তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪০ (২)
ঐশী আফরিন
বেলার রোদে ভ্যাপসা গরমে অবস্থা নাজেহাল। সূর্য্য মাথার উপরে চড়াও হয়ে আছে। ছাদের শ্যাওলাগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। অপূর্ব পিঠে হাত বেঁধে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে অবলোকন করছে কুসুম রঙা সূর্যটাকে। মাধবী তার থেকে বেশ দূরত্ব রেখে রেলিঙে দুহাত রেখে দাঁড়িয়েছে। সময় নষ্ট না করে নিরবতা ভেঙে মাধবী প্রশ্ন করে “অপুর সাথে কেন বেঈমানী করছেন?”
অপূর্ব অবাক নেত্রে তাকায়। কন্ঠে গম্ভীরর্যা ঢেলে বলে “কে অপু?”
মাধবী সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্য হাসে “ওহ এখন চেনেনই না!”
“না চেনাটাই স্বাভাবিক নয় কী? ওকে কী আমার চেনার কথা?”
মাধবী কন্ঠে দিগুন গম্ভীর্য ঢেলে বলে “আপনি ওকে চেনেন”
“আপনাকে আমি চিনি?”
অপূর্বের আকস্মিক প্রশ্নে মাধবী সরাসরি তাকায়। পরক্ষণেই চোখ নিচে নামিয়ে বলে “তা তো আপনিই জানেন। কিন্ত অপুকে আপনি চিনেন”
“পরিচয়টা দিলে ভালো হতো”
“আমার শখী। অপরাজিতা মেহরিন। আপনি যখন প্রথম রাজবাড়ি গেছেন তখন একটা মেয়ের সাথে আপনার ঝগড়া হয়েছিল। সেই মেয়েটা”
অপূর্ব মনে করার চেষ্টা করে বললো “খুব সম্ভবত লাল রঙা শাড়ি পরা ছিলো। গ্রাম্য মেয়েদের মত। দুটো বিনুনি করা ছিলো?”
“হুম”
“হ্যা সেদিন ঝগড়া হয়েছিলো। মেয়েটা বেশ ঝগড়ুটে। আপনার শখী কী করে হলো বুঝতে পারলাম না। কিন্ত ওর সাথে আমি বেঈমানী কেন করবো?”
“আপনিও তো কম ঝগড়ুটে নন। পর পর আমার এবং অপু দুজনের সাথেই ঝগড়া শেষ। এখন বোধহয় কিছুটা ভদ্র হয়েছেন?”
“বলতে পারছি না”
“আচ্ছা সেসব বাদ। আপনার সাথে ওর প্রেম চলছে না?”
অপূর্ব যেন আকাশ থেকে পরে “ওর মত মেয়ের সাথে আমি করবো প্রেম?”
মাধবী মৃদু ধমকে উঠে “ছোট করে কেন কথা বলছেন? যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বলুন। ওর সাথে আপনার সম্পর্ক আছে?”
“নাহ”
মাধবী ভাবুক হয় “তাহলে ও কার সাথে প্রেম করছে?”
“কিছু বলছেন?”
মাধবী ভাবনা থেকে বেরিয়ে বলে “সত্যিই কী ওর সাথে আপনার কিছু নেই”
“না নেই। কেন?”
“ও আপনাকে ভালোবাসে”
অপূর্ব চোখ ছোট ছোট করে বলে “ও না আমাকে সহ্য করতে পারতো না? তাহলে ভালোবাসা আসলো কোত্থেকে?”
“সহ্য করেই ভালোবাসা হয় না। মাঝে মাঝে অসহ্যের মধ্যেও বেশ গভীর ভালোবাসা হয়ে যায়। কিন্ত…”
“কি?”
“ও বললো আপনিও ওকে ভালোবাসেন। আপনার সাথে ওর যোগাযোগ হয়। চিঠির মাধ্যমে। আপনি নাকি ওকে বিয়ে করবেন বলেছেন”
“আস্তাগফিরুল্লাহ! আমি ভালোবাসতে যাবো ঐ মেয়ে…”
অপূর্বের কথার মাঝে আবারও মাধবী মৃদু ধমকায় “আবারও ছোট করে কথা বলতে চাইছেন? কেন ওকে কী ভালোবাসা যায় না? আপনারা আসলে ভালো বাসতেই জানেন না। যারা শ্যামলাদের ভালোবাসে, বিশ্বাস করুন পৃথিবীতে শুধুমাত্র তারাই সত্যি কারের ভালোবাসতে জানে। আপনারা তো কেবল সৌন্দর্যের পূজারী”
অপূর্ব চুপ মেরে থাকে। মাধবী বলে “আপনি যদি ওর সাথে প্রেম করে না থাকেন। তবে ও কার সাথে প্রেম করছে? কেউ একজন আপনি সেজে ওর সাথে প্রেম করছে”
“এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে ওর সাথে আমার আর যোগাযোগ হয়নি। আপনাদের বিয়েতেও ওর সাথে দেখা হয়নি”
“খোঁজ নিতে হবে ওকে কে ঠকাচ্ছে। তবে হ্যা। আপনার সাথে ওর দেখা হলে দয়া করে এড়িয়ে যাবেন না। ও কষ্ট পাবে। আমি দেখছি কে এমন করছে”
অপূর্ব তাচ্ছিল্য হেসে মনে মনে আওড়ায় “যাকে আমি ভালোবেসে দেওয়ানা সে নিজেও তা জানে না। আর যে আমাকে ভালোবেসে দেওয়ানা তার খোঁজও রাখি না। কি অদ্ভুত!”
