Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫১

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫১
আরোবা চৌধুরী আরু

রাত প্রায় বারোটার কাছাকাছি। চারদিকে নিস্তব্ধতা। এমন ফাঁকা জায়গা, যেন বহুদিন ধরে কেউ আসে না। শহরের ছবির মতো জায়গা হলেও এখন এদিকটায় মানুষ বললেই চলে নেই। মাঝেমধ্যে দূরে কোনো কুকুরের ডাক শোনা যায়, মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসে দীর্ঘশ্বাসের মতো হালকা একটা শব্দ।
এক কোণে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। দোকানটা পুরো ভাঙাচোরা, অর্ধেক দরজা নড়বড়ে, ঝুলে আছে আধাআধি। সেখানে রাখা একটি কাঠের বেঞ্চের উপর নাফিসা বসে আছে নিঃশব্দে। শরীরের মধ্যে আর কোনো শক্তি নেই। অনেকক্ষণ ধরে কিছু খায়নি, কিছু পানিও করেনি। পেটের ভেতর খালি কিন্তু বুকের ভেতর ভরা ভয়, ব্যথা, অভিমান, আর তার সন্তানের জন্য নিজের ভিতরকার কাঁপুনি।

এভাবে হেঁটে হেঁটে কখন এখানে এসে পড়েছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি। এটা কোন জায়গা তার কোনো ধারণা নেই। শুধু জানে সে একা। আর একা নয়—তার সাথে আরেকজন আছে, তার ভেতরে। সে শুধু নিজের জন্য না, তার সন্তানটিকে নিয়ে অজানা অন্ধকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
যত রাত বাড়ছে, তত জায়গাটা আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠছে দোকানের সামনে লাগানো হলুদ বাতিটা মাঝে মাঝে টিমটিম করে নিভে যাচ্ছে, আবার জ্বলছে। সেই আলোয় নাফিসার চোখের নিচের কালো দাগ, টলমল করা ঠোঁট, আর ভেজা গালগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ পাশের ড্রেন থেকে একটা তীব্র বাজে গন্ধ ভেসে এলো। গন্ধটা এত খারাপ যে নাফিসা মুখে হাত চেপে রাখতেই পারল না।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

গড়… গড়… করে বমি করে দিল। শরীর কাহিল হয়ে গেল আরও। মাথা ঘুরছে। চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে।
“এখন কোথায় যাবো? কী করবো?”
বারবার নিজের ভেতরে এ প্রশ্ন করছে সে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর ঠাণ্ডা বাতাস। তার কাছে নেই ফোন। নেই টাকা। যে কারো সাথে যোগাযোগ করবে। আর সবচেয়ে বড় ব্যথা এই নির্জন রাতে সে একা নয়। তার শরীরের ভেতরে ডিএসপি সাহেবের সন্তান। সেই সন্তানের প্রতি ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠে।
“আপনি কোথায় …? আপনার সন্তানকে কেন এত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে?”
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল নাফিসা। চোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল। ঠিক তখনই, কাছে কয়েকজন লোকের পায়ের শব্দ সামনের অন্ধকার ফুঁড়ে তিন-চারজন লোক এগিয়ে এলো। একজন মাঝবয়সী, চোখে অদ্ভুত নজর। সে খুব কাছে এসে দাঁড়ানো মাত্র নাফিসার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
লোকটা একটু হেসে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কি নতুন… মানে হারাই গেছেন নাকি আপা?
চলেন, ঠিকানা দেন, পৌঁছে দেই। অনেকক্ষণ ধরে খেয়াল করছি আপনাকে।”
লোকটার লুঙ্গিটা তোলা অর্ধেক হাঁটুর উপরে। গায়ে ময়লা শার্ট। দাঁতে চুনের দাগ। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে,
নাফিসার সারা শরীর শিরশির করে উঠল। এবার পিছন দিক থেকে আরেকজন এসে দাঁড়াল। আরেকজন বেঞ্চের ঠিক পাশে।আরেকজন চায়ের দোকানের অন্ধকার অংশ থেকে বের হয়ে সামনে এসে চোখ সরু করে তাকাল। চারদিকে লোক…
কিন্তু ভালো মানুষ না, চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। প্রথম লোকটা এগিয়ে এসে বলল,

