তাকদিরে তুমি পর্ব ৩
মোনালিসা মেহরোজ
—উফ্, হোয়াট দ্যা ফা……।
কথাটা বলতে বলতেই থেমে গেলো পুরুষটি। চোখদুটো কয়েকবার ঝাপটা দিয়ে নিজের পানে তাকাতেই খেয়াল করলো মুখখানাসহ সোফাটাও ভিজে গেছে। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেরুন রঙের থ্রি-পিস পরিহিতা এক রমনী। আসিফ তাকাতেই সে আড়াল করলো নিজের মুখশ্রী। ওড়নার ভাঁজ টেনে মুখটা আরও ঢেকে ফেলল৷ আসিফের বুঝতে বেগ পোহাতে হলো না যে ঘটনা কী। দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো সে। রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলো রীতিমতো।
—তুমি…!
শব্দটা প্রায় ফেটে বেরোল তার গলা থেকে। সোফার দিকে একবার তাকিয়ে আবার মেয়েটার দিকে ফিরল। চোখে রাগের আগুন। ফাতিহা নড়ল না। শান্ত, স্থির দাঁড়িয়ে রইল। আসিফ কিছু বলার আগেই ফাতিহা বললো—-
—ফজরের আযান শুনতে পাননি? যান, নামাজ পড়ে আসুন।
আসিফ ঠোঁট বাঁকালো। শীতল গলায় বললো—-
—তুমি ভেবেছো গ্লাসে করে পানি ছুড়ে মারলেই আমি দৌড়ে মসজিদে চলে যাবো? পাগল পেয়েছো আমায়?
ফাতিহা এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো। চোখদুটো বরফের ন্যায় ঠান্ডা করে বললো—
—আমি জানি আপনি জেদী, তাই আপনাকে জেদের জায়গা থেকেই নাড়া দিতে হবে। আর এখন আপনি নামাজ আদায় করতে যাবেন, যাবেন মানে যাবেন।
আসিফ এক ধাপ এগিয়ে এলো। তাচ্ছিল্য নিয়ে বললো—-
—হুকুম করছো আমায়? আর আমাকে নাড়া দেওয়ার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? হু আর ইউ দ্যা বি***।
ফাতিহার চোখে এবার সামান্য দৃঢ়তা বাড়ল। সাথে চোয়ালদ্বয় শক্ত হলো আসিফের মুখে গালি শুনে। সে চোখ বন্ধ করে নিলো।
—আল্লাহ দিয়েছেন।
এই কথাটায় আসিফ আরও রেগে গেলো। হাত উঠিয়ে সোফার ভেজা অংশটা দেখিয়ে বলল—
—আর এটা?এটা কী?
—একটা ছোট ভুল।
—ছোট ভুল?
আসিফ হেঁসে ফেলল, কিন্তু সেটা হাসি না—তীক্ষ্ণ কটাক্ষ যা সে এই মুহূর্তে ফাতিহাকে করলো।
—তুমি আমার ঘরে এসে আমার ওপর ‘ছোট ভুল’ ট্রায়াল চালাচ্ছো?
ফাতিহা শান্ত গলায় বলল—-
—না। আমি আপনাকে জাগানোর চেষ্টা করছি। অনেকবার ডেকেছি আপনাকে, তবে আপনি সোজাভাবে কথা শোনার মানুষ নন বুঝতে পেরে পানি ছুঁড়েছি।
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো পুরো ঘরজুড়ে। আসিফ চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল তার দিকে। যেন মেয়েটাকে প্রথমবার সত্যিকারের ওজন করে দেখছে। বুঝতে চাইছে তার কথার ভাবধারা। আসিফ বিরক্ত হলো। চোখমুখ কুঁচকে ফের বলল—-
—তুমি ভয় পাও না আমাকে? আমার সাথে এভাবে অসভ্যতা করছো আমি ধরলে বাঁচতে পারবে? কলিজা কতবড় তোমার?
