Home তুমি আমার শেষবেলা তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৮

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৮
নীতি জাহি

ইমরান সবে মাত্র বাইরের কাজ সেরে ড্রইং রুমে এসে বসেছে, উপর থেকে নয়ন,ইশান, সোহান, জাহিন ধড়ফড় করে নেমে ইমরানের কাছে এসে দাঁড়ালো। নয়ন ইমরানের হাত ধরে টেনে সবাইকে উপরে আসতে বললো। বাচ্চারা লাফাচ্ছে উপরে কি দেখার জন্য।
‘নয়ন পড়ে যাব আস্তে টান। উপরে কি বায়োস্কোপ দেখাবি? আর মোনালিসাকে আমার রুমের দরজার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেনো? ও এখনো চেঞ্জ করেনি কেনো?’
‘এত কথা কস কেন? আগে তুই চল মামা’
বাড়ির সবাই উপরে চলে এসেছে। নয়ন ইমরানের রুমের দরজা খুলেই চিৎকার দিয়ে বলে সারপ্রাইজ। ইমরান রুমের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে আছে। এমন একটা কিছু সে কখনোই আশা করেনি। পেছন ফিরে দেখে বাড়ির অর্ধেক মানুষ সব উপরে। মোনা অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে।ইমরান নয়নের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলে বলে,

‘ নয়ন দিস ইজ ঠু মাচ। কি বানিয়েছিস রুমটাকে।এই বয়সে রুম সাজিয়ে,পাড়া বাজিয়ে বাসর করবো?? একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলোনা।’
‘ কেন এই বয়সে মানুষ কি বাসর করেনা,নাকি তুই করবিনা কোনটা। বাসর না করলে ইশান কোত্থেকে আসছে। তুই বুইড়া তো কি হয়েছে, মোনা তো এখনো ইয়াং ফেয়ার লেডি।আর তোরে দেখলে বুঝা যায় এখনো ডজনখানেক বাচ্চা পয়দা করার শক্তি তোর মধ্যে আছে। সো মামা চিল। এঞ্জয়।’
‘বেয়াদপ, আমার সব ছেলে- ছেলের বৌরা এখানে তুই সবার সামনে আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু করছিস কেন?’
‘ ছেলেরা বাসর করে নাই,জাহিন,জ্যুতি, অনামিকা কইত্তে আইছে?’
‘অসভ্য, ফাজিল চুপ থাক তুই?’
নকিব,মাশফি এগিয়ে এসে ইমরানকে বুঝাচ্ছে,
‘চাচাজান হাইপার হচ্ছেন কেনো? আপনি একটু শান্ত হোন। আজকে এমনিতেই স্পেশাল দিন, থাকুক না সাজানো রুমটা ভালো লাগছে দেখতে।’
ইমরান রাগ করে চেঁচালো।

‘রহিমা… আনোয়ার…।
‘জ্বি স্যার।
‘ ১০ মিনিটের মধ্যে পুরো রুম ক্লিন করো। একটা ফুল,বেলুন যেন না থাকে। ‘
নয়ন বাঁধা দিলো।
‘ইমরান ইশান নিজ হাতে সাজিয়েছে। মন ভেঙে দিস না ছেলেটার।’
ইমরান কিছুটা থমকে ইশানের দিকে তাকায়। আবার মোনার দিকে তাকায়। মোনা চোখের ইশারায় বুঝায় থাক। ইমরান বড় শ্বাস ছেড়ে বলে,
‘ওকে।’
রুম থেকে বের হয়ে যায় ইমরান। মোনা তখনো দাঁড়িয়ে। সবাই মোনাকে ভেতরে নিয়ে বসালো। বড় একটা দম ফেলে সবাই রুমে ঢুকে সাজানোর প্রশংসা করছে।কামরাজুড়ে লাল গোলাপ এবং সাদা রজনীগন্ধা। চারপাশে মোমবাতি জ্বালানো। সব মিলিয়ে পরিবেশটা মনোমুগ্ধকর।
‘ বড় মামী শাড়ি চেঞ্জ করবে?’