“চলেন আপা, ভয় পাইতেছেন নাকি? আমি আছি তো।”
তার গলায় নোংরা সুর।
নাফিসা ধীরে করে মাথা নেড়ে বলল,
“না… আমি ঠিক আছি… কেউ আসছে…”
“কি আসছে? এত রাতে কে আসব?”
লোকটা হো হো করে হেসে উঠলো।
তারপর আরেকজন বলল,,
“চলেন আপা, আমাদের গাড়ি আছে। উঠেন।”
এবার সে হাত বাড়িয়ে নাফিসার হাত ধরে টানতে চেষ্টা করল।
নাফিসা কেঁপে উঠল, হাতটা সরিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে গেছে, কথা বের হচ্ছে না। শুধু “না… না…” বলতে পারছে।
মাঝখানের লোকটা চোখ পাকিয়ে বলল,

“এই জায়গা ভালা না আপা। এত রাতে আপনে একা, ঠিক না। চলেন, গাড়িতে উঠেন। সুন্দরী মাইয়া এত রাতে একলা থাকে নাকি…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই একসাথে কাছে আসতে শুরু করল।
একজন বলল,
“দেখেন তো, বাচ্চা-বাচ্চা মুখ। হারাইছে মনে হয়। ঘরে দিয়ে আসলে খারাপ কি?”
আরেকজন মুখের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল,
“আপা, একা মাইয়া দেইখা মনে নাই যে ভয় পাইতেছে… উঠেন গাড়িতে…”
হঠাৎ একটা লোক চিৎকার করে উঠল,

“ওই! দেরি করিস না! গাড়ি আন—গাড়ি আন!”
নাফিসার বুকের ভিতর ধক ধক ধক করে বাজতে লাগল। তার শ্বাস কেঁপে উঠল। পেটের ভিতরের সন্তানটাকে দুই হাতে চেপে ধরে রাখল যেন তাকে রক্ষা করতে পারে।
একজন জোর করে তার হাত টেনে ধরল।
“চলেন! বেশি নাটক করবেন না! দেরি হইতেছে!”
“না! ছেড়ে …ছাই দেন! আমাকে ছেড়ে দেন!”
নাফিসা ছটফট করতে লাগল।
আরেকজন এসে পেছন থেকে তার কাঁধ চেপে ধরল। কেউ একজন বলল,,
“গাড়িতে উঠাই দে! এই মাইয়া মতো আর পাবা না, বুঝছিস?”
সবাই মিলে ঘেরাও করে ফেলল। একটা গাড়ি একটু দূরে দাঁড়ানো।হেডলাইট জ্বলে উঠল।
নাফিসার চোখের পানি ভয় হয়ে বের হলো,
এভাবে নয়… এভাবে কিছু হতে পারে না… তার সন্তানের কিছু হতে পারে না…

” রাশিদ ভিল্লা ” সকাল সাড়ে এগারোটা। অন্য কোনো দিনের তুলনায় আজকে ভিল্লার বাতাসও যেন আচমকা ভারী হয়ে আছে। বারান্দার গাছগুলোর ডালপালা পর্যন্ত নিস্তব্ধ। বাড়ির বিশাল হলরুমে যেই প্রাণচাঞ্চল্য থাকত কোথাও তার ছায়া নেই। যেন এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি জানালা, প্রতিটি ঘর আজকে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে কোনো অদৃশ্য ঝড়ের অপেক্ষায়।
এই চুপচাপ পরিবেশই হঠাৎ বজ্রপাতের মতো ভেঙে গেল। ভিল্লার সামনের দরজা ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকল সায়ফান।

