Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ৫

তাকদিরে তুমি পর্ব ৫

তাকদিরে তুমি পর্ব ৫
মোনালিসা মেহরোজ

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দরজার সামনে আসিফকে টলতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে রইলো ফাতিহা। হাত থেকে খসে পরলো কয়েকখানা কাপড়, যা সে গুছিয়ে রাখছিলো। মাথায় যেনো বাজ পরলো এমন অবস্থা। সে ইহকালেও কল্পনা করতে পারেনি যে আসিফ এরূপ একটা কাজ করে বাড়ি ফিরবে।
রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার পর ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন ফাতিহার বাবা ইয়াসিন, জুলেখা আর ছোট্ট নাবা। ফাতিহা গল্প করতে করতে বোনের কাপড় গুছিয়ে রাখছিলো। ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে গাড়ি থামার শব্দ ভেসে এলো। নাবা লাফিয়ে উঠেছিলো সেই শব্দে।

—ভাইজান এসেছে!
কথাটা বলেই সে দরজার দিকে দৌড়ে গিয়েছিলো। ফাতিহাও ধীর পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে পরেছিলো। কিন্তু দরজার সামনে পৌঁছাতেই থমকে গেল সবাই। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে আসিফ। আর তার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটির পরনে আঁটসাঁট ছোট পোশাক। মুখভর্তি গাঢ় মেকআপ। ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিলো—মেয়েটা প্রায় আসিফের গায়ের সাথেই লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটা দেখেই জুলেখা হতবাক হয়ে গেলেন। নাবা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলো। আর ফাতিহার বাবা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে বললেন—

—নাউযুবিল্লাহ…।
ভদ্রলোকের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তবুও চুপ করে রইলেন তিনি। অন্যদিকে আসিফ তখন টলোমলো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অদ্ভুত এক হাসি। মেয়েটা তার কাঁধে মাথা হেলিয়ে বললো—
—বেবি, তোমার বউয়ের বাসাটা খুব ছোট্ট।
আসিফ হেঁসে উঠলো। ফাতিহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাল মিলিয়ে বললো—-
—তা…তাই না, বেবি? সত্যিই খুব ছোট্ট বাড়িটা।
মেয়েটাও খিলখিল করে হেসে উঠলো। ফাতিহার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো দৃশ্যটা দেখে। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। আসিফ এবার ড্রয়িংরুমের ভেতরে পা রাখলো। টলতে টলতে বললো—
—শ…শ্বশুর আব্বা, কেমন..আছেন?
আসিফের কথাগুলো জড়ানো জড়ানো শোনালো। ছায়া সাথে সাথে বলে উঠলো—

—উফ্ বেবি! সাবধানে, পরে যাবে তো!
কথাটা বলেই আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। আসিফ নিজেও ভার ছাড়লো ছায়ার উপরে। জুলেখা মুখ ফিরিয়ে নিলেন এই দৃশ্য দেখে। বুকটা কাঁপছে। হুট করেই আসিফের প্রতি ঘৃণা জন্মালো, মনে হলো—মেয়ের জীবনটা বোধহয় শেষ। তারা হয়তো ভুল মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। জুলেখা চোখ বন্ধ করে রইলেন। নাবা অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে ফেললো।
আর ফাতিহা? সে শুধু দাঁড়িয়ে রইলো। কোনো কথা বললো না। কোনো অভিযোগও করলো না। তবে তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠতে লাগলো। এই কি সেই মানুষ, যাকে নিয়ে তার বাবা এত আশা করেন? এই কি সেই মানুষ, যার জন্য সে ধৈর্য ধরে আছে? যাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে সে কি আদৌও শুধরে যেতে চায়?
আসিফ আড়চোখে ফাতিহার দিকে তাকালো। মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবুও সে বুঝতে পারছে—ফাতিহা কষ্ট পেয়েছে, ভীষণ আশ্চর্য হয়েছে। আর এটাই তো সে চেয়েছিলো। আজ এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করবে, যাতে কাল সকাল হতে না হতেই সবাই তাকে এই বাড়ি থেকে বিদায় করে দেয়। কথাখান ভেবেই মনে মনে প্রফুল্লিত হলো আসিফ।ছায়া আবারও মিষ্টি গলায় বললো—

