Home ইশকে দে ফানিয়ার ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ১
মেহজাবিন নাদিয়া

সদ্য বিয়ে করা নববধূকে ফেলে রেখে বরকে উদভ্রান্তের মতো চলে যেতে দেখে উপস্থিত সবার চোখ ছানাবড়া! মুহূর্তেই আশেপাশের গ্রামের মানুষজনের মধ্যে কানাকানি আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। এদিকে বসার ঘরের সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা সরাষ্ট মন্ত্রী আরিশান মৃধা ছেলের এহেন আকস্মিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে চরম লজ্জায় পড়ে গেলেন। উপস্থিত লোকজনের বাঁকা চাহনি ও গুঞ্জন তাঁর ভেতরের ক্ষোভকে আরও উসকে দিল। তিনি প্রচণ্ড বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং রাগ সামলাতে না পেরে চলে যেতে উদ্যত সারিমের উদ্দেশ্যে গমগমে গলায় বলে উঠলেন,

“সারিম, কোথায় যাচ্ছ তুমি? আমি এই বিয়েবাড়িতে কোনো তামাশা দেখতে আসিনি!”
বাবার বজ্রকঠিন আওয়াজে সারিমের যাওয়ার গতি কিছুটা শ্লথ হলো, সে থমকে দাঁড়াল। এরপর অত্যন্ত ধীর পায়ে পিছু ফিরে বাবার ক্রুদ্ধ মুখের দিকে তাকাল। আরিশান মৃধার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি এখন ভীষণ রেগে আছেন। তবে সারিমের তাতে বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না; তার চোখে-মুখে কোনো অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। সে একরাশ অবহেলা আর গা-ছাড়াভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিল,
“বিয়ে করতে বলেছ, বিয়ে করেছি। এখন আমার কাজ শেষ।”
“বিয়ে যেহেতু হয়ে গেছে, এখন তোমার বউয়ের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে!” আরিশান মৃধা এবার দাঁড়িয়ে উঠে ধমকের সুরে বললেন।
বাবার মুখে ‘দায়িত্ব’ শব্দটা শুনে সারিমের কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে একবারের জন্যও ঘুরে নিজের সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর দিকে তাকাল না। উল্টো মেয়েটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাবার উদ্দেশ্যে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে উঠল’

“বিয়ে যখন তুমি দিয়েছ, এখন এই মেয়ের দায়িত্বও তোমার, আমার না!”
কথাটা ছুড়ে দিয়েই সারিম সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। তীব্র অহংকার আর জেদ নিয়ে গটগট পায়ে হেঁটে আজাদ রহমানের ছোট একতলা বাড়িটা থেকে বের হয়ে গেল। পিছন থেকে আরিশান মৃধা তাকে বারবার ডাকলেও সেসবে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না সারিম। সোজা বাইরে বেরিয়ে নিজের দামি গাড়িটাতে গিয়ে বসল এবং সশব্দে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চোখের পলকে সেখান থেকে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল।
ইতিমধ্যে পুরো গ্রামে বাতাসের বেগে খবর রাষ্ট্র হয়ে গেছে যে—গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী কন্যা অরির বর তাকে একা ফেলে রেখে চলে গেছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের প্রায় সব সমবয়সী মেয়েদের মনে যেন এক অদ্ভুত আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। মনের কোণে লুকিয়ে থাকা হিংসার আগুনে প্রলেপ পড়ল। কারণ, তারা অরিকে মনে মনে প্রচণ্ড হিংসা করত। গ্রামে যখনই কোনো ভালো পাত্রপক্ষ মেয়ে দেখতে আসত, তখনই কোনো না কোনোভাবে আশেপাশের লোকজনের মুখে অরির রূপের জয়গান শুনে তারা দিক পরিবর্তন করত। পাত্রপক্ষ কনের বাড়ি না গিয়ে সোজা চলে যেত আজাদ রহমানের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
অথচ অরির বয়স সবেমাত্র তেরো বছর। এই কাঁচা, অবুঝ বয়সে আজাদ সাহেব অরির বিয়ের কথা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতেন না। কিন্তু নিজের স্ত্রী হেনা বেগমের বাঘিনী রূপ আর চড়া গলার ভয়ে তিনি পাত্রপক্ষকে সরাসরি ‘না’ করতে পারতেন না, আবার নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ‘হ্যাঁ’ও বলতে পারতেন না। এক দোলাচলের মধ্যে দিন কাটত তাঁর।
প্রকৃতপক্ষে অরি হলো আজাদ রহমানের মৃত ছোট ভাই দেলোয়ার রহমানের একমাত্র মেয়ে। ওর পুরো নাম অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা। অরির জন্মের ঠিক কিছুদিন পরেই ওর মা নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় মারা যান। সৌন্দর্যের দিক থেকে অরির মা ছিলেন অনন্য। গ্রামের প্রবীণরা এখনো ওনার রূপের কথা উঠলে বলাবলি করে,

“বউ পাইয়া দেলোয়ার জিতছিল রে, একখান আসমানের পরি লইয়াইছিল ঘরো।”
আর মায়ের সেই স্বর্গীয় রূপেরই যেন পূর্ণ প্রতিচ্ছবি পেয়েছে অরি। সৌন্দর্যের দিক থেকে অরি যেন ওর মায়ের চেয়েও এক কাঠি উপরে! গ্রামের প্রায় সকল ছেলেই মনে মনে অরিকে নিজের করে পেতে চাইত। তবে অরির মতো গম্ভীর, অন্তর্মুখী আর শান্ত স্বভাবের মেয়ের সঙ্গে কেউ সহজে কথা বলার সাহস পেত না। মেয়েটা প্রয়োজনের বেশি কখনো মুখ দিয়ে টু শব্দ বের করে না; সমস্ত বেদনা, সমস্ত অবহেলা সে নিজের বুকের গভীরে পাথরচাপা দিয়ে রাখে।
অরির মায়ের মৃত্যুর পর ওর বাবা দেলোয়ার রহমান মেয়েকে একা ফেলে রাখতে পারেননি। তাই ওকে নিজের কাছে রাখার জন্য চট্টগ্রামে নিজের কোয়ার্টারে নিয়ে আসেন। দেলোয়ার রহমান ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন দেশপ্রেমিক মেজর। নিজের দেশের প্রতি তিনি সবসময় অত্যন্ত দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি। নিজের প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন, তবে ভাগ্য হয়তো সেই পবিত্র ভালোবাসাকে বেশিদিন সইতে দেয়নি।

মেয়ের বয়স যখন ছয় বছর, তখন হঠাৎ করেই এক জরুরি ও বিপজ্জনক মিশনের ডাক আসে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেলোয়ার রহমান বাধ্য হয়ে অরিকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ওনার মা এবং ভাইয়ের কাছে রেখে আসেন। তবে আজাদ সাহেবের স্ত্রী হেনা বেগম ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী, দাম্ভিক এবং কুটিল এক মহিলা। তিনি অরিকে ছোটবেলা থেকেই মোটেও পছন্দ করতেন না, যা আজাদ রহমান ভালো করেই জানতেন। কিন্তু ছোট ভাই দেশের জন্য লড়ছে, সে কষ্ট পাবে ভেবে তিনি স্ত্রীকে কিছুই বলতেন না। বরং তিনি নিজেই আড়ালে-আবডালে অরিকে নিজের মেয়ের মতোই আগলে রাখতেন।
অরিকে গ্রামে রেখে যাওয়ার বছর দুয়েক পার হয়ে গেলেও যখন দেলোয়ার রহমানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন পরিবারের সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া হলো। এরই মধ্যে ছোট ছেলের ফিরে না আসার শোকে অরির দাদি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। আর হেনা বেগম এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিলেন অবুঝ ছোট অরির ওপর; তাকে ‘অলক্ষ্মী’ ও ‘কুলক্ষ্মী’ বলে অপবাদ দিতেও তাঁর বাঁধল না।

