Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৪৫

জাহানারা পর্ব ৪৫

জাহানারা পর্ব ৪৫
জান্নাত মুন

ফ্ল্যাশব্যাক____
শীতকাল চলে এসেছে।ইদানীং সকালে হালকা কুয়াশা পড়ছে।রাতে একটু একটু ঠান্ডা লাগে। কিন্তু সূর্য উদয় হলেই আবারও খুব গরম পড়ছে।বাইরের তাপমাত্রা এতটাই, মনে হচ্ছে যেন গ্রীষ্মকাল।এই গরমের মধ্যেও দুই গৃহকর্তী রান্নাঘরে সকলের জন্য দুপুরের খাবার প্রস্তুত করছে।সারা বাড়িতে এসি থাকায়__এই গরমে আগুনের তাপের কাছে থাকার পরেও রক্ষা পেয়েছ দুজন।

এদিকে ড্রয়িং রুমে বসে আছে দাদি,জুই আর জিয়াদ।আজ স্কুলে যায়নি জিয়াদ।আর ওর দেখাদেখি জুইও যায়নি।তাই দাদির কাছে বসে ভারতের গল্প শুনছে।দাদি একজন ইন্ডিয়ান মেয়ে। ভারতের কাশ্মীর তার মাতৃভূমি।দাদা বিজনেসর কাজে যখন কাশ্মীর যায়,তখন দাদিকে পাহাড়ে বান্ধবীদের সাথে হাসিঠাট্টা করতে দেখে।আর তৎক্ষনাৎ এই সুন্দরী সুরেহা বিবির প্রেমে পড়ে।তখন দাদির বয়স আঠারো পড়েছে সবে।দাদা পরদিনই দাদির বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব দেয়।কিন্তু দাদির পরিবার রাজি হয় নি। কারণ দাদি তার বাবা-মার খুব আদরের সন্তান এবং বড় দুই ভাইয়েরও একমাত্র বোন।কেউই দাদিকে তাদের থেকে দূরে রাখতে চায় না।এই কারণেই দাদাকে রিজেক্ট করা।কিন্তু দাদাও হার মানার পাত্র নয়।তিনিও দাদিকে পটিয়ে কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে বাংলাদেশ চলে আসে।এই নিয়ে বহু বছর দাদির বাপের বাড়ির মানুষ অভিমান করে দাদির সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।কিন্তু তাতে কি আর আদরের কন্যা কে কেউ ভুলতে পারে?সেই কয়েকবছর পর আবারও সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায়।এরপর থেকে প্রতিবছর দাদিকে ভারতে যেতে হয় বেড়াতে।সেখানে গেলে কম হলেও তিনমাস আটকে রাখে।দাদিও সেই সুযোগে নিজের সকল আত্মীয় সজন দের বাড়িতে বেড়ায়।

এই বছরও দাদি বাপের বাড়ি যায় জায়ান ভাই দেশে আসার এক সপ্তাহ আগে।জায়ান ভাইয়ের দেশে আসার সিদ্ধান্তটা হঠাৎ হয়।যদি আগে জানতো জায়ান ভাই আসবে তাহলে যেতো না।আর কি?কাশ্মীর থেকে প্রতিদিন ফোন করে কি আপসোস দাদির__দেশে থাকলে নাতিটাকে দেখতে পারতো।তার তিনমাস পর দেশে আসেন তিনি।তখনও আসতে দিত না দাদিকে__দাদির ভাইরা।কিন্তু আমার নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনে দাদি অসুস্থ হয়ে পড়েন।আমার কাছে আসার জন্য সেই কি যে পাগলামি!! বাধ্য হয়ে দাদিকে আমাকে খুঁজে পাওয়ার পরদিন দেশে দিয়ে যায় বড় দাদু ভাইয়ের ছেলে।তিনি আমাদের সকলকেই দাওয়াত দিয়ে যায়। যাতে উনাদের ওখানে বেড়াতে যাই।কাশ্মীরে শেখ বাড়ির সকলেই বেড়িয়ে এসেছে।শুধু আমারই কখনো যাওয়া হয়নি।এমন কি গত বছর দাদির সাথে কবিতা আপু, জিয়াদ আর ছোট্ট জুইও গিয়েছিল।কিন্তু আমাকে নেয় নি।আমি সেই কি কান্না!! কিন্তু জায়ান ভাইয়ের কথার উপর কেউ কিছু বলতে পারে নি।জায়ান ভাই দেশের বাইরে থাকলেও আমার সব দায়িত্বই তিনি আড়ালে পালন করতো।উনার অনুমতি ছাড়া আমার এক পাও বাসা থেকে বেরোনোর অনুমতি নেই।

বাইরের এই কাট পোড় গরমের মধ্যে আমি কলেজ থেকে বাড়িতে এসেই কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে মারলাম।সাদা কলেজ ড্রেস ঘামে ভিজে একাকার। যদিও গাড়িতে এসি ছিলো।তাতে কি আর রাগের গরম কমে?আমাকে এত রেগে থাকতে দেখে, দাদি নিজের চশমাটা নাকের ডগায় এনে আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো।জুইও কম যায় না!!সেও হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে গোল করে চোখের সামনে ধরে আমাকে দেখতে লাগলো।রাগের মধ্যে এমন ফাইজলামি দেখে আমার রাগ আরও বড়লো।আমি চেচিয়ে উঠলাম,
–বুড়ির ঘরে বুড়ি,আরেকবার এইসব করলো তোকে আবার তোর বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবো।বলে দিলাম হু।
আমার ঝাঁঝালো কন্ঠ শুনে দাদি নিজের চশমা আবার ঠেলে আগের স্থানে বসাতে বসাতে মুখ মুচরালো।আমি তেড়ে গিয়ে বললাম,,

–বুইড়া বয়সে ভঙ্গি চু*দাও আমার সাথে?
আমার কথায় দাদি মুখে হাত ধরে অবাক হওয়ার নাটক করলো।অতঃপর জুইকে আমাকে দেখিয়ে বললো,
–ন*ডির সেরির কথা শুনছস ছোট বোইন?মায়া মায়া গো কি তেজ কি তেজ?
দাদির হেয়ালি কথা শুনে জুই মুখে হাত ধরে হাসছে।দাদি আবার আমাকে বললো,
–শুন চেমরি এত রাগ দেখানো ভালো না।এখনো সময় আছে এই অভ্যাস বাদ দে।নাহলে রাইতে জামাই আদর করতে পারবো না।
–তরে আজকে খায়ালছি বুড়ি,,,,,,,

