তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৪
আশফিয়া হিয়া
আহি শাড়ি পড়ে নিজের ঘরেই ছিল। হঠাৎ তার মাথায় কিছু দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যেতেই, রুহাকে বলল তাকে এক বাটি হলুদ এনে দিতে। রুহা অবাক হয়ে বলল,
– ‘ তুমি এখন হলুদ দিয়ে কি করবে?’
– ‘ মুখে মাখব, নিয়ে আয় তুই।’
– ‘ না না হলুদ সরাসরি মুখে মেখ না তাহলে তোমার মুখে মেকাপই বসবে না।’
– ‘ আচ্ছা মাখব না তুই নিয়ে আয় তো। ‘
রুহা মুখের ওপর ভেংচি কেটে বলল,
– ‘ এই জন্যই কারো ভালো করতে নেই হুহ্।’
ড্রয়িং রুমের টেবিলের ওপর দুই বাটি হলুদ রাখা ছিল রুহা সেখান থেকে এক বাটি হলুদ নিয়ে আহিকে দিল। আহি হলুদের বাটি শাড়ির আচলের তলায় লুকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রুহা বোকার মতো তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এটা কি হলো হলুদ নিয়ে কোথায় চলে গেল, একবার ভাবল আহির পিছু নেবে তবে পরবর্তীতে নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টে মোবাইল নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
আহি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ইয়াজের ঘরের কাছাকাছি এল। সেখান থেকে কথা – বার্তা ও হাসি ঠাট্টার শব্দ ভেসে আসছে, শব্দ শুনেই বুঝে গিয়েছে ভেতরের ইয়াজে বন্ধুরা রয়েছে, সেখানে তার যাওয়াটা একদমই উচিত হবে না। ইয়াজও কি তবে ভেতরে আছে? আহির মুখটাই ভার হয়ে গেল। কি করতে এসেছিল এখন খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে। আহি নিজের ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পিছু ঘুরতে নিলে কারোর পায়ের শব্দ শুনে থমকে দাঁড়াল। ইয়াজ গটগটে পায়ে হেঁটে এদিকেই আসছে, মুখটা দেখে মনে হচ্ছে রেগে আছে ভীষণ। হঠাৎ এমন রেগে আছে কেনো? সে এখনো আহিকে খেয়াল করেনি। আহি কয়েক পা এগিয়ে ইয়াজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আহি থেকে দেখে ইয়াজ চমকে উঠল। যা তার মুখে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। আহিকে এখন তার সামনে একদমই আশা করেনি। সে তো ভেবেছিল আজ বোধ হয় সারাটাদিন মেয়েটার দেখাই পাবে না। আহি তার মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে ভ্রু উঁচাল। ইয়াজ তার পা হতে মাথা অবদি দৃষ্টি বুলিয়ে ঢোক গিলল। শাড়ি পড়ে আহিকে ভীষণ অন্যরকম লাগছে, ইয়াজের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। আহি সেই দৃষ্টি দেখে কিছুটা মিইয়ে গেল। ইয়াজ তার হাত ধরে টেনে ওপরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। এখানে এখন কারোর আসার সুযোগ নেই। ছাদের দরজাটা বন্ধ আছে আহির পিঠ ছাদের দরজায় মিশে গেল। ইয়াজ এক ধাপ সিঁড়ির ওপরে উঠে আহির মুখোমুখি হয়ে শুধাল,
– ‘ কি চাই?’
আহি শাড়ির আড়ালেই বাটি থেকে হলুদ অনেকটা নিজের অন্য হাতে নিয়ে নিল। কৌশলে হলুদের বাটিটা পেছনে রেখে দিল। ইয়াজ নজর আহির মুখের দিকেই সীমাব্দ্ধ তাই সে এতকিছু খেয়াল করেনি। আহি হাতটা সাবধানে বের করে ইয়াজের সম্পূর্ণ মুখে ইচ্ছে মতো ঘষে ঘষে মাখিয়ে দিল। এরপর ইয়াজকে ডেঙিয়ে পালিয়ে যেতে নিলে ইয়াজ তার হাতে টান দিয়ে আবারও আগেই জায়গায় নিয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– ‘ এটা কি করলি আহির বাচ্চা?’
আহি ঢোক গিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,
– ” আজ আমাদের হলুদ যদি এভাবে হলুদ না ই মাখাতে পাড়ি তাহলে হলুদের অনুষ্ঠানটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে না বলো?’
