Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৪

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৪

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৪
তোনিমা খান

বিয়ের পরে সেদিন প্রথমবার বিন্দু তার তথাকথিত
স্বল্পভাষী অনুভূতিহীন স্বামীর সাথে ঢাকার ব্যস্ত নগরীতে বের হয়েছিল। বৃষ্টিভেজা এক বিকেল ছিল। পাখিরা বৃষ্টির করতালি থেকে নিজেদের লুকাতে ডালে ডালে বসে ঝিমাচ্ছিল। তেমনি হুড তোলা রিকশার আড়ালে একটা মিষ্টি পাখি ঝিমিয়ে বসে ছিল। পাশের মানুষটি কথা বলত না, আর না তার কোনো অভ্যাস ছিল কাউকে খুঁচিয়ে কথা বলানোর। ঠিক এই স্বভাবগুলি তাদের মাঝে আরো দূরত্ব তৈরি করত।
কিন্তু হঠাৎ করেই সেই ঝিমুনি দিয়ে থাকা পাখিটা ডানা ঝাপটাতে শুরু করল। বিচলিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
“লিলি!”

বিন্দুর আচমকা চিৎকারে তালহার চমকে তার পানে ফিরে তাকালো। দেখল মেয়েটি রাস্তার ওপাশে থাকা ফুলের দোকানের দিকে প্রায় উড়ে যেতে চাচ্ছে। সে রিকশা থামালো। সাথে সাথেই নীল শাড়ি পরিহিত নারীটি বৃষ্টির মাঝেই ছুটে গেল দোকানে। ভীষণ আনন্দের সাথে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিয়েছিল সাদা ধবধবে লিলি ফুলগুলো। পেছনে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভের ন্যায় কঠিন দেখতে মানুষটির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। ভীষণ জড়তার সাথে আবদারের সুরে বলেছিল,
“একটা লিলি নেই?”
প্রেক্ষিতে কঠিন মানুষটি ফুলওয়ালার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলেছিল,
“পুরো বালতিটা প্যাক করে দিন।”

বিন্দু সেদিন আশ্চর্য হয়েছিল। এবং সময়ের পরিক্রমায় তার সেই আশ্চর্যের রেশ বাড়তেই লাগল। সেদিনের পর থেকে তিনবছরের সংসার জীবনে একদিন ও এমন যায়নি যেদিন তার ঘরে সতেজ লিলিফুল আসেনি। প্রতিদিন সকালে বিন্দুর ঘরে লিলিফুল এসে হাজির হতো। হয়তো তালহার নিজে অফিসে যাওয়ার আগে দিয়ে যেতো। নয়তো দোকানদার সকালে তার বাসায় এসে দিয়ে যেতো।
কে বলেছে, ভালোবাসা শুধু ‘ভালোবাসি’ বলে প্রকাশ করতে হয়? এভাবেইও ‘ভালোবাসি’ বলা যায়। কাউকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসার কারণ হিসেবে এতটুকুই যথেষ্ট ছিল বিন্দুর জন্য।
কিন্তু সবসময় কী চোখের দেখা সত্যি হয়? তাকে একটা সুখী সংসারের ভার চাপিয়ে দিয়ে, মানুষটা নিজেকেই অন্য কারোর বাহুডোরে সপে দিয়েছে।
ঘরভাঙা নারীটির প্রথম প্রভাতটিকে এলোমেলো করে দেয়া সেই লিলি ফুল আর কফি হাতে বিন্দু ছুটে বারান্দায় গেল। তিন বছরের যত্নে গড়া সংসার ভাঙার দুঃখ বোঝে মানুষটা? তবে এই ফুল দিয়ে কেন সেই যন্ত্রণা বাড়াতে চাইছে? সে কী চায়?
কৈফিয়ত দেবে না-কি এটা বলবে যে— তিন বছরের সংসারে কোনো ভালোবাসা ছিল না, শুধু দ্বায়বদ্ধতা ছিল?

বারান্দায় যেতেই সে ভড়কে গেল। নিচে তন্ময় সহ আরো কিছু মেয়েরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক লিলিফুল ওয়ালাকে ঘিরে ধরেছে।
তখুনি তন্ময় উপরে তাকালো। তাকে দেখেই প্রগাঢ় হেসে হাত উঁচিয়ে ডাকল।
“আপু? লিলিফুল পেয়েছেন?”
বিন্দু আশ্চর্য হয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো। এটা কী তালহার পাঠায়নি? সে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।
তন্ময় মৃদু হেসে বলল,
“ওকে আপু। এখন রিফ্রেশ লাগছে নিশ্চয়ই?”
বুকভরা আশা ভেঙে যাওয়ার ক্লান্তি নিয়ে বিন্দু ম্লান হেসে উঠল, অথচ চোখ টলটল করছে। সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। রিফ্রেশ লাগছে।
“আচ্ছা আপু, কোচিং এ দেখা হচ্ছে তবে।”

তন্ময় লিলি ওয়ালার সাথেই হেলেদুলে চলে গেল। কিন্তু বিন্দু তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে। চোখদুটো হন্য হয়ে কাউকে খুঁজছে। হয়তো এখনো তার ভঙ্গুর বোকা মন আশা রাখে, শহুরে পথে চলতে না পারা মেয়েটিকে তালহার এত সহজে এই সুবিশাল শহরে ছেড়ে দিতে পারে না।
কিন্তু সেই মানুষটি ছিল না প্রভাতের সদ্য ব্যস্ততায় মেতে ওঠা শহুরে পথটিতে।
একটা ফোনকল, একটা খোঁজখবর, একটা প্রচেষ্টা— কিছু না। স্ত্রী হিসেবে নাহয় মূল্যহীন ছিল কিন্তু মানুষ হিসেবে কী কখনো একটু মূল্যায়ন করেছে?
বিন্দুর রক্তাভ নেত্রে চেয়ে রইল আনমনে। শক্ত করে
আঁকড়ে ধরল লিলি ফুলের কাণ্ডগুলো। ফিসফিসিয়ে বলল,
“যন্ত্রণাদের ছেড়ে দিতেও এত যন্ত্রণা হয় কেন?”

