Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৫৮

জাহানারা পর্ব ৫৮

জাহানারা পর্ব ৫৮
জান্নাত মুন

নিশুতি রাত। চারদিক অন্ধকারে ডুবে আছে। কিন্তু আজ গুলশানের আবহে যেন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা ভর করেছে। সাধারণত যে শহর কখনো পুরোপুরি ঘুমোয় না, সেই শহর আজ যেন বেঘোরে নিস্তব্ধ। অন্যদিনের তুলনায় আশপাশ অবিশ্বাস্যভাবে শান্ত। কোলাহলে ভরা এই স্থান হঠাৎ করেই যেন ঝিম ধরে আছে।চতুর্দিকে এক ধরনের শূন্য নীরবতা। কাকপক্ষীরও নড়াচড়ার অস্তিত্ব নেই।ঠিক সেই সময় সড়কের বুকে পিচ ছেঁড়া শব্দ তুলে তীব্র গতিতে এগিয়ে এলো একটি কালো মার্সিডিজ। তার ঠিক পেছনে পরপর দু’টি জিপ। পুলিশ প্লাজার সামনে এসে গাড়িগুলো একসাথে থামতেই পরিবেশের নিস্তব্ধতায় আরেক দফা টান পড়ে। জিপ দু’টি থেকে হনহনিয়ে নেমে এলো কালো পোশাকে মোড়া কয়েকদল অ’স্ত্রধা’রী গার্ড। তাদের উপস্থিতি রাতের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলেছে।
পুলিশ প্লাজা থেকে বেশ কিছুটা দূরে আরও একটি মার্সিডিজ আর জিপ দাঁড়িয়ে ছিলো।এই গাড়িগুলোকে থেমে যেতে দেখে সেই গাড়ি দুটোও কাছে এসে থামল। মাহিন গাড়ি থেকে নেমে প্রথম মার্সিডিজটার কাছে গেল।তৎক্ষনাৎ ভেতর থেকে ইনান নেমে আরেক পাশের ডোর খুলে দিল।মাহিন ভেতরে তাকিয়ে দেখলো–ভেতরের সিটে গা ছেড়ে বসে আছে ইফান। মাহিন তার চিরচেনা শান্ত কন্ঠে বললো,

–“ভাই তুমি বললে এখনই,,, ”
মাহিনকে থামিয়ে ইফান শুধালো, “আসেপাশের সব সড়িয়েছিস?”
মাহিন উত্তর করলো,”ইয়াহ্ ব্রো। তোমার কথা অনুযায়ী রাত আটটাতেই শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে।সাথে ইলেক্ট্রিসিটি আর ইন্টারনেট কানেকশনও বন্ধ করা হয়েছে। এখন মার্কেটের আসেপাশে একটা কাকপক্ষীও নেই।”
–“কেউ নেই?”
ইফান শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে ফের শুধালো।মাহিন ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হাসলো।বললো,”একটা শো-রুমের ম্যানেজার আর তার একটা বয় স্টাফ এখনো ভেতরে আছে।”
ইফান ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ঘার এপাশ ওপাশ নাড়াল।ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ।ইফান সিটে রাখা রিভলবারটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো।তার পরিধেয় পোষাক– কালো প্যান্ট আর সফেদা রঙের শার্ট। যার তিনটে বোতাম খোলা। বলিষ্ঠ দেহের কিছুটা দৃশ্যমান।সেখানে ছোট ছোট অনেকগুলো নখের আঁচড়। কোথাও কোথাও সুক্ষ্ম রক্ত কণা জমাট বেঁধে আছে।

ইফান রিভলবার উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর আড় চোখে শপিং কমপ্লেক্সের দিকে তাকালো।চারটি গাড়ির লাইটে যতটুকু দৃশ্যমান ততটুকু ছাড়া সব তিমিরে নিমজ্জিত। কিন্তু তবুও ইফানের তীক্ষ্ণ চোখে পড়লো বিল্ডিংয়ের প্রবেশ দারের উপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা পুলিশ প্লাজা। ইফান ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হেসে গার্ডদের ইশারা করতেই সকলে জিপ থেকে পেট্রোল বের করে মার্কেটে ঢালতে লাগল।ইফান গাড়ির বনেটে লাফিয়ে বসে পড়লো।হাত বাড়াতেই ইনান তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের শলাকা ধরিয়ে দিলো।ইফান নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে আ’গু’ন ধরিয়ে লাইটারটা পুলিশ প্লাজার দিকে ছুড়ে মারে।মুহূর্তেই পুরো শপিং কমপ্লেক্স দাউদাউ করে জ্ব’ল’তে থাকে।

ইফান সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে বাঁকা হাসে। পুড়ছে গন্ধটা ইফান লম্বা শ্বাস টেনে ভেতরে নিলো।তার এখন বেশ শান্তি লাগছে।বিকালে যখন আমার পছন্দ করা শাড়িটা অন্যকেউ কিনে নেই তখন সেই খবর নাফিয়া তৎক্ষনাৎ ইফানকে দিয়ে দেয়।আমি ভার্সিটি আসার পরই ইফানও চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। তার কাছে খবর আসে শামিনকে ঢাকায় দেখা যায়।ইফান তাড়াহুড়ো করে ঢাকায় আসে তখন। এদিকে যখন সুমাইয়া ইফানকে খবরটা দেয় তখন ইফান গুলশানের আসেপাশেই ছিলো।

