Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৩৪

জাহানারা পর্ব ৩৪

জাহানারা পর্ব ৩৪
জান্নাত মুন

জায়ান ভাই দেশে আসার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে।মানুষ টা প্রথম প্রথম আমাকে এড়িয়ে চললেও এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। এই যে আমাকে কলেজে ভর্তি করতে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো জিতু ভাইয়ের। কিন্তু ইদানীং তিনি একটা জটিল কেইস নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে আমাকে কলেজে নিয়ে যাওয়ার সময় করে উঠতে পারে নি।তারপর আব্বু নিয়ে যেতে নিলে জায়ান ভাই’য়া বলে, উনি নিয়ে যেতে পারবেন।সেদিন তো খুশিতে পাগল পাগল অবস্থা হয়েছিলো আমার।ঐদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে জায়ান ভাই আমাকে পুচকাসহ অনেক কিছু খাইয়েছে।সাথে অনেকগুলো শপিংও করে দিয়েছে।
কথাগুলো ভাবতেই চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দিচ্ছে। আমি একলা একলা হাসছি দেখে তিন বাদর এক সাথে কেঁশে উঠলো,

–এহেম এহেম এহেম,,
ওদের গলা শুনতেই আমি হুঁশে ফিরি। বর্তমানে আমি কবিতা আপু, জিয়াদ আর জুই রান্নাঘরে আছি।আমি জায়ান ভাইয়ের পছন্দের খাবার পায়েস রান্না করছি।আর ওরা কিচেন কাউন্টারের উপর বসে আমাকে নিয়ে টিটকারি মারছে।জুই গাজরে কামড় দিতে দিতে বললো,
–কালে কালে আর কত কি যে দেখবো।যে মাইয়া আলসেমি করে হাগু করতে যায় না হচু করতে হবে বলে।আজ সেই মাইয়া লাং এর জন্য পায়েস বানাচ্ছে।
জুইয়ের কথা শুনে কবিতা আপু আর জিয়াদ উচ্চ স্বরে হেসে দিলো।আমি চোখ পাকিয়ে জুইয়ের দিকে তাকালাম।পড়নে হাঁটু সমান ফ্রক। মেয়েটার বয়স কত আর ১১ হবে।এই বয়সে যে এত পাকনামি কথা কোথা থেকে শিখলো বুঝতে পারি না।আমি হাতের পায়েস নাড়া দেওয়ার চামচ দেখিয়ে বললাম,

–আন্ডা সেরি আরেকটা পাকনা কথা বলে দেখ তোর খবর আছে।
কবিতা আপু আমাকে শান্ত করে। আমি আবার রান্নায় মনযোগ দিলাম।এদিকে পিছন থেকে জিয়াদও গাজর খেতে খেতে বললো,
–যাই কর জাহান আপু আজকে পায়েস দিতে গিয়ে আবার পেদে দিও না। তোমার ইজ্জত নাই থাকতে পারে।তোমার সঙ্গী হিসেবে আমাদের একটা প্রেস্টিজ আছে।
জিয়াদের কথা শুনে আবারও খেপে গেলাম।তেরে আসতে নিলেই কবিতা আপু ধরে আটকে নিলো।আমি সেভাবেই চামুচ দেখিয়ে জিয়াদকে বকতে লাগলাম,

–চিগার ঘরে চিগা।আরেকটা বাজে কথা বলে দেখ। পাছা লাল করে দিবো।
তারপর পায়েস নামাতে যাব তখনই হাতের এক আঙ্গুলে ছেঁকা লেগে মূহুর্তেই লাল হয়ে যায়।আমি চেচিয়ে উঠতেই কবিতা আপু তাড়াতাড়ি হাতে পানি ঢালতে শুরু করলো।
–ইসস রে কতটা পুড়ে গেলো।যে কাজ পারিস না ঐ কাজ করতে গেলি কেন?
কবিতা আপু ধমকাতে থাকলো। আমি তার কোনো কথা শুনলাম না।কারণ এখন রাত বারোটা বাজে।বাড়ির সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেলেই আমরা রান্নাঘর দখল করেছি।এখন তাড়াতাড়ি কাজ শেষ না করলে হয়তো গিয়ে দেখবো জায়ান ভাইও ঘুমিয়ে পড়েছে।তখন আবার আমার সব পরিশ্রম বৃথা যাবে। আমি দ্রুত পায়েস টা একটা বাটিতে তুলে যাওয়া ধরলাম।তখনই পেছন থেকে কবিতা আপু আর জিয়াদ ডেকে উঠলো।জিয়াদ বললো,

