জাহানারা পর্ব ৫৯
জান্নাত মুন
আমি শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসলাম। শরীরে বেগুনি রঙা ব্লাউজ আর পেটিকোট। কাঁধে সাদা টাউয়াল পেচিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। ভেজা চুলগুলো কোমরে পড়ে আছে।সেখান থেকে টপটপ করে বিন্দু বিন্দু পানি কণা পড়ছে।ড্রেসিং টেবিলের বড় মিররটার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে টাউয়ালটা খুলে চুলে পেচিয়ে নিলাম।তারপর পার্পল কালার সুন্দর একটা শাড়ি পড়তে লাগলাম।কাঁধে আঁচল তোলার সময় আচমকা নজরে পড়ল ইফানকে।সে বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।একটু আগে বাইরে থেকে আসার পর ফ্রেশ না হয়ে শুয়ে পড়েছে।
আমি লোকটার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে চাইলেও পারলাম না।ইফানের পেশিবহুল দেহ আকর্ষন কেঁড়ে নিচ্ছে আমার। হঠাৎ শরীরে হিজিবিজি কি সব টেটু আঁকার ফলে আলাদা রকম লাগছে। দেখতে খারাপ নয় বরং তার জিম করা দেহে বড্ড মানানসই লাগছে। আমি আড় চোখে ইফানকে দেখতে দেখতে শাড়ি পড়া কমপ্লিট করে ফেললাম।অতঃপর চুল মুছতে মুছতে আবারও ইফানের দিকে তাকালান। লোকটা এখনো নড়চড় বিহীন শুয়ে আছে।ঘুমাচ্ছে নাকি?
মনে প্রশ্ন টা উঁকি দিতেই আমি বেডের দিকে এগিয়ে গেলাম।উঁকি দিয়ে দেখলাম লোকটার মুখ বালিশে গুঁজে রাখা। তাই বুঝা যাচ্ছে না।হয়তো ঘুমাচ্ছেই।আমি চলে আসতে নিলেই চোখ পড়লো লোকটার বাহুতে। সেখানে এত হিবিজিবি টেটুর মাঝেও আমার স্কেচটা আলাদা ফুটে উঠেছে। আমি নিঃশব্দে ঝুঁকে নিজের স্কেচটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। আচমকা ঘুম জড়িত পুরুষালি হাস্কি স্বর কানে আসলো,
–“উমম, বেইবস চুরি করে দেখার কিছু নেই। সবই তো তোমার।”
ইফানের কন্ঠ শুনেই চোর ধরা পড়ে যাওয়ার মতো আঁতকে উঠলাম।তাড়াতাড়ি চলে যেতে পা বাড়াতেই পিছন থেকে আমার হাতে টান পড়তেই হুমড়ি খেয়ে ইফানের উন্মুক্ত বুকে পড়লাম। আমি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলাম,
–“আহ্।”
ইফান মৃদু হেসে আমাকে ঝাপটে ধরে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।আমি মাথা তুলে তার দিকে কটমট করে তাকালাম। ইফান আমার কপালে চুমু খেয়ে ঘুম জড়িত হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
–“নাও এখন ইচ্ছে মতো দেখ।”
আমি চোখ উল্টে বললাম,”হাহ্ তোমাকে দেখতে তো আমার বয়েই গেছে।”
ইফান চোখ বন্ধ করতে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে আমার গলায় মুখ ডুবালো।আমি কপালে সুক্ষ্ম ভাজ ফেলে শুধালাম,”কি সমস্যা তোমার?বাইরে থেকে এসেই সটাং হয়ে শুয়ে পড়েছ। যদি না-ই ঘুমাও তাহলে ফ্রেশ হতে যাচ্ছ না কেন?”
–“ঘুম আসবে না এখন।”
ইফানের কথায় চোখদুটো আরও ছোট হয়ে আসল।আমি ইফানের চেহারার দিকে তাকালাম। ইফানও আমার চোখের দিকে তাকাল।লোকটার ফর্সা মুখ ভর্তি খুঁচা খুঁচা দাড়ি।সিগারেটে পোড়া ব্রাউন ঠোঁট। চেহারায় তো সৌন্দর্যের কোনো কমতি নেই। বরং বেটাছেলে হয়েও অত্যাধিক সুদর্শন। আর তার সব সৌন্দর্য যেন লুকিয়ে আছে তার রহস্যময় ধূসর বাদামি চোখের মণি জোড়ায়। কিন্তু সেই চোখ জোড়ায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আমি ইফানকে ভালো করে দেখে প্রশ্ন করলাম,
–“দেখে তো মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমাওনি।কিন্তু কেন?”