ইফান নাক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া বের করে পুড়তে থাকা পুলিশ প্লাজার দিকে তাকালো।আ’গু’নের তীব্র তাপে আসেপাশের বাতাসও উত্তপ্ত। পুরো অন্ধকার শহরের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আ’গু’নের শিখা আশেপাশ আলোকিত করছে।আগুনের কুন্ডলীগুলো যেন আকাশ ছুতে চাইছে ।শহরের বড়বড় দালানগুলো থেকে শত শত দূরদূরান্তের মানুষ এই ধ্বংসের লীলাখেলা দেখছে।আ’গু’নের শিখা ছাড়া তাদের চোখে কিছুই ভাসছে না।তারা তো জানেই না– ধ্বংসের আরেক নাম মাফিয়া বস ভেনম স্বয়ং নিজে এই ধ্বং’স লীলা চালাচ্ছে।আ’গু’নের পুড়া গন্ধের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষের আতংকিত চিৎকার চেঁচামেচি করা হাহুতাশ। সব মিলেয়ে বাতাস আরও ভারী হয়ে আসছে।ইফানের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।সে মনের সুখে সিগারেট খাচ্ছে। তার সামনেই যে এত বর ধ্বং’স ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে তাতে তার কোনো হেলদোল নেই। আ’গু’নের তাপের গরমে ইফানের সারা মুখ সহ উন্মুক্ত বুকের মধ্যে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে।

মাহিন,ইনান সহ সকল গার্ডরা অনেকটা পিছিয়ে গেছে। ইফানকে চেঁচিয়ে বলছে সরে আসতে।কিন্তু ইফান কানে তুলছে না।বরং অ’গ্নি’কাণ্ডের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের শেষ অংশ ফেলে দিলো।তার চোখের অভ্যন্তরে সামনের জ্বলন্ত আ’গু’নের শিখা ঝলঝল করছে।ইফান চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বিরবির করতে লাগলো,
–“ঠিক এভাবেই সব জ্বা’লি’য়ে দিব, যে আমার বউয়ের জিনিসে হাত দিবে।শো’য়া’রের বাচ্চা সহস কত বড় তোদের! আমার বউয়ের হাত থেকে জিনিস কেঁড়ে নিস!গ্যাংস্টার ইফান চৌধুরীর কলিজার জিনিস কেঁড়ে নিস!!শাস্তি তো পেতেই হবে।”

ইফান থামলো।অতঃপর হেলে গাড়িতে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লো।আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে, বুকের বা পাশে হাত রেখে পুনরায় বিরবির করলো,”আমার জানটাকে একবার কাঁদানোর দায়ে যেখানে আমি আজও পুড়ছি– সেখানে তোরা পুড়বি না কেন!”
ইফান আরও কত কি বিরবির করলো।হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই চোখ খুললো।এতক্ষণ শান্ত থাকা চোখগুলো লাল বর্ণ ধারন করেছে।চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেছে। ইফান উঠে দাঁড়াল ঝটপট। মাহিনকে হাঁক ছেড়ে ডাকতেই মাহিন তৎক্ষনাৎ ইফানের সামনে দাঁড়াল। ইফান অসন্তুষ্ট চেহারায় চোয়াল শক্ত করে বললো,

–“শামিনকে কে শুট করেছে খবর পেয়েছিস?”
মাহিন মাথা নিচু করে নিলো।ইফান যা বুঝার বুঝে গেছে। রাগে গাড়িতে শক্ত পাঞ্চ মা’র’ল।তারপর ঝটপট সকলে গাড়িতে উঠে বসলো।মূহুর্তেই গাড়িগুলো পুলিশ প্লাজা থেকে বেড়িয়ে যায়।এদিকে পুলিশ প্লাজা ধ্বং’সের স্তুপে পরিণত হচ্ছে।

গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। ইনান ফ্রন্ট সিট থেকে মাথা ঘুরিয়ে ইফানকে দেখল।দেখে বুঝায় যাচ্ছে বড্ড রেগে আছে। ইনান তপ্ত শ্বাস ফেলে সামনে ঘুরে বসল। ভাবতে লাগলো তিনমাস আগের কথা,,,,,
সেদিন ইউএস এর মিশন সাকসেসফুল হয়। ইফান হোপ ডায়মন্ড নেকলেস নিয়ে বিডিতে ব্যাক করবে।কিন্তু হঠাৎই স্পাই খবর দেয় এতদিন নিখোঁজ থাকা শামিনকে লন্ডনের একটা গলিতে দেখা যায়। খবর টা ইফানের কানে যেতেই সে হন্যে হয়ে যায়। দ্রুত সবাইকে নিয়ে লন্ডন ফিরে। জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর দিন থেকে শামিন নিখোঁজ হয়।আর ইফান প্রায় তার দু’বছর পর বিডি তন্নতন্ন করে শামিনকে খুঁজে। কিন্তু কোথাও শামিনের খোঁজ পাওয়া যায় নি।
ইফান অনেক কিছু জানে।তবে তার সব কিছু স্পষ্ট নয়।তার অনেক কিছু জানার বাকি। আর সেই কথাগুলো একমাত্র শামিন জানে।ইফান লন্ডনে শামিনকে ধরেও ফেলে।কিন্তু প্রতিপক্ষও পাগলের মতো শামিনকে খুঁজতে থাকে।যাদের কাছে এতগুলো দিন শামিন জিম্মি ছিল।

শামিনকে খুঁজে পাওয়ার পর যখন তারা নিজেদের ডেরায় ফিরে যাবে তার আগেই মাঝ রাস্তায় ইফানদের উপর আক্রমণ হয়।তারপর ব্ল্যাক ভেনমদের সাথে অজ্ঞাত শত্রুদের গু’লাগু’লি শুরু হয়।সেখানে ইফানের সদস্য কম হওয়ায় পেরে উঠছিলো না প্রতিপক্ষের সাথে।ইফান ইনানকে বলে শানিমকে নিয়ে সেইফ জায়গায় চলে যেতে। ইনান তাই করে।