সামান্তার কথায় ধ্যান ফিরে কিছুটা সংকিত,সচকিত হয়ে তাকিয়ে আছে মোনা। নওশীন, তুশি এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলো। আচমকা সুরাইয়া মোনার বুকের উপর হাত দিয়ে লাফিয়ে উঠেছে।
‘ বড় চাচীজান আপনার হার্টবিট এত বেশি কেনো। ভয় পাচ্ছেন আপনি?’
এমন সময় রিক্তা রুমে প্রবেশ করে মোনাকে ধরে খাটে বসালো। সবাইকে ইশারা দিয়ে দরজা বন্ধ করে বসতে বললো। মোনার মুখ তুলে নিজের দিকে ঘুরালো।
‘মোনা বলেই ডাকলাম। নয়ন তো ভাবী ডাকতেই মজা পায়। তুমি যখন হয়েছো তখন আমি আর নয়ন প্রেম করতাম। কিছু প্রশ্ন করি কেমন? ইমরান ভাই সম্পর্কে কতটুকু জানো তুমি?’
‘জানি কিছু কিছু।’
‘নয়ন আর সালমা বলেছে তাই না?’
‘জ্বি’

‘আমি ভাইয়ার তিন ব্যাচ জুনিয়র। পালিয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, ভাইয়া জোর করে ধরে নিয়ে যায় আব্বুর কাছে। আমার ডাক্তার বাবা কিছুতেই নয়নের সাথে বিয়ে দিবে না কারণ নয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা। বাবার কোনো এক কালের রোগী বাবাকে ধমকে গিয়েছিলো সে আবার ছাত্রনেতা ছিলো।সেই ভয় বাবার মনে। ইমরান ভাই নিজ জিম্মায় কিভাবে যেন বাবাকে বুঝিয়ে আমাদের বিয়ে দেয়। নয়ন কথা দিয়েছিলো বাবাকে ওর সবটা দিয়ে করবে আমার জন্য। নয়ন একটু রসিক কিন্তু মানুষ হিসেবে চমৎকার একজন। আমি আজো পড়াশোনা করি, নয়ন নাহিয়াকে সামলায়। সবার জীবনকে রাঙিয়ে ইমরান ভাই নিজের জীবনটা অন্ধকারেই রেখেই গিয়েছে এতটা বছর। আমি চোখ বন্ধ করে আত্নবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি তুমি ইমরান ভাইকে যতটা চেনো ততটা কেউ চেনে না? কি সত্যি বলছি না??’
রিক্তার এমন প্রশ্নে তব্দা খেয়ে তাকিয়ে আছে মোনা।মোনা চোখ বলছে মোনা ইমরানকে সত্যি অনেকখানী বুঝে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে ইমরান রিক্তাকে এখানে পাঠিয়েছে মোনাকে সহজ করতে। একটু আগে লজ্জায় কুকড়ে গিয়েছে সবার সামনে।
রিক্তা মৃদু হেসে পুনরায় বললো,

‘ পুরুষ তার শখের নারীকে আগলে রাখে, তুমি জানো তুমি ঠিক কতটা শখের ইমরান ভাইয়ের? ভাইয়ের স্টাডি রুমে খুব সুন্দর একটা শো পিচ আছে একটা গাছ আর পাখির। কখনো হয়তো দেখবে। এই শো পিচে যেন আঁচড় না লাগে তাই উনি কাচের শোকেচ বানিয়ে নিজের হাতে ওটার যত্ন করে রেখেছে। ওই রুমে সবার প্রবেশ নিষেধ। শোপিচে যাতে আঁচড় না লাগে গ্লাবস পরে। তাহলে মানুষটা তোমাকে কতটা যত্ন করবে ভাবো তো। একবার নয়ন প্রশ্ন করেছিলো, মোনাকে কতটা ভালোবাসিস? উত্তর দিয়েছিলো- মোনালিসা আমার বড্ড শখের নয়ন। সেদিন সারা রাত আমি নয়ন ঘুমায়নি। তার আগেরদিন ঝগড়া করেছিলাম। ইমরান ভাইয়ের এই কথা শুনে নয়ন অনেক কেঁদেছিলো। মাফ চেয়েছিলো আমার কাছে। একটা মানুষ ঠিক কতটা আবেগ দিয়ে ভালোবাসতে পারে উনাকে দেখে বুঝা যায়। মানুষ টা প্রকাশ করতে পারেনা।’
তুশি সহসা বলে উঠলো,

