তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৮
নওরিন মুনতাহা হিয়া
টেবিলে বসে সকালের নাস্তা করছিল আদ্রিয়ান আর মেঘ। মেঘ মনযোগ সহকারে খাবার প্লেট থেকে খাবার খাচ্ছিল হঠাৎ তার চোখে যায় তার পাশে বসে থাকা আদ্রিয়ানের উপর। যে এখন ফোন হাতে নিয়ে কারো সাথে মেসেজ করে কথা বলছে আর মিটমিট করে হাসছে। আদ্রিয়ানের ঠোঁট হাসির ঝলক দেখে মেঘের চোখ ছোট ছোট করে সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায়।
খাবার খাওয়া বন্ধ করে হাতে ফোন নিয়ে আনমনে হাসছে আর ফোনের অপ পাশে থাকা ব্যক্তির সাথে মেসেজ করছে। আদ্রিয়ানের গাল লজ্জায় লাল রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে চোখে মুখে হাসির ঝলক স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে আদ্রিয়ানের দিকে। কার সাথে কথা বলছে আদ্রিয়ান? কথা বলার মাঝে এমন লজ্জা পাচ্ছে! আবার ব্লাশিং করছ? ক্লাসের সুন্দরী ছাএীর সাথে? না অন্য কোন মেয়ের সাথে! মেঘ চেয়ার থেকে উঁকি দিয়ে পাশে থাকা আদ্রিয়ান ফোনে কার সাথে কথা বলছে তা দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু মেঘ ব্যর্থ হয়!
চেয়ারের কোণায় বসে হাত দূরে রেখে ফোনে কথা বলছে আদ্রিয়ান।মেঘের মাথা সে অবধি পৌঁছায় না! মূলত আদ্রিয়ান কারানের সাথে ফোনে কথা বলছে। হানিমুনে গিয়ে কারান আর আবিহা রোমান্স আর খুনসুটির গল্প শেয়ার করছে কারান। যা খুব হাসির আর মজার! তাছাড়া মেঘ আর আদ্রিয়ানের সম্পর্ক নিয়ে তাকে টির্জ করছে যার কারণে আদ্রিয়ান এমন ব্লাশিং করছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আদ্রিয়ানের এমন লজ্জা পাওয়া আর মিটমিট করে হাসা দেখে মেঘ বিরক্ত হয়ে বলে
“আদ্রিয়ান স্যার খাবার খাওয়া বাদ দিয়ে ফোনে কি কথা বলছেন! প্লেটে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। তাছাড়া আপনি না আজ তাড়াতাড়ি কলেজে যাবেন। লেইট হয়ে যাবে!”
মেঘের কণ্ঠ শুনে আদ্রিয়ানের তার কলেজে যাওয়ার কথা মনে পড়ে! কারানের সাথে মেসেজে কথা বলা বন্ধ করে দ্রুত প্লেটের থাকা খাবার খেতে থাকে।
ছুটির দিনে বাড়ির সকল কাজকর্ম শেষ করার পরিকল্পনা ছিল মেঘের। ঘর ঝাড়ু ‚ রান্নাঘর পরিস্কার‚ থাল_ বাসন গুছিয়ে রাখা‚ ফ্লোর মােছা দেওয়া সহ কাজ করার। কাজের মহিলারা ছুটি থেকে ফিরত না আসা অবধি সব কাজ তার একা করতে হবে! যদি ও মেঘের কাজ করা নিয়ে কোন অসুবিধা নাই। আদ্রিয়ান কলেজে চলে গেলে মেঘ বাড়ির কাজকর্ম করবে! আদ্রিয়ান চলে যাবে কথাটা মনে হতেই মেঘের সারাদিন বাড়িতে একা থাকার কথা মনে পড়ে।
বিশাল বড় ফাঁকা বাড়ির ভিতরে সারাদিন মেঘ একা কি করবে! পড়াশোনা করে না হয় কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যাবে কিন্তু এরপর কি করবে! ছোটবেলা থেকে মেঘ ভীষণ বইপ্রেমী তাই বিনোদনমূলক জিনিস যেমন টিভি‚ফোন‚বা কার্টুন ‚মুভি দেখার অভ্যাস তার কখন ছিল না। বাড়িতে কোন কাজের মহিলা উপস্থিত নেই যার সাথে সে গল্প করবে! তাছাড়া রাতে আবার এখন কারেন্ট ও চলে যায় এই বিশাল বড় বাড়িতে অন্ধকারে মেঘ কি করে থাকবে! তাছাড়া আদ্রিয়ান কখন বাড়িতে ফিরবে তা মেঘ জানে না। মেঘ খাবার খাওয়া রেখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে
“আদ্রিয়ান স্যার আপনি কলেজ থেকে কখন বাড়ি ফিরবেন?”
