Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ৪

তাকদিরে তুমি পর্ব ৪

তাকদিরে তুমি পর্ব ৪
মোনালিসা মেহরোজ

পরেরদিন সকালবেলা।
ঘরের এক কোণে বসে কাপড় গুছাচ্ছে ফাতিহা। বিছানার উপর পরিপাটি করে রাখা দুটো ব্যাগ। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একে একে ভাঁজ করে ভেতরে রাখছে সে। ঠিক তখনই ঘুম থেকে উঠে চোখ মেললো আসিফ। বেশ খানিকটা সময় স্থির থেকে আশেপাশে তাকালো। প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও কয়েক সেকেন্ড পর ভ্রু কুঁচকে গেল তার। ফাতিহাকে কাপড় গুছাতে দেখে জিজ্ঞেস করলো—-

—এগুলো কী হচ্ছে?
ফাতিহা হাতের কাজ থামালো না। ব্যাগ গুছাতে গুছাতেই নমনীয় গলায় বললো—-
—ব্যাগ গুছাচ্ছি।
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কেন…?
কথাখানা বলতে বলতেই আসিফের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। ফাতিহা কিছু বলার আগেই সে উচ্ছ্বসিত গলায় ফের বললো—
—বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছো না-কি?
ফাতিহা মনে মনে হাসলো। পুরুষটি কতই না বিরক্ত তার উপর! তা না হলে এমন কথা কি সে বলতো? ফাতিহা চলে গেলে কতই না সুখ পেতো সে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতিহা। আসিফ এখনো ফাতিহার শান্ত দু’চোখের দিকে একরাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে। ফাতিহার ধূসররঙা টানা টানা আঁখিপল্লবে একনাগারে তাকিয়ে রইলো আসিফ৷ মুখখানা দেখতে না পেলেও চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। তবে ফাতিহার গভীর চোখে সে তেমন আশানুরূপ কিছু খুঁজে পেলো না। ফাতিহা মৃদু গলায় বললো—-

—না, বাড়ি ছাড়বো কেন? সংসার ফেলে চলে যাওয়ার জন্য তো আসিনি।
আসিফ হতাশ হলো। সাথে তীব্র বিরক্ত আঁকড়ে ধরলো তাকে। ফাতিহা ফের বললো—
—আজ আমরা আপনার শশুর বাড়ি যাচ্ছি।
আসিফ যেন ঠিক শুনতে পারেনি। সে কপাল কুঁচকে বললো—-
—আমরা?
—জ্বী। আব্বাজান দাওয়াত করেছেন।
—কে বলেছে আমি যাবো?
ফাতিহা শান্তভাবে কাপড় ভাঁজ করতে করতে বললো—-
—আপনাকে আব্বাজান নিজে বলেছেন সেদিন।
—আর আমি রাজি হয়েছিলাম?
ফাতিহা এবার তার দিকে তাকালো। নিশ্চল থেকে বললো—-
—না।
—তাহলে?
—তবুও যাবেন।
আসিফ হেঁসে ফেললো। চুলের ভাজে হাত চালিয়ে বললো—-

—তুমি মনে হয় আমাকে এখনো চেনোনি।
—চিনেছি বলেই বলছি।
—আমি কোথাও যাচ্ছি না।
—ঠিক আছে।
ফাতিহার কথায় চমকে ওঠে পুরুষটি। কেননা ফাতিহার থেকে এত সহজ উত্তর আশা করেনি সে। সে ভেবেছিল তর্ক হবে। তাকে জোড় করবে ফাতিহা। তবে এটা কি হলো?
অন্যদিকে ফাতিহা আর কিছু না বলে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। ফলাফল স্বরুপ কয়েক মিনিট পর বিছানা থেকে নেমে পরলো আসিফ। ফ্রেশ হয়ে বিরক্ত মুখে নিচে নেমে গেল।
ড্রয়িংরুমে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন আযান মির্জা। ছেলেকে দেখে চশমার উপর দিয়ে তাকালেন।

—কি হয়েছে? মুখটা ওমন কেনো?
—আমি কোথাও যাচ্ছি না।
—মানে?
—ওই মেয়েটা বলছে আজ আমাকে নিয়ে ও ওদের বাড়ি যাবে।
আযান মির্জা খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখলেন।
—তাতে সমস্যা কী? আর ওই মেয়েটা বলছো কাকে? সে তোমার স্ত্রী। সম্মান দিয়ে কথা বলো।
আসিফ কয়েক মুহূর্ত দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। অতঃপর নিজেকে শান্ত করে ফের বললো—-
—ওকে ফাইন, ফাতিহা তাই না ওর নাম! সেই ফাতিহা বলেছে নিয়ে যাবে। আমার কোন সমস্যা না হলোও যাওয়ার ইচ্ছে নেই। তাই যাচ্ছি না
—সব কাজ ইচ্ছেমতো হয় না।
—বাবা…!
—চুপ।
একটা শব্দেই থেমে গেল আসিফ। আযান মির্জার কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠলো। তিনি হিসহিসিয়ে বললেন—-