‘ ভাইয়াকে আমি বড্ড ভয় পাই ভাবী। আমি উনাকে সবসময় চুপচাপ থাকতে দেখেছি। কিন্তু যেদিন জানলাম মোনা নামে কেউ আছে উনার জীবনে,সেদিন থেকে আপনাকে দেখতে ছটফট করলাম। একদিন ভোরে ভাইয়ার জ্বর এসেছে দেখে ইশতিয়াক আমাকে ডেকে পাঠালো। বড় আপা বাসায় ছিলোনা। ইশান ও নেই। সেদিন দেখি ল্যাপটপ খোলা। ভিডিও চলছে সামনে। ভাইয়া তখন জ্বরে অচেতন। ভিডিওটা আপনার, কোনো এক অনুষ্ঠানে গায়ে হলুদে মেজেন্ডা শাড়ি পড়ে গিয়েছিলেন মনে হয়। কল্পনা আপুর মেয়ের। ভাইয়ার পুরো ল্যাপটপের ওই ফাইল জুড়ে আপনার ছবি। আমি, ইশতিয়াক এতটা বিস্মিত হয়েছি যে ভুলেই গিয়েছিলাম কিছুক্ষনের জন্য ভাইয়া অসুস্থ। মানুষ টা সরাসরি প্রকাশ করতে পারেনা ভালোবাসা এটাই সমস্যা।’
‘ তুশি থামো আসল কথা বলে আমরা বের হব।তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আলমারির তিন নাম্বার তাকে শাড়ি রাখা আছে। ইমরান ভাইয়ের সমস্ত দায়িত্ব তোমার। পারলে মানুষটাকে একটু সুখ দাও। আর কত বলো। ভালোবেসে কাছে টেনে নাও। আমরা গেলাম।’
সবাই বেরিয়ে গেলো।একা ফেলে গেলো মোনাকে। অনেক গুলো প্রশ্ন,চোখের জল। উত্তর শুধু একটাই, ‘ইমরান শরীফ খানের শখের নারী মোনালিসা। যাকে ইমরান মল্লিকা ডাকে।’

সদ্যস্নাত কিশোরীকে দেখেই বুকের ধড়ফড় আরো জোরে ঝংকার তুলবে, চন্দ্রমল্লিকা সুভাস ছড়াবে,রাতের ফুল লজ্জায় সিক্ত হয়ে মুখ লুকাবে। আরশীতে নিজের কোকড়ানো চুলে চিরুনি চালিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লাল জড়ি পাড়ের সুতি শাড়িটিতে আজ অন্যরকম লাগছে মোনাকে। হাতের কনুই এর উপর ব্লাউজ। সামনে পেছনের গলাটা বেশ বড়। ঝুঁকলেই বক্ষভাঁজ পরিদৃষ্ট। এত বড় ব্লাউজ কেউ বানায়। এসব রিক্তা আন্টির কাজ। গলায় শাশুড়ি মায়ের রেখে যাওয়া সিম্পল চেইন যেটা বিয়ের কয়েকদিন পরই আইরিন পরিয়ে দিয়েছে। কানেও ছোট্ট দুলজোড়া পরেছে ভারী গয়না সব ছেড়ে। একটু স্বস্তি প্রয়োজন। নেভিয়ার লোশনটা হাতে পায়ে দিয়ে ধীমে পায়ে খাটের কোণায় গিয়ে বসলো। চোখ গেলো বিছানার চাদরে লিখা ইমরান প্লাস মোনা লিখাটাতে। মাঝে একটা রুপার ডালায় দুটো মালা রাখা। একটা মালা হাতে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে কয়টা গোলাপ আর রজনীগন্ধা আছে। এক,দুই, সতেরো,বিশ,একুশ। এবার আরেকটা মালা হাতে নিয়ে গুনলো। গুনে দেখে বেয়াল্লিশটা গোলাপ। তবে এই মালার গোলাপের সাইজ আগেরটার চেয়ে ছোট। দুটো মালা,দেখতেই ভিন্ন। মালা হাতে নিয়ে মোনা মুচকি হাসি দিলো। সহসা দরজায় খচ করে শব্দ হলো। মালা হাত থেকে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার সুঠামদেহী বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রেমিক পুরুষ। আবার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। ইমরান ধীর পায় মোনার দিকে এগিয়ে আসে, পরনে এখনো আগের পোশাক।
‘আমাকে জাস্ট দশ মিনিট সময় দাও। ফ্রেশ হয়ে আসি।’
‘আচ্ছা।’
ইমরান কাভার্ড থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গিয়েছে। মোনা মালাগুলো আগের মত রেখে আরেকবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে নিলো। চুলের পানি পড়ে ব্লাউজ এর অনেকক্ষানী ভিজে গিয়েছে। গ্লাসে একটু পানি ঢেলে গলাটা ভিজিয়ে নিলো। ওয়াশরুমের দরজায় ছিটকিনি খোলার আওয়াজ ইমরান টাওয়ালে মাথা মুছতে মুছতে বের হলো। পরনে মিষ্টি কালার একটা পাঞ্জাবি। হাতা কনুই অবধি গুটানো। টাওয়াল বারান্দায় মেলে দিয়ে রুমে প্রবেশ করলো।এক গ্লাস পানিতে গলা ভিজিয়ে মোনার দিকে ফিরলো,