–“ড্রা’গ’স নিয়েছি তাই।”
ইফানের সহজ স্বীকারোক্তি। কিন্তু আমার এতক্ষণের নমনীয় চেহারা শক্ত হয়ে আসলো।আমি ইফানের বুকে দু’হাতের ভর রেখে উঠে বসলাম। ক্ষ্যাপাটে স্বরে শুধালাম, “ল’জ্জা করলো না এটা বলতে?”
–“উহু।”
ইফান মাথার নিচে হাত রেখে পুনরায় প্রতিত্তোর করলো। বিষয়টা আমার একটুও ভালো লাগলো না।আমি রাগের বশে বিছানায় জোরে থাপ্পড় বসালাম। দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”কোথায় ছিলে রাতে?ওও আমাকে পোষাচ্ছিল না বুঝি।তাই ক্লাবে লাং ধরতে গিয়েছিলে?”
আমার বাক্যটা ইফানের কানে যেতেই লোকটার এতক্ষণ শীতল থাকা চোখজোড়া ক্রোধে লাল বর্ণ ধারণ করেছে।নিজেকে সংবরন করতে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু ইফানের চুপ থাকাটা আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি ইফানের উপর ঝুঁকে পড়লাম। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আওরালাম এক অশ্রাব্য ভাষা,”আমার থেকে বেটার সার্ভিস দিয়েছে তাই না?”
ইফান তৎক্ষনাৎ চোখ বন্ধ করে নিলো।তার চোয়াল অত্যাধিক শক্ত হয়ে এসেছে। মুষ্টিবদ্ধ হাতও আরও শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু আমি থামলাম না।ওর থেকে উত্তর পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম। তাই আবারও শুধালাম,”কি হলো উত্তর করছ না কেন?নাকি উ,,,,”
–“আমি তোমার গায়ে হাত তুলতে চাইছি না জাহান।রাগিয়ে দিও না আমাকে।”
আমার কথা মাঝ পথেই থেমে যায় ইফানের ভারিক্কি কন্ঠ স্বর শুনে। আমি আজ লক্ষ্য করলাম– লোকটা যখন বেশি মাত্রায় রেগে থাকে তখন আমার নাম ধরে ডাকে।এদিকে ইফানের কথায় অযাচিত রাগে আমার সারা শরীর রিরি করছে। আমি ক্রোধিত নয়নে ইফানের দিকে তাকিয়ে। আমার গনগন শ্বাস-প্রশ্বাস ইফানের কানে বারি খাচ্ছে। আমার থেকে কোনো সারা শব্দ না পেয়ে ইফান চোখ খুললো।আমি বড় বড় চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে। রাগে নাকের পাঠা ফুলে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার ফলে বুক উঠানামা করছে।ইফানের ক্রোধিত নয়ন জোড়া মূহুর্তেই শীতল হয়ে আসল।ইফান হাত বাড়িয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে আমার গালে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে হাস্কি স্বরে বললো,
–“আমি রাতে যেখানে যার সাথেই থাকি না কেন তাতে তোমার কি?”
–“কারণ তুমি আমার স্বা…”
ইফানের কথাটা কানে আসতেই কোনো দিক বিবেচনা না করেই মুখ ফসকে বলতে গিয়েও থেমে পড়লাম। ইফান সুক্ষ্ম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো, “আমি তোমার?”
–“রেপিস্ট,জাস্ট আ রেপিস্ট।”
আমার কথা শুনে ইফান তাচ্ছিল্য করে নিঃশব্দে হেসে বললো,”রাইট, ইউর অ্যাবসলিউটলি রাইট।আ’ম রে’পি’স্ট,জাস্ট ইউর রে’পি’স্ট।”
ইফানের কথাটা আমার কেন জানি সহ্য হচ্ছে না।কেন জানি এই মূহুর্তে গলায় কান্না আঁটকে আসছে।তাই এই জ’ঘ’ন্য লোকটার সামনে আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালাম না।ইফান অনুভূতিহীন নয়নে আমার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল কয়েক মূহুর্ত।অতঃপর আবার বাঁকা হাসলো।তার এই হাসিতে কোনো প্রাণ নেই। ইফান নিজ চোখ দু’টোর উপর হাত রাখলো।অতঃপর বিরবির করতে লাগলো,,
❝তুমি জানতে পারোনি
কত গল্প পুড়ে যায়
তুমি চিনতে পারোনি
আমাকে হায়….❞
ভেজা টাউয়াল দিয়ে ভালোভাবে চুলগুলো পেচিয়ে খোপা করে নিলাম।ভীষণ রাগ হচ্ছে, সাথে শরীর জ্বলছে অজানা ক্রোধে। কেন আমি এই জানোয়ার লোকটার থেকে কৈফিয়ত চাইতে গেলাম?কিই বা দরকার আমার এতসব জেনে?জাহান্নামে যাক তাতে আমার কি!!রাগে গজগজ করতে করতে সিঁড়ি কাছে আসতেই কানে একটা অচেনা মেয়েলি কন্ঠ স্বর আসলো।
–“আন্টি বাসা ঝাঁট দিব?দিই হ্যাঁ দিই।”
কাকিয়া বলছে,”না না তুমি কেন দিবে বাসায় কাজের মেয়ে আছে।”
মেয়েটা বলছে,”তাহলে আন্টি কি কি রান্না করতে হবে প্লিজ আমাকে বলুন না।আমি কোনো কাজ করছি না জানলে স্যার আমাকে আজ মেরেই ফেলবে।কত কষ্ট করে হাতে পায়ে ধরে লাস্ট চান্স পেয়েছি প্লিজ কেউ আমাকে কাজ দাও….”