– ‘ তাই না তাহলে বিষয়টা শুধুমাএ আমার ক্ষেএে কেনো হবে? তোকেও তো ঠিক এভাবেই হলুদ মাখানো উচিত তা নাহলে আমাদের হলুদের অনুষ্ঠানটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে না? ‘ কথাটা বলে ইয়াজ তার দিকে আরও এগিয়ে গেল। আহির শরীর ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়াল। আহি আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ দে.. দেখো আমি এভাবে হলুদ মুখে দিতে পারব না আমার এলার্জি আছে, তাছাড়া আমার মুখে মেকাপও বসবে না প্লিজ এটা করো না।’
ইয়াজ হাত উচিয়ে বলল,
– ‘ ওকে।’ ইয়াজ এত সহজে মেনে যাবে আহি এটা ভাবতেই পারেনি। সে খুশি মনে চলে যেতে নিলে ইয়াজ আবারও তার হাত টেনে ধরে ঠিক আগের জায়গায় নিয়ে এল। আহি অবাক হয়ে বলল,
– ‘ কি হলো?’
– ‘ গালে দেব না বলেছি অন্য কোথাও যে দেব না এমন কোনো কথা তো বলিনি।’
আহি অবুঝ স্বরে বলল,
– ‘ মানে?’
ইয়াজ তার বিস্ময়কে চরম পর্যায়ে পৌছে দিয়ে আহির গলায় মুখ গুজে দিল। আহির শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠল। ইয়াজ কখনই এমনটা করেনি। তার এই বাইশ বছরের জীবনে এই প্রথম পুরুষালী এমন স্পর্শ পেয়ে অনুভূতির তড়ে কেঁপে উঠল ছোট্ট শরীরখানা। আহি ইয়াজের পিঠে হাত রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
– ‘ কি.. কি করছো?’
ইয়াজ মুখে কিছুই বলল না তবে কাজে ঠিকই বুঝিয়ে দিল। আহির গলায় ইচ্ছে মতো মুখ ঘষে হলুদে আহির সফেদ গলা ভরিয়ে তুলল। এরপর খুব ধীরে ধীরে গলা থেকে মুখ তুলল। আহি চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে আছে। এক হাত দিয়ে ইয়াজের কোমড়ের কাছটার পোশাক মুঠো করে চেপে ধরে আছে। ইয়াজ তার এই করুণ দশা দেখে মৃদ্যু হাসল। আহির শাড়ি পেট থেকে কিছুটা সরে গিয়ে তার ফর্সা উদরের কিছুটা উন্মুক্ত হয়ে গেল। ইয়াজ চোখ বুঝে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তবে হুট করেই নিজের মুখটা আরও কিছুটা হলুদ নিয়ে আহির উদরে লেপ্টে দিল। আহি এবার কারেন্টের মতো শক খেয়ে চোখ জোড়া খুলে ফেলল। ইয়াজ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– ‘ আই কান্ট কন্ট্রোল মাই স্রেফ প্লিজ আমার সামনে থেকে যা নয়তো এক্ষুণি খারাপ কিছু ঘটে যাবে। ‘ আহি তাকে ধাক্কা দিয়ে চটজলদি আচল দিয়ে ঘাড় পেচিয়ে নিল। এতে গলায় হলুদ কিছুটা কম দেখা যাবে। এরপর ইয়াজকে বকতে বকতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজের ঘরে দৌড়ে গেল। ইয়াজ তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে মাথা চুলকে হাসল।
ছাদের সিঁড়ি দিয়ে নামতেই বন্ধুরা তাকে ধরে নিচে নিয়ে গেল। অথচ যেই কাজের জন্য সে ওপরে এসেছিল সেটায় ভুলে গেছে। নিহাদকে আরুর ব্যাপারে সাবধানটাই করা হলো না।
ইয়াজকে বাগানে হলুদের গোগল করানো হবে। সব ছেলেরা মিলে তাকে ঘিরে ধরেছে। সকলের পরণে একই ধরনের পোশাক লুঙ্গি, সাদা সেন্টু গেঞ্জি ও গলায় ঝুলানো গামছা। ইয়াজের মুখ দেখে মা – চাচিরা সব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন,
– ‘ তোকে এভাবে হলুদ লাগাল কে?’
