জাহানারা পর্ব ৪৪
জান্নাত মুন
চৌধুরী মেনশন__
ভোরের আলো ফুটেছে সবে।সূর্য সম্পূর্ণ রুপে উদয় হয়নি এখনো।গতরাত থেকে অঘুমে আছে পলি।ঘুম যেন তার চোখ হতে পালিয়েছে।সারারাত স্বামীর মাথার পাশে বসে থেকে অঝোরে চোখের জল ফেলে গেছে।ইমরান ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে আছে,তবুও রাতে বেশ কয়েকবার প্রেয়সীর কান্নার আওয়াজ শুনে জেগে উঠেছে।তারপর একহাত বাড়িয়ে অর্ধাঙ্গিনীর চোখের অশ্রুটুকু মুছে শান্তনা দিয়ে বলেছে,
–কি হয়েছে বোকা মেয়ে?আমি ঠিক আছি তো নাকি?তাহলে এভাবে কাঁদছ কেন?তুমি জান না, তোমার কান্না আমি সহ্য করতে পারি না।তোমার কষ্ট দেখে আমার যতটুকু কষ্ট হচ্ছে তার চেয়ে একবিন্দু পরিমাণও শরীরে ব্যথা অনুভব হচ্ছে না।বাবু কান্না থামাও প্লিজ।
ইমরানের নরম কন্ঠ শুনে মেয়েটা আরও ফুপিয়ে উঠে।অতঃপর নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে ভেজা কন্ঠে বলতে থাকে,
–আপনি কেন আমার কথা শুনেন না?আজ যদি আপনার কিছু হয়ে যেতো, তাহলে আমার কি হতো?আমি নিজের বাপ হারিয়ে একবার এতিম হয়েছি।তারপর আপনাকে মাথার ছাঁদ হিসেবে পেয়েছি। এখন আপনিও চলে গেলে আমি তো বিধবা হয়ে যাব।আবারও ছাঁদ হারা নিঃস্ব হয়ে যাবো।কিভাবে একা একা এই নি*ষ্ঠুর দুনিয়ায় বাঁচবো?
পলি কান্নায় ভেঙে পড়ে।ইমরান মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয়।ইমরান ঘুমিয়ে পড়লেও পলি ঘুমায় নি।এদিকে ওদের রুমে আজ বেশ অনেক রাত পর্যন্ত নাবিলা চৌধুরী ছিলো।তিনি গম্ভীর মানুষ, অন্য নারীদের থেকে বড্ড আলাদা। কখনো অনুভূতি প্রকাশ করে না।তিনি ইফানের এ*ক্সিডেন্টের পর আরও গম্ভীর হয়ে গেছেন।এই যে গতকাল যতটুকু সময় আদরের ছোট ছেলের কাছে ছিলো,ততটুকু সময় এক দৃষ্টিতে ছেলেটাকে দেখে গেছে। তারপর রুম থেকে বেড়িয়ে আসার সময় ছেলের বেন্ডেজ করা কপালে একটা চুমু খায়।আর পলিকে খুব সংক্ষিপ্ত করে বলে,
–ছেলেটার খেয়াল রেখো।
পলি হাঁটুতে মাথা রেখে ঘুমন্ত ইমরানের শান্ত চেহারাটাকে আপন মনে দেখে যাচ্ছে। তখনই রুমে কেউ নক করে।পলি নাক টেনে শাড়ির আচলটা অপর কাঁধে তুলে নিলো।অতঃপর মিহি কন্ঠে বললো,
–দরজা খোলা আছে।ভেতরে আসতে পারেন।
পলির উত্তর পেয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো রোকেয়া বেগম।তিনি সব দিনের মতো আজও শাড়ির উপর হিজাব পড়ে আছেন। আর হাতে তছবি নিয়ে একটা একটা পুঁতি গুনছেন। পলি দাদিকে দেখতে পেয়ে বিছানা থেকে নেমে আসলো।অতঃপর দাদির বাহু ধরে বিছানায় বসালো।দাদি ইমরানের দিকে তাকিয়ে পলিকে বললো,
–কিরে ছোট বউ, আমার নাতিটার শরীর এখন কেমন?
পলি ইমরানের দিকে তাকিয়ে মুখ ভারী করে,নাক টেনে উত্তর করলো,
–ঐ যেমন দেখছেন আরকি।মানুষটার ওপর কয়দিন পর পর ফারা যায়।আল্লাহর রহমতে এখনো সুস্থ আছে এটাই অনেক। কত করে বলি বাবা, কাকাইরা রাজনীতি করুক __আপনি এসব থেকে সরে আসেন।কিন্তু উনি কোনো কথা শুনে না।উনার কথা, “আমি আব্বুর পাশে না থাকলে কে থাকবে?ভাইয়া তো বিজনেসেই বেশি সময় দেয়। আমাকেই উনাদের দেখে রাখতে হবে।”
সারারাত কান্না করার ফলে মেয়েটার গলা বসে গেছে। পলির কথা শুনে দাদিরও চেহারাটা দুঃখে ছেয়ে গেছে।দাদি পলিকে বললো,
–থাক বোইন আর কাঁদিস না।সব আল্লাহর লীলাখেলা।মাবুদ ভালো মানুষেরই পরীক্ষা নেয় বেশি করে।ধৈর্য ধরে থাক।আল্লাহর ইবাদত কর।মোনাজাতে পড়ে কাঁদবি, দেখবি আল্লাহ সব মুশকিল আসান করে দিবে।
পলি আর দাদির কথোপকথনের মধ্যেই ইমরানের ঘুম ভেঙে যায়।সে চোখ খুলে তাকাতেই দেখতে পেলো দাদি তার পাশে বসে আছে।ইমরান উঠতে নিলে মাথায় ব্যথা অনুভব হয়।পলি গিয়ে ধরে আবারো শুইয়ে দিতে দিতে বললো,
–আপনি উঠবেন না।আপনার শরীর এখনো দুর্বল।
ইমরান পলির হাতটা ধরে মৃদু হেসে বললো,
–সারারাত বউ সেবা খেয়ে আমি চাঙ্গা হয়ে গেছি।
দাদি হেসে বললো,”তর বউ আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে,না হলে এই বউয়ের সেবা খেয়ে এখন দৌড়াতি।” দাদির কথা শুনে ইমরান হাসলো,”এত সকলে আমাকে দেখতে এলে নাকি।তোমাকে তো এখন আর রুমের বাহিরে পাওয়ায় যায় না।নাকি বড় জামাই নাই বলে দুঃখ পালন করছ?”
