Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট শেষ পর্ব 

তুই আমার ৭ মিনিট শেষ পর্ব 

তুই আমার ৭ মিনিট শেষ পর্ব 
ঐশী আফরিন

বিকেলের নরম আলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারপাশের পরিবেশ কে। ঘরের ভেতরের টিমটিমে আলোকে পেছনে ফেলে বিষাদ বদনে বারান্দায় এসে দাঁড়াল মাধবী। তার পেছনে নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল অপু। তাদের বর্তমান অবস্থান মুক্তাগাছার ছোট প্রাসাদে। আজ দেড় বছর পর মাধবী মুক্তাগাছায় পা রাখে। সে মোটেও ফিরে আসতে চায়নি। আসতে বাধ্য হয়েছে। দেড় বছর পর প্রথম বারের মত মুক্তাগাছা থেকে চিঠি গিয়েছিল তার ঠিকানায়। দেখবে না দেখবে না করেও খুলেছিল চিঠির নীল রঙা খামটি। কে পাঠিয়েছে জানা নেই। তবে চিঠিতে দেওয়া সংবাদ পেয়ে মাধবী না চাইতেও ছুটে আসে। যেই রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সেই রাজ্যে তো এতদিন পর হুট করে চলে আসা যায় না। তাই ছদ্মবেশে এসেছে। তবে প্রাসাদে এসে আরিয়ান কে পায়নি। অপুকে বাড়ি থেকে নিয়ে এসে প্রাসাদে ঢুকেছে। যেই প্রাসাদে এতকাল তার রাজত্ব কায়েম ছিলো এখন সেই প্রাসাদেই অন্য কারো সাহায্যে ঢুকতে হয় তাকে। অপু ভেবেছিল মাধবী এমনিতেই ফিরে এসেছে। তাই আরিয়ানের দ্বিতীয় বিয়ের সংবাদ টা কীভাবে দেবে বুঝতে পারছে না। মাধবী কেমন প্রতিক্রিয়া দেবে! ভেঙে পরবে নিশ্চয়ই। এই ভয়ে সে সাহস পাচ্ছে না। কিন্ত মাধবী স্বাভাবিক ভাবেই পুরো প্রাসাদ ঘুরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। আজ হোক কাল হোক সত্য তো মাধবী জানবেই এই ভেবে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমতা আমতা করে বললো “মা.. মাধবী। আসলে তোকে একটা কথা বলার ছিলো। তার আগে বল তুই ভেঙে পরতে পারবি না। আমরা সবাই আছি তোর পাশে”

অপুর আমতা আমতা কথায় মাধবী হেসে ফেলে “আরিয়ান ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করেছে এ নিয়ে আমার ভেঙে পরার কিছু নেই। কোন নারী যদি তার স্বামীকে অঘাত ভালোবাসে তাহলে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে সে ভেঙে গুড়িয়ে যাবে। আর যদি ভালো না বাসে তবে দশটা বিয়ে করলেও কোন যায় আসে না। আর আমি তো উনাকে কখনো ভালোই বাসিনি”
অপু কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এসব কী বলছে এই মেয়ে! কীভাবে জানলো যে আরিয়ান ভাই আবার বিয়ে করেছে। আর এই সংবাদ শুনেও এত শান্ত আছে কীভাবে! সে জানতো মাধবী আরিয়ান ভাই কে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। বাকি সবাই-ও তো এটাই জানে। কিন্ত এখন এই মেয়ে এসব কী বলছে! অতিরিক্ত অভিমানে এসব বলছে কী! নাকি সত্যিই! হ্যা এই মেয়ের দ্বারা কিছুই অসম্ভব নয়। তবে আরিয়ান ভাই-ও তো কম ভালোবাসে না মাধবীকে। তার তো কেবলই সমাজের চাপে পরে বিয়েটা করতে হয়েছে কিছুদিন আগে। তবে বউয়ের চেহারা তারা কেউ দেখেনি। কিন্ত আরিয়ান ভাইয়ের ভালোবাসা আজও মাধবীর জন্য অটল। দিনের পর দিন অপেক্ষা করে গেছে। এখন যদি শুনতে পারে মাধবী এতদিন তাকে ভালোই বাসেনি! সে-ও প্রথম প্রথম অবাকই হয়েছিল এটা দেখে যে, মাধবী আরিয়ান ভাইয়ের সাথে এত সুন্দর করে থাকছে। তাহলে কী এসব অভিনয় ছিলো! এত নিখুঁত! তার অবিশ্বাস্য লাগছে। সে সংশয় নিয়ে কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে “তাহলে কী তুই এতদিন নাটক করছিলি?”

মাধবীর অকপটে স্বীকারোক্তি “অবশ্যই। এসব ভালো টালো বাসা বাসি আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব একটা বস্তু”
অপু রেলিং এর উপর নরেচরে বসে বলে “তাহলে কেন বিয়েটা করেছিলি?”
“আমি যে বড্ড স্বার্থপর নারীরে অপু”
অপু বুঝতে না পেরে বলে “হঠাত স্বার্থপরতা আসছে কোত্থেকে?”
মাধবী অপুর দিকে ফিরে বসে। অপু সঙ্গে সঙ্গেই চোখ অন্যদিকে ফেরায়। বুঝতে পেরেও মাধবী চোখ সরায় না। অপুর চোখের দিকে তাকিয়েই বলে “তোর কী মনে হয়; যেখানে আব্বা নিজে মৃত্যুর আগে বলে গেছে ঐ শান্ত নামক ছেলেটার সাথে বিয়ের কথা সেখানে আমি কীভাবে আরিয়ান ভাই কে বিয়ে করি! হ্যা মানলাম শান্ত আমাদের জাত শত্রুর ছেলে কিন্ত তবুও আমি তাকেই বিয়ে করতাম। কেননা সেটা মাহফুজ চৌধুরী নিজে বলে গেছে”
“তাহলে বড় ভাইকে বিয়ে কেন করলি?”

