তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৭
ঐশী আফরিন
ক্যাচ ক্যাচ শব্দে দু পাশে খুলে গেল বড় লোহার ফটকটি।মাধবী কিছুক্ষন একগুয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাড়িটির দিকে।গাছের শেকড়ের আড়ালে বাড়ির দেয়াল গুলোও দেখা যাচ্ছে না।মনে হচ্ছে যেন শত শত বছর পুরোনো রাজাদের ফেলে যাওয়া বাড়ি।অথচ মাত্র দু বছর হয়েছে বাড়িটি জনমানবশুন্য।এর মাঝেই বাড়িটির আশেপাশেও কেউ ভিড়তে পারছে না।সবচেয়ে বেশি তাকে আশ্চর্য করে দিন দিন বাড়িটির বিশাকৃতি হওয়া।এতদিন লোকমুখে শুনে সে বিশ্বাস করেনি।আজ নিজের চোখে দেখলো।বাড়িটি আগের চেয়ে অল্প নয় অনেক অনেকটা বড় হয়েছে।এই অবিশ্বাস্য কথাটা নিজ চোখে দেখার পরও তার বিশ্বাস হলো না।কিভাবে একটা জড়বস্তু দিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে!আশ্চর্য!
ভাবতে ভাবতেই মাধবী যেই না ভেতরে পা দিতে যাবে অমনি সেই ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কা লাগে।তবে বাতাসটা এবার শুধু তাকে ছুঁয়ে দেয় না।বাতাস এতটাই জোরে বইলো যে, সে দু কদম পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।সে অবাক চোখে তাকায় বাড়িটির দিকে।আবারও পা দিতে গেলে একই ঘটনা ঘটে।এরকম তিনবার ঘটে।হঠাৎই তার চোখ আপনা আপনিই চলে যায় বাঁ পাশের গাছে বসে থাকা প্যাঁচা টার দিকে।কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে।গাছের নিচে দেখতে পায় একটা ধবধবে সাদা বিড়াল।এবার দৃষ্টি যায় ডান পাশের গাছে।সেখানে ঘাপটি মেরে বসে আছে একটি কাঁক।তার নিচে দেখতে পায় একদম কুচকুচে কালো একটি বিড়াল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তার পায়ের সামনে তাকাতেই সে আতকে উঠে দু পা পিছিয়ে যায়।মানুষের পায়ের বড় বড় দুটো হাড্ডি।একটার উপর আরেকটা ক্রস চিহ্নের মত রাখা।তার চার দিকে চারটে লেবুর উপর সিঁদুর ছিটিয়ে দেওয়া।যেন মাধবীর চোখ কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে,এমনভাবে সবগুলো জিনিস চোখে পরলো।সবটা তার মাথার উপর দিয়ে যায়।রাজবাড়িতে আর ঢুকতে না পেরে সরে আসে।পিছিয়ে আসে সেখান থেকে।হাঁটা শুরু করে অপুদের বাড়ির দিকে।তবে কিছুটা যেতেই মনে হয় তার পিছনে কেউ আসছে।একদম মানুষের অস্তিত্বের মত মনে হয়।পেছনে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার হাঁটা ধরে।এভাবে অনেকবার হয়।তাই দেড়ি হয় পৌছাতে।অনেকটা সময় পর সে খেয়াল করে তার সাথেই উঁড়ে আসছে সেই প্যাঁচা টি।তখন সে অপুদের বাড়ির সামনে।সে সেখানেই দাঁড়িয়ে পরে।তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করে প্যাঁচা টাকে।হিংস্র দুটো দৃষ্টি যেন এক সাথে হয়।কিছুক্ষন পর কেন যেন প্যাঁচাটি দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়।