ইমরানের কথায় দাদির মনে পড়ে গেলো ইফান আর আমার কথা।দাদি পলিকে জিজ্ঞেস করলো,আমি কবে বাপের বাড়ি থেকে চৌধুরী বাড়িতে আসবো?পলি বললো ওর সাথে আমার কথা হয়েছে। তবে ফিরবো সেটা জানায়নি।পলির কথা শুনে দাদি আর কিছু বললো না।তারপর কিছুটা সময় ইমরানের সাথে কথাবার্তা বলে পলির রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
★শেখ বাড়ি,,,,,
সকাল হতে না হতেই ইফানের লোকেরা নতুন খাট নিয়ে হাজির।আমি ভোরেই রুম থেকে বেড়িয়ে জুইদের রুমে চলে এসেছি।আজ আর শাড়ি পড়িনি। বহুদিন পর সেলোয়ার-কামিজ পড়েছি।আর ওড়নাটা ভালোভাবে মাথায় পেচিয়ে নিয়েছি।গলায় অনেক দাগ সৃষ্টি হয়েছে।যা কেউ দেখলে আমার জন্য অস্বস্তিকর।আমি কিছুক্ষণ আগে জানতে পারলাম ইমরান আহত হয়েছে।পলি আমাকে কল করে খবরটা দিলো।ইমরানের জন্য একটু খারাপও লাগছে।ছেলেটা বড্ড চঞ্চল প্রকৃতির।মানুষের সাথে খুব তাড়াতাড়ি মিশে যাই।আমি আর ভাবলাম না।এবার নিচে গিয়ে আম্মু’দের একটু সাহায্য করলে তাদের কাজ আরেকটু সহজ হবে।আমি রুম থেকে বের হতে নিলেই পিছন থেকে ইতির কন্ঠ ভেসে আসে,
–বড় ভাবি, চল আজ আমরা চলে যাই। আমার ছোট ভাইয়ার জন্য মন কেমন করছে।
আমি পিছনে তাকাতেই দেখলাম ইতির চোখ দুটো জলে টইটম্বুর। বিছানার এক কোণায় চুপ করে বসে আছে।তার পাশে নোহা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমি ইতির কাছে গিয়ে ওর গালটা টেনে দিলাম। অতঃপর হেসে বললাম,
–তোমার ভাইয়া ঠিক আছে।এত চিন্তা করার কিছু নেই।আর তবুও যদি চলে যেতে মন চায় তাহলে তোমার বড় ভাইকে গিয়ে বল নিয়ে যেতে।আমি আপাতত ঢাকা ফিরছি না।আমার ভার্সিটি আবার খোলা হলে এখানে আরেকবার কবে আসবো সেটা ধারণা করতে পারছি না। তাই আরও কিছু দিন এখানে থাকবো।
–তুমি না থাকলে আমার ভালো লাগে না তো।আর এখানোও তো থাকা যাবে না। পরীক্ষার তারিখও এগিয়ে এসেছে।
ইতি মুখ গোমড়া করে বললো।আমি বাচ্চা মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,
–এটাও ঠিক।আগে পড়াশোনা পরে বাকি কাজ। তোমাদের পরীক্ষা তো খুব কাছেই চলে এসেছে।আর বেড়ানো লাগবে না।পরীক্ষা দাও ভালো করে। পরে না হয় আবার এখানে বেড়াতে আসবে।জুই তো এখানে আছেই।
আমাদের কথার মাঝেই রুমে জুই আসলো।জুইয়ের হাতে নাস্তার ট্রে।সে টেবিলের উপর ট্রেটা রেখে বললো,
–ইতি চল আমরা পড়তে পড়তে ব্রেকফাস্ট সেরে নিই।
আমি বিষয়টা পছন্দ করলাম না।পড়তে পড়তে আবার কিসের খাওয়া।আমি জুইকে নাকচ করে বললাম,
–তুই রুমে খা।ইতি তুমি নিচে চল।
–এখানেই খাই না জুইয়ের সাথে। অনেক মজা হবে।আর জুইও আমাকে পড়ার অনেক টপিক বুঝিয়ে দিবে।
আমি আর কিছু বললাম না ইতি কে।আমি ওদের কে একা রেখে নিচে আসলাম।ইফানের লোকেরা রুমে আমাদের খাট সেটিং করে দিচ্ছে। আর ইফান ড্রয়িং রুমে বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে।সে আব্বুর হাতের নিউজ পেপার কেড়ে নিয়ে তা নিজের চোখের সামনে ধরে রেখেছে। এমন ভাব ধরছে যেন নিউজ পড়ায় খুব মনযোগী।বড় আব্বু ছুপছুপ বসে চা খাচ্ছে।আর আব্বু চা হাতে নিয়ে বসে আছে।কিছুক্ষণ পরপর মেয়ের জামাই নামক অসভ্য লোকটাকে আড় চোখে দেখে নিচ্ছে। ইফান আর আব্বু পাশাপাশি বসে আছে।মূলত আব্বুই আগে বসে নিউজ পেপার পড়ছিল।আর ইফান আচমকা এসে নিউজ পেপার টান মেরে নিয়ে আব্বুর পাশে ঘেঁষে বসে পড়ে।আমি ইফানের কর্মকান্ড চোখ ছোট করে দেখছি।ইফানের হঠাৎ চোখ আটকায় আমার দিকে।মূহুর্তেই যেন ইফানের নেশা লেগে যায়।বিয়ের পর থেকে আমাকে শাড়ি পড়েই দেখেছে আজ হঠাৎ কালো সেলোয়ার-কামিজে দেখে অনেক অবাক হয়েছে।ইফান আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিলো।আমি ইফানের এমন বেহায়া চাউনি দেখে দাঁতে দাঁত পিষে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলাম।ইফান আমার যাওয়া দেখতে দেখতে আব্বুকে ফিসফিস করে বললো,