মাধীব এবার আর কিছু লুকায় না। স্বীকারোক্তি দিয়ে বলে “আমি ভেবেছিলাম উনি যেহেতু চৌধুরীদের ব্যপারে সব জানে। তাহলে হয়তো উনার কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে চৌধুরীদের খুনিদের খুঁজতে পারবো। আর উনি যেহেতু শহুরে মানুষ। তাই উনি নিশ্চিত ভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারবে। তাছাড়া তিনি এতদিন বিদেশ করে এসেছে। বাহিরের জগত সম্পর্কে আমার চেয়ে ওনার ধারনা বেশি”

এরপর কিছুটা উদগ্রীব হয়ে বলে “অপু তুই জানিস! উনি না কালো যাদু সম্পর্কেও জানে। যখন থেকে বুঝেছি উনি আমার প্রতি দূর্বল তখনই সেই সুযোগটা আমি কাজে লাগাই। উনাকে ভিষন ভাবে ভালোবাসি এমনটা বুঝিয়ে বিয়ে করতে চাই। কিন্ত বিশ্বাস কর আমি উনাকে বিয়ে করতাম না। আমি আমার কার্য হাসিল করে উনাকে জানিয়ে দিতাম। আর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে একটা ভালো মেয়ের সাথে বিয়ে দিতাম। কারণ আমি কখনোই সংসার সাজাতে পারবো না তা আমি জানি। তাই উনাকে একটা সুন্দর জীবন দিয়ে শান্তকে বিয়ে করে ওর জীবন টা দূর্বিসহ করে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্ত ভাগ্য আমার সঙ্গ দেয় নি। দুর্ঘটনা বসত বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হতে হলো উনার সাথেই। তবে বিয়ের পরও যখন দেখছি কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এরমধ্যে আবার গ্রামে নতুন সমস্যা। কারণে অকারণেই তৃশান ভাইয়ের স্মৃতি আষ্টেপিষ্টে ধরতো আমাকে। এতসব ঝামেলা নিতে পারছিলাম না। তখন আরেকটা সত্য আমার সামনে আসে আরিয়ান ভাই সম্বন্ধে। এতদিন আমি উনার রাজত্ব করা রাজ্যেই ছিলাম।

কিন্ত অজ্ঞাত কোন কারণে তিনি আমাকে খুঁজে পাননি। হয়তো পেতেও চাননি। আর আমারও সেখানে বেশ শান্তিতেই দিনগুলো কাটছিলো। কিন্ত আজ যখন শুনলাম উনি দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছে তখনই রওনা দিলাম মুক্তাগাছার উদ্দেশ্যে। কেন দিলাম জানি না। কিন্ত আমার ব্যবহার করা জিনিস অন্য কেউ ব্যবহার করা আমার একদমই পছন্দ না। কিন্ত উনাকে তো আর রেখে দিতে পারবো না তাই নিজের চোখে দেখতে এলাম। জানিস! আমার না একদমই বিশ্বাস হচ্ছে না যে উনি… উনি দ্বিতীয় বারও কাউকে ভালোবাসতে পারবে। তাই তো বলি, পুরুষ কক্ষনো এক নারীতে আশক্ত থাকতে পারে না। এই অমোঘ সত্য কথাটা মানতে কেন যেন আমার পিড়া লাগে। অপু! আমি না মানতে পারছি না যে উনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। করেছে ভালো করেছে। আল্লাহর কাছে হাত তুলে মোনাজাত করবো যেন এবার উনার একটা সাজানো সংসার হয়। উনার দ্বিতীয় বউটা যেন সংসারি হয়। ঐ মেয়েটা যেন উনাকে পিতা বানানোর স্বাদ পুরন করতে পারে। মেয়েটা যেন…”

বলতে বলতেই ওর কিঞ্চিত বুকে ব্যাথা শুরু হয়। বছর খানেক ধরে এই বুকে ব্যাথাটা তার প্রায়ই হয়। এটা এখন তার সহনীয় হয়ে গেছে। তবে কথা হঠাত জরিয়ে আসছে কেন! বুকে ব্যাথার সাথে কী এই রোগটাও নতুন করে যোগ দিলো! অপু অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে মাধবীর দিকে। তেমনই অবিশ্বাস্য কন্ঠে জরিয়ে আসা জিহ্বা নাড়িয়ে বলে “তাই বলে এতদিন একসাথে থাকার পরেও তোর ভাইয়ের প্রতি একটুও ভালোবাসা জন্ম হয়নি!”
মাধবী আনমনা হয়ে বললো “ভালোবাসা?”

পরক্ষণেই হেসে ফেললো “আমি এবং ভালোবাসা এই দুটো শব্দ একসাথে বড্ড বেমানান লাগে। একটা কথা মগজে ঢুকিয়ে নে, যেদিন থেকে বুঝেছি অবলাদের এই দুনিয়ায় কোন ঠাই নেই , নারী হয়ে জন্মানো মানে সমাজের কথায় তোমাকে উঠতে-বসতে হবে, দূর্বল নারীদের শিকার হতে হয় হিংস্র জানোয়ারদের থাবায়, মেয়েদের জন্য তার বাপ ছাড়া আর কোন পুরুষ নিরাপদ নয়, আশেপাশের নিকটতম আত্মীয় স্বজনেরাই হয় প্রকৃত শত্রু, বাঁচতে হলে লড়তে হবে,। সেদিন থেকেই জীবনের সমস্ত শখ-আহ্লাদ,সমস্ত সপ্ন, আশা-ইচ্ছা, মায়া-ভালোবাসা, মোহ, সব কিছু বিসর্জন দিয়েছি। সব কথার এক কথা জীবনে যত পিছুটান থাকে মানুষের; সেই সমস্ত পিছুটানের সমাপ্তি ঘটিয়েছি। আর একবার যেহেতু সমাপ্তি ঘটিয়েছিই আর কক্ষনো সেই সমাপ্তির পুনরাবৃত্তি করবো না”

কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। বুকের ব্যাথাটা কিছুটা বারছে। অপু খুব মনোযোগের সহিত কথা গুলো শোনে। একটা কথাও তো মাধবী ভূল বলেনি। সত্যিই তো সবগুলো কথা সত্য। সে কিছু বলার মত পেলো না। কি-ই বা বলবে? সত্য যুক্তির সামনে কি কোন কথা চলে? তবে সে শুধু এতটুকুই বললো “তুই এমন না হলেও পারতি মাধবী”
মাধবী হেসে দেয়। কেমন অদ্ভুত ঘোর লাগানো সেই হাসি! হাসতে হাসতেই বলে “ধর, তোর কাছে একজনকে মারতে যত অস্ত্র লাগে সব আছে। এখন যদি অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও নির্জন রাস্তায় তোকে কোন ছেলে মেরে পুতেও ফেলে তুই কিছু করতে পারবি?”

অপু দু পাশে মাথা নাড়ালো। সে আসলেই পারবে না। সেখানে নিজের জীবন দিয়ে ফেলবে তবুও কাঁপা হাতে তলোয়ার টা চালাতে পারবে না। অপুর উত্তরে সে আবার বললো “যদি একই ঘটনা আমার সাথে হয়?”
অপু ভাবলো। জীবনেও তো কোন ছেলের সাহস হবে না মাধবীকে মারতে একা আসার। যদি কেউ মাধবীকে না চিনেও ভূল করে থাকে; তবে সেদিন হবে তার জীবনের শেষ দিন। মাধবী যদি নিরস্ত্রও থাকে তবে আশেপাশে কোন ছোট্ট বস্তুর সাহায্যে হলেও প্রথমে কুপোকাত করে নিয়ে শেষে জানে মেরে ফেলবে। মারামারি খুন-খারাবিতে গুন্ডা মাস্তানদের থেকেও বিশ ধাপ এগিয়ে এই মেয়ে। আচ্ছা এত সুন্দর মেয়েটা কি তার নিষ্পাপ চেহারার মতই নিষ্পাপ হতে পারতো না? পারতো না কি তার সৌন্দর্যের মতই পবিত্র হতে? অপুর ভাবনার মাঝেই মাধবীর কন্ঠ কানে আসে,

“সব মেয়েদের নিরাপত্তা দিয়ে একটা সুন্দর জীবন উপহার দেওয়ার জন্য আমার মত কিছু মাধবীলতাদের এক জীবন উৎসর্গ করতে হয় অপু। কেননা প্রতিটা মেয়েই যদি সমান হয়। পুরুষদের সামনে ভয়ে কুকড়ে যায় তাহলে বাঁচাবে কে তাদের? পাশের গ্রামেই দেখ। সাধারণ জনগণ না জানলেও যারা ক্ষমতায় আছে তারা তো জানে যে, দিনে ঠিক কতগুলো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়। অথচ এই গ্রামে দেখ। রাস্তায় একটা মেয়েকে আসতে দেখলে একটা ছেলে দশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। কারণ তাদের ভয় থাকে কখন না জানি রাণীর লোকেরা দেখে উল্টো পাল্টা ভেবে রাণীর কাছে বিচার নিয়ে আসে। আজ যদি আমিও সাধারণ মেয়েদের মত হতাম? হয়তো তুই আমি দুজনেই আজ ধর্ষিতা উপাধি নিয়ে মরতে চাইতাম। আসলে নারীদের জন্য সমাজটাই এমন ‘হয় মরো নয় নিজেকে বিলিয়ে দেও’। এটাকে বদলে ‘হয় মারো নয় শাস্তি দেও’ এমন বানাতে হলে সমাজে দরকার আমার মত কিছু মাধবীলতাদের। আজ ধর্ষণকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির আওতাভুক্ত করেছি বলে সমাজের নারীরা টিকে আছে। আর ওদের টিকিয়ে রাখতে হলে মাধবীলতাদের যে পিছুটান রাখা যাবে না। রাখলেই তাদের মায়া ছেড়ে যখন-তখন দুনিয়া ছাড়তে পারবো না। তাই আমাকে যে এমন হতেই হবে এবং এভাবেই থাকতে হবে”

অপু অনেকক্ষন যাবত মাধবীর প্রতিটা কথাকে মগজে পুনরাবৃত্তি করে শুনলো। সত্যিই যদি এরকম কয়েকটা মাধবীলতা না থাকে তাহলে সমাজে মেয়েদের বেঁচে থাকাই কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। কেউ প্রতিবাদ করে বলেই কেউ বিচার পায় আর কেউ বেঁচে যায়। আর যদি কেউ প্রতিবাদ না করতো? মাধবী যদি নিজের তেজ আর অপরূপা নিয়ে দুনিয়াতে না আসতো? সত্যিই এই মেয়ে দুনিয়ায় আসতো না। হয়তো ভুল করে জান্নাতের হুরপরিদের মধ্য থেকে কেউ দুনিয়ায় পরে গেছে। যাকে আল্লাহ নিজের হাতে বানিয়েছে। আচ্ছা মাধবী কেন এসবের প্রতিবাদ করে? সে জমিদার কন্যা। সে চাইলেই আরামে ঘরে বসে বসে জীবন পার করতে পারতো। জমিদারের ভয়ে চাইলেও কেউ তার টিকিটাও ধরতে পারতো না। তাহলে সে কেন লড়ে যাচ্ছে? অপু মনে মনে হাসলো। আসলেই প্রতিটা সমাজে একটা করে মাধবীলতা প্রয়োজন। খুব করে প্রয়োজন। কিন্ত আরিয়ান? তিনি? তিনি কি আদেও মেনে নিতে পারবে এই অমোঘ সত্য? সত্যিই কী তিনি আবার বিয়ে করেছে? এই কথা শুনে কেমন অভিবাদন দিবেন তিনি? খুব বেশি কষ্ট পাবে কী? সে গলার স্বর ক্ষীণ করে জিজ্ঞেস করলো “আরিয়ান ভাইয়ের কি হবে?”