ইয়াজ বলল,
– ‘ বন্ধুরা জোর করে লাগিয়ে দিয়েছে। ‘ ইয়াজ কথাটা বলেই তাদের দিকে চেয়ে এক চোখ মারল। তা যা বোঝার বুঝে গেল। বড়দের সামনে কিছু না বললেও পরবর্তীতে একা পেয়ে ঠিকই মজা নিয়েছে।
ইয়াজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে আহির বেলকণিতে দাঁড়ালে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। আহি চুপিচুপি বেলকণিতে এসে দাঁড়াল। ইয়াজের মাথায় পানি ঢালা হলো বড়রা এখানে কেউ থাকল না, ইয়াজের বন্ধুরা ইয়াজকে ইচ্ছে মতো হলুদ মাখিয়ে ভূত বানিয়ে ফেলল। ইয়াজও তাদের দিকে তেড়ে গেল। হলুদ ও পানি দিয়ে জায়গাটা মাখামাখি হয়ে গেল। ইয়াজের এক বন্ধু বাগানের গাছে পানি দেয়া পাইপ নিয়ে এল। ইয়াজকে সম্পূর্ণ তা দিয়ে ভিজিয়ে দিল। ইয়াজে কি মনে করে আহির ঘরের বেলকণির দিকে তাকাল। আহি তাকে দেখে লুকিয়ে পড়ল না সেখানেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ইয়াজ তাকে দেখে মুচকি হাসল। আহি নিজের হেসে সেখান থেকে চলে গেল।
রুদ্ধ সবে নিজের ঘরে এল। সকালের সেই ঘটনার পরে সে একবারও আরুর দেখা পায়নি। বাচ্চারা তার দাদুভাই ও নানাভাইয়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ আরু তাদের খাইয়ে দিয়েই ফ্রেশ হতে নিজের ঘরে এসেছে। রুদ্ধকে দেখেও আরু কোনো প্রক্রিয়া দেখাল না। প্রয়োজনীয় পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে গেল। শাড়িটা বিছানায় রেখে গেল। এটা রুদ্ধর দেয়া শাড়িটা নয় অন্য শাড়ি রুদ্ধর সেটা দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল। আরু ওয়াশরুমের দরজা আটকাতেও পারল না তার আগেই রুদ্ধ তাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেল। শাওয়ার অন করে সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। আরু রাগে – মুখ দিয়ে একটা কথাও বলল না রুদ্ধর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থেকে যেই না বের হতে যাবে, ওমনি রুদ্ধ তার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। এক হাতে কোমড় জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিল। আরু রেগে তাকে ধাক্কা দিতেই রুদ্ধ আরও শক্ত করে নিজের সঙ্গে চেপে ধরল। আরু নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
– ‘ ছাড়ুন আমাকে একদম ধরবেন না সকালের কথা ভুলে যায়নি আমি।’ বলতে বলতে আরুর চোখে পানি চলে এল। এই তার একটা সমস্যা অতিরিক্ত রেগে গেলে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। সে চাইলেও আটকাতে পারে না।
আরুর এই চোখের পানি রুদ্ধকে দুর্বল করে তোলে। এই একটা জিনিস সে একদমই সহ্য করতে পারে না। আরুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। উন্মুক্ত কাজে ঠোঁটের ছোঁয়া দিতে দিতে বলল,
– ‘ আই ‘ ম সরি সুইটহার্ট। তোর দিকে আমি ছাড়া কেউ ওভাবে তাকালে আমি সহ্য করতে পারি না। তুই শুধু আমার, আমি ছাড়া কেউ তোরদিকে মুগ্ধতা নিয়ে তাকাতে পারবে না, আমি সেই সুযোগটাই দেব না। ”
– ‘ আপনি সবসময় এমন করেন, আমাকে কষ্ট দেবেব এরপর সরি বলবেন,এরপর আবারও সেই একই কাজ করবেন। ‘
– ” সরি তো জান আর করবো না।
রুদ্ধর আদুরে সম্মধনে আরু গলে গেল। রুদ্ধ তাকে সবসময় এভাবে ডাকে না, আরু যখন রেগে যায় এবং তাদের কাছে আসার মুহুর্তেই রুদ্ধ তাকে এইসব নামে ডেকে তার রাগ ভাঙিয়ে ফেলবে। আরু রুদ্ধকে ছাড়িয়ে বলল,
