জাহানারা পর্ব ৪৬
জান্নাত মুন
আমার উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে দের মাস আগে।পরপরই আমার আর জায়ান ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।তারপর আরও এক মাস হাতে সময় নিয়ে বিয়ের সকল গোছগাছ করা হয়।
দেখতে দেখতে কিভাবে শীতকাল চলে আসলো!!হালকা হালকা ঠান্ডা পড়েছে।তাই সকাল আর রাতে গরম কাপড় পড়তে হয়।তবে দিনের বেলা তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে।আজকের দিনের শুরুটাই হয়েছিলো এক আলাদা অনুভূতি নিয়ে।হ্যা আজ আমার আর আমার প্রাণপ্রিয় জায়ান ভাইয়ের গায়ের হলুদ। আগামীকাল আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা প্রাপ্তির দিন।আমি আজ খুশিতে আত্মহারা।এই অপরিসীম আনন্দময় অনুভূতি আমার হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে।
শেখ বাড়িতে আমাদের বিয়ের বিশাল এক আয়োজন করা হয়েছে।বিয়ে উপলক্ষে পুরো কলোনি লাইটিং করা হয়েছে।আমাদের সকল আত্মীয় স্বজন গতকালই চলে এসেছে।এখন বিকাল চারটা বাজে।সারা বাড়ি ভর্তি মানুষ।প্রতিবেশীরা আম্মু আর বড় আম্মুকে সকল কাজে সাহায্য করছে।মেহমানরা সকলে একসাথে বসে চা নাস্তা করতে করতে আড্ডার আসর জমিয়েছে।জুই তার সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে বাড়ির এক প্রান্তে থেকে আরেক প্রান্তে ছুটছে।আয়নার সামনে বসে আছি আমি।আমার চুলের খোঁপায় ফুলের গাজরা বেঁধে দিচ্ছে কবিতা আপু।কবিতা আপু নিজের কাজ সম্পন্ন করে আমাকে বললো,
–এই তো সাজ কমপ্লিট। এবার আয়নাতে নিজেকে দেখ।
আমি লজ্জা মিশ্রিত চেহারা নিয়ে আয়নার দিকে তাকালাম। মূহুর্তেই নিজের চোখেই মুগ্ধতা ছড়িয়ে গেছে।আমি নিজেকে দেখে নিজেই অবাক।আমাকে এত সুন্দর লাগছে!!আমি নিজেকে আয়নায় দেখে লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে হাসলাম।কবিতা আপুর প্রশংসাও না করলেই নয়।মেয়েটা সব কিছুতেই ভীষণ পারফেক্ট।আমার সাজ দেখে মানুষ আমার সাথে কবিতা আপুরও প্রশংসা করবে।কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে!আমার পাশ থেকে তন্নি হেয়ালি কন্ঠে বলে উঠলো,
–ওও মাই খাট,এটা কে?আমি তো চিনতেই পারছি না!!
সুমাইয়া আর নাফিয়া আমার দু কাঁধে ধরে, আয়নাতে আমাকে দেখতে দেখতে নাফিয়া বললো,
–কে আর হবে হ্যা!এটা তো আমাদের জাহান টুকুটুকি।মাশাআল্লাহ বোইন তোকে তো একদমই পরীর মতো লাগছে।
সকলের প্রশংসা শুনে বেশ লজ্জা লাগছে।আমি লাজুক হাসতে লাগলাম।কবিতা আপুর কোমর জড়িয়ে ধরে বললাম,
–থাংকু থাংকু, এত সুন্দর করে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য।
কবিতা আপু হাসতে হাসতে পাশের টোলটা টেনে আমার সামনে বসে বললো,
–হয়েছে হয়েছে, এত প্রশংসা করতে হবে না।তুই এমনিতেই এক পরী।তোকে না সাজলেও কিউট লাগে।আল্লাহ,তুই আমার ভাবি হয়ে যাচ্ছিস রে জাহান!! এখন থেকে তো তোকে ভাবি বলে ডাকতে হবে।
–ইশশশ যা,,,,
সকলের কথা শুনে লজ্জায় আমার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমাকে দেখে,এটা ওটা বলে সবাই হাসিঠাট্টা আরম্ভ করেছে।এরই মাঝে রুমে দাদি এসে হাজির হলো।তিনি আমার থুতনি ছুঁইয়ে নিজের হাতে শব্দ করে চুমু খেলেন।অতঃপর দাদি কনিষ্ঠা আঙ্গুল দিয়ে নিজের চোখের কাজল আমার কানের পিছনে টিপ দিয়ে বললেন,
–মাশাআল্লাহ। আমার বোইনকে তো আজ হুরপরীর মতো লাগছে।আজ তরে দাদু ভাই দেখলে তো উষ্ঠা খেয়ে পড়বে রে।এত সুন্দরী বউ দেখে তো ভাইয়ের আদর করতে মন চাইবে।
দাদির কথা শুনে সকলে হেসে ফেটে পড়ছে।দাদির এসব কথা শুনে আমার লজ্জা আরও বাড়ছে।দাদি কিছুক্ষণ আমাদের সাথে হাসিঠাট্টা করে চলে যায়।কবিতা আপু সহ বাকিরাও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলো।তখনই রুমে আরিফ হাজির।আরিফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে সেটাতে কিছু একটা করতে করতে বললো,
–কিরে বোইন তাড়াতাড়ি আয়।পড়ে সন্ধ্যা হয়ে গেলে পিক কেমনে তুলবি।
