তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১২
ঐশী আফরিন
আরিয়ান এসেই ঝুমা চৌধুরীকে জরিয়ে ধরে বড় বড় শ্বাস নেয়।বোঝ হওয়ার পর থেকে এই প্রথম তার চোখে পানি দেখা গেল।নিজের বাবার মৃত্যুতেও তার চোখে মুখে কোন শোকের ছাঁয়া দেখা যায়নি।
সে ঝুমা চৌধুরীকে আগলে বলে “এই ফুফু?ফুফু?তুমি চলে গেলে আমাকে দেখবে কে?কোথায় যাচ্ছো আমাকে রেখে?তুমি চলে গেলে আমাকে কে আগলে রাখবে?আমার তো বাপ নাই মা টা থেকেও নাই।তুমিই তো ছিলে এখন তুমিও চলে যাচ্ছো কেন?”
রাজ্যের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।ছোট থেকেই তারা আরিয়ান কে এই বাড়িতে দেখছে।কখনো এই আরিয়ান কে দেখা হয়নি।সবসময়ই ছেলেটা গম্ভীর আর কঠোর স্বভাবের ছিল।আজ যেন তারা এক ভিন্ন আরিয়ান কে দেখছে।দেখছে তাদের ভিন্ন রাণী মা কে।মাধবীর রুপের বর্ণনা এত দিন সবাই শুনেছিল আর মনের মাঝে জমাচ্ছিল আকাঙ্ক্ষা এক নজর রুপসীটাকে দেখার।আজ যেন অত্যন্ত খঁরার মাঝে এক পাশলা বৃষ্টির মত মাধবীর দেখা পেল।
হঠাৎ আরিয়ানের হুশ ফেরে পুরো রাজ্যের মানুষ মাধবীকে দেখছে। সে চিৎকার করে আদেশ করে “প্রহরী?অন্দরমহলে যেন আমি আর একটা কাক পক্ষিকেউ না দেখি।অন্দরের দরজা বন্ধ করা হোক”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আদেশ পাওয়ার সাথে সাথে সৈন্যরা সবাই কে বের করে নিজেরাও বেরিয়ে যায়।মাধবীর আশে পাশে কোন কিছুর হুশ নেই।সে এক ধ্যানে তার বাবাকে দেখে যাচ্ছে। আর মাত্র কিছুক্ষন তারপর তো আর এই চেহারাটা আর দেখতে পারবে না।চেনা মুখটা হাড়িয়ে যাবে চিরদিনের মত।কিছুক্ষন নিরব থেকে সে মুখ খুললো।এবার আর সে আগের মত উত্তেজিত হলো না।
ধীরে ধীরে বলে “আব্বা?আপনি না থাকলে আমাকে মা কে ডাকবে?পড়তে না বসলে ধমক কে দেবে?প্রতিদিন সকালে নিজের হাতে নাস্তা বানিয়ে কে দিয়ে যাবে পড়ার টেবিলে?ছাদ ভরতি আমার শখের ফুলগাছ গুলো কে লাগাবে?আমাকে ভালোবেসে মাধবীলতার গাছ কে উপহার দেবে?খেতে না চাইলে খাইয়ে কে দেবে?ভীষন মন খারাপের বিকেলে মাথায় হাত কে রাখবে?মন খারাপের দিনে শান্তনা দেওয়ার মত কেউ যে আর রইলো না ”
কিছুটা থেমে আবার বলে “দুনিয়াটা যে বড্ড সার্থপর আব্বা।কীভাবে পারলেন এই সার্থপর দুনিয়ায় আমাকে একা ফেলে যেতে?”
