Home তোমার নামের রোদ্দুরে তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৩

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৩

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৩
আশফিয়া হিয়া

আগামীকাল আহি ও ইয়াজের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে পড়ানো হবে। আজ তাদের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। ঘড়িতে এখন প্রায় দুপুর বারোটার কাটায়। ইয়াজকে হলুদের গোসল করানো হবে তাই তাকে লুঙ্গি ও সেন্টু গেঞ্জি পড়ানো হয়েছে, ইয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ফারিশ ও রুদ্ধও একই পোশাক পড়েছে।
আরু আজ সকাল থেকেই ভীষণ ব্যস্ত নিজের ঘরে যাওয়ার সময়টুকু পায়নি, শুধু ফাঁকে ফাঁকে বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে দিয়েছে। রুদ্ধ নিজেই রুদ্র ও আদ্রিতাকে তৈরী করে দিচ্ছে ও ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে, সকাল থেকে সে একবারও আরুকে দেখেনি। ডেকে পাঠিয়েও কোনো লাভ হয়নি, আরু একটু পর আসছি বলেও আর আসেইনি। রুদ্ধ রুদ্রকেও নিজের মতো একই পোশাক পড়াল। লুঙ্গি ও সেন্টু গেঞ্জি বাচ্চাটাকে দেখতে আরও অনেক বেশি মিষ্টি লাগছে এখন। রুদ্র ঘুরে ঘুরে মুখ দিয়ে বহু কষ্টে বলল,
– ‘ বাব্বার মও লাগচে। ‘ রুদ্ধ ছেলের আদুরে কথায় হেসে ইচ্ছে মতো কতগুলো চুমু খেয়ে ছেড়ে দিল। ছেলেকে সিড়ি দিয়ে নামিয়ে দিয়ে বলল,
– ‘ তোমার মাম্মামকে ডেকে আনো তো বাবা।’
– ‘ আওা।’

রুদ্র দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্ধ ঘরে এসে কন্যার দিকে দেখল সে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। ভাইকে তার আগে তৈরী করে দিয়েছে সেটা নিয়েই সে রেগে আছে। রুদ্ধ মেয়ের রাগ দেখে হাসল। মেয়েকে টেনে তার ফুলো ফুলো গাল দুটোতে চুমু খেল। আদ্রিতা মুখটা গম্ভীর করেই রাখল। রুদ্ধ তাকে সুড়সুড়ি দিতেই আদ্রিতা খিলখিল করে হেসে দিল। রুদ্ধ নিজেও হেসে আলমারি থেকে মেয়ে ও মেয়ের মায়ের জন্য আনা শাড়ির প্যাকেট বের করল। রুদ্ধ দুজনের জন্যই একই রকমের বাসন্তী রঙের শাড়ি এনেছে। রুদ্ধ শাড়ি বের করে মেয়েকে পড়িয়ে দিতে লাগল। আদ্রিতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে, রুদ্ধর কাছে সে একেবারেই শান্ত তবে রুদ্ধর জায়গায় আরু হলে, আরুকে এখন পুরো বাড়ি ছুটতে হত শাড়িটা পড়ানোর জন্য। শাড়ি পড়ানো শেষ হতেই আদ্রিতা পুরো বিছানা জুড়ে লাফাতে লাগল। রুদ্ধ বলল,
– ‘ আস্তে মা পড়ে যাবে তো।’
আদ্রিতা ঘুরে ঘুরে বলল,
– ‘ আমাওে তেমন লাগচে বাব্বাহ?’
রুদ্ধ অধর কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
– ‘ আমার মাকে পুরো রাজকন্যার মতো লাগছে।’

