Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৭

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৭

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৭
নওরিন মুনতাহা হিয়া

রান্নাঘরে কোমড়ে কাপড় গুঁজে মাথার চুল খোপা করে হাতে খুন্তি নিয়ে রান্না করছে মেঘ। আজ সকালের খাবারে খুব সাধারণ রান্না করা হবে শুধু পাউরুটি আর ডিম। আদ্রিয়ান ডক্টর হওয়ার সুবাধে সে অতিরিক্ত তেল মসলা যুক্ত খাবার খায় না। তবে যদি রান্নার পদ হিসাবে বিরিয়ানি উপস্থিত থাকে তাহলে সে সকল ডাইট বা নিয়মকানুন ভুলে যায়। চুলায় ডিম সিদ্ধ বসিয়ে মেঘ পাতিল ঢাকনা দিয়ে ডেকে চুলার আঁচ কমিয়ে দেয়। এরপর ডিম সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে৷

টেবিলে থাকা মেঘের ফোন বেশ দীর্ঘ সময় ধরে টুংটাং শব্দ করে যাচ্ছে। ক্রমাগত শব্দ শুনে মেঘ বেশ বিরক্ত হয়ে টেবিলে থাকা ফোন হাতে নিয়ে স্কিনে থাকা নোটিফিকেশনে চাপ দায়। নোটিফিকেশনে চাপ দিয়ে গ্রুপে ঢুকে পড়ে। মূলত গ্রুপের ছাএ ছাএীরা একে অপরের সাথে মেসেজে কথা বলছিল যার নোটিফিকেশন আসছিল বারবার। মেঘ গ্রুপে থাকা ছাএ ছাএীর মেসেজ পড়ছিল তারা নবীন বরণ অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলছিল। নবীন বরণ অনুষ্ঠান কম তারা আদ্রিয়ানের রূপের প্রশংসা করছিল মূলত। গ্রুপের সকলের কথা শুনে মেঘের রাগে মেঘের শরীর জ্বলে উঠে।
গ্রুপের মেসেজ কয়েকটা পড়ে বিরক্ত হয়ে যায় তাই ফোন বন্ধ করে রাগে শব্দ করে টেবিলের উপর শব্দ করে ফোন রেখে দেয়।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সিঁড়ি দিয়ে বড় বড় পা ফেলে নিচে নেমে আসে আদ্রিয়ান টেবিলে খাবার দেখতে না পেয়ে রান্না ঘরে যায়। রান্নাঘরে মেঘ পাতিল থেকে বিরক্ত হয়ে সিদ্ধ করা ডিম বাটিতে নামিয়ে রাখছে। গ্রুপে করা মেয়েদের মেসেজ দেখে তার সকাল সকাল মেজাজ বিরক্ত হয়ে গেছে। আদ্রিয়ান রান্নাঘরে পৌঁছে পিছন থেকে মেঘকে ডাক দিয়ে বলে
“মেঘ‚ রান্না করা কি শেষ তোমার?”

আদ্রিয়ানের ডাক শুনে মেঘ পিছনে ঘুরে তাকায়। মেঘের দৃষ্টি আটকে যায় সেখানে সদ্য গোসল শেষ করে নীল শার্ট আর কালো রঙের প্যান্ট পড়ে রেডি হয়ে নিচে এসেছে আদ্রিয়ান। তার হাতের কনুইয়ে পরহিত দামী ঘড়ি চোখে সাদা ফ্রেমের চশমা। মাথার এলেমেলো চুল পিছনে পরিপাটি করে ভাজ করা। আদ্রিয়ানের গায়ের রং বেশ ফর্সা দুধের মতো ধবধবে সাদা। আদ্রিয়ান আর সৃষ্টির দুইজন তার মা শার্লিন বেগমের মতো হয়েছে। মুখের গঠন আর চেহারার বেশ মিল রয়েছে শার্লিন বেগমের সাথে।