মাধবী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে “আচ্ছা এটা জিজ্ঞেস করতেই ডেকেছিলাম। আর হ্যা…”
কিছুটা থেমে মাধবী বলে “আপনার বন্ধুকে কখনো বলবেন না যে আপনার সাথে আমার একাকী কথা হয়েছে। এতে ভূল বোঝা বুঝি হতে পারে”
অপূর্ব হেসে বলে “সে আপনার আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে না। আমার বন্ধুকে আমি আপনার থেকেও বেশি ভালোবাসি”
বলে আর এক সেকেন্ডেও না দাঁড়িয়ে অপূর্ব গটগট পায়ে প্রস্থান করে। মাধবী অবাক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। কথাটা দ্বারা আসলে কী উদ্দেশ্য করলো লোকটা? মাধবীর থেকেও নিজে আরিয়ান কে বেশি ভালোবাসে নাকি নিজে মাধবীকে যতটা ভালোবাসে তা থেকেও বেশি আরিয়ান কে ভালোবাসে? কোনটা? অপূর্ব না বললেও সে জানে অপূর্ব তাকে ভালোবাসে। কীভাবে জানে? কারণ সে তো নিজেও মানতে বাধ্য তার সৌন্দর্য দেখা সত্বেও তাকে না ভালোবেসে থাকতে পারবে; এমন লোক দুনিয়াতে নেই। অপূর্ব তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। সেদিনও দেখেছে আর আজও। তাহলে কীভাবে ভালো না বেশে থাকবে? অবশ্যই অপূর্ব তাকে ভালোবাসে। সেটা তো চোখের চাহনিতেই বোঝা যায়। আর আরিয়ানও তো বলেছে, অপূর্ব একজনকে খুব করে ভালোবাসে। কিন্ত তাকে কেউ চেনে না। আর অপূর্ব নিশ্চয়ই আরিয়ানকে বলবে না যে, সে ওর বউকে ভালোবাসে! মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে মনে মনে বিরবির করে “এই এতো এতো অনিশ্চিত ভালোবাসার নিশ্চয়তা কোথায়? সত্য চাপা থাকে না। যেদিন বেরিয়ে আসবে সেদিন সমস্ত অনিশ্চয়তা নিশ্চয়তায় রূপ নেবে। কিন্ত সাধারণ নিশ্চয়তা নয়, অসম্ভব নিষ্ঠুর নিশ্চয়তা”
রাতের আধারে সম্পূর্ণ ইশান বাড়ি তলিয়ে। কেমন যেন গা ছমছমে হয়ে আছে পুরো বাড়ি। রাত বাজে ১১টা ৫৫। আজ সারাদিনেও আরিয়ানের দেখা মেলেনি বাড়িতে। কোথায় গেছে তাও জানে না কেউ। বাড়ির সকলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আয়াজও আজ বাড়িতে। তাহলে ঐ লোকটা একা একা বাহিরে কী করে ভেবে পাচ্ছে না মাধবী। তার সামনে আরিয়ানের দেওয়া শাড়িগুলোর মধ্যে কিছু শাড়ি ছড়ানো। ভীষন ভাবে শাড়িগুলো তাকে আকৃষ্ট করছে। হঠাত শাড়ি পরে সাজুগুজু করতে ইচ্ছা করছে। তবে এত রঙ বেরঙের শাড়ির মধ্যে তার চোখ কেবল শুভ্র শাড়িতেই সীমাবদ্ধ। সাদার মধ্যে অনেক ধরনের শাড়িই আছে। যেমন, সাদার মধ্যে লালা পাড়ের, কালো পাড়ের, নীল পাড়ের, গোলাপি, হালকা সবুজ, আবার সম্পূর্ণ সাদা শাড়িও আছে। সে সাদার মধ্যে কালো পাড়ের শাড়িটা রেখে বাকিগুলো গুছিয়ে রাখে। বেশির ভাগ নারীদেরই লাল পাড়ের শাড়ির উপর আকর্ষণ বেশি। তবে সে আলাদা। তার কাছে কালো পাড়ের শাড়ি বেশী আকর্ষণীয় লাগে। মুক্তাগাছায় আগে এমন শাড়ি ছিলো না। তার পছন্দ বলে আরিয়ান কারখানা থেকে বিশেষভাবে বানিয়ে এনেছে। তার এই শাড়ি পছন্দ বলে গ্রামের অনেক মেয়েরাই এখন কালো পাড়ের শাড়ি পরে। শাড়ির নামটাই যেন হয়ে গেছে ‘মাধবী রাণীর শাড়ি’। বলা বাহুল্য এখন মুক্তাগাছা ছাড়িয়ে দেশের নানান জায়গায় কালো পাড়ের যে কোন শাড়িকে সবাই এই নামেই চেনে। মাধবী কামিজ পাল্টে কালো ব্লাউজের সাথে বাঙালি নারীদের স্টাইলে শাড়িটা গায়ে জরিয়ে নেয়। গহনা বলতে আরিয়ান সবসময় পড়ার জন্য যেগুলো দিয়েছিলো সেগুলোই। চোখে একটু গাঢ় কাজল টেনে চুলগুলো ছেড়ে দেয়। লম্বা ঢেউ খেলানো চুগুলো নিতম্ব বেয়ে হাঁটুর উপরে ঠেকে। সামনের ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসের দাপটে মুখে উঁড়ছে। এতেই যেন রূপের বাহার চুইয়ে চুইয়ে পরছে। সে আলতা বের করে আরিয়ানের জন্য অপেক্ষা করে। আরিয়ানের হাতে পরবে বলে। আজ আর ফুল পায়নি গাজরা বানানোর জন্য।