রুদ্র কখন থেকে ছোট্ট শরীর নিয়ে আরুকে খুঁজে চলেছে। হাঁটতে গিয়ে কয়েকবার পড়েও গিয়েছে, তবুও তার মাকে খুঁজে বের করতে হবে। বাড়িতে প্রচুর আত্মীয় – স্বজন গিজগিজ করছে। রুদ্রকে যেই দেখছে ওমনি আদর করছে, গালে চুমু দিচ্ছে, যেটাতে সে ভীষণ বিরক্ত হচ্ছে। ইয়াজের বিয়ে উপলক্ষে তার কিছু বন্ধু – বান্ধব এসেছে, তারা ড্র‍য়িং রুমে বসে ছিল। রুদ্রকে দেখতে পেলেই একজন কলে তুলে নিল ইচ্ছে মতো গাল টিপে চুমু খেল। এমন কিউট গুলুমুলো বাচ্চা পেলে কার না আদর করতে ইচ্ছে করে। রুদ্র এবার আর সহ্য করতে পারল না, মাম্মাহ – পাপ্পাহ ছাড়া কেউ তাকে চুমু দিবে এটা তার একদমই পছন্দ নয়। রুদ্র ঠোঁট উল্টে জোরে চিৎকার দিয়ে কেঁদে দিল। বাকিরা সব ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে বাচ্চাটার কান্না দেখে। আরু বাগানে কাজে ব্যস্ত ছিল, ছেলের কান্নার শব্দ তার কান অবদি পৌছে গেল। সে দৌড়ে বাড়ির ভেতর চলে এল। ইয়াজের সেই বন্ধুর কোল থেকে রুদ্ধকে নিয়ে নিল। মায়ের কোলে যেতেই রুদ্র কাঁধে মাথা ফেলে রাখল। আরু তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,

– ‘ কি হয়েছে আমার বাবাটার ব্যাথা পেয়েছো কোথাও?’
রুদ্র ফুঁপিয়ে বলল,
– ‘ ছব্বাই সুধু চুমা দিচ্চে। ‘ বলেই আবার কেঁদে দিল। ইয়াজের সেই বন্ধুটা শব্দ করে হেসে দিল। আরু নিজেও হাসল ছেলেটা দুলিয়ে দুলিয়ে ঠান্ডা করল। ছেলেটা বলল,
– ‘ আপনার হাসিটা খুব সুন্দর। আরু অপ্রস্তুত হলো ভীষণ ছেলেকে নিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে নিল।
ইয়াজের বন্ধু আরুকে কখনো দেখেনি তবে বাড়ির প্রত্যেকের কথাই শুনেছে। সে ভেবেছে মেয়েটা ইয়াজের কোনো আত্মীয় হবে। আরুকে দেখে তার চোখে এক রকমের মুগ্ধতা কাজ করছে। ইচ্ছে করছে শুধু মেয়েটাকেই দেখতে। আরু ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত তার এদিকে খেয়াল ছিল না কোনে। ছেলেটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

– ‘ আমি নিহাদ ইয়াজের বন্ধু। আপনি ইয়াজের সম্পর্কে কি হোন? ‘
আরু কথা বলতে না চাইলেও ভদ্রতার খাতিরে বলল,
– ‘ বোন।’
নিহাদ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ‘ কেমন বোন জানতে পারি? আমি তো জানি ওর দুটো বোন রয়েছে যাদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে আপনাকে দেখে তো তেমন মনে হচ্ছে না।’
আরু জবাব দেয়ার পূর্বেই ওপর থেকে বজ্র কন্ঠে নিজের নামে ডাক শুনে কেঁপে উঠল মেয়েটা। চমকে উপরে তাকাল রুদ্ধ রক্তলাল চোখে মেয়েকে কোলে নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। আরু ঢোক গিলল, কি দরকার ছিল এই ঝামেলারটার সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার এখন রুদ্ধকে কি করে সামলাবে সে? আরু এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে রুদ্রকে কোলে নিয়েই ওপরে ছুটল।

রুহা আহির পাশে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। সে এখন অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। তার গাল ফুলানোর কারণ আহি তাকে ইয়াজের সঙ্গে প্রেম করতে বারণ করেছিল, বলেছিল ইয়াজের থেকেও ভালো ছেলে এনে দেবে তার জন্য অথচ এখন দেখো নিজেই ইয়াজ ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করে বসে আছে। বিয়েও করে নিচ্ছে দুজন। আহি তার গাল ফুলানো দেখে বলল,
– ‘ এইভাবে গাল ফুলিয়ে বসে আছিস কেনো? আমার চুলটা বেঁধে দে না এই আপুটা কোথায় যে গেল। আমার কোনো কাজে ওকে পাওয়ায় যায় না।’
– ‘ গাল ফুলাব না তো কি কি করবো, তুমি নিজেই আমাকে বলেছ ইয়াজ ভাইকে ভুলে যেতে আর এখন নিজে বিয়ে করে নিচ্ছো। তুমি আমাকে এভাবে ধোঁকা দিতে পারলে? আমার ক্রাশকে এভাবে দুলাভাই বানিয়ে দিলে।’
আহি তার দু গাল টিপে দিয়ে বলল,