মেঘ খুব মনোযোগ সহকারে আদ্রিয়ানের মুখের আদল ‚ তার শারিরীক গঠন আর ফর্সা ত্বক পর্যবেক্ষণ করল। ক্লাসের ছাএী খুব মিথ্যা কথা বলে না আদ্রিয়ান সত্যি খুব সুদর্শন। তার গায়ের রং মেঘের চেয়ে ও অধিক ফর্সা। মুখের গম্ভীর্যতার সাথে চোখের সাদা ফ্রেমের চশমা যেন মানুষটার সৌন্দর্য দিগুণ বাড়িয়ে দেয়। মেঘের এখন আদ্রিয়ানের উপর হিংসা হচ্ছে! পুরুষ মানুষকে কোন এতো সুন্দর হতে হবে!
আদ্রিয়ান অবাক হয় মেঘকে তার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে। আদ্রিয়ান এগিয়ে যায় মেঘের কাছে এরপর মেঘকে ডাক দেয়

“মেঘ কি হয়েছে আপনার? কথা বলছেন না কেন? রান্না কি শেষ হয়েছে?”
মেঘ হয়ত শুনল না আদ্রিয়ানের কথা সে এখন ও মনোযোগ সহকারে আদ্রিয়ানকে দেখে যাচ্ছে। আর নিজ মনে বিরবির করে কথা বলছে। মেঘকে প্রশ্নর উত্তর দিতে না দেখে আদ্রিয়ান তার আঙুল দিয়ে মেঘের চোখের সামনে শব্দ করে আর বলে
“মেঘ শুনছেন আপনি আমার কথা? এমন চুপচাপ হয়ে কি দেখছেন? মেঘ”
আদ্রিয়ানের আঙুল শব্দ শুনে মেঘের ঘোর কাটে সে দ্রুত আশেপাশে তাকায়। আদ্রিয়ানকে তার কাছে দেখে মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আপনি ফ্রেশ হয়ে এসে পড়েছেন?”

“হুম‚ আমি ফ্রেশ হয়ে সেই কখন এসেছি? তুমি কি দেখতে পাও নি? তোমার মনোযোগ কোথায় ছিল মেঘ?”
মেঘ মনে মনে বলল “আমার মনোযোগ আপনার উপর ছিল আদ্রিয়ান স্যার”।কিন্তু মুখে অন্য কথা বলল
“মনোযোগ আর কোথায় থাকবে? রান্নার উপর ছিল।”
“রান্না করা কি শেষ তোমার মেঘ?আমাকে আজ দ্রুত কলেজে যেতে হবে।”
“রান্না প্রায়ই শেষ। আপনি টেবিলে গিয়ে বসুন আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
“ওকে নিয়ে আসো।”

মেঘ পাতিলে থাকা ডিমের খোসা পরিস্কার করতে থাকে। সকালের মেসেজে মেয়েদের কথা শুনে তার মুড অফ হয়ে গেছে ‚ বেশ বিরক্তি নিয়ে সে কাজ করছিল। মেঘের চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠে। আদ্রিয়ান নাস্তার টেবিলে যায়নি সে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মেঘের বিরক্তি মাখা মুখ দেখে। আদ্রিয়ান ভাবে হয়ত সকালে ভোরে উঠে রান্না করতে হচ্ছে বলে ‚ মেঘ বিরক্ত বোধ করছে! আদ্রিয়ান প্রশ্ন করে
“মেঘ ভোরে ঘুম থেকে উঠে রান্না করতে হচ্ছে বলে কি তুমি বিরক্ত বোধ করছ? কাজের মহিলা খুব শীঘ্রই চলে আসবে। আমি আজই তাদের ফোন করব?”