ফাতিহা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। শীতল গলায় উত্তর করলো—-
—আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না।
এই কথার পর আসিফ আর কিছু বলল না।
শুধু দাঁতে দাঁত চেপে সোফার ভেজা জায়গার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। ফাতিহার দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো—
—পাগল একটা…।
বলেই সে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলো।
কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে থেমে গেলো একবার। পেছনে তাকালো না। তবুও বলল—-
—এই খেলাটা তোমার জন্যই খারাপ হয়ে যাবে, মেয়ে। ভেবো না পাড় পেয়ে যাবে।
কথাটা শেষ করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো আসিফ। ঘরে রইল শুধু ফাতিহা আর এক অদ্ভুত নীরবতা। ফাতিহা ধীরে ধীরে সোফার দিকে তাকাল। ভেজা জায়গাটা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
—হেদায়েত শুধু কথা দিয়ে হয় না…।
নিজের কাছে খুব নিচু গলায় বলল সে। অতঃপর জায়গাটা পরিস্কার করে বেড়িয়ে গেলো স্টাডি রূম হতে।
বিকেল পাঁচটা।
আসিফ ফোন চালাতে চালাতে বাড়িতে প্রবেশ করলো। মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সারাদিন বাইরে কাটিয়ে এখন তার একমাত্র ইচ্ছে ছিল নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকা।
কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই থমকে গেল সে।
সোফায় বসে আছেন মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। চেহারায় প্রশান্তির ছাপ। লোকটিকে অচেনা লাগলেও সম্পূর্ণ অপরিচিত নয়। বিয়ের দিন দেখেছিল সে। সম্পর্কে ফাতিহার বাবা হন ভদ্রলোক। কথাখানা ভাবতেই আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ঠিক তখনই আযান মির্জা ছেলেকে দেখে হাসিমুখে বললেন—-
—আসিফ, এই যে তোর শ্বশুর এসেছেন। সালাম কর।
না চাইতেও সালাম করতে হলো তাকে।ভদ্রলোক স্বস্নেহে উত্তর দিলেন।
—ওয়াআলাইকুমুস সালাম, বাবা। কেমন আছো?
—ভালো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে যাবে, এমন সময় আযান মির্জার কড়া গলা ভেসে এলো—-
—কোথায় যাচ্ছিস?
আসিফ বিরক্ত মুখে ফিরে তাকালো।
—রুমে।
—আগে বস এখানে এসে। শশুর আব্বা এসেছে, গল্প কর পরে যা।
—বাবা…।
—বসতে বলেছি।
বাবার চোখ রাঙানিতে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না আসিফ। বিরক্তি চেপে গিয়ে ধপ করে সোফায় বসে পড়লো। ড্রয়িংরুমে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এলো।ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন—
—শুনলাম তুমি নাকি ব্যবসায় যোগ দিচ্ছো না?
আসিফ ভ্রু কুঁচকালো। আবারও সেই একই কথা! তাকে বাড়ির কথা কে বললো? ফাতিহা নিশ্চয়ই! আসিফ মনে মনে রাগান্বিত হলো। তবুও নিজেকে সামলে বললো—
—জ্বী।
—কেন?
—ইচ্ছা নেই।
—সব কাজ কি ইচ্ছা দিয়ে হয়, বাবা?
আসিফ এবার সরাসরি তাকালো তার দিকে।
ভদ্রলোকের চোখে কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো রাগও নেই। অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি।
যেটা আসিফের কাছে আরো বিরক্ত লাগছে। মনে হলো, ফাতিহা ঠিক তার বাবার মতো। রাগে না, জোড় করে না—অথচ গলার স্বরে তার কথা শুনতে বাধ্য হতে হয় এমন ভাব। বাবার মেয়ে বলে কথা, এক হবে না? মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসলো আসিফ। ফোন চাপতে চাপতে বললো—-
—আমি আমার জীবন কীভাবে চালাবো সেটা আমি জানি। আপনারা এটা নিয়ে না ভাবলে খুশি হবো।
কথাটা বলেই ফোনে চোখ নামিয়ে নিলো সে।
আযান মির্জার মুখ শক্ত হয়ে এলো। কিন্তু ভদ্রলোক শুধু মৃদু হাসলেন। শান্ত গলায় বললেন—
—জানো বলেই তো বলছি। দায়িত্ব থেকে পালিয়ে থাকা মানুষকে মানুষ রূপে মানায় না। আর তুমি ছোট্ট, বড়রা দিকনির্দেশনা দিবেই, তোমার বাবাও যেমন দেন—তেমন আমিও তোমাকে উপদেশ দিতে পারি।
আসিফ এবার ফোনটা নামিয়ে রাখলো।
—আপনি কি আমাকে উপদেশ দেওয়ার জন্য এসেছেন?