আমি রেগে দাদির দিকে তেড়ে যেতে নিলে জিয়াদ পেছন থেকে কোমরে পেচিয়ে ধরে আটকায়।এদিকে দাদি আর জুই হাসছে আমাকে রাগতে দেখে।এরই মাঝে কবিতা আপু সদর দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। তার হাতে ফোন।সে খুব মনযোগ দিয়ে ফোনে টাইপিং করছে।ইদানীং কয়েক মাস ধরে আপু ফোনেই বেশি মগ্ন থাকে।কেমন যেন বেখেয়ালিপনাও বেড়েছে।কোনো কাজে মন নেই, হঠাৎ হো হো করে হেসে দেয়।আমরা হাসির কারণ জানতে চাইলে বলে পুরানো কথা মনে করে হাসছে।আর কি আমরাও বোকার মতো হিহিহি করে হাসি, কবিতা আপুর সাথে।
আজ সকাল থেকে ভার্সিটিতেই ছিলো কবিতা আপু। আজকাল একদিনও ভার্সিটি মিস দেয় না।আর আগে ঠেলেও ওকে পাঠাতে পাড়তো না বড় আম্মু।আর আজকাল নিজেই নেচে নেচে চলে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করতেই আমাকে নজরে পড়লো তার।কবিতা আপু ফোনে শেষবার টাইপিং করে ফোনটা এফ্রনের পকেটে রেখে আমার কাছে এগিয়ে আসলো।আমাকে রাগে গজগজ করতে দেখে বললো,

–কি হয়েছে বনু? এভাবে রেগে আছিস কেন?
আমি কবিতা আপুর কথায় ঠোঁট উল্টাম। তারপরই নাক টানতে লাগলাম। কবিতা আপু আমাকে ধরে সোফায় বসালো।অতঃপর আদুরে কন্ঠে জিগ্যেস করলো,
–কি হয়েছে বনু?কেউ কি বকাঝকা করেছে?
দাদি সহ বাকিরাও আমার দিকে মনযোগ দিলো।আমি টুক করে দাদির শাড়ির আচল দিয়ে সর্দি মুচে নিলাম।এতে দাদি মুখ মুচরালো।জুই জিয়াদ হিহি করে একটু হাসলো।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললাম,
–শা*লি মা*গী একটা।বাল চামরা তো কিচ্ছু নেই। আবার আমার জায়ান ভাইয়ের দিকে নজর দেয়।
কবিতা আপু জিজ্ঞেস করলো ,”কে আবার ভাইয়ার দিকে নজর দিলো রে?” আমি দাঁত কটমট করে বললাম,”ঐ চম্পা ন*ডি। বাল ডার নাম শুনলেই তো পাবলিকের কষা হয়ে যাবে।সে কিনা আবার আমার জামাইয়ের দিকে নজর দেয়!!” আমি আরও কিছু বলবো তার আগেই পুরুষালি কন্ঠ স্বর কানে আসে,

–কে তোর জামাই?
আমি সামনে তাকাতেই দেখলাম জায়ান ভাই প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি ব্রু নাচিয়ে ফের জিগ্যেস করলো,
–কি হলো বল?
কি লজ্জা কি লজ্জা!!এভাবে দিনে দুপুরে সকলের সামনে, জায়ান ভাইয়ের কাছে বাঁশ খেলাম!!আমি চোরের মতো চোখ নিচে নামিয়ে নিলাম। লজ্জায় গাল দুটো টকটকে লাল বর্ণ ধারন করেছে।আমার এই অবস্থা দেখে জায়ান ভাই সহ সকলেই ঠোঁট টিপে হাসছে।দাদি আমার লজ্জার মধ্যে আরও এক কথা বলে বসলো,
–শুন দাদুভাই,সরমিন্দা বউকে আদর করতে কিন্তু ভারি মজা।তোর দাদু আমার লজ্জা পাওয়া দেখে সবসময় বলতো।
জায়ান ভাই কৌতুক স্বরে বললো,”উমম তাই নাকি?তাহলে তো একটা সরমিন্দা বউই আমার লাগবে।”

জুই কবিতা আপুর সাথে দাঁড়িয়ে চাপা হাসিতে ফেটে পড়েছে। এদিকে লজ্জায় আমি আর উপরের দিকে তাকাতে পারছি না।এরই মাঝে কারো চিৎকার চেচামেচি শুনতে পাচ্ছি। সকলে সেই চেচামেচির আওয়াজ শুনে সদর দরজার দিকে তাকানোর আগেই আমি লাফ মেরে উঠে জায়ান ভাইয়ের পিছনে লুকিয়ে পড়লাম।অতঃপর উনার পিটের শার্ট খামচে ধরলাম।জায়ান ভাই আমার এমন কাজে ব্রু কুঁচকালো। আমি ভয়ে কেঁদে দিতে ঠোঁট উল্টালাম।তক্ষুনি সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো চম্পা আর চম্পার মা বাবা।সকলে ওদের দিকে তাকালো।চম্পার অবস্থা খুবই সূচনীয়। নাকে আর ঠোঁটের কোণে লাল তরল দৃশ্যমান।চোখ একটা কালো হয়ে কিছুটা ফুলে আছে। মাথায় জুটি করা চুলগুলো রাস্তার পাগলিদের মতো হয়ে আছে।কলেজের ড্রেসের এক সাইট ছিঁড়ে গেছে।ক্রস বেল্ট একটা কাঁধ থেকে পড়ে আছে।জায়ান ভাই সহ সকলে অবাক হয়ে মেয়েটাকে দেখছে।চেচামেচির আওয়াজ শুনে রান্নাঘর থেকে আম্মু আর বড় আম্মুও বেড়িয়ে এসেছে।চম্পা আমার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তার বাবাকে বললো,

–আব্বা এই শয়তানটা আমাকে মারসে।
চম্পার বাবা গর্জে উঠলো, “এই মেয়ের অভিভাবক কে?কি শিক্ষা দিয়েছেন এই মেয়েকে?কলেজে যায় কি মস্তানি করতে?আমার মেয়ের কি অবস্থা করেছে দেখেন।আজ এর বিহিত না হলে, এই বজ্জাত কে থাপ্পড়ে সাইজ করে দিয়ে পরে যাব।”
লোকটার কথা শেষ হতে না হতেই জায়ান ভাই গর্জে উঠলো,
–স্টপ দ্যা ননসেন্স! হাউ ডিয়ার ইউ!!আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের মেয়েকেই এভাবে শাসানোর রাইট কে দিয়েছে আপনাকে?আসার আগে জেনে আসা উচিত ছিল কার বাড়িতে এসেছেন!!
জায়ান ভাইয়ের ধমকে এক মূহুর্তের জন্য সবাই থমকে যায়।তারপর চম্পার মা চেচিয়ে উঠলো,
–ওগো চম্পার বাপ, দেখেছ!!চোরের মায়ের বড় গলা।
এটা শুনার পর আমার মাথায় আগুন ধরে গেছে। কেউ কিছু বলার আগেই, আমিই জায়ান ভাইয়ের পিছন থেকে বেড়িয়ে আসলাম।অতঃপর শাড়ির মতো করে পায়জামাকে উপরে টেনে ধরে ঝগড়া করার জন্য এগিয়ে গেলাম,
–অক্করে না,অক্করে না,,,,,,