–সেই এক আগুনের মতো সুন্দরী পয়দা করেছিস ভাই।
ইফানের কথায় আব্বু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,”আমি তোমার শ্বশুর হই।” আব্বুর কথায় ইফান চোখ আব্বুর দিকে ঘুরালো। তারপর ভাবুক চেহারা করে বললো,
–ঠিকই তো বলেছেন।নাহ্,এই সুন্দরী কে পয়দা করার জন্য হলেও আপনাকে এক পেকেট আকিজ বিড়ি উপহার দিতে হচ্ছে।
আব্বুর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে আসলো।তিনি রাগে রিরি করতে করতে বললো,
–অসভ্য ছেলে, ভদ্রতার কোনো ছিটে ফোটায় নেই তোমার মধ্যে।
আব্বু আর বসলো না।সোজা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো।ইফান আব্বুর রাগ দেখে চোখমুখ উল্টে বললো,
–যা বাবা শ্বশুর আব্বাও দেখছি আমার বউয়ের মতো ভং ধরা শুরু করেছে।
নিজের কথা বলতেই নজরে পড়লো বড় আব্বুর দিকে।তিনি ভদ্রতার খাতিরে মৃদু হেসে স্থান ত্যাগ করলো।এতে ইফান নাক ছিটকালো।তখনই ইনান এসে মোবাইলে কিছু একটা দেখালো।ইফান মূহুর্তেই নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখা সত্তায় বেরিয়ে আসলো।তার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে।ইফান ইনানের উদ্দেশ্যে বললো,
–তাহলে শা*লা আব্দুইল্লা উপরে টপকে গেছে। ভালোই হয়েছে রে।শালা সব মাইয়া একাই খেয়ে দিচ্ছিল।এদিকে তরুণ যুবকরা বেডি হীনতায় ভুগছে।এবার এই প্রতিবন্ধী গুলোও একটু খাওয়ার সুযোগ পাবে।
ইনান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,”জি ভাই ঐ প্রতিবন্ধীর কাতারে আমিও ছিলাম।এবার মনে হয় ভাগ্য খুলবে।” ইফান শয়তানি হেসে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে ঠেলতে ইনানকে কিছু বলতে যাবে তখনই চোখ পড়ে জিতু ভাইয়ার দিকে। তিনি ফর্মাল ড্রেসআপে পরিপাটি হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। ইফানের সাথে জিতু ভাইয়ার চোখাচোখি হলো।ইফান বাঁকা হেসে ইনানকে জিতু ভাইয়ার দিকে ইশারা করে বললো,
–তুই একা নারে পাগলা।আমার শালাও প্রতিবন্ধীর কাতারে আছে।
ইফানের এসব কথায় জিতু ভাইয়ার চোখ সরু হয়ে আসলো।তিনি ইফানকে জহরি চোখে দেখে চলে যেতে নিলে, পিছন থেকে ইফান বলে,
–মান্নার মতো ভাব দেখিয়ে জীবনে কি করলি?এখনো তো কারো কোনো বালই ছিঁড়তে পারলি না।
ইফানের খুঁচা মারা কথা জিতু ভাইয়ার কান অব্ধি যেতেই পা থেমে গেলো।অতঃপর তিনি পিছনে ফিরে পকেটে দু’হাত গুঁজে ইফানকে দেখে তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো,
–বাল ছিঁড়লে আবার গজানোর সম্ভাবনা থাকে।আর আমি ছিঁড়ে সেই চান্স টুকু দিবো না।তাই একেবারে আ*গুন লাগিয়ে আগা থেকে গুড়ি সবটাই ধ্বং*স করে দিব।
জিতু ভাইয়া নিজের কথা শেষ করে নিঃশব্দে বাঁকা হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো।ইফানও বাঁকা হেসে ব্রু নাচালো।অতঃপর উপরে যেতে যেতে ইনানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
–সব রেডি রাখ আজই ঢাকা ফিরছি।
রান্নাঘরে আম্মু আর বড় আম্মু রান্না করছে।এত আয়োজন সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিল দুজনে।তাই রাকিব ভাইয়ের আম্মাও এসেছে তাদের সাহায্য করতে।রাকিব ভাইয়ের আম্মা__মদিনা চাচি মশলা কুটছে।বড় আম্মু কাটা-বাছা করছে।আমি আর আম্মু দুজনে দুই চুলায়, দুই রকম আইটেম রান্না করছি।আম্মু মাংস কষিয়ে সিদ্ধ হওয়ার জন্য পরিমাণ মত পানি ঢেলে পেন ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলো।আমি মাছের ভাজি গুলো উল্টে দিচ্ছি।আম্মু শাড়ির আচলে হাত মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বললো,
–জাহান কি বলেছিলাম মনে আছে?