–জাহান আপু সবটা বাটিতে করে নিয়ে যাচ্ছ কেন।আমাদের জন্যও একটু রেখে যাও।
কবিতা আপু বললো,
–আরে বোইন একবার টেস্ট করে তো দেখে নে খেতে কেমন হইসে।রান্নার সময় তো একবারও চেকে দেখলি না।
আমি ওদের তিন জনকে মুখ মুছরা দেখিয়ে যেতে যেতে বললাম,

–এটা শুধু জায়ান ভাইয়ের জন্যই স্পেশাল। উনি ছাড়া কেউ টেস্ট করতে পারবে না।
আমি সিড়ি দিয়ে জায়ান ভাইয়ের রুমের দিকে যাওয়া ধরলাম।এদিকে তারা আমার প্রস্থান দেখে গ্যাসের চুলার উপর বসানো পাতিলটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। পাতিলে এখনো লেগে আছে অনেকটা পায়েস। তিন জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করলো।অতঃপর জিয়াদ বুক ফুলিয়ে এক আঙ্গুল দিয়ে পাতিলের গায়ে লেগে থাকা পায়েস তুলে নিলো।তারপর সকলের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে আঙ্গুল টা মুখে ঢুকাতেই তৎক্ষনাৎ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে পড়লো।কবিতা আপু আর জুই জিয়াদের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।কিছুক্ষণ চলে গেলেও জিয়াদ না মুখ নাড়াচ্ছে আর না মুখ থেকে আঙ্গুলটা বের করছে।কবিতা আপু চোখ সরু করে জিগ্যেস করলো,

–কিরে মজা হয়েছে?
অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসলো না।বরং জিয়াদের হেঁচকি উঠা শুরু হয়েছে।জুই বিরক্ত হয়ে টান মেরে জিয়াদের আঙ্গুল টা বের করে নিলো।তৎক্ষনাৎ জিয়াদ ওয়াক ওয়াক করে বেসিনে বমি করে দিলো।কিছুক্ষণ পর চোখমুখ ধুয়ে পিছনে তাকাতেই দেখলো কবিতা আপু আর জুই ওর দিকে তাকিয়ে নখ কামড়াচ্ছে।জিয়াদ বাচ্চাদের মতো সরল চেহারা করে, চিকেন থেকে যেতে যেতে কবিতার সরে বলতে লাগলো,
❝ইহা আমি কি খেয়েছি বৎস
মনে তো হচ্ছে সমুদ্রই তার উৎস,
পায়েস রেঁধেছে জাহানাপু লেরা
নিসন্দেহে জায়ান ভাইয়ের হবেই আজ কলেরা,,,❞

আমি জায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে দাড়িয়ে বুক ফুলিয়ে একটা শ্বাস নিলাম।অতঃপর দরজা হালকা একটু খুলে উঁকি মারলাম।জায়ান ভাই বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে আছে। তার উরুর উপরে লেপটপ।সে খুব মনযোগ দিয়ে সেখানে কিছু একটা করছে।পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেলেও আমি উনার রুমে পা রাখবো কিংবা ডাক দিবো, সেই সাহসটা করে উঠতে পারলাম না।আমার কেঁদে দিতে ইচ্ছে করছে।আমি মন খারাপ করে পায়েসের বাটিতে চোখ রাখলাম ।তখনই গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠ স্বর কানে আসে,

