ছায়াস্পর্শ পর্ব ২২
জান্নাত চৌধুরী
কাল কুঠুরির মাঝ বরাবর একখান কাঠের রাজকীয় চেয়ারে বসে একের পর এক ধারালো অস্ত্র হাতরে চলেছে এক
ছায়ামানব তারপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক যুবক। এদিকে শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই মাটিতে পড়ে থাকা যুবকটির একেবারে মাটির সঙ্গে নেতিয়ে আছে সে।
হাত থেকে তুলে নেওয়া মাংসের জায়গায় হারের দেখা মিলছে। মাটিতে রক্ত শুকিয়ে কালো রং হয়েছে। যুবকের প্রাণ পাখি যেন একটু সাড়া পেলে বিদায় নিবে। ভীষণ যাই যাই করছে যে। ছায়া মানব খুতিয়ে খুতিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছে সব ধারালো অস্ত্র।
এক এক করে সবগুলো পর্যবেক্ষণ হতেই ,শেষে এসে হাতে তুলে নেয় একটা “চেইন স্পোকেট”। ছায়ামানব কিছুটা হেসে অস্ত্রের ধার পরীক্ষা করতেই এক টানে কেটে নেয় নিজের বৃদ্ধা আঙ্গুলের চামড়া। কাটা জায়গা হতে অচিরেই রক্ত ঝড়ছে। ইরফাদ এগিয়ে আসতে নিবে তার আগেই ছায়ামানব তাকে থামিয়ে উঠে দাড়ায় । “চেইন স্পোকেট” হাতে এগিয়ে যায় নেতিয়া থাকা যুবকের পানে। শক্তিহীন এক প্রাণী লাগছে ছেলেটাকে ছায়ামানব নেতিয়ে থাকা যুবকের মুখের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ইরফাদের পানে তাকাতেই হাতে করে এক বোল ফুটন্ত গরম পানি হাতে এগিয়ে আসে সে। ছায়ামানব একবার পানির দিকে একনজর তাকিয়ে হাতের “চেইন স্পোকেট”গরম পানিতে ভিজিয়ে ঝুকে যায় যুবকের দিকে। কানের কাছে এসে হিসহিসিয়ে বলে-
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কুল্লু নাফসি জাইকাতুল মাওত”
দ্বিতীয় বারের মতো ছায়ামানব যুবকের পুরো শরীর পর্যবেক্ষণ করে ইরফাদের দিকে তাকাতেই “আবারো অস্ত্র এগিয়ে দেয়। ছায়ামানব স্পোকের ধার অংশের জলন্ত আলো একবার দেখে বলে –
“জাযাকাল্লাহ খাইরুন”
সঙ্গে সঙ্গে এক কোপে ধর থেকে মুন্ডু আলাদা হয়ে যায়। যুবকের তাজা রক্ত ছিটকে এসে পরে ছায়া মানবের মুখে। রক্তে ভিজে উঠে কাঁচা মাটি , ইরফাদ এমন দৃশ্যে চোখ বুজে নেয় হাত কাঁপছে বেচারার ।এতটুকুতে ক্ষান্ত হয় না ছায়ামানব এবার পুরো “ চেইন স্পোকেট” গেঁথে দেয় মৃত দেহের বুক বরাবর, ঠিক বামদিকে হার্টের অবস্থানে। অস্ত্র গেঁথে যেতেই হাত সরিয়ে নেয়। চোখে মুখে রক্তের ফোটা ইরফাদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করতেই বাকি ধারালো অস্ত্রের দিকে এগিয়ে যায়। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে সব অস্ত্রের মাঝে ছোট ধারালো ছুরি “অবসিডিয়ান ব্লেড” হাতে আবারও এসে দাঁড়ায়। ছায়ামানব হাত বাড়িয়ে ছুরিটা হাতে নিয়ে ঠিক “স্পোকেট” গাথা জায়গার চারপাশে দক্ষ হাতে চামড়া ছুলে মাংস বের করে তারপর ধীরে সুস্থে মাংস কেটে হৃদপিণ্ডের দেখা মিলতেই চোখে মুখে এক পৈশাচিক আনন্দ ফুটে ওঠে।
স্পোকেটের আঘাতে হৃৎপিণ্ড দুভাগ হয়েছে। ছায়ামানব উচ্ছ্বসিত চোখে বুক চিরে বের করে আনে হৃদপিণ্ড। মানব দেহের তরতাজ রক্তে হাত ভিজে উঠছে তার। গরম পানির বোলে হৃদপিণ্ড রেখে এবার উদ্যত হয় ফুসফুসের দিকে প্রথমে ডানের বুক চিরে ফুসফুসের ডান দিকের অংশ চীড়ে নেয়, তারপরে বামের অংশ ছিড়ে এনে মুন্ডু হীন দেহের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাঙ্ক্ষিত দুই জিনিস যথাস্থানে রেখে এবার ছায়ামানব কলিজার দিকে হাত বাড়ায় বেইমানের কলিজা মাপা তার এক শখের কাজ।
কলিজা ছিরে হাতে নিয়ে এগিয়ে ওয়েট মেশিনের উপর রাখতেই লাল আলো ফুটে উঠে জানান দেয় “ ১৫০০গ্রাম।” ওজন দেখে ছায়ামানব রক্ত হাতে ভ্রু চুলকায় –
-ধুর বাল মাপ তো ঠিকই ছিল তবে মারাটা খেলি কেন?