—বেবি, আমি কিন্তু খুব ক্লান্ত।
—অ..আমিও, বেবি।
—তাহলে আজ আমি এখানেই থাকি?
—অবশ্যই।
কথাটা বলেই হেসে উঠলো আসিফ। ফাতিহা বাবার পানে একপলক তাকিয়ে দু’পা এগিয়ে এলে। শরীরটা তার অসার হয়ে আসছে। পা চলতে চাইছে না। সে ভাঙা গলায় বললে—
—অ…আপনি নেশা করেছেন?
কথাটা যেনো পুরো ঘরকে এক মুহূর্তে থমকে দিলো। আসিফ মনে মনে বাঁকা হাসলো। অতঃপর দু’পা এগিয়ে এলো। আচমকা ফাতিহার উপর ঢলে পরলো। কাঁধে হাত রেখে নিজের ভাড় ছাড়লো ফাতিহার উপরে। ফাতিহা প্রথমে ভরকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলো। আফিস বললো—–

—বলে…বোঝাতে হবে বউ?
ফাতিহা দু’পা পিছিয়ে যেতে চাইলো। তবে পারলো না। পরক্ষণেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলো সে৷ অনেকটা সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আসিফের পানে তাকিয়ে রইলো। লম্বা শ্বাস টানলো, আসিফকে ঠিকভাবে সামলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরলো। আসিফ ফাতিহার এহেন আচরণে মনে মনে বিজয়ীর হাসি হাসলো। সে ভাবলো ফাতিহার ধৈর্য বোধহয় এবার এখানেই শেষ হবে। সে মুক্তি পাবে। সে যতটুকু বুঝেছে এমন একটা পরিবার তার আজকের কান্ড নিশ্চয়ই মেনে নিবে না। তারা তাকে আর জামাই হিসেবে চাইবে না।
আসিফ ফাতিহাকে ছেড়ে আবারো দু’পা এগিয়ে গেলো ছায়ার পানে। ফাতিহা থমকে রইলো। অতঃপর কাতর দৃষ্টিতে বাবার পানে তাকালো। ভদ্রলোক তখন জলের ন্যায় শান্ত হয়ে রইলেন। জুলেখা মেয়ের পানে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললো—-

—এসব ঠিক হচ্ছে না আম্মাজান। সে সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে।
ফাতিহার বুকটা কেঁপে উঠল নিজের স্বামীর প্রতি মায়ের এই অনীহায়। তবে জুলেখা তো ভুল কিছু বলেনি। যা বলেছে তা ঠিকই বলেছে। আসিফ ছায়াকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলো। টলমল পায়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। চোখজোড়া নিভু নিভু হয়ে এসেছে তার। ঠিক তখনি ভেসে এলো ফাতিহার দৃঢ় কন্ঠ স্বর।
—থামুন।
আসিফ ছায়া থেকে গেলো। আসিফ তখনো পুরোপুরি ছায়ার উপর নির্ভর করে আছে। চোখজোড়া একবার বন্ধ করছে তো একবার খুলছে। যেনো পুরো দমে টাল হয়ে গেছে সে। ছায়া আসিফের কাঁধে হাত রেখে পিছু ফিরে বললো—-

—হোয়াট? দেখছো না আমার বেবিটা ক্লান্ত? ওকে শুয়ে দিতে হবে।
ফাতিহা ভেতরে ভেতরে ক্রোধান্বিত হলো ছায়ার কথায়। সে চোখ ফিরিয়ে বাবার পানে এগিয়ে এলো। ফাতিহা শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললো—
—আব্বাজান!
ভদ্রলোক মেয়ের পানে তাকালে ফাতিহা জোর গলায় বললো—
—রাত এক’টা বাজতে চললো। সকাল হবে কয়েক ঘন্টা পরেই। ততক্ষণে আপনার জামাইকে বাহিরে বাগানে ফেলে রাখলে কেমন হয়?
ভদ্রলোক অবিশ্বাস্য নয়নে মেয়ের পানে তাকালেন। মেয়ের এহেন কথার যথাযথ কারণ বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি। অন্যদিকে আসিফ চমকে উঠলো। বড়বড় আঁখি মেলে তাকিয়ে রইলো ফাতিহার পানে। ফাতিহা যে এই অবস্থায়ও এমন কথা বলবে তা তার ভাবনার বাহিরে। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন—