গতকালের ফ্লাইটটা হঠাৎ লেট হয়ে যাওয়ায় যাওয়া হয়নি তার। আর ফ্লাইট না হলে সে কখনোই বাড়ি ফেরা মানুষ নয়। বন্ধুরা জোর করছিল, তাই তাদের সঙ্গে এক বন্ধুর ফার্মহাউসে রাতটা কাটিয়ে দেয়। ওখানে আড্ডা, গল্প, খাওয়া। সবই চলছিল স্বাভাবিকভাবে। মনে বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙতেই তার জগৎটা এমনভাবে পাল্টে যাবে।
আজ সকালে ফ্লাইট ছিলো জাপানের । কিন্তু ফোনটা বেজে উঠতেই স্ক্রিনে দেখা গেল জারিন। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি, ভাবছিল হয়তো কোনো সাধারণ কথা। কিন্তু ফোন কানে দিতেই জারিনের কাঁপা কণ্ঠ আর তাড়াহুড়া করা কথা শুনে বুকটা ধপ করে নেমে গেল নিচে।

জারিন আসলে খবরটা শুনছিল রিশার কাছ থেকে। রিশা আগের রাতে কি কি ঘটেছে, কে কী বলেছে—সবই খুলে বলেছিল জারিনকে। আর জারিন আবার সবকিছু বলেছে সায়ফানকে। কথাগুলো শোনার পর থেকেই তার দম আটকে আসছিল। আর সরাসরি ড্রাইভ করতে করতে চলে এসেছে ভিল্লায়।
চুল এলোমেলো। চোখ লাল। নিঃশ্বাস ভারী। শরীরে শুধু একটি থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, গায়ে কোনো জামা নেই, যেভাবে রাত কাটিয়েছে বন্ধুদের ফার্ম হাউসে, সেভাবেই গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে ভোর হতে না হতেই।
ভেতরে ঢুকতেই সে লাথি মেরে ধাক্কা দিল ডাইনিং রুমের গ্লাস সেন্টার টেবিলে।
চ্যাঁক্‌–চ্যাক্‌–ঘরররর!!

ওটা মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। চারদিকে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে গেল। তারপর পাশের ফুলদানিটা তুলে নিল। এক মুহূর্ত দেরি না করে সেটা ছুড়ে মারল দেয়ালের নিচে।
ঠ্যাং!!
ফুলদানিটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। মেঝেতে পানির দাগ, ফুল—সব এলোমেলো হয়ে গেল।
“সবাই কই?! নিচে নামো——এখনই নামো!!!”
বাড়ি কেঁপে উঠল সায়ফানের বজ্রকণ্ঠে।
বিলকিস আরা বেগম, রিশা, ইমা বেগম, রিদওয়ান—যারা-যারা বাড়িতে ছিল, সবাই ভয়ে-শোকে-অবাক হয়ে ছুটে-ছুটে নিচে নেমে এলো। কেউ বুঝতে পারছে না কী হয়েছে। সবার মুখে মুখে আতঙ্ক।
সবাই নিচে নামতেই সায়ফান সোজা হেঁটে গেল আফিয়া বেগমের দিকে।
তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে। চোখ লাল, ফুলে গেছে। বোঝা যাচ্ছে—রাত জেগে কেঁদেছেন, বহুদিনের জমে থাকা কষ্ট হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।

যে মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো করে বড় করেছেন, তার মুখ থেকে নিজের আদরের ছেলে এমন অভিযোগ তার নিজের কাছেও অসহনীয়।
সায়ফান গিয়ে দাঁড়াল মায়ের সামনে।
“আম্মু… নাফু কই?
আমি ওকে তোমার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম।
ও কই?? বলো—এখনই বলো!”
আফিয়া বেগম বুক সোজা করল। মুখ শক্ত। কণ্ঠে বরফ।
“নাই।

বাড়িতে কোনো বেইমানের নাম আমি দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করতে চাই না।”
এই কথাটা শুনে সায়ফানের চোখ সরু হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত।
“কে বেইমান আম্মু? আমি এতকিছু বুঝি না। নাফিসাকে এখনই সামনে আনবা।
এখনই মানে—এখনই!!!”
সায়ফান আবার চিৎকার করে উঠল।
বিলকিসারা বেগম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে নরম সুরে বলল,
“দাদুভাই… আগে একটু বসে শান্ত হও। কথা বলে—”
“বসার অবস্থায় নাই দাদুন! নাফিসাকে চাই—এখনই চাই!
দাও আমাকে… আম্মু—ও কই?!”
কথা শেষ করার আগেই সায়ফান আবার পাশে থাকা বড় ফুলের পটটা মাটিতে আছাড় মারল।
চূর্ণ! ভাঙচুর!