ইরফাদ দূর হতে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল “আসলে ভাই লোভে পাপ , পাপে মৃত্যু। এই সংজ্ঞা হয়তো এই বান্দির ছেলে জানতো না!
ছায়া মানব ঘাড় কাত করে একবার ইরফাদের দিকে তাকিয়ে, পকেট হতে একটা ছোট শিশি বের করে আবারও এগিয়ে যায় লাশের কাছে। শিশি টা উল্টেপাল্টে কয়েকবার দেখে নেয় । শিশির গায়ে বড় অক্ষরে লেখা “ফ্লোরোঅ্যান্টিমনিক এসিড (HSbF6 )
ছায়া মানব লেখাতে একবার চোখ বুলিয়ে পুরো শিশি লাশের উপরে ঢালতেই এক মুহূর্তে পুরো ঘরে বীভৎস এক গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ইরফাদ দুহাতে নাক চেপে ধরে চোখের পলকে লাশ পুড়ে ছাই হতে থাকে। মাংস জ্বলে কালো হয়ে গিয়েছে। চোখের সামনে এত ভয়ংকর এক দৃশ্য এই প্রথম দেখলো ইরফাদ। ছেলেটা এ লাইনে নতুন তাই হয়তো এসবই অস্বস্তি তার। মোচড় দিয়ে উঠে পেটের নাড়িভুড়ি- এক মূহুর্তে গলগলিয়ে পেটের সব উগড়ে বের করে সে।
বুক ধরফর করছে , কপাল বেয়ে ঘাম বইয়ে। ঘরের মাঝে নিঃশ্বাস নেওয়াটাও বিষ লাগছে।
এদিকে ছায়ামানব শান্ত চোখে লাশের জলন দেখে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। সেই শব্দ চার দেয়ালের মাঝে বারি খেয়ে পুরো ঘরে কম্পনের সৃষ্টি করে।
বাইরে ঝড়ো বাতাস বইছে , ইফরাহ আসরের নামাজ শেষে খাটের পাশিতে হেলান দিয়ে বই নিয়ে বসেছে, আরাধ্য বেরিয়েছে ! গোসল সেরে এসে খাটে এসে বসতেই কল এসেছিল, তড়িঘড়ি করে কোথায় গিয়েছে কে জানে?
ইফরাহ একবারের জন্যেও সুধায়নি। শুধালেও বুঝি থুরি বলবে তাকে। উংফাং বুজরুকে একটা বুঝিয়ে দিত লোকটা, আরাধ্য যেতেই ভেজা চুল বালিশে মেলে লম্বা এক ঘুম দিয়েছিল। সামনে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা অনেক পড়া জমে রয়েছে। সে কি জানতো নাকি বিয়ের পরেও ওই মানুষটা তাকে পড়তে দিবে। দিয়েছে তো! তার উচিত মানুষটাকে ধন্যবাদ জানানো! বায়োলজির শ্রেণীবিন্যাস পড়তে পড়তে এসব কথা ভাবছিল সে। আজকাল লোকটা বড্ড ভাবনা এসে হানা দেয় তার। এখন আর পড়া হবে বলে মনে হয় না।
ইফরাহ বইয়ের পাতা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায় , লাল ব্লাউজের সঙ্গে সাদা রঙের এক শাড়ি পড়েছে মেয়েটা। হাঁটতে হাঁটতে ভেনেটির কাছে এসে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে তাচ্ছিল্য হাসে!
-কি অবাক নিয়ম আপনার বিধাতা, যার সাথে জোড়া মিলালেন তার প্রতি অনুভূতি শূন্য রাখলেন। খুতবা পড়ে শরীরে বৈধতার রাস্তা দিলেন! তবে বিষাদে ভরা মনে প্রণয়ের সৃষ্টি কেন বাধা রাখলেন? তবে কি মালিক আপনি আমায় জীবন্ত লাশ বানালেন?