এরই মাঝে হঠাৎ একদিন ওনাদের বাড়ির সামনে এসে থামল সেনাবাহিনীর একটা গাড়ি। সেখান থেকে নেমে কয়েকজন গম্ভীর মুখের অফিসার ওনাদের বাড়িতে এসে অরির জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও নির্মম খবরটা দিয়ে গেলেন—ওর বাবা আর নেই। দেলোয়ার রহমান মিশনের সময় শত্রু পক্ষের একটা গুলি বুকে নিয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হয়েছেন। অশ্রুসজল চোখে তারা জানান, মেজর দেলোয়ার নিজের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে দেশের পতাকাকে রক্ষা করার জন্য লড়াই করে গেছেন।
সেই দিন থেকে ছোট, চঞ্চল অরিটার ভেতরের শৈশবটা যেন এক নিমেষেই মরে গেল। সে বুঝতে পারল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তাকে ভালোবাসার মতো আর কোনো মানুষ বেঁচে নেই। অরি ছোটবেলা থেকেই একটু ভীতু প্রকৃতির, কেউ সামান্য ধমক দিলে বা কিছু বললে খুব সহজেই ভয় পেয়ে যেত এবং বিশ্বাস করে নিত। আর এই সহজ-সরল, নরম স্বভাবের জন্য তাকে হেনা বেগমের কাছ থেকে অমানুষিক মার খেতে হতো। হেনা বেগম যে তাকে একদমই দেখতে পারতেন না, তা অরিও খুব ভালো করে জানত। অরিকে তিনি সংসারের একটা মস্ত বড় বোঝা আর উটকো ঝামেলা ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না। সারাদিন এই কচি মেয়েটাকে দিয়ে ঘরের সব কঠিন কাজ করিয়ে নেওয়ার পরেও ঠিকমতো দু-মুঠো অন্ন মুখে তুলতে দিতেন না, একটা ভালো পোশাক পরতে দিতেন না।

তবে বড় চাচা আজাদ রহমান স্ত্রীর অগোচরে, লুকিয়ে লুকিয়ে অরিকে পড়াশুনার জন্য খাতা-কলম আর সামান্য কিছু হাতখরচা দিয়ে সাহায্য করতেন। এই অবহেলিত জীবনে এতটুকুই যেন অরির জন্য আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো বড় কিছু ছিল। কিন্তু চাচির হাতে এতো অত্যাচার, এতো লাঞ্ছনা সহ্য করেও অরি মুখ বুজে চুপচাপ সবকিছু সয়ে নিত। চোখের জল লুকিয়ে রাখত।
কারণ, অরিকে ছোটবেলায় ওর বাবা কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন,
“অরি মা, তোমাকে বড় হয়ে একজন আদর্শবান ডাক্তার হতে হবে। হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচাতে হবে।”
বাবার সেই শেষ কথাগুলোই ছিল অরির বেঁচে থাকার অক্সিজেন। অরি পড়াশোনার দিক থেকে সবসময় ক্লাসের টপার ছিল। অরির ক্লাসমেটরা এই নিয়ে তাকে ভীষণ হিংসা করত। ক্লাসে শিক্ষক না থাকলে তারা অরির বাবা-মা না থাকা নিয়ে খোঁটা দিত, যা নয় তাই বলে কটু কথা শোনাত। কিন্তু অরি ওদের সেসব বিষাক্ত কথায় কান না দিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে বইয়ের পাতায় মন দিত। প্রয়োজন ছাড়া ক্লাসে সে কারো সাথে একটা শব্দও উচ্চারণ করত না। অরি ওর বাবার দেওয়া সেই ইচ্ছেটাকে নিজের মনের মণিকোঠায় শক্ত করে গেঁথে নিয়েছে। যেভাবেই হোক, যত কষ্টই করতে হোক না কেন, পড়াশোনা করে তাকে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। আর এই একটা জ্বলন্ত স্বপ্নের কারণেই অরি হেনা বেগমের সমস্ত অত্যাচার ও নির্যাতন সবসময় মুখ বুজে সহ্য করে চলেছে।

বাবার সেই পবিত্র স্বপ্নকে বুকে লালন করে দিন পার করা তেরো বছর বয়সী অরির জীবনে আজকের সকালটা এসেছিল আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। প্রতিদিনের মতো ভোরে উঠেই যখন সে রান্নাঘরের কাজে হাত দিতে যাবে, ঠিক তখনই হেনা বেগম আর আজাদ রহমান এসে দাঁড়ালেন ওর ভাঙা ঘরের দরজায়।
চাচির মুখে আজ কোনো চিলতে রাগ নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক কুটিল ও তৃপ্তির হাসি। আজাদ সাহেবের মুখটা চুন হয়ে আছে, অপরাধীর মতো তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। হেনা বেগম গলার আওয়াজ যতটা সম্ভব নরম করার ভান করে অরিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“অরি, হাত-মুখ ধুয়ে নে জলদি। আজ তোর বিয়ে। পাত্রপক্ষ এখনই চলে আসবে, ঘরদোর গোছাতে হবে।”
চাচির মুখে ‘বিয়ে’ শব্দটা শুনে অবুঝ অরি থমকে দাঁড়াল। রান্নাঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সে বড় বড় চোখ করে চাইল ওর চাচা-চাচির দিকে। ‘বিয়ে’ কী, কেন মানুষ বিয়ে করে,এইসব জটিল সামাজিক সমীকরণ বোঝার মতো বয়স বা মানসিকতা কোনোটাই অরির ছিল না। তার চব্বিশ ঘণ্টার পৃথিবীটা ছিল কেবল কাকডাকা ভোরে উঠে চাচির দেওয়া একগাদা ঘরের কাজ শেষ করা, আর তার ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা। এইটুকুই ছিল তার জীবন।
এক লহমার জন্য অরির কচি মনে ভয় ডানা মেলল। সে আমতা-আমতা করে বলল,