—বিয়ে করেছিস। এখন সম্পর্কও রাখতে হবে। মেয়ের বাবা দাওয়াত দিয়েছে, আর তুই যাবি না?
—আমি এসব সামাজিকতা পছন্দ করি না।
—আমি পছন্দ-অপছন্দ জানতে চাইনি তোর কাছে।
কড়া চোখে তাকালেন তিনি। অতঃপর বললেন—-
—তোকে যেতে হবে। এটা আমার আদেশ।
আসিফ চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলো। বুকটা উঠানামা করছে তীব্র বেগে।
—বাট বাবা…।
—আর একটা কথাও না। আজ তুই ফাতিহা আম্মাকে নিয়ে ওখানে যাবি। কথা এখানেই শেষ।
আযান মির্জা কথাগুলো এমন দৃঢ়ভাবে বললেন যে আর প্রতিবাদ করার সুযোগ পেল না আসিফ। বিরক্ত মুখে সিঁড়ির দিকে ফিরে গেল সে। আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সায়না মির্জা মুচকি হেসে বললেন—-
—কখনো কখনো বাবার কথাও শুনতে হয়, বাবা।
আসিফ শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কথা বলতে আর ইচ্ছে হলো না তার। আজকাল কেমন দম বন্ধ লাগছে এবাড়ি। মনে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুঁড়ে কোথায়ও একটা চলে যেতে। তবে পারছে না। কেননা যেখানেই যাবে জীবন ধারণের জন্য টাকা লাগবেই। আর এখন তার হাত খালি। টাকা চাইলেও তা পাচ্ছে না। ফলস্বরূপ বাবার আদেশ মেনে বাবাকে গলিয়ে নিজের স্বাধীনতা হাসিল করার অপেক্ষায় আছে সে।

আসরের পর।
গাড়ি ছুটে চলেছে শহরের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে।
ড্রাইভিং সিটে বসে আছে আসিফ। ব্যাক সিটে নীরবে বসে আছে ফাতিহা। সারা রাস্তা দুজনের কেউই তেমন কথা বললো না। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর গাড়িটা এসে থামলো একটি পরিচ্ছন্ন, শান্ত বাড়ির সামনে। বাড়িটা খুব বিলাসবহুল নয়।
তবে পরিপাটি, উষ্ণ আর আপন অনুভূতি মাখানো।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতিহার বাবা।
তাদের গাড়ি থামতেই মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার। ফাতিহা গাড়ি থেকে নামতেই ভদ্রলোক বললেন—-
—আলহামদুলিল্লাহ! আমার আম্মাজান এসেছেন।
ফাতিহার ঠোঁটেও হাসি ফুটলো। সে সালাম দিয়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে পরলো। ঠিক তখনই ভেতর থেকে দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে এলো দশ-এগারো বছরের একটা মেয়ে। চঞ্চল কন্ঠে বললো—-

—আসসালামু আলাইকুম আপু!
বাচ্চাটি চিৎকার করে ফাতিহার গলা জড়িয়ে ধরলো সে। ফাতিহা হাসিমুখে সালামের উত্তর দিয়ে বুকে আগলে নিলো মেয়েটিকে।মেয়েটার নাম নাবা। ফাতিহার ছোট বোন। চঞ্চল, প্রাণবন্ত আর ভীষণ আদুরে। মাথায় হিজাব পড়া। সুশ্রী মুখখানা জ্বলজ্বল করছে নূরের আলোই। শালীন পোশাকে আচ্ছন্ন মেয়েটির মুখে নজরকাড়া হাসি।
—কেমন আছিস বনু?
হেসে বললো ফাতিহা। নাবাও হাসিমুখে উত্তর করলো। এরমধ্যেই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন তার মা জুলেখা। চোখেমুখে স্পষ্ট আনন্দ। নিজের মেয়েকে কয়েকদিন পর দেখার আনন্দ এটা। ফাতিহা মা’কে সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। সবাই যখন ফাতিহাকে ঘিরে ব্যস্ত, তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল আসিফ। ছোট্ট পরিবারটা তখন অদ্ভুত ভাবে আকর্ষণ করছিলো তাকে।
আর ঠিক তখনই দৌড়ে আসা নাবার চোখ গিয়ে পড়লো তার উপর। মেয়েটা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বললো—

—আপুই ইনি কি আমার নতুন ভাইজান? সেদিন না ভালো করে দেখতে পারি নি এতো গন্ডগোলের মাঝে।
প্রশ্নটা শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল সবাই। আর আসিফ বুঝতে পারলো— এই বাড়িতে তার জন্যও আলাদা একটা পরিচয় অপেক্ষা করে আছে। আসিফ দু’পা এগিয়ে এলো। ফাতিহার বাবা ও মা’কে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলে জুলেখা মেয়ে জামাইয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। সালামের উত্তর করে বললেন—-
—ওখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো, আব্বা? ভেতরে এসো।
আসিফ জোরপূর্বক হাসি টানলো মুখে। নাবাও বিষয়টা বুঝতে পেরে এক ছুটে এসে থামলো আসিফের পাশে। ছোট্ট মুখখানা হাসি হাসি করে বললো—-
—আসসালামু আলাইকুম, ভাইজান। কেমন আছেন?
আসিফ থমকালো মেয়েটার কথায়। বুকটা হুট করেই কেঁপে উঠল এতোটা নমনীয়তা দেখে। এতোটুকু একটা মেয়ে কি সুন্দর করে সালাম দিলো তাকে! সম্মোধন করলো অপূর্ব এক নামে।
আসিফ কয়েক মুহূর্ত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। ফাতিহার বাবা জামাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে খানিকসময় তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর কি ভেবে যেনো চমৎকার হাসলেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়ে ভেতরে পা রাখতে রাখতে মেয়ে ফাতিহাকে ইশারা করলেন আসিফকে ভেতরে নিয়ে যেতে।

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আসিফ বসে আছে ফাতিহার ঘরে। এসেই সামান্য নাস্তা-পানি করেছে সে। আর এখন বিশ্রাম নিচ্ছে এখানে বসে। চারিদিকটা খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে দেখছে সে। ঘরটা ছোট্ট হলেও চারিদিকটা ভিষন পরিপাটি করে সাজানো। শেলফে বেশ বই রাখা, তারমধ্যে ইসলাম সম্পর্কিত বইয়ের সংখ্যায় বেশি। আসিফ বসা হতে উঠে দাঁড়ালো। পায়ে পায়ে ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে লাগলো। এরমধ্যেই হুট করেই তার মাথায় খেলে গেলো অন্য একটা প্রশ্ন। আচ্ছা! ফাতিহা দেখতে কেমন? সে কেনো তার সামনেও মুখ ঢেকে রাখে? কোন গড়বড় আছে কি?
আসিফ কপালে ভাজ ফেলে ঘরের দেওয়ালগুলো দেখতে লাগলো। পড়ার টেবিলেও তাকালো, তবে কোথায় কোন ছবি পেলো না। পুরুষটি বিরক্ত হলো, তারওপর আশ্চর্য হলো বেশ। ঘরজুড়ে একটা ছবিও নেই? কারো নেই? তাদের বাড়িতে তো আছে। কতগুলো ছবি সে দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে নিজের। বাবার আছে, মায়েরও আছে দু’একটা। অথচ এখানে একটাও নেই!

সে কি ফাতিহাকে বলবে নিজের মুখ দেখাতে?
কথাখানা ভাবতেই চোখমুখ খিঁচে নিলো আসিফ। আশ্চর্য! সে কেনো ওই মেয়ের মুখ দেখতে চাইবে? গড়বড় থাকলে থাকুক, তাতে তার কি? সে’কি আর ফাতিহা নামক বিরক্তিকর মেয়েটার সাথে সংসার করবে? স্ত্রী রূপে মানবে? না-তো।
সে তো শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে। কখন বাবাকে পটিয়ে ফাতিহাকে ডিভোর্স দিবে, কখন তার বাবা তাকে সম্পত্তির জন্য ব্ল্যাকমেইল করা বন্ধ করবে। বাবা একবার তার কথা মেনে গেলে ফাতিহার চ্যাপ্টার সেখানেই শেষ। তাহলে এতো আগ্রহ দেখানোর কি আছে?
আসিফ আবারো বিছানায় বসে ফোন চালাতে লাগলো। এরমধ্যেই ঘরে প্রবেশ করলো ফাতিহা। আসিফ মাথা তুলে তাকালো না অবদি। ফাতিহা আসিফকে ফোন চালাতে দেখে তার সামনে এসে থামলো। বললো—-
—এসময় ফোন ব্যবহার করতে নেই।
—প্লিজ, অ্যাডভাইস দিয়ো না৷
ফাতিহা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আসিফের বিরক্তিমাখা গলায়। তবে না দমে ফের বললো—-

—মাগরিবের আযান দিচ্ছে।
—সো হোয়াট?
মাথা না তুলেই বললো আসিফ। ফাতিহা আসিফের হাতের দিকে তাকিয়ে বললো—-
—আব্বা বসার ঘরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
—কেনো?
চট করে মাথা তুলে তাকালো আসিফ। ইতিমধ্যেই তার কপালে ভাজ পরেছে।
—মাগরিবের সালাত আদায় করতে যাবেন মসজিদে, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন বলে বসে আছেন।
আসিফ চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। ধপ করে বসা হতে উঠে আঙুল তুলে বললো—-
—হেই লিসেন! কি ভাবো তোমরা নিজেকে? যখন যা ইচ্ছে তা করবে আমার সাথে? আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ফোর্স করবে আমায়? এতো বড় সাহস তোমাদের?