মাধবী আর অপুকে না ডেকে একাই তাদের বাড়ির পেছন দিকে চলে যায়।অপুকে ডাকেনি কারন অপু এসবে ভয় পায়।নদীর সচ্ছ পানি চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে।আজ বোধ হয় পূর্ণিমা।এই নদীর পার ধরেই যাওয়া যাবে রাজবাড়িতে।মাধবী সেই নদীর পার ধরে হাঁটা ধরে।আশেপাশে প্রতিটা নড়া চড়া ঢুকিয়ে নেয় মস্তিষ্কে।তবে কিছুদূর যেতেই তার দৃষ্টি আটকায় নদীতে ভাসমান তাবীজের উপর।আরেকটু হাঁটতেই দেখতে পায় শত শত তাবীজের সমাহার।এত বড় নদীতে ঠিক রাজবাড়ির এরিয়াতেই তাবীজের দেখা মেলে।রীতিমত সে অবাকের চূড়ান্ত সীমায়।
তার মানে সে এতক্ষন যা সন্দেহ করেছিল তাই সত্য হয়েছে।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে তার।ফিরে যায় সে অপুদের বাড়ির দিকে।আবারও মনে হয় কেউ তার পিছু নিচ্ছে।তবে এবার আর সে ফিরে তাকায় না।পেছন দিক থেকে অপুর রুমের জানালায় টোকা দেয়।অপু গভীর ঘুমে থাকা অবস্থাতেও কানে শব্দ পৌছে যায়।এত রাত্তিরে মাধবী ছাড়া আর কেউই আসবে না তার সাথে দেখা করতে।ভেবে সে উঠে গায়ে ওড়নাটা জরিয়ে নেয়।তবুও একবার ভাবলো জানালাটা খুলে দেখে নেওয়া ভালো।তবে জানালা খুলতেই সে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পরে।
মাধবী মুখ খুলে মাথা থেকে কাপড়টা সরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।মাথা থেকে কাপড়টা সরানোতে হাত খোপাটা খুলে গিয়ে প্রথমে পিঠে পরে কোমরে শেষে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ছরিয়ে পরে।বাতাসে অবাধ্য চুলগুলো নৃত্য করছে।চাঁদের আলোয় এই সৌন্দর্য দ্বিগুণ মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে বেহেস্ত থেকে পালিয়ে আসা কোন হুরপরি।অন্য সবার মত অপুরও জবান বন্ধ হয়।এই মাত্র ঘুম থেকে উঠা অপু সবচেয়ে বেশি অবাক হয় মাধবীর কপালে সদ্য কাঁটা দাগ দেখে।তবে কিছু না বলে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে আস্তে করে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।
মাধবীর কাছে গিয়ে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করে “কিরে তোর কপালে কি হয়েছে?”
মাধবী ভ্রু কুচকে কপালে হাত দেয়।হাতে রক্ত দেখে নিজেও অবাক হয়।মনে করার চেষ্টা করে কোথাও ব্যাথা পেয়েছিলো কি না।তার জানা মতে এতক্ষন যা হয়েছে তাতে সে কোন আঘাত পায়নি।তবে এসব অপুকে না জানিয়ে বলে “আরে আসার সময় ইটের সাথে পা মোঁচকে পরে গিয়েছিলাম।তখন হয়তো ব্যাথাটা পেয়েছি”
“তা এত রাতে এখানে কেন?আর আরিয়ান ভাইয়া তোকে কিভাবে আসতে দিলো?”
“চুরি করে এসেছি।আগে শোন।কাল তুই এরকম করলি কেন?”
“কী করেছি?”
“কাল ছাঁদে যে ওভাবে হাসলি”
“কাল তো আমি ছাঁদেই যাইনি”
“নাহ।কাল তুই ছাঁদে গিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলেছিলি ‘নিচে আয় তোর সাথে কথা আছে’।তারপর আমি নিচে গিয়ে তোকে পাইনি।পরে কিছুক্ষন পর তুই রুমে এসেছিলি।মনে করে দেখ”
“আরে তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?আমি তো এসেই সোজা তোর রুমে গিয়েছিলাম।গিয়ে তো তোকে রুমেই পেয়েছি”
চিন্তারা ঘিরে ধরে মাধবীকে।তাহলে কাল ছাঁদে অপুর বেশে কে এসেছিলো।ঐ ছেলেটাই বা কোথায় নিখোঁজ হলো।আর এসব হাড়গুলো আসছে কোথা থেকে।যেখানে কেউ যায়না সেখানে এভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে লেবু কে রেখে যাবে?