ডিমের খোসা পরিস্কার করার সময় হঠাৎ আদ্রিয়ানের এমন কথা শুনে থমকে যায় মেঘ। পিছনে ঘুরে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়! আদ্রিয়ানের কথার মানে বুঝার চেষ্টা করে। মেঘ বিরক্ত কারণ গ্রূপের ছাএীদের কথা শুনে! কিন্তু আদ্রিয়ান কি মনে করেছে? মেঘ সকালের রান্না নিয়ে বিরক্ত। বাংলাদেশে যখন মেঘ একা বাসায় থাকত তখন ও মেঘ নিজে রান্না করে খেতো। তাছাড়া রান্না তার প্রিয় শখের মধ্যে অন্যতম। রান্না করতে মেঘ অনেক ভালোবাসে! আর রান্নার প্রতি তার কখন বিরক্তি আসে না। মেঘ বলে
“সকালে ভোরে রান্না করার অভ্যাস আমার আছে আদ্রিয়ান স্যার। আমি এই নিয়ে বিরক্ত না! তাছাড়া রান্না আমার প্রিয় শখ। রান্না করতে কখন আমার বিরক্ত বা ক্লান্ত লাগে না।”

আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে খুশি হয় কিন্তু মেঘের বিরক্তির কারণ জানার উদ্দেশ্য পুনরায় প্রশ্ন করে উঠে
“তবে তুমি সকাল সকাল এমন বিরক্ত হয়ে আছো কেন মেঘ? কি হয়েছে? মন খারাপ তোমার?”
আদ্রিয়ানের প্রশ্নের উত্তর এখন কি দিবে মেঘ?সে কেন বিরক্ত? গ্রুপে সুন্দরী ছাএীর মুখে তার প্রশংসা শুনে মেঘ বিরক্ত! কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে মেঘ বলে
“না‚আমি বিরক্ত নয়। এই ডিমের খোসা খুব শক্ত তাই ছাড়াতে গিয়ে আমার বিরক্ত লাগছে।”

আদ্রিয়ান মেঘের মিথ্যা ধরতে পারল। কারণ সিদ্ধ ডিমের খোসা কখন শক্ত হয় না। কিন্তু মেঘ যখন তার বিরক্তির কথা আদ্রিয়ানকে বলছে!তাই তাকে বারবার জিজ্ঞেস করা উচিত হবে না। কিন্তু আদ্রিয়ান বেশ অনেক সময় ধরে শুনছিল মেঘের ফোনের টুংটাং শব্দ হচ্ছিল। ফোনে এতো নোটিফিকেশন কোথাও থেকে আসছে? আদ্রিয়ান বলে
“মেঘ‚তোমার ফোনে এতো শব্দ করছে কেন? নোটিফিকেশনের শব্দ মনে হচ্ছে? তুমি কি কোন গ্রুপে জয়েন হয়েছে?”
“হুম‚ আমাদের নিউ ইয়ারের স্টুডেন্ট গ্রুপে জয়েন হয়েছি। ওই গ্রুপ ছাএ ছাএীরা কথা বলছে তার নোটিফিকেশন আসছে।”
“সকাল নয়টার সময় গ্রুপের ছাএ ছাএীরা কী কথা বলছে এতো। তাছাড়া আজ বন্ধের দিন।”
আদ্রিয়ান ক্লাসর ছাএ ছাএীর উপর এতো আগ্রহ দেখাচ্ছে? মেঘের হয়ত সয্য হলো না বিষয়টা মেঘ উল্টো দিকে ঘুরে থাকা অবস্থায় বলে উঠে
“ওরা নবীন বরণ অনুষ্ঠানের কথা আলোচনা করছিল।”
আদ্রিয়ান বলে

“নবীন বরণ অনুষ্ঠানে কি ওরা উপস্থিত থাকবে? আজ কি সকল ছাএ ছাএীরা আসবে কলেজে?”
মেঘ পিছনে ঘুরে তাকায় আদ্রিয়ানের দিকে। আদ্রিয়ান বেশ খুশি মনে কথাগুলো জিজ্ঞেস করছিল ‚কারণ যদি ছাএ ছাএীরা সকলে আজ উপস্থিত থাকে। তবে তার কাজের চাপ কম থাকবে!সকলে মিলে সাহায্য করতে পারবে তাকে। মেঘ কথাটার উল্টো মানে বুঝে তাই সে বলে উঠে
“হুম অবশ্যই আসবে। সকল ছাএীর প্রিয় টির্চার আদ্রিয়ান রেদোয়ান আসতে বলেছে বলে কথা। আপনার সুন্দরী ছাএীরা অবশ্যই আসবে আদ্রিয়ান স্যার।”