“বললাম তো উনার সংসার গুছিয়ে দিয়ে যাবো”
“তারপর তুই?”
“বাপের শেষ ইচ্ছেটা রাখাবো”
অপু হকচকিয়ে উঠে “ক কী করতে চাইছিস কী?”
মাধবী শুকনো ঢোক গিলে নেয়। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে “শান্ত কে খুঁজে নেব। ভালো আমি কাউকেই বাসি না আর না বাসবো। তবে আরিয়ান ভাইয়ের জীবন শেষ না করে শান্তর টা করবো। কিন্ত ওকে তো কোত্থাও খুঁজে পাইনি। ওকে পেলই শশব্যাস্ত বিয়ে…”
কথাটা শেষ করার আগেই কিছু একটা ভাঙার বিকট আওয়াজে দুজনে হকচকিয়ে তাকায়। অগ্নিমূর্তির রূপ ধারণ করেছে আরিয়ান। অপু তান্ডবের ইঙ্গিত পেয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে না থেকে দৌড়ে চলে যায়। ঘটনা বুঝে মাধবী উঠে দাঁড়ানোর আগেই আরিয়ান তার সামনে দাঁড়িয়ৈ চিৎকার করে উঠে “বান্দির বাচ্চা তোর সাহস হয় কি করে আমাকে ঠকানোর? কলিজা কাঁপে নাই কথাগুলো বলতে? দিন দিন কলিজা বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে না? শরীরটা ভর্তি কলিজা দিয়ে? খুন হতে চাইছিস আমার হাতে। না? আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম নিকৃষ্ট পাপী বানাতে চাইছিস তোর খুনি বানিয়ে? হারামির বাচ্চা তোর…”

বলার আগেই একটা সজোরে থাপ্পড় এসে লাগে আরিয়ানের গালে। অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাধবীকর পানে। হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে অভ্যাস মত আরিয়ানও হাত উঠিয়ে মারতে নিলে মাধবী চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নেয়। তবে আরিয়ানের মাঝপথে ধ্যান আসতেই; যে সে কী করছিলো; তখন আরো মেজাজ তুঙ্গে উঠে। রাগ সংবরন করতে না পেরে দেয়ালে একাধিক ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে ফেলে হাত। মাধবী নিজের উপর কোন প্রভাব না পেয়ে চোখ খুলে আরিয়ান কে এভাবে ঘুষি দিতে দেখে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্ত কোনভাবেই আটকাতে পারে না। রাগে আরিয়ানের গাঁ কাপছে। পায়ের পাতা আর হাতের তালু উত্তপ্ত হয়ে গেছে মুহুর্তেই। সবসময়ই ঠান্ডা মাথার মানুষ টাকে এতো রেগে যেতে দেখে মাধবী নিজেও বাঁক হাড়া হয়ে যায়। যখন হাত ফেটে রক্ত পরে মেঝে ভরে উঠছে তখনই হঠাৎই আকস্মিক আরিয়ান মাধবীকে জরিয়ে ধরে। এতটা জোরে ধরেছে যেন তাকে নিজের গায়ে ঢুকিয়ে ফেলতে চাইছে। মাধবী স্পষ্ট শুনতে পেলো হৃদস্পন্দন দ্রুত বেগে চলার শব্দ। এতটাই জোরে হচ্ছে যেন শক্ত বুক ফেরে হৃদয়টা খুলে বেরিয়ে যাবে। মাধবী কিছু বলে না। তবে জরিয়েও ধরে না। নির্বিকার ভঙ্গিতে পরে থাকে আরিয়ানের বুকে। প্রায় মিনিট দশেক পর আরিয়ান ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে জরিয়ে যাওয়া কন্ঠে বলে “স্যরি মধু। আমি হাত তুলতে চাইনি। একদম চাইনি। তোকে কীভাবে ব্যাথা দিবো আমি? কেউ কী কখনো নিজের ব্যাথার উপর ব্যাথা দিতে পারবে? নাহ তো। তাই আমিও তোর গায়ে হাত তুলতে পারি না। তুই শুধু একবার বলে দে এতক্ষন যা যা বললি সব মিথ্যে। আমাকে ভালোবাসিস। বল না মধু?”
মাধবী নিষ্ঠুর মনে কাঠ কাঠ জবাব দেয় “আমি আপনাকে ভালোবাসি ন…”

“চুপপপ। একদম চুপ। এই কথা আমার সামনে উচ্চারণ করবি না যদি আমার কাফন দেখতে না চাস। মধু তুই এত স্বার্থপর কীভাবে হলি! এমন করিস না। তুই আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছিস। এতদিন এই অভ্যাস হীন থেকে আমি আত্মা ছাড়া দেহের মত ছিলাম। ত… তুই বল এসব মিথ্যা। তুই কীভাবে উচ্চারণ করলি যে আমাকে একা রেখে অন্য কাউকে…। মধু!”