– ‘ ওরেএএ আমার বাচ্চাটা, এটা তো এক দিকে ভালোই হয়েছে বল, তোর সাইয়্যা হয়নি তো কি হয়েছে ভাইয়া তো ঠিকই হয়েছে তাই না, এটা বলে অন্তত মনকে শান্তনা দিতে পারবি।’
– ‘ ধ্যাঁত তুমি আমার মনটায় ভেঙে দিয়েছো। ‘ সে মন খারাপ করে বেডের এক পাশে বসে রইল।
রুহানি সবেই আহির রুমে এল। আহি তাকে দেখেই এক চিৎকার দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রুহানি হেসে বোনকে নিজের সঙ্গে আগলে নিল। আহি তাকে ছেড়ে অভিমানি স্বরে বলল,
– ‘ তোমার এতদিনে আসার সময় হলো আপু? আমি তোমাকে কতটা মিস করেছি জানো?’
রুহানি বোনের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
– ” সরি সোনা ব্যস্তটার কারণে আগে আগে আসতেই পারিনি। তবে এবার অনেকদিন থাকার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। এবার আমরা মা – মেয়ে মিলে তোদের প্রচুর জ্বালাবো।’

– সত্যিইই তো?’
– ‘ তিন সত্যিইইই।’ আহি খুশি হয়ে গেল। রুহানির ফুলে উঠা পেটে হাত বুলিয়ে বলল,
– ‘ পুচকু কেমন আছে? আর মিশি কোথায় ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এল না এটা হতে পারে?’
– ‘ ভালো। মিশি এসেই তার ভাই – বোনদের সঙ্গে দেখা করতে চলে গিয়েছে৷ ‘ রুহানি দ্বিতীয়বারের মতো আবারও মা হতে চলেছে৷ তার এখন ছয়মাস চলছে। তার ও ফারিশের একমাএ কন্যা সন্তান মিশি যে কিছুদিন আগেই তিনবছরে পা দিয়েছে।
রুহানি আহিকে খুঁচিয়ে বলল,
– ‘ তোরা কি করেছিস বল তো, যারা সারাদিন ঝ*গড়া নয়তো মা*রামা*রি করে দিন কাটিয়েছে, তাদের আজ বিয়ে এটা আজও সম্ভব?’
রুহা ঝট করে বিছানা থেকে দাঁড়িয়ে গেল৷ রুহানির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলল,
– ‘ আমিও তো এটায় বুঝতে পারছি না কিভাবে কি হলো। আচ্ছা আপু তোমাদের কতদিনের রিলেশন ছিল?’
আহি লজ্জা পেয়ে মিনমিন করে বলল,

– ‘ ছ..ছয় বছর।’
– ‘ ছয় বছর? রুহা মাথায় হাত দিয়ে বেড এ বসে পড়ক। রুহানি নিজেও বেশ অবাক হয়েছে,এতগুলো বছর ধরে তাদেরই নাকের ডগা দিয়ে দুটো মানুষ প্রেম করে গিয়েছে আর তারা এক বিন্দুও বুঝতে পারেনি? রুদ্ধ ও আরুর বিষয়টা তো সে আগেই বুঝে গিয়েছিল। রুদ্ধর প্রতি আরুর পাগলামি ও আরুর প্রতি রুদ্ধর কেয়ার পসেসিভ আচরণ দেখে সবটায় বুঝতে পেরেছিল। অথচ এরা? রুহানি বলল,
– ‘ আমাদের সকলে সামনে ঝ *গড়া করে তলে তলে ঠিকই প্রেম করে বেরিয়েছিস দুজন তাই না? ভাবা যায় আর এটা আমরা জানতেও পারি নি।’
আহি লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল। রুহা মুখটা ফুলিয়ে আহির চুল বেঁধে দিতে লাগল। আহি তার গালে হাত রেখে বলল,
– ‘ থাক মন খারাপ করিস না, তোর জন্য একটা ভালো ছেলে খুঁজে দিব, ইয়াজের থেকেও ভালো হবে সে।’
– ‘ হয়েছে লাগবে না, আমি প্রেমই করবো না, সোজা বিয়ে করে ফেলব। ‘
– ‘ এইতো গুড গার্ল। ‘