চোখের কোনায় পানি এসেছে ইফরাহর। পানি মুছে চুলে বেনী করে নেয়। একা রুমে দম বন্ধ লাগছে, এবেলাটা নাহয় অরুনিমার ঘরেই থাকবে সে। যেই ভাবা সেই কাজ, লম্বা বেনুনী খান পেছনে ছেড়ে মাথায় কাপড় টেনে বেরিয়ে পড়ে।
দোতলার মাঝ বরাবর ঘরটা চেয়ারম্যান আর অরুনিমা। অরুনিমা খাটের উপর বসে পান চিবোতে চিবোতে বই পড়ছিলেন। পুরনো দিনের এক নোভেল- ইফরাহ দরজার কাছে এসে ডাকতেই বই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেন তিনি
-আম্মা আসবো।
ডাকটা বেশ আদুরে মনে হলো তার। অরুনিমা হাতের বই বিছানায় রেখে চোখের চশমা খুলে হাতে নিলেন
-আরে বউরানী যে , আসো আম্মা।
ইফরাহ শাড়ির আঁচলে পিঠ ঢেকে এগিয়ে গিয়ে খাটের কাছে দাঁড়াল। অরুনিমা বারবার মুগ্ধ হয় এই মেয়ের রূপে, গায়ের রঙ ভীষণ সাদা। অরুনিমা কালো তা নয় , তবে এই মেয়ের রং দুধে আলতা।
-আমি কিছু সময় এখানে বসি আম্মা..!
ভাবনার মাঝে অরুনিমা দ্রুত চমকে বলে- সে আর বলতে আয় দেখি।
কথা শেষেই প্রায় হাত ধরে বসিয়ে দেন তিনি। ইফরাহর শাড়ির আঁচল সরে যায় লম্বা বেনুনি খাটে পড়তেই
-মাশাআল্লাহ
বিড়বিড়িয়ে ওঠে অরুনিমা। ইফরাহ্ শান্ত চোখে তাকায়। অরুনিমার একটু এগিয়ে লম্বা বেলুনী হাতে নিয়ে বলে-
-দুনিয়ার নিয়মে বুঝি রূপবতী তোরেই বলে! কি সুন্দর কেশ, কি সুন্দর গায়ের রং।
“-আপনিও তো কম সুন্দর না আম্মা!”
অরুনিমা মুচকি হাসে “ আমি সুন্দর কিনা জানিনা! তয় তোর লাহান সুন্দর এই গ্রামে একখানও নাই , এই কথা মিছা নাহ।
ইফরাহ নিশ্চুপ থাকে , অরুনিমা তার থুতনি হাতে ছুঁয়ে নিয়ে চুমু খায়। ভীষণ অবাক হয় মেয়েটা মলিন চোখে তাকিয়ে থাকে অরুনিমার মুখের দিকে । চোখ ছলছল করছে মরা মায়ের কথা মনে পড়ে যায় তার। আজ আম্মা বেঁচে থাকলে হয়তো তাকে এভাবেই ভালোবাসতো। মা চরিত্রটা ভীষণ আদুরে তার কাছে । যার কপাল রয় সেই এই সুখ লুফে লয়।
“-এই মাইয়া !” কি ভাবো?
অরুনিমার ডাকে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটে ইফরাহর। নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে –
-ইয়ে মানে আম্মা.. বুবু মানে , মানহা বুবু আপনার বোনজি তাই না?
-হো , আমার ছোটবোনের মেয়ে। ভীষণ ভালো ছিলো মেয়েটা, বাপজানের সকল কথা মাইনা চলতো। স্বামী ভক্ত তো বটেই, উপরওয়লা মনে হয় বেশি ভালা মানুষরে বেশিদিন আমাগো মাঝে বাঁচাইয়া রাখে না। তাই তো আমার ময়নারে লইয়া গেছে, একখান বাস এক্সিডেন্টে বইন আমার গত হয়েছে। ছোটকালে মাইয়াটা মা হারাইছে পরে তোমার শশুর বাপ লইয়া আইছিলো তারে। তাই গত বছর মঞ্জুরুলের শরীর খান খারাপ থাকায় মাইয়ারে পাঠাইয়া দিছিলাম। সে বছর মন্জু ইন্তেকাল করেছে শুনছি ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল তার। মাইয়া আমার বাপ মা ছাড়া এতিম। ভাবছি , নির্বাচন বাইর হইলে ভালো এক রত্ন দেইখা নিকা দিমু।
অরুনিমার কথা শেষ হতেই দীর্ঘশ্বাস নিংড়ে ফেলে ইফরাহ।
ছায়াস্পর্শ পর্ব ২১
“মালিক বুঝি মরা মানুষরেই বারবার মারে তাই না আম্মা?
অসহায়ের প্রতি বুঝি মালিকের ভীষণ ক্ষোভ।
অরুনিমা হাত রাখে তার মাথায়, মুখে দুঃখ মিশ্রিত এক মলিন হাসি টেনে বলে –
-মালিক সর্বশক্তিমান ,আর জীবন হলো ভূমিকাহীন এক গল্প। এর প্রতিটি লাইনে ব্যর্থতা সাজানো! যা কেবল মুখস্থ বিদ্যাতেই সহজ- হিসাব কষা বড্ড কঠিন।
অরুনিমার এই কয়েক লাইনের জীবন বর্ণনার মানে ইফরাহ বুঝলো কিনা জানা নেই। তবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো মুখ পানে।