—এ তুমি কি বলছো, আম্মাজান? জামাইকে বাহিরে ফেলে রাখবো মানে?
—ওনি নেশা করেছেন আব্বা, আর আমি কোনো মাতাল লোককে ঘরে তুলতে চাই না। অপবিত্র করতে চাই না আমার গৃহ। তাই আজ ওনি সারারাত বাহিরে কাটাবেন। বৃষ্টি আসবে মনে হয়। ওনি সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবেন। সকাল হতে হতে বৃষ্টির পানির ছোঁয়ায় ওনার নেশা কেটে যাবে অতঃপর নেশা কাটলে নতুন করে গোসল করে ঘরে পা রাখবেন, তার আগে নয়।
—কিন্তু আম্মা…!
—কোন কিন্তু নয় আব্বা। এটায় হবে।
ফাতিহা জোড় পায়ে এগিয়ে গেলো আসিফের পানে। আসিফ বিস্ফোরিত নয়নে ফাতিহার মুখপানে তাকিয়ে রইলো। আশ্চর্য হলো ভিষন। মেয়েটা বলে কি? সে সারারাত বাহিরে কাটাবে? কি করে সম্ভব এটা? এখন তো নেশা করার ভান করছে, বাহিরে পাঠালেও তো সে নিজের বাড়ি যেতে পারবে না। তাহলে সকলে বুঝে ফেলবে সে নাটক করছে। এখন কি হবে? তাকে কি সত্যি সত্যিই সারারাত বৃষ্টিতে ভিজতে হবে? মশার কামড় খেতে হবে?
আসিফ শুকনো ঢোক গিললো। ছায়ার চোখমুখ লাল হয়ে এলো। ফাতিহা আচমকা আসিফের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো দরজার পানে।

—চলুন। আজ আপনার জায়গা ওই মশাদের আড্ডায়। আজ আপনি তাদের আহার জোগাবেন আপনার রক্ত দিয়ে।
আসিফ শুকনো মুখে পুতুলের ন্যায় ফাতিহার সাথে যেতে লাগলো। সে ভুলে বসলো যে নেশা করার নাটক করছে।
—এই দাঁড়াও, কি করছো কি?
ছায়া ডেকে উঠলো। তবে ফাতিহা তার কথায় কান না দিয়ে আচমকা আসিফকে দরজার বাহিরে পাঠালো। আসিফ বাহিরের দিকে তাকালো। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। সে কি করে থাকবে এখানে? বাড়িতেও তো ফিরতে পারবে না ধরা পরার ভয়ে।
আসিফ জড়ানো কন্ঠে বললো—
—এ…এটা ঠিক নয়। দিস ইজ নট ফেয়ার, ফাতিহা। আ’ম ইউর….হাজব্যান্ট।
—তো? নেশা করার আগে মনে ছিলো না আপনার স্ত্রী কেমন? এখন অন্যায় করেছেন যেমন তেমন ফলটাও ভোগ করুন। এমনিতেও, আপনি তো নেশা করেছেন। আমি আপনার সাথে কি করছি না করছি তা তো নেশা কেটে গেলে আপনার মনেও থাকবে না। তাহলে সুযোগের সৎ ব্যবহার কেনো করবো না?
অকপটে কথাখানা বলে চট করে দরজার খিল আঁটকে দিতো নিলো ফাতিহা। তবে তা আটকানোর আগেই আসিফ তড়িঘড়ি করে হাত দিয়ে দরজা আঁটকে বলে উঠলো—

—না, না! এটা হবে না!
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই থমকে গেলো সে।
ফাতিহাও থেমে গেলো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। আসিফ বুঝতে পারলো না কখন উত্তেজিত হয়ে নিজের স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলে ফেলেছে। সে দ্রুত আবার টলোমলো ভাব ধরার চেষ্টা করলো।
—মা…মানে…আমি…
ফাতিহা দরজার হাতল ছেড়ে ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে বললো—
—কি বললেন আপনি?
—আমি…।
আসিফ কথার খেই হারিয়ে ফেললো। ফাতিহা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার পানে।
—এতক্ষণ তো দাঁড়াতেই পারছিলেন না। এখন হঠাৎ….।
আসিফ শুকনো ঢোক গিললো। ফাতিহা আরও এক পা এগিয়ে এলো।
—বৃষ্টিতে ভিজে রাত কাটাতে হবে আজ আপনাকে। যান, বাহিরে যান।
আসিফ বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে ফেললো। সে সম্পুর্ন ভুলে গেলে যে সে নাটক করছে। অতন্ত্য স্বাভাবিক গলায় বললো—-