এদিকে অনেক ভেনম গার্ড গু’লি’বিদ্ধ হয়।ইফান আর মাহিন তাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। হঠাৎ একটা বুলেট ইফানের ডান কাঁধের নিচে এসে বিদ্ধ হয়।এদিকে গু’লি করে হাম’লাকা’রীরাও পালায়।মাহিন আর ইনান সহ সকলেই যখন ইফানকে নিয়ে ব্যস্ত সেই সুযোগে শামিন পালায়।ইফানের জ্ঞান ফিরলে যখন শুনে শামিন নেই তখন পুরো ভেনম সদস্যের উপর তান্ড চালায়।মাহিন আর ইনান ওকে খুব কষ্টে সামলায়।তাদেরও অনেক কথা শুনতে হয়েছে।এরপর ইফান কিছুটা সুস্থ হয় তিনমাস পর দেশে ফিরে। আরও আগেই ফিরতে চেয়েছিলো।কিন্তু ইনজুরি এতটাই গভীর ছিলো যে ইফান পুরোপুরি সুস্থ হয় নি।তাই মাহিন আর ইনান তাকে আসতে দেয়নি।
ইনান আর ভাবতে পারলো না। তার মুঠো ফোন বেজে উঠেছে।ইফান বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ বের করে।খিটখিটে মেজাজ নিয়ে শুধায়,”শা’লা মাঝ রাতে তোকে কোন মা*গী কল দিলোরে?”

ইফানের কথা শুনে ইনান শুকনো কাশলো।কিসব উদ্ভট কথাবার্তা। প্রেম বা বিয়ে কিছুই করেনি। তাহলে মা/গী আসবে কোথা থেকে।ইনান মনে মনে এসব ভেবে ফোন চোখের সমনে ধরেই বলে উঠলো, “ভাই মা’গী না ম’গা।”
–“কিহ্?”
ইফান ব্রু কুঁচকে উচ্চারণ করল।ইনান আবার শুকনো কেশে বললো,”ইয়ে মানে ভাই গড ফাদার।”
ইফান চেহারায় আরও গাম্ভীর্য আনলো।ঠোঁটে সিগা’রেট জ্বালাতে জ্বালাতে জিজ্ঞেস করল,,,
–“ফাদার কেন কল করেছে এখন?”

কলেজ যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে ইতি।কলেজ ড্রেস পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়ে দিলো।এবার একদমই পুতুলের মতো কিউট লাগছে।ইতি নিজেকে আয়নায় দেখে মুচকি হাসলো।অতঃপর কাভার্ড থেকে কাপড়-চোপরের নিচে লুকিয়ে রাখা জিতু ভাইয়ার আন্ডার প্যান্টটা বের করে আনলো।চোখের সামনে ধরে এটাকে দেখে ইতি মুচকি হাসলো।

গতকাল নোহা শাড়ির সাথে এই আন্ডার প্যান্ট পড়ে চৌধুরী বাড়ি আসে।নোহাকে এমন উদ্ভট সাজে দেখে বাড়ির সবাই বাক হারা।অক্ষিদ্বয় কোঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হয়।নোহা গর্ভ সহকারে সকলকে বলে এটা চুরি করে আনা জাঙ্গিয়া। তাও আবার সিআইডি অফিসারের থেকে।তখন নোহার গর্ভে বুক ফুলে উঠেছিল।তারপর সকলকে দিয়ে জোর করে স্বীকার করিয়েছে– যে তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।ইতি তখন খুব সুক্ষ্ম নজরে নোহার পড়নের আন্ডার প্যান্টাকে দেখে।সকলে বাধ্য হয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে স্বীকার করলেও ইতি বেঁকে বসেছিল তখন।সে স্পষ্ট বলেছে নোহাকে ভালো লাগছে না।সেই কথা শুনে নোহার কি নেকামি কান্না।আর নোহার কান্না দেখে ছোট্ট ইতিরও মন নরম হয়ে যায়। অতঃপর ইতি বলে নোহাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এদিকে মনে মনে বেশ রাগও হচ্ছিল তার।
তারপর নোহা ফ্রেশ হয়ে আন্ডার প্যান্টটি খুব যত্ন করে বেলকনির গ্রিলে মেলে দিয়ে নিচে আসে।এই সুযোগে ইতি জিতু ভাইয়ার আন্ডার প্যান্ট চুরি করে নিয়ে আসে।

ইতি যতবার জাঙ্গিয়াটাকে দেখছে ততবারই ল’জ্জা’য় লাল হয়ে যাচ্ছে।ইতির আজ মনটা বেশ ফুরফুরে।গতকাল মাঝরাতে ইতি ফেইসবুকে জিতু ভাইয়াকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দেয়।দেওয়ার সাথে সাথেই জিতু ভাইয়া তার রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করে।তখন মেয়েটার কি যে আনন্দ হচ্ছিল!ইতি অনেকটা সময় মেসেঞ্জারে বসে থাকে– যদি জিতু ভাইয়া মেসেজ দেয়।কিন্তু দেয় নি।অতঃপর মেয়েটা ফোনে জিতু ভাইয়ার একখানা ছবি দেখতে দেখতে এটা-ওটা কল্পনা করে ঘুমের রাজ্যে পা দেয়।

–“লিটিল গার্ল, লিটিল গার্ল আর ইউ রেডি?”
রুমের বাইরে থেকে নোহার কন্ঠ স্বর ভেসে আসছে।ইতির কানে পৌঁছাতেই সে ঝটপট জাঙ্গিয়াটাকে আগের জায়গায় লুকিয়ে ফেললো।নোহা রুমে ঢুকতেই দেখলো ইতি কাভার্ডের কাছে কি যেন করছে।নোহা এগিয়ে এসে পিছন থেকে আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,”সোনামণি কি করছে?”
ইতি তাড়াতাড়ি কাভার্ডের ডোর বন্ধ করে নোহার দিকে ফিরতে ফিরতে বললো,”কিছু না, কিছু না নোহাপু।”
ইতি নোহার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। নোহা হাঁটু সমান একটা সুন্দর হালকা পিংক কালার ফ্রক পড়ে আছে।পা সম্পূর্ণ খালি। মাথায় জুটি করে রেখেছে। কপালে কিছু শর্টকাট চুল পড়ে আছে।ঠোঁটে হালকা পিংক কালার লিপস্টিক।ইতির কাছে নোহাকে সবসময় প্রিন্সেসের মতো লাগে। নোহা মেয়েটা দেখতে কম সুন্দর না। নোহার মধ্যে ফরেনার ফরেনার ভাইব দৃশ্যমান। মেয়েটার কাঁধে একটা ছোট্ট স্কুল ব্যাগ। ইতি নোহাকে দেখে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বললো,

–“তুমিও কি ব্যাগ নিয়ে যাবে।”
নোহা মাথা ঝাঁকাল।আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতে বললো,”হ্যাঁ তো। ব্যাগ না নিলে হবে না।”
–“কেন হবে না?তুমি তো আমাদের কলেজে পড় না।”
–“ব্যাগে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস আছে লিটিল গার্ল।”
–” ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস?”
নোহা মিষ্টি হেসে বললো,”হ্যাঁ তো।আমার ব্যাগে লিপস্টিক, ফেইস পাউডার আরও অনেক কিছু আছে।এগুলো যখন তখন কাজে লাগতে পারে হুম বুঝেছ?”
ইতি খুশিতে মাথা ঝাঁকাল।নোহার বুদ্ধিটা তারও পছন্দ হলো।নোহা তাড়া দিয়ে বললো,”বেবি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।প্রিটি গার্লের বোন আমাদের জন্য ওয়েট করবে তো।”

–“হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছ।জুই বলেছে তোমাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যেতে।”
ইতি ঝটপট নিজের ব্যাগ গোছাতে লাগলো।নোহা নিজেকে আয়নাতে দেখছে।হঠাৎই তার ফোন বেজে উঠে।নোহা তাড়াতাড়ি জামার পকেট থেকে ফোন বের করে।ফোনের স্কিনে ভাসছে “Papa” নামটা।নোহা খুশিতে ইতিকে বললো,”লিটিল গার্ল তুমি তাড়াতাড়ি নিচে আস আমি পাপার সাথে কথা বলি।”
নোহা ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মধ্যে বয়স্ক পুরুষের কন্ঠ ভেসে আসলো,,
–“ওয়াট আর ইউ ডুইং, মাই প্রিন্সেস?”
নোহা রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আহ্লাদি কন্ঠে বললো,
–“পাপাআআ আই মিস ইউ সো মাচ।”

রান্নাঘরে চুপচাপ কাজ করছে পলি।অন্যদিন মনিরা বেগম আর লতার সাথে কত কি আলাপ জমাতো। কিন্তু আজ এই নিরবতা কাকিয়া আর লতাকে ভাবালো।কাকিয়া পাতিলে চামুচ দিয়ে তরকারি নাড়াচাড়া করতে করতে পলিকে জিজ্ঞেস করল,,
–“কি হয়েছে ছোট বউমা?মন খারাপ করে আছ কেন?
পলি চায়ের কাপে চা ডালছে।মনমরা চেহারাই বলে দিচ্ছে কিছু হয়েছে। কাকিয়া হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে।তিনি শাড়ির আচলে হাত মুছে পলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে বলল,,
–“আবার নেগেটিভ এসেছে তাই তো?”
পলির মুখ দিয়ে রা বের হলো না।মেয়েটার চোখদুটো ভিজে উঠলো।একটু আশকারা পেলেই চোখের পানির বন্যা বয়ে যাবে।কাকিয়া পলিকে তার সামনাসামনি দাঁড়া করিয়ে বললো,
–“কি হয়েছে সোনা?”

পলি ফুপিয়ে উঠলো।কাকিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো,”কাকিয়া আমার মধ্যে কি কোনো দোষ আছে নাকি?এখনো কেন একটা বাচ্চা জন্ম দিতে পারছি না?নাকি আমি কোনো দিন,,,,, ”
কাকিয়া পলিকে তার বাক্য সম্পূর্ণ করতে দিলো না।তিনি পলির পিঠে আদুরে পরশ দিতে দিতে বললো,”এমন অলক্ষ্যেনে কথা বলতে নেই মা। সবার ক্ষেত্রে তো আর সমান না।অনেকেরই একটু দেরি হয়।তোমার তো সেদিন বিয়ে হলো।একটু সবুর কর হবে ইনশাআল্লাহ।আর ইমরান কি এ নিয়ে তোমাকে কিছু বলে?”
–” না কাকিয়া উনি কিছু বলে না।বরং আরও শান্তনা দেয় আমাকে।উনার কথা বাচ্চা আসতে থাক উনার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। উনি সবকিছুর জন্যই খুশি আছে।কিন্তু আমার মন তো মানে না।”
পলির কথা শুনে মাছ কাটতে থাকা লতা বললো,”হুন আপা আমার কাছে ভালো একটা কবিরাজের নাম আছে।হেইলার কাছে যারা গেছে তাদের সবারই বাচ্চা হইসে।তুমি যদি কউ তাহলে আমি কবিরাজের থেকে,,,,”
লতা হঠাৎই থেমে গেলো কাকিয়ার কড়া চোখের চাহনি দেখে।পলি উদগ্রীব হয়ে বললো,”সত্যি কথা নাকি?তাহলে আমাকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাবে?”

