Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৭

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৭

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৭
জান্নাত চৌধুরী

পুরো গ্রাম কেচ্ছা রটানো হলো‌ , বেলা গড়ানো আগেই লোকের মুখে মুখে ছিঃ -ছিক্কার পড়ে গেলো। পুরো গ্রাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে লোক আসছে ধরা পড়া ছেলে মেয়ে মেয়ে দেখতে। কি লজ্জাজনক ব্যপারটা। রেজার ইচ্ছে করলো সব ধ্বংস করে দিতে‌। তার জন্যে, শুধু তার জন্যই বিনা দোষে বদনামি হচ্ছে একটা মেয়ের। এর থেকে বড় শাস্তি কি আর হতে পারে?

লোক জনে ফিসফাস করছে , কেউ কেউ তো রাইসার বয়স নিয়ে টোন কাটছে , “এ্যাঁহ নাক টিপলে মায়ের দুধ বাহির হ‌ইবো, ছেরির উত্তেজনা দেখছো?”
একজন তো বলেই ফেললো , “ আমার ঘরের মাইয়া যদি এমন হ‌ইতো। ওই মাইয়ারে বিষ খাওয়াইয়া মাইরা দিতম;
রাইসা শুনলো সকলের কটু কথা। এইটা যদি অন্য কোনো সময় হতো রাইসা কি তাদের কথা শোনাতে ছাড়তো? বিন্দু পরিমাণ নয়। রাইসার হাসি পেলো ? হাসি পেলো বলতে হেসে উঠলো। বুকে ওড়না নেই , গায়ে মাটি, ককড়ানো চুলো গুলো এলোমেলো পিঠে। রেজা অবাক হলো , মেয়েটা হাসছে ? অথচ সময়টা কান্না করার।
রাইসা না তাকিয়েও বুঝলো রেজা অপরাধ বোধে ভুগছে। লোকটার দোষ নেই , সত্যি দোষ নেই। সে বিপদে পড়ে এসেছিলো। রাইসা সাহায্য করেছে তাকে। এতো অপমান, লাঞ্ছনা কিছুই যেন টলাতে পারে না রাইসার এ ভাবনা। রাইসা মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো। পারলে খামচে ধরে, মাটি গায়ে মেখে একটু আশ্রয় চেয়ে নিতো। এ দুনিয়া আজ তার কাছে বড্ড স্বার্থপর লাগছে। তার আপাকে প্রয়োজন ?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-আপারে”
বিরবির করে থেমে গেলো রাইসা! মনে ভাবনা বাসা নিলো তার আপাও কি তাকে নষ্টা ভাববে? মস্তিষ্কে এই কথা আসার কারণ বুঝলো না।‌তার আপাও কি ঘেন্না করবে তাকে ? আপার চোখে কি তার জন্য ঘেন্না থাকবে কত ভাবনা ভাবলো সে?
“বিবাহের আগে নারী জীবনের পুরুষ আর কলঙ্ক দুটোই যেন চান্দের গায়ের সেই ফাঁটা ফাঁটা দাগের মতো। পৃথিবীতে যতদিন এদের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন এই দাগ গায়ে লাগিয়ে নিয়ে চলতে হবে। পুরুষ কি কলঙ্ক মুক্ত হয়? এদের কি কোনো‌ ভুল নেই? নেই হয়তো ! পুরুষের গায়ে কখনো দাগ লাগেনা , কখনো কেউ কাঁদা ছুঁড়ে না। কেনো ছুঁড়ে না ?

তবে কি কলঙ্ক কেবল নারীর জন্য‌ই সৃষ্ট।
রাইসা সকল ধিক্কার মাথা পেতে নিলো।
অতঃপর ভাবলো , এই ছোট জিবনে পৃথিবীর তাকে বড্ড একটা উপহার দিলো।আর কোনো চাওয়া পাওয়া নেই তার! সব ফুরিয়ে এসেছে , বাকশক্তি হীন অনভুব হলো। জোয়ারের এক বিভৎস ভাঙ্গনে হারালো তার ঘর।
বিচারের ব্যবস্থা করা হলো‌, চেয়ারম্যান বাড়িতে বিচার বসবে। গ্রামের লোক দলের দলে চেয়ারম্যান বাড়ির বাগানে এসে ঘাসের উপর বসল। চেয়ারম্যান এখনো আসে নি , লোকজন এসে তার অপেক্ষায় করতে লাগলো।