– ‘ হয়েছে আমি রেগে নেই আমি বের হোন আমি শাওয়ার নেব।’
রুদ্ধ কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
– ‘ তো আমি কি তোকে আটকে রেখেছি? ‘
আরু তাকে ঠেলে বলল,
– ‘ আপনি বের হোন আগে। ‘
আরু তার সঙ্গে পেরে উঠল না। রুদ্ধ শ্যাম্পু নিয়ে নিজের চুলে শ্যাম্পু করতে করতে ভ্রু কুঁচকে বলল,
– ‘ এমন ভাব করছিস যেন আমার সঙ্গে আজ প্রথম শাওয়ার নিচ্ছিস? ভুলে যাছ না বিয়ের পর থেকে তোকে সময়ে অসময়ে আমার সঙ্গেই শাওয়ার নিতে হয়।’
তার উল্টো – পাল্টা কথায় আরুর রাগ হলো। রেগে বলল,
– ‘ ধ্যাত আমিই যাচ্ছি, আপনি বের হলে তবেই আমি শাওয়ার নিব।’
আরু চলে যেতে নিলে রুদ্ধ তার শাড়ি হাতে পেচিয়ে এক টানে খুলে ফেলল। এরপর আরুকে পানি দিয়ে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল। আরু রাগে – দুঃখে রুদ্ধর গায়েও পানি ছুঁড়ে মারল শুরু হয়ে গেল পানি ছুঁড়াছুঁড়ির প্রতিযোগিতা কে কাকে কত বেশি ভেজাতে পারে। রুদ্ধ হুট করে কোলে তুলে আরু কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাড়ি ভর্তি বার্থটাবে ফেলে দিল। সেখান থেকে আরুর ওঠার আর সাধ্য হলো না। রুদ্ধ তাকে সেই সুযোগটায় দেয়নি। দশমিনিটের গোসল আরুকে ঘন্টাখানেক লাগিয়ে করতে হলো।
ওয়াশরুম থেকে বের হবার পূর্বে রুদ্ধর সাবধানি বাক্য কানে এল,
– ‘ আমার দেয়া শাড়িটাই যেন পড়াই হয় নয়তো শাড়ি পড়ার প্রয়োজন নেই।’ আরু ভেংচি কেটে চলে এল। রুদ্ধর দেয়া শাড়িটায় নিজের গায়ে জড়াল।
দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে বাঁধল আরও এক বিপওি। রুমা বেগম ও আরু সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন সঙ্গে সুমিতা বেগমও আছে, বাড়িতে অনেক মানুষ এত মানুষের রান্না – বান্না কি কম কথা। ড্রাইনিং রুমের স্প্রেসটা বিশাল বড়ো। তাই ড্রাইনিং টেবিলের সঙ্গেই আরও একটি টেবিল যোগ করে সেখানে চেয়ার বসানো হয়েছে৷ বাড়ির পুরুষ ও ছেলেদের একসঙ্গে খাবার খেতে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রুদ্ধর বন্ধু ও ইয়াজের বন্ধুরাও রয়েছে। আরু রুমা বেগমকে সাহায্য করছে, ভাত তরকারি বেড়ে দিচ্ছে প্লেটে প্লেটে। নিহান তখন থেকেই আরুকে দেখে চলেছে আড় চোখে ও মিটিমিটি হাসছে। সে এটাও খেয়াল করেছে মেয়েটা রুমা বেগমকে বড় মা বলে ডাকছেন তার মানে এই বাড়িরই মেয়ে অথাৎ ইয়াজের বোন সে। আরুর মনে হলো কেউ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আরুর চোখ নিহানের দিকে পড়তেই চমকে গেল মেয়েটা। মাথার কাপড় আরও একটু টেনে নিল। মনে মনে বলল,
– ‘ এই গাধাঁটা কি এখনো বুঝতে পারেনি আমি এই বাড়ির বউ এমন গাঁধাও মানুষ হয়?’
আরু একপলক রুদ্ধর দিকে তাকাল, ওমনি তার শিরদাঁরা বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। রুদ্ধর চোখ জোড়া রাগে লাল হয়ে এসেছে। সে নিহানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে আরুকে ইশারা করল ভেতরে যেতে। আরু সেই কথা অমান্য করল না তার নিজেরই প্রচুর অস্বস্তি হচ্ছিল সে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আরু চলে যেতেই নিহানের মুখটা চুপসে গেল। মেয়েটা এভাবে চলে গেল কেনো?