আম্মুর হঠাৎ এহেন কথা মাথায় ঢুকলো না।আমি আরেকটা পিস উল্টে আম্মুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম,
–কি বলেছিলে?
আমার কথায় আম্মু চোখ সুরু করে ফেললো।অতঃপর আমার পাশে আরেকটু চেপে ফিসফিস করে বললো,
–চৌধুরী বাড়িতে যাওয়ার সময় আমি তোকে একটা কাজ দিয়েছিলাম।করেছিস,নাকি ভুলে গেছিস?
আম্মুর কথা শুনে এবার মাথায় আসলে কিসের কথা বলছে।আমি আবার রান্নায় মনযোগ দিয়ে ভাবুক চিত্তে বললাম,
–সবই মনে আছে।শুধু একটু সময় দাও আমায়।যত তাড়াহুড়ো করতে চাইছি,ততই সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যতটুকু অংক কষেছি ততটুকুও ঘেটে যাচ্ছে। তাই এবার আর মাথা গরম করবো না।এই শেষবার আমি আবারও চৌধুরী বাড়িতে ফিরে যাব।আমার উপর ভরসা রাখ।
ঘড়ির কাটা বিকাল তিনটার ঘরে।দুপুরে পুরুষদের খাওয়ানোর পর আমাদের খেতে বসতে আড়াইটা বেজে গেছে।তারপর রান্নাঘরে আম্মুদের সাথে একটু গল্প করলাম।সারাদিন এত ব্যস্ততার মধ্যে খেয়ালই হয়নি আজ সারাদিন জিয়াদ বাড়িতেই ছিলো।তাই ছেলেটার সাথে কথা বলতে আসলাম।
রুমে ঢুকেই দেখি জিয়াদ বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।গতকাল রাতে রুম যেমন দেখে গিয়েছিলাম। আজ তার আরও অধপতন হয়েছে।সব কিছু এলোমেলো অগোছালো। আমি তপ্ত শ্বাস ছাড়তেই চোখে পড়লো বিছানার এক কোণে পড়ে থাকা আমার পুড়ানো গিটার’টার উপর।মূহুর্তেই বুকের ভিতর কেঁপে উঠলো।হঠাৎই শ্বাস ফেলা বড় দায় হয়ে উঠেছে।এটা তো সেই গিটার, যা আমাকে জায়ান ভাই কিনে দিয়েছিলো।এটা এখানে কি করছে?আমি তো খুব যত্ন করে জায়ান ভাইয়ের রুমে রেখে দিয়েছিলাম। আমি ভাবতে ভাবতে জিয়াদের কাছে গিয়া বসলাম।তারপর ছেলেটার এলোমেলো চুল গুলোতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম।জিয়াদ কিছু বললোও না,আর কোনো নাড়াচাড়াও করলো না।আমি আস্তে করে ডাক দিলাম,
–ভাই,এই ভাই, তুই ঘুমাচ্ছিস?
জিয়াদের থেকে উত্তর আসলো না।আমি ধরে নিলাম ছেলেটা ঘুমাচ্ছে। তাই উঠে যেতে নিলে জিয়াদ আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লো।আমি আশ্চর্য হলাম!হঠাৎ এটা কি হয়ে গেলো?ছেলেটা কাঁদছে কেন?আমি জিয়াদকে সান্তনা দিতে লাগলাম,
–কি হয়েছে তোর ভাই? তুই তো এমন ছিলি না।তাহলে হঠাৎ এত পরিবর্তন কেন তোর মাঝে? আমাকে বল তোর কি হয়েছে?
জিয়াদ আমাকে ছেড়ে আবার উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো।অতঃপর ভেজা ব্যথাতুর কন্ঠে বললো,
–তোমায় বললে যদি কষ্ট কমে যেত,তাহলে সত্যিই তোমাকে বলতাম।কিন্তু এমনটা তো হবে না। তাই কিছু কথা আড়াল থাকায় শ্রেয়।
আমি আরও কিছুক্ষণ বুঝালাম। কিন্তু কোনো কাজ হলো না।তখনই রুমে ইতি ছুটে এসে বলতে লাগলো,
–ভাবি ভাইয়া ডাকছে তাড়াতাড়ি যাও।
–কেন ডাকছে?
–আমাকে বলছে তোমাকে ডেকে দিতে। আর কিছু জানি না।
ইতি নিজের কথা শেষ করে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।আমি সেদিকে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে ভাবলাম কি আবার হলো!অতঃপর জিয়াদকে বলে নিজের রুমের উদ্দেশ্য যাওয়া ধরলাম।
আমি রুমে আসতেই দেখি ইফান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।একদম নতুন প্যান্ট-শার্ট, ব্লেজার পড়ে পরিপাটি হয়ে। সে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে দেখতে বেড়ে উঠা চুলগুলো তে ব্রেক ব্রাশ করছে।অতঃপর হাত ঘড়িটা ঠিকটাক করে,সারা বডিতে পারফিউম মেখে নিলো।আমি বড় বড় পা ফেলে ওর কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম,
–কি সমস্যা ডেকেছেন কেন?
আমার কন্ঠ শুনে নিজের কাজ থামালো ইফান।অতঃপর শেষবারের মতো মিররে নিজেকে দেখে, আমার দিকে তাকালো।আমি একটা ব্রু উঁচিয়ে তার দিকে তাকিয়ে।ইফান গলার টাই’টা হালকা ঢিলে করে মাদকীয় কন্ঠে বললো,
–মন কোথায় পড়ে থাকে বুলবুলি?ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া, আমি তোমার জন্য কতক্ষণ ধরে ওয়েট করছি?
–সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি কেন?
ইফান দুই আঙ্গুল দিয়ে আমার থুতনি ধরে, মুখটা উপরে তুললো।অতঃপর তার ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখিয়ে,আমার উপর হালকা ঝুঁকে হাস্কি স্বরে বললো,
–কেন আবার কি?জামাই রেডি হলে বউকে শার্টের বোতাম লাগিয়ে দিতে হয় জান না?
আমি ইফানের হাতটা সরিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বললাম,
–ফাইজলামি না করে আসল কথ বলেন।চলে যাচ্ছেন কি?দেখেতো তাই মনে হচ্ছে। যাইহোক ভালো করছেন।অন্যের বাড়িতে পড়ে থাকা ভালো ব্যপার না।
আমার কথা শুনে ইফান কপাল কুঁচকে ”হিশশশ” আওয়াজ করে থামিয়ে দিলো।অতঃপর আমার গালে হালকা থাপড়ে বললো,
–দিনদিন সব সাইজই তো বেড়েছে!তাহলে ঘিলুটা বাড়ছে না কেন বুলবুলি?
আমি দাঁত কটমট করে কোনো কিছু না বলেই চলে যেতে নিলে__ইফান আমার হাত ধরে ফেলে। আমি চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই ছেড়ে দিলো।অতঃপর বিছানার দিকে ইশারা করলো।আমি ইফানকে সুক্ষ্ম নজরে পরক করে সেদিকে তাকালাম।বিশাল বড় বিছানার উপর সবটা জুড়ে নতুন সেলোয়ার-কামিজ আর শাড়ি রাখা।আমি কিছুটা অবাক হলাম। তারপর ইফানের দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকাতেই ইফান বাঁকা হাসলো।ইফান আমার ঠোঁটে হালকা চুমু খেয়ে বললো,
–রেডি হয়ে যাও, জান।
আমি কপাল কুঞ্চিত করে অতন্ত্য বিরক্তি নিয়ে বললাম,
–রেডি হব মানে?
–সারাজীবন কি বাপের বাড়িতে পড়ে থাকবে? নাকি শ্বশুর বাড়িতেও যাবে কোনটা?
আমি ইফানের থেকে চোখ সরিয়ে তিক্ততার সাথে উত্তর করলাম,
–আমি যখন এখানে এসেছি একা,তাহলে নিশ্চয়ই একাই যাব!তাহলে আপনার সাথে যাব কেন?
ইফান চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে থাকে।হয়তো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।কয়েক মূহুর্ত যেতেই ইফান চোখ খুলে আমার দু’গালে হাত রেখে হাস্কি স্বরে বললো,
–রেডি হয়ে যাও জান,যেতে হবে।
আমিও নিজের কথায় অটুট থেকে বললাম,
–আমি এখন যাব না,আমর একটা কাজ আছে,,,
–হিশশশ,,,,
ইফান আমাকে থামিয়ে দিলো।মূহুর্তেই সে নিজের রাগ প্রকাশ করে বসলে আমার দু’গাল একহাতে চেপে ধরে।ইফান এতক্ষণ দেখানো সকল নমনীয়তা দূরে ঠেলে দিয়ে__চোয়াল শক্ত করে আমাকে হিসহিসিয়ে বললো,
–সেই কাজটাই তো করতে দিতে চাইছিনা, বুঝনা?
আমি ওর শক্ত থাবা থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলালম,
–আমি কোন কাজের কথা বলছি, তুমি কিভাবে বুঝলে?
ইফানের ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠলো সেই চিরচেনা পৈশাচিক হাসির রেখা।সে সেভাবেই ক্রুর হেসে উত্তর করলো,
–আই গেট ইট অল,মাই ডিয়ার ফা*কিং বুলবুলি।
–আমি যাব না।কি করবে তুমি?
ইফান আমার দিকে আরেকটু ঝুঁকে পড়লো।আমার গালে রাখা হাতটা আস্তে আস্তে চুল ভেদ করে পিছনে নিয়ে আচমকা ঘার শক্ত করে ধরে তার কাছে টেনে নিলো।আগের ন্যায় হিসহিসিয়ে বললো,
–যেতে না চাইলে কাঁধে তুলে নিয়ে যাব।আমাকে তো চেনই, শালা এক বা*লের মুড__যখনতখন বিগরে যায়।আমি নিজের রাগের উপর আতংকিত! না জানি কখন তোমার গায়ে হাত তুলে বসি।আমায় রাগিও না জান।মেজাজটা এমনিতেই বিগড়ে আছে।
আজ আমি বেশ অবাক হচ্ছি ইফানের কথায়।সবই তো আজ ঠিকটাক ছিলো!! তাহলে হঠাৎ লোকটা গিরগিটির মতো রং বদলাচ্ছে কেন?আমি তবুও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়চড় হলাম না।আমি আবার শক্ত গলায় উত্তর করলাম,
–কতবার বলতে হবে তোমায়, ভয় জিনিস টা আমাকে দেখাতে এসো না।আমি কোনো কিছুকে ভয় পাই না।আর হঠাৎ আসল রুপে চলে আসার কারণ কি?