“কি হলো মাধবী?”
“হ্যা?”
“আরে” বলে অপু ধাক্কা দেয় তাকে।
মাধবী ধ্যান ভাঙে “কি?কি হয়েছে?”
“তুই ঠিক আছিস মাধবী?কি হয়েছে?”
“কিছু হয়নি।তুই গিয়ে শুয়ে পর আমি আসছি”
“একা যেতে পারবি?না আমার দিয়ে আসতে হবে”
শত চিন্তার মাঝেও মাধবী একটু খুনশুটি করে নেয় “হ্যা।এখন তুই আমাকে আগিয়ে দিয়ে আয়।তারপর আবার আমি তোকে এসে আগিয়ে দিয়ে যাবো।এভাবেই কাটবে সারারাত”
অপু হেসে দেয় “আচ্ছা যা।তোর মত তো আমার এতো কলিজা নেই”
মাধবী বিদায় নিয়ে ফিরে যায় রাজবাড়িতে।রাস্তায় আবারও একই ঘটনা ঘটে।মাধবী সেখানে পৌছে দেখতে পায় ফটকটা লাগানো।সে তো খুলে গিয়েছিলো।তার স্পষ্ট মনে আছে সে ফটক লাগায়নি।তাহলে লাগালো কে?সে খোলার চেষ্টা করে।কিন্ত আর খুলতে পারে না।এক একটা ঘটনা তাকে অবাকের চরম সীমায় পৌছে দিচ্ছে।ফটক রেখে এগিয়ে যায় হাড়গুলোর দিকে।বুক ভরে শ্বাস নিয়ে হাত বারায় হাড়ের পাশে পরে থাকা সিঁদুরে লেপ্টানো লেবুর দিকে।তবে ছোঁয়ার সাথে সাথেই সে আচমকা জ্ঞান হাড়ায়।ঢলে পরে চিরচেনা মাটির বুকে।হাতে লেগে থাকে টকটকে লাল সিঁদুর।পাশের ডালগুলো বসে থাকা প্যাঁচা,কাক এবং বিড়ালগুলো এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে এক দুঃসাহসী অপ্সরাকে।
রুহিদের স্কুলে আজ টিকা দিবে।সেই ভয়ে সে কোনভাবেই স্কুলে যেতে রাজি নয়।ইঞ্জেকশনকে মেয়েটা যমের মত ভয় পায়।রুহির পাগলামিতে আরশিরও কলেজে লেট হয়ে যাচ্ছে।এদিকে আয়াজ বকা ঝকা করে রাখছে না আরশিকে।সাথে মা-চাচিরা তো আছেই।ওদের কথা, কেন বড়বোন থাকতে ছোট বোনকে বোঝাচ্ছে না।
আরশি এবার রেগে চর বসিয়ে দেয় রুহির গালে “ভাই শুধু একটা মশার কাঁমরের মত মনে হয় আর এই জিনিসটা নিয়ে তুই এরকম করছিস।তোর জন্য আমি কতগুলো বকা শুনেছ”
“আরে ইঞ্জেকশন দেখলেই আমার ভয় করে”
আয়াজ এসে বলে “আমি আরিয়ান ভাইয়ার বন্ধু অভিকে বলে দিচ্ছি।ওনাকে দিয়ে তোকে ইঞ্জেকশন দেওয়াবো।ও আমাদের নিজের মানুষ।আমি ওকে বলে দিচ্ছি যেন তোকে ব্যাথা না দেয়।এবার উঠ আর একটা কথাও নয়”
ভাইয়ের মুখের উপর কথা বলতে না পেরে অগত্যা রুহি তৈরি হয়ে পরে।বাড়ির গাড়িতে দুজন যাওয়া আসা করে।পুরোটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে গেছে।আরশির কলেজের সামনে আসতেই সে নেমে পড়তে নিলে রুহি ওর ওড়না টেনে ধরে।
নাক টেনে বলে “বইন আমি তোমার দুঃখগুলা মনোযোগ দিয়া শুনি। তুমি আমার সাথে আসো না।প্লিজ ”
মেয়েটাকে দেখে আরশির মায়া হলেও কিছু করার নেই।একটু পরেই তার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।তাই বলে,
“এখনই যদি এত কাঁদিস তাহলে টিকা দেওয়ার পর কি কাঁদবি।একটু কান্না জমিয়ে রাখ পরে কান্না করার জন্য”
বলেই সে তড়িঘড়ি করে গাড়ির দরজা লাগিয়ে ফেলে।ড্রাইভারকে ইশারা করে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে।তারপর সে নিজের ক্লাসে চলে যায়।স্কুলে পৌছে স্কুলের সামনে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে রুহি।একটু পরেই ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।একটা ক্লাসের পরেই টিকা দেয়া শুরু হবে।ভাবতেই তার গায়ে কাটা দেয়।
আচমকা হাতে হেচকা টান পরতেই রুহি চোখ মেলে তাকায়।দেখতে পায় একটা সাদা এপ্রন পড়া ছেলে তাকে হাত ধরে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে।
সে চেঁচিয়ে উঠে “এই কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?কে আপনি?”