বেলা আড়াইটে , বেঘোড়ে ঘুমোচ্ছে আরাধ্য। ইফরাহ খাবার এনেছে , প্লেট টেবিলে রেখে ডাকলো –
-“ছোট নবাব উঠুন , চেয়ারম্যান সাহেব ডেকেছেন আপনাকে।”
আরাধ্য ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠলো। ইফরাহ গায়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে তাকে আবার ডাকলো, “ উঠুন”!
কিছু সময় একইভাবে ডাকার পর , আরাধ্যের ঘুম আলগা হলো। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলো ইফরাহকে, রোজকার মতো আটপৌরে শাড়ি পড়ে মাথায় ঘোমটা টানেছে মেয়েটা।‌ হাতে একখান তোয়ালে নিয়ে দাড়ানো,
আরাধ্য হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে বসালো পাশে। কিছু টা সরে এসে উবু হয়ে কোলে মাথা রাখলো। ইফরাহ বলল-
-”আল্লাদ করা হলে উঠে পরুন। আব্বাজান ডেকেছে আপনাকে। বাগানে সালিসি আছে আজ – আপনি আমন্ত্রিত।
আরাধ্য নাক ঘুষলো , মাথাটা হালকা উঁচু করলো জিজ্ঞেস করলো,

“ কিসের সালিস ?”
ইফরাহ জানে না কিসের সাসিল। সে নিশ্চুপ থেকে বোকা মেয়েদের মতো তাকিয়ে থাকলো।
-”জানো না ?”
ইফরাহ মাথা নাড়ালো “উঁহু”
আরাধ্য উঠে বসল ! উদাম শরীরের বুক ভর্তি লোমের দিকে তাকিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলে নিলো ইফরাহ। আরাধ্য ভ্রু কুঁচকে তাকেই দেখছে। এক পর্যায়ে ইফরাহর হাত টেনে নিয়ে নিজের বুকে রাখলো। ইফরাহ চমকালো , আরাধ্য কিছুটা ঝুঁকে তার ললাটে চুমু খেলো।
-“ইরা ”
-“হুম”

আরাধ্য তাকিয়ে থাকলো কিছু বলে না। রোজ এই “হুঁম” এই উত্তর টুকু তাকে তৃপ্তি দেয়। উঠে দাঁড়ালো , গোসল খানায় গিয়ে ব্রাশ করে চোখ মুখ ধুয়ে এলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিলো।
বেশ সুদর্শন সে ? নিজকে নিয়ে গর্ব হয় তার।আর্মি তে থাকা কালীন কত প্রশংসা পেয়েছে ,সেসব অতীত। ইফরাহ একটা পাঞ্জাবী বের করে দিলো, কালো রঙের। আরাধ্য নাক কুঁচকে বলে , “ বিয়ে করতে যাচ্ছি নাকি ,পাঞ্জাবি দিয়েছো কেনো?”
-”বিয়েতেও পাঞ্জাবি পড়েন নি আপনি !
আরাধ্য উদাম গায়ে পারফিউম মারলো , জুঁই , জেসমিনের ঘ্রাণ নাকে বাজলো ইফরাহর। চোখ বুজে ঘ্রাণ শুঁকেছে। আরাধ্য পাশ কাটিয়ে গিয়ে আলমারি থেকে একটা গেঞ্জি বের করে গাঁয়ে জড়ালো।
-”আসছি আমি ;
ইফরাহ চোখ মেললো দ্রুত , আরাধ্য যেই যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে সে সামনে এসে দাড়ালো। আরাধ্য অবাক হলো না তেমন। ইফরাহ বলল-

-”খাবার এনেছি খাবেন না ?
আরাধ্য ঘড়ি দেখলো , “ এসে খাবো”।
-আমি খাইনি , “ চলুন একসাথে খাই!”
এবারে স্তব্ধ আরাধ্য , কিছুটা অবাক চোখে তাকায় ইফরাহর দিকে! আনমনেই বলে –
-“আমায় ডাকছো তুমি ? তুমি ডাকছো ?”
-”কি হলো আসুন ?
-এ্যাহ, ও হ্যাঁ, কি বলছো?
ইফরাহ চেহারায় মৃদু রাগ। আরাধ্য দুহাত জোর করে বললো,
-“ভুল হয়েছে মহারানী আসুন।”
দুজনে গিয়ে সোফায় বসল , ইফরাহ এক প্লেট আরাধ্যের দিকে এগিয়ে দিলো। আরাধ্য খাবার দেখে নিয়ে চুপ করে করে থাকলো, নাড়লো না। ইফরাহ জিজ্ঞেস করল-

-“কিছু প্রয়োজন ?”
আরাধ্য আস্তে করে মাথা ঝাঁকালো , “হুম”!
-“কী ?”
-”খাইয়ে খাও ;
ইফরাহ চুপচাপ হাত ধুয়ে খাওয়াতে বসল। ছোট ছোট হাতে বেশ সুন্দর করে ভাত মাখায় মেয়েটা। আরাধ্য তাকিয়ে দেখলো। ইফরাহ এক লোকমা ভাত তুলে , আরাধ্য দিকে ধরতেই আরাধ্য খেলা না। উল্টো ঘুরিয়ে ভাত ইফরাহ দিকে দিলো।‌ ইফরাহ একবার ভাত আরেক বার আরাধ্য কে দেখছে। আরাধ্য বলল-
-“আগে তুমি খাও , যদি খাবারে কিছু মিশিয়ে আমারে বৃন্দাবন পাঠানো ব্যবস্থা করো। এমনিতেই আজকাল তোমায় আমার সন্দেহ লাগে!”

ইফরাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, বিনা বাক্যে ভাত মুখে নিয়ে চিবোতে শুরু করলো। আরাধ্য তৃপ্তি নিয়ে মেয়েটার খাওয়া দেখছিলো এক পর্যায়ে বলল –
-“তোমায় বড্ড অচেনা লাগছে ইরা!”
ইফরাহ মলিন হাসলো , চিবনো ভাত গিলে নিয়ে আবারো ভাত মাখিয়ে আরাধ্যের দিকে ধরলো। আরাধ্য ভাত মুখে নিলো।
-“আপনি কি আমায় পুরোটা চিনেন ছোট নবাব ?”
-“চিনি না বলছো?”
-”হুম”
আরাধ্য হাসল , ইফরাহ মাথা নিচু করে ভাত মাখাতে মাখাতে বলল , “ আপনি সবসময় আমার পিছু নিয়েছেন। আমায় ভয় পাইয়েছেন। সব সময় জোড় করে বিরোধ করেছেন।”

-“তো এখন কি করছি না, বলছো?”
-“উহু!”
-“তবে ?”
ইফরাহ আরেক লোকমা ভাত এগিয়ে দিলো ,
– “ ইসলামে উল্লেখ্য নিয়ম পালন করছি। আপনি স্বামী আমার , আপনার খেদমত করা আমার কর্তব্য!”
-“শুধুই কর্তব্য?”
ইফরাহ মৃদু হাসল। খাবারের প্লেটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেই বলল-
-“আপনি ভরসা আমার এতটুকুই । বলতে পারেন , এই যে বিষাক্ত সমাজের মাঝের এক শক্ত খুঁটি আপনি।‌ যার আশ্রয়ের আপতত নিজেকে বাঁচিয়ে , বেঁচে আছি। আমার জীবনে ভালোবাসার মানুষ খুব কম সংখ্যক হলেও, ভরসার মানুষ আপনি একজন।

-”আমি ভরসা ?
ইফরাহ আস্তে জবাব করল , “ হুম আপনি ভরসা। আপাতত আপনি ব্যতিত আমার ভরসার কেউ নেই। সবাই আমায় ঠকিয়েছে জানেন?”
বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকালো আরাধ্য, ইফরাহকে আবেগপ্রবণ দেখাচ্ছে। মেয়েটা এমন নয়। ভীতু , তবে দুর্বল নয়। আরাধ্য বসা অবস্থায় কিছুটা এগিয়ে এলো , ইফরাহর হাতের প্লেট টেবিলে রেখে নিজের হাতে মুঠোয় তার বাম হাত রাখলো। আরাধ্য খানিক সময় তাকিয়ে থাকল , তারপর নরম স্বরে বলল-
-”কিছু হয়েছে তোমার ?”
ইফরাহ মুখ লুকালো আরাধ্যের বুকে , চোখ হতে পানি পড়ছে। আরাধ্য মাথায় হাত রেখে ডাকল –
-“ইরা”

-“আমায় আজ কাল কেনো বুঝে উঠছেন না আপনি ছোট নবাব? আমি বড্ড দুর্বল হয়ে পরেছি‌‌। নিজের অবস্থান নড়বড়ে মন হচ্ছে আমার। আমায় আগলে নিন ছোট নবাব।”
আরাধ্য শক্ত করে জড়িয়ে নিলো। এঁটো হাতেই ইফরাহ খামচে ধরে আরাধ্য বুকের কাপড়। ডুকরে উঠলো , আরাধ্য কিছু সময় তাকে বুকে রেখে শান্ত স্বরে বলে ,
-“কেঁদো না ইরা , তোমার চোখের ঝড়া বিন্দু পানির দৃঢ়তা ঠিক, এতোই প্রখর। যা অচিরেই ক্ষত করছে আমার বক্ষ পিঞ্জর।”
ইফরাহ নিশ্চুপ আরাধ্যের বুকে। আরাধ্য তার চুলে হাত বুলায় , কয়েকবার খোঁপা চুল বিলি কাটলো।
-”রাজার অবর্তমানে রানীর দায়িত্ব হয় পুরো সাম্রাজ্য পরিচালনা করার। আর তুমি কিনা অবস্থান নড়বড়ে বলে কেঁদে ভাসাচ্ছো মেয়ে ? আমার সম্রাজ্ঞী তুমি , আমার রানী। আর রানী কখনো অবস্থানের ভয়ে মরে না। সাহসী হ‌ও ইরা;

-”পারছি না ;
-“শিখবে কবে ? আজ আমি আছি , কাল না থাকলে তবে।
ভেঙ্গে পড়বে তুমিই?”
কান্না থামলো , ইফরাহ দ্রুত সরে এসে বসল। আরাধ্যের চোখের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থাকলো।
আরাধ্য হাসল , “বড্ড কোমলমতি তুমি , মেয়ে। তবে , ছোট হৃদয়ের চঞ্চলতা লুকিয়ে বাঁচতে চাইছো। প্রয়োজন নেই , তুমি স্বাধীন ইরা। মাথার উপরের এই বিশাল আকাশ চড়ে বেড়ানো স্বাধীনতা তোমায় দেওয়া হলো। চড়ে বেড়াও এই ধরনী বুকে , উড়ে যাও ওই নীল আকাশের উদ্দেশ্যে। , তবে মনে রেখো কেউ একজন তোমার প্রতিক্ষায়।”
ইফরাহ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো আরাধ্যের অভিব্যক্তি। চোখে , চোখ রেখে বলল-

-“আমার প্রতি এতো বিশ্বাস রাখবেন না !”
আরাধ্য উচ্চশব্দে হেসে ফেলল , “বিশ্বাসেই মেলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর!”
-“বিশ্বাসী হয়ে ঠকলে নিশ্চয়ই আমি দায়ী ন‌ই ?”
-”তুমি ঠকাবে আমায় ইরা?”
আরাধ্যে চাতকের ন্যায় অপেক্ষা করছে উত্তরের , ইফরাহ কিছু না বলে মুসকি হাসলো শুধু। এঁটো হাত প্লেটে ধুয়ে, পানি এগিয়ে দিলো আরাধ্যের দিকে, – “ আপানাকে ঠকালে অবশ্যই প্রাণের মায়া ত্যাগ করতে হবে ছোট নবাব।”
আরাধ্য মুসকি হাসল; ধীরে ধীরে আরো কিছুটা প্রসস্থ হলো সেই হাসি। ঘড়ির কাঁটার শব্দ হলো, বিকাল তিনটা। অপাতত দু’জনের কথার ইতি টানলো। ইফরাহ আরো একটা গেঞ্জি এনে দিলো। আরাধ্য তা গাঁয়ে জড়িয়ে বেড়িয়ে গেলো –

সালিসি বসেছে , দুটো কাঠের চেয়ার বসানো হয়েছে বাগানের দিকটায়। একটা চেয়ারম্যান এসে বসেছে অনেকক্ষণ। অপরটা আরাধ্যের জন্য অপেক্ষা করছে।
সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আরাধ্য এলো , চেয়ারম্যান একবার তার অগোছালো ছেলের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকায়। চুল দাঁড়িতে বেপরোয়া লাগছে , চেয়ারম্যানের ভাষায় এক কথায় জংলি। আরাধ্য , রিলেক্সে বসেছে। সে শুধু কথা শুনবে , বিচার পছন্দ না হলে শেষে নিজে একখান মত দিয়ে কেটে পড়বে। বরাবর‌ই তাই হয় তবে আজ কী ঘটবে সে কি জানে?
বিচার কার্যক্রম শুরু হলো , চেয়ারম্যান সাহেব সকলের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলেন আজকে মূখ্য বিষয় কী। প্রথম এক বৃদ্ধা উঠে দাড়ালেন , সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে বললেন ,
– “ আজ‌ই সকালে মাইয়া – আর পোলা কুকাম করতে গিয়া ধরা খাইছে চেয়ারম্যান সাহেব। আমরা হগ্গোলে সাক্ষী। লগে মাতব্বর সাহেব ও আছিলো।
চেয়ারম্যান তাকালেন মাতব্বরের দিকে , মাতব্বর চোখ দিয়ে আসস্ত করলেন। অতঃপর চেয়ারম্যান আবার জিজ্ঞেস করলেন –

-“ছেলে – মেয়ে কোথায় ?”
এক দড়িতে দুজনকে বেঁধে টানতে টানতে চেয়ারম্যান বাড়ির বাগানে এনে দাড় কারালো পাড়ার ছেলেরা। রেজা – রাইসা দু’জনের দিকে তাকিয়েই চমকিত হলো আরাধ্য। যা তার চোখে মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। চেয়ারম্যান নিজেও অবাক হয়েছেন। তবুও ভাবলেস ভাবেই বললেন –
-“কে কে দেখেছে তাদের খারাপ কাজে লিপ্ত হতে ?”
এক মহিলা শাড়ির আঁচল টেনে এগিয়ে এলো ,মাথাটা মাটির দিকে নিচু রেখে বলল , – “ আমি দেখছি হুজুর , আমি দেখছি ইসমাইলের মাইয়ার ঘর থেকে এই পোলা বা‌ইর হ‌ইছে। মাইয়া নিজে বাহির করেছে। তার থেকেও বড় কথা , পোলা -মাইয়া দুজনেই খারাপ কামের চিহ্ন নিজের শরীর বহন করতাছে।
উপস্থিত সকলেই মনোযোগ দিয়ে শুনলো সব , জহুরা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন। সমাজের সামনের নিজের কোনো মতামত নেই। ইসমাইল শেখ শান্ত হয়েই শেষ ফলাফলে অপেক্ষায়। চেয়ারম্যান নীবর থেকে সব শুনে বললেন –

-তাদের পাপ কাজে লিপ্ত হতে কেউ দেখেছে ?
উপস্থিত সকলেই নিশ্চুপ , এ কাজে কেউ তাদের দেখেনি। তবুও মহিলা নিজেকে ঠিক রাখতে বলল, “ আমি মাইয়ারে ঘর থেকে টাইনা আনবার সময় মাইয়ার বিছানায় রক্ত দেখছি।”
রাইসার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো , নিজের প্রতি ঘৃণা হতে শুরু করেছে তার। ভালো হয়েছে তার আপা নেই , আপা থাকলে নিশ্চয়ই এসব শুনে রাইসা কে ভীষণ খারাপ ভাবতো।‌ রক্তে কথায় মুখ খুললো আরাধ্য ,
-”রক্ত দেখেই আপনি নিশ্চিত তারা পাপাচার করেছে ?
মহিলা বলল, ‘ জুয়ান পোলা মাইয়া রাইতে এক ঘরে আছিলো। তার উপর বিছানায় রক্ত , তাইলে কেন মানমু না তারা কুকাম করছে।”
-“শুধু কি কুকামেই রক্ত পড়ে ? হাত কাটলে কি তাইলে পানি বাহির হয় ?”
মহিলা ভরকালেন , আরাধ্য এবার রেজার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো –
-“রুদ্রনীল’ তুমি রাতের আঁধারে শেখ বাড়িতে কেনো গিয়েছিলে। তবুও এই মেয়ের ঘরে , যথাযথ কোনো কারণ বলতে পারবে?

রেজা মাথা নিচু রেখে বলল , “ দক্ষিণ পাড়ার লোকের আক্রমণ হতে বাঁচাতে আমি ,ইরফাদ এবং আরো দুজন সহকর্মী প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করছিলাম ছোট নবাব। একপর্যায়ে আমি আর ইরফাদ পড়ে গিয়ে আহত হ‌ই। রাতের আঁধারে নিজেদের বাঁচাতে চারজন চারদিকে ভাগ হয়েছি। উপায় না পেয়ে প্রথমে মাতব্বর বাড়ির দরজায় দাড়িয়ে সাহায্য চাইলে , কেউ দরজা খুলেনি। তখনি আমি সাহস্য নিতে শেখ বাড়িতে গিয়েছি। ‌ তবে দুটো ঘরে কে কোথায় ছিলো জানা নেই আমার। এক দরজা ধাক্কাতে রাইসা দরজা খুলেছে। আমি শুধু প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছি। তার যথাযথ প্রমাণ স্বরূপ আমার দেহের ক্ষত
ছোট নবাব।
সকলে মনোযোগ দিয়ে শুনলো , “ আরাধ্য এবার উঠে গিয়ে দাঁড়ালো মহিলার কাছে। অতঃপর বলল –

-“নিজের প্রাণ বাঁচাতে অপর ঘরে আশ্রয় নেওয়া কোনো অপরাধ নয় তাইনা চাচি ?”
মহিলা দমলো না , আরাধ্য কে পাশ কাটিয়ে চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্য বলল , “ সে আশ্রয় নিয়েছে তাহলে, ছেলে-মেয়ে দুজনে গলায় কামড়ের দাগ কেন হুজুর জিজ্ঞাস করেন?”
আরাধ্য সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলো ,“ কামাড়া কামড়ি করেছে তাই হয়েছে? এই প্রশ্নের আবার উত্তর প্রয়োজন নেই।”
এবারের মুখ খুললো মাতব্বর। ভরা মহলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল , “ মাফ করবেন ছোট নবাব , রেজা আপনের সঙ্গী এইডা আমরা হগ্গোলে জানি। তাই তারে না বাঁচাইয়া নিরপেক্ষ বিচার করেন ?”
মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন , “ পোলা মাইয়া নষ্টামি করেছে , এই মাইয়া একটা ব্যাশা। এই ব্যাশা আর তার পরিবার রে আমাগো সমাজে রাখন যাইবো না চেয়ারম্যান সাহেব।”

আরাধ্য কান চুলকাতে চুলকাতে আবারো চেয়ারে গিয়ে বসলো। এবার আরো একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে বলল –
-কথা সত্য চেয়ারম্যান সাহেব , এইসব নোংরামি আমাগো সমাজে রাখা যাইতো না। আইজ এক পোলার লগে শুইছে এই মাইয়া। আবার পরে আরেক পোলার লগে শুইতে কতক্ষন? এদের এক ঘরে করেন চেয়ারম্যান সাহেব। এই কী ক‌ও সবাই? এই নটির লগে এক সমাজে তোমরা থাকবার চাও ?
মূহুর্তেই সকলেই হৈ হৈ করে উঠলো “ শেখ পরিবার কে এক ঘরে করতে আর্জি করছে।
মাতব্বর বলল, “ ইসমাইলের পরিবারের লগে আপনার আত্মীয়তা ব‌ইলা আপনি তাগোরে বাঁচাইতে পারেন না চেয়ারম্যান সাহেব।”
আরাধ্যের ভাবভঙ্গিমা ঠিক বুঝা গেলো না , এবার মহিলা ধৈর্য্য ভাঙ্গলো। মাথার শাড়ির আঁচল ফেলে , কোমড়ের প্যাঁচ মেরে ডাকল –

“ এই চুন কালি নিয়ে আয় কেউ , এই নটিরে চুন কালি দিয়ে, চুল কাটতে হ‌ইবো।”
রেজার রাগে শরীর জ্বলছে , মহিলা হাতে কালি নিয়ে রাইসার দিকে যাচ্ছে। পাশ হতে এক বৃদ্ধা বললেন ,
-“ভালো করে ঘুইষা ঘুইষা কালি লাগাও দেহি, এ কলঙ্কিনীরে। যৌবন জ্বালা এক্কেরে দমাইয়া দেও।”
মহিলা রাইসার কাছে এসে দাড়ালো তবে কালি লাগানোর আগেই রেজা গর্জে উঠলো , “ ওরে কেউ ছুয়েও দেখবেন না‌। কালি লাগানো তো দূর‌।”
রাইসার হৃদযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে গেলো। সে পূর্ণ দৃষ্টিতে রেজা কে দেখছে। পরিবেশ শান্ত হয়েছে কিছুটা , তবে ক‌ই থেকে জানি একটা আওয়াজ আসলো।
-“উঁহু দেখছো কারবার , লাংগের দরদের শেষ নাই। তারপরেও কে ক‌ইবো এরা কুকাম করে নাই , আল্লাহ জানে পেট বাজাইছে কিনা। আগেও মনে হয় গেছে। ছিঃ ছিঃ এই মাইয়ার দায়িত্ব কে ল‌ইবো। নষ্টা , কলঙ্কিনী।
রেজা শুনলো কথাগুলো। তারপর বুক ভরে কয়েকবার নিঃশ্বাস টেনে বলল , -“সে কলঙ্কিত – আমি করেছি , আমি ছুঁয়েছি। আমার জন্য দাগ লেগেছে তাইতো? আমায় দিয়ে দেন তাহলে? আপনাদের তার দায় নিতে হবে না ??”
পুরো এক সমাজ মানুষ আবারো নিশ্চুপ হয়ে যায়। আরাধ্য চেয়ারে বসে পা দুলাচ্ছে। রেজা আবারো আকুতি করে বলে-

-“দেন না ছোট নবাব, এই পাজি মেয়েটারে আমারে দেন।
আমি বিবাহ করবো , তবুও এই সমাজের অসম্মান আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে। আমি তার সব দায়িত্ব নিবো , আমি আর্জি করছি- দেন না।”
রেজা থামলো, আরাধ্য তখনো কথা বলেনা। রেজা আবার বলল-
-“সে নষ্টা নয় ছোট নবাব , সে পবিত্র।
আমার কাছে পবিত্র ! পাজিমেয়ে তুমি পবিত্র ,
আপনি একবার অনুমতি দেন ছোট নবাব।
আমি সমাজের মুখে থুথু ছুঁড়ে তাকে ঘরে তুলবো।”
চেয়ারম্যান আরাধ্যের দিকে তাকিয়ে উত্তরের আশা করলো। তবে আরাধ্য কিছুই বলছে না। এদিকে উত্তেজিত জনতাও উত্তরের অপেক্ষা করছে। চেয়ারম্যান নীরবতা ভাঙলেন ,

– “ ছেলে যখন মেয়েকে বিবাহ করতে রাজি। এখানে , আমি বিরোধের কোনো কারণ দেখছি না। এখন আপনরা বলুন, এ সিদ্ধান্তে আপনাদের আপত্তি আছে কিনা ?”
সকলে ফিসফিস করেছে, এক আপরের সাথে পরামর্শ করতে শুরু করলো। বেশ অনেক্ষণ সময় কাটলো এক‌ই ভাবে। সকলের মাঝেই মাতব্বর চট করে বলে ওঠে ,
-“পোলা মাইয়া যেহেতু পাপে লিপ্ত হয়েছে , আবার বিবাহ করতেও সম্মতি দিয়েছে। তাহলে, আমাদের আর কোনো কিন্তু থাকে না চেয়ারম্যান সাহেব। আমরা ও চাই বিবাহ হোক !”
চেয়ারম্যান স্থির চোখে তাকিয়ে সালিসির প্রতিটি মুখ পর্যবেক্ষণ করে বলল , “ বেশ তবে তাই হোক; ছেলে -মেয়ের বিবাহের আয়োজন হোক। মৌলবি কে কেউ খবর দেন;
একজন ছেলেকে পাঠানো হলো মৌলবি ডাকতে। আরাধ্য উঠে দাড়ালো , রেজা আর রাইসার কাজে গিয়ে দড়ি খুলে দিলো। রাইসার বুকে ওড়না নেই বিশ্রী লাগছিলো দেখতে। আরাধ্য সবার থেকে মেয়েটাকে সরিয়ে নিলো। তারপর বলল;

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৬

-”বিচার শেষ হোক। গ্রামের কয়েকজন মুরব্বি থাকুক বিবাহ মীর বাড়ির অন্দরে হবে , বাকিরা ফিরে যান।
আরাধ্য রাইসা কে নিয়ে চলে গেলো। জহুরা বেগম এসে পা জড়িয়ে নিলো চেয়ারম্যানের। চেয়ারম্যান দ্রুত সহিত উঠে দাঁড়িয়ে বলল –
-“পা ছাড়ো জহুরা , ভুল ছেলে -মেয়ে করেছে তুমি ন‌ও। তাই নিজেকে ছোট করো না।”
বিচার ভাঙ্গলো। রেজার সাথে দুজন ছেলে রাখা হলো। চেয়ারম্যান হেঁটে বাড়ির দিকে চলে গেলেন।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৮