আরু নিজেদের ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে বু*কে কয়েকবার ফুঁ দিয়ে নিল। ছেলেকে বিছানায় নামিয়ে দিল। রুদ্ধ ডিভানে বসে রাগে ফুঁসছে। চোখের ভাষা প্রচন্ড ঠান্ডা যেন ঝড় উঠার আগের পূর্বাভাস। আরুর দৃষ্টি রুদ্ধর ওপর থেকে সরে নিজের মেয়ের দিকে গেল। মনে মনে মাশাল্লাহ বলে মেয়েকে কোলে তুলে নিল। ড্রেসিং টেবিলের টুলে দাঁড় করিয়ে, হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক বের করে মেয়ের ঠোঁটে দিয়ে দিল। বাচ্চাটা হাসছে। আরু তার গালে চুমু খেলে বলল,
– ” এইবার সাজ কম্পিলিট হয়েছে।’
আদ্রিতা মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
– ‘ তমার মও লাগচে?’
আরু হেসে বলল,
– ‘ আমার থেকেও সুন্দর লাগছে, একদম পরীর মতো।’

এর মাঝেই মিশি মামু ডাকতে ডাকতে ভেতরে চলে এল। রুদ্ধ তাকে দেখে রাগটুকু গিলে হাসিমুখে কোলে নিল অনেক আদর করল। আরুও কোলে নিয়ে আদর করে দিল। এরপর তিন ভাই বোন খেলতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আরু ঢোক গিলল। রুদ্ধ দরজার সামনে গিয়ে দেখল ফারিশ রুহানির ঘর থেকে নিচের দিকে যাচ্ছে রুদ্ধ ছেলে – মেয়েকে ওর কোলে দিয়ে বলল সাবধানে নিচে নিয়ে যেতে। ওরা যেতেই রুদ্ধ দরজা লক করে দিল। আরুর দিকে এক পা এক পা করে এগোতে লাগল। আরু পেছাতে গিয়ে বেডের সঙ্গে এক পা বেঁধে বেডেই পড়ে গেল। ওঠার সুযোগটুকু তাকে দেয়া হলো না তার আগেই রুদ্ধ তার ওপর নিজের ভার ছেড়ে হাত দুটো বেডের সঙ্গে চেপে ধরল। ঠান্ডা স্বরে বলল,
– ‘ সকাল থেকে তোকে কতবার ডেকে পাঠিয়েছি?’
আরু আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ চা..চার পাঁচবার।’
রুদ্ধ তার হাতে আরও একটু বল প্রয়োগ করে বলল,

– বাহ্ কাউন্ট করাও হয়েছে, তাহলে না আসার কারণ?’
– ‘ কাজে ব্যস্ত ছিলাম ভেবেছিলাম কাজটা শেষ করেই একেবারে আসব।’
রুদ্ধ এবার নিজের রাগটা প্রকাশ করেই ফেলল, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ‘ যখন নিচে ঔই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলছিলি তখন তোর কাজ ছিল না তাই না? আমি কাছে ডাকলেই কাজের অযুহাত দেখাস। এর মানে আমার প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছে তাই তো?’
আরু অবাক স্বরে বলল,
– ‘ এসব কি বলছেন আপনি, আপনি আমাকে এই কথাটা বলতে পারলেন? ‘
– ‘ যেটা সত্যি সেটাই বলেছি, ওই ছেলেটা তোকে কি বলছিল?’
আরু মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। রুদ্ধর সেই কথাটাই মেয়েটা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে, যাকে এক পলক না দেখলে রাতের ঘুমটুকু হারাম হয়ে যায়, সেই মানুষটার প্রতি ওর বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছে এটা ওর শুনতে হলো। রুদ্ধ আরুর গাল শক্ত করে চেঁপে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
– ‘ কথা বল নয়তো এই মুহুর্তে আমি যেই কাজটা করবো তোর একটুও পছন্দ হবে না।’
– ‘ বলছিল ইয়াজের সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক। ‘ আরু না চাইতেও জবাব দিল। রুদ্ধর জেদ সম্পর্কে তার খুব ভালো করেই ধারণা আছে।