মেয়েটা হাউমাউ করে কেঁদে সকলের কাছে কাজ চাচ্ছে। আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার দিকে।মেয়েটা আমাকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে তাই ফেইস দেখা যাচ্ছে না।তবে পড়নের থ্রিপিস দেখে মনে হতো হচ্ছে বেশ দামি।মেয়েটার তাহলে ভালোই টাকা পয়সা আছে।তবে এখানে এভাবে কাজ চায়ছে কেন?
আমি মেয়েটির দিকে চেয়ে এসব ভাবছি তখনই কাকিয়ার নজরে পড়ি।কাকিয়া আমাকে দেখেই বলে উঠলো, “বউমা তোমার কাছে কোনো কাজ থাকলে ব,,,”
কাকিয়া বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না।তার আগেই মেয়েটা পিছনে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে চেচিয়ে উঠলো, “ম্যাডাআআআম।”
মেয়েটা ঝড়ের বেগে দৌড়ে সিঁড়ির কাছে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরলো।কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,”ম্যাডাম আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনাকে সেদিন চিনতে পারি নি।আমি জানতাম না আপনার শাড়িটি অনেক পছন্দ হয়েছিল….”
আমি আশ্চর্য হলাম এই মেয়েটাকে দেখে।এই মেয়ে এখানে কি করছে?এসব ভাবনা সাইডে রেখে মেয়েটাকে টেনে আমার সামনে দাঁড় করালাম। আমি মেয়েটার এমন নাজেহাল চেহারা দেখে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,”ও মাই গড!তোমার গালে কিসের দাগ?এমন লাল টকটকে হয়ে ফুলে আছে কেন?”
মেয়েটা বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে।নাক দিয়ে সর্দি বের হয়ে যাচ্ছে। আমি নাক ছিটকে অন্যদিলে তাকিয়ে বললাম,”ছিহ্ নাক পরিষ্কার কর?”
মেয়েটা গায়ে জড়িয়ে রাখা ওড়না টা দিয়ে নাক মুছে কাঁদতে কাঁদতে বললো,”আপনার থেকে দশ হাজার টাকা দামের শাড়িটি বারো হাজার দিয়ে আমি কিনে নেওয়ায় স্যার আমাকে বারোটা থাপ্পড় মেরেছে গো।এ্যাঁ এ্যাঁ এ্যাঁ,,,,”
–“হোয়াট!!”
আমি অবাক হয়ে উচ্চারণ করলাম।বাড়ির বাকিরাও অবাক হলো।নাবিলা চৌধুরী বেশ বিরক্ত হচ্ছে। সবে অফিসের উদ্দেশ্য বের হবে তখনই ইফান এই উটকো ঝামেলাটাকে নিয়ে হাজির।নুলক চৌধুরী নাবিলা চৌধুরী কে ইশারা করলো তিনি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না।নাবিলা চৌধুরীও ইশারায় বললো,” চল।” অতঃপর তারা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লো।
আমি সোফায় এসে মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। ইদানীং ইফানের এসব আজাইরা কান্ড-কারখানায় অতিষ্ঠ আমি। মেয়েটাকে দেখে বড় ঘরের মনে হচ্ছে।মীরা মেয়েটার কান্নায় বিরক্ত হয়ে বললো,”ওহ্ ডিয়ার স্টপ দ্যা ক্রায়িং।”
মেয়েটা চোখমুখ মুছে আমার পায়ের কাছে বসলো।আমি বিরক্তিতে “চ” বর্গীয় আওয়াজ বের করে বললাম,”নিচে বসছো কেন?সোফায় বস।”
–“না ম্যাম স্যার বলছে এখন থেকে আপনার পায়ের কাছে থাকতে।”
–“ইফান।”
আমি চাপা স্বরে বলে দাঁত কটমট করলাম।তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”অনেক হয়েছে এবার নিজ বাসায় যাও।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মেয়েটা আমার পা শক্ত করে পেচিয়ে ধরে কেঁদে বলে উঠলো, “ম্যাম আমাকে তাড়িয়ে দিবেন না।এক তো স্যার আমাকে মেরেই ফেলবে দ্বিতীয়ত আব্বু নিজের পদ হারাবে।আমি যে আপনার সাথে এমন করেছি শুনার পর তিনিও আমার গালে তেরো নাম্বার থাপ্পড় বসায়।এ্যাঁ এ্যাঁ।”
মেয়েটার কথায় ব্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার বাবা পদ হারাবে মানে?কে তুমি?”