–ভেতরে আয়।আর যদি সারারাত ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে মন চায়, তাহলে দাঁড়িয়ে থাক।
আমি ঝটপট উনার দিকে তাকালাম। লোকটা এখনো লেপটপে মনযোগ দিয়ে কাজ করছে।আমি আস্তে আস্তে রুমে ঢুকে মিনমিন করে বললাম,
–আ আপনি তো একবারও তাকালেন না। তাহলে কিভাবে বুঝলেন আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছি?
উনি কাজে মনযোগ রেখেই গম্ভীর ভাবে উত্তর করলেন,
–তোর উপস্থিতি জানার জন্য আমার তাকিয়ে দেখতে হয় না।আমার হৃৎস্পন্দনই জানান দিয়ে দেয় তোর প্রতিটি পদক্ষেপ।
–কি কিভাবে?
আচমকা লেপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে জহরি চোখে তাকালো।আমি ভয়ে ভয়ে একটা ঢুক গিললাম। উনি কাটকাট গলায় সুধালো,

–এত রাতে আমার রুমে কি চাই?
ইসস কি সাংঘাতিক লোক ভাবা যায়?আমি নিজে থেকে উনার কাছে আসলেই দোষ। এই যে গতকাল আমি উনার রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন পিছন থেকে উনি ডেকে উঠেন,
–জারা,,,,,
আমি উনার কন্ঠ শুনেই কেঁপে উঠলাম।লাজুক চেহারা নিয়ে পিছনে ফিরতেই দেখি উনি ফর্মাল ড্রেসআপে দাঁড়িয়ে। ইসস কি যে হ্যান্ডসাম লাগছিলো।আমি তো সকল হুশ হারিয়ে বেহায়ার মতো উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ডেবডেব করে।আমার এমন কাজে উনি বিরক্তিতে চোখ সরু করে আমাকে ক্রস করে চলে যেতে যেতে বিরবির করলো,
–স্টুপিট,,,,
উনাকে চলে যেতে দেখেই হুশ ফিরে আমি তাড়াতাড়ি পিছন থেকে ডেকে উঠলাম,
–কি কিছু বলছিলেন আপনি,,,,
আমার কন্ঠ শুনে উনি একটু থামলেন। তারপর হালকা ঘার বাকিয়ে আমাকে দেখে যেতে যেতে বললেন,
–নাথিং।

–কি হলো কিছু জিগ্যেস করছি?
উনার কন্ঠ শুনে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলাম।অতঃপর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আস্তে আস্তে চোখ হাতের বাটিটার দিকে রাখলাম।উনি আমার দৃষ্টি অনুযায়ী হাতের দিকে তাকালেন।মূহুর্তেই উনার চোখে পড়ে যায় পুড়ে যাওয়া আঙ্গুল টায়।উনি তৎক্ষনাৎ বিছানা থেকে নেমে আমার হাতটা উনার চোখের সামনে ধরলেন।আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই জায়ান ভাই আমার আঙ্গুলে ফু দিতে দিতে উতলা হয়ে বলতে লাগলো,
–ইসসস কতটা পুড়ে গেছে। তর খুব কষ্ট হচ্ছে জারা।খুব কষ্ট হচ্ছে। দাঁড়া আমি ডক্টর কে কল করছি।
তিনি ফোন হাতে নিতেই আমি অবাক সরে বললাম,

–জায়ান ভাই আমি ঠিক আছি।ডাক্তার লাগবে না তো।
উনি চোখ কড়া করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
–বেশি বুঝিস হ্যা। খুব বড় হয়ে গেছিস।হাতটা পুড়লো কিভাবে?
–ঐ আরকি গরম পাতিলে ছেঁকা লেগেছে একটু।
আমার কথা শুনে জায়ান ভাই আরও রেগে গেলেন,
–কে বলেছিলো তোকে রান্না ঘরে যেতে?
উনি চেচিয়ে সকলকে ডাকতে নিলে আমি থামিয়ে বললাম,
–কেউ বলেনি তো।আমি আপনার জন্য পায়েস বানাতে গিয়ে,,,,,
বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই থামিয়ে দিলো,
–আমি বলেছিলাম তোকে বানাতে।তাহলে কেন বানাতে গেলি,,,,
–আপনি পছন্দ করেন তাই ভেবেছিলাম,,,,
আবার মাঝ পথে থামিয়ে বললো,

–আর কখনো এমন করিস না জারাপাখি।তোর ফুলের শরীরে একটু টোকা লাগলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।কেন এভাবে জ্বালাতন করে পোড়াস আমায়?
আমি চরম আশ্চর্য হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি।উনি মনযোগ দিয়ে আমার হাতে আবার ফু দিচ্ছেন। আমি উনার মায়াবী চোখে ডুব দেওয়ার আগেই উনার কন্ঠ কানে আসে,
–আর কখনো আমার অবাধ্য হবি না। মনে থাকবে?
–হু,,,
আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে উনি শান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন।আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছি।উনি আমার হাত থেকে আচমকা পায়েসের বাটিটা নিয়ে নিলেন।আমি আবার উনার দিকে তাকালাম।উনি আমার ডানায় ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো।তারপর পুড়া জায়গায় যত্ন করে মলম লাগিয়ে দেয়।অতঃপর বললো,
–খাইয়ে দে,,,
আমার চোখ কুঠর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। আমি সেই তখন থেকে একটার পর একটা ঝটকা খেয়ে যাচ্ছি।জায়ান ভাই আমার অবাক হওয়া দৃষ্টি দেখে ব্রু কুঁচকালেন।আমি চোখ নিচু করে মিনমিন করে বললাম,

–আ আমি?
–এখানে তুই ছাড়া আর কেউ আছে কি?
আমি লাজুক হাসলাম।অতঃপর চামুচে করে উনাকে পায়েস খাইয়ে দিতে থাকলাম।খাওয়া শেষ হলে আমি খুশি খুশি চেহারা নিয়ে বললাম,
–পায়েস কেমন লেগেছে?
উনি টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে বললেন,
–ভলো,,,

ব্যাস আমার খুশি আর ধরে রাখে কে।আমি লাজুক হেসে এক দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম।তারপর আসেপাশে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিলাম কেউ আছে কিনা।কেউ নেই নিশ্চিত হতেই জায়ান ভাইয়ের খাওয়া চামুচ টা মুখে পুরে নিলাম।মুহুর্তেই সমস্ত মুখ বিষাদে ছেয়ে গেলো।তার মানে আমি চিনি ভেবে নুন দিয়ে রান্না করেছি।আর সেই এক বাটি কুখাদ্য জায়ান ভাই চুপচাপ খেয়ে নিয়েছে।ভেবেই চোখ ভিজে উঠেছে। গলায় কান্না আটকে আসছে।নিজের গালে নিজেই চর মারতে ইচ্ছে করছে।আমি আবার জায়ান ভাইয়ের রুমের দিকে যেতে লাগলাম।উনাকে জিজ্ঞেস করবো এত বাজে খাবার কেন খেলেন।একাবার আমায় কেন বললেন না এটা খেতে বাজে হয়েছে। এখন যদি উনার শরীর খারাপ হয় আমার জন্য তখন?আমি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কাঁদতে কাঁদতে উনার ঘরে ঢুকতেই দেখি উনি ফোনে কারো সাথে কথা বলছে।

–ডু ইউ থিংক আমি তাকে ভয় পায়?আসতে দাও ওকে।আমিও দেখি আমার কি করে,,,,
আরও কিছু হয় তো বলতে যাবে তখনই কারো ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজে তৎক্ষনাৎ পিছনে তাকায়।উনি ফোন রেখে আমার গালে হাত দিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলে,
–কি হয়েছে তোর, কাঁদছিস কেন?
উনার আশকারা পেয়ে আরও হেঁচকি তুলতে তুলতে বললাম,
–আপনি এত পচা খাবার কেন খেয়ে নিলেন।কেন বললেন না,এটা খেতে জঘন্য হয়েছে?
আমার কথাশুনে উনার উত্তেজিত হওয়া চেহারা শীতল হয়ে গেলো।উনি আমার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললেন,

–কে বললো বাজে হয়েছে।আমার কাছে তো পৃথিবীর বেস্ট রান্না ছিলো।তোর হাতের তৈরি করা পায়েসটুকু খাওয়ার পর যেন দশ বছরের খুদা নিবারণ হলো।
উনার আদুরে কথা শুনে কান্না থেমে গেলো।আমি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম আমার স্বপ্নের পুরুষটাকে।উনাকে নিয়ে মনের গহীন থেকে বারবার উঁকি দিচ্ছে গানের দুটো লাইন,
___MAIN HOSH USKAA
WO BEKHUDI HAIN MERI
MAIN ISHQ USKAA
WO AASHIQI HAIN MERI –
WO LADKA NEHI
ZINDAGI HAIN MERI____❤️‍🔥🌹

সকাল ছয়টা পঞ্চাশ বাজে।আমি আমার বান্ধবী তন্নি,সুমাইয়া, নাফিয়া আর আমাদের ছেলে বেস্ট ফ্রেন্ড আরিফ এক সাথে দাঁড়িয়ে আছি এক কোণায়। এখানে আমাদের আরও অনেক সহপাঠী দাঁড়িয়ে আছে।কদিন হলো আমরা ইন্টারের ইংরেজি প্রাইভেট শুরু করেছি।মূলত সাতটার সময় আমাদের প্রাইভেট শুরু হবে।স্যার উনার বাসাতেই প্রাইভেট পড়ান আমাদের। উনার বিল্ডিং ঘরের সাথে ছোট্ট একটা টিনের ঘর। আমারা সেখানেই বসে পড়ি।কিছুক্ষণের মধ্যেই গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বাসা থেকে বেড়িয়ে আসে আমাদের ইংরেজি স্যার খায়রুল ইসলাম।তিনি হাসতে হাসতে বললো,

–তোমরা চলে আসছ?এই নাও চাবি। দরজা খুলে ভিতরে গিয়ে বস।আমি এক্ষুনি আসছি।
উনি আরিফের হাতে চাবি দিয়ে অন্দরমহলে চলে যান।আরিফ তালা খুলছে তখনই আমি ওকে প্রশ্ন করলাম,
–কিরে ভাই স্যার প্রত্যেকদিন সকালে গোসল করে কেন?
আরিফ দরজা খোলা বাদ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে বললো,
–বুঝ না মামা, রাইতে ফ্যাক্টরিতে কাম করে যে।
আরিফের কথা শুনে অনেকে হু হা করে হাসিতে ফেটে পড়লো।আমি সহ আরও কয়েকজন কথার আগামাথা মন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না।
তারপর এক ঘন্টা প্রাইভেট পড়ে সকলে আড্ডা দিতে দিতে আইসিটি প্রাইভেটের উদ্দেশ্য রওনা হোলাম।খায়রুল স্যারের বাসা থেকে ছয়টা বাসা পেড়লেই রতন স্যারের বাসা।তবে এই জায়গাটা গলি হওয়ায় প্যাঁচ মচড়া দিয়ে যেতে হয়।যাওয়ার পথে নজরে আসলো একটি হিন্দু বাসা থেকে গলির খালি চিপার বাউন্ডারি দিয়ে ঝুলে পড়া ডালে তিনটা বড় বড় জবা ফুল দেখা যাচ্ছে।ফুলগুলো এখনো কারো নজরে পড়ে নি।না হলে আমার বান্ধবীরা যা ছুঁচি দেখলেই সবগুলো হামলে পড়বে। আমি তন্নিকে আমার ব্যাগটা দিয়ে বললাম,

–দোস্ত আমার ব্যাগটা ধর।গিয়ে আমার জন্য জায়গা রাখিস।ঐ দেখ ফুল ফুটছে।দুই টা আমার একটা তর।তুই ওদের সাথে যেতে থাক। আমি নিয়েই চলে আসছি।
তন্নি আমার ব্যাগ নিয়ে ওদের সাথে এগিয়ে গেলো।আমি চোরের মতো আসেপাশে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আছে নাকি।কারণ এই বাসার বুইড়া মহিলাটা একটা হিটলার। কদিন আগে আমার সাথে পড়ে মনিকা আর অনু ফুল ছিঁড়তে গিয়ে ওনার হাতে ধরা পড়ে।আর কি বকাঝকাটায় না করেছে ওদের।
আমি গলিটার চিপাটায় গিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়ালের উপর ঝুলে থাকা ডাল থেকে ফুল ছিঁড়তে হাত বাড়ালাম।যখই আমি ফুলের ডাটাটাকে ছুঁই ছুঁই ঠিক তক্ষুনি কেউ ঝড়ের বেগে এসে ফুলটাকে ছিড়ে আমাকে নিয়ে আরেকটু ভেতরে ঢুকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরলো।আচমকা ঘটনায় আমি হতবুদ্ধ হয়ে বাকহারা হয়ে পড়েছি।সম্পূর্ণ দেহ কালো তে মোড়ানো। লোকটা আমাকে শেওলা পড়া দেয়ালটার সাথে শক্ত করে চেপে ধরে আছে।আমি চোখ তুলে তাকাতেই লোকটার সাথে চোখাচোখি হয়।চোখগুলো কেমন লালছে বর্ণের হয়ে আছে।কেউ অধিক পরিমাণে রেগে থাকলে এমনটা হয়।চোখের মণি দুটো একেবারো কালো নয়, কিছুটা ঘোলাটে।

লোকটার মুখে কালো মাস্ক পড়া।লম্বা ঘন চুলগুলো কপালে চোখে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।আমি ভয়ে চিৎকার দিতে যাবো তখনই লোকটা নিজে দেয়ালের সাথে চেপে আমাকে তার সামনে রেখে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্টে নিলো।হাতের ফুলটা আমার কানে গুজে দিচ্ছে এমন সময়ই গলি দিয়ে দুটো লোক ছুটে গেলো।লোকটা তাদের প্রস্থান দেখে আমাকে ছেড়ে দিতে নিলেই আরও কয়েকজন এদিকে ছুটে আসার শব্দ শুনে আমার কোমর আরও শক্ত করে জরিয়ে ধরে। অতঃপর লোকটা নিজের মুখ আমার ঘারের কাছে নিয়ে আসে।দূর থেকে দেখলে যে কেউ ধরে নিবে নিব্বা নিব্বি অনৈতিক কাজকর্ম করছে।

আমি ভয়ের চোটে মরি মরি অবস্থা। গলা দিয়ে কোনো সর বের হচ্ছে না।তখনই আরও তিনজন লোক এই গলি দিয়ে দৌড়ে আসলো।এদিক ওদিক তাকাতেই নজরে পড়লো আমাদের কে।লোকগুলো মাথা চুলকাতে চুলকাতে অন্যদিকে ছুটে চলে গেলো।লোকগুলো চলে যেতেই আমার কোমরে রাখা লোকটার হাতে জোর কমে আসলো।লোকটা যখন জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে তখনই আমি লোকটাকে ধাক্কা মেরে ছুটতে থাকলাম প্রাণপ্রণে।আমার হঠাৎ এমন কাজে লোকটার চোখ আরও লাল হয়ে উঠলো।মাস্কের আড়ালে ঠোঁট নাড়িয়ে নাড়িয়ে অশ্রাব্য ভাষায় কয়েকটা গা*লিও দিয়ে দিলো আামকে।
এদিকে আমি এমন ভাবে ছুটতে লাগলাম যেন পা থামলেই আমার সব শেষ হয়ে যাবে।লোকটা আমার প্রস্থান হওয়ার পথের দিকে পলকহীন তাকিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার কানে আসলো তখনকার লোকগুলো দৌড়ে আসার শব্দ।তৎক্ষনাৎ লোকটার ধ্যান ভঙ্গ হলো।লোকটা নিজের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত পায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে বিরবির করলো,
–ওহ্হ শীট,,
অতঃপর আর এক মূহুর্ত ব্যায় করলো না।লোকগুলো এখানে আসার আগেই এক লাফ মেরে বাউন্ডারি টপকে ঐপারে চলে যায়।

অন্ধকার রুমে হঠাৎই আমার মুখের উপর ফোনের ফ্ল্যাশ এসে আঁচড়ে পড়তেই নোনাজল সিক্ত চোখ দুটো পিটপিট করে খুললাম।সামনে ফোনের লাইট ধরে দাঁড়িয়ে আছে নোহা।এখানে নোহাকে দেখে ঝটপট চোখ দুটো মুছতে লাগলাম।যাতে নোহার নজরে না পড়ে।তবে আড়াল করতে পারলাম না।নোহা আমার সামনে হাঁটু ভেঙে বসে গাল ফুলিয়ে বললো,
–আর ইউ ক্রায়িং প্রিটি গার্ল?

তখন ইফানের উল্টো পাল্টা কথা শুনার পর আর ঘুম আসে নি।তারপর আস্তে আস্তে দরজা খোলে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা জায়ান ভাইয়ের তালাবদ্ধ রুমে চলে এসেছি।তারপর লাইট জ্বালিয়ে পুরো রুমটাতে একবার চোখ বুলালাম। না এখনো আগের মতোই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গুছানো আছে।কে বলবে এই ঘরে কয়েক বছর ধরে কেউ থাকে না।
এই ঘরের কোনো জিনিসে কেউ কখনো হাত দেয় না আমি ছাড়া।আমি উনার ওয়ার্ডরোব থেকে একটা ফ্যামেলি এলবাম বের করি।সেখানে আমাদের প্রতিটি মূহুর্তের স্মৃতি বাঁধানো।আমি এক এক করে প্রতিটি পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে জায়ান ভাই আর আমার কিছু ছবি দেখে থমকে যায়।সেখানে আমি নীল সাদার কম্বিনেশনে একটি শাড়ি পড়ে আছি।আর জায়ান ভাই সাদা শার্ট পড়ে আছে।আমি যখন উনার হাতের আঙ্গুল ধরে ঘুরপাক খাচ্ছি তখনই মূহুর্তটাকে ক্যামেরাই বন্দি করা হয়।আমি ছবিগুলোকে বুকের সাথে চেপে ধরে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যখন কল্পনার জগতে ডুবে গেছি,তখনই নোহা এসে হাজির।

–কি হলো প্রিটি গার্ল,তুমি কাঁদছ কেন?
আমি ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম,
–তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে তাহলে এখানে কি করে আসলে?
–হ্যা তো ঘুমাচ্চিলাম।কিন্তু বারবার তোমার ফোন বাজতে থাকায় ঘুম ভেঙে গেলো।তারপর ফোন হাতে নিয়ে দেখি চোদ*নবাজ কল করেছে।আমি ফোনটা রিসিভ করতেই ফোনকলের লোকটার কন্ঠ শুনেই বুঝে গেছি,ওহ্হ হোলি এটা তো আমার ইফান বেইবি কল করেছে।
আমি নোহার দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বললাম,

–ও কেন আবার কল করেছিলো?
–বেইবি তো তোমাকে খুব মিস করছে তাই।আর তুমি রুমে নেই শুনে আমাকে অনেক বকাঝকা করেছে হু।তাই তো আমি তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে আসলাম।
আমি নোহার কথাগুলো শুনার পর ওর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।তারপর উঠে দাঁড়ালাম ওয়ার্ডরোবে এলবাম টা আগের জায়গায় রাখার জন্য। তখনই পিছন থেকে নোহার গলা ভেসে আসে,,
–এই মেয়েটা কে প্রিটি গার্ল?
আমি তৎক্ষণাৎ পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি নোহা ফোনের ফ্ল্যাশ ওর হাতের একটা ফটোতে ধরে দেখছে।আমি বড় বড় পা পেলে ওর কাছে এসে টান মেরে ছবিটা নিয়ে নিলাম।অতঃপর ঝটপট আগের স্থানে রেখে লক করে দিলাম।নোহা আবার প্রশ্ন করলো,

জাহানারা পর্ব ৩৩

–কি হলো বল ঐ মেয়েটা কে?
আমি ওকে টেনে নিয়ে রুম থেকে বেরতে বেরতে শক্ত গলায় প্রতিত্তোর করলাম,
–সেটা তোমার না জানলেও চলবে,,,,,,,,,,,

জাহানারা পর্ব ৩৫