Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৯
জেরিন আক্তার

প্রাণেশা আর স্নিগ্ধ কথা বলতে বলতে নিচে আসছিলো। যা শুনতেই সুবহা এক পা পিছিয়ে গেলো। যাতে সৌরভ আগে যেতে পারে। সৌরভ ফোন বের করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। আর সুবহা ওর পেছনে। প্রাণেশা আর স্নিগ্ধ নিচে এসে নিজেদের রুমে ঢুকলো। প্রাণেশা চুলগুলো বেধে নিলো। স্নিগ্ধ পানি খেয়ে আয়নায় প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রাণেশা আয়নায়ই স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঠিয়ে বলল,
“কি দেখছেন? আমি এখন একজনের বউ ওভাবে তাকিয়ে থাকবেন না আমার স্বামী আপনাকে বকবে। তখন?”

স্নিগ্ধ পানির গ্লাস রেখে মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“নিজের বউ ভালো লাগে না। তাই পরের বউ দেখছি ম্যাডাম। এতে কি আমার পাপ হবে?।”
প্রাণেশা তালে তাল মিলিয়ে বলল,
“হুমম খুব পাপ হবে। আজ আসুক আমার স্বামী বলে দিবো একজন আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশার কাছে এসে ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“এখনই আদুরে গলায় স্বামীর কাছে নালিশ করুন না।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“সময় হলে নালিশ করবো। এখন না। বুঝেছেন?”
স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে ছেড়ে দিয়ে চুলগুলো চিরুনি দিয়ে সেট করতে করতে বলল,
“ঠিক আছে রাতে নালিশ শুনবো।”
দুজনে রুম থেকে বেরিয়ে ছাদে চলে এলো।
এদিকে সৌরভ ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। ইভা ওকে দেখে হাঁসফাঁস করছে। সুবহা ইভাকে বলল,

“তুমি কি এইখানে কমফোর্টেবল না?”
ইভা সৌরভকে দেখিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আসলে সৌরভ ভাই আসছে না। কই ভেবেছি কাছে এসে বসবে কিন্তু তার কথা বলাই শেষ হচ্ছে না।”
সুবহার মুখটা আরও ছোট হয়ে গেলো। সিয়াম ইভাকে জিজ্ঞাসা করলো,
“তোমরা কি রিলেশনে আছো?”
ইভা কিছু বলে উঠার আগেই স্নিগ্ধ আর প্রাণেশা এলো। প্রাণেশা সুবহার পাশে বসলো। সৌরভও এলো। ইভা ডেকে বলল ওর পাশে বসতে। কিন্তু সৌরভ তা কেয়ারই করলো না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে স্নিগ্ধর পাশে বসলো। মনে মনে বলল, তোর মতো বাঁচালের পাশে বসলে মাথাটা নষ্ট হয়ে যাবে। একাই বস। পাগল কোথাকার। আল্লাহ এর থেকে মুক্ত করো আল্লাহ।
ওরা আড্ডা দেওয়া শেষে ছাদে থেকে নেমে এলো। ছাদেই ইভা সুবহার সাথে কথা বলছে। ইভা সুবহার হাত ধরে বলল,

“তুমি অনেক ভালো।”
সুবহা মলিন হেসে বলল,
“থ্যাংক ইউ।”
ইভা আস্তে করে বলল,
“একটা গুড নিউজ আছে।”
“কি?”
ইভা লাজুক হাসি দিয়ে আস্তে করে বলল,
“সৌরভ ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ের প্রস্তাব দিতে আসবে আমার বাবা। আমাদের জন্য দোয়া করো।”
সুবহা মলিন হেসে বলল,
“হুমম।”
সুবহার ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে। এই কষ্ট আর বয়ে বেড়াতে পারছে না ও। একতরফা ভালোবাসা মৃত্যুর মতো যন্ত্রনা দেয়।
ইভা চলে গেলো। সুবহা ছাদের এককোণে গিয়ে হাটু গেরে বসে পড়লো। হাঁটুতে মুখ গুজে কাঁদতে শুরু করলো।