তন্নিরাও আরিফের সাথে হ হ করলো।অতঃপর সকলে আমাকে দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো।কবিতা আপু সহ,আমার সকল বান্ধবী,কাজিনরা আমার মতো হলুদের শাড়ি পড়েছে।আমাদের ফটোশুট হবে বাড়ির পেছনের পুকুর ঘাটে।আমরা হেঁটে সামনে এগোচ্ছি।আর আরিফ ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও ধারণ করছে।আমরা ঘাটের কাছে আসতেই দেখলাম,জায়ান ভাইকে প্রতিবেশী দাদিরা ঘিরে ধরেছে।তারা জায়ান ভাইকে ঘিরে ধরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গীত গাইছে।জায়ান ভাই মুরুব্বিদের এমন কাজে না চাইতেও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসছে।পাশেই জুই সহ জায়ান ভাই আর আমার কাজিনরা ঘাটে বসে মেহেদী পাতা, কাচা হলুদ,সরষে বাঁটছে।জুই আর আমার মামাতো বোনেরা আমার পক্ষ থেকে মেহেদী, হলুদ বাঁটছে।আর জায়ান ভাইয়ের পক্ষ থেকে হলুদ আর মেহেদী বাঁটছে জায়ান ভাইয়ের কাজিনরা।তাদের মুখ ভর্তি পান সুপারি।যাতে মুখ থেকে কোনো কথা বের না হয়।প্রতিবেশী দাদিরা বলেছে,বাঁটার সময় কথা বললে নাকি,নতুন বউও বিয়ের পর বেশি কথা বলে।
আরিফ তার ক্যামেরাটা জুইয়ের দিকে ঘুরালো।দাদি আমার নানু সহ নিজের সইদের সাথে হাসিতে মেতেছিলো।দাদি আমাকে দেখতে পেয়েই জায়ান ভাইকে কৌতুক করে বললো,
–কি দাদু ভাই, আজ বউকে দেখে নিজেকে সামলাতে পারবে তো?
সকলে এটা ওটা বলা শুরু করেছে।বয়স্ক দাদিদের এসব লাগামহীন কথাবার্তা শুনে লজ্জায় এখান থেকে পালাতে ইচ্ছে করছে।জায়ান ভাই হঠাৎ এসব কথার মানে বুঝতে পারছে না। দাদি চোখের ইশারায় আমার দিকে দেখালো।জায়ান ভাই ইশারা অনুযায়ী সেদিকে তাকাতেই দেখলো আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।আমাকে এরকম সাজে দেখে জায়ান ভাই থমকে গেলো।কি বলবে কি করবে সব দিশা হারিয়ে, অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।এতে সকলে আরও আমাদের নিয়ে এটা ওটা বলে হাসছে।জায়ান ভাই আমাকে দেখতে দেখতে একটা শুকনো ঢুক গিললো।মনে হলো ঢুক গিলতে উনার ভীষণ কষ্ট হয়েছে।আরিফ সবটা ভিডিও করে নিচ্ছে।আমি এখনো মাথা উপরে তুলতে পারছি না।পাশ থেকে সুমাইয়া বলে উঠলো,
–বোইন একবার তাকায়া দেখ,দুলাভাই কেমনে ডেবডেব করে তাকিয়ে তোকে দেখছে।
আমি লাজুক চেহারাটা হালকা উপরে তুলে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি এখনো আমার দিকে তাকিয়ে।তাই চোখাচোখি হলো।জায়ান ভাই তক্ষুনি বিরবির করলো,
–মাশাআল্লাহ।
আমি তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিতে যাব তখনই লোকটার দিকে চোখ আটকালো।একটা কালো টাউজারের উপর একটা নেবি কালার টিশার্ট পড়ে আছে।পেশিবহুল দেহে টিশার্টটি আষ্টেপৃষ্টে দেহের সাথে মিশে আছে।ঘামে উনার শ্যামলা গায়ের রং টা আরেকটু গাঢ় দেখাচ্ছে।লোকটার মায়াবী চোখদুটোতে আমার জন্য একরাশ মুগ্ধতা।লোকটাকে যখন আমি ভালোভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি তখনই আরিফের কন্ঠ কানে আসে,
–জাহান সুন্দর করে হেঁটে ভাইয়ার কাছে যা। আমি ভিডিও করছি।
আমি লাজুক হেসে পেন্ডেলের দিকে তন্নিকে দেখিয়ে বললাম,”ঐখান থেকে এক গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। ”
তন্নি এক ছুটে গিয়ে একটা শরবতের গ্লাস নিয়ে এসে আমার হাতে দিলো।কবিতা আপু পাশ থেকে বললো সামনে এগোনোর জন্য।আমার বুকটা কেমন যেন দুরুদুরু করছে।নিজেকে ভীষণ নার্ভাস লাগছে।তবুও জোরে শ্বাস টেনে সুন্দর করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম, দু’হাত ভরা মেহেদী রাঙা হাতে শরবতের গ্লাস নিয়ে।পাড়ার মহিলারা আরও জোর গলায় গীত ধরেছে।আরিফ ভিডিও করছে।আমি ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে জায়ান ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালাম।আমাদের কাজিন আর ফ্রেন্ডরা হো হো হো করে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। জায়ান ভাইয়ের সামনে আমি কাঁপা কাঁপা হাতে শরবতের গ্লাসটা ধরলাম।তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