“চাচি… বিয়ে মানে কী?
“আহা, অত শতেক বুঝে তোর কাজ নেই!”
হেনা বেগম এবার কিছুটা চড়া গলায় ধমকে উঠলেন, তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
“আমি তোর মঙ্গলের জন্যই বলছি। আমি যা আদেশ করব, তোকে তা-ই মানতে হবে। কোনো কথা না বাড়িয়ে যা বলছি কর।”
চাচির সেই চেনা ধমক আর আদেশের সুর অরিকে আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দিল না। অরি জানে চাচির আদেশ অমান্য করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাছাড়া হেনা বেগম যখন বলছেন, তখন তো সেটা করতেই হবে—এই সহজ সরল বিশ্বাস থেকেই অরি মাথা নেউটে সম্মতি জানাল।
সারাক্ষণ কাজ আর পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকা অরির কাছে ‘বিয়ে’ বিষয়টি ছিল একেবারে নতুন, সম্পূর্ণ অচেনা এক অভিজ্ঞতা। সে ভাবল, হয়তো বিয়ের পরও সে এই বাড়িতেই থাকবে, একইভাবে কাজ করবে আর রাতে মন দিয়ে পড়াশোনা করবে।
অরি জানত না, এই না-বোঝা সম্মতির আড়ালে তার জীবনের destiny বা ভাগ্য কতটা নির্মম এক মোড় নিতে চলেছে। সে বুঝতেই পারল না যে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে বউ সাজে সাজিয়ে বসার ঘরে বসানো হবে, আর কোনো একজনের নামে বাধা পড়ে যাবে। আসলে অরি ‘রা’ খুব অভাগা হয় তারা জীবনে যা চায় জীবন তাদের তা না দিয়ে সবচেয়ে কঠিন জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দাড় করাতে ভালোবাসে।

অরির ক্ষেত্রে ও এখন তাই হচ্ছে সারিম চলে যাওয়ার পর বসার রুমটা পুরোপুরি ভাবে নীরবতা বিরাজমান করছে। বিয়েবাড়ির কোলাহল, গুঞ্জন আর হাজারো মানুষের বাঁকা চাহনির মাঝে বসার ঘরের সোফায় যেন একটা জীবন্ত পাথর হয়ে বসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধা। তাঁর চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যে ছেলের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, যার ভেতরের ঔদ্ধত্য আর জেদকে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ মেয়ের ছোঁয়ায় ধুয়ে-মুছে সাফ করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি এই প্রত্যন্ত গ্রামে এসেছিলেন—সেই ছেলেই আজ তাঁর মুখে চুনকালি দিয়ে চলে গেল।আরিশান মৃধার মনে হচ্ছিল, তাঁর নিজের বুকের ভেতর একটা বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বলছে। তিনি দেশের কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেন, অথচ নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানকে একটা ন্যূনতম শালীনতা শেখাতে পারলেন না! এই তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জায় তাঁর মাথা নিছু হয়ে আসছিল।
এদিকে পুরো বসার ঘরে তখন সম্পূর্ণ নীরবতা বিরাজমান। উপস্থিত গ্রামের মাতব্বর আর আত্মীয়স্বজনরা আড়চোখে আরিশান মৃধার দিকে তাকাচ্ছেন। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলছেন,
“টাকা-পয়সা, ক্ষমতা থাকলে কী হইব? পোলা তো বাপের মুখের ওপর জুতা মারিয়া গেলগা!”
এইসব বিষাক্ত ফিসফিসানি আরিশান মৃধাকে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ করছে,

অপর দিকে এতক্ষন যাবত সকলের কথাবার্তা আর আচার আচরন এর ধরন দেখে অরি কিছুটা হলেও বুঝতে পারছে। ওর চাচা চাচি আসলে ঐ লোকটার সঙ্গে ওকে বিয়ে দিয়ে এই বাড়ি থেকে বিদায় করতে চাচ্ছিল। তবে লোকটাতো অরিকে বিয়ে করে একা ফেলে চলে গেছে, ওকে সাথে করে নিয়ে যাইনি, তারমানে চাচা চাচির মতো ঐ লোকটাও অরির মতো অভাগা মেয়েকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়নি। ভাবতেই অরির কিশোরী মনটা ভার হয়ে গেল। কেন? কেন সবাই ওকে এতো অপছন্দ করে, তাকে বোঝা ভাবে।অরিতো কারো কাছ থেকে কখনো দামি কিছু চেয়ে বসে না, জ্বালায় না, কারো ক্ষতি করে না। শুধু কাজ করার বিনিময়ে একটু খাবার আর পড়াশুনা করতে চেয়েছিল।অরির ছোট মনটা ভেবে নেয় সবকিছু পিছনে একটাই কারন, অরির বাবা মা নেই অরি অনাথ। তাই ওকে কেউ ভালোবাসে না। কাছে রাখতে চায়না সবাই ওকে ফেলে দিতে চায়,যেমনটা আজকে ওর বিয়ে করা স্বামীটা করল।ওকে না নিয়েই একা রেখে চলে গেল সে।লোকটাও অরির মতো অনাথ মেয়েকে চায়না, এসব ভাবতেই অরির ফসা গাল বেয়ে মুক্তোর দানার মতো কয়েক দানা জল গড়িয়ে পড়ল।

এত সবকিছুর মাঝে হেনা বেগমের ভেতরের বাঘিনী রূপটা হঠাৎ জেগে উঠেছে। সারিম চলে যাওয়ার পর থেকেই ওনার বুকের ভেতর এক চরম আতঙ্ক আর ক্রোধের জন্ম হয়েছে। তিনি ভেবেছিলেন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘরে অরিকে বিদায় করতে পারলে ওনাদের ওপর থেকে একটা মস্ত বড় বোঝা নেমে যাবে, উপরন্তু মন্ত্রীর সুদৃষ্টি থাকলে ওনাদের পরিবারও রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন? বর তো মেয়েকে ফেলে রেখে চলে গেছে! তার মানে এই আপদ, এই ‘অলক্ষ্মী’ মেয়েটা আবার ওনাদের ঘাড়েই এসে পড়ল? সারাজীবন এই উটকো ঝামেলা ওনাকে টেনে নিয়ে বেড়াতে হবে? এই চিন্তাটা হেনা বেগমের মাথায় আসতেই তাঁর চোখ-মুখ হিংস্র হয়ে উঠল।
হেনা বেগম ভিড়ের আড়াল থেকে অরির দিকে তাকালেন। অরি তখনো বসার ঘরে এক কোণে বউ সাজে জড়সড় হয়ে বসে আছে। পরনে লাল বেনারসি, আর মাথায় জড়ানো ওড়না—সব মিলিয়ে তাকে কোনো এক অপ্সরার মতো লাগছে। অরির বড় বড় নিষ্পাপ চোখ দুটোতে তখনো একরাশ বিভ্রান্তি আর ভয়।
হেনা বেগম আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে ভিড় এড়িয়ে অরির কাছে গেলেন। অরির একটা হাত শক্ত করে খপ করে ধরে অত্যন্ত নিচু কিন্তু হিংস্র গলায় বললেন,
“এদিকে আয় হারামজাদি! তোরে আজ আমি বিয়ার সোয়াদ বুঝাইতাছি!”