এর মধ্যেই হঠাত নিস্তব্ধ বাড়িটাতে বাতাসের বেগ তীব্র হয়। সেই চিরচেনা ঠান্ডা বাতাসে মাধবী কেঁপে উঠে। পরক্ষণেই বাতাসটা চলে যায়। কিন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বাতাস বেশ তীব্র হয়ে উঠেছে। বাহিরে বুলবুলের গম্ভীর ডাকে আরো রহস্য ময় হয়ে উঠেছে রাতটা। হঠাত ঘরের সামনের লম্বা বারান্দা থেকে ঘুঙুরের শব্দ ভেসে আসে। কেউ যেন এই ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। তার জানা মতে তো বাড়ির কেউ জেগে নেই। আর এমন শব্দ করা ঘুঙুরও তো বাড়িতে কেউ পরে না। তাহলে কোত্থেকে আসছে এই আওয়াজ! ধীরে ধীরে আওয়াজ ঘনিয়ে আসছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মাধবী দরজার দিকে এগিয়ে যায়। নিঃশব্দে কোন সময় ব্যয় না করেই ঠাস করে দরজা খুলে ফেলে। লম্বা বারান্দা পুরোটাই ফাঁকা! কারো পদচিহ্ন পর্যন্ত নেই। আচমকা মনে হয় তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে পেছনে ফিরে দেখে কেউ নেই। এবার ঘরের ঝুলো বারান্দা থেকে আসছে ঘুঙুরের শব্দটা। সে কিছুক্ষণ দম নিয়ে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে যায়। বারান্দার দরজাটা হাঁট করে খোলা। তবে সাদা পর্দাটা তীব্র বাতাসে উঁড়ছে। সে বাঁ হাতে পর্দাটা সরাতে যাবে এমন সময় একটা মেয়ের চিকন রিরিনে কন্ঠ ভেসে আসে “পর্দাটা সরাবেন না”
মাধবীর হাত থমকে যায়। এত চিকন কন্ঠ! সে হাত সরিয়ে চোখ কুচকে বলে “কে আপনি?”
ভেসে আসে রিনরিনে কন্ঠ স্বর “আমি জ্বীন গোত্র মারিদের একজন জ্বীন”
মাধবী অবাক হয়। শিরদারা সোজা করে দাঁড়ায়। জ্বীনদের মধ্যে শক্তির তারতম্য এবং তাদের প্রভাব অনুযায়ী ‘মারিদ’ সম্প্রদায়ের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সামগ্রিক ক্ষমতা এবং ধ্বংসাত্মক শক্তির বিচারে ‘মারিদ’ এবং ‘ইফরিত’ এই দুটি গোত্রকে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী মনে করা হয়। মারিদ – সবচেয়ে শক্তিশালী। মারিদদের জ্বীন জগতের ‘দৈত্য’ বলা যেতে পারে। শক্তির বিচারে এরা সবার উপরে। তাহলে হঠাত এরা তার কাছে কেন আসলো! সে কপাল কুচকে বলে “আমার কাছে কেন?”
“আপনার সাথে আমার কথা আছে। আমাদের সম্প্রদায়ের নেতা আমাকে দূত হিসেবে আপনার কাছে পাঠিয়েছে”
হঠাত তার সাথে কীসের কথা এদের? তার তো মারিদ সম্প্রদায়ের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। সে জিজ্ঞেস করে “কেন পাঠিয়েছে?”
“আপনি আমাদের সর্দারকে আটকে রাখতে পারেন না”
মাধবী ভ্রু কুচকে বলে “আমি কেন আপনাদের সর্দার কে আটকে রাখতে যাবো?”
“আপনিই আটকে রেখেছেন আমাদের সর্দার কে”
মাধবী কপাল গোছায় “কে মারিদদের সর্দার?”
অপাশ থেকে যেই উত্তর আসলো তা শোনার জন্য মাধবী মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। তাকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় করে দিয়ে অপাশ থেকে ভেসে আসলো একটি বাক্য।
“জ্বীন সর্দার সুলতান আরিয়ান ইশান”
মাধবী স্তব্ধ হয়ে যায়। কথা হাড়িয়ে যায় তার। গায়ের পশমগুলো দাড়িয়ে পরে। বুকের ধুকপুকানি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। শিরদারা বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। কন্ঠ কেঁপে উঠে “ক কী বললেন?”
“সুলতান আরিয়ান ইশান আমাদের মারিদ সম্প্রদায়ের সর্দার”
মাধবী আকস্মিক ধপ করে মেঝেতে বসে পরে। বাতাসের দাপটে চুল উঁড়ে চোখে মুখে পরায় বেশ বিরক্ত হয়। তাই ততক্ষণাত চুলগুলোকে হাত খোপা করে কথায় মনোযোগী হয়। কৌতুহলে গায়ে কাটা দিচ্ছে। সে নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। একদম স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলে বিপরীত পক্ষের অবয়বটার সাথে। সর্ব প্রথমেই জিজ্ঞেস করে “উনার আসল নাম কী সুলতান আরিয়ান ইশান?”