–“আমার বাবা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। আমি ফারিয়া তাবাস্সুম। আমার মায়ের নাম লাকি ইসলাম। আমার বোনের নাম তানিয়া। আমার ভাইয়ের নাম আবু তাহা।আামর দাদির নাম,,,,,।”
মেয়েটা একদমে নিজের চৌদ্দ গোষ্ঠীর পরিচয় দিতে লাগলো।ফারিয়াকে থামাতে আমি চেচিয়ে উঠলাম,”চুপ।এক দম চুপ।আমি তোমার হিস্ট্রি জানতে চাই নি।”
আমি মাথায় হাত চাপড়ালাম।বিরবির করতে লাগলাম,”এই লোকটা আমাকে জ্বালিয়ে মারবে।”
দুপুর বারোটা বাজে।ঘন্টা বাজতেই ছাত্রছাত্রীরা ক্লাস রুম থেকে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়িয়ে আসতে লাগলো।জুই ও তার দুই বান্ধবী সহ ইতি আর নোহাও একসাথে বেড়িয়ে আসছে।কলেজের সকলে নোহার দিকে তাকিয়ে। একই তো মেয়েটা সেই লেভেলের সুন্দরী তার উপর ড্রেসআপ স্টাইল।নোহাকে কেউ কেউ হাত নাড়িয়ে হায় দেখাচ্ছে । নোহাও মিষ্টি হেসে হাত নাড়িয়ে বলছে,”হায় লিটিল গার্লস।”
জুইয়ের কাছে সব সাধারণ লাগছে।কারণ এর আগেও নোহার সাথে তার দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে।কিন্তু সোমা আর মিনা বাঁকা চোখে নোহাকে দেখছে।যদিও তাদেরও নোহাকে বেশ মনে ধরেছে।নোহার আচরণ একেবারে মন খোলা।
সবাই গেইটের সামনে এসে দাঁড়াল। আজ ক্লাসে বসে বসে সবাই প্ল্যান করেছে কি কি খাবে।নোহা ফুচকা খায়নি কখনো।তাই আজ আগে ফুচকা খাবে।সবাই একজন আরেকজনের হাত ধরে কয়েক কদম এগোতেই জিতু ভাইয়ার গাড়ি এসে থামল গেইটের কাছে।জুই গাড়ি দেখেই বুঝে গেছে কে এসেছে।জুই তাড়াতাড়ি গাড়ির কাছে গেলো।গাড়ি থেকে জিতু ভাইয়া না নেমে নামলো অফিসার আবির।জুই নাক ছিটকালো।অফিসার আবির সবে হায় দিতে যাচ্ছিল কিন্তু জুইয়ের রিয়াকশন দেখে বাড়াতে চাওয়া হাতটা দিয়ে মাথা চুলকে মিহি হাসলো।সোমা আর মিনা ঠোঁট টিপে হাসছে।জুই ফিরে আসবে তক্ষুনি জিতু ভাইয়া গাড়ি থেকে নামলো।জুইয়ের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠেছে। জুই কিছু বলবে তার আগেই নোহার চিৎকার ভেসে আসলো,
–“বেইবি তুমি এখানে!!ইয়েএএএ।”
নোহা দু’হাত মেলে ধরে পাগলা ঘোড়ার বেগে ছুটে আসছে।জিতু ভাইয়ার পা থেমে যায়।চোখ থেকে রোদচশমা সরিয়ে আশ্চর্য চেহারায় বিরবির করে,”ও মাই গড! এখানে এই আজীব প্রাণীটা কি করছে?”
জিতু ভাইয়া এসব ভাবতে ভাবতেই নোহা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে তার আগেই জিতু ভাইয়া সরে দাঁড়ায়। বেচারা নোহা রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ চোখ খিচকে বিরবির করে,”হালা খাইসেরে।”
এদিকে বাকি সবার মুখে হাত।নোহা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতেই মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো,”আহ্।”
ইতির চোখ ভিজে উঠলো।সে নাক টেনে ডেকে উঠলো, “নোহাপু তুমি ব্যথা পেয়েছ?”
ইতি দৌড়ে নোহার কাছে গেলো।এতক্ষণে ইতিকে চোখে পড়লে জিতু ভাইয়ার। সে অবাক দৃষ্টিতে লাজুক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো।নোহা পড়ে গিয়ে হাতের ছাল উঠে গেছে। এটা দেখে ইতি ঠোঁট ভেঙে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে কেঁদে দিয়েছে।জুইরা সবাই মিলে নোহাকে তুলে দাঁড় করালো।জিতু ভাইয়ারও খারাপ লাগলো নোহাকে ব্যথা পেতে দেখে।এখন সে-ই বা কি করবে যদি তাকে বারবার বিরক্ত করে!!জিতু ভাইয়া কোমরে হাত ধরে নোহাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।নোহা মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো জিতু ভাইয়া তার দিকে তাকিয়ে আছে।মেয়েটা নিজের ব্যথা ভুলে দাঁত কেলিয়ে মন ভুলানো হাসি দিয়ে বাচ্চাদের মতো নেকামি কন্ঠে বলে উঠলো,
–“ওহ্ হোলি আমি পড়ে গেয়েছিলাম।”
নোহার এহেন কথা শুনে জিতু ভাইয়ার মাথা একটা চক্কর মারলো।এটা কেমন মেয়ে ব্যথা পেয়েও হেসে এভাবে বলছে।এটার মাথায় কি বুদ্ধি সুদ্ধি নেই কিছু?
জিতু ভাইয়া মনে মনে এসব ভাবছে তখনই একজন পুরুষের গলার আওয়াজ শুনতে পায়।
–“হোয়াটস রং?”
সকলে পিছনে তাকাতেই দেখতে পেল মাহিন নিজ গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। মাহিনের প্রথমই নজর পড়ে জুইয়ের দিকে।জুই মাহিনকে না দেখার মত অ্যাটিটিউড দেখিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।মাহিন জুইয়ের অ্যাটিটিউড দেখে জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে তাচ্ছিল্য করে হাসে।তারপর মাহিনও চোখ সরিয়ে নেয় জুইয়ের থেকে।তখনই চোখে পড়ে নোহাকে।মাহিন শুকনো কেশে বিরবির করতে লাগলো, “উপরওয়ালা এই অ্যাটিটিউড গার্লের সামনে আমার ইজ্জত রক্ষা করো।”
মাহিন এসব ভাবছে তক্ষুনি নোহা ডেকে উঠে,”ব্রো আমি পড়ে গিয়েছিলাম।”
মাহিন যেন আকাশ থেকে পড়লো।যে মেয়ে মাহিন বেবি ছাড়া কোনোদিন ডাকে নি। সেই মেয়ে কিনা আজ ভাই ডাকছে!!মাহিন আশ্চর্য হলো তবুও প্রকাশ করলো না।সে স্বাভাবিক ভাবে নোহাদের কাছে গেলো।ইতিকে বললো মনিরা বেগম তাকে বলেছে আসার পথে মেয়ে দুটোকে পারলে নিয়ে আসতে।তাই মাহিন বাড়ি ফেরার পথে ওদের নিতে এসেছে।
ইতি আর নোহা দুজনেই না করলো এখন যাবে না।তাদের এখনও ফুচকা খাওয়া বাকি।
মাহিন ওদের কথা শুনে বললো,”ফাইন,তোমরা তাহলে পরে যেও।গার্ড তো আছেই দেখছি।”
মাহিন পিছনে তাকিয়ে দেখলো ইতির তিন জন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে।জিতু ভাইয়া আর মাহিনের চোখাচোখি হতেই দুজন ভদ্রতাসূচক হাসলো।হাই হ্যালো করে মাহিন চলে যেতে নিলেই জিতু ভাইয়া বলে উঠলো, “ভীষণ ব্যস্ত মানুষ দেখছি আপনি?”
মাহিন চোখের সানগ্লাস খুলে হেসে বললো,”ঐ আরকি।”
জিতু ভাইয়া হাতের সানগ্লাসটা ঘুরাতে ঘুরাতে হেসে বললো,”তো এই এরিয়ায় কি করছেন?ভুল না হলে তো উত্তরায় থাকেন।”
মাহিন মৃদু হাসলো।খানিকটা ভেবে বললো,”একটু কাজ ছিল।”
–“কি কাজ?”
পাশ থেকে আবির বললো।মাহিন চোখ ঘুরিয়ে আবিরকে উপর নিচ একবার পরখ করে বললো,”স্কিউজ মি।”
আবির আবারও কিছু বলতে যাবে তখনই জিতু ভাইয়া ইশারায় না করলো।আবির আর কিছু বললো না।অতঃপর জুইদের কে জিতু ভাইয়া একটা ক্যাফে তে নিয়ে আসলো। জুইরা তো বায়না ধরেছিলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকাওয়ালা মামার থেকে খাবে।কিন্তু মাহিন স্টেইটলি ইতিদের বলে দিয়েছে বাইরের খাবার না খেতে।পরে জিতু ভাইয়া সবাইকে ম্যানেজ করে ক্যাফে তে নিয়ে আসে।
জুইরা একটা টেবিলে আর মাহিন, জিতু ভাইয়া আর আবির একটা টেবিলে।মাহিন আর জুই সোজাসুজি বসায় দু’জনের মধ্যে স্নায়ু যোদ্ধ চলছে কিছুক্ষণ পর পর।জিতু ভাইয়া তাদের তিন জনের জন্য কফি আর মেয়েদের জন্য এক প্লেট করে ফুচকা অর্ডার করেছে।
জুইরা সবাই ফুচকা খেতে ব্যস্ত।ইতি লজ্জায় খেতে পারছে না।তার খালি মনে হচ্ছে জিতু ভাইয়া তার খাওয়ার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু জিতু ভাইয়া একবারও ইতির দিকে তাকাচ্ছে না। বরং কফি খেতে ব্যস্ত।
জিতু ভাইয়া বেশ কিছুক্ষণ পর ইতির দিকে আড় চোখে তাকালো।মেয়েটা একটু একটু করে ফুচকায় কামড় দিচ্ছে।
জিতু ভাইয়া দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।কদিন ধরেই ‘অচেনা বালিকা’ আইডি থেকে জিতু ভাইয়ার প্রতিটি পোস্টে কেয়ার রিয়েক্ট আসতো।আবার কিছু পোস্টে কমেন্ট আসতো এ মাস্ক পড়া মেয়েটা কে?জিতু ভাই প্রথমে পাত্তা না দিলেও পরে কি যেন ভেবে আইডিটা ঘাঁটিয়ে দেখলো– মেয়েটা জুইয়ের লিস্টে আছে।তারপর জুইকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারল এটা ইতির আইডি।এরপর যখন রাতে ফোন টিপছিল তখনই ইতির ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট আসে।জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ এক্সেপ্ট করে।
কথাগুলো ভাবতেই জিতু ভাইয়ার ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠলো।সেকেন্ডের মধ্যেই তা আবার মিলিয়ে গেছে।মাহিন কফিতে চুমুক দিতে দিতে আচমকা চোখ পড়ল জুইয়ের দিকে।জুই পুরো আস্ত আস্ত ফুচকা মুখে পুরে নিচ্ছে। মাহিন চরম আশ্চর্যজনক ভাবে আওড়াল, “হাউ স্ট্রেঞ্জ!”
এদিকে আয়েশ ভঙ্গিমায় খেতে খেতে বেখেয়ালি মাহিনের দিকে নজর পড়লো জুইয়ের। মাহিন কে নিজের দিকে ডেবডেব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুই তৎক্ষনাৎ মুখের সামনে হাত ধরে নিজেকে আড়াল করে নিলো।আরেকটা ফুচকা মুখে পুরে বিরবির করতে লাগলো,”ধুর ধুর ধুর আজ নিশ্চয়ই পেট খারাপ হইব।”
পিছন থেকে আবির জুইকে ডেকে উঠলো, “এই যে ম্যাঠাম আরেক প্লেট অর্ডার দিব।”
জুই ক্ষ্যাপাটে নজরে আবিরের দিকে তাকালো। আবির ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে।জুই রাগকে সাইডে রেখে মাথা নাড়াল।মানে সে খাবে। আবির হেয়ালি করে বললো,”পরে পেট খারাপ হলে কিন্তু আমার কোনো দোষ নাই।”
জুই জিহ্বা দেখিয়ে ভেঙচি কাটলো। জিতু ভাইয়া আর আবির দুজনেই আওয়াজ করে হেসে দিল।মাহিন জুই আর আবিরের আধিক্যেতা দেখে বিরক্তিতে বিরবির করে আওড়ালো,
–“ডিজগাস্টিং!”
বিকাল চারটা বাজে।রান্নাঘরে কাকিয়া রাতে কি রান্না হবে তা ঠিক করছে।পলি আর ফারিয়া মেয়েটা সবার জন্য মুড়ি মাখছে।ড্রয়িং রুম থেকে ইতি আর নোহার কন্ঠ ভেসে আসছে।তারা দু’জন আজ কলেজে কি কি করেছে সব গল্প দাদি আর মীরাকে শুনাচ্ছে। আমি আসলাম কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়ার জন্য। আজ সারাদিন মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে।
কাকিয়া আমার পাশে ঘেঁষে দাঁড়াল। আমি তাকাতেই তিনি সবজি কাটতে কাটতে ফিসফিস করে বললো,”আমার কথা হয়েছে।বলেছে আজকালের মধ্যে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবে।”
আমি চা কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
–“এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। ”
–“আচ্ছা।”
আমার কথা শুনে কাকিয়া চলে যেতে নিচ্ছিল তখন পাশ থেকে আমি পুনরায় ডেকে উঠলাম,”উমম কাকিয়া তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো।”
কাকিয়া আস্তে করে বললো,”হুম বল।”
আমি চায়ে সামান্য চিনি দিয়ে চামুচের সাহায্যে নাড়াচাড়া করতে করতে বললাম,”এই বাড়িতে আমি তোমাকে সবচেয়ে ভরসা করতে পারি কাকিয়া?”
