Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৬

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৬
নওরিন মুনতাহা হিয়া

রাত ১০ : ০০
নিউইয়র্ক শহরের বরফখণ্ডে ঢাকা সরু রাস্তায় পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে মেঘ আর আদ্রিয়ান। আজ মেলায় তারা প্রচুর আনন্দ করছে এতো সুন্দর সময়টা যেন খুব দ্রুত চলে গেছে। মেঘ আজ ভীষণ খুশি আর ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলে এই একটু আনন্দ আর জীবন রঙিন করে দিয়েছে। মেঘ রাস্তায় হাঁটার সময় যখন বরফ কণা তার শরীরে পড়ছিল। তখন পিছন থেকে ছাতা মেঘের মাথায় ধরে আদ্রিয়ান। মেলা থেকে নতুন ছাতা কিনেছে।
হঠাৎ বরফ পরা বন্ধ হয়ে গেছে দেখে মেঘ চোখ তুলে উপরে তাকায় দেখে তার মাথায় ছাতা ধরে রাখা হয়েছে।

মেঘের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চলে আসে সে ইচ্ছা করে ছাতার নিচ থেকে এক পা দূরে সরে যায়। আদ্রিয়ান ছাতা হাতে এক পা এগিয়ে যায় যাতে মেঘের শরীরে বরফ না পড়ে। মেঘ আবার কিছুক্ষণ পর আবার পিছিয়ে এসে দাঁড়ায় যার ফলে আদ্রিয়ান আবার এক পা পিছনে দাঁড়ায়। আদ্রিয়ানকে এমন জ্বালাতন করে মেঘের বেশ মজা লাগছিল।
আদ্রিয়ান হয়ত মেঘের কাণ্ড বুঝল সে এইবার পিছন থেকে চলে আসে সামনে। এরপর মেঘের পাশাপাশি দাঁড়ায় এখন ও ছাতা মেঘের মাথায় ধরে রেখেছে। মেঘ আদ্রিয়ানকে দেখে পাশ ফিরে খিলখিল করে হেঁসে উঠে। আদ্রিয়ান ওর মাথায় আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে বলে

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“খুব দুষ্ট হয়ে যাচ্ছো তুমি মেঘ।”
আদ্রিয়ানের কথায় মেঘ ডোন্ট কেয়ার ভাব নেয়। পাশাপাশি হাঁটার কারণে দুইজনের হাত স্পর্শ করছিল মেঘ দ্রুত তার হাত সরিয়ে নেয়। কিন্তু তার আগেই আদ্রিয়ান মেঘের ঠাণ্ডা শীতল হাত জোড়া তার মুষ্ঠিবদ্ব হাতের ভাঁজে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে এরপর মুষ্টিবদ্ধ বাঁধন থেকে তার হাত সরিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। কিন্তু আদ্রিয়ানের শক্তির কাছে মেঘের নূন্যতম চেষ্টা হার মানে!

ছাতার বাহিরে বরফ খণ্ড গড়িয়ে পড়ছে যা মেঘ হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয়। আদ্রিয়ান তার মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা হাতের বাঁধন খুলে মেঘের হাতের দিকে বাড়িয়ে দেয়। মেঘের হাতের নিচ দিয়ে তার হাত রাখে দুইটি ঠাণ্ডা হাত যখন একে অপরের সংস্পর্শে আসে। তখন যেন তারা বিশ্ব থেমে যায় বরফ খণ্ডের অবিরাম ধারা মুষুলধারে বৃষ্টির ন্যায় গড়িয়ে পড়ে তাদের উপর। সময় থেমে যায় প্রকৃতি এক শীতল বাতাস উপহার দিয়ে হয়ত বুঝায় সে চাই তাদের মিলন হোক। অনন্তকাল এই দুই হাত জোড়া সব দুরত্ব ভুলে কাছাকাছি চলে আসুক একে অপরের পরিপূরক হয়ে বৃদ্ধ কাল অবধি মুষ্টি বদ্ধ হয়ে থাকুক।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে ড্রাইভ করছে আদ্রিয়ান। আর তার পাশের সিটে মাথা হেলান দিয়ে বিভোর হয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে মেঘ তার শরীরে জড়ান রয়েছে আদ্রিয়ানের হুডি। সারাদিন ক্লাস আর ঘুরাঘুরি পর ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করায় বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্য গাড়িতে হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল মেঘ।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা হয়ত নিজে ও বুঝতে পারেনি!