“না সর্দারের নাম আরিয়ান ইশান তৃহার। আমাদের গোত্রের রাজার নামের শুরুতে ‘সুলতান’ পদবী দেওয়া হয়। তাই আমরা উনাকে সর্দার সুলতান আরিয়ান ইশান বলেই ডাকি”
এবারের প্রশ্নে মাধবীর কন্ঠ কাপে “উ উনি কী জ্বীন?”
“নাহ। উনি একজন সাধারণ মানুষ”
মাধবী সোজা হয়ে বসে “মশকরা করছেন? একজন সাধারণ মানুষ জ্বীন সর্দার হয় কী করে?”
“সেটা আমিও জানি না। তবে আমাদের নেতার কাছে শুনেছিলাম। উনার কাছে এমন এক আংটি আছে যার ক্ষমতায় উনি জ্বীনদের উপরও হুকুম চালাতে পারে। আরও অনেক গোপন শক্তির অধিকারী তিনি। যা শুধু গোত্রের বড় বড় নেতারা জানে। তাই সকলে উনাকে ভয় পায়। ওসব আমরা সাধারণ জ্বীনেরা জানি না। তবে দিনের আলোতে আপনি যার বিশ্বস্ত হাত ধরে হাঁটেন রাতে আধারে আমাদের সম্পূর্ণ জ্বীন জগত তার কাছে নত স্বীকার করে”
মাধবী আবারও বলে “কিন্ত উনি তো একজন সাধারণ মানুষ”
“সাধারণ? সাধারণ মানুষ তো জ্বীনের কথা শুনলে ভয়ের সাগরে ডুবে মরে, কিন্তু সর্দার সেই সাগরের ঢেউ শাসন করে। তিনি মানুষ হয়েও আমাদের ‘সুলতান’ বা মহান সর্দার। সবচেয়ে শক্তিশালী ইফরিত থেকে শুরু করে অহংকারী মারিদরা পর্যন্ত তার ইশারায় চলে”
“আপনারা তাকে এত মানেন?”
“মানতে তো হবেই। কোন এক কারণে তিনি মানুষ হয়েও আমাদের মুকুটহীন সম্ভ্রাট”
“তিনি কী কালো যাদুকর?”
“না, জাদুকররা তো জ্বীনদের গোলামি করে। কিন্তু তিনি হলো হুকুমের মালিক। উনার হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হলেও আমাদের জগতে ভূকম্পন শুরু হয়। তিনি এমন এক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, যা উনাকে আমাদের আগুনের তৈরি সত্তার ওপর মাটির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সাহায্য করেছে। তিনি শাসন করে তার পেশীবহুল শক্তিতে নয়, বরং তার অদম্য ‘ইচ্ছা’ আর ওই গোপন ক্ষমতার বলে, যার সামনে সবচেয়ে শক্তিশালী ইফরিতও হাঁটু গেড়ে বসে থাকে। তিনি আপনার জন্য একজন প্রেমিক পুরুষ, কিন্তু আমাদের কাছে এক ভয়ংকর ত্রাসের নাম—যাকে অমান্য করার সাহস কারো নেই”
মাধবী এবার অবাক না হয়ে পারে না। এসব কী শুনছে সে? সে এতদিন জ্বীন সর্দারের সাথে ছিলো? যার এত শক্তি, এত ক্ষমতা? এসব কী আদেও সম্ভব? ঘুরেফিরে মাধবীর মাথায় এক কথাই ঘুরপাক খায়, উনি মানুষ হতে পারেন না। মারিদ এবং ইফরিতের মত সম্প্রদায়ের সর্দার হয়ে উনি মানুষ হতে পারে না। কিছুতেই না। তবে সে আর এই প্রশ্ন না করে জিজ্ঞেস করে “উনাকে এত ভয় পান, উনি কী ক্ষমতার অপব্যবহার করে? মানে উনি কী আপনাদের অত্যাচার করে?”