মেঘ যে আদ্রিয়ানকে খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল তা আদ্রিয়ান বুঝল। নারী জাতি বড় অদ্ভুত। যতই স্বামীর সাথে রাগ‚ঘৃণা‚বা অভিমান করুক না কেন! স্বামী সাথে অন্য নারীকে দেখে হিংসা অবশ্যই করবে। নারীরা মূলত সবকিছুর ভাগ দিতে পারে শুধু স্বামীর ভাগ নয়। সকাল থেকে মেঘের বিরক্তির কারণ এখন বুঝল আদ্রিয়ান। মেঘ যে তাকে নিয়ে হিংসা করছে তা সে বুঝতে পারছে। আদ্রিয়ান মেঘের রাগের আগুনের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ইচ্ছা করে বলে উঠে

“ক্লাসের সকল সুন্দরী ছাএীরা ও আমার ভীষণ প্রিয়।”
আদ্রিয়ানের কথায় মেঘ তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল চোখ গরম করে দাঁত কটমট করে তাকিয়ে বলে
“সুন্দরী ছাএীরা আপনার ভীষণ প্রিয়!”
আদ্রিয়ান আনমনে হাসল এরপর মেঘের কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠে
“সবার অধিক প্রিয় কে জানো মেঘ?”
মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করে বলে “কে?”
আদ্রিয়ান মেঘের কানের পিঠের সাথে তার ঠোঁট ঠেকিয়ে আলতো করে চুম খায়। মেঘ আদ্রিয়ানের বিস্ময়ের সহিত ঘুরে তাকায় ‚ আদ্রিয়ান পুনরায় ফিসফিস করে বলে উঠে
“তুমি আমার অধিক প্রিয় ছাএী। আমার বউ।”
আদ্রিয়ানের মুখে “বউ” শব্দটা শুনে মেঘ অবাক হয়ে যায়! তবে কি আদ্রিয়ান জানে মেঘই মালিহা! তার বিবাহিত বউ?মেঘ দ্রুত উত্তর চেয়ে প্রশ্ন করে উঠে

“বউ মানে? কে বউ? আমি কি আপনার বউ?”
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে মিটমিট করে হাসে। পরশু দিন থেকে আদ্রিয়ান মেঘকে কতো কথা বলছে ‚হাতি‚কালো বলে অপমান করেছে তার বউকে! তবুও মেঘ কেন স্বীকার করল না সে তার বউ?মেঘের তার উপর ভীষণ অভিমান করেছে তা সে জানে। তবে মেঘ যতোখন তার পরিচয় না দিবে ততক্ষণ অবধি আদ্রিয়ান ও চুপ থাকবে! আদ্রিয়ান মেঘের কাছ থেকে দূরে সরে এসে দুষ্ট স্বরে বলে
“মেঘ ‚তুমি কেন আমার বউ হতে যাবে!আমি বলেছি তুমি আর আমার বউ আমার অনেক প্রিয়। তবে দুঃখের বিষয় কি জানো মেঘ, এই শীতের মধ্যে বউ ছাড়া থাকা খুব কষ্টকর।”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘ বিরক্ত হয়ে বলে

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৬

“তবে আপনার বউয়ের কাছে যান। বাংলাদেশে বউ রেখে আমেরিকায় কেন থাকেন?”
“হুম খুব শীঘ্রই চলে যাব। বউয়ের থেকে দূরে থাকা আর সম্ভব নয়। আই মিস ইউ বউ।”
“এখন দয়া করে আমার থেকে দূরে যান। টেবিলে গিয়ে বসুন আমি নাস্তা রেডি করে নিয়ে আসছি।”
আদ্রিয়ান মেঘকে আর বিরক্ত করে না সে রান্নাঘর থেকে চলে যায়। মেঘ নাস্তা রেডি করে টেবিলে সাজিয়ে পরিবেশন করে। আদ্রিয়ান তার প্লেটে খাবার নেয় এরপর খাওয়া শুরু করে দেয়। মেঘ পাশের চেয়ার টান দিয়ে বসে যায়।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৮