– ‘ তুই বলেছিস নি তুই আমার ওয়াইফ?’
আরু ঢোক গিলে বলল,
– ‘ বলার সুযোগ পাইনি, তার আগেই তো আপনি ওপর থেকে আমাকে ডাকলেন।’
– ‘ বাহ্ অসাধারণ, সেটা বলতে যাবি কেনো তাহলে প্রপোজাল কি করে আসবে? আমার দু দুটো বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছে এখনো তার পেছনে ছেলেরা লাইন মারার চেষ্টা করছে৷ ‘ আরু কিছু বলতে নিলে রুদ্ধ প্রচন্ড জোরে ধমক দিয়ে বলল,
– ‘ স্যাট আপ।’
আরু ওখানেই থেমে গেল। রুদ্ধ মেয়েটার ঠোঁট কামড়ে ধরল। বেশ অনেকক্ষণ পর ঠোঁট আগলা করে নিল। আরুর ঠোঁট ফুলে দিয়েছে অনেকটা। রুদ্ধ সেখানটায় হাত বুলিয়ে বলল,

– ‘ আজ এইভাবে এই ঠোঁট নিয়ে তুই পুরো বাড়িতে ঘুরে বেড়াবি। ঠোঁটে যেন কোনো লিপস্টিক পড়তে না দেখি। যদি আমার কথার অবাধ্য হয়েছিস তোর ঠোঁটের অবস্থা আরও বেশি বেহাল হবে।’ কথাটা বলে সে আরুর ওপর থেকে উঠে পড়ল। দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যেতে বিরবির করে বলল,
– ‘ ইচ্ছে করছে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখি, যাতে কোনো বি** নজর দিতে না পারে।’
আরু আয়নায় নিজের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাগ উঠলে রুদ্ধর মাথা ঠিক থাকে না যা নয় তাই বলে ফেলে। রাগ কমে গেলে উল্টো আরুকে জড়িয়ে ধরে ইচ্ছে মতো আদর করে সরি বলবে। আরু রুদ্ধ কথা শুনল না এভাবে এত মানুষের সামনে যাওয়া যায় নাকি? ওনার তো লজ্জা নেই তাই বলে আমারও লজ্জা থাকবে না? আরু ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক পড়ে নিল। পরনের শাড়িটা অনেকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছে সেটা ঠিক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ইয়াজের বিয়ে উপলক্ষে বাড়িতে রুদ্ধর বন্ধুরাও আছে। ফারিশ তুষার ও সাদমান বাগানে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে আজ অনেকদিন পর তারা একসাথে হয়েছে, সবাই এখন যে যার লাইফ নিয়ে ব্যস্ত থাকে তবে সময় বের করে একদিন হলেও তারা মিট করার চেষ্টা করে। তাদের সামনে হালকা কিছু নাস্তার আইটেম দেয়া হয়েছে।
ইয়াজ বন্ধুদের সঙ্গে নিজের ঘরে ছিল। বেলকণি থেকে তাদের দেখতে পেয়ে নিচে চলে এল। ইয়াজকে দেখে সবাই ওকে জড়িয়ে ধরে হাল – চাল জিজ্ঞেসা করল ইয়াজও হাসি – মুখে তার জবাব দিয়ে তাদের পাশে বসল। সাদমান ভ্রু তুলে বলল,
– ‘ এই জন্যই বলি আমার সন্দেহ কখনো বিফলে যায় না, আমি এদের ঝ*গড়া করতে দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম এদের মাঝে নিশ্চয় কোনো ঘাপলা আছে। ‘
ইয়াজ মাথা চুলকে হালকা হাসল। ফারিশ হেসে বলল,
– ‘ পুরো ভাইয়ের মতো হয়েছে, তলে তলে ঠিকই প্রেম করে বেরিয়েছে অথচ কাউকে বুঝতেই দিল না। ‘
তুষার বলল,