অপাশ থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায় না। আর যাই হোক বউয়ের কাছে তার স্বামীর বদনাম করলে স্বামীর কানে যাবেই। অপাশের নিরবতার কারণ বুঝে মাধবী বলে “আপনি আমাকে বলতে পারেন। হতে পারে কোন প্রতিকার পেতে পারেন। স্বামী বলে যে উনার পাপ মেনে নেবো এমন স্ত্রী আমি নই। উনি যদি আপনাদের সাথে পাপ করে থাকে তবে আমাকে জানান”
এবার অপাশ থেকে উত্তর আসে “উনার ব্যাপারে কিছু বলার মত তুচ্ছ ক্ষমতা টুকুও আমার নেই। তবে আপনার কাছে বলার সাহস পাচ্ছি। কেন জানেন? কারণ এই নিষ্ঠুর জ্বীন সর্দার কেবল আপনার জন্য দূর্বল। যার সামনে দাঁড়াতে আমাদের হাঁটু কাঁপে; তিনি আপনার চরণ ছুঁয়ে আলতা পরায়। তাই আপনার ভরসায় বলছি। তবে এই খবর যদি সর্দারের কানে যায় তাহলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। এমনিতেও যাবেই। কেননা কোন কিছুই তার অজানাতে হয় না”
“আপনি নির্ভয়ে বলুন”
“উনি যে সিংহাসনে বসে আছে, তার প্রতিটি পায়া তৈরি হয়েছে অগুনতি জ্বীনের দীর্ঘশ্বাস আর রক্ত দিয়ে।ক্ষমতার লোভে তিনি জ্বীন জগতের প্রাচীন পবিত্রতা নষ্ট করেছে। আমাদের গোত্রের সবচেয়ে বয়স্ক এবং জ্ঞানী জ্বীনদের সে জ্যান্ত দগ্ধ করেছে কেবল উনার অবাধ্য হওয়ার অপরাধে। তিনি এমন এক নিষিদ্ধ কালো জাদু নিজের শরীরে ধারণ করেছে, যা উনার শিরায় শিরায় এখন নীল আগুনের বদলে বিষাক্ত অন্ধকার বইয়ে দেয়। উনি মানুষ। এটাই তো সবচেয়ে বড় পাপ! তিনি মানুষ হয়েও আমাদের জগতের সবচেয়ে অন্ধকার গহ্বরগুলো শাসন করে। তিনি মানুষের মায়া আর জ্বীনের নিষ্ঠুরতা—এই দুইয়ের এক ভয়ংকর সংমিশ্রণ। যে হাত দিয়ে তিনি আপনার কপালে ভালোবাসার ছোঁয়া দেয়, সেই হাত দিয়েই সে গত রাতেও হয়তো কোনো অবাধ্য ইফরিতের অস্তিত্ব মুছে দিয়েছে। তিনি কোনো ত্রাণকর্তা নয়, তিনি এক অভিশপ্ত সম্রাট। যিনি ধ্বংস দিয়ে গড়া। কারো প্রাণ যেতে দেখলে উনি পৈশাচিক আনন্দ পান। ইচ্ছে হলেই যখন তখন জ্বীনদের ধরে এনে হত্যা করছেন। কিন্ত কেউ কিছু করতে পারছেন না। উনি আমাদোর জাবুলকা শহরে পা রাখতেই আতঙ্কে সবার কলিজা শুকিয়ে যায়। তবে সেটা শুধু জ্বীনদের ক্ষেত্রে। পরীদের ক্ষেত্রে নয়। অযাচিত কারণে তিনি পরীদের সম্মান করে। নিয়মানুযায়ী শাস্তি যোগ্য অপরাধ না করলে উনি পরীদের ব্যাপারে কখনো কথা বলেন না। জ্বীনদের থেকে অত্যাচারিত পরীরা সস্তি পায় উনি জাবুলকায় গেলে। আর যেই জ্বীনেরা পরীদের অত্যাচার করে তাদের শাস্তি হয় দৃষ্টান্ত মূলক। তবে জ্বীন এবং মানুষের জন্য তিনি ভয়ংকর। তিনি শুধু জ্বীনদের নয়, মানুষদেরও ক্ষতি করে। তিনি কোন এক স্থানে একটা মহল বানাচ্ছে। কোথায় বানাচ্ছে তা আমরা জানি না। সেই মহল তিনি সবচেয়ে দামী হিরা ‘নীল পান্না’ দিয়ে বানাচ্ছেন। দুনিয়া থেকে মানুষ গুম করে নিয়ে সেখানে ক্রীতদাস বানিয়ে কাজ করায়। তারপর কাজ শেষে মেরে ফেলে। এছাড়াও উনার পাপ কর্ম নিয়ে কথা বলে আমি শেষ করতে পারবো না। দুনিয়াতেও আরো কী কী যেন করে। সেসব আমরা জানি না”
সব শুনে মাধবী ঠান্ডা মাথায় কিছুক্ষন ভাবে। সব শুনে মনে হচ্ছে আরিয়ান যেমন তেমন কেউ না। উনার ক্ষমতা প্রখর। আর এতটাই প্রখর যে জ্বীনদের বক্ষেও কম্পন ধরাতে সক্ষম। কিন্ত আরিয়ানের পাপ নিয়ে মাধবীর কোন মাথা ব্যাথা নেই। থাকতো! যদি আরিয়ান পরীদেরও অত্যাচার করতো। আরিয়ান তার কথা রেখেছে। সে বলেছিলো, সে সমস্ত পাপ মেনে নেবে কিন্ত নারী ঘটিত কোন পাপ মানবে না। আরিয়ান তা করেওনি। তবে আজ যা শুনলো তা তো একেবারেই দুর্লভ একটা ব্যাপার। সে তো এতদিন জানতো আরিয়ান স্রেফ কালো যাদুকর। কিন্ত এখন তো দেখছে সে জ্বীনদের পাপীষ্ঠ সর্দার! কিন্ত এসব হলো কীভাবে? এত ক্ষমতা এমনি এখনই পায়নি। হয়তো এর পেছনে আরো বড় কিছু আছে। সেসব জানতে হবে। তার ভাবনার মাঝেই ওপাশ থেকে আবারও কিছু কথা ভেসে আসে।
