Home তোমাতেই বসন্ত তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৯

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৯
জেরিন আক্তার

প্রাণেশা স্বীকার করার সাথে সাথে সৌরভ দাঁত চেপে বলল,
“তোকে এসব প্রেম-ভালোবাসায় জড়াতে না করেছি না? ছোট থেকে কি শিক্ষা দিয়েছি। সব ভুলে গিয়েছিস?”
প্রাণেশা জোর গলায় বলল,
“ভাইয়া ছেলেটা ভালো। আমায় কখনই ছেড়ে যাবে না।”
সৌরভ কোমরে হাত রেখে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“ও আমার জানা আছে কে কেমন হবে। আজ তোকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বিয়ে করবে আর তার কয়েকদিন পরেই ঝামেলা হবে এরপরে ছাড়াছাড়ি। আর ওই যে তোর দিনকানা বান্ধবীর ভাই না। ওই ছেলে যে তোর সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দিবে এর কি গ্যারান্টি?”

“না, ভাইয়া উনি এমন না। উনি আমায় অনেক আগে থেকে ভালোবাসে।”
সৌরভ ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ! মুখে মুখে তর্ক করিস?”
প্রাণেশা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাইয়া মুখে মুখে তর্ক করছি না। আমি উনাকে ভালোবাসি। তুমি খোঁজ নিয়ে দেখো উনি খারাপ না। এমনকি উনার পরিবারও খারাপ না।”
সৌরভ নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে রাগী কণ্ঠে বলল,
“পরিবার পর্যন্ত চলে গিয়েছে, তাহলে এই বাড়িতে কেনো থাকিস? ওইখানে চলে যা?”
প্রাণেশা একথা শুনে মুখ ভেঙচি দিয়ে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লো।

সকাল সকাল প্রাণেশা ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য রেডি হলো। সৌরভ খাবার টেবিলে গম্ভীর হয়ে নাস্তা করছে। প্রাণেশা এসে চুপচাপ ব্রেকফাস্ট করতে বসল। দুই ভাই-বোনের মাঝে কোনো কথা হলো না।
প্রতিদিনের মতো আজও সৌরভ প্রাণেশাকে ভার্সিটিতে দিয়ে অফিসে চলে গেলো। আরশাদ খানও এসেছে। সৌরভ তার কেবিনে ঢুকেই বলল,
“তোমাকে বলেছিলাম না, তোমার মেয়ে প্রেম করছে। আর দেখো তাই হয়েছে। থাকে তো একটা দিনকানা বান্ধবীর সাথে। সেই বান্ধবীর ভাইয়ের সাথেই প্রেম করছে। আমি তো ওদের রিলেশন মানবো না।”
আরশাদ খান বললেন,
“এতো হাইপার হয়ো না সৌরভ। বসো।”
সৌরভ বসলো। আরশাদ খান বললেন,
“তোমার বোন যে ছেলেকে পছন্দ করে সে করে কি?”
“প্রাণেশার ভার্সিটির লেকচারার।”
আরশাদ খান ভাবুক গলায় বললেন,

“হামিম আর ওই ছেলে একই ইউনিভার্সিটির লেকচারার।”
“হুমম।”
“ছেলেটার নাম কি?”
“স্নিগ্ধ।”
“তুমি শিওর তোমার বোন ওর সাথেই রিলেশন করে?”
সৌরভ তখনই স্নিগ্ধ প্রাণেশাকে প্রপোজ করার পিকচারটা দেখালো আরশাদ খানকে। আরশাদ খান বললেন,
“ছেলেটা কেমন খোঁজ নিয়ে দেখেছো?”
সৌরভ স্পষ্ট গলায় বলল,
“ছেলে যেমনই হোক বাবা, আমি কিন্তু এই রিলেশন মানছি না। আমি জানি তুমি প্রাণেশার পছন্দই প্রায়োরিটি দিবে। ও যেমন তোমার ছোট মেয়ে আমিও তোমার বড় ছেলে। আমি এই রিলেশন মানবো না।”
আরশাদ খান কিছুক্ষন ভেবে সৌরভকে বললেন,
“আজকে প্রাণেশাকে দুপুরে আমি নিতে যাবো। তুমি অফিসটা হ্যান্ডেল করো।”
“ওকে।”

আরশাদ খান এলেন প্রাণেশার ইউনিভার্সিটির সামনে। প্রাণেশা আর সুবহা বের হয়ে এলো। আরশাদ খানকে দেখে সুবহা বলল,
“কেমন আছেন আংকেল?”
“এইতো ভালো। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো।”
আরশাদ খান আশেপাশে তাকিয়ে সুবহাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“সুবহা তোমার ভাই কি আজকে ভার্সিটিতে এসেছে?”
“হ্যা।”
“একটু কথা বলা যাবে? ভিতরে আছে?”
সুবহা বলল,
“ভিতরে আছে কিন্তু একটু দাঁড়ান এখনই, এখানেই আসবে।”
প্রাণেশা ভয়ে আরশাদ খানের কাছে এসে বলল,
“বাবা তুমি কিন্তু উনাকে কিছু বলবে না।”
আরশাদ খান প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললেন,
“না কিচ্ছু বলবো না।”
স্নিগ্ধ বাহিরে এলো। আরশাদ খান, প্রাণেশা আর সুবহাকে একসাথে দেখে কপালে ভাজ ফেলে এগিয়ে এলো। সুবহা বলল,

“আংকেল এইটা আমার ভাই।”
আরশাদ খান স্নিগ্ধকে বললেন,
“তুমি স্নিগ্ধ।”
“হ্যা আংকেল।”
আরশাদ খান প্রাণেশাকে গাড়িতে উঠতে বললেন। প্রাণেশা গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। এই দেখার আশায় যে ওর বাবা স্নিগ্ধকে কিছু বলে নাকি।
আরশাদ খান শ্বাস ছেড়ে স্নিগ্ধকে বললেন,
“আমি তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই। এখানে তো বলা যাচ্ছে না। একটু পরে আমার অফিসে আসতে পারবে?”
স্নিগ্ধ সোজা গলায় বলল,
“হ্যা।”
প্রাণেশা স্নিগ্ধর দিকে তাকিয়ে মাথা দিয়ে যেতে না করলো। স্নিগ্ধ হালকা মাথা নাড়িয়ে বোঝালো কিচ্ছু হবে না।
আরশাদ খান প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“টেনশন করো না। আমি আমার মেয়ের পছন্দই প্রায়োরিটি দিবো। তোমাদের আলাদা করবো না।”
প্রাণেশা খুশি হয়ে গাড়িতে উঠল। আরশাদ খান হেসে গাড়িতে উঠলেন। আর প্রাণেশাকে বললেন,
“স্নিগ্ধকে অফিসের লোকেশন দিয়ে দাও।”
স্নিগ্ধ প্রাণেশা আর ওর বাবার হাসি দেখে কনফিউসড। আদৌ কি সম্পর্ক মানার জন্য ডাকলো নাকি তার মেয়েকে ভুলে যাওয়ার জন্য কথা বলবে। যত যাই হোক, স্নিগ্ধ কোনোমূল্যেই প্রাণেশাকে ছাড়বে না।
প্রাণেশা স্নিগ্ধকে অফিসের লোকেশন পাঠিয়ে দিয়ে আরশাদ খানকে বলল,
“বাবা আমি তোমার সাথে যাই?”
“তুমি এই সময় অফিসে যাবে কেনো?”
“বাবা তুমি তো আবার স্নিগ্ধকে কিছু বলবে না? আমি উনাকে ভালোবাসি বাবা। উনার বাড়িতে গিয়েছিলাম, সবাই ভালো। বাবা তুমি প্লিজ আমাদের আলাদা করো না। আমি তো তোমার কাছে কোনোদিন কিচ্ছু চাইনি। বাবা আজ আমি চাইবো, আমার স্নিগ্ধকেই লাগবে বাবা। তুমি দিবে না?”
আরশাদ খান নরম গলায় বললেন,

“তুমি আমার কাছে একটা জিনিস চেয়েছো আর দেবো না তা কি করে হয়? দেখি আসুক স্নিগ্ধ, কথা বলে দেখি। আর তোমার ভাই তো রেগে বোম হয়ে আছে।”
প্রাণেশা চোখ ছোট-ছোট করে বলল,
“তা থাকুক। নিজে প্রেম করবে না দেখে কি অন্যেও করবে না? আমিও দেখবো ভাইয়া বিয়ের সময় কি করে?”
আরশাদ খান হাসলেন। বলতে গেলে কালকে হামিমকে তার পছন্দ হয়নি বলতে, ছেলেটার মাঝে সবই ঠিক আছে তবুও কেনো যেনো মন টানছে না।

স্নিগ্ধ সুবহাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। এরপরে শাওয়ার নিয়ে সাদা শার্ট আর সাথে কালো প্যান্ট পড়ে বের রুম থেকে বের হলো। নিচে ডাইনিং টেবিলে এসে পানি ভরে খাচ্ছিলো। রাজিয়া বেগম জিজ্ঞাসা করলেন,
“কোথাও বেরোচ্ছিস?”
“হুমম।”
“কোথায়?”
“আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি। সেই মেয়ের বাবার সাথে দেখা করতে।”
রাজিয়া বেগম যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। এই ছেলে বলে কি? তিনি স্নিগ্ধর বউ হিসেবে মেয়ে ঠিক রেখেছেন, তাহলে সেটা কি হবে?
রাজিয়া বেগম স্নিগ্ধকে বললেন,
“দেখ মজা করবি না। সত্যিই মেয়ের বাবার সাথে কথা বলতে যাচ্ছিস?”
স্নিগ্ধ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“তোমার কি মনে হয় আমি মজা করি?”
রাজিয়া বেগম শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“মজা কিনা জানিনা। তোর বউ হিসেবে আমি মেয়ে পছন্দ করেই রেখেছি। যখন প্রয়োজন হবে তখন প্রস্তাব নিয়ে যাবো।”
স্নিগ্ধ গ্লাসটা শব্দ করে রেখে কর্কশ গলায় বলল,

“আমি আমার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করবো। এই সম্পর্কে আর কোনো কথা শুনতে চাই না আমি। যদি এই নিয়ে কথা বলো তাহলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবো।”
রাজিয়া বেগমের থেকে কোনো কথা আসার আগেই স্নিগ্ধ গট গট করে বাহিরে চলে গেলো।
সুবহা উপরে দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে। রাজিয়া বেগম স্নিগ্ধর অগোচরে যেই মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে পছন্দ করে রেখেছিলেন সেই মেয়েই প্রাণেশা। স্নিগ্ধ সেটা জানে না। আর রাজিয়া বেগমও জানেন না স্নিগ্ধ যে মেয়েকে বিয়ে করতে চায় সে প্রাণেশাই।
সুবহা এখন আর তার মাকে বলতে গেলো না। রাতে যখন ওর বাবা আসবে তখন ওর বাবাকে দিয়েই বলাবে।

স্নিগ্ধ অফিসে এসে পৌছালো। থার্ড ফ্লোরে এসে সামনেই পড়লো সৌরভ। স্নিগ্ধকে দেখেই ও বলল,
“তুমি এখানে কেনো?”
স্নিগ্ধ বলল না যে আরশাদ খান ডেকেছে। কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আসলে ভাইয়া আপনার বাবার সাথে একটু কথা বলতে এসেছি।”
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“যা বলার আমাকে বলো।”
স্নিগ্ধ মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আপনার বাবাকেই বলতে হবে।”
এই মুহূর্তে একজন স্টাফ এসে স্নিগ্ধকে বললেন,
“আপনাকে স্যার আসতে বলেছে তাইনা? উনি একটা মিটিংয়ে আছেন। একটু লেইট হবে বের হতে। এখন আপনার যদি ইচ্ছে হয় তাহলে উনার কেবিনে গিয়ে ওয়েট করবেন। আর ইচ্ছে না হলে কালকেও আসতে হবে।”
স্নিগ্ধ সোজা গলায় বলল,

“আমাকে নিয়ে চলুন।”
সৌরভ বুঝতে পারলো স্নিগ্ধকে ওর বাবাই ডেকেছে। এর পরই ও রেগে গিয়ে স্টাফকে বলল,
“তোমার স্যারকে বলো, আমি তার অফিস করবো না।”
স্টাফটি জিজ্ঞাসু কণ্ঠে বললেন,
“কেনো স্যার?”
সৌরভ দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“অন্য কোথাও কাজ করবো।”
বলে হন হন করে বেরিয়ে গেলো। স্নিগ্ধ স্টাফটিকে বলল,
“উনি রেগে গেলো কেনো?”
স্টাফ আশেপাশে তাকিয়ে বললেন,
“এতো মাত্র অল্প। উনি তো আরও রাগী।”
স্নিগ্ধ মনে মনে বলল,
“রাগী জানতাম কিন্তু এতো রাগী। যাক সমস্যা নেই, শশুর ভালো হলেই হবে। এখন উনার সাথে কথা বললেই বোঝা যাবে উনি কেমন?”

সন্ধ্যার পরে সৌরভ বাড়ির দিকে যাচ্ছিলো। গাড়িটা খুব আস্তে চালাচ্ছিলো আর সিগারেট খাচ্ছিলো। কোনো কিছুতেই ভালো লাগছিলো না, তাই রাস্তার এক সাইডে গাড়িটা থামিয়ে নামলো। খুব একটা গাড়ি নেই এই রাস্তায়। সৌরভ গাড়িতে হেলান দিয়ে একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে শেষ করছে।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ৮

এদিক থেকে হঠাৎ কয়েকজন লোকের জোরে জোরে কথা বলার শব্দে পেছন ফিরে তাকালো। মনে হচ্ছে এক্সিডেন্ট হয়েছে। সৌরভ কপাল কুঁচকে এগিয়ে গেলো। এদিকে তো কোনো গাড়িই নেই, ২-১ টা রিক্সা শুধু। একজন লোক বলছে, মেয়েটা রাস্তা পার হতে গিয়ে রিক্সার সাথে বারি খেয়েছে।
সৌরভ এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায় একটা মেয়ে পড়ে আছে। দুটো মহিলা এসে মেয়েটাকে সোজা করতেই সৌরভ দেখে এটা প্রাণেশার বান্ধবী সুবহা।

তোমাতেই বসন্ত পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here