আসলো না বিপরীত পক্ষ থেকে কোন উত্তর।আরিয়ান উঠে গিয়ে মাধবীর পাশে বসে।শ্রেয়সীর আর্তনাদে তার হৃদয় কেপে উঠছে বারংবার।
“মধু?শক্ত কর হো।নিজেকে এভাবে ভেঙে দিলে খুনিদের শাস্তি কীভাবে দিবি?বিদায় মানে হাড়ানো নয়।বিদায় মানে পরবর্তী আলিঙ্গনের প্রতীক্ষা।সবাইকেই একদিন মরতে হবে।কবর আমাদের অপেক্ষায় আছে”
মাধবী অশ্রু ভেজা নয়নে তাকায়।ঐ মায়াবি নয়নের লম্বা ঘন পাপরি যখন ঝাপটায় তখন আরিয়ানের মনে হলো এ স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোন হুরপরি।
মাধবী দূর্বল কন্ঠে উচ্চারণ করলো ভারী কয়েকটা শব্দ “আরিয়ান ভাই? একটা কবর শুধু মৃত অস্তিত্ব রাখে না,রাখে বেঁচে থাকা মানুষের নিরব আর্তনাদ”
“মধু কান্না করলেই সব ঠিক হয়ে যায় না।যদি ঠিক হতো তাহলে মানুষ কান্না করেই জীবন সুন্দর করে ফেলতো।আংকেল কে শেষ বিদায়টা ভালোভাবে দে।দোয়া কর উনার জন্য।আংকেলের জানায় ব্যবস্থা করতে হবে।কান্না থামা”
মাধবী কান্না থামানোর চেষ্টা করলো।তবে অবাধ্য অশ্রুরা ঝর্ণার ন্যায় নিজ গতিতে ছুটতে চাচ্ছে।সে চোখের পানি মুছে ফেলে।কাজ হয় না।হবে কি করে?সে তো তার একমাত্র নির্ভরশীলতার প্রতীককেই হাড়িয়ে ফেলেছে।তবুও সে নিজেকে শান্ত করে উঠে দাঁড়ায়।
ঢোক গিলে বলে “জানাযার ব্যবস্থা করান”
২ ঘন্টার মধ্যে সবাই কে গোসল করিয়ে জানাযা পরানো হয়।মাধবীর চোখের সামনে গুণে গুনে ১৯ টা লাশ খাটিয়ায় তোলা হয়।বাড়ির ডান দিকের পারিবারিক কবরস্থান যেখানে শায়ীত আছে তার দাদা-দাদু।
শেষ বারের মত মাধবী তার বাবার কানে কানে বলে “কখনো বলা হয়নি আব্বা ভীষণ ভালোবাসি আপনাকে।আমার এই ছোট্ট জীবনে একমাত্র আপনাকেই হাড়ানোর ভয় করতাম।আর আপনিই হাড়িয়ে গেলেন।চিন্তা নেই আপনার দেওয়া প্রতিটা উপদেশ আমার জীবন খাতায় লাল কালির মত জ্বলজ্বল করবে।জানি না আপনার মৃত্যুটা কতটা কষ্টের ছিল। ওয়াদাবদ্ধ হলাম আজ।আপনাকে কষ্ট দেওয়া প্রতিটা জানোয়ার কে দুনিয়াতেই ছোটখাট জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে আনবো।ভালো থাকবেন ”
কথাগুলো বলার সময় টুপটুপ করে চোখের পানি পরে কাফনের কাপড় ভিজে একাকার হয়।সে ঢোক গিলে চোখের পানি মুছে ফেলে।প্রতিটা ঢোক গেলার সময় মনে হচ্ছে গলায় বিঁধে থাকা কাটা গেলার চেষ্টা করছে।আদেশ দেয় দাফন করার।সবগুলো লাশ একে একে রাখা হয় কবরে।এর মধ্যেই পুলিশ আসে।
লাশ কবর দিতে দেখে দাড়গা উত্তেজিত হয়ে বলে “রাণী মা এত বড় একটা ঘটনা আমাদের না জানিয়ে আপনার দাফন করে দিচ্ছেন?লাশগুলো ময়না তদন্ত না করলে খুনিদের ধরা কঠিন হয়ে যাবে।রাণী মা আপনি আদেশ দিলে লাশগুলো তুলে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হলে ভালো হবে ”
মাধবী খুবই শান্ত স্বরে জবাব দেয় “একটা লাশেও যেন হাত না লাগানো হয়।আপনারা এসেছেন তার জন্য ধন্যবাদ। এবার যেতে পারেন ”
” কিন্ত রাণী মা অপরাধীদের শাস্তি না দিলে তারা সাহস পেয়ে বসবে।আমাদের কয়েকটা কথার উত্তর দিন শুধু”
ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকায় ওড়নার আড়ালে মাধবীর অভিব্যক্তি বোঝা গেল না।দাড়গা জিজ্ঞেস করলো “আপনার বিরোধী দলের কেউ করেছে বলে আপনার সন্দেহ হয়?”