“আমি এখন সাধারণ জ্বীন হলেও আগে তেমন ছিলাম না। আমাদের পূর্ব সর্দারের নাতি আমি। কথা ছিলো ভবিষ্যতে রাণী হবো আমি। কিন্ত মাঝখান থেকে উনি ক্ষমতা পেলেন। আর আমাদের সম্প্রদায়ের নিয়ম ছিলো, নবীন সর্দারকে পূর্ব সর্দারের বংশের যে কোন পরীকে নিকাহ করতে হবে। সেই নিয়মানুযায়ী উনার আমাকে নিকাহ করার কথা ছিলো। কিন্ত উনি আমাদের প্রাচীন নিয়ম ভঙ্গ করেছে। উনি জ্বীন সর্দার হয়েও দুনিয়ার এক সাধারণ মানবীকে বিয়ে করেছে। এ নিয়ে সম্প্রদায়ের বড় বড় নেতাদের মনে মনে ক্ষোভ আছে। শুধু উনার উপরে না, আপনার উপরও। আপনি জানেন না, আপনি আমাদের সম্প্রদায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মূল। আপনার রূপের বাহারে আমাদের সম্প্রদায়ের জ্বীনেরা পাগল হয়ে গেছে। প্রতিদিনই আপনার জন্য দু একজন করে রক্তা রক্তি হয়ে মারা যাচ্ছে। সম্ভবনা আছে সামনে হাজার হাজার জ্বীনদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবে শুধুমাত্র আপনার রূপের জন্য। একদিকে সর্দার নিয়ম ভেঙে আমার বদলে আপনাকে নিকাহ করেছে অন্যদিকে আপনাকে পাওয়ার জন্য ধ্বংস হচ্ছে জ্বীন জাতি। এ কথা সর্দার জানতে পারলে অনেক বড় ঝামেলা হয়ে যাবে। আপনার রূপ আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনারা দুজনেই ধ্বংসের কারিগর। ধ্বংস করে দিচ্ছেন জ্বীন জাতি”
ব্যস! থেমে যায় ওপাশের কথা। মাধবী স্তম্ভিত! তার মানে এ জন্যই তার গায়ে এই ঠান্ডা হিমেল বাতাস বয়! লাস্যময়ি রূপের জন্য নিজের অজান্তেই হয়ে উঠেছে জ্বীনদের কামনা বাসনা! তাও আবার আরিয়ানের সম্প্রদায়ের জ্বীনদেরই! এসব আরিয়ান জানলে তো যুদ্ধ ঘোষনা করবে। সে পরীটার সব কথা আমলে নেয় না। তার যেই যেই কথাগুলো প্রয়োজন সেগুলো মাথায় ঢুকিয়ে পরীটার উদ্দেশ্যে বলে “এখন আমার কাছে কেন এসেছেন?”
“আপনি আমাদের সর্দাসকে নিজের রূপে আটকে রেখেছেন। ছেড়ে দিন উনাকে। আমাদের নেতাদের ক্ষোভে পরেছেন আপনি। উনাকে মুক্তি দিন। তাহলেই উনি জাবুলকায় ফিরে গিয়ে আমাকে নিকাহ করে ফেলবে। আর একবার নিকাহ হয়ে গেলে উনি আর দুনিয়ায় ফিরে আসতে পারবে না। আর ধীরে ধীরে আমি উনাকে আমার ভালোবাসায় ভালো করে ফেলবো। এতে আপদের সম্প্রদায়ের জ্বীনেরা মুক্তি পাবে”
মাধবী তাচ্ছিল্য হেসে ফেলে “আপনার কী মনে হয়? আমি ছেড়ে দিলেই উনি আমাকে ছেড়ে দেবে? আমি যদি উনাকে ছেড়ে পাতালেও চলে যাই, সেখান থেকে ধরে আনবে। আর কী বললেন? আমি ছেড়ে দিলে আপনাকে নিকাহ করবে? হাসালেন। মাধবী যদি উনাকে ছেড়েও দেয় তবুও উনি বারংবার এক মাধবীকেই নিকাহ করবে। আপনার সমস্ত ভালোবাসা দিয়েও উনাকে এক চুল নড়াতে পারবেন না। আর আমার এক ইশারায় জ্বীন সর্দার হাসিমুখে মৃত্যুকে বরন করতেও প্রস্তুত। শুধু শুধুই এসব অকাজের বুদ্ধি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এতে আপনারও ভালো আর আমারও। আমার পাঞ্জাবিওয়ালার দিকে চোখ দিলে সেই চোখ আর চোখের জায়গায় থাকবে না। আর আমি যদি ছেড়ে দিতে চাই এতে আমার ইশারায় মৃত্যু গ্রহন করা মানুষটাও আমাকে মৃত্যু দিতে পিছ পা হবে না। উনি আমার জন্য মরতেও পারে, মরতেও পারে। তাই বলছি আপনারও লাভ আর আমারও”
কথা শেষ করে মাধবী তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে। অপাশ থেকে বেশ কিছুক্ষন নিরবতার পর কথা শোনা যায়।
“চাই না আপনার স্বামীকে আমার। কিন্ত আমাদের সম্প্রদায়ের শান্তি ফিরিয়ে দিন”
মাধবী ভ্রু কুচকে বলে “কীভাবে?”
“আমার সাথে আপনাকে আমাদের জাবুলকা শহরে যেতে হবে। আপনাকে কিছুদিন সেখানে লুকিয়ে রাখা হলে সর্দার ওখানে যাবে। তখন আপনি শুধু ওনাকে বলবেন, যেন আমাদের অত্যাচার না করে। আর ঠিকমত রাজ্য শাসন করে। আপনার কথা উনি শুনবে। এরপর আমরা আপনাকে ছেড়ে দেবো”
“কীসের নিশ্চয়তায় আমি যাবো আপনার সাথে?”