এটুকু চেচিয়ে বলতে বলতে এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে জায়ান ভাই আমার কান ধরে টেনে নিজের কাছে আটকালো।অতঃপর চোখ গরম দেখিয়ে চুপ করতে বললো।আমি আবার ভয়ে জড়সড় হয়ে উনার পিছনে দাঁড়িয়ে শার্ট খামছে ধরলাম।চম্পার বাবা জায়ান ভাইয়ের কাছে আমার নামে বিচার দিতে নিলেই হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলো।অতঃপর শক্ত কন্ঠে বললো,
–আমাদের বাড়ির মেয়ের দোষ থাকতেই পারে না।আই হোপ কোনো ঝামেলা করলে আপনার মেয়েই করেছে।আন্ডারস্ট্যান্ড? এবার যে পথ দিয়ে এসেছেন,ঠিক সেই পথ দিয়ে বেড়িয়ে যান।
জায়ান ভাইয়ের শক্ত কন্ঠে বলা কথার ধরণ দেখে না চাইতেও চম্পার মা বাবা ভেতরে ভেতরে ভয় পেল।অতঃপর নিচু কন্ঠে বললো,

–আমার মেয়ের সাথে এত বড় অন্যায় আমি মুখ বুজে সহ্য করবো না।ভেবেছিলাম নিজেরা নিজেরা মিমাংসা করে নিব।কিন্তু আপনাদের ব্যবহার দেখে আর না।কি ভেবেছেন আপনাদের পয়সা আছে আমাদের কি নাই নাকি।এবার আদালতে দেখা হবে,,,
চম্পার বাবার কথা শেষ হতে না হতেই সদর দরজা থেকে একটা পুরুষালি কন্ঠ কানে আসলো,
–যা বলছেন ভেবে বলছেন তো?
সকলে সদর দরজার দিকে তাকালো, সেখানে জিতু ভাইয়া কথাটা বলে দাঁড়িয়ে হাসছে।তার পিছনে রাকিব ভাইয়া।তিনি পুলিশের ইউনিফর্ম পরিধান করে আছে।চম্পার বাবা থানায় যাওয়ার আগেই পুলিশ কে দেখতে পেয়ে খুশিতে গদগদ করছে।তিনি ছুটে গিয়ে রাকিব ভাইয়ের কাছে আমার নামে নালিশ দিতে থাকে।রাকিব ভাই একবার জিতু ভাইয়াকে আরেকবার জায়ান ভাইকে আর চোখে দেখছে।চম্পার বাবার নালিশ দেওয়া শেষ হলে তিনি বললেন,
–স্যার আমি দুটো কেইস করতে চাই।একটা আমার মেয়েকে আহত করার জন্য। আরেকটা মানহানীর মামলা।উনারা আমাদের কে অনেক অসম্মান,,,,,,,,

রাকিব ভাই চম্পার বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,”কার নামে মামলা করবেন বলছেন?”রাকিব ভাইয়া জায়ান ভাইকে দেখিয়ে বললো,”এই যে দেখছেন লোকটা দাঁড়িয়ে আছে;তিনি আর কেউ নন Director General জায়ান শেখ নীরব।” জিতু ভাইয়াকে দেখিয়ে বললো,”ইনি হচ্ছেন সিআইডি এসপি আরমান শেখ।”
রাকিব ভাইয়ের কথা শুনে লোকটা একটা শুকনো ঢুক গিলে জায়ান ভাইয়ের চোখের দিকে তাকায়।জায়ান ভাই পকেটে দু’হাত গুজে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে থাকে।লোকটা ভয়ে ভয়ে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকাতেই জিতু ভাইয়া বাঁকা হেসে প্যান্টের পকেট থেকে সিআইডি ব্যাজ লোকটার চোখের সামনে ধরে।লোকটা ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়।অতঃপর তিনজনে আমাদের কাছে মাপ চেয়ে তাড়াতাড়ি শেখ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়।এদিকে রাকিব ভাই কবিতা আপার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসতেই, কবিতা আপু চোখ উল্টে জিহ্বা দেখিয়ে চলে যায়।এটা দেখে ফেলে দুই বাটপার জিয়াদ আর জুই।তারা তক্ষুনি হো হো করে হেসে দেয়।রাকিব ভাইয়া লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে ধরে,চোখ নিচু করে নেয়।এদিকে জায়ান ভাই নিজের রুমের উদ্দেশ্য যেতে যেতে আমাকে বলে,

–জারা তুই আমার রুমে আই।তোর সাথে কথা আছে,,,,
ভয়ে হাত-পা কাঁপছে আমার।এখন রুমে আমাকে বকবে নাকি এই ভেবে গলা শুকিয়ে আসছে।জিতু ভাইয়া আশ্বাস দিলো বকবে না।তারপর সকলের দিকে তাকাতেই নজরে আসলো আম্মুর ক্ষ্যাপা দৃষ্টি।আমি মুখটা বাচ্চাদের মতো সরল করে জায়ান ভাইয়ের রুমের উদ্দেশ্য যাওয়া ধরলাম।

জায়ান ভাইয়ের রুমের সামনে এসে সূরা পড়ে,আল্লাহ নবীর নাম জপে বুকে তিনবার ফু দিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলাম। ভেতরে জায়ান ভাইকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের শব্দ আসছে।আমি বুঝতে পারলাম তিনি ফ্রেশ হচ্ছেন। আমি ভয়ে বিছানার এক কোণায় চুপচাপ বসে রইলাম।আমি বসে বসে যখন নিজের চুলের জুটি ঠিক করছি__তখনই চোখে পড়ে বেডসাইডের টেবিলে জায়ান ভাইয়ের ফোন রাখা।আমি ওয়াশরুমে একবার উঁকি দিয়ে তাড়াতাড়ি ফোনটা নিয়ে নিলাম।অতঃপর পাসওয়ার্ড চাইলে বোকা পাখি দিয়ে লক খুললাম। অনেকদিন আগেই জায়ান ভাই উনার ফোনের পাসওয়ার্ড আমাকে বলে দিয়েছিলো।আমি মাঝেমধ্যেই নিজের ফোন রেখে উনার ফোন টিপি।ফোনে আছে বলতে আমার ছোট থেকে আজ পর্যন্ত তোলা সব ছবি।ফোনে আমার ছবি ছাড়া অন্য কারো কোনো পিকই নেই। আমাদের কাশবেন তোলা একটা পিক ওয়ালপেপার দেওয়া।আমি বেশ কিছুক্ষণ সেই ছবিটা তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠে। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যেতে নিলেও ক্যাচ ধরে নিলাম।অতঃপর স্কিনে তাকাতেই দেখলাম অদ্ভুত এক নাম্বার।যেখানে এগারো ডিজিট নেই। তবে এত কিছু ভাবার আগেই কলটা কেটে যায়।আমি ফোনটা আগের জায়গায় রেখে দিতে যাব তখনই আবার একই নাম্বার থেকে কল আসে।আমি ফোনটা কে একবার দেখে আরেকবার ওয়াশরুমের দিকে তাকালাম।ডাক দিবো কি দিবো না ভাবতে ভাবতে আবারো লাইন কেটে গেছে।তক্ষুনি আবার কল আসে।এতবার কল আসছে বিষয়টা আমার মোটেও সুবিধার লাগছে না।হঠাৎই মাথায় আসলো কোনো মেয়ে আবার জায়ান ভাইকে বিরক্ত করছে না তো?ভেবেই ঝটপট ফোনটা রিসিভ করলাম।অপর প্রান্তের ব্যক্তি কিছু বলার আগেই আমি বললাম,