কথাগুলো এতটাই অসহায় শোনালো যে মাধবী বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়! এটাই নাকি জ্বীন সর্দার! এত বিশাল রাজত্বএর অধিকারী নাকি এই লোকটা। এমন অসহায় কন্ঠ শোনার পর কেউ কী কখনো বলবে এটা জ্বীন সর্দার! যে কিনা কারণে অকারণে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়! সে মুখ তুলে তাকাতে চাইলো আরিয়ানের চোখে। কিন্ত আরিয়ান যেন গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে বুকে আগলে রাখতে চাইছে। অসহায় অশ্রুরা যে অবাধ্য হয়ে চোখের কোণে চিকচিক করছে তা প্রকাশ করতে নারাজ সে। এমন একজন শক্ত ধাঁচের কঠোর মানুষের চোখেও পানি আনতে সক্ষম এই নারীর ধোঁকা। অসহায়ত্বের সংগা যে এত নিখুঁত ভাবে উপলব্ধি করতে হবে তা সে কল্পনাতেও আনেনি। সে-ও তো কখনো চায়নি তার কোন পিছুটান থাকুক। কিন্ত না চাইতেও হয়ে গেল যে। নিঃশ্বাস যেন স্বাভাবিক ভাবে চলতেই চাইছে না। কোন বার আটকে থাকছে আবার কোনবার এত দ্রুত চলছে যে নিঃশ্বাসের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাধবীর বুকটা আবারও মোচর দিয়ে উঠলো। সে নিজেকে দৃঢ় বাহু বন্ধন থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বললো “ছাড়ুন আমাকে। কষ্ট হচ্ছে আমার। বুক ব্যাথা করছে”

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিলো। এই প্রথম বার। প্রথম বারের মত সরাসরি তাকালো মাধবীর বেগুনি রঙা তেজি চোখে। মাধবীর হাশফাশ লাগলো। প্রথমবারের মত হলুদ এবং বেগুনি চোখে দৃষ্টি মিলিত হলো। যেন বিদ্যুত স্পৃষ্ট হচ্ছে। মাধবী চোখ সরিয়ে নিতে চাইলে আরিয়ান তাকে শক্ত করে ধরে বললো “আজ কোন অভিনয় করবি না। তাঁকা আমার চোখের দিকে। এই ভয়টাই তো তুই পেতি না? আচ্ছা এটাও কী মিথ্যে ভয় পাওয়ার নাটক ছিলো মাত্র?”
নাহ। এ তো সত্য কথা। সে সব পারলেও এই লোকটার তীক্ষ্ণ চোখে চোখ রাখতে পারে না। এটা তার ভয়। কিন্ত এই ভয়ের কারনটাও তার অজানা। কিন্ত এটা তো আরিয়ানের সামনে শিকার করা যাবে না। সে গলা খাঁকারি দিয়ে চোখ বুজে নিষ্ঠুরত্বের প্রমাণ দিয়ে বলে “হ্যা। সব মিথ্যে”

আরিয়ান সাথে সাথে মাধবীর বাহু ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেলো। মাথা এবং বুক চিনচিনে ব্যাথায় মোচর দিয়ে উঠছে। সে মাথা ধরে শক্ত শ্বাস ফেলে আচমকাই টেবিলের উপর বিছানো মখমলের কাপড়টা টেনে ফেলে দিলো। এতে টেবিলের উপর থাকা সমস্ত কাচের জিনিস ঝনঝনিয়ে ভেঙে পরে। কয়েকটা কাচের টুকরো মাধবীর দিকে তেড়ে এলে সে স্বাভাবিক ভাবেই সরে যায়। একদম প্রতিক্রিয়া বিহীন তাকিয়ে রইল ভাঙা কাচ গুলোর দিকে। কী যেন ভেবে এই পরিস্থিতিতেও ফিচেল হেসে বললো “আমার সাথে এসব করে কিছুই পরিবর্তন করতে পারবেন না আপনি মি. ইশান। আপনি নিজেও তো বিয়ে করে নিয়েছেন”
আরিয়ান কিছু একটা ভেবে মৃদু চিৎকার করে উঠে “হ্যা আমি বিয়ে করেছি। কিন্ত তোর স্থান তোরই। তোকে আমি ঠিক যেভাবে বছরের পর বছর চেয়েছি সেভাবে কাছে পাইনি। আমার হক আমাকে ফিরিয়ে দে। আমি তোকে যত যুগ চেয়েছি ঠিক তত যুগ পেতে চাই। আর তোকে পাওয়ার দিনগুলো এতটাই দীর্ঘ হবে যে সমাপ্তি হবে মৃত্যু দিয়ে। কেননা তোকে চাওয়ার দিনগুলো কিন্ত কম ছিলো না”

মাধবীর কানে বার বার বাজতে থাকে ‘হ্যা আমি বিয়ে করেছি’ কথাটা। সে চোখ বন্ধ করে নেয়। আরিয়ানের বাকি কথাগুলো এতটা প্রভাব ফেলে না তার উপর। তার মাথায় ঘুরছে ঐ একটা বাক্যই। সত্যি সত্যিই কি এখন তার পাঞ্জাবিওয়ালা অন্য এক নারীকে সময় দেবে! অন্য কোন নারীর জন্য বেপরোয়া হবে! মত্ত হবে অন্য নারীতে! মধুমতী আর পাঞ্জাবিওয়ালার গল্প কী এখানেই শেষ! না চাইতেও তার হাতটা বুকের বা পাশে চলে যায়। সে কী ভেঙে পরছে? নাহ। নাহ মাধবী তুই ভেঙে পরতে পারবি না। তোকে কেউ ভেঙে ফেলতে পারবে না। জেগে উঠ তুই। আবেগ ঝেড়ে ফেলে গর্জে উঠ। এসব নানান কথা নিজ মনে আওড়িয়ে মাধবী সত্যিই গর্জে উঠে “আমাকে আপনি আর কখনোই পাবেন না পাঞ্জাবিওয়ালা। শুধু একবার ওদের খুনিদের খুজে বের করি। আব্বাকে দেওয়া শেষ কথাটা রেখে আব্বার শেষ ইচ্ছেরটাও পূর্ণ করবো। আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে কেউ আটকাতে পারবে না। পারলে ঠেকিয়ে দেখান”
আরিয়ান কম্পিত চোখে তাকিয়ে বলে “চেলেজ্ঞ করছিস?”
মাধবী আবারও গর্জে উঠে “হ্যা সেটাই”