সবাই চমকে উঠল। ইমা বেগম কেঁপে হাত মুখে দিল। রিশার শ্বাস আটকে গেল।
ঠিক তখনই সাবিহা খালেদ এগিয়ে এসে, ঠোঁট বেঁকিয়ে বিরক্তিতে বলল,
“এই সব কি নাটক? তোমাকেও কি বশ করে নিয়েছে ওই বেয়াদব মেয়ে? ধরিবাজ মেয়ে কোথাকার! বাড়ির ছেলেদের মাথা খাইছে।
নষ্ট! পেটে নোংরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার—”
আর কোনো কথা শেষ করতে পারল না।
সায়ফান গর্জে উঠল,
“আর একটা বাজে কথা বললে আপনার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে নিব!
আপনি আমার কে হন—তা দেখব না!”

সাবিহা খালেদ হতভম্ব হয়ে পিছিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় বাড়ির সামনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল মাহবুব রাশিদ এবং মঈন রাশিদ। সায়মান,,ফোন করে জরুরি বলে ডেকেছে।এমন এর আগে কোনদিন জরুরি তলবে ডাকিনী। তারা বুঝতে পারছে কিছু বড় ঘটনা হয়েছে।দেরি না করে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে।
ভেতরে ঢুকেই তারা দেখল, বাড়িতে অস্থির পরিস্থিতি, ভাঙা জিনিসপত্র।
মাহবুব রাশিদ সায়ফানের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“সায়ফান, ভদ্রভাবে কথা বলো। ওটা তোমার ফুপি। মুখ সামলে কথা বল।”
এটা শুনে সায়ফান আর ধরে রাখতে পারল না। বাবার দিকে তাকিয়ে, চোখ পানিতে ভরা, একদম ভেঙে কান্না করে উঠল।

“আব্বু… তুমি দেখছো না?
কি বাজে কথা বলছে আমার নাফিসাকে নিয়ে?”
সাবিহা খালেদ তখন নাক সিঁটকিয়ে কাঁদতে লাগল,,
“ভাইজান! দেখছো কেমন ব্যবহার করছে? এক বাইরের মেয়ের জন্য আমাকে অপমান করছে! আমি আর থাকবো না এ বাসায়… আমি চট্টগ্রাম চলে যাবো!”
সায়ফান এবার সম্পূর্ণ ঘুরে দাঁড়াল।
“এই! দরজা দিয়ে বের হয়ে যান। আপনাকে আর সহ্য হয় না।
নিজের ফুপি বলতে ঘেন্না লাগে!”

সাবিহা খালেদার মুখটা কালো হয়ে গেল সাথে সাথে।
তারপর সায়ফান মায়ের দিকে তাকাল।
“আম্মু… কাকে দুশ্চরিত্রা বললে তুমি। নাফিসাকে তুমি এনে দিবে এখনি ?
মাহবুব রাশিদ এবার রাগে বললেন,
“তোমার মায়ের সাথে কথা বলার ভঙ্গি ঠিক করো! আরেক জায়গায় গিয়ে বসে —তারপর বলো কি হয়েছে!”
সায়ফান চিৎকার করে উত্তর দিল,
“আমি কোথাও বসবো না! আমার নাফিসা কই প্রথমে সেটা বলবেন!”
আফিয়া বেগম মুখ শক্ত করে বললেন,

“নাই। কোনো বেইমান এই বাড়িতে থাকবে না।”
সায়ফান তার মায়ের দিকে তাকিয়ে স্থির কণ্ঠে বলল,
“এই কথাটা তুমি তোমার আদরের বড় ছেলের সামনে বলতে পারবে তো আম্মু?”
সবাই স্তব্ধ।
মাহবুব রাশিদ ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“মানে…?”