অরি কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেনা বেগম তাকে টেনেহিঁচড়ে পেছনের দিকের একটা অন্ধকার, পরিত্যক্ত স্টোর রুমের দিকে নিয়ে যেতে লাগলেন। অরি ভয়ে কেঁপে উঠে বলল,
“চাচি… কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমার কষ্ট হচ্ছে চাচি, হাতটা ছাড়ো…”
কিন্তু হেনা বেগমের কানে তখন কোনো কথা ঢোকার মতো অবস্থা ছিল না। তিনি অরিকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর ফেলে দিলেন এবং সাথে সাথে ভেতরের খিলটা সশব্দে আটকে দিলেন। বাইরের জানলাগুলো আগে থেকেই বন্ধ ছিল, ফলে পুরো ঘরটাতে এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ তৈরি হলো।
হেনা বেগম দাঁতে দাঁত চেপে অরির দিকে এগিয়ে এলেন। অরি মাটিতে পড়ে গিয়ে ওনার দিকে ভয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল। হেনা বেগম ঘরের কোণে থাকা একটা পুরনো কাঠের খাটের নিচে হাত বাড়িয়ে একটা ভারী, চওড়া কাঠের ক্রিকেট ব্যাট টেনে বের করলেন। ওটা ছিল আজাদ সাহেবের পুরনো দিনের একটা ভারী ব্যাট। ওটা হাতে নিতেই হেনা বেগমের চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরতে লাগল।
“তুই একটা ডাইনি! তুই একটা অলক্ষ্মী!” হেনা বেগম হিসহিসিয়ে উঠলেন।

“তোর জন্মের পর তোর মা মরল, তোর লাইগা তোর বাপ মরল, তোর দাদি মরল! আর আজ বিয়ার পিঁড়িতে বইসা আমার কপালটাও পুড়াইলি? ওই বড়লোকের পোলা তোরে থুতু দিয়া চইলা গেছে! এখন তোর ভার কে নিব রে হারামজাদি? আমি নিমু? তোর ওই এক হাত কাটা পঙ্গু চাচা নিব?”
কথাটা শেষ করতেই হেনা বেগম সজোরে কাঠের ব্যাটটা দিয়ে অরির পিঠে আঘাত করলেন।
“আহ্! চাচিইই!” অরি একটা তীব্র চিৎকার দিয়ে উঠল। কাঁচা বয়সের নরম পিঠে ওই ভারী কাঠের আঘাত লাগতেই অরির মনে হলো তার হাড়গোড় বুঝি গুঁড়ো হয়ে গেল। সে ব্যথায় কুঁকড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
“চিৎকার করবি না! একদম মুখ ফুটিবি না!” হেনা বেগম অরির ওড়নাটা টেনে নিয়ে ওর মুখের ভেতর গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করলেন, যাতে বাইরের লোকজন আওয়াজ শুনতে না পায়। এরপর তিনি একের পর এক নির্মম আঘাত করতে লাগলেন অরির সারা শরীরে।
“তোর এই রূপের দেমাগ আমি আজ শেষ করুম! এই রূপ দেখাইয়া তুই বড়লোকের পোলারে ফান্দে ফালাইতে পারলি না কেন? এখন সে তোরে ছাইড়া গেছে, এখন কুনহানে যাইবি তুই?”
ভারী কাঠের ব্যাটের প্রতিটি আঘাতে অরির লাল বেনারসি শাড়িটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল, আর ভেতর থেকে তাজা লাল রক্ত বের হয়ে আসছিল। অরি বাঁচার জন্য ছটফট করছিল। সে হাত জোড় করে, মুখ বন্ধ থাকা অবস্থায় গোঙানির সুরে বলতে চাইল—’চাচি, আমাকে মেরো না, ‘

কিন্তু হেনা বেগমের ভেতরের পিশাচটা তখন পুরোপুরি জাগ্রত। তিনি অরির কোনো আকুতিই শুনলেন না। বাইরের বিয়েবাড়ির মানুষের হট্টগোল আর কানাকানির আওয়াজে এই বন্ধ ঘরের ভেতরের নির্মম নির্যাতন পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেল। কেউ টেরও পেল না, একটা তেরো বছরের অনাথ মেয়েকে কীভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো নির্যাতন হচ্ছে।
এদিকে বসার ঘরে বসে থাকা আরিশান মৃধার হঠাৎ করেই অরির কথা মনে পড়ল। এতক্ষণ তিনি নিজের ক্ষোভ আর অপমান নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর বিবেকের দংশন শুরু হলো। আরিশান মৃধা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি আশেপাশে লোকজনের ভিরে তাকালেন, কিন্তু সেখানে অরি নেই। বসার ঘরের কোথাও অরিকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি চারপাশটা ভালো করে লক্ষ্য করলেন, অরির চাচা আজাদ রহমান এক কোণে মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু হেনা বেগমকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। হেনা বেগমের ওই কুটিল চেহারা আর আগের ব্যবহার মনে পড়তেই আরিশান মৃধার বুকের ভেতর একটা অজানা আতঙ্ক মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, কিছু একটা মারাত্মক ভুল ঘটছে।

তিনি কালবিলম্ব না করে ওনার ব্যক্তিগত বডিগার্ড এবং সিকিউরিটি ইনচার্জ কমান্ডার ইরফাদকে ডাকলেন।
“ইরফাদ, মেয়েটা কোথায়? আর ওর চাচিই বা কোথায়? জলদি খুঁজে বের করো!”
আরিশান মৃধা নিজেই ভেতরের ঘরের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর পেছনে চার-পাঁচজন সশস্ত্র বডিগার্ড। আজাদ রহমানের একতলা বাড়িটার করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই পেছনের বন্ধ স্টোর রুমটার সামনে এসে আরিশান মৃধা থমকে দাঁড়ালেন। চারপাশের হট্টগোলের মাঝেও ওনার কান যেন একটা চাপা গোঙানি আর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। কেউ একজন ব্যথায় ছটফট করছে, আর অবরুদ্ধ গলায় বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে।
“ইরফাদ! এই ঘরটার দরজা খোলো! জলদি!” আরিশান মৃধার গলা কাঁপছিল রাগে আর আশঙ্কায়।
ইরফাদ এগিয়ে এসে দরজায় ধাক্কা দিল, কিন্তু ভেতর থেকে শক্ত করে খিল আটকানো। আরিশান মৃধা আর সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। তিনি চিৎকার করে বললেন,

“দরজা ভেঙে ফেলো!”
দুইজন বিশালদেহী বডিগার্ড একসাথে সজোরে লাথি মারতেই পুরনো কাঠের দরজাটা মড়মড় করে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। দরজা খুলতেই যে দৃশ্য আরিশান মৃধার চোখে পড়ল, তা দেখে ওনার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ছোট্ট অরি। তার মুখের ভেতর ওড়না গোঁজা, চোখ দুটো উল্টে যাওয়ার মতো অবস্থা। আর হেনা বেগম তখনো হাতে সেই রক্তমাখা কাঠের ব্যাট নিয়ে অরিকে আঘাত করার জন্য উঁচিয়ে ধরেছেন।
আরিশান মৃধার মুখ থেকে একটা সিংহের মতো গর্জন বের হলো। ওনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি অনেক অপরাধী দেখেছেন, কিন্তু একটা তেরো বছরের অনাথ বাচ্চার ওপর এমন পৈশাচিক নির্যাতন তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
আরিশান মৃধা এক মুহূর্তও না ভেবে হেনা বেগমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওনার বডিগার্ডরা হেনা বেগমকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল এবং ওনার হাত থেকে ব্যাটটা কেড়ে নিল। আরিশান মৃধা সোজা মেঝের ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লেন। তিনি অত্যন্ত সাবধানে, কাঁপতে কাঁপতে অরির মুখের ভেতর থেকে ওড়নাটা বের করলেন।
মুখের কাপড়টা সরতেই অরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেঁদে উঠল,