“জানি না ”
মাধবীর কাঠ কাঠ জবাবে লোকটা ঘাবড়ালেও বলে “জমিদার কাশেমের কাজও তো হতে পারে। তিনি আপনাদের পূর্ব শত্রু।হতে পারে রাজত্ব নেওয়ার জন্য পূর্ব শত্রুতার জের ধরে সবাইকে খুন করিয়েছে ”
” প্রথমত না জেনে কারো নামে সন্দেহ করাটা অনুচিত।দ্বিতীয়ত জমিদার কাশেমের এত সাহস নেই যে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে রাজত্ব নেবার জন্য পুরো পরিবারটাকে ধংশ করে দেবে।ওরা খুব ভাল করেই জানে জমিদার পুত্র তৃশান চলে গেলেও মরে যায়নি।আর এখন তো তৃশানেরও প্রয়োজন নেই।ভাগ্যক্রমে আল্লাহ আমায় ওদের শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করার জন্য বাচিঁয়ে রেখেছে ”
” আপনার কথা সঠিক রাণী মা।কিন্ত আমাদের একবার খোঁজ নেওয়া উচিত।আপনি আপনার মত করে চালিয়ে যান আমরা আপনাদের দিক থেকে চেষ্টা করি ”
” ওদের আমি নিজের হাতে শাস্তি দেব ”
” দুঃখিত রাণী মা।আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধের সমতুল্য ”
মাধবী হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে নেয় তবে কোন কথা বলে না কেবল শক্ত চোখে তাকায়।তার দৃষ্টি দেখেই সকলে মিইয়ে যায়।কেউ আর কথা বলার সাহস পায় না।দাড়গাসহ সকলে সালাম দিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
মাধবী খুব ভালো করেই জানে পুলিশেরা কেবল ঘুষ নেওয়ার জন্যই।নয়তো এরা পারে কি?পারে শুধু ডায়েরি লিখে লিখে থানায় স্তূপ বানাতে।তার মতে মৃত্যু মানেও শাস্তি নয়,জেল মানেও শাস্তি নয়।আসল শাস্তি হলো মানসিক যন্ত্রণা।
সে আরিয়ানের দিকে এগিয়ে যায় “বাড়ি চলুন ”
মাধবীর কথায় আরিয়ান একবার তার চোখের দিকে তাকায়। তারপর বলে “কাঁদছিস না যে?”
“কাঁদবো তো সেদিন,যেদিন জানোয়ার গুলোকে শাস্তি দিতে পারবো ”
“একা কতটুকু করতে পারবি?”
“যতটুকু সাধ্যের মধ্যে থাকবে ”
“যদি সাধ্যের বাইরে যায়?”
“ভাইয়াকে খুঁজে বের করবো”
“না পেলে?”