আমার কথা শুনে কাকিয়া মৃদু হাসলো,”একবার করে দেখতে পার।”
কাকিয়ার কথা শুনে খুশি হলাম।বললাম, “জানো এই বাড়িতে আসার পর থেকে তুমি যেভাবে আমাকে ভালোবেসেছ, ভুল হলে তা ধরিয়ে দিয়েছ তাতে তোমাকে আমার মায়ের মতো মনে হয়।মনে হয় তুমি আমার আরেক মা।”
–“কেন মা হতে পারি না বুঝি?”
আমি মৃদু হাসলাম।কাকিমার কাঁধে চুমু খেয়ে বললাম,”আলবাত তুমি আমার আরেক মা।”
–“হয়েছে থাক। কি যেন বলবে বলেছিলে বল?”
আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি জেসমিন কে চেন?”
আমার কথাটা কাকিয়ার কান অব্ধি পৌঁছাতেই ওনার সবজিতে নাইফ চালানো হাতটা থেমে থরথর করে কাঁপতে লাগলো।আমি আড় চোখে ওনার হাত আর চেহারা লক্ষ করলাম।কাকিয়া ঘামছে। চোখে মুখে অযাচিত এক আতংকের ছাপ।আমি কাকিমার কাঁধে হাত রেখে শুধালাম,”তুমি ঠিক আছ?”
কাকিয়া কিছু বললো না।বরং রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে ফিসফিস করে দ্রুত বললো,”জাহান তুমি একটু সাবধানে থেকো সোনা।মনে রেখো– তুমি যাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করবে সেই তোমার পিঠে ছু’রি বসাবে।”
কাকিয়া রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।আমার কাছে এখনো কাকিয়ার সব কথা বোধগম্য হচ্ছে না। কাকিয়া ঠিক কাকে ইঙ্গিত করে কথাটা বললো?আমার সন্দেহে তো সবসময় নাবিলা চৌধুরী, নুলক চৌধুরী আর লতা মেয়েটা।যারা আমার খারাপ চায় হয়-তো।
কিন্তু আমার ভাবনার বাইরে আর কে থাকতে পারে?কে-ই বা আমার পূর্ব পরিচিত শত্রু ।ভাবতে ভাবতে আচমকা রান্নাঘরের মুড়ি মাখাতে থাকা পলির উপর নজর পড়লো।মেয়েটা ফারিয়ার সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে নিজের কাজ করছে।অল্প সময়েই কেমন সকলের সাথে মিশে যায় পলি।আমি পলির থেকে চোখ সরিয়ে ফারিয়ার দিকে তাকালাম।মেয়েটা সকলের সাথে বাইরে থেকে দম্ভ দেখালেও একবার কারও সাথে মিশলে পেটের সব কথা উগড়ে ফেলে।এই কয়েক ঘন্টা পরিচয়েই বিষয়টি পরিষ্কার আমার কাছে।না এই মেয়ে কিভাবে হবে!!
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকে তাকালাম। আমার নজরে প্রথমেই আসলো মীরা। কি সুন্দর হেসে হেসে সকলের সাথে কথা বলছে।কে বলবে মেয়েটা দেশের বাইরে বড় হয়েছে!আর তার ব্যবহার তার চেয়েও মিষ্টি। আমি নোহার দিকে তাকালাম। এই মেয়ে তো আরও সহজ সরল। বয়স আমার মতো হলে কি হবে– বুদ্ধি দশ বছরের বাচ্চাদের থেকেও কম।
আমি শেষ ইতির দিকে তাকালাম। এ তো বাচ্চা মেয়ে। লজ্জা পাওয়া ছাড়া কিছুই বুঝে না।আমার মাথা কাজ করছে না আর।কাকিয়া কি কাউকে ইঙ্গিত দিয়ে কিছু বললো নাকি কথায় কথা?
আর ভাবতে পারলাম না।উপর থেকে ইফানের কন্ঠ ভেসে আসছে,”জাহান ফাস্ট দেখে যাও।”
আমি তপ্ত শ্বাস ছেড়ে চা খেতে খেতে উপরে চলে গেলাম।
রুমে এসেই দেখি ইফান বাইকারদের মতো সাজে তৈরি হয়ে আছে।পড়নে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট,হাতে হ্যান্ড গ্লাভস।আমি ইফানের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে। কেন সে আমাকে ডাকল?
