Home তোমার আমার গল্প তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮ (২)

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮ (২)
noorayn

আরহাম যেই ব্রেকফাস্টের জন্য উঠতে যাবে তখনি ডোরা বাবার সাথে যাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো।
আরহাম তা দেখে ছেলেকে কোলে নিয়ে গেলো ডাইনিং টেবিলের দিকে।
আজ আয়শা আরহামের পছন্দের অ্যাভোকাডো স্যান্ডউইচ বানিয়েছে। সাথে আছে ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর অমলেট।
আরহাম স্যান্ডউইচ নিয়ে খাওয়া শুরু করলে ডোরা বাবার কোল থেকে হাত-পা দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে যেন বোঝাতে চাচ্ছে সেও খাবে। টোস্টেড স্যান্ডউইচ হওয়ার কারনে আরহাম তা ডোরাকে দিলোনা বরং পরোটা ছিড়ে অল্প অল্প করে তার মুখে তুলে দিতে থাকলো। আরশানের ছোট ছোট চারটি দাঁত উঠেছে। দেখতে বড্ড আদুরে লাগে যা আরহামের ভাষায় ইঁদুর ছানার মতো দাত।

ডোরা অল্প খেয়ে আর খেলোনা – কাউকে কোনোকিছু খেতে দেখলে সে হাত বাড়িয়ে তা খেতে চায় কিন্তু একটু মুখে দেয়ার পর আর খায়না। ডোরা এখন বাবার গলায় থাকা লকেট নিয়ে খেলতে ব্যাস্ত।
আয়শা এসে বললো আরশান কে তার কোলে দিতে যাতে আরহাম আরাম করে খেতে পারে। আরহাম কিছু বলার আগেই ডোরা বাবার বুকে মুখ গুজে দিলো – সে যাবেনা।
তবুও আয়শা জোর করে নিতে চাইলে সে বাবার টি-শার্ট এর অংশ তার ছোট গুলুমুলু হাত দিয়ে মুঠো করে ধরে রাখলো। সে যাবেনা মানে যাবেই না – তা দেখে আরহামও মানা করে দিলো নিতে। আয়শা নাতিকে আদর করে চলে গেলো লিভিং রুমের দিকে।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে আরহাম আবারও এসে বসলো সবার মাঝে। মেহরোজা আক্তার আরশান কে কোলে নিতে চাইলে সে যায়না। সে বারবার আশেপাশে চোখ বুলাচ্ছে। তার মাকে খুজে চলেছে সবার ভিড়ে। শাইনা তা বুঝে বললো –

“আমার দাদুভাই কি মাম্মাকে মিস করছে?”
“মাম…মা..ম্মা..”
“হ্যাঁ মাম্মা এক্ষুনি চলে আসবে।”
আরশান মাকে ছাড়া বেশিক্ষন থাকতে চায়না। এতক্ষন বাবার সাথে থাকলেও এখন তার মাম্মাকে চায়। পেটে ক্ষিদে থাকলে এমন চারপাশ তাকিয়ে মাকে খুজে।
নীলা কোলে নিতে চাইলে তার কোলেও গেলোনা। এতে আরহামের ভ্রু কুচকে গেলো – আরশান মা-বাবার পরে সবচেয়ে বেশি থাকে নীলার কাছে। নীলার সাথে তার বেশ ভাব – কারো কোলে না গেলেও ফুমাকে দেখলে নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে দেয়। তাই এখন নীলার কোলেও যায়নি দেখে আরহাম বুঝে গেলো তার ছেলের মাকে চায়। নিশ্চয়ই ক্ষিদে পেয়েছে। সে শাইনা কে জিজ্ঞেস করলো –