আরিয়ান আচমকা হেসে দেয় “তাহলে তুই ইতিমধ্যেই হেড়ে গেছিস মধু। আমি চাইছি না তোকে এখনই ভেঙে দিতে। তবে তোর যদি এতটাই ভেঙে যাওয়ার এবং হেড়ে গিয়ে জীবনের রেকর্ড ভাঙার ইচ্ছে থেকে থাকে তাহলে এখন সেটাই করবো। প্রস্তুত হো মধু। আমি তোকে শক্ত থাকার কথা বলে বৃথা সান্তনা দেবো না মধু। তাই শক্ত থাকার প্রস্তুতি না নিয়ে ভেঙে পরার প্রস্তুতি নে। কেননা তোর ভাঙন এবার নিশ্চিত। ধ্বংস এবার অনিবার্য হয়ে এসেছে প্রত্যেকের উপর ”
মাধবী ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকায়। অযাচিত কারনেই বুকের বা পাশটা তীব্র ভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। সে ঠোঁট কামরে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে “কী করতে চাইছেন আপনি?”
আরিয়ান ফিচেল হেসে বলে “করবো না। করা তো অনেক আগেই শেষ। এবার শুধু তোকে দেখাবো। তবে একটা শর্ত আছে”

মাধবী চোখদুটো বন্ধ করে নেয়। জীবন এ কোন পরীক্ষায় এনে ফেললো তাকে! অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কী দেখতে চলেছে সে! আজ, এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে সে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতি পার করছে। এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় বর্তমানে তার আপন বলতে কে আছে? আসলেও আছে কেউ? বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কেউই তো নেই। সে যদি সত্যিই ভেঙে পরে তাহলে কে তাকে সাহস দেবে। সামনে দাঁড়ানো নিষ্ঠুর মানব তো বলছে ধ্বংসের প্রস্তুতি নিতে। তাহলে কী সত্যিই মাধবীর এক জীবন শেষ হয়ে যাবে ধ্বংস আর পাপ দেখতে দেখতে? আজ তার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যার্থ নারী মনে হচ্ছে? না ভালো মেয়ে হতে পারলো, না পারলো ভালো বোন হতে, না পারলো ভালো বন্ধু হতে, না পারলো ভালো স্ত্রী হতে, আর না পারলো একেকজন মা হতে। কী আছে তবে এই জীবনে? সর্ব হারা নিঃশ্ব সে। তবে এই নিঃশ্বতা ডিঙিয়ে কী সে ভাঙনের উপর গড়া মানবী হতে পারবে না? যত তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে তত তাড়াতাড়িই নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। মাধবী বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে “কী শর্ত?”

আরিয়ান আবারও ফিচেল হাসে। মেয়েটা এখনও নিজের জেদে অটল। তার মতে জেদ আসলে
মেয়েদের কেই মানায় আর পুরুষদের মানায় রাগে। মেয়েটা আসলে যতটা সহজ ভাবে নিচ্ছে কথাটা ততটা সহজ ভাবে সামাল দিতে পারবে না। এটা সে খুব ভালো করে জানে। সে মনে মনে আওড়ায় “বেঈমান নারী? তুই যেভাবে আমাকে ঠকিয়েছিস ঠিক সেভাবেই আমি তোকে জোর করে নিজের কাছে রেখে দেব। তোর অজান্তেই রয়ে গেল বেঈমান যে, তুই অগোচরেই আজ আমাকে খুব নিষ্ঠুর ভাবে ভেঙে দিয়েছিস। এবার তোকে কীভাবে স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে দেই? খুব বাজে ভাবে হাড়িয়ে দিয়েছিস তুই আমায়। আজ থেকে তুই পাঞ্জাবিওয়ালার মধুমতী থেকে নরপিষাচের বেঈমান নারী হয়েছিস”

মনে মনে কথাগুলো আওড়িয়ে বিষাদ বদনে বলে “তোকে একটা কিছু দেখাবো। তবে শর্ত একটাই, তুই হাত-পা এবং চোখ বাধা অবস্থায় আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানে যাবি। তোর সময় ১০ সেকেন্ড। ১০ সেকেন্ডের জন্য তোর চোখ খোলা হবে। এবং পরক্ষণেই বেধে ফেলা হবে। সেভাবেই তোকে নিয়ে আসা হবে। পরে তুই জানতে চাইতে পারবি না যে, তোকে কোথায় নিয়ে গেছি বা যা দেখবি তার সম্বন্ধে। রাজি থাকলে বল”
মাধবী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে “এমন কী নিশ্চয়তা আছে যে আমাকে নিরাপদে আবার ফিরিয়ে আনবেন?”
আরিয়ান হো হো করে হেসে ফেলে। মাধবীর ভ্রু জোরা কুচকে যায়। শব্দ করে হাসতে হাসতেই আরিয়ান বলে “নিরাপত্তা?”