ইফান হাসলো।অতঃপর ঘার বাকিয়ে, সেখানে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
–আমি আবার নকল রুপেই কবে ছিলাম?আমার তো রুপ একটাই। অন্তত তোমার মতো দুমুখী সাপ নয়।যাও বউ রেডি হয়ে নাও।আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, এভাবে মাথায় উড়না পেছিয়ে রেখেছ যে দেখেই তোমাকে, আমার লেডি ফিল আসছে।
ইফান আমার চুপ করে থাকা দেখে, আমার ঠোঁটে পুনরায় তার সিগারেটে পোড়া খসখসে ঠোঁট দুটো ছুঁয়াল।অতঃপর আবারও হাস্কি স্বরে বললো,
–যাও সোনা রেডি হয়ে নাও।
আমি শীতল নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে বেশ খানিকটা সময় ভাবলাম।অতঃপর ঠোঁট বাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললাম,
–নিজের ধ্বংসকে আলিঙ্গন করার জন্য তোমাকে ওয়েলকাম ইফান চৌধুরী।
ইফান মাথা নাড়িয়ে হেসে হিসহিসিয়ে বললো,
–তোমাকে আলিঙ্গন করে আমি বারবার ধ্বংস হতে প্রস্তুত।বাট আমি বেঁচে থাকতে আমার জিনিস কে কারো হতে দিবো না। আই রিপিট তোমাকে আমি কারো হতে দিব না।পৃথিবীর সব কিছু সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও ইউ আর জাস্ট মাইন।অনলি মাইন।
ইতির ব্যাগ গোছানো শেষ।সে জুইয়ের সাথে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে।এক দু’দিনে জুইয়ের সাথে ভালোই বন্ধুত্ব হয়ে গেছে ইতির।বান্ধবী চলে যাচ্ছে দেখে জুইয়ের মনটাও খারাপ। অন্য দিকে নোহা নাকে টিস্যু গুঁজে নিজের ছোট্ট ব্যাগে যা ছিলো তা সব ইতির ব্যাগে ঢুকচ্ছে।ইতি নিজের দুঃখ সাইডে রেখে নোহাকে প্রশ্ন করলো,
–ও নোহাপু তোমার ব্যাগতো এখন খালি হয়ে গেছে। সবকিছুই তো আমার ব্যাগে ভরে নিয়েছ!!
নোহা ইতির ছোট ব্যাগে ভালোভাবে সব চেপে চেপে ব্যাগের চেইন লাগিয়ে বললো,
–আর বলো না লিটিল গার্ল, আমার ব্যাগে এখনো ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস রাখার আছে।তোমরা একটু ওয়েট কর আমি আসছি।
নোহা দৌড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলে।পেছনে ইতি আর জুই একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখাচোখি করে নিলো।দুজনেই বুঝতে পারছে না নোহার মতি গতি কি?
নোহা এক ছুটে জিতু ভাইয়ার রুমে এসেছে।আসেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে টুক করে ঢুকে পড়েছে।তারপর কাভার্ড ঘেটে ভাইয়ার ইউজ করা কয়েকটা টিশার্ট আর কয়েকটি আন্ডার প্যান্ট টুকটুক করে নিজের ছোট্ট ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলো।অতঃপর এক ছুটে রুম থেকে বেড়তে নিলেই কোনো শক্তপোক্ত বস্তুর সাথে সজোরে ধাক্কা খায়।নোহার হালকা শরীরে তার তাল সামলাতে না পেরে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লো।তারপর হাত পা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা সামনে তাকাতেই চোখ কপালে। দানবের মতো দেহের জিতু ভাইয়া নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুই অব্ধি তুলছে।ভয়ে নোহা একটা ঢুক গিললো।জিতু ভইয়া চোখমুখ শক্ত করে এক পা এক পা করে নোহার দিকে এগোতে লাগলো।নোহাও সমান তালে পিছিয়ে যাচ্ছে।নোহা পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে আটকালো। জিতু ভাইয়া নোহার সামনে এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বললো,
–আমার রুমে আসার পারমিশন কে দিয়েছে?