–হ্যালো???
ফোনের অপর প্রান্তে ইফান নিজের জিহ্বার আগায় থাকা অশ্রাব্য গালি গিলে নিলো আমার কন্ঠ স্বর শুনে।সে তার অফিসে বসে ড্রিংকস করছে।বারবার জায়ান ভাইকে কলে না পেয়ে রাগে রিরি করছিলো।এদিকে কারো উত্তর না পেয়ে আমি আবার বললাম,
–হ্যালো আসসালামু আলাইকুম।
আমার কন্ঠ শুনে ইফানের বুঝতে বাকি নেই এটা যে জাহানারা।সে বুকের বা পাশে ফোনটা নিয়ে দু হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো।অতঃপ চোখ বন্ধ করে হাস্কি স্বরে হিসহিসালো,
–উফফ কি কন্ঠ রে মাইরি,শালা শুনলেই সিস্টেমে আগুন লাগে।
ইফানের এহেন কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইনান প্রশ্ন করে বসলো,”জি ভাই কোথায় আগুন লাগে।” ইনানের কথা শুনে ইফান আয়েশি “ইসসস” এর মতো আওয়াজ করতে করতে নিজের মেইন পয়েন্টে এক আঙ্গুল দিয়ে দেখালো।ইনান মাথা চুলকাতে চুলকাতে কেঁশে উঠলো,

–এহেম, এহেম।
আমি কপাল কুঁচকালাম কারো কন্ঠ না শুনতে পেয়ে। আমি আবারও বললাম,
–হ্যালো,কে ব,,,,,,
বাকি কথা বলার আগেই কেউ আমার কান থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো।আমি ঝটপট সেদিকে তাকাতেই দেখি জায়ান ভাই। তিনি কলটা কেটে বিছানায় ছুঁড়ে মারলো।আমি উনার কড়া চাউনি দেখে ভয়ে আরেকটু গুটিয়ে গেলাম।আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।জায়ান ভাই শান্ত কন্ঠে বললো,
–কলেজে কিসের জন্য যাস?

আমি মাথা নিচু করে রেখেই উত্তর দিলাম,”প পড়াশোনা করতে।” আমার কথার পিছে একই ভাবে প্রশ্ন করলো,”তাহলে ঐ মেয়েটার সাথে মারামারি কেন করেছিস?” আমি ঠোঁট উল্টালাম। এই কেঁদে দিব দিব তখনই জায়ান ভাই নরম কন্ঠে বললো,”ডোন্ট ক্রায়। স্পষ্ট করে কথা বল।আমি তোকে মারছি নাকি?”
আমি নাক টেনে বলতে লাগলাম কলেজ শেষ হওয়ার পরের ঘটনা।আমি তন্নি,সুমাইয়া, নাফিয়া আর আরিফ কথা বলতে বলতে কলেজ থেকে বের হচ্ছিলাম।তখনই চম্পা আর তার বান্ধবীদের কন্ঠ কানে আসে,
–দোস্ত জায়ান স্যার কি হ্যান্ডসাম ভাই।উনাকে দেখার পর থেকে আমার তো রাতে ঘুমে আসতে চায় না।খালি স্বপ্নে দেখি উনার সাথে আমি রোমান্স করছি।
চম্পার বান্ধবীরা হাসিতে ফেটে পড়লো।তারাও জায়ান ভাইকে নিয়ে এটা সেটা অনুভূতি শেয়ার করছে।এসব শুনে আমি রাগে ফুঁসতে লাগলাম।এরই মাঝে চম্পা আমাকে ডাকতে লাগলো,

–এই জায়ান স্যারের বোইন।শুন শুন।।
জায়ান ভাইয়ের বোন সম্মোধন শুনে রাগের মাত্রা আরও এক ধাপ বাড়লো।তন্নি আর আরিফ একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে বুঝালো,
–শালিরে আজ জাহান পশ্চাতে বাঁশ ঢুকাবে।
চম্পা আমার কাছে এসে জায়ান ভাইয়ের ফোন নাম্বার সহ পার্সোনাল ইনফরমেশন চাইতে থাকে।আমি এমনিতেই রাগ কন্ট্রোল করতে পারি না।তার উপর এই মাইয়া একটার পর একটা বকে যাচ্ছে। আমি ওকে এভয়ড করে চলে যেতে নিলে চম্পা আমার মাথায় গাট্টি মেরে বলে উঠে,

–এত ভাব ধরতাছস কেন?আমার সাথে ভালো আচরণ কর।আমি কদিন পর তোর ভাইকে বিয়ে করে তোর ভাবি হব।
এক পর্যায়ে চম্পা নিজের সকল লিমিট ক্রস করে বসে।আমি আর নিজের রাগ সামলে রাখতে পারলাম না।তাই নিজের কাঁধের ব্যাগটা আরিফের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে চম্পার চুলগুলো দু’হাতে মুটি করে ধরলাম।চম্পাও আমার সাথে মারামারিতে লেগে গেলো।আমি হচ্ছি ট্রেনিং প্রাপ্ত ক্যারাটে। তাই চম্পা সহ ওর বান্ধবীরা একা-আমার সাথে পেরে উঠলো না।অন্যদিকে আরিফ মাটিতে থাপড়ে শীশ বাজিয়ে রেফারির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলো।আমি চম্পাকে মাটিতে ফেলে আচ্ছা মতো দু ঘা দিয়ে কেটে পড়ি, কলেজের টিচার্সরা আসার আগেই।

আমার কথা শুনার পর,জায়ান ভাই আমাকে কান ধরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছে।আমি দু কানে ধরে রেখে জায়ান ভাইয়কে আড় চোখে দেখছি।লোকটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে__দেহের বিন্দু বিন্দু পানিগুলো টাউয়ালের সাহায্য মুচ্ছে।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে, শুকনো ঢুক গিলতে লাগলাম। তল পেটে কেমন যেন গুরগুর করছে।মনে হচ্ছে সেখানে লক্ষ প্রজাতি ডানা মেলে উড়ছে।এই অনুভূতিটা ভীষণ অস্বস্তিকর।সবে সপ্তাদশী, তাই বুঝে উঠতে পারি না এটা কি ধরনের অনুভূতি?আমি এক পা দিয়ে আরেক পা ঘষে যাচ্ছি।জায়ান ভাই আমাকে এমন অস্থির দেখে এদিকে এগিয়ে আসলো।লোকটার পড়নে একটা টাউজার।পেশিবহুল দেহ স্পষ্ট দৃশ্যমান। আমি না চাইলেও আমার নজর সেদিকে চলে যাচ্ছে বারবার।ব্যাপারটা জায়ান ভাই ধরে ফেলেছে।তিনি আমার খুব সন্নিকটে এসে দাঁড়াল।অতঃপর দেয়ালে এক হাত রেখে আমার উপর হালকা ঝুঁকে পড়ে সেডাকটিভ টোনে বললো,