সায়ফান এবার হাঁটু ভেঙে মেঝেতে বসে পড়ল। মাথা ধরে কাঁদতে লাগল।
“আব্বু… ভাই যদি জানতে পারে নাফিসার সাথে কি হয়েছে…
যদি ওকে না পাই… ভাই মরে যাবে! পাগল হয়ে যাবে!
নাফিসা হচ্ছে তার স্ত্রী! বিয়ের চার বছর! আমাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছিলো ওকে!”
মঈন রাশিদ সামনে এসে সায়ফানকে জড়িয়ে ধরল।
“বাবা… সায়মান আর নাফিসা বিয়ে করেছে! তুই কি বলছিস সায়ফান ??”
সায়ফান কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“হ্যাঁ ছোট আব্বু… সায়মান ভাইয়ের বউ নাফিসা… ওরা বিয়ে করেছে। আর এখন… এই বাড়ির উত্তরাধিকারী আসতে চলেছে…

আমাদের রক্ত… কিন্তু… বাড়ির মানুষ তাকে কলঙ্ক লাগিয়ে বের করেছে!”
পুরো বাড়িতে স্তব্ধতা। কারো চোখের পলক পড়ে না। রিশা মুখে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। ইমা বেগম অবাক। রাইমা ফিসফিস করে কালো হয়ে যাওয়া মুখে বলল—“নাফিসা ভাবি?”
মাহবুব রাশিদ চেয়ারে হেলে বসলেন, যেন হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠেছে।
রিদওয়ান নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে। বিলকিস আরা বেগমের চোখে আতঙ্ক।
এবং আফিয়া বেগম। তার মুখের রঙ মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল। চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে লাগল। হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন বুকের কাছে। তার মনে যেন বজ্রাঘাত পড়ল।

“নাফু… আমার নাফু… আমার ছেলের বউ… আমার মা হওয়া মেয়েকে আমি…” কথা আটকে গেল।
হঠাৎ তার পা কাঁপতে লাগল। দৃষ্টি ঝাপসা। মাথা ঘুরছে। ঘর যেন দুলে উঠছে তার কাছে।
“আমি… আমি জানতাম না… আমি কেন… এমন কথা বললাম…
আমার নাফু… আমার–”
ঠাস!
আফিয়া বেগম মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।সবাই ছুটে গেল তার দিকে। বিলকিস আরা বেগম চিৎকার করে উঠল,
“আফিয়া,,, বউমা,, ——!!”
ইমা বেগম দৌড়ে পানি আনতে গেল। মাহবুব রাশিদ স্ত্রীকে কাঁপতে থাকা হাতে মাথা কোলে নিল। মঈন রাশিদ তাড়াহুড়ো করে নাড়ি পরীক্ষা করলেন।

“ভাইয়া! প্রেসার পড়ে গেছে!
অবস্থা খারাপ!”
রিদওয়ান দৌড়ে ফোন বের করলো ডাক্তারে,। সায়ফান মায়ের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল
“আম্মু উঠো… প্লিজ আম্মু… নাফু আমার ভাইয়ের স্ত্রী… সে দোষী না… তুমি জানলে এমন করতে না…আমি জানি আম্মু… চোখ খুলো…”
আফিয়া বেগম অজ্ঞান অবস্থায় অশ্রুসিক্ত চোখ বেয়ে একটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। মনে হচ্ছে ভিতরে ভিতরে তার সমস্ত শক্তি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।বাড়ির বাতাস দমবন্ধ হয়ে গেল।

অন্ধকার ঘরটা যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে ঢোকা বাতাসও যেন কাঁদছে। স্যাঁতসেঁতে গন্ধে নাফিসার মাথা ঝিমঝিম করছে। নোংরা বিছানার উপর তাকে ফেলেই লোকগুলো চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে এমনভাবে—যেন জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কোনো অসহায় প্রাণীকে ঘিরে ফেলেছে হিংস্র নেকড়ে।
নাফিসা হাত-পা ছটফট করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট দুটো ফেটে রক্ত উঠেছে সামান্য। তার চোখে এখন ভয় নেই—বরং একটা গভীর অসহায়তা, একটা মাতৃত্বের ব্যথা। ধরে রাখা লোকগুলোর হাত শক্ত হতে থাকলে নাফিসা মরিয়া হয়ে মাথা তুলে ফিসফিস করে বলল,,
“আল্লাহ… বাঁচান… কেউ… কেউ বাঁচান…”
তার কথা দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো, কিন্তু সাহায্য আসছে না।
যে লোকটা সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আরেক ধাপ এগিয়ে এসে কর্কশ হাসিতে বলল,
“এই কান্নাকাটি করলে চলবে না। আজকে তোর অভিনয় কাজে লাগবে না। এখানে কেউ তোক বাঁচাইতে আসবো না।”

লোকগুলোর বাঁকা হাসি আর দূরের কুকুরগুলোর ডাকে পুরো পরিবেশটাকে আরও ভয়ংকর লাগছিল। কিন্তু হঠাৎই নাফিসা চোখ শক্ত করে বন্ধ করল। তার বুকের ভিতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
অভ্যাসের মতো, স্বভাবের মতো—যার নাম শুনলেই তার ভরসা ফিরে আসে,
” আল্লাহ সহায় হও আমার DSp সাহেব…কে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও ”
শ্বাস কাঁপতে কাঁপতে সে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল।
“ডিএসপি সাহেব… কোথায় আপনি…?”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে, অশ্রু ঝরছে অসহায়ত্বে।
“আপনার পিচ্চি পুতুল… অনেক অসহায়, সাহেব…আপনি কোথায়… ”
নাফিসা ভাঙা নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

“প্লিজ দয়া করেন , আমার বাচ্চা কিছুই বুঝে না… ও তো এখনও এই দুনিয়া আসতে পারে নাই…”
তার এক হাত শক্তভাবে চেপে ধরা লোকটা চিৎকার করে বলল,
“চুপ শালী !আবার মুখ খুললেই—”
কথা শেষ করার আগেই নাফিসা কেঁদে উঠল।
“প্লিজ… আমার পেটে বাচ্চা… প্লিজ দয়া করে আমার ক্ষতি করেন না আমাকে ছেড়ে দেন, আল্লার দোহাই লাগে ” অসহায়ভাবে চিৎকার করে উঠল।
“DSPসাহেব ! আপনার বাচ্চার জন্য হলেও আসেন আপনার পিচ্চি পুতুল ডাকতেছে… দয়া করে… আসেন আপনার খুবই প্রয়োজন এখন ”
অন্য লোকটা হেসে বলল,,

“এই যে, কে রে তোর সাহেব? কে বাঁচাবে তোকে এবার ?
একজন এগিয়ে এল—
“চেঁচামেচি কইরেন না আপা। আমরা তো আপনাকে সাহায্যই করতে চাইছি…”
হাতে নোংরা গামছা, চোখে কুৎসিত হাসি।
আরেকজন দরজাটা ভেতর থেকে ঠাস করে বন্ধ করে দিল।
ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেল আরও।
নাফিসার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। বুক ঢিপ ঢিপ করছে। কানও যেন ঝিমঝিম করছে ভয় আর দুর্বলতায়।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫০

” প্লিজ এমন করবেন না “চোখ ভিজে গেল। অশ্রু ঝরে পড়ল তার কানের পাশে বিছানায়।
চারজন ওর হাত পা ধরে আচ্ছা শক্ত করে.. আর আরেকটা লোক নিজের শার্ট খুলে টান মেরে নাফিসার দিকে লালসার দৃষ্টিতে এগিয়ে গেল…………

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫২