জাহানারা পর্ব ২৮
জান্নাত মুন
নিত্যদিনের মতো আজও সবার আগে কাকিয়া আর পলি কাজের মেয়ে লতাকে নিয়ে ব্রেকফাস্ট তৈরি করছে।আমি আরও কিছুটা সময় নিয়ে নিচে আসলাম।সোফায় পায়ের উপর পা তুলে দুই বোন নবাবের মতো বসে আছে।পলি তাদের চায়ের ট্রেটা টি-টেবিলে রেখে আবার রান্না ঘরে চলে গেছে। আমি নিচে নামতেই ইতি ডাক দেয় তার পাশে গিয়ে বসতে।নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরীও আমার দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে।আমি ইতিকে আসছি বলে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলাম।আমাকে দেখে কাকিয়া আর পলি জিজ্ঞেস করছে আজ আমি ভার্সিটি যাব কি না।আমি হ্যা বললাম।তারপর পিছন থেকে ইতি ফিসফিস করে বলে,
–ও বড় ভাবি তুমি কখন চলে যাবে?
আমি পিছনে ফিরে ওর তুলতুলে দু গাল টেনে, হেসে বললাম,
–কেন, তোমার কি কিছু লাগবে।আসার সময় নিয়ে আসবো?
ইতি সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বললো,
–আরে না গো ভাবি।আমার কিছু লাগবে না।যদি আরেকটু সময় বাড়িতে থাক, তাহলে একটা ফ্রীতে সিনামা দেখতে পারবে।
আমি ইতির কথা কিছু বুঝলাম না।তবে ওর কথা শুনে কাকিয়ে, পলি চাপা হাসছে।আমিও হাসার চেষ্টা করে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, “কি হয়েছে?” কাকিয়া বললো সোফায় গিয়ে বস আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি।”আমি না করে বললাম,”তুমি আবার কষ্ট করে দিয়ে আসতে যাব কেন।আমি যখন এসেছি,তাহলে আমিই নিয়ে যায়।”পলি আমার হাতে ধরে বলে,” ভাবি প্লিজ যাও না।তোমার জন্য চা নিয়ে যাওয়ার বাহানা ধরে আমিও একটু সিনেমা দেখতে পারবো।”
ওদের তিন জনের কথা আমার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি কিছু আর বলতে পারলাম না। ইতি টেনে সোফায় নিয়ে বসালো।আমি নাবিলা চৌধুরীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,অন্যদিনের তুলনায় আজকে উনার চেহারায় গম্ভীরতা বেশি। উনি চায়ের কাপে আরেকটা ছোট চুমুক দিয়ে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার সাথে কথা বললো।
–আমার ছেলের শরীর কেমন আছে?
এটুকু বলাতেই যেন উনার জিহ্বা খসে পড়ার অবস্থা হয়েছে।আমিও উনার মতো অ্যাটিটিউড ধরে রেখে বেশ সময় করে উত্তর দিলাম,
–হুম আছে।
আমার সংক্ষিপ্ত উত্তরে নাবিলা চৌধুরীর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে যায়।তারপর বেশ কিছু সময় নিয়ে কাটকাট গলায় সুধায়,
–ছেলেটা এখনো ঘুমাচ্ছে?
–জানি না।
এবার চেচিয়ে উঠলো আমার কথায়,
–কি জান তুমি হ্যা কি জান।তোমাকে খাইয়ে দাইয়ে পালা হচ্ছে কেন,নবাবজাদির মতো থাকতে?
এবার আমি আর শান্ত ভাবে কথা বলতে পারলাম না।আমিও একইভাবে বললাম,
–এমন নাটক করছেন যেন আমার শ্বশুর মশাই আপনাকে কামলা বেডির মতো রাখে।আপনাকে তো আজ পর্যন্ত একবার দেখলাম না,বাবাকে এক গ্লাস পানি হাতে তুলে দিতে।আর আমি যতটুকু করছি তা আপনার ছেলে আর আপনার চোদ্দগুষ্টির ভাগ্য। বুঝতে পেরেছেন।
নাবিলা চৌধুরী রাগে চায়ের কাপ ফ্লোরে ছুরে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।আমি উনার রাগকে তোয়াক্কা করলাম না।একই ভাবে শান্ত থেকে আরামসে ধোঁয়া উঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগলাম।
–এবার কিন্তু বেশি বেড়ে যাচ্ছ জাহানারা। বিষয়টা কিন্তু ভালো করছ না,আর,,,,,,,
তক্ষুনি সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। পলি তারাহুরো করে দরজা খোলার জন্য এগিয়ে যেতে লাগলেই পেছন থেকে নাবিলা চৌধুরী ধমকে উঠলেন,
–এই মেয়ে তোমাকে কে বলেছে দরজা খোলার জন্য। চুপচাপ যেখানে দাড়িয়ে আছ সেখানে দাঁড়িয়ে থাক।
আচমকা ধমকে পলির এইটুকু শরীর কেঁপে উঠলো।ভয়ে ভয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ। ইতি চোখের সামনে বাংলা বইটা ধরে, দু চোখ বের করে সদর দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে এসব।এত সকালে কে আসলো?ভাবতেই পলি আমার বাহুতে চিমটি কেটে কি যেন ইশারা করলো।তবে ওর চোখ দেখে মনে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।অন্যদিকে কাকিয়া আর লতা কজের ফাঁকে ফাঁকে সদর দরজায় উঁকি ঝুঁকি মারছে।তখনই আবার কলিং বেল বেজে উঠলো।নাবিলা চৌধুরী শাড়ির আচলটা পেচিয়ে কোমরে গুঁজে নিলো।তারপর হাক ছাড়লো,
–মনিরা আমার বেলানটা নিয়ে আস কুইক।
কাকিয়া হাতের কাজ ঐখানে ফেলেই দৌড়ে রুটি বানানোর বেলানটা নিয়ে আসলো।নাবিলা চৌধুরী হাতে নিয়ে চোখ সরু করে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে কাকিয়ায় উদ্দেশ্য বললো,
–ভালোভাবে সরিষা তেল মেখে রেখেছিলে তো?
–জি ভাবি।
নাবিলা চৌধুরী আর এখানে এক মূহুর্ত দাড়ালেন না।সোজা এগিয়ে গেলেন সদর দরজার দিকে। লিভিং রুমে চেঁচামেচি শুনে নিজের রুম থেকে বেড়িয়ে আসলো দাদি।দাদিকে দেখে পলি এগিয়ে গিয়ে ধরে নিয়ে এসে আমার পাশে বসালো।আমি সেসব লক্ষ করলাম না।বরং দেখছি আমর শাশুড়ী মার পরবর্তী পদক্ষেপ। আবার কলিং বেল বাজলো।নাবিলা চৌধুরী দরজার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে গেলো চুপচাপ।এদিকে উপর থেকে মাহিন, ইরহাম চৌধুরীও তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসলো।দু’জনেরই এখনো ঘুমের রেশ কাটে নি।মনে হয় নাবিলা চৌধুরীর গলা শুনে নিচে নেমে এসেছে। এক মিনিটের মাথায় দরজা হালকা ফাঁক করে ভেতরে উঁকি দেয় ইকবাল চৌধুরী। একবার সকলের মাঝে চোখ ঘুরালেন।সেখানে নাবিলা চৌধুরীর উপস্থিতি না পেয়ে আরেকটু মাথা ভেতরে আনলেন।সকলে একবার নাবিলা চৌধুরী কে আড় চোখে দেখছে তো আরেকবার ইকবাল চৌধুরী কে।ইকবাল চৌধুরী সকলকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন, উনার বউ এখানে আছে কিনা।কিন্তু কেউ কিছু বলার সাহস পেলো না।কারণ চোখ কড়া করে নাবিলা চৌধুরী আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি আর মাহিনই হতবুদ্ধের মতো তাদের কার্যকলাপ দেখছি।এখনো বুঝে উঠতে পারছি না এসব কি হচ্ছে?
ইকবাল চৌধুরী বারবার ইশারা করছেন, এটা জানতে নাবিলা চৌধুরী এখানে আছে কিনা।কেউ কিছু বলছে না।তবে ইরহাম চৌধুরী মাথা চুলকে বুঝাতে চাইচেন,”ভাই আজকে তোমার কপালে দুঃখ আছে।এখান থেকে কেটে পর।”অন্যদিকে দাদি বারবার চশমা ঠিক করে ছেলেকে দরজার কোণায় ইশারা করছেন।ইকবাল চৌধুরী কিছু বুঝতে পারলো না। অবশেষে দশ মিনিটের নাটক আমি শেষ করলাম,
–আরে বাবা আপনি এভাবে দরজায় উঁকি দিচ্ছেন কেন?ভেতরে আসুন,,
আমার কথায় ইকবাল চৌধুরী ভরসা পেল।উনি মনে করেছেন নাবিলা চৌধুরী নেই এখানে।তাই তিনি দরজা ধাক্কা দিয়ে সম্পূর্ণ খুললেন।তারপর পড়নের পাঞ্জাবিটাকে টেনে ঠিক করে একজন খাঁটি নেতাদের মতো হেঁটে দুকদম এগোতেই পেছন থেকে নাবিলা চৌধুরী উনার পশ্চাতে স্বজোরে বেলান বসিয়ে দিলেন।তৎক্ষনাৎ ইকবাল চৌধুরী মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেলেন,কোনো রকম নাড়াচাড়া বিহীন। পলি আর ইতি ভেতর থেকে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ইরহাম চৌধুরী হাত দিয়ে কপাল চাপড়ালেন।দাদি এবার গলা খাঁকারি দিয়ে চশমা ঠিক করে চোখে দিলেন।এদিকে আমি আর মাহিন চরম আশ্চর্য হয়ে গেছি।দু’জনেই হা করে নাবিলা চৌধুরী আর ইকবাল চৌধুরী কে দেখছি।ইকবাল চৌধুরী একজন সুনামধন্য নেতা হয়ে ছোট বড় সকলের সামনে বউয়ের হাতে মার খেয়ে বাকহারা।
–সারারাত কোথায় কাটানো হয়েছে শুনি?
ইকবাল চৌধুরীর দু’হাত উনার পশ্চাতে। বেলান বসানো জায়গাটায় হাত বুলাচ্ছেন।আমাদের সকলকে একবার আড় চোখে দেখে মিনমিনিয়ে বললো,
–পার্টির সাথে গোপন মিটিং ছিল,,,,
আবার বাকি কথা শেষ করার আগে, নাবিলা চৌধুরী উনার পশ্চাতে বেলান বসালেন,
–পার্টির সাথে মিটিং ছিলো হ্যা,সারা রাত মিটিং করেছেন।বেকুব পেয়েছ আমায়?
এরই মাঝে কারো উচ্চ হাসির আওয়াজে সিঁড়ির দিকে সকলে দৃষ্টি রাখলাম।নোহা হাসতে হাসতে সিঁড়ির মাঝে গড়াগড়ি খাচ্ছে।আমি আর হাসি ধরে রাখতে পারলাম না।তাই না চাইতেও উচ্চ স্বরে হেসে দিলাম।আমার হাসি দেখে এতক্ষণ পলি আর ইতির চেপে রাখা হাসিও বেড়িয়ে এসেছে।কাকিয়া কোনো মতে নিজের মুখে আচল ধরে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছেন।কাকাই মাথা চুলকাতে চুলকতে ঠোঁট চেপে ধরেছেন।দাদি এখনো উশখুশ করছেন।মাহিন বুঝতে পারছে না কি করবে।তাই বোকার মতো সকলের দিকে তাকিয়ে আছে।ইতি আর নোহার খিলখিল করা হাসির শব্দ পুরো চৌধুরী মেনশনে দেয়ালে দেয়ালে ঝংকার তুলে দিয়েছে।এরই মাঝে নাবিলা চৌধুরী বাড়ি কাঁপিয়ে চেচিয়ে উঠলো,
–চুওওওওওওওওপ,আর একবার কারো মুখ দিয়ে একটা শব্দ বের হলে খবর করে দিবো।
নিমেষেই সকলে চুপসে যায়।ইকবাল চৌধুরী লজ্জায় আর কোনো দিকে তাকালেন না।এক দৌড় দিলেন নিজের রুমের উদ্দেশ্য। এদিকে নাবিলা চৌধুরী একহাতে বেলান উঁচিয়ে ধরে,আরেক হাতে শাড়ির কুচি ধরে পিছনে ছুটলেন।উনারা লিভিং রুম ত্যাগ করতেই নোহা আর ইতি আবারো খিলখিল করে উচ্চ স্বরে হাসতে আরম্ভ করলো।এবার কাকা মাহিন সহ উপস্থিত সকলেই উচ্চ স্বরে হাসতে আরম্ভ করলো।শুধু ব্যতিক্রম নুলক চৌধুরী।তিনি প্রথম থেকে এক দৃষ্টিতে চায়ের কাপে তাকিয়ে ছিলেন।আসে পাশে যে এত বড় নাটক হয়ে গেলো, তাতে উনার কোনো হুশ আসে নি।কিন্তু ইকবাল চৌধুরী আর নাবিলা চৌধুরী চলে যাওয়ার পরই উনার চেহারায় গম্ভীর্যতা সরে চাপা ক্রোধে রুপ নিলো।আমাদের সকলের হাসির আওয়াজ যেন তা আরও দ্বিগুণ করে তুললো।তিনি আচমকা হাতের চায়ের কাপটা ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দিলেন।কাচ ভাঙার শব্দে আমাদের হাসি বন্ধ হয়ে যায়।আমরা সেদিকে তাকাতে না তাকাতেই নুলক চৌধুরী ওঠে সেখান থেকে চলে যান।আমি বুঝতে পারছি না হঠাৎ উনার রেগে যাওয়ার কারণ।কেননা উনাকে সবসময় গম্ভীর অনুভূতিহীন দেখেছি।তাহলে হঠাৎ এত রেগে যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক বিষয়।
তখনকার এসব নাটক শেষ হওয়ার পর আমি ব্রেকফাস্ট করে নিজের রুমে চলে এসেছি।আজকেই লাস্ট এক্সাম। পর পরই থার্ড ইয়ারে ভর্তি হবো।আমি আজ একটা নীল রঙের শাড়ি পড়েছি।কানে খুব ছোট একজোড়া নীল পাথরের হুপ ইয়ার রিং।মাথার মাঝখানে সিতা তুলে সবগুলো চুল মুটি করে খোপা করে নিয়েছি।ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপ বাম দিয়ে একেবারে পরিপাটি হয়ে নিলাম।তবে দেখতে একদমই সাধারণ লাগছে।আমি আবার এখন আর আগের মতো সাজগোছ করি না,আর না করতে পছন্দ করি।অবশেষে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে থেকে চলে যাব তখনই চোখে পড়ে অপ্রীতিকর বেশকিছু চিহ্নে।আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ফেইস পাউডার দিয়ে জায়গাগুলোকে ঢেকে দিলাম।তখনই আচমকা চোখ পড়ে বেডে ইফানের দিকে।সে উল্টো ভাবে চিত হয়ে শুইয়ে আছে।আর মুগ্ধ নয়নে আমাকে দেখছে।
❝এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন,ধান্দা কী?❞
আমি পিছনে ফিরে, চোখ সরু করে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম।আমার কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হেসে,আমাকে মাথা থেকে পা অব্দি স্কেন করে ইফান।তারপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে হাস্কি টোনে বললো,
❝আমার তো ধান্দা একটাই,সুযোগ পেলেই তোমার পুকুরে সাতার কাঁটা।❞
আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম।তারপর ওর থেকে চোখ সরিয়ে ব্যাগে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ঢুকিয়ে নিলাম।আমার পেছনে ঘারের উম্মুক্ত অংশে ইফান কিছুক্ষণ নেশালো দৃষ্টিতে চোখ বুলিয়ে একটা ঢুক গিললো।তারপর নিঃশব্দে উঠে এসে পেছন থেকে আমার সরু কোমর জড়িয়ে ধরে, উম্মুক্ত কাঁধে ঠোঁট ছোঁয়ালো।পরপরই দাঁত বসিয়ে মাদকীয় পুরুষালী কন্ঠে বললো,
❝আমার করে দেওয়া আদরের চিহ্নগুলো লুকিয়ে লাভ হবে না।যতবার আড়াল করতে চাইবে ততবার করে দিবো।এই চিহ্নগুলোই প্রমাণ করে দেয়, তুমি ঠিক কতটা আমার।❞
তখনই আমার হাতের কাজ থেমে গেছে।আমি কোমর থেকে ওর হাত সরিয়ে দিতে দিতে বললাম,
❝ছাড়ুন আমাকে। আমার লেইট হয়ে যাচ্ছে। ভার্সিটিতে এক্সাম আছে❞
আমার কথা শেষ হতেই কানের লতিতে শব্দ করে আরেকটা চুম্বন এঁকে দিলো।তার সাথে আরেকটু চেপে ধরে কানে হিসহিসিয়ে বললো,
❝গতরাতে ছাড় দিয়েছি আজ রাতে কিন্তু একটুও ছাড় পাবে না।❞
আমি আর কিছু বললাম না। ব্যাগ গুছানো শেষ হতেই যেতে নিলে,ইফান আমার হাত ধরে থামিয়ে দেয়।অতঃপর ওয়ার্ডরোব থেকে কিছু একটা বের করে আমার খোঁপায় গেঁথে দিলো।আমি আশ্চর্য হয়ে খোঁপায় হাত দিতে নিলে,ইফান বাঁধা দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড় করালো।আমার কোমরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি রাখলো।আমি তার দিকে তাকাতেই সে মাদকীয় কন্ঠে বললো,
–এদিকে না সামনে তাকাও,,,,
আমি তাকালাম, সে তখনই কাঁধে শব্দ করে একটা গাঢ় চুমু দিলো__
❝Now looks perfect.❞
আমি খোঁপায় হাত দিয়ে আয়নাতে দেখলাম,খোঁপায় একটা কাঠি ব্যান্ট, তার মাথায় ঝুলন্ত তিনটা নীল রঙের গোলাপ।আমি বিয়ের আগে সব সময় খোঁপায় কাঠি ব্যান্ট গুঁজে রাখতাম।তবে কয়েক বছর ধরে সেই অভ্যাসটাও ত্যাগ করেছি।কিন্তু হঠাৎ ইফান আমার মাথায় কাঠি ব্যান্ট গুঁজে দিলো কেন?আমি অবাক নয়নে আয়নাতে ইফানের দিকে তাকালাম।সাথে সাথে দু’জনের চোখাচোখি হলো।
❝হঠাৎ প্রেমিকের মতো আচরণের কারণ?❞
আমার শান্ত কন্ঠে বাক্যটা ইফানের কাণে পৌঁছাতেই, আগের মতো ঠোঁট বাকিয়ে জিহ্বার আগা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে, আমার কানের কাছে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বললো,
❝ ঝাঁঝওয়ালি ঝাঁঝওয়ালি ঝাঁঝওয়ালি,মুরগী শিকার করে খেতে শিয়াল কে তো একটু আধটু ভং ধরতেই হয়।❞
ইফানের কথা মূহুর্তেই আমার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলো।আমি ধাক্কা মেরে আমার থেকে সরিয়ে দিয়ে,রুমে থেকে বেড়িয়ে যেতে যেতে বললাম,
❝হারামজাদা শয়তান কোথাকার। ❞
বাংলাদেশ CID অফিস কার্যালয়, ঢাকা।অফিসে মনযোগ দিয়ে কম্পিউটারের কিবোর্ডে হাত চালাচ্ছে সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর অফিসার কবির।তার দুপাশে আরও দুজন ইনভেস্টিগেটর অফিসার আবির আর অরনা।তারা তিনজনের দৃষ্টি কম্পিউটার মনিটরে।অপর পাশে ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে ফাইল ঘাটছে আরেকজন ইনভেস্টিগেটর অফিসার কণা তার পাশের ডেস্কে আরেকজন পুরুষ অফিসার কিছু লেখালেখি করছে। তার নাম হিমন।পুরো অফিসে নিরবতা বিরাজ করছে।সকল অফিসার তাদের কাজের মধ্যে ডুবে আছে।তখনই অফিসে প্রবেশ করে ফরেন্সিক অফিসার আব্দুল কালাম।
উনাকে আসতে দেখেই সকলে উঠে দাঁড়ালো।আবদুল কালাম হাতের ফাইলটা অফিসার আবিরের হাতে তুলে দিলো।আবির ফাইল একবার মনযোগ দিয়ে পড়লো।অতঃপর আশ্চর্য হয়ে ফরেন্সিক অফিসারের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।অফিসার কণা আবিরকে জিজ্ঞেস করলো,
–কি হয়েছে স্যার,রিপোর্টে কি আসছে?
আবির আবদুল কালামের দিকে এখনো তাকিয়ে আছে।আবদুল কালাম বেশ বিরক্ত নিয়ে বললো,
–মেয়েটার শরীরে হেবি ড্রা*গস পাওয়া গেছে।ফেন্টা*নাইল নামক হেবি ড্রা*গস।এটা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যায়।তবে বাংলাদেশে পাওয়া খুব একটা সহজ ব্যপার না।ফেন্টা*নাইল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সিন্থেটিক অপিওয়েড, যা মোরফিনের চেয়ে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গুণ শক্তিশালী।
–আর মেডিক্যাল ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা উপশমের জন্য ব্যবহৃত হলেও, অবৈধভাবে ব্যবহার করলে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।যেমনটা মেয়েটার ক্ষেত্রে হয়েছে।
তখনই হাজির হলো ফরেন্সিক এসিস্ট্যান্ট ডক্টর সুমি।আবদুল কালাম সকলকে সুমির থেকে বাকিটা শুনার জন্য বললো।ডক্টর সুমি আবার বলা শুরু করলো,
–মেয়েটাকে অনেকবার রে*প করা হয়েছে। বডিতে ৪২ গ্রামের কাছাকাছি সি*মেন পাওয়া গেছে। একজন পুরুষ কমপক্ষে ২থেকে ৬ গ্রামের মতো সি*মেন দিতে পারে।সেক্ষেত্রে আমরা ধারণা করছি রে*পিস্ট ছয় থেকে সাতজন ছিলো।
–তার মানে রে*প করার কারণে মেয়েটা মারা গেছে?
তখনই অফিসে প্রবেশ করে CID টিম লিডার SP আরমান।বিশাল বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী লোকটা।পড়নের সফেদা শার্টটা দেহের সাথে আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে।ফলে বাহির থেকেই বুঝা যাচ্ছে পেশিবহুল দেহের গঠন।SP আরমান কে দেখা মাত্রই উপস্থিত সকল অফিসার’রা স্যালুট জানালো।SP আরমান চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে হাতে নিয়ে আবদুল কালাম কে জিজ্ঞেস করলো,
–এই কারণেই পপির মৃত্যু হয়েছে?
ডক্টর সুমি নিজের শর্টকাট চুলগুলোকে কানে গুজে দিতে দিতে বললো,
–আগ্গে না স্যার।মেয়েটার আসল মৃত্যুর কারণ ফেন্টা*নাইল ড্রা*গসের ফলে।কালাম স্যার যতটুকু ধারণা করেছেন, মেয়েটাকে হয়তো পরে ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছিল।তখন তাড়াতাড়ি সুস্থ করার জন্য হয়তো ফেন্টানাইল দেওয়া হয়েছিলো।কিন্তু সেটার পরিমাণ অতিরিক্ত হলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটাতে পারে।যেমনটা মেয়েটার ক্ষত্রে হয়েছে।
ডক্টর সুমির কথা শেষ হলে অফিসার আবির বলে,
–স্যার ফেন্টা*নাইল নামক ড্রা*গস এদেশে পাওয়া যায় না যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যায়।আমার যতদূর মনে হচ্ছে ক্রিমিনাল যুক্তরাষ্ট্রের কারো সাথে হাত মিলিয়ে নারী পাচার সহ এসকল ড্রা*গসের বিজনেস করছে।
আবিরের কথা শুনে আরমান কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা ভেবে বললো,
–আমি যাকে সন্দেহ করছি তুমিও কি তাকেই সন্দেহ করছ?
–আপনি কি চৌধুরী বাড়ির কাউকে,,,
আবির কে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে আরমান বললো,
–হতেও পারে।
তারপর আরমনা কোনো দিকে না তাকিয়ে নিজের ডিস্ককের দিকে যেতে যেতে আবির কে বললো,
–কিছুদিন আগে পুলিশ অফিসার রাকিব যে ফাইলটা দিয়েছিল,সেই ফাইলটা নিয়ে আস।
ফরেন্সিক ডক্টর আবদুল কালাম তার এসিস্ট্যান্ট কে নিয়ে আবার ল্যাবে চলে গেছে। আবির আরমানের কেবিনে ডিস্কের সামনে দাড়িয়ে ফাইল গুলো দেখাচ্ছে। এদিকে অফিসার কবির আর হিমন কম্পিউটার মনিটরে কয়েকজন আসামির ডিটেইলস বের করায় ব্যস্ত।কণা মনযোগ দিয়ে ফাইল চেক করছে।তখন কণার কাছে গিয়ে অরনা বললো,
–দেখলে স্যার কে দেখা মাত্রই ডক্টর সুমির ভাবটা।
কণা অরনার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
–আর ইউ জেয়লাস।
কণার কথা শুনে অরনা SP আরমানের কেবিনের দিকে তাকালো।কেবিনটা কাঁচের হওয়ায় বাইরে থেকে দেখা যায় ভেতরে কি হচ্ছে। অরনা সেদিকে তাকিয়ে বললো,
জাহানারা পর্ব ২৭
–আমি জেয়লাস হবো কেন? আমি স্যারকে সবসময় স্যারের নজরে দেখি।আমি তো আর ডক্টর সুমি না যে, হেংলার মতো পাত্তা না পেয়েও পিছনে পড়ে থাকবো।
–তার মানে আরমান স্যার পাত্তা দিলে তুমিও রাজি হয়ে যাবে তাই তো।
পুরুষের কন্ঠ শুনে পিছন দিকে তাকাতেই দেখলো অফিসার হিমন দাঁত বের করে হাসছে।অরনা নাকমুখ কুঁচকে বললো,
–স্যার আপনিও কণার মতো কথা বলছেন,,,