“আরশান সকালে কি খেয়েছে?”
“কিছুই খায়নি সকালে।”
“লিশা সেরেলাক খাইয়ে যায়নি?”
“না। আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে বিধায় তাড়াহুড়ো করে কলেজ চলে গেলো। নিজেও খায়নি কিছু।”
“আলিশা যাওয়ার আগে দুধ খাইয়েছিলো।” (নীলা)
“১৬ মাসের বাচ্চার কি শুধু মায়ের দুধে হয়? এখন নানুভাইয়ের সলিড খাবারের প্রয়োজন। এই মেয়েটাকে কতবার বলি সলিড খাবারের অভ্যাস করাতে কিন্তু কানেই তুলেনা। আজ আসুক।” (আয়শা)
“আহা আয়শা। সারাদিন মেয়েটাকে বকাবকি করিস কেন? ও কি কম চেষ্টা করে? আমাদের আরশানই তো সলিড খাবার খেতে চায়না। যা একটু খায় তা সেরেলাক।”
“থামো তোমরা। কি শুরু করলা? আমি সেরেলাক বানিয়ে আনছি।” বলেই নীলা চলে গেলো কিচেনের দিকে।
একটু পর বাচ্চার বাটি হাতে ফিরে আসলো নীলা।
সবাই খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও ডোরা একটুও মুখে তুলেনি খাবার। বাবার হাতে ২ চামুচ খেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
তাই আর কেউ চেষ্টা করেনি খাওয়ানোর।

আরহামের বারবার কল আসছে – আজ তার ভার্সিটি যেতে হবে। গ্রুপ প্রজেক্টের কাজ বাকি আছে। সকাল ৯ টায় যাওয়ার কথা থাকলেও আরশানের জন্য ডিলে করেছে। আরাফ কে বলেছে সামলে নিতে।
আলিশার এতক্ষনে চলে আসার কথা থাকলেও এখনো আসেনি। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
আরহাম অনেকবার কল দিয়েছে কিন্তু ফোন বন্ধ। এই মেয়েটা নিশ্চিত আজও চার্জ না দিয়ে মোবাইল নিয়ে গেছে।
আরহাম এবার ড্রাইভার কে কল দিয়ে জানতে পারলো আলিশার ক্লাস অনেক আগেই শেষ হয়েছে এবং সে এখন তার ফ্রেন্ডদের সাথে বৃষ্টি বিলাশে ব্যাস্ত।
১ ঘন্টা পর…
আরশান বাবার কাধে মাথা রেখে গলা জড়িয়ে আছে। আরহাম তাকে নিয়ে রুমের ভিতর হাঁটাহাঁটি করছে।
একটু আগে নীলার কাছে থাকলেও এখন সে আরশাদ এবং বাবাদের লাঞ্চ দিতে অফিস গিয়েছে।

“বা..ব্বা…”
“এইতো বাবা আছি।”
“মা..ম্মা মাম দাবো।”
“আচ্ছা নিয়ে যাবো।”
আরশান আবারও চুপ হয়ে গেলো।
একটা স্মেল নাকে এসে ঠেকতেই আরহাম ছেলের ডায়পার চেক করে দেখলো – সে শিশি করেছে।
আরহাম ছেলেকে বেডে শুইয়ে ডায়পার চেঞ্জ করে দিতে দিতে বললো – “এই পটকার বাচ্চা।”
“পতকা পতকা”
“হ্যাঁ তুই পটকা।”
“দোরা পতকা বা..ব্বা পতকা।”
আরহাম ছেলের মুখে নিজেকে পটকা শুনে তার পশ্চাৎদেশে আলতো চড় মেরে তেতে বললো – “অসভ্য ছানা। বাপকে পটকা বলিস? একটা মাইর দেবো।”
“অসভ বা..ব্বা অসভ দোরা।”
এতটুক বাচ্চা বাপের মুখে মুখে তর্ক করছে দেখে আরহাম ফের তেতে কিছু বলার পূর্বেই রুমে জুবুথুবু ভেজা অবস্থায় আগমন ঘটলো আলিশার। এসেই ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে মেরে তড়িঘড়ি করে দরজা আটকে দিলো সে – আয়শা তাকে ভেজা অবস্থায় দেখলে মাইর একটাও নিচে পড়বেনা।
মাকে দেখতে পেয়েই ডোরা খুশিতে হাত-পা দাপাদাপি শুরু করলো। হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কোলে যাওয়ার জন্য।

