Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৪

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৪

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৪
নীতি জাহি

বিপদে কেউ আশে পাশে না থাকলে ও নয়ন এবং ইমরান ছিলো নিজের মানুষের মত। মিনহাজ যখন পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলো, ঠিক তখনই তার পাশে ইমরান- নয়ন। মাইশার মৃত্যুতে ও ভেঙ্গে পড়তে দেয় নি ওরা। নিজেকে আজ বড্ড অকৃতজ্ঞ মনে হচ্ছে। মানুষটাকে পাশে পেয়েছিলো তার প্রয়োজনে অথচ তারই ভালোবাসাকে অবমূল্যায়ন করেছিলো সমাজের জন্য। যে সমাজ তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলো যখন মেয়েকে নিয়ে অফিসে যেতে হিমশিম খেত। যখন চাকরি হারিয়ে ফেলেছিলো তখন পরিবারের মানুষজনেরও কত কটু কথা শুনেছিলো। টাকা মানুষের রূপ পরিবর্তে সাহায্য করে। আজ তার সব আছে,কিন্তু ইমরান পাশে ছিলোনা। নিজের ভুল শুধরে নেয়ার যদি একটা সুযোগ পেত!!!
ইমরানের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো মিনহাজ,

‘শরীর কেমন তোমার? কোথায় হারালে?’
‘আলহামদুলিল্লাহ,আগের চেয়ে ভালো।গত রাতে তো ভেবেছিলাম মরেই যাচ্ছি।’
‘আল্লাহ না করুক,আমার সুস্থতা টুকু ও যেন তুমি পাও সেই দোয়া করি।’
‘আর কত ঋণী বানাবি???
কিছুক্ষন থামলো মিনহাজ। কি বলবে উপস্থিত কারো মুখে কোনো কথা নেই। মিনহাজ পুনরায় বললো,
‘তুই কবে এলি?’
ইমরান মাথা উঠিয়ে মলিন মুখে বললো,
‘আজই একটু আগে,এয়ারপোর্ট থেকে এখানে এসেছি।তোমার জ্বর শুনে থাকতে পারিনি।’
মোনা- ইমরান কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেনা। কারো অভিমান আর অন্য কারো চাপা কষ্ট। দুয়ে মিলে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে।
মিনহাজ ইমরানকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে। আগে থেকে আরো বেশি সুপুরুষ লাগছে।কানের কাছে দুটো চুল সাদা দেখা যাচ্ছে। সাদা চুল যে কারো সৌন্দর্য্য বর্ধন করে এটা ইমরানকে দেখলেই উপলব্ধি করা যায়। মায়া বলে বসলো,

‘ ইমরান ভাই এসেছেন যখন রাতে খেয়ে যান।আমি নিজ হাতে রান্না করবো।’
মায়াকে দেখলেই রাগে গা জ্বলসে যাওয়ার মত অনুভূতি হয়। বেহায়ার মত সবার সামনে এভাবে বলার কোনো মানে হয়না। নয়ন ভাবছে এই মহিলার চুলের মুঠি ধরে আঁছাড় দিতে পারতাম। তখনই ইমরান সবার সামনে বললো,
‘ মায়া ছেলেটাকে নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করো,বাচ্চামি গুলো বাদ দাও। বয়স তো কম হলোনা।’
মামুন সাহেব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বললেন,
‘বাবা খেয়েই যাও।অনেক দিন তো একসাথে খাই না।’
ইমরান মুচকি হাসি দিলো। এতক্ষনে একবার ও মোনার দিকে তাকায় নি। মোনা ও তাকায় নি। মোনার চোখের পানি মিনহাজের নজরে পড়েছে। মেয়েটা ধুমড়ে মুচড়ে নিজের সাথে লড়াই করছে। অথচ বাবার সামনে একবার ও প্রিয় মানুষটার দিকে তাকাচ্ছে না। মোনা সবার সামনেই উঠে চলে গেলো। মায়া মোনার পিছু নিলো। মিনহাজ খেয়াল করেই ইমরানের হাত ধরলো।
ইমরান মিনহাজের দিকে নজর দিলো,
‘ দিয়ে দিলাম মোনাকে, অফিশিয়ালি কবে নিবি বন্দোবস্ত কর।’
ইশান তৎক্ষনাৎ এত জোরে হুররে বলে চিৎকার দিলো।সবাই ভয়ে পেয়ে লাফিয়ে উঠেছে।
‘ইশা শা ন……..’