—শুনুন! আপনি ভুল বুঝছে….।
—জাস্ট শাট আপ।
ফাতিহ কেঁপে উঠল আসিফের ধমকে। দু’পা পিছিয়ে গেলো মেয়েটা। আসিফ দাঁতে দাঁত পিষে বললো—-
—এই আসিফ মির্জাকে নিজেদের ইশারায় পুতুলের মতো নাচানো যাবে না, হ্যাঁ৷ তাই চেষ্টাও করো না।
আসিফ কড়া গলায় কথাগুলো বলে গটগট পায়ে ঘরে ছেড়ে বেড়িয়ে গেলো। ফাতিহা স্তব্ধ হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো নিজের জায়গায়।
আসিফ ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতেই মুখোমুখি হলো ফাতিহার বাবার। ভদ্রলোক শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আসিফের পানে। আসিফ তা দেখেও না দেখার ভান করে ধপাধপ পা ফেলে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো। গাড়িতে বসে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো স্টিয়ারিং, অতঃপর দাঁতে দাঁত পিষে বললো—-
—আজ এমন কান্ড ঘটাবো যে সকাল হতে না হতেই আপনারা স্বইচ্ছায় আমাকে আমার বাড়ি ফেরত পাঠাতে বাধ্য হবেন, জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি।
কথাটা শেষ করেই গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে সেখানে থেকে বেড়িয়ে গেলো আসিফ৷ অন্যদিকে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে ফাতিহা বাবার পানে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। ভদ্রলোক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন—–
—ধৈর্য ধারণ করো, আম্মাজান। মনে রেখো, সে আগুন হলে তুমিও পানি। আর পানিই পারে আগুন নেভাতে৷
ফাতিহা বাবার কথায় ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে হাসলো। ভদ্রলোক ফের বললেন—-

—তুমি জানো এই বিয়েটাতে আমি কেনো রাজি হয়েছি? আসিফের মতো উগ্র, বেনামাজি জামাই বেছেছি।
ফাতিহা মাথা নাড়িয়ে না বললো৷ ভদ্রলোক হেঁসে বললেন—-
—সওয়াব অর্জন করতে। তাকে পরিশুদ্ধ করে দীনের পথে ফিরিয়ে আনতে।
—মানে?
—একজন মানুষকে দীনের পথে ফিরিয়ে আনা খুব বড় নিয়ামত, আম্মাজান। আর আমি জানতাম, আল্লাহ চাইলে তোমার চরিত্র, তোমার ধৈর্য আর তোমার আখলাক একদিন না একদিন আসিফের হৃদয়ে প্রভাব ফেলবেই। মানুষকে জোর করে বদলানো যায় না, কিন্তু সুন্দর ব্যবহার অনেক সময় এমন দরজা খুলে দেয়, যা কঠোরতা দিয়েও খোলা যায় না। আর এই কাজের ফলস্বরূপ ফেরেস্তাগন তোমার সওয়াব লিখবেন, যার কোন হিসেব হয়না, আম্মাজান। আর আমি আমার মেয়েকে ঠিক সেভাবেই মানুষ করেছি, যেভাবে মানুষ করলে একটা পাথর মনও তার ছোঁয়ায় নৈতিকতা ফিরে আসে নরম হয়ে হৃদয়। আমি বিশ্বাস করি তোমায়, আম্মাজান। বিশ্বাস করি।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৩

এক নাগারে কথাগুলো বলে ভদ্রলোক থামলেন। ফাতিহা অশ্রুশিক্ত নয়নে চেয়ে রইলো আব্বার পানে। বুকটা তার বড্ড ভারি হয়ে উঠেছে। আব্বা যে তাকে নিয়ে অহংকার করে কথাখানা ভাবতে গিয়েও কেমন সুখ সুখ লাগছে। ফাতিহা আব্বাকে জড়িয়ে ধরলো আলতো করে। ভদ্রলোক নিজেও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অতঃপর অপেক্ষা করতে লাগলেন আসিফ ঘরে ফেরার।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৫