“একাই যথেষ্ট ”
মাধবীর চোখে জ্বলজ্বল করা প্রতিশোধের আগুন দেখতে পেল আরিয়ান। ছোট করে বলে “চল”
মাধবী আরেকবার পুরো কবরস্থানে চোখ বুলিয়ে হাঁটা ধরে।অনেকে অবাক হয়ে দেখল তাকে।তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে কিছুক্ষণ আগে এত আহাজারি করছিল।মানুষ এতটা কঠোর হতে পারে তা তারা মাধবীকে না দেখলে হয়তো জানতোই না।পুরো পরিবারের দাফন শেষে কী সুন্দর হেটে বাড়ি আসছে।কেউ কেউ বললো রানী মায়ের জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো তাকেও সাথে দাফন করতে হতো।
মাধবী অন্দরমহলের ঢুকে থম মেরে থাকে।এক সময় জাকজামক বাড়িটি আজ কেবলই শূন্যতায় ঘেরা।বাতাসে তাজা রক্তের গন্ধ।হঠাৎই তার কাছে মনে হলো এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গন্ধ।কিছুক্ষন সে মেঝেতে পরে থাকা রক্তের দিকে তাকিয়ে রইল।কানে এলো তার মামা মামিদের কান্না।মাহমুদা ইশান মাধবীকে জরিয়ে ধরে কেঁদে উঠে।মাধবী শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকে আরিয়ান তার মাকে মাধবীর থেকে ছাড়িয়ে নেয়।একে একে উপস্থিত হয় সবাই রাজবাড়িরতে।সমস্ত আত্মীয় স্বজনরা খবর পেয়ে ছুটে আসে।সবার প্রশ্ন তাদের খবর না দিয়ে দাফন কেন করলো।তবে মাধবী কারো সাথে টু শব্দও করলে না।
শুধু অপুর হাত ধরে বেরিয়ে যায়।অপুকে জিজ্ঞেসাও করলো না দেড়ি হওয়ার কারণ।মাধবী কোথায় গেছে দেখার জন্য আরিয়ানও বেরিয়ে যায়।মাধবী অপুকে নিয়ে আবারও যায় গোরস্থানে।তার মন টিকছে না বাড়িতে।সে তার বাবার কবরের সামনে গিয়ে বসে।অপুর কাধে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলে।
নাহ এই মেয়ের চোখের পানি আর সহ্য করতে পারছে না অপু। “কিরে?কান্না করলে আর কি হবে বল।যেটা ভাগ্যে ছিল সেটা হয়ে গেছে।কাঁদলে কী আর ভাগ্য বদলাবে?তুই না কাঁদিস না?তাহলে কেন এভাবে কাঁদছিস?”
শেষের কথাগুলো সে বলতে চায়নি।মেয়েটা এমনিতে না কাঁদলেও তার বাবার একটু মাথা ব্যথা করলেও তার চোখ থেকে পানি পরে।আর আজ তো আস্ত বাপটাকেই হাড়িয়ে ফেলেছে।তাহলে চোখের পানি কিভাবে আটকাবে?
মাধবী কিছু বললো না।একই ভাবে চোখ বন্ধ করে পরে রইলো।কিছুক্ষনের মধ্যেই পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সে চোখ খোলে।আরিয়ান কে তার কাছে বসতে দেখে কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও সেটা চেহারায় প্রকাশ করে না।নিঃশব্দে ওড়না দিকে মুখটা ঢেকে ফেলে।
আরিয়ান অপুকে বললো “অপু বাড়িতে গিয়ে সবাই কে সামলাও।ওখানে আমার বন্ধুরাও আছে তাদের সাথে সাহায্য করো ”
অপু বুঝলো না আরিয়ান তার নাম কিভাবে জানে।তাকে তো ভালোকরে চেনেও না বোধহয়।তবে সে আর কথা না বারিয়ে বাড়িতে চলে যায়।
মাধবীর চোখ দুটো অসম্ভব লাল ঠেকলো আরিয়ানের কাছে।সে কাঁপা হাতটা মাধবীর কপালে রাখে।হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়।আছ প্রায় ১১বছর পর মাধবীকে ছুঁলো।অতিরিক্ত আগুনের তাপ যেমন সহ্যের বাইরে তেমনি মাধবীর সান্নিধ্যও তার জন্য সহ্যের বাইরে।মেয়েটার গা পুরে যাওয়ার জোগাড়।ধরা যাচ্ছে না গায়ে।অতিরিক্ত জ্বরে মাধবীর অচেতনের মত অবস্থা।তাকে যে কেউ স্পর্শ করেছে সেই খেয়াল টাও নেই।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১১
আরিয়ান ডাকলো “মধু?”
কোন সারা আসলো না।সে আবার ডাকলো “মধু?বাড়ি চল।রাত অনেক হয়েছে ”
না এবারেও কোন সারা পাওয়া গেল না।অবচেতন মনে হঠাৎই মাধবী আরিয়ানের কোলে ঢোলে পরে।আস্তে করে মাথা রাখে আরিয়ানের বুকে।
অবচেতন মাধবী জানতেও পারলো না সে কার বুকে মাথা রেখেছে।তার সামান্য স্পর্শে যে কারো দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়।তাও বুঝলো না।ওভাবেই পরে রইলো।