—আরে, মানুষ কি আর বৃষ্টির মধ্যে সারারাত থাকতে পারে নাকি? মজা করছো? আমি কি করে বাহিরে থাকবো?
কথাটা বলেই থমকে গেলো সে। আচমকা চেপে ধরলো নিজের মুখ। ফাতিহার চোখ চিকচিক করে উঠলো।
—ওহ্! আপনার কথাবার্তা তো বেশ স্বাভাবিকই শোনাচ্ছে।
জুলেখা আর ইয়াসিনও এবার সন্দেহের চোখে তাকালেন। আসিফ বুঝতে পারলো, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিপদ বুঝে সে আবারও জড়ানো গলায় বললো—
—আ…আমি…মানে…।
—আর কোন নাটক নয়। যান, ঘরে যান। আপনার চালাকি ধরা পরে গেছে মিস্টার মির্জা।
চোয়াল শক্ত করে কথাখানা বলে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো ফাতিহা। ফাতিহার মা হতবাক হয়ে গেলেন। আর ইয়াসিন বুঝতে পারলেন পুরো বিষয়টা। আসিফ যে তাদের চোখে খারাপ হয়ে এখান থেকে চলে যাওয়ার প্ল্যান করছে ভাবতেই চোখজোড়া বন্ধ করে নিলেন তিনি।
ছায়া দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। আর আসিফ মাথা নত করে নিলো। মনে মনে তীব্র ক্রোধ বাসা বাঁধলো তার। তীব্র লজ্জায় ভেতরটা গুলে উঠলো। সে ফাতিহার পানে একপলক তাকিয়ে শক্ত পায়ে স্থান ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ালো। তার আগেই আবারো ভেসে এলো ফাতিহার তীক্ষ্ণ কন্ঠ স্বর—

—দাঁড়ান।
আসিফ থেমে দাঁড়ালো। ফাতিহা আসিফের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো—-
—এতোক্ষন যেই নাটকটা করলেন, আপনার মনে হয়না আপনি ভুল করেছেন?
আসিফ কথা বললো না। শুধুমাত্র শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো। ফাতিহা ফের বললো—-
—ক্ষমা চান আমার আব্বার থেকে।
—হোয়াট?
আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ফাতিহা আগের মতই দৃঢ় থেকে বললো—-
—হ্যাঁ, মাফ চান। আপনি অন্যায় করেছেন, আর তার জন্য ক্ষমা চান।
মেয়ের কথায় ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন মাত্র। তীব্র অপমানে থমথমে হয়ে এল আসিফের মুখমন্ডল। ফর্সা মুখশ্রী লালবর্ণ ধারণ করেছে ইতিমধ্যেই। সে চারিদিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। অতঃপর ফাতিহার উদ্দেশ্যে হিসহিসিয়ে বললো—-
—সবকিছুর হিসেব আমি নেব।
ফাতিহা কথা বললো না। আসিফ পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো ভদ্রলোকের পানে। অতঃপর মাথা নিচু করে বলল—-