প্রাণেশা এসেছে ছাদে। কারো কান্নার শব্দে নিরেট হয়ে এগিয়ে গেলো। দেখলো ছাদের এককোণে বসে কাঁদছে সুবহা। প্রাণেশা তড়িৎ পায়ে ওর কাছে গিয়ে বসে ওকে ধরে বলল,
“এই কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো? সুবহা…”
সুবহা প্রাণেশাকে ধরে কেঁদে উঠল। প্রাণেশা ওর মাথায় হাত রেখে শুধানো গলায় বলল,
“এই পাগল কাঁদছিস কেনো? আমি সেই আমার বিয়ের আগে থেকে দেখছি। তোর কি হয়েছে? কাউকে না বলতে পারলে তু্ই বিশ্বাস করে আমাকে বল।”
সুবহা মাথা তুলে কান্না থামিয়ে চোখ মুছে বলল,
“কিচ্ছু হয়নি আমার। এমনেই ভালো লাগছিলো না। কোনোকিছুতেই মন বসাতে পারছি না।”
প্রাণেশা গভীর গলায় বলল,
“কোনো একটা কারণে তো তু্ই এমন করছিস সেটা তো বল?”
সুবহা হেসে বলল,
“কোনো কারণ নেই চল। আমার মন! একাই ঠিক হয়ে যাবে রে। আর তু্ই কিন্তু ভাইয়াকে বলবি না।”

প্রাণেশা আর সুবহা ভার্সিটি থেকে ফিরছিলো রিক্সা নিয়ে। স্নিগ্ধ পরে আসবে। ভার্সিটিতে সব টিচারদের আজ মিটিং হবে তাই লেট্ হবে।
সুবহা আর প্রাণেশা দুজনে মাঝ রাস্তায় একটা সুন্দর বসার জায়গা দেখে রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিলো। এরপরে দুজনে সেখানেই গিয়ে বসলো। ওদের বাড়িটাও কাছেই। প্রাণেশা কয়েকবার সুবহাকে জিজ্ঞাসা করেছে কি হয়েছে? কেনো এমন চুপচাপ থাকিস? কিন্তু প্রতিবারই সুবহা এড়িয়ে গিয়েছে। প্রাণেশা ভাবলো, এভাবে না অন্যভাবে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
প্রাণেশাকে একা বসিয়ে রেখে সুবহা গেলো ফুচকাস্টলে ফুচকা আনতে। প্রাণেশা ফোন বের করে স্ক্রল করছিলো। তখন ৩-৪ টা ছেলে আসে। প্রাণেশা সামনে দুটো ছেলেকে চিনতে পারলো। বিয়ের আগে যে স্নিগ্ধর সাথে শপিংয়ে গিয়েছিলো সেদিন এই ছেলে দুটো প্রাণেশাকে উল্টো-পাল্টা কথা বলেছিলো। যার কারণে স্নিগ্ধ দুজনকেই মেরেছিলো। সেই ছেলে দুটোই এসেছে। সাথে আরও ২ টা ছেলে।
সামনের একটা ছেলে প্রাণেশাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“কিগো সুন্দরী! তোমার সেই প্রেমিকপুরুষটা কোথায়? আজ যে সাথে নেই।”
প্রাণেশা তপ্ত কণ্ঠে বলল,
“কেনো তার হাতে আবারও মার খেতে চান নাকি?”
ছেলেটা বলে উঠল,
“আজ আসুক দেখি কত মারতে পারে। আজ ৪ জন এসেছি।”
সুবহা দূর থেকে ওই ছেলেগুলোকে দেখেই সিয়ামকে কল দেয়। বাড়িটা বেশি দূরে না ও আসতে পারবে। সুবহা একহাতে ফুচকার প্লেট আর একহাতে ফোন নিয়ে সিয়ামের সাথে কথা বলতে বলতে এলো।
সুবহা ফোন রেখে ছেলেদের সাথে কথা বলছিলো। সেই পর্যন্ত সিয়ামও এসে উচিত শিক্ষা দিতে পারবে। কিন্তু এই পাশ দিয়েই স্নিগ্ধ বাড়িতে যাচ্ছিলো। আজকে ভার্সিটিতে টিচারদের সাথে মিটিং হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু ৪ জন টিচার সেখানে না থাকায় সেই মিটিং আজকে হয়নি, বরং কালকে সকালে হবে।
স্নিগ্ধ সুবহাদের দেখার সাথে সাথে গাড়িটা থামিয়ে নেমে হনহন করে ওদের দিকে এগিয়ে আসছিলো। একটা ছেলে স্নিগ্ধকে দেখে প্রাণেশাকে বলল,

“ওই যে তোমার প্রেমিক পুরুষ চলে এসেছে।”
প্রাণেশা পেছন ফিরে তাকাতেই দেখে ওর অতি কাছে স্নিগ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে সরিয়ে শার্টের হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে বলল,
“কি যেনো বলছিলি তোরা?”
পেছনে থেকে সিয়াম ডাক দিলে সবার দৃষ্টি ওদের দিকে যায়। ওর সাথে ওর বন্ধু আছে। দুজনের হাতেই ক্রিকেট খেলার ব্যাড। অতঃপর সিয়ামরা এগিয়ে এলো। সবাই ভেবেছে ওরা হয়তো এখানে খেলতে এসেছে। কিন্তু সিয়াম স্নিগ্ধর দিকে একটা ব্যাড এগিয়ে দিয়ে বলল,
“খেলো.. ”
ছেলেগুলো বোঝার আগেই স্নিগ্ধ ওদের মারতে থাকে। সাথে সিয়ামও। স্নিগ্ধ মারছিলো আর বলছিলো….
“কুত্তার বাচ্চা তোদের কি সেদিন কান দিয়ে কথা যায়নি? আমি ওর প্রেমিক পুরুষ না, আমি ওর হাসব্যান্ড। ও আমার বিবাহিতা স্ত্রী। তোদের তো আজকে মেরে হাড়গোড় সব ভেঙে ফেলবো। আমার বউয়ের দিকে আবার নজর দেওয়ার সাহস পাস কই থেকে? তোদের চোখদুটো তুলে ফেলবো। এই সিয়াম থানায় ফোন দে!”
ছেলেগুলো কোনোরকম সেই মার থেকে পালিয়ে যায়। নাহলে হাত-পা সত্যি সত্যি ভেঙে দিবে।

এরপরে স্নিগ্ধ প্রাণেশা আর সুবহাকে গাড়িতে উঠতে বলে। প্রাণেশা স্নিগ্ধর পাশে বসলো। কিন্তু স্নিগ্ধ কোনো কথা বলছে না। গম্ভীর হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। প্রাণেশা দু-এক বার বলেছে কিন্তু স্নিগ্ধ উত্তর দেয়নি।
আজ দুপুরেই সৌরভ এলো অফিসে। তবে কোনো ফরমাল ড্রেসে না। কালো ফরমাল ড্রেসে। হাতে সানগ্লাস। সেইযে প্রাণেশা আর স্নিগ্ধর বিয়ের কথা চলছিল তখন রেগে চলে গিয়েছিলো তারপর প্রথম এলো। শুধু একটা ডিলের সাইন করতে এসেছে।
সৌরভ এসে নিজের কেবিনে বসলো। সেখানে এটাচ করা একটা রুম আছে সৌরভের। সেখানে ঢুকে কিছু টুকটাক ফাইল দেখছিলো।
আরশাদ খান ওর কেবিনে এসে ডাকলেন। সৌরভ সাড়া দিলে তিনিও সৌরভের রুমে ঢুকেন। সৌরভ ফাইল রেখে ফোনটা হাতে নিয়ে বেডে বসলো। আরশাদ খান হেসে বললেন,
“আজ এখানকার স্পেশাল গেস্ট তুমি। বলো কি খাবে টি ওর কফি?”
সৌরভ বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল। আরশাদ খান বুঝতে না পেরে বললেন,
“কি বললে, কি খাবে?”
“কিছুনা। আপাতত কফি হলেই হবে।”
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে বললেন,

“তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। ইভাকে নিয়ে। ডিল ফাইনাল হলে আগেই যেও না।”
সৌরভ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমাকে আর্জেন্ট যেতে হবে।”
আরশাদ খান ছেলের মতিগতি বুঝে বললেন,
“বেশি সময় না, জাস্ট ১০ মিনিট।”
সৌরভ বলল,
“তাহলে এখন বলো।”
আরশাদ খান হালকা হেসে বললেন,
“না থাক পরেই বলবো।”
আরশাদ খান ইভা এবং সুবহা দুজনকে নিয়েই কথা বলতে চান। এখন যদি সৌরভকে বলেন তাহলে এই ডিল রেখেই রেগে চলে যাবে। মাঝখান থেকে তার পরিশ্রমটাই জলে যাবে। তার থেকে পরে বলাই ভালো।

প্রাণেশা শাওয়ার নিয়ে বের হলো। লাল রঙের থ্রি-পিস পড়েছে। স্নিগ্ধও শাওয়ার নিবে তাই ও কাভার্ড খুলল স্নিগ্ধর জামাকাপড় বের করার জন্য।
জামাকাপড় বের করার সময় কাভার্ডের স্নিগ্ধর পার্সোনাল ড্রয়ারে চোখ আটকে যায়। স্নিগ্ধর শার্ট প্যান্ট কাঁধে রেখে একটা নিল রঙের ফাইল হাতে নিলো। সেখানে কিছু লেখা পড়ে প্রাণেশা পুরো হতভম্ব। বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া। বিড়বিড় করে বলল, “তার মানে স্নিগ্ধ একজন বড় মাপের….
তখনই স্নিগ্ধ রুমে আসে। প্রাণেশা ফাইলটা রেখে কাভার্ড বন্ধ করতে নিলে স্নিগ্ধ এগিয়ে এসে শয়তানি করে বলল,
“কি চুরি করছো?”
প্রাণেশা বুকে হাত গুজে বলল,
“টাকা-পয়সা, সোনা-দানা সব।”
স্নিগ্ধ হেসে বলল,
“ওমা তাহলে কি এখন পালাবে?”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে বলল,

“একদমই না। আপনাদের বাড়ির সমস্ত টাকা-পয়সা লুট করে নিয়ে পালাবো।”
স্নিগ্ধ এগিয়ে আসে কাভার্ডের দিকে। প্রাণেশা সাথে সাথে সামনে দাঁড়ায়। অতঃপর স্নিগ্ধর শার্ট শুকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,
“সিগারেট খেয়েছেন?”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। প্রাণেশা কোমরে হাত রেখে বলে উঠল,
“মিথ্যে বলবেন না। আমি এর আগেও আপনার থেকে সিগারেটের স্মেল পেয়েছি।”
স্নিগ্ধ টেডি স্মাইল দিয়ে বলল,
“তুমি জানোই না সিগারেটের স্নেল কেমন হয়। এটা সিগারেটের স্মেল না।”
প্রাণেশা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে বোকা ভাববেন না। আমি জানি এটাই সিগারেটের স্মেল। কয়েকবছর ধরে এই স্মেলের সাথে পরিচিত বুঝলেন।”
“মোটেও না।”
“মোটেও হ্যা।”

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১৮

দুজনে কিছুক্ষন ঝগড়া করার পরেও স্নিগ্ধ হার স্বীকার করে না। এরপরে প্রাণেশাকে বলে জামাকাপড়গুলো ওয়াশরুমে রেখে আসতে। প্রাণেশা তা রাখতে ওয়াশরুমে যায়। স্নিগ্ধ কাভার্ড খুলতেই নিজের পার্সোনাল ড্রয়ারের দিকে তাকায়। সেটা লক করা না দেখে ও সাথে সাথে চাবি দিয়ে লক করে ফেলে শ্বাস ছাড়ে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here