কথাটা শোনামাত্র সায়না মির্জা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। আযান মির্জার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ভদ্রলোক রাগলেন না। বরং শান্ত কণ্ঠে হাসি হাসি মুখে বললেন—-
—না। আমি আমার মেয়েকে দেখতে এসেছি। সাথে দেখতি এসেছি মেয়ে জামাই ও তার সংসারটাকে।
তার কথায় এক মুহূর্তে পরিবেশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আসিফ চোখ ফিরিয়ে নিলো। ঠিক তখনই রান্নাঘরের দিক থেকে ট্রে হাতে বেরিয়ে এলো ফাতিহা। মাথায় ঘোমটা টানা। চোখ নিচু, একেবারে মাটিতে তাক করে রাখা।ট্রেতে ধোঁয়া ওঠা চা আর নাস্তা।
বাবাকে দেখেই তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে জানেই না বাবা তার এসেছে। কাজে ব্যস্ত ছিলো বিধায় এদিকটায়ও আসে নি। শশুর আব্বার জন্য বিকেলের নাস্তা বানাচ্ছিলো কি-না!
—আসসালামু আলাইকুম, আব্বাজান। কেমন আছেন।
—ওয়াআলাইকুমুস সালাম, আম্মাজান। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আছি৷ আপনার কি খবর আম্মা?
ভদ্রলোকের কণ্ঠে স্পষ্ট স্নেহ। ফাতিহা নত হয়ে বাবার সামনে চা রেখে দিলো। তারপর মৃদু স্বরে বললো—-
—আলহামদুলিল্লাহ।
অতঃপর ফের বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললো—
—কখন এসেছেন আব্বা? জানালেন না যে?
—এই তো, কিছুক্ষণ আগে। আর না জানিয়ে আসলে কি আসা হতো না আমার মেয়ের সংসারে?
—কি যে বলেন আব্বাজান!
বাবা-মেয়ের কথোপকথন নীরবে দেখছিল আসিফ। কেন জানি দৃশ্যটা তার বিরক্ত লাগার কথা। কিন্তু অদ্ভুতভাবে লাগলো না। সে তাকিয়ে রইলো, মনটা কেমন জানি করে উঠলো তার। সে ঘাড় ঘুড়িয়ে নিজের বাবার দিকে তাকালো। মনে হলো, সে এভাবে কতদিন তার বাবার সাথে কথা বলে না। কতদিন বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়না।
তবে এই কোমল চিন্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আচমকায় নিজের চিন্তায় বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। ঠিক তখনই ফাতিহার বাবা আবার বললেন—–
—মা, জামাই সাহেবের খেয়াল রাখো তো?