‘ স্যরি দেরি করে ফেললাম। একটা মিটিং ছিলো ফরেন বায়ারদের সাথে। তুমি দাঁড়িয়ে কেনো।বসো এখানে।’
মোনা কচ্ছপ গতিতে এসে বসলো। ইমরান পাশে এসে বসল। সেল ফোনে কি যেন টিপে পাশের বেড সাইড টেবিলে রেখে দিলো। মিষ্টি একটা মনভুলানো হাসি দিলো।
‘ মোনালিসা আমি তোমাকে এই বিব্রত অবস্থায় ফেলতে চাইনি। আমি আগে থেকে জানলে ওদের কিছুই করতে দিতাম না। ইশান যে নিজ হাতে এসব করেছে বুঝতে পারিনি।’
‘আমি আপনাকে এই নিয়ে কিছু বলেছি?’
‘ তা বলো নি।’
‘ তাহলে এই নিয়ে আর স্যরি বলবেন না,বরং আমার ভালোই লাগছে। ফুলের ঘ্রান,স্নিগ্ধতা,ক্যান্ডেল।একটা মোহনীয় পরিবেশ। আমি কি লাইট টা নিভিয়ে দিতে পারবো? ক্যান্ডেলগুলো সুন্দর লাগছে।’
ইমরান সাইড টেবিলের সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে রুমের সবগুলো বাতি নিভিয়ে দিলো। পাশ ফিরতেই মোমের আলোতে দেখতে পেলো ঝলঝল করা প্রতিমা, মোমের আলোতে সমস্ত পরিবেশ আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। ইমরান চোখ বুজলো। মুখ ফুটে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো,

‘ মোনালিসা লাল শাড়িতে অনেক সুন্দর লাগছে।’
মোনা লজ্জাতে মাথা নুইয়ে ক্ষীন স্বরে বললো,
‘ আপনাকেও পাঞ্জাবি দারুণ লাগে।’
ইমরান চোখ খুলে তাকায়। দুজনই কাছাকাছি নিঃশ্বাসের শব্দ বেড়ে যাচ্ছে। ইমরান নিরবতা ভেঙ্গে বললো,
‘ আমি বিছানা ঝেড়ে দিচ্ছি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি ও এখানেই শোব তবে একপাশে। ব্যাপারটা অকোয়ার্ড।কালকে থেকে তুমি আবার তোমার রুমে শিফট হয়ে যেও। আজকে রাতটা নাহয় আমরা ম্যানেজ করে নি।আশা করি তোমার সমস্যা হবে না।’
‘আমাকে আপনার রুমে রাখবেন না?’
‘ তুমিতো পরিবারের লোকজন ছাড়া কারো সাথে থাকোনি। আমি চাই না তোমার কম্ফোর্ট জোন ভেঙ্গে যাক।’
‘আপনি কে? আমার পরিবার না?’
ইমরান মৃদু হাসি দেয়,
‘ আচ্ছা থাকো। বিছাড়া ঝেড়ে দিই। সারাদিন অনেক ঝামেলা ছিলো একটু ঘুমাও।’
‘ বিছানা ঝাড়তে হবে না এভাবে ঘুমাবো। একদিন সয্যায় ফুল থাকলে কি বড্ড বেশী অনিয়ম হবে?’
‘ তা হবে না, কিন্তু বুঝতে হবে তোমাকে তুমি একজন পুরুষ মানুষ পাশে নিয়ে ঘুমাচ্ছো।আর বিছানায় এই মুহুর্তে ফুল থাকা মানে অনুভূতিগুলো ভীষণ যন্ত্রণা দিবে।’
‘ কি সুন্দর ফুল সজ্জা,ফুল গুলো ফেলতে ইচ্ছে করেনা।’
‘বুঝো ফুলসজ্জা কি?’