–আামর জন্য এত সুন্দর করে সেজেছিস!! ভারী মিষ্টি লাগছে তোকে।
জায়ান ভাইয়ের হিসহিসিয়ে বলা কথাগুলো আমার শরীরে শিহরন তুলে দিলো।তলপেটের প্রজাতিগুলো আবারও উড়তে আরম্ভ করলো।জায়ান ভাই আমার লজ্জা পাওয়া দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো।অতঃপর তিনি ঘাটের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলো।আমিও উনার পাশে বসে শরবতের গ্লাসটা এগিয়ে দিলাম।তিনি হাতে নিয়ে এক চুমুকে সবটা খেয়ে নিলো।এতক্ষণ হয়তো এটার ভীষণ দরকার ছিলো উনার। কিন্তু এত কাজের মধ্যে সময় করে উঠতে পারি নি।জায়ান ভাই গ্লাসটা আবার আমার হাতে এগিয়ে দিলো।আমি সেটা নিয়ে বেঞ্চিতে রেখে দিলাম। তারপর আমার শাড়ির আচল দিয়ে উনার ঠোঁট সহ সারা মুখের ঘুম টুকু মুছিয়ে দিতে লাগলাম।সকলে আবার আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টায় মেতে উঠলো।জায়ান ভাই আমার কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বললো,
–তোকে একদমই আমার পাক্কা গৃহিনী লাগছে রে জারা।
আমি লজ্জায় আরও জমে গেলাম।তবুও ভিতর থেকে নিজেকে সামলে দুহাত জায়ান ভাইয়ের সামনে ধরলাম।জায়ান ভাই আমার হাতের দিকে তাকাতেই লক্ষ করলো,আমার হাতে উনার নাম লেখা ইংরেজি অক্ষরে।জায়ান ভাই আমার হাত দুটোতে হাত বুলিয়ে দিলো।উনার চোখেমুখে একরাশ তৃপ্তির হাসির রেখা। সকলে আমাদের কে দেখছে মন ভরে।আরিফ সবটা মূহুর্ত ভিডিও করতে ব্যস্ত।কবিতা আপু দৌড়ে এসে আমার হাতে বাঁটা মেহেদীর বাটিটা দিয়ে বললো,
–আমরা দিলে ভাইয়া পরবে না। তুই পড়িয়ে দে জাহান।
আমি লাজুক চোখে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকাতেই, তিনি চোখের পাপড়ি ফেলে সায় দিলেন।আমি উনার আঙ্গুল গুলোতে গোল গোল করে মেহেদী পড়িয়ে দিলাম।অতঃপর কবিতা আপু কাগজের মেহেদী পাতাটা দিলো জায়ান ভাইয়ের হাতে আমার নাম লিখে দেওয়ার জন্য। আমি জায়ান ভাইয়ের দু’হাতের তালুতে আমার নাম ইংরেজি অক্ষরে জারা লিখে দিলাম।লেখা শেষ হতেই জায়ান ভাই নিজের বুকে ইশারা করে বললো,,
–এখানেও লিখে দে।
আমি অবাক হলাম।তিনি ইশারায় আবার বললো লিখে দিতে।এবার আমার হাত পা কাঁপছে। আমি বুঝতে পারছি না কি করবো।সকলে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো লিখে দিতে।সকলের আনন্দ আর দেখে কে!!আমি কাঁপা কাঁপা হাতে জায়ান ভাইয়ের টিশার্ট টা উপরে তুললাম।অতঃপর বুকের বাম পাশে ইংরেজি গোটাগোটা অক্ষরে আমার নামটা লিখে দিলাম।তারপর টিশার্টের একটা কোণা জায়ান ভাইয়ের মুখে ধরিয়ে দিয়ে, তাড়াতাড়ি উঠে চলে গেলাম অন্যপাশে।দুনিয়ার সকল লাজ আমাকে ঘিরে ধরেছে। এদিকে আমাকে এত লজ্জা পেতে দেখে সকলে আরও হাসিঠাট্টা আরম্ভ করলো।জায়ান ভাইও আমাকে দেখে হাসতে লাগলো।
বাগানে হলুদ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে।প্রথমে বাড়ির ছাঁদে করার সিদ্ধান্ত হলেও ছোট বড় সকলের কথা চিন্তা করে এখানে আয়োজন করা হয়েছে।চারিদিকে লাইটিং করা।যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ভিন্ন ভিন্ন আলোর সমাহার। স্টেজ অনেক সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।আমি সেখানে বসে আছি।আমার সামনে পায়েস,মিষ্টি, ফল দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করে সাজিয়ে রেখেছে।আমার সাথে বড় আব্বু থেকে শুরু করে একে একে সকলে আমার গালে,হাতে,গলায় হলুদ ছুঁইয়ে দিয়ে ছবি তুলছে।সাথে সকলে আমার জন্য দোয়া করে দিচ্ছে। আম্মু আব্বু তো কেঁদেই দিয়েছে, আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করতে গিয়ে। কিছুক্ষণ পর জিতু ভাইয়া জায়ান ভাইকে টেনে নিয়ে আসলো।অতঃপর জায়ান ভাই আর আমি একে অপরকে হলুদ মেখে দিলাম।জায়ান ভাই আমার সাথে কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়।তারপর পাড়ার প্রতিবেশী রা এক এক করে আমার গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে দিতে থাকে।এক বয়স্ক মহিলা আমার হাতে হলুদ ছুঁইয়ে দিতে দিতে মজা করে বললো,