লাগাতার কলিং বেলের বিরক্তিকর শব্দে সদ্য লেগে আসা নিদ্রার ঘোর কাটতে লাগল। তালহার বিরক্তি নিয়ে বালিশে মুখ ঘঁষলো। বদ্ধ নেত্রে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে স্বভাবসুলভ ডেকে উঠল,
“বিন্দু? বিন্দু, পত্রিকা ওয়ালা এসেছে দরজা খোলো। এতবার বেল কেন দিচ্ছে?”
প্রত্যাহিক একবার বেল বাজাতেই বিন্দু ছুটে যেতো। কিন্তু আজ বেল বাজতে বাজতে কান ব্যথা হয়ে যাওয়ার উপক্রম তবুও কেউ দরজা খুললো না। তালহারের নিদ্রা ভেঙে গেল পুরোপুরি। এবং বিন্দু নামক ঘোর ও কেটে গেল। বালিশ থেকে মাথা উঠিয়ে সে এদিক ওদিক তাকায়। বিন্দু নেই তার পাশে।
“ওহ্, বিন্দু তো তার জীবনেই নেই।”
সাধারণ কোনো মানুষ হলে হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা যেতো কিন্তু সে তালহার ছিল। যে কখনো কোনোকিছু নিয়ে আফসোস করত না। যা হয়েছে তো হয়েছে। ওটা হওয়ার-ই ছিল। জাস্ট মুভ অন।
তালহার অলসতার সাথে চোখ মেলতেই চোখের সামিয়ানায় ভেসে উঠল একটি অসহায়ত্ব ভরা চাহনি। বাবা চোখ মেলে তাকাতেই সাদা ধবধবে প্রিশা’র চোখ যেন আরো টলটল করে উঠল। সে আদুরে ভঙ্গিতে মুখ এগিয়ে নিয়ে বাবার গালে জিহ্বা লেহন করল। তালহার স্মিত হেসে স্বাস্থ্যবান বিড়ালটিকে বুকে জড়িয়ে নিলো। গলায় মুখ ঘঁষে কয়েকদফা চুমু দিয়ে বলল,

“আর ইউ মিসিং মাম্মা?”
বাবা মায়ের আদুরে প্রিশা এতটুকু আহ্লাদের ই যেন অপেক্ষা করছিল। সে বাবার গলায় মুখ ঘঁষে ম্যাও ম্যাও শব্দ করে উঠল। তালহার তাকে আদর করতে করতে উঠে বসল। কলিং বেল তখনো বেজে যাচ্ছে। আজ সকালটা খুব সুপ্রসন্ন হবে না এতটুকু বুঝে নিলো তালহার।
ওভার সাইজ টিশার্ট আর ট্রাউজার পরিহিত সুঠামদেহী পুরুষটি ভীষণ অলসতার সাথে বিছানা ছেড়ে দরজার কাছে যায়। দরজা খুলতেই বত্রিশ তেত্রিশ বছর বয়সী পেপার ওয়ালা চমৎকার হাসল। তালহার পেপারটা না নিয়ে মাসিক টাকাটা তার হাতে ধরিয়ে দিলো। লোকটি থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“টাকা কেন স্যার?”
তালহার দরজার নব আঁকড়ে ধরে চোখে চোখ রেখে বলল,
“যখন দেখলে কেউ দরজা খুলছে না, তখন এতবার বেল দিয়েছ কেন? পেপার দরজার নিচ থেকে দেয়া যায় না?”

“প্রতিদিন তো একবার বেল দিতেই ম্যাডাম দরজা খুলে দেয়, স্যার!”
লোকটি কাঁচুমাচু করে উঠে তালহারের বগলের নিচ থেকে ঘরের ভেতর উঁকি দিল। সহসা একটা শক্তপোক্ত হাত পেপার ওয়ালার গলার হাড় চেপে ধরলো। লোকটি ছটফটিয়ে উঠল নিঃশ্বাসের স্বল্পতা অনুভব হতেই। তালহার হিসহিসিয়ে বলল,
“তো ম্যাডামকে খুঁজছিলি তাই তো? আচ্ছা আমি দেখাচ্ছি তোর ম্যাডামকে।”
পেপার ওয়ালার গলা চেপে ধরে সোফায় ছুঁড়ে মেরে দরজা আটকে দিল তালহার। লোকটি এবার ভয়ে দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল হাতজোড় করে।
“স্যার, আমার কোনো খারাপ মতলব ছিল না বিশ্বাস করুন। আমায় যাইতে দেন। আমি এমনিই ম্যাডামরে খুঁজছিলাম।”
“দেব, তার আগে তোর মাথা থেকে ম্যাডামকে বের করে নেই।”
তালহার চাপা স্বরে বলে এগিয়ে গেল সোফার কাছে। লোকটি এবার ছুটে এসে তার পা আঁকড়ে ধরল।
“ছাইড়া দেন স্যার। আমি কহনো ম্যাডামরে খারাপ চোখে দেখিনাই। ম্যাডাম অনেক ভালো। আমার লগে হাসিমুখে কথা কইত সবসময়।”
তালহার হাঁটু গেড়ে বসে তার চোয়াল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
“শি ইজ সুইট উইথ এভরিওয়ান। তাই বলে তোরাও তাকে সুইটহার্টের নজরে দেখবি? চোখ উপরে ফেলে দেব একদম।”

লোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। হাতজোড় করে বলল,
“ভুল হইয়া গেছে, স্যার। ছাইড়া দেন, পায়ে পড়ি আপনার। এই কইরাই আমার পেট চলে।”
তালহার ছাড়ল না তার চোয়াল। বরং আরো শক্ত করে চেপে ধরে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল,
“এই এলাকায় তোকে যেন আর না দেখি। আমি তোর মালিককে ফোন করে দেব এখন। ইন ফিউচার যদি তোকে এই এলাকায় দেখি তবে চোখ দুটো হারাবি। মনে থাকবে?”
“মনে থাকবে, মনে থাকবে।”
তালহার পুনরায় দরজা খুলে লোকটিকে ছুঁড়ে ফেললো বাইরে। দরজা আঁটকে মালিককে ফোন করে বিক্ষিপ্ত মেজাজে ওয়াশরুমে ঢুকলো। বের হতে হতে মস্তিষ্ক সহ পুরো অবয়ব একদম শীতল। বোঝার উপায় নেই এই লোক একটু আগেই কাউকে হুমকি ধমকি দিয়ে এসেছে।
সে মাথা মুছতে মুছতে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করল। কিন্তু দশ মিনিট হতেও সেই জিনিসটি আসল না। সে ফিরে তাকালো দরজার দিকে। কফি হাতে কেউ ছুটে আসছে না।
সে চোখ ফেরাতে চাইল। কিন্তু চোখে বাঁধল চমৎকার কিছু। তার পি.সির ঠিক পাশে একটা ফ্লাস্ক, একটা কফি মগ, কফি জার, সুইটনার কিউব, দুধ আর একটা কফি বিটার রাখা সেথায়। বিন্দুর সঙ্গদোষে দিনে শুধু এই একবার তালহার দুধ চিনি সমেত একটা চমৎকার কফি পান করে। না চাইতেও পুরুষালী ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে গেল।

“অভ্যাস ছুটতে দাওনি অথচ আমার একছত্র অভ্যাস সাথে নিয়ে গিয়েছ।”
সে বিড়বিড় করেনিজেই কফি বানাতে নিলো। পানি ঢালতেই দেখল তা তখনো বেশ গরম। তন্মধ্যেই ব্যক্তিগত ফোনটি বেজে উঠল। সে ঘাড় কাত করে তাকায় ফোনের দিকে। মা ফোন দিয়েছে। সে ফোনটি রিসিভ করে টেবিলে রেখে দিলো। ভেসে আসল মায়ের মায়াভরা ব্যস্ত কণ্ঠ।
“তালহার!”
“বলো।”
পুনরায় কফি বিট করতে করতে জবাব দিল সে।
“বাড়িতে না-কি অফিসে?”
“কেন?”
তনয়া বেগমের ব্যস্ততা খানিক রুখে আসল। মেইডের হাতে খুনতি ধরিয়ে দিয়ে বসার ঘরের সোফায় এসে বসল। ফ্যানের হাওয়ায় দেহ শীতল হলো। পাশে বসা নারীটির ও কান ততক্ষণে খাঁড়া হয়ে গেল।
তনয়া আঁচলে গলার ঘাম মুছতে মুছতে বলল,
“গতকাল থেকে বিন্দুর ফোনে কল ঢুকছে না, তালহার। ওর ফোনে কী হলো? বাড়িতে থাকলে ওকে ফোনটা দে।”