নোহা ভয়ে কাঁপতে লাগলো।গত রাতের চর খাওয়ার পর থেকে জিতু ভাইয়াকে বাঘের মতো ভয় পেতে আরম্ভ করেছে।জিতু ভাইয়া ভয়ার্ত নোহাকে উপর নিচ একবার চেয়ে নাক ছিটকালো।কারণ নোহা একটা শর্ট প্যান্ট আরেকটা টপ পড়ে আছে।জিতু ভাইয়া আরেক হাত দূরে সরে গিয়ে কঠোর স্বরে বললো,
–আমি যাতে তোমাকে আমার আসেপাশে না দেখি।তোমাকে দেখলে অনেক গিল্টি ফিল হয়।আই থিংক ইউ নো দ্যা রিজন ভেরি ওয়ল।
নোহা এতক্ষণ জিতু ভাইয়াকে ভয় পেলেও এখন আর পাচ্ছে না। তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।নোহার মনে আজ বড্ড কষ্ট অনুভব হচ্ছে।তাকে কেউ এতটা ঘৃণা করে?সে নিজের প্রশ্নে নিজেই য*ন্ত্রণা অনুভব করছে।বোকা মেয়েটা ঠোঁট ভেঙে, নাক টানতে টানতে বললো,
–আই উইল বি গুড,,,,,
–গেট আউট অফ হেয়ার।।
বাকি কথা না শুনেই চেঁচিয়ে উঠলো জিতু ভাইয়া।নোহার চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনাজল গড়িয়ে পড়লো।তবুও নোহা নিজের ভেতরে সাহস সঞ্চার করে কিছু বলতে যাবে,তখনই আবার জিতু ভাইয়া চেঁচিয়ে উঠতে নিলেও ব্যর্থ হয়।কারণ একটা রিনরিন মেয়েলি কন্ঠ তাকে থামতে বাধ্য করে।
–আমার নোহাপুকে বকবেন না প্লিজ।
নোহা আর জিতু ভাইয়া দুজনেই দরজার দিকে তাকালো।ইয়েলো কালার গাউন পড়া ইতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। নোহার কষ্টে তার চোখ দু’টোও জলে টইটম্বুর। জিতু ভাইয়া এভাবে ইতিকে দেখে কিছু না বলে বেলকনিতে চলে যায়। ইতি দৌড়ে গিয়ে নোহাকে ঝাপটে ধরে কাঁদু কাঁদু কন্ঠে বলে,
–কেঁদো না আপুন।তুমি কাঁদলে আমার কান্না লাগে অনেক।
–আমি কাঁদছি না তো লিটিল গার্ল।
নোহা নিজের চোখ মুছে ইতির চোখও মুছিয়ে দিলো।অতঃপর বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য সামনে তাকাতেই দেখতে পেল অসহায় চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে জুই।নোহাও বাচ্চাদের মতো চেহারা করে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো।জুই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বললো,
–নিচ থেকে তোমাদের কে ডাকছে।
শেখ বাড়ির সামনে সারি করে এক সাথে নয় দশটার মতো ব্ল্যাক মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে। আসেপাশের প্রতিবেশীরা আড়াল থেকে এদিকে তাকিয়ে দেখছে।তারা তো আমার জামাই নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কেউ আর মনে রাখেনি তিন-চার মাস আগের সেই বিবৎস ঘটনা।ইনান আর আলাল দুলাল ইতি আর নোহাকে নিয়ে একটা গাড়িতে উঠে পরেছে।আম্মু আর বড় আম্মু মুখে আচল ধরে কান্না করছে।আব্বু এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে নির্জীব। হয়তো চোখে স্পষ্ট দৃশ্যমান আদরের কন্যার অন্ধকার ভবিষ্যৎ। বড় আব্বু শেষ বারের মতো গার্ডিয়ানের দায়িত্ব অনুযায়ী ইফানের বাহুতে হাত রেখে বললো আমাকে দেখে রাখতে।বড় আব্বুর সাথে ইফান বাজে ব্যবহার করে নি।বরং প্রথম থেকেই বড় আব্বুকেই একটু মেনে চলেছে।ইফান বড় আব্বুকে আশ্বাস দেয় আমার খেয়াল রাখবে,যত্ন নিবে।
ইফান কোনো একটা বিষয় নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। সেই তখন থেকে কানে ইয়ার প্যাড লাগিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। সাথে এদিকটাও দেখে নিচ্ছে। আমি আজ ইফানের আনা একটা এশ কালার থ্রিপিস পড়েছি।ওড়নাটা সুন্দর করে মাথায় পেচিয়ে পিনআপ করে নিয়েছি।যাতে গলার অ*শ্লীল চিহ্নগুলো আড়ালে থাকে।আমি সবাইকে শেষ বারের মতো বলে বিদায় নিলাম।ইফান আমার আসতে লেইট হচ্ছে দেখে বড্ড বিরক্ত হচ্ছে। সে গাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছে।কপাল কুঞ্চিত করে হাত ঘড়িটায় সময় দেখে আমায় ডাকলো,
–জান হারি আপ।
আমি কয়েক পা হেঁটে গিয়ে আবারও পিছনে ফেলে যাওয়া মানুষগুলোর দিকে তাকালাম। সবাই কত অসহায় নয়নে আমার পানে চেয়ে।সবার মাঝে হঠাৎ চোখ আটকালো দোতলার জিতু ভাইয়ার রুমের বেলকনিতে।সেখানে দাঁড়িয়ে প্যান্টের দু পকেটে দু’হাত গুঁজে জিতু ভাইয়া আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। আমাদের চোখাচোখি হলো।জিতু ভাইয়ার চোখ মুখ খুবই শান্ত দেখাচ্ছে।আমি চোখের ইশারায় দোয়া চাইলাম। তিনি উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন।লোকটা এতটা শক্ত দেখালেও আজ কেন জানি ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে।হয় তো আমার জীবনের অনিশ্চয়তার কথা ভেবেই। জিতু ভাইয়া আমার চোখে চোখ রেখে না বলা কথাগুলো, মনে মনেই উগড়ে দিলো,