আদ্রিয়ান গাড়ি ড্রাইভ করছে আর বারবার ঘুমন্ত মেঘের মুখশ্রীর উপর নজর বুলিয়ে দেখছে। গাড়ির মধ্যে হিটার চালু করায় বিধায় উষ্ণ আবহাওয়ায় বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে আছে মেঘ। আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসে ‚ ধীরে ধীরে সে প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। হয়ত তার হৃদয়ে প্রেমে পড়ার থেকেও অধিক অনুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বড় বাড়ির সামনে গাড়ি গিয়ে থামে। আদ্রিয়ান গাড়ি পার্ক করে ঘুমন্ত মেঘের দিকে তাকায়। মেঘ শান্ত আর ঘুমন্ত মুখ দেখে তাকে জাগ্রত করার ইচ্ছা হয় না আদ্রিয়ানের। কিন্তু সারারাত গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকতে পারবে না মেঘ! আদ্রিয়ান এখন কি করবে? আদ্রিয়ান কিছুক্ষণ ভাবল এরপর গাড়ির দরজা খুলে বের হয়ে যায়। গাড়ির অপর পাশ ঘুরে মেঘের কাছে যায় ‚ দরজা খুলে মেঘের শরীরে থাকা সিট বেল্ট খুলে ফেলে। এরপর মেঘের এক হাত তার কাঁধে নিয়ে তার হাত দিয়ে মেঘের পা স্পর্শ করে শক্ত করে ধরে কোলে তুলে নেয়।

শরীরে ঝাঁকি লাগায় ঘুমন্ত অবস্থায় মেঘ নড়েচড়ে উঠে এরপর আবার আদ্রিয়ানের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। আদ্রিয়ান মেঘের কাণ্ড দেখে হাসে এরপর তাকে কোলে করে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে মেঘের রুমে যায়। বিছানায় মেঘকে শুয়িয়ে দিয়ে তার মাথার নিচে বালিশ দেয় মেলে থাকা দুই হাত গুছিয়ে পাশে রাখে। এরপর ঘুমন্ত মেঘের শরীর উষ্ণ কম্বল দিয়ে মুড়িয়ে দেয়।

আদ্রিয়ান যখন মেঘকে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়ে উঠে চলে যেতে যাবে। তখন বালিশের পাশে রাখা তার হাতের উপর মেঘ মাথা রেখে শুয়ে পড়ে আর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার হাত। আদ্রিয়ান থমকে যায় সে মেঘের মাথার নিচ থেকে তার হাত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুমন্ত মেঘ ভীষণ শক্ত করে বালিশ মনে করে তার হাত ধরে রাখে। যদি এখন আদ্রিয়ান জোর করে মেঘের মাথার নিচ থেকে হাত সরাতে চাই। তবে হয়ত মেঘ ঘুম থেকে উঠে পড়তে পারে তাই আদ্রিয়ান আর জোর করল না। বাধ্য হয়ে মেঝের মধ্যে হাঁটু গেঁড়ে বসে বিছানায় মাথা দিয়ে বসে পড়ে।
আদ্রিয়ানের থেকে এক সেন্টি মিটার দুরত্বে মেঘ শুয়ে আছে তার ডান হাতের উপর মাথা রেখে।