“আমি বাড়িতে নেই।”
অকপটে বলা সেই মিথ্যা কথাটি ছিল ওই সময়ের সবচেয়ে সঠিক জবাব। এতক্ষণ মায়ের কথার মাঝেই সে মায়ের প্রশ্নের সঠিক জবাব খুঁজছিল।
তনয়া বেগম অসন্তোষের সাথে বললেন,
“এত সকালে অফিস? বিন্দুর ফোনে কল ঢুকছে না কেন? কিছু হয়েছে ওর ফোনে?”
“কিছু হলে তো ও নিজেই জানাতো তোমায়।”
“তাহলে ফোন ঢুকবে না কেন?”
“হয়তো ব্যস্ত আছে।”
“না, ফোন ই ঢুকছে না। গতকাল দুপুরের পর থেকে ওকে ফোনে পাচ্ছি না। তোর সাথে কথা হয় কিসে?”
“ও আমার সাথেই থাকে, মা।”
ছেলের নিরুদ্বেগ কণ্ঠে তনয়া রুষ্ট হয়ে বলল,

“বাড়ি গিয়ে আমায় ফোন দিবি। ওর সাথে কথা বলিয়ে দিবি।”
ভীষণ বিরক্তির সাথে একের পর এক মিথ্যা বলে যাচ্ছিল তালহার। এই পর্যায়ে এসে শুধাল,
“কী প্রয়োজন ওর সাথে?”
“ও বলেছিল ডাক্তারের কাছে যাবে এই সপ্তাহে। গিয়েছিলি নিয়ে?”
তনয়া সতর্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। সহসা তালহারের মুখশ্রী আগের চেয়েও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলল,
“গিয়েছিল হয়তো।”
“হয়তো? তুই যাসনি?”
“নাহ, আমি হসপিটালে ড্রপ করে অফিসে গিয়েছিলাম।”
“তালহার, এটা কেমন কথা? ডাক্তার কী বলে তুই শুনবি না? এমন একটা গুরুতর বিষয়ে তুই স্ত্রীকে একা ফেলে যাস কী করে?”
তনয়া বেগম রাগান্বিত স্বরে বললেন। তালহার নির্বিকার বলল,
“যেটা তোমাদের কাছে গুরুতর সেটা আমার কাছে গুরুতর নাও হতে পারে।”
“একটা সন্তান কার কাছে গুরুতর হয় না, তালহার?”
“আমার কাছে হয় না। আল্লাহর ইচ্ছা হলে দেবে, না হলে না। এটা নিয়ে এত প্যানিক হওয়ার মতো তো কিছু নেই।”

ছেলের কঠোর অনুভুতিহীন কণ্ঠে তনয়া বেগম অসহায়ত্ব ভরা নিঃশ্বাস ফেললেন।
“এগুলো কী বিন্দুর সামনেও বলিস? একটা মেয়ে এমন বিষয় নিয়ে কতটা ট্রমার মধ্য দিয়ে যায় তা কী তোর ধারণা আছে তালহার? তার মধ্যে তুই যদি ওর সাথে হাসপাতালে না যাস, মানসিকভাবে স্বান্তনা না দিস ও তো ভেঙে পড়বে।”
সহসা তালহারের ললাটের রগ ফুলে উঠল ক্রোধে। সে থমথমে মুখে বলল,
“কেন এমন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিন্দু ট্রমার মধ্য দিয়ে যাবে, মা? একটা সন্তান না হলে কী বা হবে? আমি কী নেই? আমরা একে অপরের জন্য যথেষ্ট।”
“সন্তান একটা স্বর্গীয় সুখ তালহার।”
“হ্যাঁ, সবসময় সবার ভাগ্যে স্বর্গীয় সুখ নাও থাকতে পারে। তাই বলে কী আমরা তা ভেবে ভেবে মরে যাব? প্লীজ এগুলোর জন্য ওর কাছে ফোন দেবে না, মা। আর না এগুলো নিয়ে ওর সাথে কোনো কথা বলবে। ওকে এইসব বলে ট্রমা দাও তো তোমরা।”
তালহার রাগান্বিত স্বরে বলল। তনয়া বেগম আর কথা বাড়ালেন না। কিন্তু তার পাশে থাকা ননদ ইতিমধ্যেই রেগেমেগে অস্থির হয়ে পড়লেন।
সে রাগান্বিত স্বরে বলল,

“তনয়া, আমার কাছে ফোনডা দাও তো। ওয় দুই দিনের পোলা কয় কী?”
তনয়া ননদকে বেশ চিনেন। তাই সে তৎক্ষণাৎ নাকচ করে বলল,
“না আপা, থাক। ওকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ যখন দেবে তখন দেবে। ও এমনিই এসব কথা নিতে পারে না।”
“তুমি আগে আমারে দাও।”
তার ননদ এক প্রকার ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে কানে ধরল। গর্জে উঠে বলল,
“এই মনু, তুই এইসব কী কথা কইলি এতক্ষণ?”
ফুপুর কণ্ঠে তালহার বিরক্তিতে চ বর্গীয় শব্দ করল।
“কী বললাম?”

“আমরা তোর বউরে টরমা দেই? তুই জানোস ফল ছাড়া গাছ কতটা মূল্যহীন? তেমনি একটা মাইয়্যার যদি বাচ্চা না হয় সেই মাইয়্যার কোনো মূল্য নেই।”
তালহারের হাত থেমে গেল। সে ফোনটা হাতে নিয়ে মনোযোগ সহকারে ফুপুর কথা শুনতে লাগল।
“তো আপনি এখন কী করতে বলছেন ফুপু? বাচ্চা না হলে কী জোর করে হওয়াবো?”
“জোর কইরা হওয়াতে তো কইনাই তালহার। আমার কথা তুই ও ভালো করে বুঝতে পারতেছিস। বিয়ার কী কম বয়স হইলো তোগো? বাচ্চা হইলে এতদিনে হইয়া যাইতো।”
“তো আপনার কথা হচ্ছে আমি বিন্দুকে ছেড়ে আরেকটা বিয়ে করব তাই তো?”
“হু।”
তালহার ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
“যে আসেনি কিংবা আদৌও আসবে কি-না তার জন্য আমি আমার বর্তমান নষ্ট করে দেব। এত বাজে বুদ্ধি আপনার মাথায় আসে কী করে ফুপু?”
দেখ তালহার আমার সাথে বেয়াদবি করবি না। বাচ্চা ছাড়া কোনো পুরুষ মানুষ সম্পূর্ণ না। আইজ যদি তোর একটা বাচ্চা কাচ্চা না হয় তোর বংশের কিছু থাকবে? তোরা মইরা গেলে তোর জায়গা সম্পত্তি খাইবে কেডা?”

“আমার জায়গা সম্পত্তি আমি গরীবদের নামে লিখে দিয়ে যাব ফুপু। আপনার এত চিন্তা করতে হবে না।”
“তালহার আবেগ দিয়া দিন চলে না। একদিন নিজেই বুঝবি যে বাচ্চা কাচ্চা কত প্রয়োজন। কিন্তু তখন আর সময় থাকবে না। এখন সময় আছে, ঢাকায় বাড়ি গাড়ি টাকা পয়সা সব আছে। অনায়াসে একটা ভালো ঘরের মেয়ে পাইয়া যাবি। আমার কথা শোন। বিন্দু একটা নিষ্ফলা মাইয়া।”
তালহার ঘাড় মর্দন করতে করতে এতক্ষণ ধৈর্য সহকারে তার পরামর্শ গুলো শুনলো। অতঃপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আপনার বাচ্চা না হলে আপনার স্বামী যদি আপনাকে ছেড়ে দিতো তবে আপনার কেমন লাগত ফুপু? আমার স্ত্রী নিষ্ফলা হোক, যাই হোক—সে আমার স্ত্রী। আমার বাচ্চা হচ্ছে না, আমার বাচ্চা লাগবে না। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে আপনাদের মুখে আর একটা কথাও যদি শুনি আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।”
ফোনটা কেটে গেল। তালহারের ফুপু স্তব্ধ হয়ে তাকালো তনয়ার দিকে যে কি-না কপালে হাত চেপে মাথা নুইয়ে বসে আছে। হাপিত্যেশ করে বলল,
“দেখলে তনয়া, তোমার পোলা আমার লগে কেমন আচরণডা করল? আমার বাপের বাড়ির কেউ আইজ পর্যন্ত আমার লগে উঁচু গলায় কথা কয়নাই। আর ও? তোমার পোলা জম্মের ত্যাড়া তনয়া। ওই নিষ্ফলা মাইয়ার মধ্যে এমন কী আছে যার লইগা এত দরদ?”
পরপরই চিৎকার করে ভাইকে ডাকল,

“ও কাওসার? কাওসার, হুইনা যা তোর পোলা আমার লগে কী ব্যবহারডা করছে।”
তনয়া অসন্তোষের সাথে বলল,
“আপা, আপনি তো জানেন তালহার বিন্দুকে নিয়ে কোনো ধরণের বাজে কথা সহ্য করে না। আজ দুই বছর ও এই কারণে বিন্দুকে এই বাড়ি আসতে দেয় না। আর আপনি ওই বিন্দুকেই ছাড়তে বলছেন। স্বাভাবিকভাবেই ও এমন রিয়্যাক্ট করবে।”
“কী? তুমি ওই পোলারে সায় জানাইতেছো? হায় হায় তানভীর দেখ দেখ তোর মা পোলার বেয়াদবিরে প্রশ্রয় দিতাছে। আমি এই কাকলি আইজ জোর গলায় কইয়া দিলাম, তোমার ওই পোলা কোনোদিন বাপ হইতে পারবে না। আমার কথা মিলাইয়া নিও।”
তনয়া এবার রেগে গেল।
“এ কেমন কথা আপা? আপনি মুরুব্বি, আপনি আরো দোয়া করে দেবেন।
সদ্য নিজের ঘর থেকে বের হওয়া তানভীর বিরক্তি নিয়ে তাকালো মায়ের পানে। থমথমে মুখে বলল,
“ফুপু ভুলকিছু কী বলেছে, মা? এত বছর ধরে ওদের বাচ্চা হচ্ছে না।‌ মুরুব্বি মানুষ দুই কথা বলতেই পারে। তার জন্য তোমার ছেলে মুরুব্বির সাথে খারাপ ব্যবহার করবে? বউ কী তার একারই আছে। আমাদের নেই?”
ফুপু মেকি চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“বোঝা তোর মারে।”
তনয়া রাগান্বিত স্বরে বলল,
“তাই বলে বিন্দুকে ছাড়তে বলবে?”
তানভীর খাবার টেবিলে বসতে বসতে বলল,
“ভুলটা কোথায় বলছে? বিন্দুর সমস্যা না থাকলে তো এতদিন হয়েই যেতো বাচ্চা। তালহারের ও তো কোনো সমস্যা নেই! ঢাকা শহরে অত বড় ফ্লাট কিনছে, গাড়ি কিনছে। যা না লাগবে তার থেকে সব বেশি বেশি করছে। এগুলো খাবে কে একটা বাচ্চা কাচ্চা না হলে?”
তনয়া অবাক হয় ছেলের কথায়। তেমনি অবাক হয় স্বামীর পাতে খাবার বেড়ে দেয়া তানভীরের স্ত্রী তৃশাও। তনয়া তেড়ে এসে বলল,
“আমার যদি বাচ্চা না হতো তবে কী তোর বাপ আমারে ছেড়ে দিতো তানভীর? আর তৃশার যদি বাচ্চা না হতো তাহলে কী তুই ও তৃশাকে ছেড়ে দিতি?”
তানভীর আশ্চর্য হয়ে তাকালো মায়ের দিকে।
“কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে গেলে?”
“তুই তো এমন কথাই বললি।”

“তোমারো বাচ্চা হয়েছে আর তৃশার ও বাচ্চা হয়েছে, মা। তাই ফালতু কথা বলো না। তুমি এটা বলো যে তুমি তোমার আদরের বিন্দু আর তালহারের বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনতে পারো না।”
“হ্যাঁ, কারণ ওরা দুজনে ভালো। তোকে তো আমি মানুষ বানাতে পারিনি তানভীর। নাহলে তুই আজ এমন কথা বলতে পারতি না। আমি আমার তালহারকেই মানুষ বানাতে পেরেছি শুধু।”
তানভীর তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তুমি না, ছয় বছরের ক্যাডেট লাইফ তোমার ছেলেকে মানুষ বানিয়েছে, মা।”
তনয়া বেগম ফুঁসে উঠলেন,
“তুই একটা অমানুষ হয়েছিস, তানভীর।”
ফুপু তৎক্ষণাৎ ফোড়ন কেটে বললেন,
“হ্যাঁ আমার কলিজার টুকরা তোমার বিরুদ্ধে কথা কইছে না? এহন তো সে অমানুষ হইবেই। এর ফল একদিন তুমি বুঝবা, তনয়া।
তনয়া রেগেমেগে রান্নাঘরে চলে গেল। তৃশা থমথমে মুখে স্বামীর দিকে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই তানভীর ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী?”
তৃশা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“তুমি আসলেই একটা অমানুষ। আমার বাচ্চা না হলে তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে, তাই না?”
তানভীর চোয়াল শক্ত করে ধমকে উঠল,
“থাপড়ে দাঁত ফেলে দেব। শাশুড়ির সাথে থাকতে থাকতে সাহস বেড়ে গিয়েছে, তাই না?”
তৃশা জবাব দেয় না। থমথমে মুখে সেখান থেকে চলে গেল। সে দুই বছরের এক ছেলে সন্তানের জননী। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে তার ছেলে তার সংসারজীবনের রক্ষা কবজ হয়ে এসেছে। তার চোখ ছলছল করে উঠল। আফসোসে জর্জরিত জিহ্বায় ফিসফিসিয়ে উচ্চারিত হলো,
“তালহার!”
তার চোখে বিন্দু নিমিষেই ভাগ্যবতী হয়ে উঠল। কিন্তু তারা জানতো না বিন্দুর চেয়ে দূর্ভাগা বোধহয় আর কেউ নেই।

সূর্যের হালকা তপ্ত রশ্মি তখন হুটোপুটি খাচ্ছে ছাদের মেঝেতে। ছাদ বাগানের গাছগুলো দুলছে হালকা সমীরণের তালে। কাপড় ঝেড়ে দড়িতে শুকাতে দিয়ে বিন্দু দ্রুত কদমে নিচে নামতে গেল। কিন্তু বাঁধ সাধলো ছাদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক সুঠামদেহী সুদর্শন পুরুষের অবয়ব। যে কি-না তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকে পরখ করছে।
সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“পথ আঁটকে দাঁড়িয়েছেন কেন?”
পুরুষটির তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ হলো না। বরং তার আপাদমস্তক অবলোকন করে বলল,
“আপনি তন্ময়ের সেই সুইট আপু?”
বিন্দুর ললাট মসৃণ হলো।
“আপনি কে?”
“আমি ওর বড় ভাই।”
বিন্দুর মাঝে নম্রতা নেমে আসে। ইনি তবে কোচিং এর মালিক। সে বলল,
“আসসালামুয়ালাইকুম।”
রুহান ঈষৎ মাথা নেড়ে জবাব দিল। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কী সমস্যায় পড়েছেন?”
“আপনাকে বলার প্রয়োজন বোধ করছি না।”
বিন্দু কপাল কুঁচকে বলল। রুহানের ভ্রু টানটান হয়ে গেল। পেছনে হাত বেঁধে থমথমে মুখে বলল,
“আমিও তবে সাহায্য করার প্রয়োজন বোধ করছি না।”
“ব্লাকমেইল করছেন না-কি অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছেন?”
বিন্দু অবিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল। রুহান স্মিত হেসে বলল,
“কোনটা মনে হচ্ছে?”
“দুটোই মনে হচ্ছে।”
“তবে দুটোই।” রুহান নিরুদ্বেগ বলল। বিন্দু মাথার কাপড়টা আরেকটু টেনে নিলো। চোখে চোখ রেখে বলল,
“তাহলে এমন মানুষের থেকে সাহায্য নিতে আমার রুচিতে বাঁধবে। আমি নিজেই নিজের ব্যবস্থা করে নিতে পারব। তন্ময় আমায় অনেক অনুরোধ করেছে বলেই আমি এখানে এসেছি। আসছি।”
বিন্দু কাটকাট কণ্ঠে বলেই তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। রুহান কিছুটা ভড়কে গেল, আশ্চর্য হলো নারীটির দৃঢ়তায়। তন্ময় তার খুব আদরের‌। কোনো আবদার কখনোই ফেলে না। সেখানে তো সে এই সুইট আপুর জন্য রীতিমতো তার হাত পা ধরে অনুনয় করেছে যেন কোচিং এ চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়।
সে পিছু ফিরে তাকালো। ইগো ভুলে বলল,

“তন্ময় বলেছিল আপনি সুইট আপু। কিন্তু আমি তো দেখছি আপনি ভীষণ তেঁতো স্বভাবের মানুষ।”
বিন্দু পিছু ফিরে চেয়ে বলল,
“আমি তাদের সাথেই মিষ্টি যারা মিষ্টতা ডিজার্ভ করে।”
“এক দেখায় আমায় এতটা অযোগ্য মনে করা উচিৎ নয় মিস তেঁতো আপু।”
শেষের সম্বোধনটা একটু খোঁচা যুক্ত শোনালো। রুহান এগিয়ে এসে দুই সিঁড়ি নেমে বিন্দুর মুখোমুখি দাঁড়ালো। রুহানের মনে হলো চারিপাশ একটু বেশিই নিস্তব্ধ প্রাণহীন। নয়তো এই তেতো আপু নামক নারীটি কেন দৃষ্টির সকল আকর্ষণ কেড়ে নিচ্ছে? নারীটির মাঝে বিশেষ কিছুই নেই। কিন্তু তবুও বিশেষ দেখতে লাগছে। তার পরিপাটি, মার্জিত, লজ্জালু চাল-চলন। ডাগর ডাগর চোখে কেমন জল ছলছল করছে। তার চোখে নম্রতা ভীড় জমায়। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“আমি কোচিং সেন্টারে বলে দিয়েছি আগেই। আপনি আজকেই জয়েন করতে পারবেন।”
“কোনো পর্যবেক্ষণ ছাড়া?”
বিন্দু কৌতুহলী গলায় শুধাল। রুহান বলল,

“তন্ময় আপনার এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড দেখিয়েছে। আর আগের কোচিং এর পার্ফরম্যান্স ও দেখিয়েছে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে আমি আপনাকে একদম যোগ্য বলে ধরে নেইনি।”
“তবে যেদিন যোগ্য বলে মনে হবে সেদিন ই জয়েন করব।”
বিন্দু কপাল কুঁচকে দৃঢ় কণ্ঠে বলল। রুহান স্মিত হাসল। তার ভালো লেগেছে মেয়েটির আত্মবিশ্বাস। সে বলল,
“ভেবে দেখুন। পরে না নিজের সিদ্ধান্ত আবার নিজের উপর ভারী পড়ে।”
বিন্দুর চোখেমুখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমা কখনো নিজের সিদ্ধান্তে আফসোস করি না। আপনি যেকোনো ধরণের পরীক্ষা নিতে পারেন।”
“আচ্ছা ছোট্ট একটা পরীক্ষা নেই।”
“এখন?”
“হ্যাঁ, কেন সমস্যা?”
“নাহ।”
“আচ্ছা সোজা একটা প্রশ্ন করছি। ধরুন আপনার সামনে কোনো ল্যাব নেই। শুধু একটা দেয়াল আর একটা চক আছে।”
বলতে বলতেই রুহান মেঝে থেকে একটা কয়লার টুকরো তুলে নিলো। ছাদের প্রায়শই বারবিকিউ পার্টি করা হয়। এটা তারই।
সে কয়লাটা বিন্দুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“আমি আপনাকে H₂O, CO₂ আর SO₂ দিলাম। শুধু তাদের আণবিক গঠন এঁকে বলুন, কোনটার ডাইপোল মোমেন্ট শূন্য আর কেন?”
বিন্দু কয়লার দিকে চেয়ে বলল,
“কয়লা দিয়ে দেয়ালে আঁকাব? দেয়ালটা নষ্ট হয়ে যাবে না?”
রুহান বিদ্রূপ করে বলল,
“দেয়ালের চিন্তা না-কি নিজের ওভার কনফিডেন্স নষ্ট হওয়ার চিন্তা।”
বিন্দু ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল,
“আমার ওভার কনফিডেন্সের মতো কী আপনার ও ভবিষ্যৎ বানী করার অভ্যাস আছে? আপনাকে কে বলল আমার ওভার কনফিডেন্স নষ্ট হবে?”
বিন্দু লোকটির দিকে এক নজর তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে দেয়ালে আঁকাতে শুরু করল। পরপর দেয়ালে তিনটা গঠন এঁকে দেখিয়ে বলল,

H₂O → বাঁকা → ডাইপোল মোমেন্ট আছে।
SO₂ → বাঁকা → ডাইপোল মোমেন্ট আছে।
CO₂ → সরলরেখা → দুই দিকের ডাইপোল একে অপরকে বাতিল করে, তাই ডাইপোল মোমেন্ট শূন্য।
এতটুকু বলে বিন্দু থামল। কয়লা ফেলে দিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পুনরায় বলল,
“একই ধরনের বন্ড থাকলেই ফল এক হয় না; অণুর জ্যামিতি ঠিক করে দেয় অণুটা পোলার হবে নাকি নন-পোলার। আশাকরি আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন।”
রুহানের ঠোঁটে মিটিমিটি হাসির দেখা দিলো। সে নীরবে মাথা নেড়ে সায় জানালো। বলল,
“আশাকরি স্টুডেন্টরাও আপনার থেকে ভালো কিছু পাবে।”
“হুম।”
বলেই বিন্দু তার দিকে আত্মবিশ্বাসী এক নজর ফেলে নিচে নেমে গেল। নরীটির ওড়না ছাপিয়ে দোদুল্যমান ঘন কালো কোঁকড়ানো চুলপানে বাঁকা দৃষ্টি ফেলে রুহান ও তার পিছেই নিচে নেমে আসল।

তালহারের গাড়িটা একটা আট তলা দালানের সামনে এসে থামলো। মেঘ জানালা থেকে বাইরে তাকালো। কৌতুহলী কণ্ঠে শুধাল,
“তুমি দুইবার গাড়ি বদলালে কেন মাঝে?”
তালহার সিটবেল্ট খুলতে খুলতে বলল,
“এমনি।”
“এমনি নাকি কেউ যেন তোমার বাসার সঠিক এড্রেস বুঝতে না পারে তাই এমনটা করো।”
পুনরায় মেঘের সন্ধানী কণ্ঠে তালহার স্মিত হাসল। এটাই আসল কারণ। কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর করল না। গাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। মেঘ তখনো ভেতরে। তালহার উঁকি দিয়ে বলল,
“কী হলো নামবে না?”
মেঘ মুখ ফুলিয়ে বলল,
“একটু দরজাটা খুলে দিয়ে হাত ধরে নামিয়ে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট তো দিতে পারো, তালহার। প্রথমবার তোমার বাসায় এসেছি।”

রোদের ঝলকানিতে তালহারের চোখমুখ কুঁচকে আছে। সেভাবেই নিরুদ্বেগ বলল,
“কিন্তু আমি কোনো প্রিন্স নই, আর না তুমি প্রিন্সেস। তাই প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিতে পারছি না। দ্রুত নামুন, ম্যাম।”
মেঘ খিলখিলিয়ে হেসে উঠে নেমে আসল। তার পরনে ব্রাউন কালার ব্যাগি প্যান্ট আর কালো একটা কূর্তি কাঁধে একটা ঝুলন্ত ব্যাগ। গলায় কোনো স্কার্ফ নেই। কোমর সমান তার চুলগুলো অনাদরে উড়ছে। সেথায় নেই কোনো ক্লাচার নামক বেরিবাঁধ।
চার তলায় লিফট থামতেই মেঘের চোখে ভেসে উঠল একটি স্বর্ণালী আভার নেইমপ্লেট। কিন্তু নেইম প্লেটে লেখা নামটি অদ্ভুত! সেখানে শুধু তিনটা অক্ষর লেখা বি.টি.এম।
সে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তালহার, এটা কেমন নাম?”
তালহার তালা খুলতে খুলতে এক পলক নেইম প্লেটটিকে দেখে বলল,
“এই বাড়ির আসল মালিকের নাম।”
“ওহ্, এটা ভাড়া বাড়ি? আমি ভেবেছিলাম এটা তোমার নিজের বাড়ি।”

মেঘের সরল কণ্ঠে তালহার আলতো হাসল কিন্তু কিছু বলল না। তবে দরজা খুলতেই মেঘের উচ্ছ্বসিত চিত্ত আচমকা বিলীন হয়ে যেতে লাগল। তালহার দরজা আঁটকে লিভিং রুমে আসতেই প্রিশা এক লাফে তার কোলে উঠে গেল।
মেঘ তখনো থমকানো চিত্তে পুরো ঘরময় চোখ বুলাচ্ছে। তার পা কেন যেন আর চলছে না। কারণ ওটা কোনো সাধারণ ব্যাচেলর পুরুষের ঘর মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন ওটা কোনো নারীর ভীষণ যত্নে গড়া শখের সংসার।
কোনায় কোনায় যত্নের ছোঁয়া, শৌখিনতা, ইনডোর প্লান্ট, ঝাড় বাতি, ফেইরি লাইট, দোলনা সহ আরো অনেক সাজসজ্জায় জ্বলজ্বল করছে ঘরটি। মেঘ চমকে তাকালো তালহারের দিকে। অস্ফুট স্বরে বলল,
“এটা তোমার ঘর তালহার?”
“হ্যাঁ, কেন?”
তালহার লিভিং রুম সংলগ্ন খোলা বারান্দার পর্দা সরিয়ে দিতে দিতে বলল।
মেঘ আশ্চর্য হয়ে বলল,

“আর ইউ শিওর এটা তোমার ঘর?”
“কী উল্টাপাল্টা কথা মেঘ?”
মেঘ উদ্বেগ চেপে রাখতে পারল না।
“কারণ এটা কোনো সাধারণ ঘর মনে হচ্ছে না তালহার। মনে হচ্ছে এটা কারোর যত্নে গড়া সংসার।”
তালহারের দৃষ্টি সরু হয়ে আসল। পকেটে হাত গুঁজে নির্বিকার বলল,
“আমি তোমায় সবটা বলেছিলাম।”
মেঘ এগিয়ে আসে তার কাছে। বিচলিত কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ, তুমি বলেছিলে তোমার ঘরের সব খেয়াল তোমার মেইড রাখে। কিন্তু তাই বলে এত যত্ন করে?”
“নারী মানেই যত্নশীল। তুমি মানো বা না মানো। ইটস ইয়োর চয়েজ। কী নেবে? ঠান্ডা, গরম, এনিথিং এলস?”
তালহারের শীতল কণ্ঠে মেঘ কৃত্রিম হাসল। সে তখনো বিষয়টাকে সহজভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করছে। বলল,
“ঠান্ডা কিছু দাও।”
“বসো, দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
মেঘ বসল না। সে ঘুরে ঘুরে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে সবটা দেখতে লাগল। তালহার পুরো ফ্রিজ খুলে বিভ্রান্ত দৃষ্টি ফেলল। ফ্রিজ দেখতে দেখতে অবুঝ কণ্ঠে বলল,

“ঠান্ডা কী দেব? আইসক্রিম, চকলেট, বেভারেজ, জুস নাকি পেস্ট্রি?”
মেঘ তখন রান্নাঘর দেখছিল। সে এগিয়ে আসল ফ্রিজের কাছে। সেখানে আচার থেকে শুরু করে এমন কোনো খাবার বাদ নেই যা একটা মেয়ে মানুষ সাধারণত খেতে পছন্দ করে। তার এখানেও মন খচখচ করে উঠল।
“এই ধরণের খাবার তুমি খাও?”
তালহার তার চোখের দিকে তাকায়। যেখানে অজস্র খচখচানি স্পষ্ট। বলল,
“হুম, কেন খেতে পারি না?”
“এগুলো বাইরের খাবার।”
“এগুলো আমার ফ্রিজের খাবার। এখন কী খাবে বলো। এত ভেবো না। বেশি ভাবলে দুশ্চিন্তা ছাড়া আর কিছুই হবে না।”
মেঘ জোরপূর্বক হেসে বলল,

“জুস দাও।”
তালহার তাকে জুস দিলো নিজে একটা ক্যান বের করল। কিন্তু মেঘের দৃষ্টি এঁটে আছে নিচে থাকা আধখাওয়া একটি কেকের দিকে। কৌতুহল দমাতে পারল না।
“এই কেক কোথায় পেয়েছ তালহার?”
তালহার কেকটি দেখল। এখনো অর্ধেক আছে। বলল,
“খাবে? হোমমেইড। অনেক টেস্টি।”
“তুমি যখন টেস্টি বলেছো তখন অবশ্যই খাবো। কিন্তু বললে না কোথায় পেলে?”
“কোথায় আর পাব?”
“মেইড বানিয়েছে?”
“হুম।”
তালহার তাকে কেক কেটে একটা বাটিতে দিলো। সে জুস রেখে আগে সেটাই খেয়ে দেখল। তালহারের কথা সত্যি ছিল। সে অমন সুস্বাদু কেক এর আগে কখনোই খায়নি। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“একজন মেইড এত সুন্দর কেক কী করে বানায়?”
প্রেক্ষিতে তালহার স্মিত হেসে লিভিং রুমে চলে গেল। মেঘ চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
“আমি তোমার মেইডের সাথে দেখা করব। তারপর তুমি আমার রান্না ছাড়া আর কারোর রান্না খাবে না।”
তালহার প্রিশাকে কোলে তুলে নিয়ে সোফায় বসল। মেঘ ঠিক তার অপোজিটে বসে বলল,
“এটা কী আদুরে তালহার! তোমার বিড়াল?”
তালহার প্রিশাকে আদর করতে করতে বলল,
“হুম।”
মেঘ তাকে অবলোকন করেপ অবাকের রেশ ধরে বলল,
“আমি এই তালহার মুজাহিদকে কোনোভাবেই চিনতে পারছি না।”
“তুমি কোনো তালহার মুজাহিদকেই চেনো না।” তালহার আনমনে জবাব দিলো। মেঘের দৃষ্টি থমকায়। থমকানো চিত্তে শুধায়,
“সত্যিই কী তাই?”

তালহার তার চোখের গভীরতায় ডোবে না। মুখাবয়ব শীতল, স্থির হয়ে আসে। ধিমি কণ্ঠে বলল,
“আমি তোমায় কিছু কাজ দিয়েছিলাম, মেঘ।”
“ওই যে রিসার্চের ব্যপারে?”, মেঘ কেক খেতে খেতে বলল। তালহার মাথা দোলালো। মেঘ নিরুদ্বেগ বলল,
“বাবা তো দেশে আসছে না, তালহার। আসতে আরো একমাস দেরি হবে। তখন দিতে পারব।”
“ওহ্, আচ্ছা।”, তালহারের মুখশ্রী অনতিবিলম্বে মলিন হয়ে গেল। মেঘ খেয়াল করল সেই মলিনতা। জিজ্ঞেস করল,
“কেন এত প্রয়োজন বাবার ওই ফাইলগুলো?”
তালহার প্রিশার মাথায় হাত বুলানো ছেড়ে টিভি ছেড়ে দিলো। সাথে সাথেই ভেসে উঠল মানুষের দূর্ভোগ আর উত্তপ্ত জনজীবন ব্যবস্থা। যেখানে গ্যাস, তেল আর বিদ্যুতের অভাবে সরকার ব্যবস্থাকে একের পর এক গালি, লানত দিয়ে যাচ্ছে জনগন।
মেঘ তা দেখে বলল,
“এগুলোর উপর রিসার্চ করছ তুমি?”
“হুম।”
“তাতে বাবা কী সাহায্য করতে পারবে তোমায়?”

“তোমার চাচু একজন প্রাক্তন ভূতত্ত্ববিদ। তার এই বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। যেটা আমার রিসার্চকে অন্য এক মাত্রা দেবে। আর এই রিসার্চ আমি ঠিকভাবে শেষ করতে পারলে অফিসের সবার চেয়ে আমার রিসার্চ বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। আর প্রমোশনের সম্ভাবনা ও বেড়ে যাবে।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমায় সাকসেসফুল হতে দেখার জন্য সবকিছু করব। কিন্তু এগুলো লুকিয়ে চুপিয়ে কেন করতে বলছ? আমি বাবাকে বললেই সে এই তথ্যগুলো দিয়ে দেবে।”
তালহার ঘাড়ে হাত মর্দন করল। সে এটা তখনি করে যখন সে খুব দুশ্চিন্তায় থাকে কিংবা খুব রাগান্বিত। ধিমি কণ্ঠে বলল,

“দেবে না। কারণ এগুলো এমন তথ্য যা জনগনের মাঝে লিক হলে সমস্যায় পড়তে হবে।”
“তাহলে আমি তোমায় কেন এই তথ্যগুলো এনে দেব?”
মেঘ সরব ভ্রু কুঁচকে নিলো। তালহার মৃদু হেসে বলল,
“কারণ আমি এগুলো লিক করব না শুধু আমার প্রমোশনের জন্য ব্যবহার করব। আর আমি জানি তুমি আমায় কখনো নাকচ করবে না।”
মেঘ মৃদু হাসল। বলল,
“তুমি ঠিক জানো। তোমায় সাকসেসফুল হতে দেখা আমার জন্য সবচেয়ে সুখকর দৃশ্য হবে। আমি যেভাবেই হোক তথ্যগুলো তোমায় এনে দেব। কিন্তু আগে চাচুর দেশে আসতে হবে।”
তালহার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কথোপকথনের গভীরতা বোঝার চেষ্টায় মগ্ন। কিছু ভালোবাসার স্বীকারোক্তি পিড়াদায়ক হয় আবার কিছু ভালোবাসার স্বীকারোক্তি সুখময় হয়। কিন্তু সে এই মুহূর্তে কী অনুভব করছে?
মেঘ জুস খেয়ে বলল,

“তোমার বিড়ালের নাম কী?”
“প্রিশা।”
“তুমি রেখেছো?”
“নাহ।”
“তবে?”
“ওর মা রেখেছে।”
তালহার প্রিশার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল। মেঘ অবুঝ কণ্ঠে বলল,
“ওর মা কে?”
তালহার চোখ তুলে তাকায়। ধিমি কণ্ঠে বলে,
“যার ছায়াতলে ও বড় হয়েছে।”
“ওহ, ওকে অন্য কারোর কাছ থেকে এনেছো? আমার কোলে একটু দাও তো।
মেঘ এগিয়ে গিয়ে তার সোফায়, তার ঠিক পাশে বসে হাত বাড়াতেই তালহার প্রিশাকে এগিয়ে দিল। কিন্তু প্রিশা নামক অতি শান্তশিষ্ট আদুরে বাচ্চাটি আচমকাই অদ্ভুত আচরণ করে বসল। সে রেগে গিয়ে মেঘকে খামচি দিয়ে তালহারের কাঁধে উঠে গেল।
মেঘ আর্তনাদ করে উঠল। তালহার চমকে উঠল।
“ব্যথা পেয়েছ? আরে প্রিশু? পাপা তুমি তো কাউকে কখনো আঘাত করো না। আন্টিকে আঘাত করলে কেন? ভেরি ব্যাড!”

তালহার দ্রুত মেঘের হাতে এন্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে দিল। কিন্তু মেঘের মাথায় গেঁথে গেল তালহারের সদ্য বলা আদুরে ডাক। “পাপা!”
যাওয়ার আগে তালহার তাকে পুরো ঘর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো কিন্তু একটা রুম বাদে। মেঘ ও জোর করল না। জোর করলে হয়তো দেখতে পেতো কামড়াজুড়ে এক রানীর অজস্র অস্তিত্ব আর কাবার্ড জুড়ে শত শত শাড়ির সমাহার। হয়তো বুঝতে পারত, এটি একটি রানীর নিবাস নচেৎ কোনো মেইডের।
ঘর থেকে বের হওয়ার আগে তালহার মেঘকে একটা জুয়েলারি বক্স দিল। মেঘ কৌতুহলী হয়ে খুলতেই দেখল, প্লাটিনামের উপর পাথর খচিত একটি এয়ারিং রয়েছে সেখানে। সেটি অনেক দামী ছিল।
মেঘ অবাক হয়ে বলল,
“এটা কেন?”
তালহার মৃদু হেসে বলল,
“আমার খুব কাছের বন্ধুর জন্য একটা ছোট্ট উপহার। আশাকরি সবসময় পড়বে।”
“এটা অনেক দামী।”
“বন্ধুকে তো দেয়াই যায়।”
মেঘ স্মিত হেসে সেটি তৎক্ষণাৎ কানে পড়তে পড়তে বলর,
“এত দামী উপহার বন্ধুকে দেয় না, ভালোবাসার মানুষকে দেয়। তুমি এখনো স্বীকার করবে না।”
তালহার প্রত্যুত্তর করল না শুধু তাকিয়ে রইল। মেঘ অভ্যস্ত তার এই মৌনতায়। আর এই মৌনতাই ইদানিং তার ভালোবাসার অন্যতম এক মাধ্যম।

প্রথম দিন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের একটা ক্লাস পড়ল বিন্দুর। তন্ময়দের ভার্সিটিতে কখনোই তেমন ক্লাস হয় না। আর না পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রফেসর আছে। তাই তাদের কোচিং করতে হয় অন্য ভার্সিটির প্রফেসরদের কাছে। কিন্তু তারা বিন্দুর কাছে একটা নির্দিষ্ট বিষয় খুব ভালো বুঝতে পারে। তাই সেই সাবজেক্টের দ্বায়ভার এখন তারা সম্পূর্ণ বিন্দুর মাথাতেই তুলে দিয়েছে।
ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা নারীটি রসিয়ে রসিয়ে বলল,
“ভাবিজান, আপনি কই গেলেন? আপনি যাইতে না যাইতেই ভাইজান ঘরে মাইয়া মানুষ আনতে শুরু করছে। আমি আপনারে আগেই কইছিলাম আইজকালকার পুরুষ মানুষরে একলা ছাড়া উচিৎ না।”
কানে ফোন চেপে বিন্দু ঘেমে ওঠা বদনে এদিক ওদিক তাকালো আর ঘাড়ে হাত ডলতে লাগল। চোখে টলটল করছে, ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হতে শুরু করল। সে লম্বা লম্বা শ্বাস নেয় আর নিজেকে সামলায়। তালহারের ঘরের কাজের মহিলাকে ফোন দেয়া যে তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল তা বুঝতে পেরে নিজের উপর রাগ হয়। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,

“আমি এগুলো শুনতে চাইনি, মালা। আমি শুধু বলতে চাচ্ছিলাম যে, প্রিশার জ্বর গত দু’দিন যাবৎ। ওকে ওষুধ খাওয়াতে হবে আরো তিনদিন। ওর ওষুধ আমি কোথায় রাখতাম তা তো আপনি জানেন। ওকে একটু নিয়ম করে ওষুধটা আগামী তিনদিন খাইয়ে দেবেন নয়তো ও আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
“আচ্ছা ভাবি। ভাইজান অবশ্য নিজেই প্রিশার জ্বর দেইখা ওষুধ খাওয়াইছিল।”
বিন্দুর আরকিছু শোনার ইচ্ছা হলো না। সে ফোনটা কেটে মালার নাম্বার ও ব্লক করে দিল। চোখমুখ অচিরেই লাল হয়ে উঠল কান্না আর যন্ত্রণা চেপে রাখতে রাখতে।
তবুও একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু গড়িয়েই পড়ল। বিন্দু তৎক্ষণাৎ সেই অশ্রু টুকু মুছে ফেলল। দৃঢ় কণ্ঠে আওড়ালো,

“ আপনার প্রতি আমার যত মায়া ছিল আমি সব কাটিয়ে এসেছি, তালহার। আপনি কী জানেন, একবার মায়া কেটে গেলে আপনাকে এক নারী কেন শত নারীর সাথে দেখলেও একটুও কষ্ট হবে না আমার।”
বলতে বলতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার কষ্ট হচ্ছে না। একটুও কষ্ট হচ্ছে না। এটাই তো হওয়ার ছিল। এর জন্যই তো সে তার ঘর সংসার সবকিছুর মায়া ছেড়ে এসেছে। কিন্তু তবুও তার চোখে পানি।
তন্ময় দূর থেকে তাকে অবলোকন করে এগিয়ে এলো।
“আপু কী হয়েছে, কাঁদছেন কেন?”
তন্ময়ের কণ্ঠে বিন্দু তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে ফেলল। কৃত্রিম হেসে বলল,
“কই না তো।”
“আমি তো দেখলাম।”

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৩

“ভুল দেখেছো। আর সকালের কফি এবং লিলি ফুলের জন্য ধন্যবাদ, ছোট ভাই। দুটোই আমার খুব প্রিয়। তুমি আমার এত সাহায্য করলে আমি কী করে এর ঋণ শোধ করব জানি না। আমি একটু আসছি হ্যাঁ? শরীরটা ভালো লাগছে না। বাসায় যাই।”
সে এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল কোচিং থেকে। কিন্তু তন্ময় তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে আছে তার গমনের দিকে। কফি? সে তো একটা লিলিফুল দিয়েছিল শুধু। কোনো কফি তো দেয়নি।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here