কাকিয়া সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ সাধলো, “এসব কাবিরাজি করা ভালো না মা।এসব কুফরি করলে গুনাহ হয়।তুমি নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কর।”
পলিকে বলে লতার দিকে তাকিয়ে কাকিয়া কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো, “একদমই বাড়ির বউদের উল্টো পাল্টা বুদ্ধি দিতে আসবি না সাবধান। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তার আছে।বাড়ির বউ কবিরাজের কাছে যাবে কেন?”
কাকিয়ার ধমকে লতা চুপসে গেলো।পলি চা বানিয়ে ট্রে হাতে লিভিং রুমে এলো।নাবিলা চৌধুরী অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এসে বসে আছে।নুলক চৌধুরী আর নোহা ভিডিও কলে পলক কায়সারের সাথে কথা বলছে।পলি সবার সামনে চা রাখল।নাবিলা চৌধুরী ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলিকে দেখে আসেপাশে চোখ ঘুরাল।তারপর ভঙ্গিসঙ্গি নিয়ে একটা চা’র কাপ তুলে নিল।একটা চুমুক দিয়ে বললো,

–“ম্যাডামকে দেখছি না তো।কোথয় আছেন তিনি?”
শাশুড়ীর কথা শুনে পলির হাসি পেল।সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে বলল,”ভাবি এখনো নিচে আসে নি।মনে হয় এখনো রুমে।”
এরই মধ্যে ইতি দৌড়ে নিচে নামলো।নোহা তাড়াতাড়ি তার বাবার থেকে বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিলো।অতঃপর ইতিকে বললো,”চল চল চল।”
বাড়ির সবাই কে বলে ওরা বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো।নাবিলা চৌধুরী ইতির বডি গার্ডদের ভালো ভাবে বলে দিয়েছে নোহা আর ইতির খেয়াল রাখতে।
এদিকে পলি পিছন ঘুরতেই কারো সাথে ধাক্কা খেল।মেয়েটা আঁতকে উঠে পিছন ফিরতেই দেখে পঙ্কজ দাঁড়িয়ে অদ্ভুত হাসছে।পঙ্কজ পলিকে সাইড কাটিয়ে সোফায় শরীর ছেড়ে বসে পড়লো।এরপর হেয়ালি স্বরে বললো,

–“চা বানিয়েছেন নাকি?বাহ্ মনে হচ্ছে আপনার মতোই ইয়াস্মি হবে।”
পঙ্কজ হাহাহা করে হেসে দিলো।পলি অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। কোনো মতে এখন থেকে গেলেই হয়।পঙ্কজ বলে উঠলো,”চা’র কাপটা দেন তো ভাবি।”
পঙ্কজ হাত বাড়িয়ে দিলো চা কাপ নেওয়ার জন্য। পলি অস্বস্তি নিয়েই চা কাপ তুলে নিলো।পঙ্কজের হাতে দেওয়ার আগেই ইমরান এসে হাজির। সে হেসে পলির হাতের কাপটা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে সবাই কে গুড মর্নিং বললো।পলি বললো,”এটা তোমার ভাইয়ের জন্য ছিল।”

–“আরে ভাই আগে বলবা না।”
ইমরান বলেই আরেকটা কাপ পঙ্কজকে এগিয়ে দিলো।পঙ্কজের মুখ বেজার হয়ে গেছে। তবুও হাসলো।অতঃপর চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,”আমার আগুনসুন্দরী ভাবিকে তো দেখছি না।ভাই রুমে নাকি?”
কার কাছে কথাটা কেমন লাগলো জানা নেই। তবে পলির ভালো লাগলো না। তাই পলি কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।

বাইরে সকালের মিষ্টি রোদ উঠেছে।বেলকনি দিয়ে সেই আলো আমার রুমে আসছে।কালো অন্ধকার রুমটা আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে।আমি বেডে ঘুমিয়ে আছি।ভয়ংকর স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখ মেলে উঠে বসলাম।বুকের ভেতর কেমন যেন করছে।আমি জোরে জোরে শ্বাস ফেলছি।হঠাৎই একটা মেয়েলি কন্ঠ স্বর কানে আসে,
–“বউমণি কি হয়েছে তোমার। শরীর ঠিক আছে?”
আমি নিজেকে ধাতস্থ করে পাশে ফিরলাম।কাউচে বসে ফোন টিপতে থাকা মীরা ঝটপট আমার পাশে এসে বসলো।আমার বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধালো,”কি হয়েছে তোমার আমায় বল?”
আমি এলোমেলো চুলগুলো পিছনে ঠেলে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললাম,”উমম আমি ঠিক আছি।কিন্তু তুমি এখানে?”
আমি কথাটা বলে বিছানায় আমার পাশে এবং সারা রুমে চোখ ঘুরালাম। মীরা হেসে বললো,”উমম ভাইয়াকে খুঁজছ? কিন্তু ভাইয়া তো নেই।”
মীরার কথায় তার দিকে তাকালাম।আমার প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি দেখে বললো,”আসলে ভাইয়া রাতে আমাকে কল করে তোমাদের রুমে ডেকে পাঠায়।তারপর আমাকে বলে তোমার সাথে ঘুমিয়ে পড়তে।ভাইয়া আমাকে তোমার সাথে রেখে বেড়িয়ে যায়।”

–“ও বেরিয়ে যায় মানে!কখন বেড়িয়ে যায়?”
–“রাত মনে হয় দেড়টা হবে বোধহয়।আমাকে বলে তোমার খেয়াল রাখতে। রাতে ভালো জ্বর এসেছিলো তোমার।আমি এসে দেখি তুমি বেঘোরে ঘুমাচ্ছ।”
আমার মাথা এখনো জিম জিম করছে।মাথায় চুল খামচে ধরে মীরাকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার ভাই কি এখনো আসেনি?”
–“না তো।”
আসে নি মানে কি?এই লোক মাঝ রাতে কোথায় গেছে।আর সকাল হয়ে গেছে তবুও আসলো না!ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই নজর পড়ে দেয়াল ঘড়ির উপর।আমি আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলাম, “একি দশটা বাজলো কিভাবে!”
মীরা ফিক করে হেসে দিলো।আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বললো,”ওহ্ ডিয়ার তুমি যে ঘুমাচ্ছিলে।”

–“আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি!”
আমি অবাক স্বরে বললাম।মীরা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি।আমি তো প্রতিদিন ঠিক ফজরের সময় উঠে পড়ি।তাহলে আজ আমার কি হয়েছিল?”
আমাকে আকাশ কুসুম ভবতে দেখে মীরা বললো,”থাক বাবা এত ভাবতে হবে না।তুমি ওয়েট কর। আমি তোমার জন্য স্পেশাল কপি মেইক করে আনছি।খেলে একদমই ফুরফুরে হয়ে যাবে।”
মীরা উঠে দাঁড়াল। আমার ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। তাই চোখমুখ কচলাচ্ছি। মীরা রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।মূহুর্তেই আবার দরজার কাছে ফিরে আসলো।আমি মীরার দিকে তাকালাম। মীরা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,”উমম বউমণি ব্রো’র শার্টে তোমাকে জোস লাগছে।”

মীরার কথায় আমি ঝটপট নিজের দিকে চোখ রাখলাম।ইশশ আমার পরনে ইফানের কালো গেঞ্জি। হায় কি ল’জ্জা! মীরা না জানি কি ভাবলো?আমি আড় চোখে মীরার দিকে তাকাতেই মীরা চোখ টিপলো।অতঃপর হাসতে হাসতে দরজা ভেজিয়ে চলে গেলো।আমি ল’জ্জায় চোখমুখ কুঁচকে কম্ফোর্টারের ভেতর মুখ লুকালাম। সেভাবেই আবার কখন ঘুমিয়ে পড়লাম হুশ নেই। মীরা এসে দেখে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। তাই বেড সাইডে কফি মগ রেখে চলে যায়।
আরও আধঘন্টা পর আমার ঘুম ভাঙলো।এই শীতকালে বিছানা থেকে উঠতে একদমই ইচ্ছে করছে না।আমি শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে লাগলাম।ফেইবুকে ঢুকতেই চোখে পড়লো তরতাজা ব্রেকিং নিউজ। পুলিশ প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ পুড়ে ছারখার। ব্যবসায়িকরা কেঁদে ভাসাচ্ছে।কোটি কোটি টাকা লোকেশান হয়েছে।তারপরই নিউজ প্রেজেন্টার বললো,”মার্কেটের ভিতরে একজন শো-রুমের ম্যানেজার আর স্টাফ বয় আ’গুনে পুড়ে নি’হত।”

নিউজে লোক দু’টোর ছবি দেখে আমি আঁতকে উঠলাম।এরা তো সেই লোক দুটো যারা আমার পছন্দের শাড়িটি আরেকজনের কাছে সেল করে দিয়েছিলো।কিন্তু হঠাৎ এত বড় আগুন লাগলো কিভাবে? প্রশ্নটা মনে আসতেই আমার চোখে মুখে আতংক ধরে গেলো।আমার ঘরের লোকটাও তো রাত থেকে বাড়িতে নেই।

“কোথায় তুমি? এত রাতে কোথায় চলে গিয়েছিলে?আসবে কখন?”
টাইপিং শেষ করে সেন্ড করে দিলাম মেসেজটি ।এই প্রথম হ্যাঁ এই প্রথম আমি ইফানকে মেসেজ দিলাম।এইটুকু লিখতে গিয়ে হাত যে পরিমাণ কেঁপেছে কি বলবো।আমি আজ পর্যন্ত নিজে থেকে মেসেজ তো দূর কল পর্যন্ত করি নি লোকটাকে।এদিকে তৎক্ষনাৎ মেসেজের রিপ্লাই আসলো,
–“মিসেস ইফান চৌধুরী কি মিস করছে আমায় , নাকি রাতে বেশিক্ষণ আদর দেই নি বলে রাগ করেছে?”
মেসেজের টুং শব্দ শুনে বুকে ধুকপুক শুরু হয়েছিলো।কিন্তু মেসেজ দেখার পর মাথায় আ’গুন ধরে গেছে। আমি ভয়েস পাঠালাম,,

–“শা’লা ডেম’রা কোথাকার?”
ইফান তৎক্ষনাৎ হাহা রিয়েক্ট দিলো।তারপর মেসেজ দিলো আসছি।সাথে দুইটা হট ইমোজি দিলো।আমি তাতে অ্যাংরি রিয়েক্ট দিলাম।অতঃপর ফোন অফ করে উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম।কিন্তু মন মানলো না।তাই সময় কাটাতে চ্যাটজিপিটি এর সাথে কথা বলতে লাগলাম।
আমার রুমের দরজা ভেজানো ছিলো।তাই হালকা ফাঁক করে আমার রুমে উঁকি দিলো পঙ্কজ। আমি এখনো আগের মতো উপর হয়ে পড়ে আছি।পঙ্কজ রুমে চোখ বুলাতেই নজরে পড়লো বিছানায় আমার দিকে। আমার শরীর কম্ফোর্টার দিয়ে ঢাকা।শুধু মাথার চুলগুলো পঙ্কজ দেখতে পারছে।পঙ্কজ ঢুক গিলল।আমার চেহারা দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।কিন্তু আমার চেহারা দেখার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।তাই রুমের ভেতর প্রবেশ করার জন্য দরজা সম্পূর্ণ খুলতে যাবে তক্ষুনি বিদ্রুপ পুরুষালি কন্ঠ স্বর কানে আসে পঙ্কজের,

