তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ৩
নীতি জাহিদ
সকালের তপ্ত রোদ জানালা ভেদ করে মুখের উপর পড়েছে৷ গতকাল রাতে এলার্মটা দেওয়া হয়নি ভেবে তড়িঘড়ি করে উঠে হাতের ফোনের দিকে তাকালো। এত বেলা করে কখনোই উঠা হয়নি। ঘড়িতে সকাল নয়টা বাজে, যা সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত কাজ বলে ধারণা ইমরানের। সকালের জগিংটাও করা হয় নি বলে শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে। দোতলার বারান্দা থেকে দুবার শেপার্ডকে ডাক দিতেই লাফিয়ে উঠে কুর্নিশ জানালো শেপার্ড। বাড়ির সবারই পছন্দ শেপার্ডকে। প্রথমদিকে আইরিন ইমরানকে বকাঝকা করলেও এখন তার বড্ড আদুরে লাগে এই বিদেশী কুকুর শাবকটি। অল্প একটু শরীরচর্চা করে রেডি হয়ে সিড়ি বেয়ে ডাইনিং এ আসলো ইমরান। আইরিন ভাইকে দেখে এক গাল হাসি দিয়ে ভাইয়ের পছন্দের সব খাবার সামনে নিয়ে আসলো। সোহান চেয়ার ঠেলে মামার পাশে বসলো। এই বাড়ির সব টাই সামলে রেখেছে আইরিন। সোহান,আইরিনের ছেলে।
মিনহাজের সাথে অফিসে বসে। একাউন্ট সেকশন সোহান দেখে। মামার বিশ্বস্ত একজন সঙ্গী। আইরিনের স্বামী গত হয়েছে বছর পাঁচেক আগে। সোহানের এর পর সামান্তা নামে এক মেয়ে আছে।ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ইমরান বিদেশের বিজনেস দেখে। ৪/৫ বছরে একবার দেশে আসে। ইশান ছুটিতে বাবার কাছে গিয়ে থেকে আসে। খেতে খেতে ইশানকে জিজ্ঞেস করলো, পড়াশোনার ব্যাপারে, ওর বন্ধুদের ব্যাপারে। এরপর খাবার খেয়ে ইশানকে স্কুলে ড্রপ করে দিয়ে সোহান আর ইমরান মিটিং এর জন্য বের হয়ে গেলো।
মিটিং শেষে অফিসে আসতে আসতে প্রায় দেড়টা। ইমরানের অনেক বিজনেসের মধ্যে টিউলিপ ইন্টারন্যাশনাল হচ্ছে সিস্টার কনসার্ন,যা মিনহাজ এবং ইমরান দুজন মিলে শুরু করেছে। এছাড়াও বায়িং হাউজ, গার্মেন্টস, এগ্রো,ফুডসহ অনেক বিজনেসই আছে। মিনহাজের কেবিনে নক করেই ঢুকলো ইমরান। ডুকেই দেখতে পেলো স্কুল ড্রেস পরিহিত কালকের দুষ্টু বাঁদরটাকে। ইমরানকে দেখে সালাম দিয়ে মুখ ফিরিয়ে সোফায় বসে গেম খেলছে। মিনহাজ আগ বাড়িয়ে বললো,
-‘ স্কুল থেকে সোজা এখানে চলে এসেছে।আমার জন্য নাকি চিন্তা হচ্ছে। আমার সাথে বাসায় যাবে। দেখেছিস মেয়ে আমার কত বড় হয়ে যাচ্ছে।’
বাবার কথায় মুখ খিঁচে মোনা বললো,
-‘ আমি বড়ই,তুমিই শুধু আমাকে ছোট বলো। দেখো ক্লাস নাইনে উঠেছি।সায়েন্স নিয়েছি।’
ইমরান টেবিলের ফাইল গুলো চেক করতে করতে বললো,
-‘ কয়েকটা দিন রেস্ট নিলেও পারতে। আমি আছি,সোহান আছে।আসাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না।’
-‘ ভাই তুই তো জানিস, আমি কাজ পাগল। ঘরে বসে থাকলে অশান্তি লাগতো।’
অফিসের স্টাফ আলম দু কাপ কফি আর একটা মিল্ক শেক দিয়ে গেলো। মোনা মিল্ক শেক টা হাতে নিলো। গ্লাসে স্ট্র দেওয়া। স্ট্র দিয়ে ভালো করে নাড়িয়ে নিলো। মুখে নিয়ে খেতেই ইমরানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। ইমরান চোখ সরিয়ে নিজের কফিতে মনোযোগ দিলো। কিন্তু মোনা তখনও ইমরানের দিকে তাকিয়ে আছে। মিনহাজ ওয়াশরুমে গেলো।নজর সরাতে নারাজ সে। ইমরানের কান্ড দেখছে। লোকটা একবারো তাকাচ্ছে না কেনো? এই লোককে আরেকবার জ্বালালে মনে শান্তি পাব। যেই ভাবনা সেই কাজ, অকস্মাৎ মোনা উঠে ইমরানের খাওয়া কফি টেবিল থেকে তুলে নিজে এক চুমুক দিলো। মুখটাকে কুঁচকে বলে উঠলো,