“বাবা… ও বাবা… আমাকে বাঁচাও… আমি ডাক্তার হবো বাবা…” তীব্র ব্যথায় অবুঝ মেয়েটি তার মৃত বাবাকে ডাকতে লাগল।
আরিশান মৃধার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি অরিকে নিজের দুই বাহুর মধ্যে তুলে নিলেন। লাল বেনারসি পরা সেই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে তিনি নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। একজন শক্ত মনের রাজনীতিবিদ আজ একটা বাচ্চার কষ্টের সামনে পুরোপুরি ভেঙে পড়লেন। তিনি অরির মাথায় হাত বুলিয়ে, কপালে চুমু খেয়ে বাচ্চাদের মতো আদর করতে করতে বলতে লাগলেন,
“মা… অদ্রিজা মা… কোনো ভয় নেই। তোমার বাবা আসেনি, কিন্তু তোমার এই বাবা এসেছে। আমি আছি মা, আমি তোমায় কিচ্ছু হতে দেব না।”

যখন তিনি অরির পিঠে হাত দিলেন, ওনার হাতটা তরল রক্তে ভিজে গেল। শাড়িটা সরিয়ে অরির পিঠের দিকে তাকাতেই আরিশান মৃধা আতকে উঠলেন। তেরো বছরের কাঁচা চামড়া ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, কালশিটে পড়ে কালো হয়ে গেছে কিছু জায়গা, আর সেখান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। এই নির্মম দৃশ্য দেখে আরিশান মৃধার ভেতরের সমস্ত মানবিকতা যেন এক মুহূর্তে এক ভয়াবহ রুদ্ররূপে পরিণত হলো। ওনার মাথার সমস্ত রগ ফুলে উঠল, চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেল। তিনি ওনার আত্মনিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেললেন।
তিনি মেঝে থেকে সেই ভারী কাঠের ব্যাটটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। হেনা বেগম তখনো এক কোণে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছিলেন,
“আমার ঘরের মেয়ে আমি শাসন করছি, আপনার কী?”
“শাসন করছিস?!”

আরিশান মৃধার গলার আওয়াজ পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে দিল। তিনি আর কোনো প্রোটোকল, কোনো আইনের তোয়াক্কা করলেন না। তীব্র ক্রোধে অন্ধ হয়ে তিনি কাঠের ব্যাটটা দিয়ে সজোরে হেনা বেগমের পায়ে আঘাত করলেন।
“আহহহ!” হেনা বেগম এক বিকট চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।
কিন্তু আরিশান মৃধার রাগ তখনো শান্ত হয়নি। তিনি হেনা বেগমের পিঠে, হাতে একের পর এক আঘাত করতে লাগলেন।
“একটা অনাথ বাচ্চার ওপর হাত তুলতে তোর হাত কাঁপল না? তুই মানুষ নাকি পিশাচ? এই মেয়ে আমার ছেলের বউ, এই মেয়ে আমার মেয়ে!সরাষ্ট মন্ত্রী আরিশান মৃধা ‘র’ মেয়ে ও।ওর গায়ে হাত দেওয়ার সাহস তোর কীভাবে হয়?”
হেনা বেগম মাটিতে গড়াগড়ি খেয়ে চিৎকার করতে লাগলেন, কিন্তু উপস্থিত বডিগার্ড বা বাইরের কেউ মন্ত্রীর এই রূপ দেখে এগিয়ে আসার সাহস পেল না। আরিশান মৃধা ওনাকে মেরেই ফেলতেন, কিন্তু কমান্ডার ইরফাদ ওনাকে এসে জড়িয়ে ধরল,

“স্যার, শান্ত হোন। ওনি মরে যাবে। আইনের হাতে দিন একে।”
আরিশান মৃধা হাঁপাতে হাঁপাতে ব্যাটটা ফেলে দিলেন। ওনার শরীর রাগে কাঁপছিল। তিনি ইরফাদ এর দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বললেন,
“এক্ষুণি লোকাল এসপি-কে ফোন করো। এই মহিলাকে যেন জীবনের মতো জেলের ঘানি টানতে হয়। চাইল্ড অ্যাবিউজ, মার্ডার অ্যাটেম্পট যত রকমের কঠিন ধারা আছে, সব দাও এর নামে। একে পুলিশে দাও!”
এরপর তিনি আর হেনা বেগমের দিকে তাকালেন না। তিনি আবার মেঝের দিকে ফিরে অরিকে আলতো করে নিজের কোলে তুলে নিলেন। অরি তখন ব্যথার চোটে আধা-অজ্ঞান অবস্থায় ওনার বুকের সাদা পাঞ্জাবী টা ছোট ছোট হাত দিয়ে খপ করে ধরে রেখেছে। যেন ও বুঝতে পেরেছে, এই মানুষটাই এখন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার একমাত্র আশ্রয়।

আরিশান মৃধা অরিকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। বসার ঘরে তখনো গ্রামের মানুষ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর দেয়াল এর এক কোণে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন অরির বড় চাচা আজাদ রহমান। তিনি নিজের স্ত্রীর এই পৈশাচিক রূপ জানতেন, কিন্তু আজ যা ঘটেছে, তার পর তিনি লজ্জায়, অপমানে আর অনুশোচনায় আরিশান মৃধার দিকে চোখ তুলে তাকানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বুঝলেন, তাঁর কাপুরুষতার কারণেই আজ তাঁর প্রিয় ছোট ভাইয়ের একমাত্র মেয়েটার এই অবস্থা হয়েছে।
আরিশান মৃধা আজাদ রহমানের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ দিয়ে তখনো আগুন ঝরছে। তিনি অত্যন্ত শীতল কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন,
“আজাদ সাহেব, আপনি আপনার ভাইকে দেওয়া কথা রাখতে পারেননি। এই কাপুরুষতার কোনো ক্ষমা নেই। আজ থেকে অরি আপনার কেউ না। ও আমার মেয়ে,ও আমার সাথে আমার বাড়িতে যাবে।আরিশান মৃধার মেয়ে পরিচয়ে”

আজাদ রহমান কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি শুধু দুই হাতে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়লেন। ওনার চোখের জল হয়তো আজ অরির কষ্টের চেয়েও বেশি ওনার নিজের ব্যর্থতার জন্য ঝরছিল।
আরিশান মৃধা অরিকে কোলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলেন। বাইরে ওনার রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী দামি গাড়ি এবং পেছনে বডিগার্ডদের আরও কয়েকটি গাড়ি প্রস্তুত ছিল। তিনি অত্যন্ত সাবধানে অরিকে ওনার গাড়ির পেছনের সিটে শুইয়ে দিলেন এবং অরির মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিলেন।অরির মাথার ওড়না দিয়ে অরির শরীরের ক্ষতগুলো আলতো করে ঢেকে দিলেন।

“গাড়ি ছাড়ো।হসপিটালে নিয়ে যাও সোজা” আরিশান মৃধা ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন।
গাড়ি স্টার্ট নিল। ধুলো উড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কনভয় গ্রামের রাস্তা ছেড়ে হাইওয়ের দিকে এগিয়ে চলল। অরি কোলের মধ্যে শুয়ে মাঝে মাঝেই ব্যথায় শিউরে উঠছিল, আর আরিশান মৃধা পরম মমতায় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, সারিম এই মেয়েকে স্ত্রীর মর্যাদা দিক বা না দিক, তিনি নিজে অরিকে মেয়ের পরিচয়ে বড় করবেন। অরির জীবনের সব অন্ধকার তিনি নিজের বাবার স্নেহের আলো দিয়ে মুছে দেবেন। গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরের সন্ধ্যা শেষ এ রাত নেমে আসছিল, আর সেই অন্ধকারের বুক চিরে গাড়িগুলো ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটে চলল,এক নতুন জীবন আর এক নতুন লড়াইয়ের দিকে।