“সমস্যা নেই। আপনার কোন ক্ষতি আমরা চাইলেও করতে পারবো না। সম্প্রদায়ের সকল জ্বীনদের আকাঙ্খা আপনি। আপনাকে কোন ক্ষতি করতে চাইলে ওরাই আগে ঝাপিয়ে পরবে। আর সর্দারের কথা তো বাদই দিলাম। আপনি একদম নিরাপদে সেখানে থাকতে পারবেন”
মাধবী কিছুক্ষন ভেবে বলে “বেশ। আমি যাবো। তবে কাল। কাল আমি আপনাকে ডেকে নেবো। আজ চলে যান”
পরীটা সালাম দিয়ে চলে যায়। আবারও ঠান্ডা হিমেল হাওয়ায় চারদিক দুলে উঠে। মাধবী পর্দা সরিয়ে দেখে কেউ নেই। সে বারান্দার আশেপাশে চোখ বুলিয়ে ঘরে চলে আসে। ঘরে আসতেই সবটা কেমন যেন দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে। সে মোরা পেতে বড় আয়ানাটার সামনে বসে। সব কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে। আরিয়ান এত শক্তিশালী? এতক্ষন মাধবী পরীটার সাথে এমনভাবে কথা বললো যেন সব স্বাভাবিক। কিন্ত আসলেও কী তা-ই? এতদিন যাকে সাধারণ একজন মানুষ ভেবে আসছিলো সে নাকি জ্বীন সর্দার! তাও এত বড় গোত্রের সর্দার! তাই তো সেদিন ইচ্ছেকে ভর করা জ্বীনের গোত্রের নাম শুনে বলেছিলো, গরীবানা গোত্র। নিজে এত বড় গোত্রের সর্দার হলে তো বাকিদের ছোটই মনে হবে। সেদিন তাহলে আরিয়ান তাকে মিথ্যা বলেছিলো, যে চাপা মেরেছে। আসলে ঐ চাপা তো সত্যিই। তাই তো নিমিষেই কোন ওঝা ছাড়াই জ্বীন টাকে তাড়াতে পেরেছে। সবকিছুই কেমন যেন মনে হচ্ছে তার কাছে। লোকটা তার কাছে কত কোমল সেজে থাকে। অথচ তিনিই নাকি জ্বীন জাতির উপর রাজত্ব করে। মাধবীর কেমন যেন সব ধোঁয়াসা লাগছে। এখন আরিয়ানের সামনে দাঁড়ালেও তো কেমন লাগবে। ভাবা যায়! মানুষ হয়ে কত শক্তিশালী জ্বীন সম্প্রদায়ের উপর রাজত্ব করে! মাধবী নিজেকে স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চালায়। যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে আলতা হাতে নিয়ে আরিয়ানের জন্য অপেক্ষায় থাকে।
এর বেশ কিছুক্ষন পর, প্রায় মধ্যরাতের দিকে আরিয়ান বাড়িতে আসে। সাধারণত আরিয়ান কখনোই এত রাত পর্যন্ত বাড়ির বাহিরে থাকে। মাধবী চটজলদি গিয়ে দরজা খুলে দেয়। আরিয়ানকে এমন অবস্থায় আশা করেনি মাধবী। পাঞ্জাবির বিভিন্ন জায়গা রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে খুন করে এসেছে। সাদা পাঞ্জাবিতে লাল রঙ ঝিলিক দিয়ে আছে। কী যেন বিরবির করতে করতে ঘরে ঢোকে। খেয়াল করেনি বোধহয় মাধবীকে। পকেট থেকে একমুঠো কাচের চুরি বের করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে হাঁক ছোরে “এই বউয়ের বাচ্চা মধু। মধু?”
মাধবী চুপ করে কিছুক্ষন আরিয়ানের ভয়ংকর হলুদ চোখজোরায় চেয়ে থাকে। রাতের বেলা এই চোখজোরা যেন আরও ভয়ংকর দেখায়। এতদিন সে ভাবতো স্বাভাবিক ভাবেই এই চোখ দুটো হলুদ। কিন্ত এখন মনে হচ্ছে এই হলুদ চোখেও কোন রহস্য আছে। আরিয়ান চুরি রেখে এক টানে পাঞ্জাবি খুলে ফেলে। ততক্ষণাত দৃশ্যমান হয় পিঠের কিছু দগদগে ক্ষত। এগুলো এতদিন ছিলো না। আজই প্রথম দেখছে। আরিয়ান পাঞ্জাবি রেখে আমার হাঁক ছোরে “কী হে বালের বউ আমার। কই গেলি?”
মাধবী সামনে এগিয়ে যায়। স্বভাবতই বলে “গরুর মত চেচাচ্ছেন কেন। আর পাঞ্জাবি তে রক্ত কেন?”
“বাল। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর দিস না কেন?”
“রেগে আছেন?”