বলে আবারও শব্দ করে হাসে ” সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার ভিরেও যার কাছে নিজের সবটা বিলিয়ে দিয়েছিস। তার কাছেই প্রশ্ন উঠছে নিশ্চয়তা আর নিরাপত্তার? হাসালি বেঈমান। আসলেও তুই আমার কাছে অনিরাপদ। কেননা যখন তখন তোকে আমার নিজের অবাধ্য স্পর্শে অপবিত্র করে দিতে ইচ্ছে করে। তাই আমি নিজেও নিশ্চয়তা দিতে পারছি না যে তুই আমার কাছে নিরাপদ। এখন কী করবি করে নে”
মাধবী দাঁতে দাঁত চেপে বলে “চলুন কোথায় নিয়ে যাবেন। তবে আমারও শর্ত আছে”
আরিয়ানের ঠোঁট বেঁকে যায় একপাশে। অভ্যাস বসত গালি তেরে আসতে চাইছে অবাধ্য মুখ থেকে। মুখ বাকিয়ে বলে “বল”
“আজ যদি আমি ভেঙে পরি তাহলে আমি আপনাকে মুক্তি দেব। আর যদি ভেঙে না পরি তবে আপনি আমাকে মুক্তি দিবেন”

আরিয়ান কথা বাড়াতে চাইলো না। পরেরটা সে দেখে নিবে। তবে ছোট্ট করে শুধু বললো “এমনিতেও কোন ছলনাময়ীর আমার জীবনে স্থান নেই ”
বলে চিকন মসৃণ কাপড়ের ওড়না দিয়ে মাধবীর হাত-পা এবং চোখ শক্ত করে বেঁধে দিলো। এর কিছুক্ষন পরেই মাধবী নিজেকে ভাসমান অনুভব করলো। বুঝলো তাকে আরিয়ান কাধে তুলে নিয়েছে। এরমধ্যের পুরোটা সময় শুধু আরিয়ানের শেষ কথা গুলো নিয়ে ভেবেছে। এরপর বেশ কিছুক্ষন সময় পর আরিয়ানের ফিসফিস কন্ঠস্বর শোনা যায় “তৈরি হোন ছলনাময়ী”

বলেই চোখের কাপড়টা সরিয়ে ফেলে। সামনের দৃশ্য দেখে মাধবী অস্বস্তিতে গোঙিয়ে উঠে। আরিয়ানের শক্ত বাহুডোরে তার লতানো দেহটা ছটফট করে উঠে। তীব্র ঘৃণা ও বিষ্ময়াবৃত্ত চোখটা তখনই শর্ত মোতাবেক ১০ সেকেন্ড পর ঢেকে ফেলা হয়। এরকম আবারও বেশ কিছুটা সময় পর তার হাত পা এবং চোখ খুলে দেওয়া হয়। এই পুরোটা সময় মাধবী জান ছেড়ে ছটফট করেছে আর গোঙিয়ে উঠেছে বারংবার। যখন দেখলো সে মুক্ত হয়ে গেছে,নিজেকে আবিষ্কার করলো তাদের বৈঠকখানায়। দিক দিশা ভুলে ঝাপিয়ে পড়লো আরিয়ানের বুকে। অবিরত কিল ঘুষি দিতে দিতে ভাঙা গলায় বললো “কী ছিলো ওটা আরিয়ান ভাই? এটা কী আদেও সম্ভব? বলুন না আরিয়ান ভাই? ঐ স্থান… ঐ…”
বলতে বলতে হাপিয়ে উঠলো। আরিয়ান দু হাতে জাপটে ধরলো তাকে। আচমকাই মাধবীর বুকে ব্যাথাটা তীব্র থেকে তীব্র হয়। বুকে মনে হচ্ছে কেউ পেরাক মেরে দিয়েছে। ঔষধ গলায় আটকে পরলে যেমন হয় তেমন হচ্ছে। মনে হচ্ছে আজই তার শেষ দিন। অস্থির হয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলে শেষবারের মত আরিয়ান কে উদ্দেশ্য করে বলে “আমি যদি এখন মারা যাই তবে সবাই দাফন করে চলে আসলেও আপনি আমার কবরের পাশে বসে থাকবেন দয়া করে? আমার না আর কেউই নেই যে কবরের সামনে বসে দুদন্ড মোনাজাতে হাত তুলবে। শূণ্য আমি বোকার মত আজীবন শূণ্যতাকেই খুঁজে গেলাম। দিনশেষে শূণ্যতাই আমার জীবনের জলন্ত পূর্ণতা হিসেবে ধরা দিলো”

বলেতেই ধীরে ধীরে নিথর হয়ে আসে তার দেহ। বুজে ফেলে সৌন্দর্য মন্ডিত চোখের পাতা। আরিয়ান দিক দিশা হাড়িয়ে ফেলে। মাধবীর গাল চাপরে বলতে থাকে “ছলনাময়ী তোর নরপিষাচ খুব দূর্বল আর অসহায় রে। যেখানে তোর কাফন কেনার সামর্থ্য আর খাটিয়ে তোলার শক্তি নেই সেখানে আমি কীসের ধনী আর কীসের শক্তিমান! এমন করিস না লক্ষ্মীটি। তোর কবরের পাশে বসে থাকতে পারবো না আমি। তবে তোর পাশে নিজের জন্য কবর খুঁড়তে পারবো। আমি তোর খাটিয়া তোলার মত শক্তিমান না হলে যে অন্য কেউ তোর খাটিয়া বহন করবে। এটার ভাগও যে আমি কাউকে দিতে পারবো না। এর চেয়ে বরং আমি মারা গেলে পরে তুই না হয় সঙ্গ দিস। কিন্ত এখন আমাকে একা করিস না। উঠ না। এই বেঈমানের বাচ্চা। উঠছিস না কেন? আমি কিন্তু এবার সত্যি সত্যিই তোর গায়ে আঘাত করবো। উঠ না রে ধোঁকা বাজ নারী ”