–আরও কোনোদিন এমন করবি?
আমি কানে ধরে রেখেই নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে দু পাশে মাথা নাড়ালাম।অতঃপর রিনরিন সুরে বললাম,
–আমি তো কিছু করি নি।চম্পাই তো আমাকে রাগিয়ে দিলো,,,
জায়ান ভাই আচমকা আমার উপর আরও ঝুঁকে পড়ে।আমি এক পা আরেক পায়ের উপর আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।কি হচ্ছে আমার নিজেই বুঝতে পারছি না।লোকটার শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমাকে আরও অস্থির করে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে লোকটার বুকে ঝাপিয়ে পড়ি।জায়ান ভাই নিজের মুখ আমার কানের কাছে নিয়ে আসলো।আমি ঝটপট চোখ শক্ত করে বন্ধ করে নিলাম।তল পেটের অস্বস্তিকর অনুভূতি পর্যায়ক্রমে আরও বেড়ে গেলো।মনে হচ্ছে সিনেমার নায়কদের মতো জায়ান ভাইও আমার কানে চুমু খাবে।কিন্তু আমার সব ভাবনা মাটি করে একই মাদকীয় কন্ঠে জায়ান ভাই বলে উঠলো,

–এইটুকু শরীরে এত রাগ কোথা থেকে আসে?
–জা জানি না তো,,,,
আমার বাচ্চাদের মতো কথা শুনে লোকটা ঠোঁট কামড়ে হাসলো।আমাকে আরও কিছু বলবে তার আগেই আবারও উনার ফোনটা বেজে উঠলো।জায়ান ভাই বিছানার ফোনটায় একবার দৃষ্টি বুলিয়ে আমাকে বললো কলেজ ড্রেস চেইঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নিতে।আমি মাথা নাড়িয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে যায়।
জায়ান ভাই আমার যাওয়ার পানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, ফোনটা রিসিভ করলো।অপর প্রান্ত থেকে ইফান হেয়ালি করে বললো,

–হ্যালো,আমার বউজান নাকি মা*ঙ্গের শালা?
জায়ান ভাই চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,”হা*রামি লেঙ্গুয়েজ ঠিক কর।তুই আমাকে কল দিবি না। তোর সাথে আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক অনেক আগেই শেষ। ”
ফোনের অপর প্রান্ত ইফান হো হো করে হেসে উঠলো।অতঃপর বাঁকা হেসে বললো,
–তর বন্ধুত্ব কে আমি পাছা মেরে শা*লার সম্পর্কে নিয়ে এসেছি।
জায়ান ভাই ইফানের প্রতি চেঁচিয়ে উঠলো।রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
–তোকে এতদিন নিজের বন্ধু ভেবে এসেছিলাম, ছ্যাহ্,,,,,
ইফান হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে গেলো।তারপর কিছু একটা ভেবে চোয়াল শক্ত করে বললো,
–সেটা তরই দোষ। তুই কেন আগে বললি না, তর যে এত সুন্দরী বোন আছে।তাহলেই তো প্রথমেই শালা বানিয়ে দিতাম।
জায়ান ভাই আর নিতে পারছে না।তিনি চোখ বন্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।তখনই ফোনের ওপাশ থেকে ইফান ফের বললো,

–আমার পু*টকি ছেড়ে আইনের পু*টকি ধরলি কেন?
জায়ান ভাই নিজেকে শান্ত করে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,”আমি তরটাই ধরেছিলাম কবে?”
–তার মানে আমাদের এত দিনের ফ্রেন্ডশিপকে অস্বীকার করছিস?
–এই কাজ আমি মরলেও করবো না।পৃথিবীতে আমাকে কখনো যদি মিথ্যা দিয়ে সত্যি ঢাকতে হয়। তাহলে জেনে রাখিস তরটাই ঢাকবো।
–পৃথিবীতে একমাত্র তুই যাকে আমি বারবার ছাড় দিই।তাহলে ভাব তুই আমার প্রায়োরিটি লিস্টে কতটা স্পেশাল আর ইম্পরট্যান্ট। আশা করি আমার সাথে বেইমানি করবি না!!
জায়ান ভাই মৃদু হেসে বললো,”আর যদি তুই করিস?” জায়ান ভাইয়ের কথা শুনে ইফান অনেকটা উদাস হয়ে গেলো।নিজের দেহটা কাউচে ছেড়ে দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললো,

–একটা বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নই।সেটা ছাড়া কখনো করবো না।তুই কি আমাকে ট্রাস্ট করিস?
জায়ান ভাই বেডে শরীর ছেড়ে দিয়ে ইফানের মতো উদাস হয়ে বললো,”হয় তো নিজের চেয়েও তোকে বিশ্বাস করি।আমি জানি তুই সত্যি না বললেও কখনো আমায় মিথ্যা বলিস না।”
ইফানের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ভেসে উঠলো।সে এক হাত দিয়ে নিজের ঘন কালো চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিতে দিতে বললো,”এত ট্রাস্ট করা কি ঠিক?”
জায়ান ভাই হাতটা চোখ দু’টোর উপর রেখে ফের তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।অতঃপর হাস্কি স্বরে বললো,,,,,
❝মন আর মস্তিষ্ক সবসময় নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতিই আটকায়রে ভি।আমিও আঁটকে গেলাম তর সাথে এক শিরোনামহীন বন্ধুত্বের দায়ে।❞
জায়ান ভাইয়ের কথার পিছে ইফান কিছু বলতে পাড়লো না।অতঃপর বেশ কিছুক্ষণ দু’জন নীরবতা পালন করে।সেই নীরবতা ভেঙে জায়ান ভাই বলে,

–এখন কোথায় আছিস?
ইফান চোখ বন্ধ করে কাউচে হেলান দিয়ে আছে।সেভাবেই উত্তর করলো,
–থাইল্যান্ড।। মাফিয়াদের একটা পার্টি এরেঞ্জ করা হয়েছে।রেডি হয়ে আছি কিছুক্ষণ পর সেখানেই যাব।
জায়ান ভাই সংক্ষিপ্ত প্রতিত্তোর করলো,”ও আচ্ছা।”
আবার দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করে।এবার ইফান সেটা ভেঙে জায়ান ভাইকে হাস্কি স্বরে ডেকে উঠে,
–নীরব!!
–হুম??
ইফান দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করলো।জায়ান ভাইও সেটা অনুভব করেছে।ইফান হিসহিসিয়ে বললো,
–আই ফিল ডিস্টার্ব!!
–হোয়াই??
ইফান চোখ বন্ধ রেখেই এক হাত নিজের বুকের বাম পাশে রেখে একই স্বরে বললো,,,,

–আই থিংক, সামথিং ইজ বার্নিং ইন মাই চেস্ট।
ইফানের কথা শুনে জায়ান ভাই ঝটপট উঠে বসলো।তিনি বেশ অবাক হয়েছেন ইফানের কথায়।তিনি হালকা হেসে কৌতুক স্বরে বললো,
–ওহ্ রিয়েলি!!
জায়ান ভাইয়ের এমন রিয়াকশনে ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে, সেও কৌতুক করে হিসহিসিয়ে বললো,
–উমমম,সামথিং সামথিং,,,,,

রাত সারে দশটা বাজে।আম্মু সকলকে ডাকছে ডিনার করার জন্য।জুই আমাকে বলে নিচে চলে গেছে।আমার পড়নে ওভার সাইজ গেঞ্জি আর প্লাজু।আমি নিজেকে আয়নায় দেখে আরেকটু পরিপাটি হয়ে নিলাম।রুম থেকে বের হওয়ার সময় ঠোঁটে হালকা লিপবাম দিয়ে, মাথায় ওড়না টেনে নিলাম।অতঃপর নাচতে নাচতে রুমে থেকে বেড়িয়ে গেলাম।কি একটা ভেবে জায়ান ভাইয়ের রুমে উঁকি দিলাম।আমার জানা মতে তিনি দুপুর দুইটাই বাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে যায়।এর পর আর বাড়িতে আসতে দেখি নি।আমি দরজা হালকা ফাঁক করে উঁকি মারছি তখন জায়ান ভাইয়ের কন্ঠ কানে আসে,

–এমন বিরক্ত করছিস কেন?কাজে মনযোগ দিতে পারছি না তো।
আমি ঠিকঠাক হয়ে রুমে ঢুকে দেখলাম, জায়ান ভাই কাউচে বসে উরুতে ল্যাপটপ নিয়ে মনযোগ সহকারে কাজ করছে।আমার মনের কোণে প্রশ্ন জাগলো,উনি তো একবারও আমার দিকে তাকালো না। তাহলে বুঝলো কিভাবে আমি বাইরে থেকে উঁকি মারছিলাম।মনের কথা মুখ ফুটে বলেই ফেললাম,
–আপনি তো তাকালেন না। তাহলে বুঝলেন কিভাবে, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম?
–তুই তুই একটা ফ্লেভার নাকে আসছিলো।
জায়ান ভাইয়ের কথা মাথায় ঢুকলো না।আমিও আর পাত্তা দিলাম না।কারণ আজ অনেক মজার মজার আইটেম রান্না হয়েছে।আমি হেলেদুলে বললাম,

–নিচ থেকে তো ডাকছে। খেতে যাবেন না?
–আমি অনেক বিজি খিদে নেই।।
–না না না,এটা বললে হবে না। আজ জিতু ভাইয়াও বাসায়, চলুন না।
জায়ান ভাই কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে বললো,
–জারা তুই সবার সাথে খেয়ে নে।আমি অনেক বিজি।
আমি জায়ান ভাইয়ের কথা শুনলাম না।মনে এক অদম্য সাহস নিয়ে উনার বাহু ধরে টানতে লাগলাম। মূহুর্তেই লোকটা টাইপিং করা থামিয়ে দিলো।তারপর আামর দিকে তাকাতেই আমি আরও জুড়ে টানতে লাগলাম।আমি বাচ্চাদের মতো বাইনা ধরার মতো বলতে লাগলাম,
–চলুন না , চুলন না,,,,,,,,
জায়ান ভাই আর কিছু বলতে পারলো না। অনিচ্ছা থাকা সত্যিও ল্যাপটপ বন্ধ করে আমার সাথে নিচে আসলো।আমি এখনো উনার বাহু টেনে সিঁড়ি দিয়ে নামছি আর বলছি,

–আসুন, আসুন,,,,,,
আমাদেরকে দেখে দাদি বড় আব্বুকে চোখ টিপ মারলো।জিতু ভাইয়া আমাদের কে এক সাথে দেখে ঠোঁট কামড়ে ফোনে মনযোগ দিলো।জুই মুখে হাত ধরে মিটিমিটি হাসছে।আমি জায়ান ভাইকে একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে, তার পাশে আমিও বসে পাড়লাম। বড় আম্মু সবাই কে খাবার দিতে এসে দেখলো কবিতা আপু এখনো আসে নি।তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
–কিরে জাহান কবিতা কোথায়?
আমি নিজের খালি প্লেটে কুটকুট শব্দ করতে করতে বললাম,
–তোমার মাইয়াকে ভূতে ধরসে বড় আম্মু।
সবাই আমার দিকে ডেবডেব করে তাকালো।বড় আম্মু অবাক হয়ে বললো,

–কি বলসরে জাহান!!
–হ্যা গো বড় আম্মু। কবিতা আপু একটা একলা কথা বলে। আবার একলা একলা হাসেও।আমি কিছু বললেই বলে এমনিতেই নাকি তার হাসি পাচ্ছে।
জায়ান ভাই আমার কথা শুনে আমার কপালে দু আঙ্গুল দিয়ে ঠোকা মেরে বললো,
–গাঁধি,,,
আমি গাল ফোলালাম।জায়ান ভাই দুটো ডাক দিতেই কবিতা আপু পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে আসলো।কবিতা আপুকে দেখে বড় আম্মু একটু বকে নিলো।বড় আব্বু কিছু বলার আগেই জায়ান ভাই শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
–কি সমস্যা?
কবিতা আপু একটা ঢুক গিলে আমতা আমতা করে বললো,
–ক কই কিছু না তো!!
–হুম, কিছু যাতে না হয়।আমি পরে জানতে পারলে শাস্তি পেতে হবে।মনে রাখবি কথাটা।
–আআ আচ্ছা, মনে থাকবে।
বাক্যটা শেষ করেই কবিতা আপু আমার দিকে রেগে তাকালো।আমি চোখ উল্টে ভেংচি কাটলাম।

আম্মু আর বড় আম্মু আমাদের যা প্রয়োজন তা দিচ্ছে।আমি মজা করে খেতে ব্যস্ত তখনই বড় আব্বুর কন্ঠ কানে আসে,
–মজিদ ভাই আমার, তোর কাছে একটা আবদার আছে।।
আব্বু খাওয়া থেকে মনযোগ সরিয়ে বড় আব্বুর দিকে তাকালো।বড় আব্বু ছোট ভাইয়ের কাঁধে এক হাত রেখে বললো,
–বাড়ির মেয়ে বাড়িতে সারাজীবন রেখে দিলে কেমন হয়?
আব্বুর চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে তিনি কথার মানে বুঝতে পারেননি।জায়ান ভাই এক মূহুর্তের জন্য খাওয়া বন্ধ করে। তিনিও বড় আব্বুর কথায় বেশ অবাক। তবে সেটা প্রকাশ করলো না।তিনি আবার খাওয়ায় মনযোগ দিলো।জায়ান ভাই ছাড়া উপস্থিত সবাই বড় আব্বুর কথায় মনযোগ দিলো।বড় আব্বু আবার বলতে লাগলো,

–ভাই ছেলেটার তো বিয়ের সময় হয়েছে। আমি চাইছি বাড়িতে পুত্র বধু নয় আমার আরেকটা মেয়ে আনতে।তুই যদি ভাই রাজি থাকস, তাহলে তোর আদরের বড় কন্যাকে আমার ছেলের সাথে চারহাত এক করে দে।আমাদের মেয়ে সবসময় আমাদের কাছেই থাকলো।মরণের আগ পর্যন্ত, সবসময় আম্মাজান কে চোখের সামনে দেখতে পারবো।
মহূর্তেই আব্বু খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।আম্মুও প্রস্তাবে বেশ খুশি হয়েছে।তবে আব্বুকে হঠাৎ এমন করতে দেখে উনার হাসি মিলিয়ে গেছে। বড় আব্বু মুখ অন্ধকার করে দাঁড়াল। অতঃপর ভাইয়ের কাছে করুন সুরে বলতে লাগলো,
–তুই যদি রাজি না থাকিস তাহলে আমি জোর করব না।তুই হয় তো মেয়ের জন্য আমার ছেলের থেকেও ভালো পা,,,,,,,
বাকি কথা শেষ করার আগেই আব্বু বড় আব্বু কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো।সবাই আরেক দফা অবাক হলো।আব্বু জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো,

–ভাই তুমি কি প্রস্তাব দিলে গো।খুশিতে তো আমার মুখ দিয়ে কথা আসছে না।এমন হীরার টুকরো ছেলে আমি কোথায় পেতাম।আমি তো মনে মনে এমন একটা ছেলেরই খোঁজ করছিলাম।আল্লাহ তুমি তো আমাকে জান ভিক্ষা দিলে। আমার তো ভাবলেই দম বন্ধ হয়ে আসতো,যে মেয়েকে পরের হাতে তুলে দিতে হবে।
দুই ভাই আনন্দে কেঁদে ভাসাচ্ছে।সকলেই সেই মূহুর্ত মন ভরে দেখছে।আমি এখনো বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে!! এদিকে সকলের দৃষ্টি সামনে থাকলেও জায়ান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে অপলক। তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি।আব্বু আম্মুরা বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে। এদিকে বড় আব্বু আমাকে বললো,

–আম্মাজান আপনি রাজি?
হঠাৎই বড় আব্বুর কণ্ঠ কানে আসতেই আমি লাফ মেরে দাঁড়িয়ে পড়লাম।আমার হাতে হাঁসের বড় একটা রান।সেটা সহ দু’হাত, মাথা নাড়িয়ে খুশিতে গদগদ করতে করতে বলে দিলাম,
–আমি রাজি,আমি রাজি, আমি রাজি,,,,,,,
আমার এমন কান্ডে সকলেই হো হো করে হেসে দিলো।জায়ান ভাইয়া আমাকে গাঁধি সম্মোধন করে ডাইনিং রুম ত্যাগ করলো।

ঘড়ির কাটা টিকটিক করতে করতে রাত একটা পনেরো তে এসে থামলো।বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে।এটা নিশ্চিত হতেই আস্তে আস্তে রুম থেকে বেড়িয়ে এলো কবিতা আপু।ভালোভাবে চাদর দিয়ে নিজেকে ঢেকে বাড়ির পিছন গেইট দিয়ে বেড়িয়ে পড়লো।এদিকে জায়ান ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে সব কিছু অস্থির লাগছে।ঘুম আসছে না।চোখের সামনে ভেসে উঠছে হাজারও স্বপ্ন।আর তার সবটা জুড়ে আমি আর আমার জায়ান ভাই।জায়ান ভইকে নিয়ে ভাবতে গেলেই তল পেটের প্রজাতিগুলো ডানা মেলে ঝাঁপটাতে শুরু করে।ভিষণ অস্থির লাগে এই মূহুর্তটাই।আমি আর এভাবে শুইয়ে থাকতে পারলাম না।তাই বিছানা ছেড়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করতে লাগলাম।হঠাৎই নজর পড়লো বেলকনির দরজা খোলা। আমি দরজা লাগাতে যেতেই চোখ পড়লো শেখ বাড়ির বাউন্ডারির ঐ পাড়ে__একটা কালো গাড়ি চোখের পলকে স্থান ত্যাগ করলো।আমি একটু অবাক হলাম।কারণ আমাদের বাড়ির পিছনের রাস্তা দিয়ে এমন বড় গাড়ি কখনো চলাফেরা করে না।তাও আবার এত রাতে।

আমি এত না ভেবে দরজা বন্ধ করে ফোন নিয়ে বসলাম।জায়ান ভাইয়ের ইনস্টাগ্রাম আইডিতে বেশ কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করলাম।সেখানে উনার অনেক ছবি আপলোড দেওয়া সেগুলো জুম করে করে দেখলাম।মাঝে মাঝে ছবিতে চুমুও খেতে লাগলাম।ছবিতে চুমু খেয়ে লজ্জায় আমার গাল লাল টুকটুকে হয়ে উঠছে।আমি বেশিক্ষণ জায়ান ভাইয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে পাড়লাম না।সকল লাজুকতা আমায় ঘিরে ধরেছে।আমি আবার শুইয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসতে চাইছে না।অবশেষে ফোন হাতে নিয়ে কবিতা আপুর রুমের উদ্দেশ্য বেরোতে নিলেই দেখলাম, জায়ান ভাই ছাঁদের দিকে যাচ্ছে। আমিও চুপিচুপি পিছনে যেতে লাগলাম। আমাদের বাগান, ছাঁদে সারারাতই লাইট জ্বলে।তাই সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।আজ পূর্ণিমা রাত, সাথে হালকা কুয়াশা মাখা রাতের প্রকৃতি যে কারো মন ছুয়ে দিবে।আকাশে চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে।তার পাশে লক্ষ কোটি তারার মেলা।এই অপরুপ প্রকৃতির দৃশ্য যে দেখবে সেই মুগ্ধ হতে বাধ্য।

কিন্তু এই প্রকৃতি থেকেও আমাকে বেশি মুগ্ধ করছে জায়ান ভাইয়ের মায়াবী চেহারা।তবে জায়ান ভাইকে ভীষণ চিন্তিত লাগছে।তিনি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে ধরে দিয়াশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে দিলো।এই দৃশ্যটা এত সুন্দর যে আমি হা করে তাকিয়ে দেখতে লাগালাম। তিনি সিগারেটে টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে দিচ্ছে। আমি দরজার আড়াল থেকে সেই দৃশ্যই দেখে স্বপ্ন জগতে পারি দিচ্ছি। জায়ান ভাই একটা সিগারেট সম্পূর্ণ শেষ করে আরেকটা ধরালো।উনার অস্থিরতা যেন কিছুতেই কমছে না।সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎই তিনি স্থির হয়ে গেলেন।তিনি আবারও আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে, মাদকীয় হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,