মাধবীর নরম সুরে ততক্ষণাত আরিয়ানের এতক্ষনের খিঁচে থাকা মেজাজ শান্ত হয়ে যায়। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে “দুঃখিত গৃহিনী সাহেবা। আর এমন হবে না”
মাধবী কিছু না বলে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। আরিয়ান এতক্ষনে লক্ষ্য করে মাধবী সাজগোজ করেছে। ততক্ষণাত চোখ দুটো স্থির হয়ে যায়। মুগ্ধ নয়নে এগিয়ে আসে মাধবীর দিকে। নেশা ধরা চাহনি নিক্ষেপ করেই ছোট ছোট অবাধ্য চুলগুলোকে এক হাতে কানের পাশে গুঁজে দেয়। পায়জামার পকেট থেকে একটা মাধবীলতা ফুল বের করে সেথায় গুজে দিয়ে বিরবির করে “স্বর্গের হুর, মধুমতী”
মাধবীর দৃষ্টি মেঝেতে স্থির। আরিয়ান তা এক পলক দেখে সরে এসে কাচের চুরিগুলোর দিকে ইশারা করে বলে “এগুলো পরে নে। আমি এক মিনিটে গোসল করে আসছি”
মাধবী বাধ সাধে “দাঁড়ান”
“আবার কী?”
“এসব কীভাবে হলো?”
“কোনসব?”
“ব্যাথা কীভাবে পেলেন? মারামারি করেছিলেন?”
“মারামারি খয়রাতির বাচ্ছারা করে। আমি শুধু টুশ করে মেরে দেই”
“কাকে মেরেছেন?”
“যার সময় শেষ হয়েছে তাকেই মেরেছি”
“নাম বলুন”
“চিনবি না”
“তবুও বলুন”
“দলীয় শত্রুতা বসত অপূর্ব কে মারতে এসেছিলো এক জানোয়ার। ওটাকে সরিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন গোসল টা করে আসি। অপেক্ষা কর”
মাধবী আবারও খাটের উপর বসে পরে। কিছুক্ষন পরেই আরিয়ান আসে। মেঝেতে বসে মাধবীর দু হাত পায়ে আলতা দিয়ে দেয়। সবশেষে পায়ে চুমু খেতে যাবে এমন সময় মাধবী পা সরিয়ে নিয়ে আচমকা বলে “আমি যদি আপনাকে ছেড়ে চলে যাই?”
আরিয়ান উঠে বসে মাধবীর পাশে বসে। এক পেশে হেসে বলে “ছেড়ে চলে যাওয়াটা তোর অধিকার, কিন্তু আগলে রাখাটা আমার জেদ। এই মহাবিশ্বের কোনো প্রান্তই আমার নজরদারির বাইরে নয়। তুই যেখানেই যাবি—সেখানেই আমার অস্তিত্ব মিশে থাকবে। তুই যেতে পারিস, কিন্তু আমার থেকে মুক্তি পাওয়ার সাধ্য তোর নেই। কারণ তুই আমার ভাগ্যের সাথে এমন এক সুতোয় বাঁধা, যা ছেঁড়ার ক্ষমতা স্বয়ং বিধাতাও তোকে দেননি। যেদিন তুই আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববি সেদিন এই পৃথিবীটা তার কক্ষপথ হারাবে। ছাই হয়ে যাবে সব”
মাধবীও এক পেশে হেসে বলে “কিন্ত আমি তো চলে যাবো”
আরিয়ানও হেসে বলে “তোর কোন ইচ্ছে অপূর্ণ থাকুক তা আমি চাই না। চলে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে যেতে পারিস। ধরে আনার ক্ষমতাটুকু আমার আছে”
“যদি অধিকারই না থাকে?”
“আমি কি বলেছি কখনো যে, আমার অধিকার চাই? আমার তোকে চাই। তুই আমার মানে বাকি সব এমনিতেই আমার”
“যদি আমিই আপনার না থাকি?”
“বালের প্রশ্ন মারাও তুমি। যেই প্রশ্নের কোন মান নেই ওসব আমার কাছে করিস না। উত্তর পাবি না”
মাধবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। আকাশে থালার মত চাঁদ উঠেছে। দেয়াল ঘেসে হাঁটু ভাজ করে বসে। আরিয়ান ঘরের ভেতর থেকে মাধবীর বিষন্ন বদন লক্ষ্য করে উঠে আসে। দরজার পাশে হাত ঠেকিয়ে বলে “হলো কী আজ গৃহিনীর? মন খারাপ কেন?”
“কিছু না”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪০
আরিয়ান এসে পাশে বসে। মাধবীর মাথাটা এক হাতে নিজের কাঁধের উপর রাখে। বেশ কিছুক্ষন পর নরম কন্ঠে বলে “আমি ভীষণ লোভি জানিস। আমার এতকিছু থাকার পরেও আমি তোর অভাবে অভাবি । আমার সমস্ত প্রাপ্তি ফিকে হয়ে যায় শুধুমাত্র তোর বিষন্ন চেহারার দিকে চাইলে। তোর মধ্যে কি যেন একটা আছে যেটা আমাকে তুই ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে দেয় না। তোর অজান্তেই তুই আমার জীবনটা এত সুন্দর করে দিয়েছিস যে—#তুই_আমার_৭_মিনিট।
মৃত্যুর পরে মানুষের মস্তিষ্ক ৭ মিনিটের জন্য সচল থাকে। তার সমস্ত সেরা স্মৃতি গুলোকে পুনরায় চালানোর জন্য। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সময়, এই ৭ মিনিটে পাঞ্জাবিওয়ালা শুধু তার মধুমতীকে রাখতে চায়”