–সুন্দরী,, জামাইকে আঁচলে বেঁধে রাখিস।নাহলে দেখবি অন্য কেউ বেঁধে ফেলবে।
বয়স্ক মহিলার কথা শুনে মূহুর্তেই আমার হাস্যজ্জল চেহারা আঁধারে ছেয়ে গেলো।মহিলাটা চলে যেতেই সিআইডি অফিসাররা একে একে আমাকে হলুদ মেখে দিলো।সিআইডি অফিসার আবির আমাকে হলুদ মাখিয়ে, মজা করে জুইয়ের গালেও হলুদ লাগিয়ে দেয়।জুই রাগে গজগজ করে আবিরের হাতে থাপ্পড় মারলো।অতঃপর আবিরকে বিরবির করে বকতে বকতে অন্যদিকে গিয়ে দাঁড়াল। আবির ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে স্থান ত্যাগ করলো।আবির যতবার আমাদের বাসায় আসে ততবারই জুইয়ের পিছে লাগে।তাই জুই আবিরকে দেখতে পারে না।এদিকে রাকিব ভাইও সবার আড়ালে কবিতা আপুকে হলুদ লাগাতে নিলে, কবিতা আপু হাত ধরে আটকে দেয়।অতঃপর হেসে হেসে হলুদ লাগাতে মানা করে দেয়।
এখানের সব অনুষ্ঠান ফটোশুট শেষ হতে না হতেই আমি উঠে চলে গেলাম পুকুরের ঘাটে।পুকুরের মাঝ বরাবর ডিজাইন করে স্টিক লাইট লাগানো হয়েছে।সেই লাইটের ঝিলমিল আলোতে পুকুরের পানিও সেজে উঠেছে।আমি এখনো বয়স্ক মহিলাটার কথা ভুলতে পারছি না।এলাকার সবাই বলে, এই মহিলার নাকি চোখ লেগে যায়।আমারও বুকের ভেতর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।গলায় কান্না দলা বেঁধে আসছে।সত্যিই যদি মহিলার চোখ আমার জায়ান ভাইয়ের উপর লেগে যায়, তাহলে আমি কি করবো।ভাবতেই চোখ ভিজে আসলো।আমি ঘাটের বেঞ্চিতে বসে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলাম।
আমাকে খুঁজে না পেয়ে কবিতা আপু চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে।আমাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না খবরটা জায়ান ভাই শুনতেই, উনার হৃৎস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লো।মনের গহীনে অযাচিত একটা আশঙ্কা নাড়া দিয়ে উঠলো।জায়ান ভাই বুকে হাত রেখে খুব কষ্ট করে একটা ঢুক গিললো।তখনই একজন বলে উঠলো, আমাকে পুকুর পাড়ে দেখেছে।এটা শুনেই জায়ান ভাই ছুটলো।
আমি নাক টেনে টেনে কাঁদছি।আমার মনটা উতলা হয়ে আছে।আমি নিজেকে চাইলেও শান্ত করতে পারছি না।বুকে কিসের এক ভয় চড়ে বসেছে!জায়ান ভাইকে হারানোর ভয়।হঠাৎ পিছন থেকে জায়ান ভাই আমার হাত টেনে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। মনে হচ্ছে এতক্ষণ দম আটকানো ছিলো।আমাকে কাছে পেয়ে যেন বাঁচার আবার স্বাদ জেগেছে। আমি লোকটার বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দন শুনতে পারছি।শব্দটা এতটাই অনিয়ন্ত্রিত যে জায়ান ভাইয়ের বুকটা উঠানামা করছে।লোকটার দেহের ঘ্রাণ শুঁকেই বুঝতে পেরেছি এটা আমার শখের পুরুষ। কিন্তু লোকটার হঠাৎ কি হলো??আমি জায়ান ভাইয়ের বুকে মাথা রেখেই সেখানে হাত রাখলাম।কিছু বলতে যাব তখনই জায়ান ভাই কাঁপা কাঁপা কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
–কেন এমন ছেলে মানুষী করিস পাখি।আমি তো এখনই মরে যেতে,,,,,
আমি তাড়াতাড়ি জায়ান ভাইয়ের মুখে হাত ধরে উনাকে আর বলতে দিলাম না।আমার জলে টইটম্বুর চোখ দুটো দেখে জায়ান ভাই নিজেকে শান্ত করে নিলো।আমি ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বললাম,
–এভাবে বলবেন না আপনি।আমার খুব কষ্ট লাগে।
জায়ান ভাই বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখ দুটো মুছে দিলো।অতঃপর আমার গাল নিজের দু’হাতের মধ্যে রেখে হিসহিসিয়ে বললো,
–তোকে কষ্ট দিতে চাইনা বলেই তো আমার করে নিচ্ছি।তুই তো আমার জান পাখি,আমার কলিজা, আমার শ্বাসপ্রশ্বাস।
আমি নাক টানতে লাগলাম।জায়ান ভাই আমাকে এভাবে কাঁদতে দেখে বললো,”কি হয়েছে আমার জানপাখির?বল আমাকে,তোকে কেউ কিছু বলেছে?
জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে আমি আরও আহ্লাদি হয়ে উঠলাম।আমি বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে প্রিয় মানুষটার বুকে কপাল ঠেকালাম। অতঃপর একই সুরে বললাম,❝জায়ান ভাই,আপনি’টা আমি কখনো কাউকে দিব না।❞
আমার বাচ্চাদের মতো কথা শুনে জায়ান ভাই মৃদু হাসলো।আমার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে বললো,❝আমার জারা,আমার বোকা পাখি।এই
আমি’টাকে তোকে লিখে দিচ্ছি তো।এবার সামলে
রাখিস,,,❞
আমাদের খুঁজতে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সকলে হাজির হলো পুকুর ঘাটে।আমাকে ঠিক থাকতে দেখে বড়রা নিজেদের কাজে চলে গেলো। কবিতা আপু আমার কাছে ছুটে আসতে নিলে হঠাৎই তার পা থেমে গেলো।এত এত মানুষের ভীড়ে তার চেনা একজন মানুষকে দেখতে পেলো সে।তার ঠোঁট প্রসারিত হলো মূহুর্তের মধ্যে।কবিতা আপু সেদিকে চলে যাবে তার আগেই পিছন থেকে জিয়াদ ডেকে উঠলো,
–আপু সবাইকে নিয়ে ঘাটে বস গিয়ে। এখন আমরা নাচগান করবো।
কবিতা আপু এক মূহুর্তে জন্য জিয়াদের দিকে তাকায়। পরক্ষণে সেই পরিচিত মানুষটার দিকে তাকাতেই দেখলো, মানুষটা উধাও। তবে কবিতা আপু মন খরাপ করলো না।তার ফোনে একটা মেসেজ নোটিফিকেশন আসে।সে ফোনে টাইপিং করতে করতে ঘাটে এসে সবার সাথে বসলো।
জিয়াদ আমার গিটারটা, আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো গান গাইতে।জায়ান ভাইয়ের সামনে জিয়াদের এমন আবদারে, লজ্জায় আমার নাক মুখ লাল হয়ে উঠেছে।জায়ান ভাই না থাকলে কেউ বলার আগেই, গলা ফাটিয়ে গিটারে ভুলভাল সুর তুলে গান ধরতাম।কিন্তু এখন তো আর এটা করা যাবে না।প্রেমিক পুরুষের সামনে নিজের তো একটা প্রেস্টিজ আছে নাকি!আমি জিয়াদকে না করে দিলাম।সকলেই আমাকে জোরাজোরি করতে লাগলো।আমাকে রাজি করাতে না পেরে জায়ান ভাই কে ধরলো।আমি ভেবেছিলাম জায়ান ভাই রাজি হবে না।কিন্তু আমার ভাবনা পাল্টে দিয়ে জায়ান ভাই হাতে গিটার তুলে নিল।অতঃপর আমার হাত ধরে বেঞ্চিতে বসিয়ে সাথে নিজেও বসলো।জায়ান ভাই আমার কোলে গিটার দিয়ে পেছন থেকে আমার সাথে মিশে, আমার হাত ধরে গিটারে সুর তুললো।সবার সামনে এমনটা করায় আমি ভিষণ লজ্জা পেলাম।উপস্থিত ছোট বড় সবাই হইহই করে উঠলো।অবশেষে লাজুক কন্ঠে জায়ান ভাইয়ের সাথে আমিও গাইতে লাগলাম,,,
❝ইয়ে রাতে ইয়ে মৌসাম নাদী কা কিনারা
ইয়ে চাঞ্চাল হাওয়া…………❞
আমাদের গানের তালের সাথে সকলেই দোলতে দোলতে সুর মিলাচ্ছে। জায়ান ভাই পুরোটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।আমিও কিছুক্ষণ পরপর উনার সাথে দৃষ্টি মিলিয়েছি।তবে বেশিক্ষণ সেই মায়াবী চোখের তরে চেয়ে থাকার সাধ্য আমার হয় নি।এত কাছ থেকে লোকটাকে পেয়ে হৃদয়ে উতালপাতাল ঢেউ উঠেছে।নিষিদ্ধ অনুভূতি গুলো বারবার আমাকে জড়িয়ে ধরছে।
আমাদের গান শেষ হতেই সকলে হাততালি দিয়ে প্রশংসায় মেতে উঠলো।তারপর আরও অনেকে গান গাইলো।সবার গান গাওয়া শেষ হলে কবিতা আপু আমাদের কাপল ডান্স করার জন্য বললো।আমি লজ্জায় হা না কিছু বলছি না।মনে মনে চাইছি প্রিয় মানুষটার হাত ধরতে।আমার না বলা কথাগুলো কিভাবে যেন জায়ান ভাই সবসময় বুঝে যায়!!তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত বাড়ালেন। আমি অবাক নয়নে জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকালাম। তিনি ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলেন।এতে আমি মনে ভরসা পেলাম।অতঃপর উনার হাত ধরে দাঁড়ালাম।সকলে খুশিতে হৈচৈ শুরু করেছে।আরিফ আগে থেকেই সবগুলো মূহুর্ত ক্যামেরা বন্দী করছে।আমি জায়ান ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলাম।জায়ান ভাই আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমাকে দেখতে দেখতে গানের তালে আমাকে নিয়ে মৃদু দোলছে।জিয়াদ সাউন্ড বক্সে লাউডলি গান ছেড়েছে,,,,
……সারদি কি রাতো মে
হাম সোয়ে রাহে এক চাদার মে
হাম দোনো তানহা হো না কই ভি রাহে ইস ঘার মে..
