মন পিঞ্জিরা পর্ব ১০
শ্যামলী রহমান
কালের বিবর্তনে পরিবর্তন হয়েছে অনেককিছু। কেঁটে গেছে কয়েক মাস।বর্ষার টইটম্বুর জল, নদীর উথালপাতাল স্রোত, বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ যেন এখন কেবল স্মৃতির খাতা।শরতের সাদা কাশফুল মাঠে আর দেখা যায় না, শিউলির ঘ্রাণও হারিয়ে গেছে কুয়াশার ভাঁজে।শীতের হিমেল হাওয়া, নিস্তব্ধ সকালের ধোঁয়াটে কুয়াশা কেটে গেছে অনেক আগেই।এখন প্রকৃতি পেয়েছে নতুন সাজ।আগমন ঘটেছে ফাগুন রঙা বসন্তের।মাঠ জুড়ে কৃষ্ণচূড়ার আগুন–লাল রঙ,পথের ধারে কদমের ডালে নতুন কুঁড়ির উঁকি।বকুল ফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে গেছে চারদিক।মৃদুমন্দ বাতাসে কানে বাজে কোকিলের মধুর ডাক,আর আকাশ যেন নীলচে সোনালি রঙে সেজে ওঠে প্রতি ভোরে।
মধ্য রাতে যখন সবাই গভীর ঘুমে। তখন কেউ নির্ঘুম রজনী কাটিয়ে খুচরো অনুভূতির চিঠি লিখছে,
প্রিয় শুকতারা,
তোমায় নিয়ে ভাবতে গেলেই অবাঁধ্য মন উতলা হয়ে যায়।ইচ্ছে করে ছুঁটে যাই,জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ বসে রই।কিন্তু তা অসম্ভবের চেয়েও অসম্ভব।কি আছে তোমার ওই কাজল চোখে?কেন ওই চোখে তাকালেই নিজেকে মাতাল লাগে,নিজের করার ইচ্ছে জাগে?ভোরের শেষে শুকতারার দেখা পেলেও তুমি নামক সুখ পাখিকে দেখতে পাই না।যাকে আমি সুখপাখি,শুকতারা আরো শত নামে ডাকতে ভালোবাসি।ভাবছো শুকতারা কেন ডাকছি?তবে শোনো,আজকের মতোই একদিন নির্ঘুম এক গভীর রাতে হঠাৎ অনুভব করলাম তুমি আমার হৃদয়ের সাথে কিভাবে যেন জড়িয়ে গেছো।চোখ বন্ধ করলেও তোমার মুখাবয়ব ভেঁসে উঠে,রাস্তার পাশে জোড়া চঁড়ুই দেখলেও তোমার সনে ঘর বাঁধার স্বপ্ন আঁকে।গভীর রাতে হুট করে তোমার কথা ভেবে ঘুম ভেঙে যায়।কোনো কিছুতে মনস্থির করতে পারিনা,ঘুমাতে পারিনা।
প্রথমে মানতে চাইনি কিন্তু হৃদয় তো মেনে বসে ছিলো। নিজের হৃদয়ের সাথে বোঝাপড়া করে বুঝলাম হৃদয়ের অনুভূতি কখনো মিথ্যে বলেনা। হুট করে মনে আসলো তোমায় কি বলে ডাকবো? ভেবেও যখন পেলাম না।তখন ভোরের আকাশের দিকে তাকালাম, দেখলাম জ্বলজ্বল করছে শুকতারা।সেই থেকে তোমায় শুকতারা ডাকি,তবে সে নাম সবার আড়ালেই রাখি।তুমি আমার কাছে দূর আকাশের শুকতারার মতো।সুখতারা কেন বললাম ভাবতেই পারো।মানুষ প্রিয়জন কে চাঁদের সাথে তুলনা করে তবে আমি শুকতারার সাথে কেন করছি?কেন জানো?কারণ চাঁদের গায়ে কলঙ্ক থাকে তুমি তো নিষ্কলঙ্ক পবিত্র ফুল।আমার ব্যক্তিগত শুকতারা।যাকে দূর থেকে দেখেও সুখ সুখ অনুভব হয়,আবার যখন দেখিনা তখন আমাবস্যা ছেঁয়ে যায় এ হৃদয়।আমি জানি তোমায় পাওয়ার সাঁধ্য আমার নেই।শুধু দূর থেকে দেখে যবো,একদিন হয়তো হারিয়েও ফেলবো। তার পরেও তুমি আমার জীবনে নির্বাসিত শুকতারা হয়ে থাকবে আজীবন।
ইতি,
শুকতারার আকাশ প্রেমিক।
এতটুকু লিখে প্রহর দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। আজকে বড্ড তার শুকতারার কথা মনে পড়ছে।দেখতে ইচ্ছে করছে।
সেই যে শ্রাবণীর বিয়ে শেষ করে এলাম আর যাওয়া হয়নি।চাইলে যেতেই পারতো কিন্তু যা পাওয়া হবে না,চোখের সামনে দেখে লোভ বাড়ানো উচিত হবে না।সত্তা এমন কথা বললেও মন চাইছে ছুটে যেতে,তাকে এক নজর দেখে আসতে।চোখের তৃষ্ণা যে বড় তৃষ্ণা।
পানির পিপাসায় যেমন গলা শুকিয়ে যায়,চোখের তৃষ্ণায় হৃদয় ছটফটিয়ে বেড়ায়।
অনার্স শেষ হয়েছে এখন মাস্টার্সে ভর্তি হতে হবে।
চাকরির জন্য কয়েক জায়গায় আবেদন করেছে ইন্টারভিউ ও দিয়েছে দেখা যাক কি হয়।চাকরি তো সোঁনার হরিণ।তার ভাগ্যে আবার কয়লা ছাড়া কিছু জোটে না।তার জীবনে অন্ধকার মানায়,আলোর রেখা নয়।তাই তো জীবনে সে অন্ধকার কে সঙ্গী করেছে।আলোর আশা বাদ দিয়ে নিজেকে ব্যর্থ বলে হার মেনেছে।
প্রহর হাতের কলমখানা রাখলো,খাতা বন্ধ করে চেয়ার ছেড়ে সবে উঠতে যাবে।তখন পিছনে চোখ পড়লো। দাঁড়িয়ে আছে তার প্রাণ প্রিয় বন্ধু পাভেল। চোখ নিবন্ধ প্রহরের দিকেই।
“ব্যর্থ প্রেমিকের ন্যায় রাত জেগে কি লিখছিস?
ভালোবাসিস বলার মুরোদ নেই ভালোবাসছিলি কেন?
এমন ভালোবাসা দেখতে আমার গা জ্বলে যায়।
“ভালো তো বাসতে চাইনি,মনের অজান্তে ভালোবেসে ফেলেছি।
একটু থেমে প্রহর আবারো বলে উঠলো,
“ভালোবাসা অনুমতি বিহীন ভাবে আসে,তীব্র অনুভূতি হৃদয়ে জুঁড়ে ভালোবাসা তৈরি করে।
পাভেল এগিয়ে এলো। প্রহর কে টেনে বসলো বিছানায়।নিজেও গিয়ে বসলো তার পাশে।তারা তিনজন মিলে হোস্টেলের একটা রুমে থাকে। আরো একজন আছে সে এখন গভীর ঘুমে।পাভেল প্রহর কে ঘুমাতে ইশারা করলো।প্রহর শুতেই সে বলল,
“পাওয়া না পাওয়া পরের হিসাব,আগে অনুভূতি ব্যক্ত করে দেখ।
হতেও পারে সে তোরে চাইল।
“সে চাইলে হবে?পরিবারের সবাই আছে। তাদের অপছন্দের হতে চাই না।তাদের মতামত দেওয়া আছে অনেক আগেই। সে হিসাবে তাকে কেউ মনের খাঁচায় বন্ধি করতে চায়।আমি মাঝখানে এসে সব শেষ করে দিতে চাই না।
পাভেল অসন্তোষ হলো। কিছুটা কপট রেগে বলল,
“অন্যের কথা ভাবলে ভালেবাসার মানুষ কে কখনোই পাবি না। মানুষ বলে ভালোবাসায় স্বার্থ থাকতে নেই, কিন্তু আমি বলি ভালোবাসায় স্বার্থ থাকতে হয়,সেই ভালোবাসার মানুষটাকে পাওয়ার স্বার্থ।
বুঝিনা তোর এতো কিসের বাধ্য বাধকতা?
পাভেলের কথায় প্রহর হাঁসলো।কাঁথা টেনে নিয়ে চলন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই ও দেখি তার মতো কথা বলছিস।
কেউ সোঁনা রেখে কেন কয়লাকে বেছে নিবে?
কেউ কেনই বা সুপাত্র থাকতে আমার মতো বেকারের হাতে মেয়ে দিবে?
পাভেল নিশ্চুপ থাকলো এবার।এ কথা যথার্থ বটে।
খানিক চুপ থেকে সে গাঢ় সরে বলে উঠলো,
“কেউ পেয়েও হারানোর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে,কেউবা
পাবে না ভেবেই দূরত্ব বাড়ায়।
পাশ থেকে আসিফ আড়মোড়া দিয়ে উঠলো।চোখ খুলে তাদের স্বল্প কথা শুনে জবাব দিলো,
“তুই ভয় পাবি কেন?হিমি তোকে ভীষণ ভালেবাসে।আজ বললে আজই চলে আসবে। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে সবকিছু তুই পাবি।
পাভেল হাঁসলো।প্রহর নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে। তার হাসি অন্ধকারে দৃষ্টি গোচর হলো না।দৃষ্টির আড়ালে কত কিছু থাকে।
সব হাঁসিতে কি আনন্দ থাকে?কিছু হাঁসি বিষাদের ও হতে পারে।
“বেকারদের কপালে বড়লোক বাবার মেয়ে প্রেমিকা হিসাবে জুঁটলেও,জীবনসঙ্গী হিসাবে ভাগ্যে জুটে না।
এতটুকু বলেই পাভেল কাঁথা গায়ে জড়ালো।প্রহর চোখ বন্ধ করেছে। আসিফ তাকিয়ে রইলো।একটু পর সেও চোখ বুজলো।ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।নিশাচর পাখিরা আকাশে উড়ে বেড়াতে লাগলো। নিঃস্তব্ধ রজনী কেটে গেলো র্নিবিশেষে।
মিথি পুকুর পাড়ে বসে আছে। কেন জানি আজ অকারণে মন খারাপ। এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। পরীক্ষার সময় কি যে অসুস্থতায় পড়েছিলো। ঠিক মতো খেতে পারেনি,পড়তে পারেনি। তবুও মোটামুটি পরীক্ষা দিয়েছে। মানিক সাহেব বলেছে সুস্থতা আগে যা হবার হবে চিন্তা না করতে।কারো পায়ের আওয়াজে মিথি পিছনে তাকালো।
শার্লিন আর নবনী এসে পাশে বসলো।নবনী মিথির গোমড়া মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি রে কি হয়েছে?মন খারাপ কেন?
মিথির কানে কথা পৌঁছালো কিনা জানিনা।তার উত্তর না পেয়ে শার্লিন মজার ছলে বলল,
“মিথির না হওয়া স্বামীর দুঃখে মনমরা হয়ে গেছে। বেচারি কে নিতে আসেনা বলে।
মিথি এবার না চাইতেও হাঁসলো।শার্লিন তো এই চেয়েছিলো।নবনী কিছু বলার আগেই মিথি জানতে চাইলো,
“তোমার বিয়ে কবে বলো তো?কতদিন বিয়ে খাইনি।
নবনী দাঁত বাহির করে বলল,
“ওর বিয়ে বাদ তোর বিয়ে খাওয়ার জন্য তৈরি হ। নিজের বিয়ে নিজে খাওয়ার অনুভূতি দেখবি।
মিথি বুঝলো না। চোখ ফিরিয়ে চিন্তা করে জানতে চাইলো,
“মানে?
“মানে সময় হলে বুঝবি।সেই সময় খুব শিগগিরই আসবে।
শার্লিন কপালে ভাঁজ ফেললো। ভাবুক হয়ে খানিক ভাবতেই হয়তো কিছুটা আঁচ করতে পারলো। তার মুখের আদল পরিবর্তন হয়ে এলো। ভালোর মাঝেও খারাপ কিছু হতে চলেছে তবে?
‘ভাগ্য বড় বেঈমান।যার ভালোর অভাব নেই তাকে আরো ভালো ঢেলে দেয়।আর যার দুঃখের শেষ নেই,তাকে আরো দুঃখের সাগরে ডুবিয়ে দেয়।’
সুচরিতা বেগম দুপুরের খাওয়া শেষ করে সবে ঘরে এলো। সোলায়মান দেওয়ান বিছানায় গাঁ এলিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিলো। স্ত্রী কে দেখে চোখ খুললো। বলল,
“পিয়াসের বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবছো?সময় তো হলো এখন কি বিয়েটা দিয়ে দিবো না?
সুচরিতা বেগম স্বামীর পাশে বসে বিছানার চাদর ঠিক করতে করতে উত্তর দিলো,
“আব্বার সাথে কথা বলেন আগে তার পর মানিকের সাথে আলোচনা করো সবাই মিলে।
“পিয়াস কি রাজি হবে?
“হবে না কেন?সে তো আগে থেকে জানে। অমত থাকলে বলতো একদিন মন বুঝেছি চুপ ছিলো। মানে রাজি নিশ্চয়ই?
সোলাইমান আর কথা বললো না। চুপচাপ বিছানা থেকে উঠে পড়লো।আজকে বড় পুকুরের দিকে একটু যেতে হবে।পুকুরের মাছ তুলে বাজারে নিবে সেসব কথা বলতে হবে।
মিথি এখন ফ্রী। পড়াশোনা নেই, স্কুল নেই।
“আপা তোমার এখন ভালো। আমাকে শুধু একা পড়তে হবে।আম্মাকে বলো না আজ পড়বো না।
রিতির এহেন কথা শুনে মিথি বলল,
“না,না তুই পড়তে বস।কয়দিন পর অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা যে।চাচি আম্মা ডাকছে তাড়াতাড়ি যা।পড়া শেষ করে আসবি।
রিতি মন খারাপ করে চলে গেলো। মিথি তার দিকে চেয়ে হাঁসছে আর ভাবছে পড়া চোর এর মতো আর কেউ নেই। পড়ার ভয়ে এই বয়সে বিয়ে করতে চায়, বিয়ে কত মজা লিলি বুবু বলে তাও বুঝেনা সে।
মানিক সাহেব আজ এখনো বাড়ি ফিরেনি। আজ একটু রাত হবে সকালে বলে বেরিয়েছে। মোহনিয়া বেগম রান্না করছিলো।মিথি গিয়ে মায়ের পাশে বসলো।
“আম্মা কি রানছো?
“তোর পছন্দের শুঁটকি মাছ ভুনা আর শীদলের তরকারি।মিথি শুঁকটির নাম শুনলেও খুশি হয় আজ কেন যেন খুশি হলো না।উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত খাবার শীদল অনেক মজা।মিথির চুলোপাড় থেকে উঠে আসলো কিছু ভালো লাগছে না।
রাতে মিথি ওই বাড়ি গেলো।শমসের দেওয়ান ডেকেছে। গান ঘরের দিকে যেতে থেমে গেলো। প্রহরের ঘর থেকে কিছু পড়ার শব্দ আসলো।
সামনে গিয়ে পিছনে ফিরলো। দরজা বন্ধ প্রহর ভাই নেই তবে ঘরে কে? জানার আগ্রহে দরজায় হাত দিলো। দরজা খুলে গেলো তখনি। ভেতরে ঢুকলো কিন্তু কেউ নেই। আশে পাশে চোখ বোলালে দেখতে পেলো একটি বিড়াল মিউ মিউ করছে। তার মানে বিড়ালই কিছু ফেলেছে। এই ঘর তো বন্ধ থাকে তাহলে খুললো কে? না দেরি হচ্ছে যাই।
বলেই পা বাড়ালে গেলে কিছু একটা নজরে পড়লো।টেবিলের পাশে অবহেলায় পড়ে আছে একটা ডাইরি। মিথি হাতে নিলো।উল্টেপাল্টে কিছুই পেলো না। শেষ পৃষ্ঠায় শুধু লেখা,
“আমার গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় তোমাকে পাওয়া হবে না,এই ডাইরির পাতার মতো আমার পুরো জীবন ফাঁকা রবে আজীবন।
“খুব কি ক্ষতি হতো?তুমি যদি আমার গল্পের ভূমিকা এবং উপসংহারেও রয়ে যেতে?”
এতটুকু পড়েই মিথির হৃদয়ে অদ্ভুত অনুভূতি হলো।শব্দ গুলো ছোট তবে অর্থ বড় ভয়াবহ। কার জন্য লেখা সে জানেনা।তবে কেন যেন নিজের মনে হলো শব্দ গুলো।কি একটা নেশা আছে এই শব্দের অর্থের মাঝে।
ডাইরিটা আনমনে রাখলো।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ৮+৯
হঠাৎ কিছু মাথায় আসতেই ডাইরির শেষ পৃষ্ঠা আবার খুললো। হ্যাঁ যা ভেবেছিলো তাই। লেখাগুলো কেমন পরিচিত লাগছে। এমন লেখার চিরকুট তো চুড়ির সাথে ছিলো। এটা প্রায় ভুলে বসেছিলো। সত্যি মিল কিনা তা জানার জন্য ডাইরির শেষ পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে নিলো। কেউ যেন না দেখে তাই ওড়নার আড়ালে লুকালো।