মোনা তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে ফ্লোরে চোখ দিলো। লজ্জার আড়ষ্টতা ভেঙ্গে আপন সত্তার সাথে সংযম করে উপর নিচ মাথা নাড়ে।
‘ বুঝোই যখন তাহলে কেনো ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছো?’
‘আপনার মাঝে বিলীন হব বলে।’
ইমরানের চোখ তড়াক করে উঠলো। এ যাবৎকালে ও এমন প্রতিউত্তর আশা করেনি। ইমরান মোনার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছে। চোখের পলক স্থির, অটল। মৃদুমন্দ বাতাসের ঝাপটায় জানালায় পর্দাগুলো নড়ছে। ক্যান্ডেলগুলো নিভু নিভু হচ্ছে আবার জ্বলে উঠছে। ইমরানের দৃষ্টি মোনাতে আবদ্ধ। এই ফিলিংসটা এলোমেলো, ছন্নছাড়া। মোনা দাঁড়িয়ে ইমরানের আরেকটু কাছে এসে বসে। আস্তে করে বলে,
‘ আপনার মাঝে বিলীন হওয়ার সুযোগ কি আমি পাব না।’
এই মেয়ের সাহস বরাবরই বেশি, যেখানে অন্যমেয়েরা এই পরিস্থিতি লজ্জায় মিইয়ে যেত এই মেয়ে কি সুন্দর আবদার করছে। ইমরান বেসামাল হয়ে পড়ছে। বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।

‘ আমি বারান্দায় যাচ্ছি মোনালিসা, ওখানে ডিভানে শুয়ে পড়ব। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। ফুল থাকুক সমস্যা নেই।’
‘ আপনার ভালোবাসায় সিক্ত হতে চাই আমি।’
ইমরানের হাত ধরে আটকে দিলো যাওয়ার পথ। ইমরান মোনার পাতলা,গোলাপি বর্ণের ঠোঁট
জোড়ার মাঝে তর্জনী দিয়ে ওর বাক্যরোধ করে বললো, শুষ… চুপ। ইমরান ঘুনাক্ষরে ও আশা করেনি মোনা এমনটা বলবে। মোনার বুকের ধুকপুকানি ইমরানের কানে বাজছে। এই মেয়েকে উপেক্ষা করলে বড্ড ভুল হবে।
‘তবে আমি কি সম্মতি ভেবে নিব?’
‘হুম’
মোনাকে প্রস্তুতির সময় না দিয়ে আচমকা বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরলো। বুকের লাব ডাব শুনা যাচ্ছে এই কপোত-কপোতীর। মোনার মুখটা দুহাতের আজলায় নিয়ে কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো। মোনা আবেশে চোখ বুঁজলো। কপাল থেকে ওষ্ঠজোড়া আলগা করে নাকে ছোঁয়ালো, দুগালে ছোঁয়ালো। কোমড় পেচিয়ে ধরে মোনাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। মোনার গোলাপী চেরীর মত অধরে নিজের আঙ্গুলগুলো ছুঁইয়ে নিলো। চোখের পলকেই ইমরান মোনার অধরে আপন অধর ডুবালো। প্রবল আবেগে, সম্পূর্ণ নতুন অনুভুতিতে মোনা দু চোখ দিয়ে উষ্ণজল গড়িয়ে পড়লো। অধর ছেড়ে ইমরান নিজের কপাল মোনার কপালে রাখে। দুজনের নিঃশ্বাস আজ ঘন।