-‘ একদম মজা না, তেঁতো। এনিওয়ে খাচ্ছেন না কেনো। খান খান। ‘
ঘটনার আকস্মিকতায় ইমরান তব্দা খেয়ে গেছে। মনে হলো যেন সামনে প্রকান্ড একটা ভূত দাঁড়িয়ে আছে, হটাৎ দেখে ভয়ে মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এমন ঘটনা এযাবৎকালে তার সাথে ঘটেনি। ততক্ষনে মিনহাজ এসে বসলো। কফিতে চুমুক দিয়ে মিনহাজ ইমরানকে কফি খেতে তাড়া দিলো। একসাথে বের হবে বাইরে লাঞ্চ করবে। ইমরান এখনো বুঝতে পারছে না কি হলো। একবার মিনহাজের দিকে তাকায়,আবার কফির দিকে তাকায়। মাথার মধ্যে হাজার ও প্রশ্নের ভিড়। এটা কি হলো? নিজের মিল্ক শেক ফেলে এই কফি কেনো খেতে এসেছে। নেহাৎই বাচ্চা মেয়ে নাহয় থা*পড়ে গাল লাল করে ফেলতো। এসব কেমন আচরন। চোখ বন্ধ করে ইমরান নিজেকে সংযত করে নিলো। কফিটা আর খেলো না। মুখে হাসি রেখে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলো। নিজের কেবিনে এসে ইমরান রাগে কটমট করছে। বাচ্চা একটা মেয়ে কি শুরু করেছে। সেদিনের অপমানটা এভাবে শোধ করলো। এর মধ্যে কে যেন দরজায় নক করলো। চোখ না তুলেই আসার অনুমতি দিলো ইমরান। অনুমতি পেয়ে ডুকে ইমরানের সামনের চেয়ারে বসলো মোনা। ইমরান নিজেকে সংযত করে আদুরে গলায় বললো,
-‘ কিছু বলবে মোনালিসা?’
-‘ হুম’
-‘ কি?’
-‘ আপনাকে সাদাতে অনেক সুন্দর লাগে। আমার ফর্সা পুরুষ পছন্দ নয়। আপনার গায়ের রঙটা রোদে পোড়া শ্যাম বর্ণ। আপনার হাসি সুন্দর।’
ইমরান ড্যাব ড্যাব চোখে চেয়ে আছে। চোখের চশমা খুলে এক হাত দিয়ে চোখ কচলে সামনের দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরীর দিকে সম্মোহনী চোখে চেয়ে আছে। গায়ের রঙ নাকি রোদে পুড়া শ্যামবর্ণ। আশ্চর্য রঙ। ইমরানের হাসি পেলো।কিন্তু অন্যরকম অনুভূতি আভাস পেলো নিজের মধ্যে। ইমরান নিজেকে বরাবরই কালো দাবি করে, অন্যদিকে আইরিন বলে তার ভাই নাকি শ্যামবর্ণ। এই মেয়ে শিল্পচর্চা করে নাম দিয়েছে রোদে পোড়া শ্যামবর্ণ। আকাশে প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের পূর্বাভাস। মোনা পুনরায় বললো,
-‘ ঝড় আসবে,বাবা ডাকছে চলুন। ‘
ইমরান সম্বিত ফিরে এসে রেগে গিয়ে বললো,
-‘ এতক্ষন কি বলেছো এসব। আর বলবে না এসব। তুমি বড় হচ্ছে মোনালিসা।বাইরের মানুষ পঁচা বলবে। বাবা কষ্ট পাবে। তোমরা যাও আমি পরে যাব।’
মোনা কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
-‘লাভ এট ফার্স্ট সাইড বলে একটা কথা আছে, সেটা আমার ক্ষেত্রে ফলে গিয়েছে। ‘
তুমি আমার শেষবেলা পর্ব ২
কথা শেষ করেই দৌড় দিলো মোনা। ইমরান তখন ও নিস্তব্ধ। এমন একটা কথা কোনো সংকোচ ছাড়াই অকপটে কি করে বলে দিলো এই মেয়েটি। দিন দুনিয়া সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান কম থাকলেই মানুষের পক্ষে এসব ভাবা সম্ভব। নাহলে তাকে এসব বলার সাহস আদতে কেউ করেছে কিনা বলা বড়ই মুশকিল। আর এই বাচ্চারই বা ইমরানকে নিয়ে এত ফ্যান্টাসি তৈরি হলো কি করে ভেবে কূল পাচ্ছেনা ইমরান। টিনেজে মানুষ অনেক রকম পাগলামি করে কিন্তু এখন যা করছে মোটেও ভালো কিছু নয়। এই মেয়ে কি পাগল নাকি মাথায় সমস্যা। কি ইঙ্গিত দিলো!! ইমরান যা ভাবছে তা যদি হয় সর্বনাশ হয়ে যাবে।
