জাহানারা পর্ব ১+২
জান্নাত মুন
আমি জাহানারা, জাহানারা শেখ। মজিদ শেখ আর হালিমা বেগমের বড় মেয়ে।আমাদের শেখ বংশের রীতি অনুযায়ী কখনো অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করা অন্যায়।আমি ছোট থেকেই আমার বাবার আদর্শে বড় হয়েছি।তিনি হাই স্কুলের হেডমাস্টার, তার আদর্শ মেনে কত ছাত্রছাত্রী যে জীবনে সফল হয়েছে তা হিসাবের বাইরে।আজও আমার বাবাকে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা কোথাও দেখলে ব্যাকুল হয়ে উঠে।আজ আমি এমন এক পরিস্থিতি তে আছি জানি না এর ফল কি হবে।আজ আমার সাথে এত বড় অন্যায় হয়েছে আমি কি তা সহ্য করবো, কখনোই না।তাই তো অনিশ্চিত ভবিষ্যত জেনেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এই বাড়িতে আসা।
চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুমে আমি দাড়িয়ে। ওহ্ শুধু আমি না, আমার শ্বশুর বাদে এই বাড়ির প্রতিটি সদস্য উপস্থিত। আমাকে দেখে সকলের মুখের অবস্থা কতটা তিক্ত তা আমি ভালোই বুঝতে পারছি।আমার সাথে পুলিশ না থাকলে হইতো এতক্ষণে গুম করে দিতো। আর যার জন্য এ বাড়িতে আসা সে তো আস্তো একটা শয়তান।এই যে সোফার উপর আয়েশ ভঙ্গিমায় বসে মনযোগ দিয়ে ফোন টিপছে।এখানে যে সব গন্ডগোল তাকে নিয়ে তাতে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
–“মিসেস নাবিলা চৌধুরী আপনার ছেলের অপরাধটা কতটা দণ্ডনীয় তা আপনারা জানেন।আপনারা রাজনৈতিক মানুষ কিন্তু ভুলে যাবেন না আপনাদের উপরেও আছে সাধারণ জনগণ। তারা একবার ক্ষিপ্ত হলে আপনাদের সব ক্ষমতা এখানেই শেষ। আমি আপনার পুত্র বধুকে এখানে রেখে গেলাম আশা করি আপনারা মিসেস ইফান চৌধুরী কে তার প্রাপ্ত সম্মান দিবেন।”
নাবিলা চৌধুরী মানে আমার নতুন শ্বাশুড়ি। তিনি পুলিশ অফিসারের কথায় হালকা হেসে বললেন,
–“অফিসার আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। এখন এই মেয়েটা আমাদের বাড়ির বউ তাকে তার প্রাপ্ত সম্মান অবশ্যই দেওয়া হবে।”
তিনি কথাটা বলে আমার দিকে আড় চোখে তাকালেন।আমি বুঝতে পারলাম এই কথাগুলো খুব কষ্টে উনার মুখ দিয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু আমি তেমন কিছু আর বললাম না। কারণ এটা এখন থেকে আমার সংসার নিজেকে আরো স্ট্রং করতে হবে সবকিছুর জন্য। হয়তো এর চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি আমার জন্য অপেক্ষা করছে। পুলিশ অফিসার আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বললো,
–“মিসেস জাহানারা চৌধুরী, আপনি এখন থেকে সেইফ আছেন। আশা করি আপনাকে আর কোনো হ্যা’রাসমেন্টের শিখার হতে হবে না। মন্ত্রী সাহেব নিশ্চয়ই নিজের কথা রাখবেন। তারপরও যদি আপনাকে অসম্মান করা হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের কে জানাবেন আইন সবসময় আপনার মতো ভুক্তভোগীদের সাথে আছে।
–অবশ্যই অফিসার আপনারা না থাকলে আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের সঠিক বিচার পেতাম না। এখন থেকে আমিই সবকিছু সামলে নেওয়ার চেষ্টা করবো।এই বাড়িতে অনেকেরই পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব। সেটা দেওয়ারও চেষ্টা করবো। তখনও যদি সাইজ না হয়, তাহলে নিশ্চয়ই আপনাদের সাহায্য চাইবো।
আমি কথা শেষ করে আড় চোখে সোফার দিকে তাকালাম। তখনই চোখাচোখি হয় সেই অসভ্য পুরুষের সাথে। তার মানে সে আগে থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার শান্ত মুখশ্রী দেখে মনে হচ্ছে প্রবল ঝড় উঠার পূর্বভাস।আমি তার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে অফিসারের দিকে তাকালাম। তিনি আমার থেকে বিদায় নিয়ে ফোর্স নিয়ে বের হয়ে যান।আমার নতুন লড়াইয়ের সূচনা হলো আজ থেকে।আমি হারতে শিখিনি আর হারবোও না। আমার বিন্দু মাত্র অধিকারও ছাড়বো না।আমার যেসকল হক সব আদায় করে নিব।কারণ আমি জাহানারা, জাহানারা শেখ।
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
বধু সেজে বসে আছে আমার প্রিয় বান্ধবী মুক্তা। আমি দুদিন ধরে তাদের বাসায় আছি। মুক্তার পরিবারের সাথে শেখ পরিবারের খুব ভালো সম্পর্ক। তাই তো আব্বু আমাকে আর আমার ছোট বোন জুইকে গায়ে হলুদ আর বিয়ের দিন থাকার অনুমতি দিয়েছে। আমরা বান্ধবীরা মুক্তার সাথে বসে কথাবার্তা বলছি তখনই পুরো বাড়ি জুড়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়েছে জামাই এসেছে তাই। আমরা সবাই নতুন দুলাভাইয়ের সাথে কিছুক্ষণ হাসিঠাট্টা করলাম। তার কিছুক্ষণ পরই কাজি সাহেব আসলেন। আমরা কয়েকজন বান্ধবী মুক্তাকে নিয়ে রুমে বসে আছি। আর কয়েকজন নতুন জামাইয়ের কাছে। নতুন জামাইকে কাজি কবুল বলতে বললেন। কিন্তু নতুন জামাই সবার থেকে কিছুক্ষণ সময় চাইল। উনার কথা তার এক বন্ধু এখনো বিয়ে বাড়িতে এসে হাজির হয় নি। অতএব বন্ধু না আসা পর্যন্ত নাকি কবুল বলা যাবে না।
বাইরের কি হচ্ছে না হচ্ছে সব খবরই আমরা পাচ্ছিলাম।আধঘন্টা পর খবর পেলাম জামাইয়ের সেই বন্ধু এসেছে। কিন্তু সে নাকি এসেই ঝামেলা শুরু করেছে।এখন নাকি ছেলে বিয়ে করতে চাইছে না।
–“হেই ব্রো, আর মেয়ে পেলি না!!শেষমেশ এই রকম ফ্ল্যাটবাজ মেয়েকেই তোর পছন্দ হলো।এই মেয়ে তো যার তার সাথে শুয়ে পড়ে। একদম ক্যারেক্টারলেস।”
জামাইয়ের স্টেজের কাছে পৌঁছাতেই এই অযাচিত কথা গুলো কানে আসতেই রাগে চিরবিলিয়ে উঠে মস্তিষ্ক। ছেলেটার এহেন উগ্র আচরণে সকলে ক্ষিপ্ত হয়। তারা ছেলেটাকে বুঝাতে চাইলেও ছেলেটা কারো কথা কানে তুলল না। রাগে তখন বাধ্য হয়ে মেয়ে পক্ষের কয়েকজন মিলে ঐ ছেলেটাকে চেপে ধরে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। বরং ছেলেটার বলিষ্ঠ দেহের কাছে তারা ছিল সামান্য কীট। ছেলেটি ওদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বিরবির করে বিরক্তি প্রকাশ করল,
–“ডিজগাস্টিং পাবলিক!”
অতঃপর ব্যঙ্গাত্মক গা জ্বালানো হাসি দিয়ে বলল,
–“লিসেন ফাকিং ব্রাউন পিপলস, আমাকে বিশ্বাস না হলে মুক্তা ডার্লিং কে জিগ্যেস করেন। ওহোহ্ আজ নিশ্চয়ই ওর ঘুম ভাঙতে চায় নি। চাইবেই বা কিভাবে? ফুল নাইট জেগে থাকার পর কি আর সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠা যায়। আসলে কি বলেন তো গতরাতেও সে আমার সাথে,,,,”
ইফান চৌধুরী এইটুকু বলেই থেমে যায়। ঠোঁট কামড়ে শয়তানি হাসতে হাসতে ঘাড়ে হাত বুলাতে থাকে।অতঃপর জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে হাস্কি ভয়েসে বললো,
–“ঐ জন্যই সোনাপাখির ঘুমটা কড়া হয়েছে। বুঝতে পারছেন তো বিষয়টা নাকি? আমার আবার খুলে বলতে একটু ল’জ্জা করছে। তবে আপনারা বললে ল’জ্জার মাথা খেয়ে বলতে রাজি।”
ইফানের কথায় সকলে ক্রোধিত নয়নে তাকালো।ইফান হোহো করে হেসে বললো,
–“আরে ইয়ার বিশ্বাস হচ্ছে না,তাই তো? কোনো ব্যাপার না। আমার কাছে সব প্রুফ আছে।দেখবেন দেখবেন?
উপস্থিত সকলে ল’জ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।ইফান পুনরায় হো হো করে হেসে বললো,
–“আপনারা চাইলে দেখাতে পারি। মোবাইলে সব কিছুর ফুটেজ আছে কিন্তু। বাট শালি একটু বেশিই হট উফফফ।”
–“স্টপ ননসেন্স ইফান। তোর আর প্রমাণ দেখানোর প্রয়োজন নেই। আমি তোকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। সবাই শুনেন এমন মেয়েকে আমি বিয়ে করতে পারবো না, যার চরিত্রে সমস্যা।”
নতুন জামাইয়ের বিয়ে না করার কথা শুনে সবাই শকড। আসেপাশে গুঞ্জন উঠেছে মেয়ে চরিত্রহীন। আমার রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছে। এমন একটা প্রাইভেট বিষয় প্রাইভেটলি সল্ভ করা যেতো না নাকি! তাই বলে নি’র্লজ্জের মতো পুরো বিয়ে বাড়িতে ঢোল পিটাবে।
–“আপনার মতো নি’র্লজ্জ পুরুষ আমি দুটো দেখিনি।আপনি কি বিয়ে করবেন না আমরাই আপনার মতো কাপুরুষের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবো না। আপনার চরিত্র এতো ভালো হলে এমন চরিত্রহীন লোক কিভাবে আপনার বন্ধু হয়। তাহলে তো আপনিও একই ঘাটের মাঝি।”
আধিক রাগান্বিত হয়ে জামাইকে কথাগুলো শুনিয়ে দিই। আমার কথার প্রেক্ষিতে জামাই বাড়ির কেউ কিছু বলতে পারলো না। বিয়ে বাড়ির সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। অনেকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে আমার প্রতিবাদে। মেয়ের বাড়ির কেউ কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলনা যখন, তখন আমার প্রতিবাদ ছিল তাদের আশ্বাস।
–“উফফ ঝাঁঝালো জিনিস মাইরি !!”
ইফান চৌধুরী নামক ঐ অসভ্য পুরুষের নোংরা বাক্যটা কানে আসতেই তড়িৎ গতিতে আমার ডান হাত তার বা গালে পড়ে। কয়েক মূহুর্তের জন্য পুরো বিয়ে বাড়ি স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়ে বাড়ির লোকেদের চোখমুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ইফান গালে হাত ধরে থাকে কিছুক্ষণ। হয়তো বুঝতে সময় লেগেছে কি হয়েছে। যখন বুঝতে পারলো তাকে আমি চর মে’রেছি তখন তার অগ্নি স্ফুটন্ত চোখ দু’টো এমন ভাবে নিক্ষেপ করে যে আমায় ভস্ম করে দেবে। রেগে আমার উপর তেড়ে আসতে নিলে ছেলের বাড়ির লোক আটকে দেয়। তার বন্ধুরা বুঝতে পারছে ইফান আর কিছুক্ষণ এখানে থাকলে কেয়ামত হয়ে যাবে।তাই জোরজবরদস্তি করে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।যেতে যেতে আগুনের ন্যয় জ্বলজ্বল করা চোখদুটো আমার উপর নিক্ষেপ করে একটা বাক্যই ছুড়েছিল,,
“আই সয়ার, এর জন্য তোকে দেখে নিব বী*চ।”