রান্নাঘরে এসে আরু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মিতা বেগম তরকারি সব আলাদা করে রাতের জন্য তুলে রাখছে। আরু তাকে বলল,
– ‘ মা বড় মাকে গিয়ে সাহায্য করো মা, আমি এখানে আছি।’
– ‘ এখানে আছি মানে? দেখছিস না তরকারি ভাগ করে রাখছি তুই এসব পারবি না, তুই বরং ওখানে যা আপা একা পারবে না।’
– ‘ মা তুমি যাও না প্লিজ আমার মাথা ঘুরাচ্ছে এত মানুষের মাঝে। ‘
মিতা বেগম হাতের কাজ রেখে মেয়ের দিকে ঘুরে বললেন,
– ‘ মাথা ঘুরাবে না সকাল থেকে ঠিক মতো খেয়েছিস? না খেয়ে থাকলে তো এমনটাই হবে, তুই এখানে খেয়ে নে আমি ওদিকে যাচ্ছি আর তোর এসব করতে হবে না আমি এসেই যা করার করব। ‘
– ‘ মা আমি এখন খাব না তুমি যাও। ‘ মিতা বেগম আরুর কোনো কথায় শুনলেন না, সে প্লেটে ভাত বেড়ে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আরুও ভীষণ ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিল আর অপেক্ষা না করে সেখানেই খেয়ে নিল।
রুদ্ধর গলা দিয়ে খাবারটা নামছেই না। ওভাবেই ভাতে হাত দিয়ে বসে আছে। ইয়াজ ভাইকে এভাবে বসে থাকতে দেখে বলল,
– ‘ কি হয়েছে ভাইয়া খাচ্ছো না কেনো?’
রুদ্ধ কটমট করে বলল,
– ‘ তোর বন্ধুকে বলেছিলি?’
ইয়াজ শুকনো ঢোক গিলল। সে তখন বলতে গিয়েছিল এরপর তো আহির সঙ্গে ওভাবে দেখা হয়ে গেল। আর বলার সুযোগই পায়নি। তাছাড়া কথাটা মাথা থেকে একেবারেই বেরিয়ে গিয়েছিল। ইয়াজ আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ আ..সলে ভাইয়া তখন বলতেই গিয়েছিলাম তবে তখনই ওরা আমাকে বাগানে নিয়ে গেল কথাটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তুমি চিন্তা করো না খাওয়া হয়ে গেলেই আমি বলবো। ‘
রুদ্ধ ইয়াজের দিকে এমনভাবে তাকাল ইয়াজ সেই দৃষ্টি দেখে চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগ দিল। রুদ্ধ চোখ – মুখ শক্ত করে ওভাবেই বসে রইল। নিহানের খাওয়া শেষ হতেই সে উঠে হাত ধোঁয়ার উদ্দেশ্য গেল। রুদ্ধর তার দেখা – দেখি উঠে গেল। ইয়াজ দুজনকে একসঙ্গে যেতে দেখে খাবার ফেলে ওভাবেই তাকিয়ে রইল। ভাইয়া আবার উল্টো – পাল্টা কিছু করবে না তো? সে উঠে যেতেও পারছে না উঠে গেলেও রুদ্ধ তাকে ছাড়বে না তাই সেখানেই বসে রইল।
নিহান নিজের হাত ধুচ্ছে আয়নায় রুদ্ধকে দেখে হালকা হাসল। রুদ্ধ কোনো ভনিতা ছাড়াই সরাসরি বলল,
– ‘ তখন টেবিলে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলে রাইট?’
নিহান থতমত খেয়ে গেল। সে তো অনেক সাবধানেই মেয়েটাকে দেখছিল যাতে কারোর চোখে না পড়ে, এই লোকের চোখে সেটা ধরা পড়া গিয়েছে? নিহান আমতা আমতা করে বলল,
– ‘ না.. মানে.. তাকে কথাটুকু রুদ্ধ সম্পূর্ণ করতে দিল না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
– ‘ মেয়েটা কে জানো?’ নিহানের দু দিকে মাথা নাড়াল যার অর্থ সে জানে না।
রুদ্ধ শীতল কন্ঠে বলল,
– ‘ শি ইজ মাই ওয়াইফ এন্ড দ্যা মাদার অফ মাই টু বিউটিফুল চিলডেন্ড । বন্ধুর বিয়ে এটেন্ড করতে এসেছো সেটাই এনজয় করো আশে – পাশে নজর দেয়া বন্ধ করো আশা করি বুঝতে পেরেছো?’
তোমার নামের রোদ্দুরে পর্ব ৫৩
নিহান ওপর – নিচ মাথা ঝাঁকাল। রুদ্ধ নিজের হাত ধুঁয়ে সেখান থেকে চলে গেল। নিহানের মুখটা একেবারে চুপসে গিয়েছে ঔই মেয়েটা বিবাহিত আর সে বুঝতেই পারেনি? সঙ্গে কি বলল দুটো বাচ্চার মা? এত বড় ছ্যাঁকা সে তার জীবনে কোনোদিনও খায়নি। এই দুঃখে গড়াগড়ি খেলেও সেটা কম হবে।