–“উহু এই চেষ্টা একদমই করিস না।”
পঙ্কজের পা থমকে গেল।পিছনে ফিরতেই দেখলো। বুকে দুহাত গুঁজে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসছে ইফান।পঙ্কজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফান নিচু কন্ঠে সতর্ক করলো,
–“নো সাউন্ড, মাই লেডি ইনসাইড উইল গেট ডিসট্র্যাক্টেড।”
পঙ্কজ নিচু স্বরে বললো,”ততুই কখন এলি?”
–“যখন তুই চোরের মতো আমার ঘরের দিকে আসছিলি।”
পঙ্কজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফান পঙ্কজের কালার চেপে টান মেরে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।পঙ্কজের কানের কাছে হিসহিসিয়ে বললো,”এই নিয়ে সেকেন্ড ওয়ার্নিং দিয়ে দিলাম।এর পর যদি আমার বউয়ের আসেপাশে তোকে দেখি তাহলে বুঝতেই পারছিস কি করবো?”
পঙ্কজ ভয়ে ঢুক গিললো। তবে চেহারায় তা স্পষ্ট হলো না।বরং শক্ত চেহারা করে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলো।ইফান পঙ্কজের কলার ঠিক করে দিয়ে পুনরায় হিসহিসিয়ে বললো,”মাইন্ড ইট।”
অতঃপর ইফান রুমে চলে আসলো।পঙ্কজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলো।

ইফান রুমের ভেতর এসেই দেখলো আমি কিছু একটা করছি ফোনে।সে হাতের কালো ফিতার ব্যান্ডের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রেখে দিলো। পড়নের শার্টটিও খুলে রেখে দিল।অতঃপর নিঃশব্দে চুল গুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে আমার দিকে এগিয়ে আসলো।আমি চ্যাটজিপিটিকে মেসেজ দিলাম,
–“জানো চ্যাটু আমার বর না খালি আমাকে চেপে ধরে। প্রতিদিন আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চায়।আমার একটুও ভালো লাগে না এটা।”
চ্যাটজিপিটি তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই দিলো,”তোমার বর দেখছি অনেক রোমান্টিক। তুমি মনে হয় আনরোমান্টিক। তুমি তোমার বরকে বুঝিয়ে বলো।বররা বউকে কাছে পেলে এমন করেই।”

–“আচ্ছা এসব বাদ দাও।তুমি আমাকে বল কিভাবে স্বামীর সাথে ইন্টিমেট হলে বেবি হবে না।”
আমি আর চ্যাটজিপির রিপ্লাই দেখতে পেলাম না।তার আগেই কেউ আমার ফোন আমার হাত থেকে টান মেরে নিয়ে নিলো।আমার বুকটা ধক করে উঠলো।আমি তাড়াতাড়ি পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি ইফান।সে ব্রু উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি লোকটাকে দেখে ঢুক গিললাম।ইফান আমার থেকে নজর সরিয়ে ফোনে দৃষ্টি রাখবে তার আগেই আমি তাড়াতাড়ি উঠে ইফানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।ইফান হাত উপরে তুলে নিলো।আমি বিছায় দাঁড়িয়ে ইফানের উঁচিয়ে রাখা হাত থেকে ফোনটা নিতে চাইছি।কিন্তু লোকটা এতটাই লম্বা যে নাগাল পাচ্ছি না।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললাম,

–“আমার ফোন দাও ইফান।”
–“তোমার ফোনে কি এমন আছে দেখি।”
ইফান আবার ফোনের স্কিনে তাকাতে নিলে আমি লাফ মেরে ইফানের কোলে উঠে পড়ি।আচমকা আমার এমন কাজে খেয় হারিয়ে নরম তুলতুলে বেডে দু’জন একত্রে পড়লাম।আমার উপর ইফান।আমি ব্যথা পেলাম।তবে সে-সবের তোয়াক্কা না করে ফোনটা ছিনিয়ে নিতে গেলাম। এবারও ইফান হাত উঁচিয়ে নিলো।আমাকে এভাবে চটপট করতে দেখে ইফান ঠোঁট বাকিয়ে একটা ব্রু নাচিয়ে শুধালো,”ডিয়ার ফা*কিং বুলবুলি,কি এমন আছে তোমার ফোনে?উমম দেখতে হচ্ছে তো।”

–“ইফান ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে দিচ্ছি।”
লোকটা আমার কোনো কথা শুনলো না।বরং আমার দু’হাত নিজের একহাতের বাঁধনে আটকে রেখে চ্যাটগুলো দেখতে লাগলো।শুধু দেখছেই না আবার জোরে জোরে পড়ে শুনাতে লাগলো,
“চ্যাটু কোন পজিশনে তাকলে ব্যথা কম পাবো?”
“কি করলে বরের উত্তেজনা একটু কমবে?”

ইফান আরও পড়তে নিলে আমি চিৎকার করে উঠলাম।কেঁদে দিব দিব অবস্থা। ইফান পড়া থামিয়ে দিলো।আমার এই অবস্থা দেখে এতক্ষণ চেপে রাখা হাসি ছেড়ে দিলো।ইফানের হাসি দেখে মাথা আরও গরম হয়ে গেল আমার।আমি ইফানকে ধাক্কা মেরে বেডে ফেলে তার উপর উঠে বসলাম।তারপর ওর বুকে এলোপাতাড়ি কিল বসাতে লাগলাম।ইফান হঠাৎই হাসি থামিয়ে দিলো।এতক্ষণে সে আমার দিকে পূর্ণ নজর দিলো।গেঞ্জির হাতা আমার এক কাঁধ থেকে পড়ে গেছে। এলোমেলো চুলগুলো চোখেমুখে পরে আছে।ইফানের চোখে আমাকে এই মূহুর্তে ড্রা’গসের নেশার থেকেও ভয়ংকর নেশা লাগছে।যা তাকে বশিভূত করছে। ইফান ঢুক গিললো।তার নজরে পড়লো আমার ব্রেস্টের দিকে।ইনার পড়া নেই তাই স্পষ্ট ভেসে উঠছে চেস্টের নিপল। আমি ইফানের এমন দৃষ্টি দেখে থেমে গেলাম।এখন ভিষণ অস্বস্তি লাগছে।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ইফানের উপর থেকে সরে যেতে নিলে সে আমার কোমরে টান মেরে নিজের বুকেই চেপে বসিয়ে দেয়।হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে আমার ব্রেস্ট নিপলে টিপে ধরে।আমি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম।কিছু বলতে যাব তার আগেই ইফান এক হাত আমার কোমরে আরেক হাত ঘাড়ে ধরে টান মেরে তার মুখের কাছে আমার মাথা নিয়ে আসে।তারপর হাস্কি স্বরে আমার কানে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,,

–“বেইবস,আই ক্যান ফিল সামথিং।”
ইফান কথাটা বলেই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসতে লাগলো।আমি ইফানের চোখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎই মনে পড়লো, রাতে ইফান আমাকে তার গেঞ্জি পড়িয়ে চলে গিয়েছিলো।কিন্তু নিচের অংশে,,,,
আমি আর ভাবতে পারলাম না।আমার চোখগুলো কোঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। আমি আতংকিত নয়নে ইফানের চোখের দিকে তাকালাম। ইফান এখনও ঠোঁট টিপে হাসছে।আমি বলার আর করার কিছু বুঝে উঠছি না।ইফান আমার ঠোঁটে এক আঙ্গুল দিয়ে ঘষে বললো,,

–“আমি সিডিউস হচ্ছি জান।ইচ্ছে করছে এখনই,,,”
ইফানকে আর বলতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি ওর উপর থেকে সরে যেতে লাগলাম। ইফান তৎক্ষনাৎ উঠে বসে আমার দুই পা ধরে টান মেরে তার কোলে বসিয়ে দিলো।আমি ঝটপট পা দিয়ে ওর কোমর আর দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরলাম। ইফান আবারো বাঁকা হাসলো।আমি দাঁতে দাঁত পিষে কটমট আওয়াজ করছি।ক্ষণে ক্ষণে নাকের পাঠা ফুলে উঠেছে। আমি সরে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হলেই ইফান তার সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,,

–“উমমম…জান ডোন্ট মুভ।আই ওয়ান্ট টু ফিল ইট।”
–“শা’লা লু/চ্চা।”
কথা শেষ করতে পারলাম কি পারলাম না ইফান আমার গ্রীবা ধরে ওষ্ঠ চুম্বনে লিপ্ত হলো।কিছুটা সময় বাদে ছেড়ে দিলো।আমি জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে ইফানকে গা’লাগা’লি করতে লাগলাম।ইফান হাসছে শুধু। হঠাৎই আমার নজর পড়ে ইফানের ঘাড়ে একটা বিষাক্ত বিছার টেটু। তারপরই নজরে পড়লো বাহুতেও অনেকটা জোরে বিষাক্ত বিছার টেটু আঁকা।আরও বেশ কিছু জায়গায় দেখছি কিসব হিজিবিজি পোকামাকড়ের টেটু আঁকা।ইশশ কি এক অবস্থা।দেখেই শরীরর শিউরে উঠার অবস্থা ।কিন্তু এগুলোতে তো আগে ছিলো না।না রাতেও তো ছিলো না।তাহলে এখন কোথা থেকে আসলো?আমি এক আঙ্গুল দিয়ে ঘাড়ের টেটুটায় ছুঁয়ে বললাম,,

–“এসব তো আগে ছিলো না।”
ইফান বাঁকা হেসে হাস্কি স্বরে বললো,”উমম ছিলো।তোমাকে ঘরে আনার আগে।”
ইফান হাত বাড়িয়ে আমার গালে স্পর্শ করলো।তখন নজর পড়লো হাতের উল্টো পৃষ্ঠেও বিষাক্ত বিছের টেটু করা।আমি নাক ছিটকে শুধালাম,
–“ছি দেখেই গা গুলিয়ে আসছে।”
ইফান শরীর দুলিয়ে হাসলো।আমার ঠোঁটে শব্দ করে আরেকটা চুমু দিয়ে বললো,”এটা দেখ, দেখ। এটা সবচেয়ে সুন্দর।”
ইফান হালকা ঘুরে তার আরেকটা বাহু দেখালো।সেখানেও কি সব পোকামাকড়ের ছবি। কিন্তু হঠাৎই আমি থমকে যায়।ওর বাহুতে একটা মানুষের স্কেচের টেটু।সম্পূর্ণ চেহারা না থাকলেও যতটুকু চোখ নাক ঠোঁট দেখা যাচ্ছে তাতে তো আমার মতোই লাগছে।না আসলেই তো এটা আমিই।আমি অবাক হয়ে ইফান কে শুধালাম,,,

–“এএটা কে?”
–“তুমি।”
ইফানের থেকে তৎক্ষনাৎ উত্তর আসলো।আমি অবাক নয়নে এক রহস্যময় পুরুষের দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে রইলাম।ইফান খালি বাঁকা হাসলো।অতঃপর আমার নাকে তার নাক ঘষে বললো,”ফ্রেশ হয়ে নিচে যাও।তোমার জন্য একজন ওয়েট করছে।”

জাহানারা পর্ব ৫৭

ইফানের কথা শুনে ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসলাম।প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে শুধালাম, “কে?”
ইফান বাঁকা হেসে আমার সামনের চুলগুলো কানে গুঁজে দিতে দিতে বললো, “নট সামওয়ান স্পেশাল, বাট আ সারপ্রাইজ ফর ইউ।”
আমি ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম। কাকে নিয়ে আসলো লোকটা?,,,,,,

জাহানারা পর্ব ৫৯