“মাম..ম্মা তোলে দাই..”
আলিশা ডোরাকে দেখা মাত্রই হেসে ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিলো কিন্তু ভেজা শরীরে কোলে নিলোনা।
“আমার সোনা বাচ্চা। মাম্মা মিসড ইউ।”
বলেই আলিশা নিজের ভেজা কলেজ ড্রেসের ক্রস বেল্ট খুলতে উদ্যত হলো।
“এতো দেরি হলো কেন?”
আরহামের প্রশ্নে আলিশার নজর গেলো সেদিকে। যে এখন রাগী দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তারই দিকে।
“ক্লাস দেরিতে শেষ হলো তাই।”
“শরীর ভেজা কেন?”
“গাড়িতে উঠার সময় ভিজে গিয়েছে।”
“এক থাপ্পড়ে গাল ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব। মিথ্যা কথা শিখেছিস?”
আরহামের গর্জনে আলিশার হাত থেমে গেলো।

“কি..কি মিথ্যা?”
“ক্লাস টাইমলি শেষ হয়েছে এবং তুই ইচ্ছাকৃত ভাবে সবার সাথে বৃষ্টিতে ভিজেছিস।”
নিজের চুরি ধরা পড়াতে আলিশা চোখ খেচে বন্ধ করে নিলো। আরহাম এসব কেমনে জানে?
“বৃষ্টিতে কেন ভিজেছিস? জানিস না তোর ছোট বাচ্চা আছে?”
“সবাই ভিজছিলো তাই আমিও…”
“সবার বাচ্চা আছে?”
আলিশা দুদিকে মাথা নাড়ালো।
“তাহলে সবাই যা করবে তোরও কি তাই করা লাগবে? এখন যদি আরশানের ঠান্ডা লাগে?”
“লাগবেনা। আমি খেয়াল রাখবো।”
আরহাম এবার আলিশার উপচ থেকে নিচ স্কেন করলো।
সাদা কলেজ ড্রেস ভেজার কারনে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। ইনারের কিছু অংশ দৃশ্যমান।”
“বেয়াদব।”
“আবার কি হলো?”
“এই ভেজা শরীরে ছেলেদের সামনে ছিলি? লাজলজ্জা কি সব বয়ে গেছে?”
“না না..কোনো ছেলে ছিলোনা। শুধু দিহান আর মিথি।”
“দিহান মেয়ে?”
“না..ছেলে।”
“ও দেখেনি তোকে এভাবে?”

“ও আমার ভাই আরহাম।”
“আমিও তোর ভাই ছিলাম এখন বাচ্চার বাপ।”
আলিশা চুপ করে আছে।
আরহাম এসে তার চোয়াল শক্ত করে ধরে হিসহিসিয়ে বললো – “বেহায়ার মতো শরীর দেখানো কবে থেকে শুরু করলি?”
“ব্যাথা পাচ্ছি আমি। ছাড়ো।”
আরহাম হাত সরালেও তার রাগ একটুও কমেনি।
“আর কোনোদিন যাতে আমি না দেখি বাইরে থেকে ভিজে এসেছিস।”
আলিশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
“কি বললাম শুনতে পেরেছিস?”
“হুম।”
আলিশার চোখ টলমল করছে।

“ফ্রেশ হয়ে আয়। হেয়ার ড্রাইয়ার দিয়ে চুল শুকিয়ে নিবি। আমার ছেলের যাতে ঠান্ডা না লাগে।”
আলিশা চলে গেলো ওয়াশরুমে।
আরহাম ডোরাকে কোলে নিয়ে ব্যালকনি গেলো।
ডোরা এখন কিছুতেই বাবার কোলে থাকবেনা। তার মাকে চায়। এটা দেখে আরহাম বললো –
“মির্জাফরের বংশধর। এতক্ষন বাপের কাছে ছিলি এখন যেই মা এসেছে আর বাপকে ভুলে গেলি?”
নিজের কথায় আরহাম নিজেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো – সে কি কোনোভাবে নিজেকে মির্জাফর দাবি করলো? কারন এই ছোট মরিচ তো তারই বংশধর।
তার ভাবনার মাঝে আলিশা ফ্রেশ হয়ে এসেছে। এসেই ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করলো।
“আমার জানবাচ্চা।”
ছোট্ট ডোরাও নিজের গুলুমুলু হাত দিয়ে মায়ের চুল টেনে আদর করছে।
আলিশা ডোরার ফোলাফোলা গালে চুমু খেলে ডোরাও মায়ের অনুকরণ করে তার গালে লালা লাগিয়ে আদর করলো।
“আমার বাচ্চা আদর দিয়েছে মাম্মাকে?”
“আডর মা..ম্মা আড..র।”
আলিশা হেসে বুকে জড়িয়ে নিলো তাকে।
আরহাম মা-ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলো এতক্ষন কিন্তু আরাফের কল আসতেই তার হুশ ফিরলো।
“ডোরাকে খাইয়ে দে। সকাল থেকে কিছু খায়নি। আমি ভার্সিটি যাচ্ছি। তোর জন্য এমনিতেই অনেক দেরি হয়েছে।”

বলেই আরহাম বের হয়ে গেলো। তাড়া আছে বলে আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিলো যাতে আলিশা আসলেই বের হতে পারে।
আলিশা ছেলেকে ফিড করাতে শুরু করলো। ডোরা খেতে খেতেই মায়ের বুকে ঘুমিয়ে পড়লো।
হঠাৎ দরজা নকের আওয়াজে আলিশা সেদিকে তাকালো।
“কে?”
“নীলা, আসতে পারি পুতুল?”
আলিশা ডোরাকে সরিয়ে নিজের কাপর ঠিক করে বললো –
“নীলাপু, ভেতরে এসো।”
নীলা এসে দেখলো ডোরা ঘুমিয়ে পড়েছে আর আলিশা তাকে ঠিকভাবে শুইয়ে দিচ্ছে।
“আরহামকে বাহিরে যেতে দেখলাম তাই ভেবেছি তোর সাথে এসে আড্ডা দেই।”
“ভালো করেছো নীলাপু। একা একা বোর হচ্ছিলাম।”
নীলা ডোরার দিকে তাকিয়ে বললো –
“না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছে?”
“দুধ খেয়েছে। এখন অন্যকিছু দিলে খেতোনা।”

“সলিডের অভ্যাস করাবিনা ওকে? তুই না থাকলে কিছুই খেতে চায়না।”
“চেষ্টা কি কম করি? কিন্তু দুষ্টটা কিছুই মুখে দিতে চায়না। যা একটু মুখে তুলে সেটাও বহুকষ্টে।”
“এখনো ছোট। আরেকটু বড় হলে নিজ থেকেই চাইবে।”
“তাই যেন হয়। আজ লাঞ্চ দিতে যাওনি অফিসে?”
“গিয়েছিলাম। একটু আগেই ফিরেছি।”
“প্যাকিং ডান?”
“শুরুই তো করলাম না। তুই করেছিস?”
“না। মিনি গন্ডারের বাপকে দিয়ে করাবো সব কাজ।”
আলিশার সম্বোধন শুনে নীলা হেসে ফেললো।
“আমি হেল্প করে দেবো? তাহলে আমার ভাইয়ের কষ্ট একটু কম হবে।”
“একদমি না। আজ অনেক বকেছে আমায় তাই এর জন্য শায়েস্তা করবো।”
“আচ্ছা।”

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৮

নীলার ফোনে কল এসেছে আরশাদের। তাই সে যাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালো।
“আমি এখন আসি। তুই সব লিস্ট করে ফেল কি কি নেয়া বাকি আছে। কাল সকালের ফ্লাইট। হাতে সময় নেই।”
“আচ্ছা…কল ধরো, আমার ভাই সেই কবে থেকে কল দিচ্ছে।”
নীলা কল রিসিভ করতে করতে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।

তোমার আমার গল্প পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here