কুয়াশামাখা মহাসড়ক চিড়ে ছুটে চলা কালো রঙের বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ির গতি মিটারের কাঁটা তখন একশো কুড়ি ছুঁইছুঁই। স্টিয়ারিং হুইলে সারিমের ডান হাতের মুঠো শক্ত হয়ে বসছিল, ক্ষণে ক্ষণে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল হাতের শিরাগুলো। দুই জোড়া চোখ সামনের অন্ধকারের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও তার মনের ভেতরের ক্ষোভের আগুন তখন বাইরের হেডলাইটের তীব্রতাকেও হার মানিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত হওয়া সেই তথাকথিত বিয়ে নামক প্রহসনটির প্রতিটি মুহূর্ত তার মস্তিষ্কের কোষে কোষে হাতুড়ির মতো আঘাত করছিল।
মৃধা আবরার সারিম। বয়স সাতাশ। দীর্ঘ সুঠাম দেহ, ধারালো চোয়াল এবং চোখের মনিতে এক তীব্র, গম্ভীর আভিজাত্য। দুই বছর আগে আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্স এবং ইকোনমিক্সে উচ্চতর ডিগ্রি শেষ করে যখন সে দেশে ফেরে, তখন তার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল—হয় বাবার বিশাল পারিবারিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য সামলানো, না হয় দেশের মূলধারার রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করা। সারিম দুটোই বেছে নিয়েছে। তবে রাজনীতির প্রতি তার টানটা শৈশব থেকেই মজ্জাগত। তার রক্তে মিশে আছে ক্ষমতা আর নিয়ন্ত্রণের খেলা।

সামনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সারিম জানে, এই তরুণ বয়সেই সে যে সরাসরি কোনো ছোটখাটো পৌরসভা বা কাউন্সিলর পদের তোয়াক্কা না করে সোজা নিজের চেনা নির্বাচনী এলাকা থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) পদের জন্য মনোনয়ন নিশ্চিত করেছে, তার পেছনে সিংহভাগ অবদান তার বাবা, দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরিশান মৃধার। ক্ষমতার সর্বোচ্চ অলিন্দে থাকা বাবার সেই প্রবল প্রতিপত্তিই সারিমকে এক লাফে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার রাজকীয় সুযোগ করে দিয়েছে। এলাকায় সারিমের জনপ্রিয়তা এবং তার আধুনিক শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে তার বিজয় প্রায় নিশ্চিত।

কিন্তু সারিমের স্বপ্ন আর পাঁচটা সাধারণ, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকের মতো নয়। তার লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী, অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ধারালো। সে দেশের শিক্ষামন্ত্রী হতে চায়। আমেরিকার আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চাকে খুব কাছ থেকে দেখা সারিম বিশ্বাস করে, এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন না ঘটালে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। তার প্রধান লক্ষ্য—এমন এক যুগোপযোগী, উচ্চমানের শিক্ষানীতি ও অবকাঠামো তৈরি করা, যাতে এদেশের মেধাবী তরুণদের উচ্চশিক্ষার বা কোনো ডিগ্রির মোহে আর কখনো হাজার হাজার মাইল দূরের কোনো পরদেশে পাড়ি জমাতে না হয়। ঘরের মেধাকে সে ঘরের ভেতরেই বিকশিত করতে চায়। আর এই স্বপ্ন পূরণের জন্য ক্ষমতা তার চাই-ই চাই। সে জানে, নির্বাচনে জয়লাভের পর সংসদে তার আসন পাকা হলে এবং তার বাবার রাজনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকলে, তাকে ক্যাবিনেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।

তার বাবা আরিশান মৃধা এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সততা, কঠোর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আপসহীন দেশপ্রেমের জন্য দল এবং সাধারণ মানুষের কাছে ওনার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। ওনি নিজেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ওনার একমাত্র সন্তান সারিমও একদিন ওনার মতোই যোগ্য ও নীতিবান এক নেতা হয়ে দেশের হাল ধরবে। কিন্তু এই আদর্শবান বাবার একটি জেদই আজ সারিমের সাতাশ বছরের নিস্তরঙ্গ জীবনটাকে লণ্ডভণ্ড করে দিল।
বাবার সেই অমোঘ, নির্মম শর্তটি সারিমের কানে এখনো বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে,
“যদি তুমি ওই মেয়েটিকে বিয়ে না করো সারিম, তবে ভুলে যাও যে আমি আরিশান মৃধা তোমার বাবা। এই নির্বাচনে তো দূর—আমার জীবদ্দশায় এই দেশের রাজনীতিতে তুমি আমার কোনো প্রকার সাহায্য, সমর্থন বা দোয়া পাবে না। নিজের যোগ্যতায় লড়তে চাইলে লড়ো, কিন্তু মনে রেখো, আমার ছায়া ছাড়া তোমার এই তরুণ বয়সের স্বপ্ন আঁকুড়েই মরে যাবে।”

সারিম অবাধ্য হতে পারেনি। ক্ষমতার লোভ নয়, বরং নিজের লালিত স্বপ্ন আর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভোল বদলে দেওয়ার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ওর বুকে জ্বলছিল, তার জন্য সে বাবার এই অদ্ভুত, যুক্তিহীন এবং স্বৈরাচারী শর্তের সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু মনে মনে সে ফেটে পড়ছিল।ওর কিছুতেই মাথায় খেলছিল না, দেশের আইনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো সংবেদনশীল চেয়ার চালানো একজন মানুষ কীভাবে নিজের শিক্ষিত, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেকে একটা কাঁচা বয়সের, অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ের সাথে এমন এক অসম ‘বাল্যবিবাহে’ বাধ্য করতে পারলেন!

মেয়েটার বয়স কতই বা হবে? সারিমের থেকে গুনে গুনে চৌদ্দ বছরের ছোট! তেরো বছরের একটা কচি পিচ্ছি মেয়ে! বিয়ের পিঁড়িতে বসার সময় সারিম একবারের জন্যও মেয়েটির মুখের দিকে তাকায়নি। ওর তীব্র আত্মসম্মান আর অহংকার ওকে ওদিকে তাকাতে দেয়নি। তবে মেয়েটির শারীরিক অবয়ব আর বসার ধরন দেখে তার স্পষ্ট মনে হয়েছে, সে অত্যন্ত ছোটখাটো, অবুঝ এক শিশু। সাতাশ বছরের দীর্ঘ জীবনে সারিম কখনো কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ায়নি। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ভিন্নদেশ জীবন—সবখানেই নারীদের থেকে সে এক নিরাপদ, গম্ভীর দূরত্ব বজায় রেখে চলেছে। ওর কাছে ক্যারিয়ার, ক্ষমতা আর পলিটিক্সই ছিল ধ্যান-জ্ঞান।
সারিমের মা, ফাইজা তালুকদার ছিলেন দেশের একজন অত্যন্ত নামকরা এবং সফল কার্ডিয়াক সার্জন। সারিম যখন কলেজে পড়ত, তখনই এক আকস্মিক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ওনার অবর্তমান ঘটে।বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় মায়ের প্রতি সারিমের ছিল অগাধ, অন্ধ ভালোবাসা। মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই বাবার সাথে সারিমের মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে, যা আজকের এই ঘটনার পর এক চরম ও চূড়ান্ত রূপ নিল।

বাবার এই জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সারিম আজ কেবল সেই বিয়েবাড়ি থেকেই ধুলো উড়িয়ে চলে আসেনি, বরং সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে আর কখনো গুলশানের বাবার সেই বিলাসবহুল পৈতৃক ভিটাতে পা রাখবে না। বাবার সাথে তার সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত সুতো সে আজ নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেলেছে। রাজশাহী শহরে তার প্রয়াত মা ফাইজা তালুকদারের ওকে দেওয়া এবং ওনার নিজের নামে রেখে যাওয়া একটা চমৎকার ডুপ্লেক্স বাড়ি আছে। সারিম এখন সোজা সেখানেই চলে যাচ্ছে। বাবার দেওয়া ক্ষমতা সে নির্বাচনে ব্যবহার করবে, কারণ ওটা ওর রাজনৈতিক অধিকার, কিন্তু বাবার ছায়াতলে থেকে সে আর নিজের আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দেবে না। বাবা আর ছেলের মধ্যে এখন থেকেই শুরু হলো এক নীরব, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ।কনভয়ের গতি কমিয়ে গাড়িটা যখন একটা নির্জন নদীর পাশে এসে থামল।সারিম গাড়ির দরজা খুলে বের হল, সামনে থাকা বিশাল পদ্মা নদী।

সারিম রাতে আধারে চাদেরঁ আলো পড়া নদীর পানিগুলোর দিকে কিছুক্ষন নীরবতা পালন করে চেয়ে রইল।কিছুক্ষন পরপর আসা উত্তাপ ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে, সারিম আনমনেই হেসে ফেলল। আগে যখন ওর বেশি মন খারাপ থাকত তখন ওর মা এখানে ওকে ঘুরতে নিয়ে আসত, মুড ঠিক করার জন্য। এই লেকের পারে সারিম প্রায় আসে নিজের মায়ের সঙ্গে কাটানো আগের সকল স্মৃতি চারন করতে।সারিম ওর পকেট থেকে ফোনটা বের করে এরপর গ্যালারি তে ঢুকে ফোল্ডার থেকে মায়ের একটা হাস্যজ্বল ছবি বের করে চোখের সামনে ধরে। কিছুক্ষন ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকার পর আনমনেই সারিম ওর চোখদুটো বন্ধ করে নিজের মাকে অনুভব করতে থাকে। সারিমের যতই মন খারাপ বা ড্রিপ্রেশন থাকুক না কেন, এই কাজটা করলে ওর ভিতরের ঝড়ো উত্তাপ টা ঠান্ডা হয়ে আছে। এক অন্যরকম প্রশান্তি আসে পায় ও ওর নিজের মধ্যে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থমথমে পরিবেশ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রোটোকল ভেঙে তিন-চারটি কালো গাড়ি যখন এসে থামল,কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। আরিশান মৃধা নিজেই কোলে করে রক্তাক্ত, লাল বেনারসি পরা অরিকে নিয়ে ইমার্জেন্সি রুমে ঢুকলেন,ওনার সাদা পাঞ্জাবিতে অরির তাজা রক্ত লেগে এক ভয়াবহ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে।
হাসপাতালের সিনিয়র সার্জনরা মন্ত্রীর উপস্থিতি দেখে মুহূর্তের মধ্যে অরির চিকিৎসার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তবে আরিশান মৃধা সেখানে বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। অরির পিঠের ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে, প্রাথমিক ব্যান্ডেজ এবং পেনকিলার ইনজেকশন দেওয়ার পর যখন ডাক্তাররা জানালেন যে মেয়েটির শরীরের চামড়া মারাত্মকভাবে ফেটে গেছে তবে কোনো অভ্যন্তরীণ অঙ্গ বা হাড় ভাঙেনি, তখন আরিশান মৃধা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি চাননি এই ঘটনা নিয়ে মিডিয়া বা বাইরের লোকজনের মধ্যে কোনো প্রকার গুঞ্জন তৈরি হোক। তাছাড়া হসপিটালের চেনা পরিবেশে অরির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারত।
তাই প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ হতেই, ডাক্তারদের কড়া নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সাথে নিয়ে আরিশান মৃধা অরিকে আবার নিজের গাড়িতে তুলে নিলেন। সোজা গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন গুলশানের বাংলোর উদ্দেশ্যে।

গুলশানের ২ একর জমিতে নির্মাণ এই বাংলোবাড়িটি ওনার পৈতৃক সম্পত্তি। চারদিকে উঁচু দেয়াল, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা এই বাড়িটি যেন বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক দুর্গ। গাড়ি এসে পোর্টিকোতে থামল, তখন রাত প্রায় নিঝুম।আরিশান মৃধা অত্যন্ত সাবধানে, পরম মমতায় অরিকে কোল থেকে নামিয়ে ভেতরের দোতলার একটা সুপরিসর, আলো-বাতাসপূর্ণ গেস্ট রুমে নিয়ে এলেন। এই রুমটি ওনি নিজেই পছন্দ করেছেন, যেখানে জানলা খুললেই বাইরের বিশাল বাগান আর চন্দ্রমল্লিকার সুবাস পাওয়া যায়।
সেবিকা এবং ব্যক্তিগত ডাক্তার অরির ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়ে, ওকে একটা আরামদায়ক সুতির পোশাক পরিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। কড়া ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অরি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার কচি, ফর্সা মুখটাতে এখনো ভয়ের ও ক্লান্তির কালচে ছোপ লেগে আছে, তবে এই নিরাপদ আশ্রয়ে এসে তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন অনেকটাই স্বাভাবিক।
আরিশান মৃধা অরির বিছানার পাশে একটা চেয়ারে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসলেন। ওনার দীর্ঘ, রাজনৈতিক জীবনের সমস্ত ক্লান্তি যেন আজ এই তেরো বছরের মেয়েটার সামনে এসে ভর করেছে। তিনি আলতো করে অরির কপালে হাত রাখলেন। মেয়েটার গায়ে মৃদু জ্বর। ওনার মনে পড়ে গেল, কেন তিনি নিজের একমাত্র ছেলের জীবনে, নিজের এত বড় রাজনৈতিক সুনামের বাজি ধরে এই ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

স্মৃতির পাতাগুলো ওনার মস্তিষ্কে একে একে খুলতে লাগল। ঘটনাটি ঘটেছিল মাস ছয়েক আগে।
অরিদের গ্রামের চেয়ারম্যান মানহার চৌধুরীর স্ত্রী আলিফা চৌধুরী মূলত আরিশান মৃধার দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। ওনার একমাত্র মেয়ে জবার বিয়েতে ওনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় নানা ব্যস্ততার মাঝেও খালাতো বোনের দীর্ঘদিনের অনুরোধ ফেরাতে না পেরে, ওনি ওনার কড়া প্রোটোকল নিয়ে সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছিলেন। বিয়েবাড়ির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যখন ওনি ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরছিলেন, তখন গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে ওনার গাড়িবহর ধীর গতিতে এগোচ্ছিল।
হঠাৎ করেই ওনার নজর পড়ে রাস্তার এক কোণে। ওনি দেখতে পান, তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সী চার-পাঁচটা সমবয়সী মেয়ে মিলে একটা মেয়েকে ঘিরে ধরে তীব্র কটূক্তি করছে। আরিশান মৃধা স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে জানলার কাচটা কিছুটা নামালেন। ওনি দেখতে পেলেন, ঘেরাও হয়ে থাকা মেয়েটি এক অপরূপা সুন্দরী কিশোরী। তার রূপ যেন ওই প্রত্যন্ত গ্রামের ধুলোবালিকেও ম্লান করে দিচ্ছিল। কিন্তু সেই রূপের বিপরীতে মেয়েটির চোখে-মুখে ছিল এক গভীর, বিষাদময় স্তব্ধতা।
আশেপাশের মেয়েগুলো অত্যন্ত চড়া গলায়, বিষাক্ত ভঙ্গিতে মেয়েটিকে বলছিল,

“কী রে অরি? মা-বাপ খাইয়া এখন চাচার ঘরে পিন্ডি গিলতাছস! রূপ দেখাইয়া খুব তো ডানা কাটানি পরি সাজছস, কাজের বেলায় তো ঘরের ঝি! তোর মতো অলক্ষ্মী মাইয়া এই গ্রামে আর একটাও নাই।”
আরিশান মৃধা ‘র’ বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। ওনি দেখতে পেলেন, এতগুলো মেয়ে ঐ মেয়েটাকে ওভাবে তার মৃত বাবা-মা নিয়ে খোঁটা দিচ্ছে, কটু কথা শোনাচ্ছে, অথচ মেয়েটার চোখে কোনো জল নেই, মুখে কোনো প্রতিবাদের ভাষা নেই। সে চরম এক নির্বিকারত্ব নিয়ে, নিজের বুকের কাছে শক্ত করে ধরে রাখা নবম শ্রেণীর একটা বইয়ের পাতার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর অত্যন্ত ধীর পায়ে, সেই মেয়েগুলোর পাশ কাটিয়ে বইটা পড়তে পড়তেই নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিল। তার সেই গম্ভীর, অন্তর্মুখী আর শান্ত স্বভাব আরিশান মৃধাকে এক মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ওনার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটা আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়; এর ভেতরে এক অদ্ভুত, পাথরচাপা শক্তি আছে।

বাড়ি ফিরেও আরিশান মৃধা সেই মেয়েটির নিষ্পাপ কিন্তু বিষাদগ্রস্ত মুখটা ভুলতে পারেননি। তিনি ওনার ব্যক্তিগত উইং এবং লোকাল সোর্স মারফত মেয়েটির ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। যখন ওনার টেবিলে অরির পুরো জীবনবৃত্তান্ত এসে পৌঁছায়, তখন ওনার চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। তিনি জানতে পারেন, মেয়েটি অন্য কেউ নয়—দেশের জন্য শহীদ হওয়া সেনাবাহিনীর বীর মেজর দেলোয়ার রহমানের একমাত্র মেয়ে, অরিয়া ইবনাত অদ্রিজা। ওনি আরও জানতে পারেন যে, অরির চাচি হেনা বেগম অত্যন্ত কুটিল ও অহংকারী এক মহিলা, যে অরিকে ছোটবেলা থেকে পৈশাতিক নির্যাতন করে আসছে, ঘরের সব কঠিন কাজ করিয়ে নিয়ে তাকে দু-মুঠো ঠিকমতো খেতেও দেয় না। অথচ এই চরম অবহেলার মাঝেও মেয়েটি ক্লাসের টপার, এবং তার একমাত্র স্বপ্ন,পড়াশোনা করে একজন ডাক্তার হওয়া, তার শহীদ বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ করা।
ওনি সেদিন এক দীর্ঘ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওনার নিজের ছেলে সারিম—অত্যন্ত গম্ভীর, জেদি, অহংকারী এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ হতে চলা এক তরুণ। সারিমের জীবনে ক্যারিয়ার আর পলিটিক্স ছাড়া আর কোনো মানবিক অনুভূতি নেই। আরিশান মৃধা অনুভব করেছিলেন, সারিমের এই রুক্ষ, ঔদ্ধত্যপূর্ণ জীবনটাকে যদি কেউ শান্ত, স্নিগ্ধ মমতায় বদলে দিতে পারে, তবে সে এই মেয়েটিই পারবে। অরির ভেতরের যে সহ্যক্ষমতা, যে সততা আর মেধা, তা সারিমের জীবনের অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে তাকে একজন প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করবে। তাছাড়া, একজন বীর শহীদের সন্তান এভাবে একটা পৈশাচিক পরিবেশে নষ্ট হয়ে যাবে, তা দেশের একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এবং একজন সচেতন মানুষ হিসেবে ওনি মেনে নিতে পারছিলেন না। ওনি অরিকে এক নিরাপদ, উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ভবিষ্যৎ দিতে চেয়েছিলেন।

তাই ওনি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে অরির চাচা-চাচির সাথে গোপনে যোগাযোগ করেন। আরিশান মৃধার মতো ক্ষমতাধর মানুষকে নিজেদের ভাঙা ঘরে দেখে আজাদ রহমান আর হেনা বেগমের তখন হাত-পা কাঁপার অবস্থা। আরিশান মৃধা কোনো ভণিতা না করে সরাসরি নিজের ছেলের জন্য অরির বিয়ের প্রস্তাব দেন। হেনা বেগম প্রথমে আকাশ থেকে পড়লেও, আরিশান মৃধা যখন ওনাদের সামনে একটা বেশ মোটা অঙ্কের টাকার চেক এবং আজাদ সাহেবের ব্যবসার জন্য বড় সুবিধার আশ্বাস দেন, তখন টাকার লোভে পড়ে হেনা বেগমের চোখ চকচক করে ওঠে। তারা সানন্দে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়।
তবে যাওয়ার আগে আরিশান মৃধা ওনাদের কড়া ভাষায় ওয়ার্নিং দিয়ে এসেছিলেন,
“মনে রাখবেন, আজ থেকে এই মেয়ে আমার ঘরের বউ। বিয়ের দিন পর্যন্ত অদ্রিজার গায়ে যেন একটা আঁচও না লাগে। তাকে দিয়ে কোনো ঘরের কাজ করানো তো দূর, কোনো লাঞ্ছনা করা যাবে না। যদি এর ব্যতিক্রম দেখি, তবে আরিশান মৃধার চেনা রূপ আপনারা সহ্য করতে পারবেন না।”

টাকার লোভ আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার ভয়ে তারা তখন মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু আজ বিয়েবাড়িতে সারিমের সেই আকস্মিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বিদায়ের পর হেনা বেগমের ভেতরের সেই পিশাচটা আবার জেগে উঠেছিল, যার চরম মূল্য দিতে হলো অবুঝ অরিকে।

এরপর ওনি আর বেশিক্ষন ঐ রুমে থাকলেন না, যাওয়ার আগে শুধু অরির মাথায় আরো একবার পিতৃত্ব হাত বুলিয়ে দিয়ে গেছেন।এরপর লাইট অফ করে ওনি রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। আর একজন সারভেন্ট কে বলে দেয় সারারাত অরিকে দেখবাল করার জন্য,ওর যদি কোনো কিছু প্রয়োজন হয়। সঙ্গে সঙ্গে যেন তা হাজির করে দেয়।

ইশকে দে ফানিয়ার পর্ব ২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here