ইফান তার লম্বা ঘন কালো চুলগুলো হাত দিয়ে পিছনে ঠেলতে ঠেলতে বললো,”রেডি হয়ে যাও ঝাঁঝওয়ালি।”
–“রেডি হয়ে যাও মানে?”
ইফান ব্রু কুঁচকালো, “হোপ বেটি এত প্রশ্ন করিস কেন?”
–“আমি এখন কোথাও যেতে পারবো না।মাথা ঝিম ঝিম করছে।”
আমার কথার পিছেই ইফান বলে উঠলো, “সেই মাঝ রাতে একটু ডোজ দিয়েছিলাম। এখনো কাটে নি নাকি!”
আমি অবাক হয়ে শুধালাম, “ডোজ দিয়েছিলে মানে?”
–“রাতে জ্বরের কারণে অস্থির হয়ে ছিলে।ভালো ঘুম হওয়ার জন্য একটু ঘুমের ডোজ দিয়েছিলাম।”
আমি রাগে রিরি করতে করতে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কি সুন্দর নিজের গুনগান স্বীকারও করছে । ইফান কথা না বাড়িয়ে কাভার্ড থেকে একটা ফরেস্ট গ্রিন কালার থ্রিপিস বের করে আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিলো।আমাকে বলার সুযোগ না দিয়ে ওয়াশরুমে ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো।আমি না পারতেও রাগে গজগজ করতে করতে ড্রেস চেইঞ্জ করে বেরিয়ে আসলাম।আমাকে দেখে ইফান হা হয়ে গেছে। ফর্সা দেহে ফরেস্ট গ্রিন কালার অনেক সুন্দর করে ফুটে উঠেছে। দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে নিজের কাছেই। আমাকে আবার সব রং এই দারুণ লাগে।ইফান এগিয়ে এসে আমাকে সম্পূর্ণ স্কেন করে বললো,”ওয়াও জোস।”
আমি ইফানের বুকে ধাক্কা মেরে মিররের সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালালাম।একা এত বড় চুল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছি। ইফান পিছন থেকে এসে আমার হাত থেকে চিরুনি কেড়ে নিয়ে সে আলতো করে আঁচড়ে দিতে লাগলো।আমি কোমরে দু’হাত ধরে আয়নায় ইফানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
–“এই বিকালে কোথায় নিয়ে যাবে হুম।খেয়ে দেয়ে কি কোনো কাজ কাম নেই নাকি তোমার ?”
ইফান গা দুলিয়ে হেসে চেচিয়ে গান ধরলো,,
❝তোকে নিয়ে ঘুরতে যাবো একশো বৃন্দাবন
আমি আর অন্য কিছুর মুড-এ নেই এখন❞
ইফান এটা ওটা বলে আমার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে খুব যত্নসহকারে।সে এমন আলতো ভাবে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে যে একটা চুলও ছিঁড়ছে না।আমি হলে এতক্ষণে চিরুনি ভরে যেতো চুল দিয়ে। আমি লোকটাকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।না সবসময় হাসে। আর লোকটা হাসলে তার চোখ দুটোও যেন হাসে। ইফান আমার এমন মুগ্ধ চাহনি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।আমি ইফানকে দেখতে দেখতে আনমনে বলে উঠলাম,
–“আমি তোমাকে আজও চিনতে পারলাম না।”
ইফান মিররে আমাকে এক পলক দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বললো,”কখনো চিনতেও পারবে না।”
–“হাহাহা তাই নাকি?তাহলে তো একবার চেনার চেষ্টা করতে হচ্ছে।”
ইফান আবার বাঁকা হাসলো। মাদকীয় হাস্কি স্বরে বললো,”উমম চেষ্টা করা মন্দ নয়।তবে লাভ হবে না।”
আমি একটা ব্রু উঁচিয়ে শুধালাম,”কেন?”
জাহানারা পর্ব ৫৮
ইফানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটাও উধাও হয়ে গেলো।হঠাৎই বেশ গম্ভীর হয়ে নিচু স্বরে বলে উঠলো,”কারণ আমি অন্ধকার। আমার শুরু থেকে শেষ সবটায় কালোয় ঘেরা।আমার এই নিষিদ্ধ অন্ধকার বিস্তৃত পাপের শহরে বিধ্বংসী মাফিয়া বস ইফান চৌধুরী গড়ে উঠার গল্প ছাড়া ভালো কিছুই খুঁজে পাবে না।আর আমাকে চিনতে গিয়ে তুমি অচিরেই ভেঙে পড়বে।”