হঠাৎ আদ্রিয়ানের লোভ জন্মায় একবার তার ঘুমন্ত “মেঘবালিকার” মুখ ছুঁয়ে দেখার। আদ্রিয়ান দেরি করল না দ্রুত তার ঠাণ্ডা হাত ছুয়িঁয়ে দেয় ‚মেঘের গালে। আলতো করে নরম হাতে তার গালে হাত বুলিয়ে মেঘ হয়ত আরাম বোধ করল।আদ্রিয়ান তার ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যায় মেঘের কাছে ‚ এরপর শব্দ করে মেঘের কপালে চুমু খায়। আদ্রিয়ান বলে

“ভালোবাসি মেঘ তোমায়। ভীষণ ভালোবাসি ‚সারাজীবন থাকবে আমার হয়ে? সুখে ‚দুঃখে সকল সময় এমন করে মায়ায় জড়িয়ে রাখবে আমায়! যতই অভিমান করে দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা কর। কিন্তু আবার ভালোবেসে আমার কাছেই ফিরে এসে। আমি দুই হাতের বন্ধনে আগলে রাখ তোমায়। আজীবন। কথা দিলাম!”
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে এরপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ঘুমের অতল গভীরে হারিয়ে যায়। সকাল আটটায় ঘুম ভাঙে মেঘের চোখ খুলে পিটপিট করে তাকায়। হঠাৎ চোখ খুলে আদ্রিয়ানকে দেখে মেঘ ভয় পেয়ে যায় ‚ আদ্রিয়ান এখানে কি করছে? মেঘ আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে এইটা তার রুম। কিন্তু আদ্রিয়ান তার রুমে ঘুমাবে কেনো? মেঘ কি স্বপন দেখছে না বাস্তব! মেঘ নিশ্চত হওয়ার জন্য তার হাত দিয়ে আদ্রিয়ানের মুখে হাত দেয়। না ‚এইটা তার স্বপ্ন না বাস্তব। মেঘ ঘুমন্ত আদ্রিয়ানকে ডাক দেয়

“আদ্রিয়ান স্যার ঘুম থেকে উঠুন! আপনি এখানে কি করছেন? আমার রুমে? আদ্রিয়ান স্যার।”
মেঘের ডাক ঘুমন্ত আদ্রিয়ান শুনতে পায় না। যার ফলে বাধ্য হয়ে মেঘ বেশ কয়েকবার জোরে জোরে ডাকল। আদ্রিয়ানের ঘুম নরম হয় সে ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে বলে
“কি হয়েছে মেঘ? এমন করে ডাকছ কেনো? একটু ঘুমাতে দাও আমায়!”
“আপনি ঘুমান। কিন্তু নিজের রুমে গিয়ে ঘুমান। এই রুমে কি করছেন? আপনি আমার রুমে কেনো এসেছেন?
“তোমাকে কাল রাতে কোলে করে গাড়ি থেকে নিয়ে এসেছি আমি। এরপর তুমি আমাকে এই রুমে থাকতে বাধ্য করছ?”

আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘের টনক নড়ল কাল সে আদ্রিয়ানকে এই রুমে থাকতে বাধ্য করছে মানে? মেঘ দ্রুত কম্বল সরিয়ে তার শরীরে জামাকাপড় চেক করতে থাকে। না‚জামাকাপড় সব ঠিক আছে? তার মানে কাল তাদের মধ্যে কিছু হয়নি। আদ্রিয়ার ঘুম ঘুম চোখে দেখল মেঘ তার শরীরের জামাকাপড় দেখছে। আদ্রিয়ান মেঘের কাণ্ড প্রথম না বুঝলে ও পরে তখন বুঝে তখন দ্রুত চোখ খুলে মেঘের দিকে তাকিয়ে বলে
“মেঘ তুমি কি মনে করছ?কাল রাতে এক রুমে থেকেছি বলে উল্টো পাল্টা কিছু করেছি? ছি: ছি : নিজের শিক্ষকের বিষয়ে এমন ভাবতে কি তোমার লজ্জা করে না! মাইন্ড ঠিক কর তোমার!
আদ্রিয়ানের কথার উত্তরে মেঘ মনে মনে