বাবার ধমক খেয়ে আবার চুপ। মনে মনে ভাবছে, পাপা আজকে আমাকে ধমকই দিবে শুধু। নিজ থেকে তো কিছুই বলে না। মিনহাজের কথার জন্য উল্লাসের আগেই ইশানের লাফালাফি আর ইমরানের ধমকে সব আবার শান্ত। সবার মনে হলো মিনহাজের প্রস্তাব ইমরানের পছন্দ হয় নি। মিনহাজের হাত চেপে ধরে ইমরান বললো,
‘ মাঝে দুটো বছর অতিবাহিত হয়েছে,ভুলে গিয়েছি সব। আমার কাছে ভালো ছেলে আছে। সি ভি এবং বায়োডাটা দিয়ে দিব। ছেলে অক্সফোর্ড থেকে পড়াশোনা করেছে। আমার বুয়েটের এক ফ্রেন্ডের ছোট ভাই।’
শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি রুমে। মিনহাজ ইমরানের দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছে। এতটা অভিমান। নিজের প্রেমিকাকে কি করে অন্য কারো হতে দিবে। এত শক্ত তো ছিলোনা ইমরান।সেবার স্যুগার ডেডি বলাতে এতটাই ইগোতে নিলো। কিছুক্ষন পরই মনে হলো,ইমরান শুধু তার মেয়ের জন্য চাওয়া মানুষটা নয় এখন সে কারো বাবা,গণ্যমান্য বিজনেসম্যান। এমন মানুষটাকে অপমান করেছিলো সেদিন। কেউ আর কথা বাড়ায় নি। ইমরান এবার মামুন সাহেবকে বললো,

‘ আংকেল আমাকে তো যেতে হবে। আজকে হোম মিনিষ্টার এর সাথে মিটিং ফিক্স করেছি। আবার দু একদিনের মধ্যে ইতালি ব্যাক করবো।’
কিছু একটা ভেবে মামুন সাহেব অদ্ভুত এক আবদার করে বসলো,
‘ মোনার সাথে একবার কথা বলে যাও।’
ইমরান ক্ষীন হাসলো,
‘ আংকেল আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি উঠি।আবার আসবো ইনশাআল্লাহ। ‘
ইশানকে নিয়ে ইমরান বেরিয়ে যায়। মোনা জানালার কাচ টা সরিয়ে ইমরানের চলে যাওয়া দেখছে। কি করে পারছে এতটা দূরত্ব টেনে আনতে মানুষটা। বুকের ভেতর টা কেমন যেন করছে মোনার। বুকটা জ্বলছে। কালো গাড়িটা ওদের গেট ছাড়িয়ে বাতাসের গতিতে চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেলো। তখনই ফোনের হোয়াটসঅ্যাপে কেউ একটা ভিডিও পাঠালো, ইমরান এবং কাঁকনের গাঢ় অনুভূতি সম্পন্ন অধরচুম্বন। প্রতিবার কেনো এমন হয়। ওকে আঘাত করার সব রকমের পদক্ষেপ যেন কেউ না কেউ ফেলে।পথে কাঁটা ওর জন্য এভাবে বিছানো থাকে। ইমরান কত যত্নে প্রেয়সীর অধরে লিপ্ত।কতটা এগ্রেসিভ সে এই ভিডিও দেখলেই বুঝা যায়। কতটা আবেগে ভাসছে দুজন। মোনা চোখ মুছলো। নিজেকে শান্তনা দিলো এবার আর ভেঙে পড়বে না। যেহেতু উনারা স্বামী স্ত্রী ছিলো তাই অনেক কিছুই হতে পারে তাদের মধ্যে। দেখা করতে হবে উনার সাথে। বাবার রুমের দিকে পা বাড়ালো মোনা।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৩

মামুন সাহেব আজ ইমরানের নতুন রূপ দেখলো। মিনহাজ হতাশ হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। মিনহাজের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
‘ আজকের ইমরান অনেক অভিমানী মিনহাজ। এই ইমরানকে টলাতে পারবেনা। সময় দাও।’
‘ বাবা, মোনা টা যে কষ্ট পাচ্ছে।’
‘কয়লা পুড়ে হীরে হয়,মোনা তো হীরের চেয়ে ও দামী।সেটা তোমার বা আমার কথা নয়। স্বয়ং ইমরান মোনাকে সম্বোধন করে মোনালিসা নামে। মোনালিসাকে নিলামে উঠানো যায়?? দাম জানো তুমি মোনালিসার? আদোও কেউ জানে?
মামুন সাহেব নিজেও জানে নাতনীর অবস্থা। বয়সের অনেক ফারাক এরপর ও দুটো মানুষ নিজেকে সামলানোর যুদ্ধ করছে।তবে আজ ইমরানকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত।ইমরানের চোখে মোনার জন্য কোনো মায়া দেখেনি। ইমরান তো ফিরেও তাকালো না। তবে কি ইমরান মোনাকে আর চায় না। মিনহাজের ও অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। মেয়ের জন্য সারাক্ষন চিন্তা করে। মোনা যেভাবে নিজেকে পাথর করে রেখেছে এই মেয়ের মতগতি বুঝা বড় দায়। সুইসাইড এটেম্পট করার মত মেয়ে না ও।তবে টেবিলের ড্রয়ারে এন্টি ডিপ্রেশন পিল দেখেছে। ডাক্তার এসব খেতে দিতে বারন করেছে। মেয়েটা যন্ত্রণা ভুলে যেতে এসব খায় এখন এই কথা বাসার সবাই জানে। শেষ বয়সে এসে এত চিন্তা আর নিতে পারছেনা। মোনার একটা ব্যবস্থা করতে হবে যতদ্রুত সম্ভব।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here