লোকটা পেছনে ফিরতে রুহি বুকে থু দিয়ে বলে “ওহ ডাক্তার বাবু।এভাবে না বলে নিয়ে যাচ্ছেন ভয় পেয়ে ছিলাম”
তারপর চুপচাপ অভির পেছন পেছন আসে।হঠাৎ মনে হয় অভিই তো তাকে ইঞ্জেকশন দিবে।ততক্ষনে অভি তাকে একটা ফাঁকা ক্লাস রুমে এনে বসিয়ে দিয়েছে।
“চুপ চাপ চোখ বন্ধ করে বসো”
রুহি শুকনো ঢোক গেলে।বাড়িতে যতই চেঁচামেচি করুক।এখন বাহিরের কারো সাথে তো চিৎকার করা যাবে না।তাই সে নিজেকে নানা ধরনের আজেবাজে বুঝিয়ে গাট হয়ে বসে।তবে অভির হাতে ইঞ্জেকশন দেখার সাথে সাথেই কান্না করে দেয়।
“আরে কিচ্ছু হবে না।তুমি টেরই পাবে কিছু”
“নাহ।ভয় লাগে আমার”
“ভয় লাগে দেখেই তো আমাকে আনিয়েছে।নয়তো আমি কোন স্কুলে টিকা দেই না।শুধু তোমাকে দিয়ে চলে যাবো।দেখো আমাকে বাধ্য করো না তোমাকে স্পর্শ করতে।তোমার আমার ধর্ম কিন্ত এক না।”
রুহি এক চোখ খুলে তাকায়।এখানে ধর্ম আসলো কোত্থেকে?
তবে আর কিছু ভাবার আগেই অভি তার দুটো হাত নিজের এক হাতে মাঝে চেপে ধরে সুঁই ঢুকিয়ে দেয়।রুহি কিছু না বুঝেই অভির হাতে সুঁই দেখে চিৎকার করে উঠে।
“আরে মেয়ে চিৎকার বন্ধ করো।কাজ শেষ”
“কি?কই?কখন করলেন?”