আরিয়ানের এত এত কথা কিছুই নিথর মাধবীর কানে গেল না। আরিয়ান পাগলের মত আশেপাশে পানি খুঁজলো। চোখে পানি ছেটাতে যাবে এমন সময় সদর দরজা থেকে ভেসে আসে কারো কন্ঠ “মাধবীলতা চৌধুরী ইরাবতীকে তার অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হবে। উনাকে আমাদের হাতে সেরেন্ডার করুন। জ্ঞান ফেরানোর ব্যাবস্থা থানায় হবে”
আরিয়ান মাত্র খেয়াল করলো ইতিমধ্যেই পুলিশেরা সম্পূর্ণ বাড়ি ঘেরাও দিয়ে ফেলেছে। তার বুকে ভয়ের দানা বাধলো। কোন অপরাধের কথা জেনেছে পুলিশ? বড় কোন অপরাধ কী? না হলে বাড়ি বয়ে কক্ষনো আসতো না পুলিশেরা। আরিয়ান জিজ্ঞেস করলো না মাধবীর অপরাধ। কেননা মেয়েটার অগণিত অপরাধের মধ্যে কোনটার কথা পুলিশ জেনেছে আল্লাহ মালুম। সামনের পরিস্থিতি আরও কতটা খারাপ হতে চলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাধবীর নিথর দেহের দিকে তাকালে তার দৃষ্টি অসহায়ত্বে রূপ নিলো। মেয়েটা যখন জ্ঞান ফিরলে দেখবে তার পাশে কেউ নেই। তখন তো আরও নিজেকে একা মনে করবে। এই পরিস্থিতিতে তার বড্ড দরকার ছিলো মাধবীকে সঙ্গ দেওয়া। কিন্ত বিধিবাম!

ইন্সপেক্টরের আদেশে দুজন মহিলা কনস্টেবল এগিয়ে এলো। সুন্দর স্নিগ্ধ হাত জেরায় স্বর্ণের চুরিগুলোর সাথে পরিয়ে দিলো লোহার হ্যান্ডকাফ। দুজনে এক কাপড়েই কোলে করে নিয়ে বেরিয়ে গেল ভগ্ন রাণীকে। বাহিরে পুলিশের জিপ চলে যাওয়ার শব্দের সাথে শোনা গেল গ্রামের লোকজনের নানান সমালোচনার ঝড়। গ্রামের লোকজন যে ইতিমধ্যে জড়োও হয়ে গেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই আরিয়ানের। তবে এখন আর এসব সামলাতে ইচ্ছে করছে না। মাধবীর কাছে যেতেও মন নারাজ। আজ যে মেয়েটা কত্ত গুলো কঠিন কথা বলে ফেলেছে। কথাগুলো মনে পরতেই সে ধপ করে মেঝেতে হাটুঁ গেরে বসে পরে। শরীরের ভর ছেরে দেয়। বুকের ভেতর যন্ত্রণায় এফোড় অফোড় হয়ে যাচ্ছে। কোনভাবেই মাধবীর এই ছলনা সে মানতে পারছে না। পুরুষ হয়েও বুক ভেঙে কান্না আসছে। হাত পা ছড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। সে তো মাধবীর এত নিখুঁত অভিনয়ে ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি ছলানার আভাস। এখন আবার এক অমোঘ সত্য জানিয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশকে সে আশা করেনি। খুনের আসামী হিসেবে গ্রেফতার হলে জামিন করাতে বহুত কাঠখোর পোহাতে হবে।

কেননা মাধবী নিজেই খুনিদের শাস্তির বিধান শক্ত করেছে। এটাও বলেছে যে, আইন সবার জন্য সমান। তাহলে এখন কীভাবে এই কঠোর আইন ভেঙে মুক্ত করবে মাধবীকে! সে আর ভাবতে চাইলো না। দু হাত মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠলো। হাত সরাতেই ঝাপসা চোখে মূল ফটকে কারো অবয়ব দেখতে পেলো। সে চোখ মুছে ভালো করে দেখার প্রয়াস চালালো। অবয়বটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে বললো “মিসেস মাধবীলতা হায়দারের তো কাজ শেষ। এবার তৈরী হোন আরিয়ান। ইতিহাসের পাতায় একমাত্র এবং প্রথম বারের মত রক্তাক্ষরে লিখিত থাকবে এক অকল্পনীয় সৌন্দর্য মন্ডিত পাপীষ্ঠা রাণী ও তার পাপীষ্ঠ জ্বীন সর্দারের ধ্বংসের কথা”

তুই আমার ৭ মিনিট ৪১

আরিয়ান কথাগুলো শুনলো। এবং বেশ মনোযোগও দিলো। হাসি ফুটলো পুরু ঠোঁটে। চারদিকে ঘার বাকিয়ে তাকালো। এক পেশে হাসি ঠোঁটে বজায় রেখে কন্ঠ খাঁদে নামিয়ে বললো “যে যুদ্ধে স্বয়ং মাধবীলতা রাণী। সেই যুদ্ধের পরাজয় আমার অবসম্ভাবী। আমাকে ধ্বংস করতে অস্ত্রের প্রয়োজন হবে না। ধ্বংসকারীর দূরে থাকাই আমাকে ধ্বংস করার প্রধান অস্ত্র”

প্রথম খন্ড সমাপ্ত

3 COMMENTS

  1. Apuuu next part ektuuu taratari den nh please….. 🙏🏻🙏🏻 eto deri kore den j amr kanna chole aseee apuuu please please please please ektu taratari dennnnnn please apuuuuu please please please please please please please please please please please apuu eto opekkha r vlo lage nh please taratari denn

Comments are closed.