– ‘ ভালোবাসার মানুষকে গোপন রাখাও একটা ট্যালেন্ট যেটা তোরা বুঝবি না, ও ওর বাড়ির লোকের নাকের ডগা দিয়ে নিজের কাজিনের সঙ্গে প্রেম করেছে আর বাড়ির কেউ সেটা বুঝতেই পারেনি। অন্যদিকে এই গাঁধাকে দেখ ফারিশকে ইশারা করে বলল,
– ‘ বন্ধুর বোনের সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে পরের দিনই রুদ্ধর কাছে ধরা খেয়ে গিয়েছে। ‘ বাকিরা শব্দ করে হাসল। ফারিশ তুষারের পা বরাবর লাথি দিয়ে বলল,
– ‘ শালা আমরা তো তাও প্রেম করেছি তুই তো জীবনে একটা প্রেমও টিকাতে পারিসনি।’
তুষার তার মুখ চেপে ধরে বলল,
– ‘ ভাই আস্তে বল, আমার বউটা আশে – পাশেই আছে শুনতে পেলে আজ আর ঘরে ঢুকতে দেবে না।’
এর মাঝেই রুদ্ধ গটগট করে হেঁটে এসে ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়ল। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে ভীষণ রেগে আছে। ফারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ‘ কিরে রাগে এমন ফোঁস ফোঁস করছিস কেনো?’
রুদ্ধ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

– ‘ শালার কপাল আমার, আমার বউটার দিকে আমারই
হাঁটুর বয়সী সব ছেলেরা নজর দিচ্ছে। ‘
তার কথায় সাদমান ও তুষার হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেল। ফারিশ তাদের মতো না হাসলেও নিশব্দে হাসল। ইয়াজ নিজেও মিটিমিটি হাসছে। রুদ্ধ তাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই প্রত্যেকেই থেমে গেল। তবে ইয়াজ এখনো মিটিমিটি হাসছিল রুদ্ধ এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
– ‘ তোর হাসি আমি বের করছি দাঁড়া। বন্ধুদের বাড়িতে এনেছিস ভালো কথা ওদের জানিয়ে দিসনি কেনো এই বাড়িতে কার সঙ্গে তোর কি সম্পর্ক? তোর কোনো এক বন্ধু আরুকে লাইন মারার চেষ্টা করছিল, ওকে ভালো করে বুঝিয়ে দিবি আরু আমার ওয়াইফ এইদিকে যেন ভুলেও হাত না বাড়ায়।’
ইয়াজের হাসি তৎক্ষণাত বন্ধ হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে ভাবল তার কোন বন্ধু আরুকে লাইন মারতে চাইবে? ইয়াজ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল। রুদ্ধকে বলল,

– ‘ তুমি চিন্তা করো না ভাইয়া আমি দেখছি বিষয়টা। ‘ ইয়াজ লম্বা পা ফেলে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। কোন গাঁধা এই কাজটা করেছে সেটা তো জানতে হবে। বন্ধুর বিয়েতে এসে মেয়ে খুঁজে বেরাচ্ছে, আজ মেয়ে খুঁজা বের করবে সে।
ইয়াজ চলে যেতেই রুদ্ধ কপালের চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিল। ফারিশ তার দিকে ঠান্ডা শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫২

– ‘ নে শরবতটা খেয়ে মাথা ঠান্ডা কর। বিয়ের এতগুলো বছর হয়ে গিয়েছে সঙ্গে দুটো বাচ্চার বাবা হয়ে গিয়েছিস এখনো আরুকে নিয়ে এতটা ইনসিকিউর ফিল করেছিস।’
রুদ্ধ সোজা হয়ে বসল, এক ঢোক শরবত খেয়ে ফারিশের চোখে চোখ রেখে বলল,
– ‘ শি ইজ ওনলি মাইন, ওরদিকে কারোর সামন্য তাকানোটাও আমার সহ্য হয় না। আই থিংক আই’ম ফলিং মোর ডিপলি ইন লাভ উইথ হার এভরি ডে।ইভেন ইফ শি বিকামস দ্য মাদার অব মাই টেন চিলড্রেন, মাই অবসেশন উইথ হার উইল নেভার এন্ড।

তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here