ফাতিহা উত্তর দেওয়ার আগেই আসিফ ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলো—–
—আমার খেয়াল রাখার কোন প্রয়োজন নেই আপনার মেয়ের।
ফাতিহা এবার প্রথমবারের মতো তার দিকে তাকালো। চোখে কোনো রাগ ছিলো না তার।
শুধু শান্ত একটা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।
—খেয়াল রাখা আর প্রয়োজন হওয়া এক জিনিস নয়।
আসিফ থমকে গেল আচমকা। আযান মির্জা কাশলেন। সায়না মির্জা মুখ চেপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করলেন। আর ফাতিহার বাবা নিচু হয়ে কাপের চায়ে চুমুক দিলেন। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো তার।
আসিফ বিরক্তিকর নয়নে ফাতিহার দিকে তাকালো। মেয়েটার টানাটানা চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখা গেলো না। অথচ সেই টানাটান চোখজোড়া কয়েক মুহূর্তের জন্য তার হৃদয় থমকে দিলো। হুট করেই শীতল হাওয়া বয়ে গেলো তার হৃদয়জুড়ে।
নিচ থেকে উপরে এসে ফ্রেশ হতে গেলো আসিফ। ফাতিহা নিজেও স্বামীর পিছুপিছু উপরে পা রাখলো। আর ঘরের ভেতরে পা রাখতেই কানে ভেসে এলো ফোনের কর্কশ আওয়াজ। বিছানার পানে তাকালো মেয়েটা। অতঃপর ধীর পায়ে সেদিকপানে এগিয়ে গেলো মেয়েটা। ফোনের স্কিনে জ্বলজ্বল করছে ‘ছায়া’ নামটা।
ফাতিহা ওয়াশরুমের দিকে একবার তাকালো। অতঃপর আবার ফোনের পানে। ফোনটা প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেলো, অতঃপর ফের বাজতে লাগলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানে ধরলো ফাতিহা। শান্ত স্বরে বললো—-
—আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?
—এক্সকিউজ মি! আপনি কে? আর আসিফের ফোন একজন মেয়ের হাতে কি করছে?
ফাতিহা অতন্ত্য সাবলীল ভাবে উত্তর করলো—-
—আপনি যাকে ফোন করেছেন, আমি তার স্ত্রী।
কথাটা বলা মাত্রই ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এলো। মেয়েটা অবিশ্বাস্য স্বরে বললে—-
—এক্সকিউজ মি? কি যা-তা বলছেন এসব?
—জ্বী। আমি ফাতিহা মির্জা। মিস্টার আসিফ মির্জার স্ত্রী।
ওপাশের মেয়েটি যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছে না। সে বললো—–
—আসিফ… ম্যারিড? বিয়ে করেছে সে?
—জ্বী।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো আসিফ।চুল থেকে এখনো পানি ঝরছে। হাতে তোয়ালে। কিন্তু তার চোখ ফাতিহার উপরে পড়তেই জমে গেল সে।ফাতিহা তার ফোন কানে ধরে কথা বলছে। এক মুহূর্তের মধ্যে আসিফের মুখের রঙ বদলে গেল। চোয়ালদ্বয় শক্ত হয়ে এলো। সে শক্ত গলায় দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—তুমি আমার ফোনে হাত দিয়েছো?
ফাতিহা ঘুরে তাকালো আসিফের পানে। স্বাভাবিক গলায় বললো—–
—বারবার কল আসছিল। জরুরি মনে হলো তাই রিসিভ করলাম।
ফাতিহার কথায় আসিফের রাগ তখন মাথায় চড়ে বসলো। সে দুই পা এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ফাতিহার কব্জি চেপে ধরলো নিজের শক্ত হাতের মাঝে।
—কে বলেছে তোমাকে আমার ফোন ধরতে?
গর্জন করে উঠলো আসিফ। হঠাৎ আক্রমণে ফাতিহার হাতটা সামান্য বেঁকে গেল। তবে সে কোনো শব্দ করলো না। শুধু শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো আসিফের দিকে।ওপাশে থাকা মেয়েটি সব শুনতে পাচ্ছিল তখন।
—আসিফ? হ্যালো? হোয়াট’স গোয়িং অন?
আসিফ ফোনটা কেড়ে নিল প্রায়। ফাতিহার পানে শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওপাশের মেয়েটাকে বললো—-
—ছায়া! আমি পরে কল করছি।
কথা শেষ করেই কল কেটে দিল সে।ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে আবার ফাতিহার দিকে ফিরলো আসিফ।
—আমার জিনিসে হাত দেওয়ার সাহস তোমাকে কে দিয়েছে?
ফাতিহা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
কব্জিতে লালচে দাগ ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার দৃষ্টি আগের মতোই স্থির। যেই দৃষ্টিতে কোন বিরক্তি অথবা রাগ ছিলো না।
—আপনার ফোনে হাত দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না।
—তাহলে ধরলে কেন?
—কারণ একজন মানুষ বারবার ফোন করলে সাধারণত প্রয়োজনেই করে।
আসিফ হেঁসে ফেললো।
—তুমি নিজেকে কী ভাবো বলো তো?
— আপনার স্ত্রী।
খুব সহজ উত্তর করলো ফাতিহা। আসিফ থমকে গেল তার এতো সাবলীল কথায়। আশ্চর্য হলো পুরুষটি। যেই নারীকে সে স্ত্রী হিসেবে মানে না সে কি সহজ ভাবে নিজেকে আসিফের স্ত্রীর পরিচয় দিচ্ছে? বাহিরে বলে বেড়াচ্ছে সে ফাতিহা মির্জা!
আসিফের ভাবনার মাঝে ফাতিহা আবার বলল—-
—তবে চিন্তা করবেন না। আপনার ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানোর কোনো আগ্রহ আমার নেই। যদিও এটা আমার অধিকার। তবুও।
—সত্যি?
—জ্বী।
—তাহলে ফোনে নিজেকে আমার স্ত্রী’র পরিচয় দিলে কেন?
ফাতিহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। অতঃপর বলল—–
—কারণ আমি মিথ্যা বলতে শিখিনি। আর যেটা সত্যি সেটা কেনো বলবো না?
কথাটা শুনে আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
মেয়েটার সবচেয়ে বিরক্তিকর ব্যাপার এটাই।
সে সরাসরি কোন ঝগড়া করে না। চিৎকার করে না গলা উঁচিয়ে। অথচ এমনসব কথা বলে যায়, যার উত্তর খুঁজে পাওয়া বড্ড কঠিন।
—আপনার আব্বাজান নিচে আছেন। আর আমার আব্বাও।
—তো?
—তাই অকারণে রাগ না করে নিচে গেলে ভালো হয়।
আসিফ কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো।
কেন জানি মেয়েটার এই অদ্ভুত শান্ত স্বভাবটা তাকে আরও অস্থির করে তুলছে। ফাতিহা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে গিয়ে থেমে আবার বলল—-
—আপনার ফোনটা বিছানায় আছে। আবার যদি ছায়া নামক মেয়েটা ফোন করেন, তাহলে এবার নিজেই রিসিভ করবেন। তবে পরনারী এড়িয়ে চললে খুশি হতাম। যদিও জানি না নারীটি সম্পর্কে আপনার কে!
আসিফ কথা বললো না। ফাতিহা ফের বললো—-
—আর একটা কথা। দ্বিতীয়বার আমাকে এভাবে ছোঁবেন না। বিয়ে হয়েছে, স্ত্রী হই আমি আপনার। তবে আপনি আমাকে এখনো পরনারীর নজরেই দেখেন। ভালো নাই-বা বাসতে পারেন, তবে যেদিন আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানবেন সেদিন আমাকে স্পর্শ করবেন। হোক তখন রাগের বশে অথবা নিজ ইচ্ছে’ই—আমি বাঁধা দিবো না। তবে তার আগে স্পর্শ করবেন না।
কথাটা বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আর আসিফ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ গিয়ে থামলো বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটার দিকে। ফাতিহার কথাগুলো তার কাছে বিরক্তিকর ছাড়া কিছুই মনে হলো না। তবুও কেন জানি তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরতে লাগলো একটাই শব্দ—-
তাকদিরে তুমি পর্ব ২
—আমি আপনার স্ত্রী।
অদ্ভুতভাবে শব্দটা বিরক্ত করার বদলে চিন্তায় ফেলে দিলো আসিফকে। মেয়েটাকে কেনো জানি বড্ড অদ্ভুত লাগে তার। ঠিক বিরক্তিকর নয়, না-তো পছন্দের। অথচ এই সবকিছুর মাঝেও অদৃশ্য এক টান অনুভব করছে। সে বুঝে উঠতে পারছে না এমনটা কেনো হচ্ছে? এটাই কি তবে তিন কবুলের শক্তি?