–জাহানারা নামের অর্থ কি জানিস?
আচমকা উনার কন্ঠ স্বর শুনে আমার বুক কেঁপে উঠলো।আমি ঝটপট দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই মৃদু হাসলো।অতঃপর একই কন্ঠে বললো,
–কাছে আয় পাখি।তুই আমার কাছে থাকলে হৃদয়ে শান্তির স্রোত বয়ে যায়।
উনার এই বাক্যটা আমার অশান্ত হৃদয় আরও প্রণয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলো।আমার বুক কাঁপছে। হাত পা অসার হয়ে আসছে।তবুও লোকটার কথা ফেলতে পারলাম না।কাঁপা কাঁপা শরীর নিয়ে রেলিং ধরে উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। জায়ান ভাই মন খুলে শ্বাস নিলো।মনে হচ্ছে এতক্ষণ উনার শ্বাস আটকানো ছিলো।আমি উনার দিকে তাকিয়ে রিনরিন সুরে বললাম,

–জাহানারা অর্থ বিশ্বের রানী।
–আর জারা অর্থ কি জানিস?
আমি লোকটার মায়াবী চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর করতে চাইলাম।তবে আমাকে বলতে না দিয়েই তিনিই বলতে লাগলেন,
–রাজকুমারী,আমার রাজকুমারী। তুই জানিস বড্ড শখ করে তোর নাম জারা রেখেছিলাম। তুই জন্মের পর ঠিক কতটা কিউট হয়েছিলি যে হাজার বর্ণনা দিয়ে বললেও তার তুলনা করতে পারবো না।ডাক্তার সহ হাসপাতালের সকলেই আশ্চর্য হয়েছিলো।কারণ তুই একদম টুকটুকে পিংক কালার হয়েছিলি।তোর রং দেখে বড় দাদু তার মার মিল পায়।তাই উনার মার নাম অনুযায়ী তোর নাম জাহানারা রেখেছিলেন।আর আমি রেখেছিলাম জারা।জানিস আমি কখনো ভাবিনি তোকে কখনো নিজের করে নিতে চাইবো।এই ইচ্ছেটা তো সেদিন জাগে তখন তোর বয়স তিন কি সারে তিন বছর হবে।আমি পড়ছিলাম। তুই কোথা থেকে ছোট ছোট পা নিয়ে দৌড়ে আমার রুমে আসলি।আমি তোকে খেয়াল করি নি পড়ায় মনযোগী বলে। হঠাৎই তুই আমার পায়ে ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে থাপ্পড় দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে ডাকতে লাগলি,

–জান ভাই, জান ভাই হুন, হুন।
আমি তৎক্ষনাৎ তোর দিকে তাকালাম। তুই মায়াবী ডাগর ডাগর আঁখি যোগল দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। তোর ঠোঁটের আস পাস চকলেট দিয়ে মেখে আছে।আমি তোর কপালে চুমু খেয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে লাগলাম।তুই আামর শার্টের একটা কোণা ধরে টানতে টানতে আদুরে কন্ঠে বলতে লাগলি,
–হামি টুমার বও??
তোর মুখের আদুরে অবুঝ কথাটা শুনা মাত্রই আমার হৃৎস্পন্দন থমকে যায়।এক মূহুর্তের জন্য দম আটকে আসে।আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম।সেদিন এটা তুই কি বললি তুই নিজেও জানিস না।আমি ঢুক গিলে তোকে কোলে নিয়ে বললাম,

–জারা পাখি এটা পচা কথা, বলতে নেই।
তুই আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘারে কামড় বসালি।তারপর আমার কাঁধে মারতে মারতে রাগ দেখিয়ে বলতে লাগলি,
–অক্করে না, অক্করে মাইয়া ডিবাম হুম।দাদি কইচেনা হামি টুমার বউ।অকন টুমি মিচি কটা কইয়েই মাইয়া ডিবাম,,,,,
জানিস পাখি সেই দিন থেকে তুই আমার স্বপ্নে ধরা দিতি প্রতিরাতে। তোকে বউ বানানোর প্রবল ইচ্ছে এই হৃদয়ে বাসা বাঁধে।তোর অপেক্ষা করতে করতে এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলো।আজ মনে হচ্ছে তোকে সত্যিই বউ করে নিতে পারবো।কিন্তু,,,,,
আমি খুব মনযোগ দিয়ে জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো শুনছিলাম।হঠাৎ উনি থেমে যাওয়ায় আমি বললাম,

–কিন্তু কি??
জায়ান ভাই আকাশের থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকালো।অতঃপর সিগারেটের শেষ অংশ টুকু নিচে ফেলে__আমার দুগাল আগলে ধরে হাস্কি স্বরে বললো,
–আমার যে বড্ড বেশি ভয় করছ।নিজের জন্য নয়, তোকে হারানোর ভয়।আমার যে স্বপ্ন তোকে বধূ করে আমার ঘরে তোলার। কিন্তু তার আগেই যদি আমি হারিয়ে যায়,,,,,
–নাহ্,,,
আমি জায়ান ভাইয়ের মুখে হাত ধরে উনাকে বলতে দিলাম না।আমার চোখ দুটো জলে ভরে উঠেছে উনার এমন কথা শুনে।জায়ান ভাই আমার হাতটা উনার মুখ থেকে সরিয়ে__উনার বুকের বাম পাশে রাখলো।অতঃপর তিনি আবার বলতে লাগলেন,,

জাহানারা পর্ব ৪৪

❝তুই অনেক সরল, পাখি আমার।আর সরল জিনিসগুলো ভীষণ স্বচ্ছ হয়।সেখানেই বিরাজ করে সকল পবিত্রতা।তুই ভীষণ পবিত্র রে জারা।তোর পবিত্র হৃদয়ে আমাকে যত্ন করে রাখিস।❞
জায়ান ভাইয়ের কথাগুলো শুনে আমার বুকে চিমচিম ব্যথা শুরু হয়েছে।লোকটা হঠাৎ এত ভারী কথা কেন বলছে বুঝতে পারছি না।আমার গলায় কান্নার দলা পাকিয়ে আসছে।আমি কান্না টুকু গিলে লোকটার বুক থেকে উনার হাতটা আমার বুকের বা পাশে রেখে ভেজা কন্ঠে বললাম,
❝এই যে এখানে যত্ন করে আপনাকে রেখে দিলাম।এবার মৃত্যু ছাড়া এই হৃদয় থেকে আপনার নাম কেউ মুছতে পারবে না।কথা দিলাম___❞

জাহানারা পর্ব ৪৬