‘ জান সময় আছে ভেবে দেখো, ঘুমিয়ে পড়ো। তোমার মুখের পরবর্তী একটা শব্দ ও আমাকে বেসামাল করে তুলবে।’
‘আপনাকে লাগবে।’
মোনার বলতে দেরী, ইমরান মিনিটের মধ্যে ক্যান্ডেল নিভিয়ে পুরো রুমে অন্ধকার নিকষ কালো নিশীথ নামিয়ে আনে। স্কেনটেড ক্যান্ডেলটা জ্বলছে। সারাঘরে জেসমিন ফুলের ঘ্রান, ক্যান্ডেল থেকে আসছে। মোনাকে কোলে তুলে পুষ্পশোভিত সজ্জায় সযত্নে শুইয়ে দেয়। একটানে গায়ের পাঞ্জাবি খুলে ফেলে। মুখ ডোবায় মোনার গলায়। মোনার শাড়ির আচল ইমরানের হাতের মুঠোয়। কিছুটা সংকোচবোধ। মোনা অস্ফুটস্বরে বলে,
‘ আমাকে ভালোবাসার অধিকার আপনার, আগলে রাখার অধিকার আপনার, আমার ভুষন বসন খোলার অধিকার ও আপনার। সংকোচ আপনাকে মানায় না ইমরান সাহেব।’
‘ এত ভালোবাসা প্রয়োজন? যদি সব ঢেলে দিই সইতে পারবে’
‘সব লাগবে, বেয়াল্লিশ বছরের সযত্নে গড়া সব’
অধর প্রসারিত হাসি। জড়িয়ে ধরে মোনাকে। ধীরে ধীরে ইমরানের ভালোবাসায় সিক্ত হয় মোনার সারা অঙ্গ। রাত যত গভীর হয় ভালোবাসার উষ্ণতা ততই নিবিড়,নিবিষ্ট, আবিষ্ট,মোহিত হয়। ইমরানের কঠিন,বলিষ্ঠ পিঠ আজ প্রেয়সীর শক্ত নখের আক্রমনে আঘাতগ্রস্থ। সেই খবর কি রাখে ছোট্ট মোনা। যদি রাখতো, কিছুক্ষন পর বলে উঠতো,

‘ ইমরান সাহেব আমি আপনাকে ইচ্ছে করে ব্যাথা দি নি।’
হালকা আর্তনাদে কেঁপে উঠে মোনা। চোখ দিয়ে আজ খুশির অশ্রু।মোনা জিতে গিয়েছে। ইমরান আজ তার ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে হৃদয়কোঠায় জায়গা দিয়েছে। আজ মোনার শরীরে ভালোবাসার চিহ্ন৷ বুকের গভীরে তৈরি হওয়া যন্ত্রনা আজ নেই বললেই চলে। ইমরান ছোট্ট যত্ন করে ডেকে উঠলো,
‘বউ, বেশী কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?স্যরি’।
‘উহু’
‘ কাঁদছো কেনো?’
‘খুশিতে।’
‘ আবার…মোনার হালকা আর্তনাদ। এটা বেশি হয়ে যাচ্ছে ইমরান সাহেব। আপনি কি বাইট ছাড়া আর কিছু জানেন না। এবার সত্যি সত্যি কাঁদবো।’
‘ ঘা ও আমি দিয়েছি, মলম ও আমি দিব। আমার আদরই এমনই এগ্রেসিভ’।
‘অসভ্য’
‘ সুপুরুষ অসভ্যই হয়। তুমি এই অসভ্য পুরুষকে পেতেই এত সংগ্রাম করেছো।’
‘খোঁটা?’

‘একদমই না বরং ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আমার শেষবেলায় তোমায় পাওয়া।#তুমি_আমার_শেষবেলা মোনালিসা। ধীরে ধীরে আমার অসভ্যতামী আরো বাড়বে।’
মোনা লজ্জায় হাসে, ইমরান ক্যান্ডেলের মিট মিট আলোতে তা দেখে৷ এই হাসিতেই তো ম*রে*ছি*লো ছয় বছর আগে। সেই ছোট্ট দুষ্টু মিষ্টি মোনালিসা আজ তার বাহুডোরে, তার একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী। বুকের মাঝে অচেনা,অদেখা ক্ষত সৃষ্টিকারী একমাত্র মানবী,যার তুলনা সে নিজেই। ভালোবাসার প্রহর শুরু। বুকের ভেতরের মশালটা আজ নিভে গিয়েছে। শান্ত হয়েছে অস্থির তনু,মন। মোনাকে বক্ষে নিয়ে ইমরান গেয়ে উঠে,

“বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছ দোলা
রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে এ কী তব হোরি খেলা
তুমি যে ফাগুন রঙের আগুন তুমি যে রসের ধারা
তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা
মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে তেমনি আমাতে তুমি
আমার পরানে প্রেমের বিন্দু তুমি শুধু তুমি।।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৭

প্রেমের অনলে জ্বালি যে প্রদীপ সে দীপের শিখা তুমি
জোনাকি পাখায় ঝিকিমিকি নেচে এ হৃদি নাচালে তুমি
আপন হারা এ উদাসী প্রাণের লহ গো প্রেমাঞ্জলি
তোমারে রচিয়া ভরেছি আমার বাউল গানের ঝুলি
মুক্তা যেমন শুক্তির বুকে তেমনি আমাতে তুমি
আমার পরানে প্রেমের বিন্দু তুমি শুধু তুমি।

তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩৯