তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৭
আশফিয়া হিয়া
রুদ্ধর রক্তলাল চোখের দিকে আরু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। নিচের দিকে চোখ রেখে কাচুঁমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুদ্ধ তার হাত চেপে ধরল। আরু চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। রুদ্ধ তাকে টেনে নিজের রুমে নিয়ে যেতে লাগল। ইয়াজ নিচে যাচ্ছিল তাদের দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তবে রুদ্ধর শক্ত মুখভঙ্গি দেখে আর কিছু বলার সাহস পেল না। পাশ কেটে দাঁড়াল। আরু ইয়াজকে কিছু বোঝাতেই সে মাথা নেড়ে না বোঝাল। অথাৎ রুদ্ধর থেকে তাকে ছাড়ানোর সাহস তার হবে না।রুদ্ধ তাকে নিজের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে গেল।
রুমা বেগমের বোনের মেয়ে নিধি। এবার অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। রুহানির থেকে বছর দুয়েক বড় সে। আজ রুমা বেগমকে ফোন করেছিল। তার পরীক্ষা শেষ হয়েছে তাই কটাদিন এখানে এসে কাটাবে ভেবেছে। রুমা বেগম তাকে বিয়ে বাড়ি যাবার জন্য একেবারে প্রস্তুতি নিয়েই আসতে বলেছে। এখান থেকে একেবারে বিয়ে বাড়িতেই নিয়ে যাবে। তারা তো কেউ বাড়িতে থাকছে না। এবার রুদ্ধর সাথেও কথা বলবে ভেবেছেন। তার বোন ও বোন জামাই অনেকদিন ধরেই একটা প্রস্তাব রেখেছেন। বিয়ে বাড়ির ঝামেলাটা মিটে যাক এরপরেই তিনি রুদ্ধর সাথে কথা বলবে ভেবেছেন। তার ছেলের মতের বিরুদ্ধে কিছুই হবে না।
রুদ্ধ আরুকে রুমে এনে ছুঁড়ে ফেলার মতো হাত ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে দিল। আরু নিজেকে সামলে নিল। রুদ্ধ তার দিকে এগিয়ে হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করল।
– ” খুব সাহস বেড়ে গিয়েছে তাই না?”
আরু চুপ করে রইল।
– ” কি ব্যাপার মুখে কথা নেই কেনো?” তার উচ্চ স্বরের ধমকে আরুর হৃদপিণ্ড ধক করে উঠল।
– ” কি..কি করেছি?
রুদ্ধ সামনে থেকেই তার হাত দুটো পিঠের সাথে জোড়ে চেপে ধরল। আরু ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠল।
– ” বিয়ে বাড়ি গিয়ে ছেলেদের সাথে নাচা- নাচি করবি? সেটা আবার এখন থেকেই ঠিক করে নিচ্ছিস।”
– ” ও..ওটা তো এমনি বলেছি। আর বাইরের ছেলেদের সাথে তো নাচবো বলিনি।”
– ” তাহলে কি বলেছিস?” রুদ্ধ তার হাত আরও শক্ত করে চেঁপে ধরল।
– ” আহ্ ব্যাথা পাচ্ছি প্লিজ ছাড়ুন। আমি সেটা মজা করে বলেছিলাম আর কখনো বলবো না সত্যি বলছি। আরু ব্যাথায় গড়গড় করে কথাগুলো বলে ফেলল।
রুদ্ধ তাকে ছাড়ল না বরং তার আরও কাছাকাছি টেনে নিয়ে এল।
– ” শোন আরু মজা করতে গিয়েও যদি কখনো কোনো ছেলের ব্যাপারে জড়াতে দেখি আই স্যায়ার আই উইল কিল ইউ।”
– ” কখনো এমন করবো না ছাড়ুন না প্লিজ।”
আরু সাথে সাথে প্রতিওর করল। এখন ছাড়া পাওয়াটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য এত জোড়ে কেউ হাত চেঁপে ধরে?উফফ ব্যাথায় হাত ছিঁড়ে যাচ্ছে।
রুদ্ধ তার হাত ছেড়ে দিল।
– ” বিয়ে বাড়িতে যদি তোকে বেশি লাফালাফি করতে দেখি তাহলে তোর চট্টগ্রাম যাবার চোখ আমি মেটাবো।”
– ” আপনি দেখবেন কি করে রুদ্ধ ভাই? আপনি তো চট্টগ্রাম আমাদের সাথে যাচ্ছেন না।”
– ” আমি যাচ্ছি না বলে খুশি হয়েছিস?”
– ” না না তা কেনো হবে? সবাই তো চাচ্ছে আপনি আমাদের সাথে চলুন।”
রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে বলল,
– ” আর তুই?”
– ” আমি..আমিও।”
রুদ্ধ কিছু বলল না। তবে আরু দরজা পর্যন্ত যেতেই রুদ্ধ আবার তাকে ডেকে উঠল। শ্বাসানোর স্বরে বলল,
– ” আর রোহানের থেকে দূরে দূরে থাকবি। বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই। মাথায় থাকবে?’
– ” হুম।”
– ” গুড যেতে পারিস।”
আরু উল্টো দিক ফিরে তাকে ব্যাঙ্গ করল,
– “গুড যেতে পারিস হু্হ। সে হাত ডলতে ডলতে বেরিয়ে গেল।
ঘড়ির কাটায় এখন বিকেল পাঁচটা। বাড়ির সব মেয়েরা তৈরি হয়ে নিচে নামল। নিজেদের জন্য কেনাকাটা করতে শপিং এ যাবে তারা। রুদ্ধ ইয়াজ আগে থেকে সোফায় বসা ছিল। তারা তিনজন নিচে আসতেই রুদ্ধর নজর আরুর দিকেই পড়ল। আরু ডার্ক রেড কালারের হালকা কাজ করা থ্রিপিস পড়েছে সে। চুলগুলো ঢিলে করে বেণী করেছে। ঠোঁটে ডার্ক রেড কালার লিপস্টিক। রুদ্ধ আরুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল। সাথে সাথে তা মিলিয়েও গেল।
রুদ্ধ ড্রাইভ করছে। ইয়াজ তার পাশে বসেছে। ব্যাক সিটে তিনবোন একসাথে বসেছে। আরু জানালার পাশে বসেছে। তিনজন মিলে গাড়িতে ওঠার পর থেকে বকবক শুরু করেছে। আরু কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বার বার রুদ্ধর দিকে তাকাচ্ছে। মানুষটা আজ ব্ল্যাক শার্ট পড়েছে। কে বলেছিল তাকে ব্ল্যাক শার্ট পড়তে? তার বুকের ভেতরেটা কেমন করছে এর দায় কে নেবে? তাদের তিনজনের বকবক শুনে বিরক্ত হয়ে রুদ্ধ মৃদ্যু ধমক দিল। ব্যাস তিনজনই চুপ হয়ে গেল। রুদ্ধ লুকিং গ্লাসটা কিছুটা বাঁকা করে দিল। যেটা দিয়ে সরাসরি আরুকে দেখা যাচ্ছে। ড্রাইভ করার পাশাপাশি সে একটু পর পর লুকিং গ্লাসের দিকে নজর রাখছে।
বিয়েরদিন মেয়েরা লেহাঙ্গা পড়বে ঠিক করেছে। সেই অনু্যায়ী তারা লেহেঙ্গা দেখতে লাগল। আরু লেভেন্ডার কালারের লেহাঙ্গাটায় পছন্দ করল। এর অবশ্য একটা কারণ আছে। রুদ্ধ কিছুদিন আগেই নিজের জন্য লেভেন্ডার কালারের কটিসহ পাঞ্জাবি কিনেছিল তার রুম ঘাটার সময় সে দেখেছিল সেটা। রুদ্ধ যদি বিয়েতে যায় তাহলে এটায় পড়বে নিশ্চয়? সেই ধারনা থেকেই এই লেহেঙ্গাটা নিয়ে নিল। তাছাড়া এটা তার পছন্দও হয়েছে ভীষন।
আরোও টুকটাক কিছু কেনা – কাটা করে তারা একটা রেস্টুরেন্টে এসে বসল। রুহানির থেকে শুনে ফারিশও রেস্টুরেন্টে এ চলে এল। রুদ্ধ ও আরু পাশাপাশি বসেছে। না চাইতেও রুদ্ধর দৃষ্টি বারবার আরুর ঠোঁটের দিকে পড়ছে। কেমন যেন হাঁসফাঁস করছে সে। তার এই অস্থিরতা আরু ঠিকই টের পেল। সে নিচু স্বরে বলল,
– ” কি হয়েছে?”
– ” এত ডার্ক লিপস্টিক দিয়েছিস কেনো?”
– ” এই ড্রেসটার সাথে মানাচ্ছিল তাই তো দিয়েছি।”
– ” আর দিবি না।”
আরু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কি বলে এই লোক এখন তার পছন্দের লিপস্টিক ও দিতে পারবে না? এটা সে কিছুতেই মানবে না।
– ” কেনো?”
– ” আমি বলেছি তাই।”
– ” সেটা কি করে হয় এটা আমার খুব পছন্দের লিপস্টিক।”
– ” বিয়ের পর যত খুশি লাগাতে পারবি। তবে এখন নয়।”
আরু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তবে রুদ্ধ তার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে থামিয়ে দিল। আরু চুপ হয়ে গেল।
আহি নিজের জন্য চা আনতে নিচে গিয়েছিল। চা নিয়ে নিজের রুমে আসতেই দেখল ইয়াজ বেডের ওপর বসে আছে। তাকে দেখেই আহির ভ্রু কুঁচকে গেল। তার রুমে এখন কি করতে এসেছে। নিশ্চয় কোনো মতলব আছে৷ আহিকে দেখেই ইয়াজ তার হাত থেকে ছোঁ মেরে চায়ের কাপটা নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিল। আহির মুখটা কাদোঁকাদোঁ হয়ে গেল।
– ” তুমি আমার চা টা খেয়ে নিলে কেনো? নিজে বানিয়ে খেতে পারো না?”
– ” এমন ভাব করছিস যেন নিজে বানিয়েছিস অকর্মার ঢেঁকি একটা।”
– ” তুমি নিজে মনে হয় খুব কাজের ছেলে।”
– ” থাক ওসব বাদ দে কাজের কথায় আসি।”
আহি ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,
– ” কি?”
– ” তোর বান্ধবী আছে না? কি যেন নাম শ্রয়া নাকি তার নাম্বারটা দে তো।”
আহির ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল,
– ” ওর নাম্বার নিয়ে তোমার কি কাজ?”
– ” তুই বুঝবি না ছোট মানুষ।
রাগে আহির গাঁ পিওি জ্বলে উঠছে কেনো সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ১৬
– ” আমার রুম থেকে বের হও।”
– ” নাম্বারটা দে চলে যাচ্ছি। তোর রুমে থাকতে আসিনি।”
আহি তাকে হাত ধরে টেনে রুম থেকে বের করে দিয়ে ঠাস করে দরজা আটকে দিল। ইয়াজ দরজার ওপাশে হেঁসে ফেলল। সে তো জ্বালাতেই এসেছিল। এইসব না্ম্বার টাম্বার ছুঁতো মাএ।