জারা জারা ব্যাহেকতা হে
ম্যাহেকতা হে, আজ তো মেরা তান বাদান
মে প্যায়াসি হো মুঝে ভার লে আপনি বাহো মে….❤️🔥
ডান্স করার সময় আমাদের দৃষ্টি একে অপরের দিকে স্থির ছিলো।আমি ভালোবাসার লোকটার চোখের গহীনে ডুবে হাজারো স্বপ্ন দেখে ফেললাম।গান শেষ হওয়ার আগেই বেখেয়ালি ভাবে আমার পা টা মচকে যায়।আমি ব্যথায় আওয়াজ করে উঠলাম।জায়ান ভাই আমাকে নিয়ে উতলা হয়ে উঠলো।কেউ আমার কাছে আসতে আসতেই তিনি আমাকে পাজাকোলে তুলে অন্দরমহলের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলেন। সকলে হা করে আমাদের দিকে তাকিয়ে।আমি লজ্জায় মুচরামুচরি করছি।জায়ান ভাই ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে আমাকে নিয়ে, আমার রুমে চলে আসলো।অতঃপর আমাকে বিছানায় বসিয়ে আমার পা নিজের উরুর উপর তুলে নিলো।আমি উনার এমন কাজে চেঁচিয়ে উঠলাম,
–এটা কি করছেন, ছি ছি!!গুরুজনের উপর পা তুলতে নেই। আমার পাপ লাগবে।
জায়ান ভাই আমার মচকে যাওয়া পা’টা নাড়াচাড়া করতে করতে প্রতিত্তোর করলো,”বিয়ের পর আরও কত জায়গাতেই তো পা তুলবি,,,,,,”
জায়ান ভাইয়ের হঠাৎ এমন লাগামহীন কথ শুনে দুই কানে হাত ধরে চোখমুখ কুচকে ফেললাম।লজ্জায় মরিমরি অবস্থা।জায়ান ভাই আমার পা নাড়াচাড়া করতে করতে ঠোঁট কামড়ে আড় চোখে আমার দিকে তাকালো।আমি আর লজ্জায় চোখ খুললাম না।জায়ান ভাই আমার পা ছেড়ে আমার উপর ঝুঁকে পড়লো। অতঃপর কানের কাছে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–এই একটা রাতই জারা।কাল থেকে সম্পূর্ণ তুইটা আমার হয়ে যাবি।তোকে আমার ঘরে তুলে, এই অবাধ্য হৃদয়টাকে শান্ত করবো।
জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো আমার শরীরে শিহরন জাগিয়ে তুলেছে।আমি কানে রাখা হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।আমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে জায়ান ভাই বেশ মজা পেল।তিনি আবারও আমার কানে একই ভাবে হিসহিসিয়ে বললো,,
❝আমার হওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু কর পাখি,,,,,,❞
জায়ান ভাই নিজের কথা শেষ করেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।আমি তখনও চোখ খিচকে বসে রইলাম।হৃদয়ে প্রনয়নের জোয়ার ভাটা বইছে।যত সময় পার হচ্ছে ততই আমার অপেক্ষার বাঁধ যেন ভেঙে চলেছে।
চাপুলটেপেক পার্ক, মেক্সিকো সিটি।।।
মধ্যে রাত (বাংলাদেশ সময় তখন দিন)।।সবকিছু অন্ধকারে ডুবে আছে।এদিকে ইফান মেক্সিকো এর চাপুলটেপেক পার্ক স্থানে, তার ব্ল্যাক-ভেনম গ্যাং এর ফোর্সদের নিয়ে মিশনে এসেছে।গত এক মাস ধরে সে তার বাহিনী ছাড়া সকলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।সে ইতো মধ্যে আরও কয়েকটি মিশন সাকসেস করেছে।
ইফানের দেহ কালোতে মুড়ানো। মাথায় হুডির ক্যাপ টেনে রেখেছে। মুখে কালো মাস্ক, চোখে কালো চশমা। কেউ দেখে চিনতে পারবে না__এই রাতের আধারে অশরীরীর মতো দানবাকৃতির মানবটা কে!!ইফান তার ব্ল্যাক মার্সিডিজের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে।সে হাতে রিভলবার নিয়ে সেটা চোখের সামনে নেড়েচেড়ে দেখছে।তার কানে ইয়ার প্যাড গুজা।ইফান যেখানে দাঁড়িয়ে তার বেশ খানিকটা দূরে একটা মিউজিয়াম আছে।সেখানেই আজ লুটপাট চালাবে।তার লোকেরা সেখানে গিয়েছে।ভেনম ফোর্সদের সাথে আছে মাহিন।মিউজিয়ামের বাইরে ইনান আরও কিছু ফোর্স। তারা বাইরের দিক সামলাচ্ছে। সবকিছুই তাদের প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে।হঠাৎই একটা গার্ড ইনানের কানাকানি কিছু একটা বললো।মূহুর্তেই ইনানের চোখে আতংক দেখা দিলো।ইনান আর এক মূহুর্ত সময় ব্যয় করলো না।সে বাইক টেনে নিমিষেই ইফানের গাড়ির কাছে এসে থামলো।
ইফান ইনানকে দেখেই ঠোঁট বাকিয়ে মাস্কের আড়ালে ক্রুর হাসলো।তার ধারণা ইনান মিশন সাকসেসফুল হওয়ার কথাই জানাতে এসেছে।ইফান রিভলবার দেখিয়ে ইশারা করে ইনানকে কাছে ডাকতে ডাকতে ভারী কন্ঠে বললো,
–ইন্দুর, কাম হিয়ার মাই বয়।
ইনানও ইফানের মতো সারা দেহ কালো পোশাকে আবৃত করে রেখেছে। ইনান আড়ালে একটা ভয়ার্থক ঢুক গিলে ইফানের কাছে এসে আমতা আমতা করতে লাগলো।এতে ইফানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।ইনান ভয়ে বলে উঠলো,