“আমার মাইন্ড ঠিকই আছে আগে আপনার চরিত্র ঠিক করুন! বউ রেখে ছাএীর সাথে প্রেম করতে চাইলে। এমন টিচার্রের বিষয়ে মাথায় ভালো কথা কি করে আসবে!”
মেঘকে মনে মনে চিন্তা করতে দেখে আদ্রিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে
“মেঘ মনে মনে কি তুমি আমাকে গালি দিচ্ছ? শিক্ষক হয় আমি তোমার?”
“না‚গালি দিচ্ছি না আপনার চরিত্রের প্রশংসা করছি। এখন বলুন আমায় আপনি এই রুমে কি করছেন? কাল রাতে কি করে আমি আপনাকে এই রুমে থাকতে বাধ্য করেছি?”
“তুমি কাল রাতে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তাই আমি গাড়ি থেকে কোলে তুলে তোমায় রুমে নিয়ে এসেছি। এরপর ঘুমের ঘোরে তুমি আমার হাতকে বালিশের মতো ধরে ঘুমিয়ে ছিলে৷ যার ফলে বাধ্য হয়ে কাল রাত এখানে থাকতে হয়েছে আমাকে৷”

আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘের কাল রাতের ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। সে সত্যি কাল বিশ্রাম নিতে সিটে হেলান দিয়েছিল পড়ে মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে! মেঘের এখন নিজেকে শত খানিক গালি দিতে ইচ্ছা করছে। মেঘ বলে
“ও্হ আচ্ছা‚ সরি আপনাকে বিরক্ত করার জন্য। এখন সরুন সামনে থেকে আমাকে ফ্রেশ হয়ে রান্নাঘরে যেতে হবে। সকালের নাস্তা খেয়ে আবার কলেজে যেতে হবে।”
“এতো তাড়াতাড়ি রান্না করতে হবে না। বড়দিন উপলক্ষে কলেজ বন্ধ আজ।”
“হ্যাঁ আজ বড়দিন আমি ভুলে গিয়েছিলাম।”

“তুমি বাড়িতে পড়ে পড়াশোনা কর। আমাকে খাবার খেয়ে কলেজে যেতে হবে ”
“আপনি বন্ধের দিন কলেজেন কেন যাবেন আদ্রিয়ান স্যার?”
“কারণ‚কাল নবীন বরণ অনুষ্ঠান। আর অনুষ্ঠানের সকল দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে প্রিন্সপাল স্যার।”
“নবীন বরণ ” কাল নবীর বরণ অনুষ্ঠান অথচ মেঘ তা আজ জানল! মেঘ বলে উঠে
“কাল নবীন বরণ অনুষ্ঠান? নিউ ইয়ারের স্টুডেন্ট তো আমরা। তবে কি আমাদের নবীন বরণ হবে?”
“হুম‚ তোমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান কাল। আমি এখন রুমে গেলাম ফ্রেশ হয়ে আবার কলেজে যেতে হবে।”
“সকালের নাস্তায় আমি সাধারণ কিছু রান্না করছি।আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন।”
আদ্রিয়ান কথাটা বলে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়৷ আবার কি মনে করে যেন পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলে উঠে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৫

“কাল কলেজের মেয়েদের সাথে গাউনে দাঁড়িয়ে কিন্তু অনুষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলছিলাম। কেউ যাতে এই নিয়ে জেলাস না হয়।”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ বলে
“আপনি যার সাথে ইচ্ছা কথা বলেন। এই নিয়ে কে জেলাস হবে শুনি?”
“না‚এমনি বলে রাখলাম।”
পর্বটা বাজে হয়ে গেছে। যার জন্য দুঃখি। তবে কাল থেকে সারপ্রাইজ পর্ব আসবে।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৭