“তোমরা মেয়েরা বোঝ কম চিল্লাও বেশি।যেটা বোঝাতে চাই সেটা না বুঝে উল্টোটা বোঝ।সোজা জিনিসটা তোমাদের বোধগম্যের বাহিরে।তোমরা মেয়েরা যদি আজ উল্টো না বুঝে সোজা বুঝতে তাহলে আজ আমাদের ছেলেদের জীবন উল্টো না হয়ে সোজাই হতো”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ঝরের বেগে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায় অভি।এই উল্টো সোজার সংগা পুরোটাই রুহির কানের পাশ দিয়ে গিয়ে মাথার উপর বারি খেল।কিন্ত কিছুই মাথায় ঢুকলো না।এই ডাক্তার লোকদের কিছুই রুহির মাথায় ঢোকে না।হুট করে তাকে ধরে নিয়ে এসে ইঞ্জেকশন দিয়ে কতগুলো কথা শুনিয়ে হুট করে আবার চলে গেল।
রুহি কিছুক্ষন থম মেরে বসে থেকে আনমনেই একা একা বলে উঠে,
“আপনার কথা আমার মাথায় না ঢুকলেও আপনি আমার মনে ঢুকে বসে আছেন ডাক্তার বাবু।জানি না কি হবে এর পরিনতি।ধর্মের দেয়াল কখনো আমাদের এক হতে দেবে না জেনেও আপনাকে ভালোবাসি।আপনি আমাকে ভালোবাসেন না জেনেও ভালোবাসি।সব অবস্থাতে,সবসময় আপনাকে ভালোবাসি ডাক্তার বাবু”
তারপর চোখ মুছে দৌড়ে ক্লাসে চলে যায়।অথচ সে জানতেই পারেনি তার মত সেই একই রোগ ভুক্ত রোগী তার সব গুলো কথা কি আবেশেই না শুনেছে।আবার মুখ টিপে আনমনে হেসেছেও।
বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙে মাধবীর।ঘুম থেকে উঠে নিজেকে আবিষ্কার করে নিজের বিছানায়।খেয়াল করে তার কপালের ক্ষতটাতেও মলম লাগানো।বেশ অবাক হয়।সাথে আশঙ্কা করে কেউ কি তাকে দেখে ফেলেছে নাকি আরিয়ান তাকে নিয়ে এসেছে।কিন্ত এত রাতে কেউ জানারও কথা না।তাকে কে নিয়ে আসলো বাড়িতে।আরিয়ান এনে থাকলে,কেন গিয়েছিল জিজ্ঞেস করলে কি উত্তর দেবে?আর ঐ হাড়গুলো যদি দেখে থাকে তাহলে তার জন্য আরো কঠিন হবে সবটা।আরিয়ান কখনোই তাকে এসব ঘাটিয়ে দেখতে যাওয়ার জন্য দেবে না।
কাল রাতের সমস্ত ঘটনাগুলো একে একে স্মৃতির পাতায় ধরা দিতে থাকে।সাদা কালো বিড়াল,কাঁক,
হাড়,খুলি,সিঁদুরে লেপ্টানো লেবু,তাবিজ,হঠাৎ তার কপালে আঘাত পাওয়া,তার পেছনে কারো অবয়ব অনুভব করা,এই সব কিছু একটা দিকেই ইঙ্গিত করছে।এখন মাধবীর খুনিদের আগে তাদের পূর্ব পুরুষ সম্পর্কে জানতে হবে।সাথে মায়ের পূর্বপুরুষদের সম্পর্কেও জানতে হবে।আরিয়ানের বাবার খুনিকে বের করতে হবে।সেনাপতি আসাদের খুনিকে বের করতে হবে।
তার আগে সর্ব প্রথম তৃশান কে খুঁজে বের করতে হবে।যতই তার সাথে আরিয়ান থাকুক।মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস বরাবরই ক্ষীণ।তাছাড়া আরিয়ান তার রক্তের কেউ নয়।যতই মামাতো ভাই হোক আর সেনাপতি হোক।আপন কেউ তো নয়।সে জানে আরিয়ানের তার প্রতি দূর্বলতা এবং সে নিজের দূর্বলতা সম্পর্কেও জানে।কিন্ত কখনো মানতে চায় না।আবার না মেনে থাকাও যায় না।তবে তাই বলে বিশ্বাস সে তার বাবাকে ছাড়া কাউকে করেনি।ভবিষ্যতে হয়তো ভাগ্য যে হবে তাকে বিশ্বাস করবে দ্বিতীয় বারের মত।