–ভাই,ভাবিকে আজ জায়ান ভাই বিয়ে করছে।গতকাল তাদের ধুমধাম করে হলুদ অনুষ্ঠান হয়েছে,,,,,
ইনানের বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই ইফান ইনানের চোয়াল বরাবর পাঞ্চ বসালো।ইনান খেয় হারিয়ে গাড়ির ঢিকির উপর পড়লো।ইফান পেছন থেকে ইনানের ঘার ধরে গাড়ির সাথে আরও চেপে ধরলো।ইনান আতংক নিয়ে বলে উঠলো,
–ভাই আমাদের লোক এই মাত্র আমাকে খবর দিয়েছে। তারা নাকি আগে থেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলো।কিন্তু আমরা নেটওয়ার্কের বাইরে থা,,,,,,,
বাকি কথা না শুনে ইফান ইনানের ঘার ধরে মাথা উপরে তুলে আবার গাড়ির সাথে বারি মারলো।ইনান মৃদু চেঁচিয়ে উঠলো। ইফানের সারা শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে।সে সেভাবেই হিসহিসিয়ে ইনানের উদ্দেশ্য অশ্রাব্য গালি ছুড়লো,
–চুত*মা*রানির পোয়া। আমার সাথে মশকরা পেয়েছিস।আমার বউকে আরেক বাইনচো*দ ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে করে নিচ্ছে।আর তোরা আমাকে মাত্র বলছিস।
ইফানের চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে ওর কথাগুলো ইনানের শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ইফান আরেক ধফা ইনানকে গাড়ির সাথে বারি মেরে ছেড়ে , নিজের মাথা চেপে ধরলো।সেভাবেই চাপা হুংকার ছাড়লো,
–নীরব্বেয়া কু*ত্তার বাচ্চা, মাদা*রচো*দ।।তোর লা*শ ফেলে দিব বেইমান, যদি আামর বউকে আমার করে না পাই।আ’ম কামিং,,,,,,,
নিজের কথা শেষ করে আবারো চাপা হুংকার ছুড়লো।ইফান আর সময় নষ্ট না করে গাড়িতে উঠতে লাগলো। পেছন থেকে ইনান ভয়ে ভয়ে বললো,
–ভাই আপনি চলে গেলে আমাদের মিশন,,,,,,
ইফান ফের ইনানকে থামিয়ে দিলো।অতঃপর চোয়াল শক্ত করেই ভারী কন্ঠে উত্তর করলো,
–আমার কোনো মিশন আজ পর্যন্ত ফেল হয়নি।আর আমার অনুপস্থিতিতে তুই আর মাহিনই সব সামলানোর জন্য যথেষ্ট।
ইফান আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না।তার মার্সিডিজ টি পলেকে ইনানের চোখের আড়াল হয়ে গেলো।ইফানের হাতে সময় অনেক কম।মেক্সিকো থেকে বাংলাদেশ আসতে কমপক্ষে বারো-তেরো ঘন্টা লাগবে।ইফানের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। মস্তিষ্ক শুধু একটা কথায় বলছে,
❝আমার বুলবুলিকে চাই।যে কোনো মূল্যে চাই।প্রয়োজন হলে পুরো বাংলাদেশ এখান থেকে বসে জ্বালিয়ে দিবো।তবুও ওর ভাগ আমি কাউকে দিব না।❞
ইফান কানের ইয়ার প্যাড চেপে তার লোককে বললো,”ইমার্জেন্সি বাংলাদেশ ফিরছি। সব রেডি কর।”
ওপাশ থেকে গার্ড বললো,”জি বস, ফ্লাইট রেডি আছে।”
ইফান গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,”হুম, আমি আসছি।”
ইফান কানের ইয়ার প্যাডটা ছুড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিলো।অতঃপর ফুল স্পিডে ড্রাইভিং করতে করতে চোয়াল শক্ত করে বিরবির করলো,
–শালি বেয়াদব।একবার দেশে আসি।তোর বিয়ে করার করকুরানি পিছন দিয়ে ভরে দিব।
নভেম্বরের ২৭ তারিখ,শুক্রবার……||
বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা। আমি বধু সেজে বিছানার মাঝখানে বসে আছি।আজ আমার স্বপ্ন পূরনের দিন।আজ আমার ভালোবাসার মানুষটার জন্য বউ সেজেছি। আমার দেহ মুড়িয়ে আছে লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা দিয়ে।শরীরে ভারী সোনার অলংকার।আমার বিয়ের সকল কিছুই জায়ান ভাই নিজে পছন্দ করে কিনেছে।আমাকে যে দেখছে সেই জায়ান ভাইয়ের পছন্দের প্রসংশা না করে পারেনি।অনেকে বলেছে, “যে এমন পরীর মতো মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পছন্দ করেছে,তার বাকি পছন্দগুলেও তো এমনই হবে।”
সকল মেহমানদের খাওয়ানো শেষ। জায়ান ভাই নিজে স্টেজ ঘুরে ঘুরে সকল অতিথিদের খোঁজ খবর নিয়েছে।বিয়ের জামাই অতিথিদের এভাবে খুঁজ নিতে দেখে, সকলে অনেক মজা করেছে জায়ান ভাইকে নিয়ে। আবার অনেক প্রসংশাও করেছে।
দুপুর গড়িয়ে ঘড়ির কাটা বিকেল চারটা বিশের ঘরে।যে অতিথিগুলো চলে যাওয়ার কথা, তারা খেয়ে আমাকে উপহার দিয়ে চলে গেছে।আর যারা থাকার তারা এখনো আছে।প্রতিবেশী স্বজনরা কাল থেকে এই বাড়িতেই বেশি সময় পার করছে।
জিতু ভাইয়া কাজী সাহেবকে আমার রুমে নিয়ে এলো।এখানে সকল মহিলারা আছে।উনাদের সামনে কাজী দোয়া পড়লো।অতঃপর আমাকে কবুল বলতে বললো।বুকটা কেমন যেন ধুকপুক করছে।অধিক আনন্দে আমি কথা বলা ভুলে গেছি। আমার চোখ দুটো মূহুর্তে জলে টইটম্বুর হয়ে গেলো।জিতু ভাইয়া আমাকে বললো তাড়াতাড়ি কবুল বলতে।ফোনের ওপাশে জায়ান ভাই অপেক্ষা করছে।আমি তবুও কোনো কথা বলতে পারছি না।ফোনের ওপাশ থেকে জায়ান ভাই অস্থির হয়ে আছে।আমাকে কবুল বলতে না শুনে উনার গলা শুকিয়ে আসছে।উপস্থিত কাজী সহ সকলে আমাকে বারবার কবুল বলতে বলছে।আমি বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে, চোখ বন্ধ করে আলহামদুলিল্লাহ বলে, তিনবার কবুল বললাম।পরপরই হুহু করে কেঁদে দিলাম।সকলে আলহামদুলিল্লাহ বলছে,আমার কবুল বলতে শুনে। ফোনের ওপাশ থেকেও জায়ান ভাই সহ সকলে আলহামদুলিল্লাহ বললো।জায়ান ভাই যখন একটু স্বস্তি পেলো তখনই উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট জায়ান ভাইয়ের কানে কানে বললো,
–স্যার আমরা যা জানতে পেরেছি সেটা সিআইডি কে জানিয়ে দেওয়া দরকার। ওরা যদি জানতে পারে আমরা ওদের ওয়েবসাইট হ্যাক করে সকল তথ্য সরিয়ে দিয়েছি,তাহলে আমাদের জন্য মারাত্মক রিস্ক হয়ে যাবে।
শুভ কাজের মধ্যে এমন কথায় জায়ন ভাই চোখ পাকালো।অতঃপর ইশারায় বললো,এখনই আসল সময় নয় সবটা প্রকাশ্যে আনার।
কাজী সাহেব আমার দিক সম্পূর্ণ করে, জায়ান ভাইয়ের কাছে গেলো।সেখানে সকল পুরুষ বসে আছে।কাজী সাহেব দোয়া পাঠ শেষ করে,জায়ান ভাইকে বললো কবুল বলতে।জায়ান ভাইয়ও থমকে গেলো।আজ এত বড় প্রাপ্তি তার সহ্য হবে তো!!জায়ান ভাই মনের মধ্যে হাজারো কথোপকথন করে একটা ঢুক গিললো।অতঃপর কবুল বলতে যাবে তখনই ফোন বেজে উঠলো।মূহুর্তেই পরিবেশটা পাল্টে গেলো।সবাই একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে।জায়ান ভাই সবে কবুলের ক উচ্চারণ করেছিলো।তখনই ফোন বেজে উঠেছে। জিতু ভাইয়া ইশারা করলো তাড়াতাড়ি দেখতে কে কল করেছে। ইম্পর্ট্যান্ট কলও হতে পারে।যেহেতু আইনের লোক।জায়ান ভাইয়া ফোন চোখের সামনে ধরতেই দেখলো আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে।তিনি আর কিছু না ভেবে কল রিসিভ করে কানে ধরলো।অতঃপর ফোনের ওপাশ থেকে কলদাতা কিছু একটা বলতেই,জায়ান ভাইয়ের চোখ প্রসারিত হয়ে গেলো।হঠাৎই তিনি বুকের বা পাশে হাত রেখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
–হোয়াট????এটা কি করে হতে পারে?না না না, এটা কিছুতেই হতে পারে না!!
জিতু ভাইয়া সহ সকলেই জায়ান ভাইয়ের আচরণে অবাক।জিতু ভাইয়া কিছু জিগ্যেস করার আগেই, জায়ান ভাই জিহ্বা দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
–সবাই একটু ওয়াইট কর। আমি এক্ষুনি আসছি।
জায়ান ভাই পাগলের মতো ছুটে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।সকলেই অবাক নয়নে জায়ান ভাইয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে।
জায়ান ভাইয়ের পা থেকে মাঠি যেন সরে গেছে। ঠিক মতো হাঁটতে পারছে না।বারবার খুব কষ্ট করে ঢুক গিলছে।মনে হচ্ছে গলায় বারংবার কান্না আটকে আসছে।উনি কানে ফোনটা ধরে রেখেই বাড়ির ছাঁদের দিকে ছুটছে।বাম হাতটা এখনো বুকের বাম পাশে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে।হয়তো হাতটা সরালেই সেখানে স-যত্নে বন্দি থাকা প্রিয় পাখিটা উড়ে পালাবে।
জায়ান ভাইয়ের পা এসে থামলো বাড়ির ছাঁদে।প্রিয় মানুষটাকে হারানোর ভয়ে বুক বারবার উঠানামা করছে।হৃৎস্পন্দন এতটাই ফাস্ট যে, আশেপাশে থাকলে যে কেউ তার ধুকপুক আওয়াজ শুনতে পাবে।
জাহানারা পর্ব ৪৫
জায়ান ভাই আগের ন্যায় কানে ফোন, বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে চাতক পাখির ন্যায় আসেপাশে কাউকে খুঁজতে লাগলো।হঠাৎই চোখ আটকালো আমাদের বাড়ি থেকে সাতটা বিল্ডিং পড়ে,নতুন একটা দালানের ছাঁদে।বিল্ডিংটায় এখনো প্লাস্টারের কাজ চলছে।সেখানে রেলিং এ এক পা রেখে দু হাতে রিভলবারটা চেপে ধরে, তা জায়ান ভাইয়ের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে আছে ইফান চৌধুরী।
ইফানকে দেখা মাত্রই বুকে ধরে রাখা হাতটা সরিয়ে নিলো জায়ান ভাই। তার চোখ দুটো যেন বিশ্বাস করতে চাইছে না,এটা আসলেই ইফান।জায়ান ভাইকে এভাবে দেখে ইফান ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হাসলো।