❝আমি জানি বনু তুই ভালো নেই।তোর সামনে কি অপেক্ষা করছে তা জানা নেই। তবে এটুকু আমি নিশ্চিত, ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।তোর জন্য অনেক অনেক দোয়া।আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তোর বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করে যাব।ভালো থকিস।বিদায়।❞
আমি জিতু ভাইয়ার থেকে দৃষ্টি সরাতেই চোখ আটকানো ছাঁদে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়াদের উপর।ছেলেটার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে।আর কদিন এখানে থাকলে হয় তো ছেলেটার চেপে রাখা কথাগুলো জানতে পারতাম।জিয়াদ আমাকে চোখের ইশারায় আশ্বাস দিলো।আমি চোখ বন্ধ করে তাকে ভরসা দিলাম।এরই মাঝে ইফানের কন্ঠ কানে আসে,,
–জাহান লেইট হয়ে যাচ্ছে, কাম অন।
আমি আবার শেখ বাড়িতে একবার চোখ বুলাতে লাগলাম।মনটা যন্ত্রণায় খা খা করছে।নিজের মন নিজেকেই জানান দিচ্ছে,
❝হইতো এটাই শেষ আসা।এই অপবিত্র দেহ মন নিয়ে এই বাড়িতে আর কখনো আসা হবে না।❞
কন্ঠ নালী কেমন যেন ভেঙে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার দেখাচ্ছে। সবকিছুর মাঝেও কাঙ্ক্ষিত মুখ ভেসে উঠছে।তাকে খুব করে জানাতে মন চাইছে,
❝আমি কিন্তু আমার হৃদয়ে আপনি ছাড়া আর কাউকে স্থান দেই নি।আপনি আমার প্রথম আর শেষ ভালোবাসা।❞
হঠাৎ কেউ আমার হাত ধরে নিলো।আমি অনুভব করলাম।তবে সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলাম না।ইফান আমার হাত টেনে নিয়ে যাওয়া ধরেছে। আমার এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা এখন ওর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে।তাই তো আর আমার ইচ্ছে জানার আগ্রহ দেখালো না।আর না তো আামকে বুঝার চেষ্টা করছে।সকলে চারপাশ থেকে তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখছে।কেন জানি চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই অন্ধকার দিনটার কথা।আমি অসহায় চোখ শেখ বাড়ির দিকে তাকিয়ে। ইফান আমার হাতে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই আমার দিকে কেউ একজন হাত বাড়িয়ে দিলো।আমি তাকে চিনি।সে আমার দেহ আমার আত্মা। আমি যাকে উজাড় করে ভালোবাসি,সেই পুরুষটা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।আমি তার দিকে অবুঝ শিশুদের মতো তাকিয়ে থাকায় লোকটা মৃদু হাসলো।অতঃপর সেই মাদকীয় পুরুষালী কন্ঠে ডেকে উঠলো,
❝আমার হাতটা ধর পাখি।❞
কেন জানি নেশা ধরে গেলো।পৃথিবীর সকল বাস্তবতা আমাকে যেন ছুঁতে পারছে না আর।আমি সেই বাড়ানো হাতটা ধরতে চাইলাম। তবে পারলাম না। চোখের সামনে উধাও হয়ে গেলো।আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছি না।হঠাৎই বাতাসের সাথে ভেসে আসলো জায়ান ভাইয়ের সেই মিষ্টি কন্ঠ স্বর,
❝চলে যাচ্ছিস পাখি আমার?আর কি হবে না দেখা?তুই কি সত্যিই অন্য কারো হয়ে গেলি।❞
কলিজা ফেটে যাচ্ছে আমার।আমার কানে উনার কথাগুলো বারবার বারি খাচ্ছে। আমার বুক আরও বিষিয়ে যাচ্ছে। আমার মন চিৎকার করে কেঁদে বলে উঠছে,
❝আমি অন্য কারো হইনি জায়ান ভাই। আমার সবটা জুড়ে আপনার বিচরণ।আমার শরীর জ্বলে যায় স্বামী নামক ঘৃ*ণিত লোকটার বন্য স্পর্শে।মনে হয় আমাকে কেউ আগুনে পোড়াচ্ছে।আমি বেঁচে থেকেও মৃত।আমার আত্মা প্রতি মূহুর্ত আপনার সন্ধানে নিয়জিত।আমি এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।আমি তো অপবিত্র হয়ে গেলাম।আপনি কি আর চাইবেন না আমায়?বলুন না জায়ান ভাই।আমি কি আপনার চোখেও অপবিত্র___❞
আবারও কোথা থেকে যেন জায়ান ভাইয়ের কন্ঠ স্বর কানে ভেসে আসছে,
❝আমি কি বলেছিলাম ভুলে গেছিস জানপাখি।আমি তো সবসময় তোর কাছেই আছি।তোর ছোট্ট বুকে।যেখানে আমি ছাড়া আজও কেউ পৌঁছাতে পারে নি।তাহলে তুই অপবিত্র হলি কিভাবে?❞
জাহানারা পর্ব ৪৩
আমি কিছু ভাবতে পারছি না।সবকিছু আমার চেতনার বাহিরে চলে গেছে।আমি বারবার থেমে পড়ছি।ইফান এতে বড্ড বিরক্ত হচ্ছে। সে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আসেপাশে সকলে সেই দৃশ্য মন খোলে দেখছে।অথচ আমি একটা ভ্রমে মগ্ন। চোখের সামনে সব অন্ধকার। শুধু আলোকিত এক শ্যাম বর্ণের চেহারার প্রতিচ্ছবি। যে হাসছে, আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে।আমি পারলাম না তার ডাক ফিরিয়ে দিতে।আবারও হারিয়ে গেলাম এক বিবৎস অন্ধকার অতীতে__