এসব ভাবতে ভাবতেই যোহরের আযান পরে।আযান কানে যেতেই সে ধরফরিয়ে উঠে বসে।বেশিই দেড়ি হয়ে গেছে।উঠে তাড়াতাড়ি গোসল করে নামায পরে নেয়।এরমধ্যে কাজের মেয়েরা এসে ঘর গুছিয়ে দিয়ে যায়।মাধবী আজ সাদার মধ্যে সোনালী পেরের একটা শাড়ি বের করে।যার আচঁল এবং দু পাশে খুব সুন্দর করে সুঁতার কাজ করা।সাথে এরকম হালকা স্টোন বসানো।শাড়িটা ঝুমা চৌধুরীর বিয়ের শাড়ি।তখনকার যুগে এরকম শাড়ি কেবল রাজার বউদের কপালেই জুটতো।শাড়িটা বেশি ভারী না।স্বাভাবিক পড়ার মত দেখে মাধবীও আজ একবার পড়বে বলে ইচ্ছা করলো।আর ভেবে রাখলো আরিয়ানের সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করে নেবে কে তাকে এনেছে বাড়িতে।
সোনালী রঙের কাজ করা ব্রাউজের উপর খুব সুন্দর করে কুঁচিগুলো তুলে জরিয়ে নিলো মাধবী নিজের গায়ে।অপুকে সবসময় পায়ের গোড়ালির উপর শাড়ি পরতে দেখে তারও ওভাবেই পড়তে ইচ্ছে হলো।আঁচলটাকে সালিনতা ঠিক রেখে কাঁধ পর্যন্ত ভাঁজ করলো।যেন শরীরের কোণ অংশ দেখা না যায়।মায়ের বিয়ের ঘুঙুরের মত মোটা মোটা নূপুরগুলো পড়লো।বেলকনি থেকে বেলি ফুল কুড়িয়ে দুটো গাজরা বানালো।চোখে মোটা করে সুরমার প্রলেপ দিলো।কিছুক্ষন বেলকনির রোদে দাঁড়িয়ে চুল শুকনো করলো।আলতা বের করে সামনে রাখলো।গাজরাগুলো সামনে রাখলো আলতা দিয়ে পরে পরবে বলে।কিন্ত বিপত্তি বাঝলো বাঁ হাতে আলতা পরতে গিয়ে।কোনভাবেই যখন পারলো না শেষে শাড়ি নষ্ট হবে ভেবে রেখে দিল।গাজরাগুলো পরতে গিয়েও একই সমস্যা হলো।ক্লান্ত হয়ে কতক্ষণ সে বসে থাকে।হঠাৎ মনে হয় রুমার কথা।এখনও রুমা মাধবী কাছেই থাকে।তাকে দিয়ে পরিয়ে নেবে ভেবে ডাকলো
“রুমা আপা….?”
কোন জবাব আসে না।
“রুমা আপা একটু শুনে যাবেন।একটু তাড়াতাড়ি”
“রুমা নেই।বাড়িতে গেছে”
দরজার বাহির থেকে আরিয়ান উত্তর দেয়।
“ওহ।আচ্ছা?আর কেউ নেই?কাউকে ডেকে দিন না”
“এখন কাউকে পাবি না।সবাই কাজে ব্যাস্ত।আজ ফিরে যাব তাই অনেক কাজ আছে ওদের”
মাধবী মন খারাপকরে বলে “কি?আজই ফিরে যাবেন।আর কয়েকদিন থাকি না”
“আমার অনেক কাজ আছে।মানুষ আমাকে এমনি এমনি ভোট দেয়নি”
“ইশশশ” মাধবী ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে।এই প্রথম একটু সাজতে চাইলো তাও হলো না।তার চেয়ে বড় কারণ চলে গেলে এই সমস্ত রহস্য রহস্যই রয়ে যাবে।
আরিয়ান দরজার বাহির থেকেই আবার ডাকে “কি সমস্যা?আমাকে বলতে পারিস।কিছু লাগবে?”
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ১৬
“আপনাকে দিয়ে হবে না”
“তোর মত আমি রাজার হালতে বড় হইনি।তাই সব কাজই জানা আছে।বলতে পারিস”
“এসব মেয়েলি কাজ আপনি পারবেন না”
“আমি যে তোর জ্বল জ্যান্ত স্বামী সেটা যদি তুই জানতি তাহলে তোর সমস্ত মেয়েলি কাজের জন্য আজ রুমাকে ডাকতে হতো না।ছ্যাহ।জীন্দেগীটাই বাঁশ পাতা”
তারপর কিছুক্ষন চুপ করে থেকে নরম সুরে বলে “মধু আমি কি ভেতরে আসবো?”
কে জানে কি ছিলো ঐ ছোট্ট লাইনটাতে মাধবী না চাইতেও বলে ফেলে “আসুন”