—সরি।
আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না সে। দ্রুত কদমে এগিয়ে গেলো ঘরের দিকে। অন্যদিকে ছায়া আসিফের পিছু নিতে গেলেই নাবা পথ আঁটকে দাঁড়ালো। বললো—-
—আপি ব্যতীত কোন পরনারী ভাইজানের ঘরে যাবে না।
—ইউ…।
ছায়া আঙুল তুলে কিছু বলতে গিয়েও বললো না। নাবা আচমকা ছায়ার হাত ধরে সেখানে থেকে টানতে টানতে নিয়ে গেলো। অন্যদিকে ইয়াসিন মেয়ের পানে এগিয়ে এলেন। ফাতিহা মাথা নত করে নমনীয় গলায় বললো—-
—ওনার হয়ে আমি মাফ চাইছি আব্বা।
ভদ্রলোক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জুলেখা মেয়ের পানে এগিয়ে এসে বললো—
—জামাই যে নেশা করেনি তা কি করে বুঝলে, আম্মাজান?
মায়ের কথায় মৃদু হাসলো ফাতিহা। বললো—
—ওসব ছাইপাঁশ কখনো না দেখি, আম্মা। কিন্তু ওসব খেলে যে মুখ দিয়ে গন্ধ আর চোখ অস্বাভাবিক হয় তা জানি। ওনার কন্ঠ শুধুমাত্র জড়িয়ে যাচ্ছিলো, যা ওনি ইচ্ছে করেই করছিলেন। আর তাই বিষয়টা বুঝতে বেশি কসরত করতে হয়নি।
জুলেখা মেয়ের কথায় ঠোঁট জোড়া প্রসারিত করে হাসলেন। আর ফাতিহার বাবা মেয়ের পানে তাকিয়ে রইলেন মুগ্ধ নয়নে।

—আমি তোমার সাথে এক ঘরে থাকবো না। বেড়িয়ে যাও ঘর ছেড়ে। আর নইলে আমি বেড়িয়ে যাচ্ছি এ বাড়ি থেকে।
সদ্যই ঘরে পা রেখেছিলো ফাতিহা। আর প্রবেশ করেই আসিফের গমগমে কণ্ঠস্বর শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। কোনো উত্তর দিলো না। ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো।আসিফ অবাক হলো ফাতিহার এহেন মৌনতায়। তবে তাকে আর ডাকলো না।
ঘর থেকে বের হতেই মুখোমুখি হলো বাবার।
ভদ্রলোক মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—-
—কি হলো আম্মা? বেরিয়ে এলে যে!
ফাতিহা মাথা নিচু করে বললো—-
—উনি আমার সাথে থাকতে রাজি নন।
—আর তাই তুমি বেরিয়ে এলে?
ফাতিহা মৃদু হাসলো।
—আমি নিজের ইচ্ছেতেই বেরিয়ে এসেছি, আব্বা।
—কিন্তু কেন?
ফাতিহা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো—-

—এক ঘরে থাকলে নিজেকে ওনার থেকে আড়াল করতে পারবো না যে।
ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
—নিজেকে আড়াল করছো কেন, আম্মা?
ফাতিহা ধীরে ধীরে বাবার দিকে এগিয়ে এলো। চোখ দুটো শান্ত, অথচ গভীর।
—কারণ আমি চাই না উনি আমাকে চিনে ফেলুক। অন্তত এখনই না।
—কিন্তু কেন?
ফাতিহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর দূরে কোথাও দৃষ্টি রেখে বললো—-

—আমি চাই না উনি আমার চেহারা দেখে আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ুক, আব্বা। চাই না আমার রূপ, আমার বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা ক্ষণস্থায়ী কোনো আকর্ষণ উনার ভালোবাসার কারণ হোক।
ভদ্রলোক নির্বাক হয়ে শুনতে লাগলেন মেয়ের কথা। ফাতিহা মৃদু হাসলো। ফের বললো—-
—আমি চাই, উনি আমার অন্তরটাকে চিনুক। আমার দ্বীনকে চিনুক। আমার ইমান, আমার চরিত্র, আমার রবের প্রতি ভালোবাসাকে চিনুক।
কথাগুলো বলতে বলতে ফাতিহার কণ্ঠটা নরম হয়ে এলো। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো পানিতে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৪

—যদি কোনোদিন উনি আমাকে ভালোবাসেন, তবে সেই ভালোবাসা যেন আমার রূপের জন্য না হয়, আব্বা। যেন হয় আমার ইমানের জন্য। কারণ রূপ একদিন ফিকে হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর জন্য গড়ে ওঠা ভালোবাসা কখনো ফিকে হবে না।
ভদ্রলোক থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন মেয়ের কথায়। তার মেয়েটা যে এতোটা বড় হয়ে গেছে তা তিনি ভাবতেও পারেননি। মনে মনে খোদার কাছে শুকরিয়া আদায় করলেন তিনি। ফাতিহা নিচু স্বরে ফের বললো—
—আমি চাই, উনি আমার মুখশ্রী নয়, আমার সত্তাটাকে ভালোবাসুক।

তাকদিরে তুমি পর্ব ৬