আদ্রিয়ান খাবার খাওয়ার মাঝে মেঘের কথার উত্তর দেয়
“খুব সম্ভবত রাত :১০ বা ১১:০০টার সময়।”
আদ্রিয়ানের মুখে রাত দশটা শুনে মেঘ শুকনো ঢুক গিলে মানে এতো রাত অবধি তাকে এই ফাঁকা বাড়িতে একা থাকতে হবে! আচ্ছা মেঘের কি উচিত আদ্রিয়ানের সাথে আজ কলেজে যাওয়া। গ্রুপের সকল ছাএ ছাএীর কথা শুনে মনে হয়েছে ওরা সকলে আজ যাবে। ছাএীরা অবশ্যই যাবে! যদিও আজ কলেজে ক্লাস হবে না কিন্তু তবুও ক্লাসের সকলের সাথে তার পরিচয় হবে। একসাথে বসে আড্ডা দিতে পারবে।সিনিয়রা নিশ্চয়ই আসবে তাদের সাথে ও কথা হবে। আর বাসার কাজ পরে করা যাবে ‚নিউ ইয়ার উপলক্ষে কলেজ বন্ধ দিবে। তখন না হয় সব কাজ করবে! কিন্তু এই একা বাড়িতে রাত দশটা অবধি থাকলে হয়ত মেঘ ভয়ে আর একাকিত্বে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে!
আদ্রিয়ান মেঘের দিকে তাকায়। খাবার খাওয়া বন্ধ করে মেঘকে ভাবনার জগতে বিভোর হয়ে যেতে দেখে আদ্রিয়ান অবাক হয়! মেঘের মুখ দেখে মনের কথা পড়তে পাড়ার মতো অভিজ্ঞতা এখন আদ্রিয়ানের হয়েছে। আদ্রিয়ান বলে
“মেঘ কি হয়েছে তোমার? খাবার খাওয়া বন্ধ রেখে কি চিন্তা ভাবনা করছ তুমি?”
আদ্রিয়ানের কথা শুনে মেঘের হুঁশ ফিরে আসে ‚ সে আবার খাবার খাওয়া শুরু করে। আদ্রিয়ান মেঘের মুখের ভয়ের ছাপ দেখে প্রশ্ন করে
“মেঘ‚ তুমি কি বাসায় একা থাকতে পারবে?না‚আমার সাথে কলেজে যাবে?”
আদ্রিয়ানের প্রশ্ন শুনে মেঘ তার মুখের দিকে পিটপিট করে তাকায় এরপর সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়
“রাত দশটা অবধি বাসায় একা থাকতে বোরিং লাগবে আমার। তাই কলেজে যাওয়ায় মনে হয় ভালো হবে।”
“ওকে‚ তাহলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে রেডি হয়ে আসো। আমি নিচে গাড়িতে তোমার জন্য অপেক্ষা করব।”
“হুম।”
খাওয়া দাওয়া শেষ শেষ করে মেঘ থালা বাসন গুছিয়ে রান্নাঘরে রেখে আসে এরপর রেডি হতে তার রুমে চলে যায়। আদ্রিয়ান বাহিরে গাড়ির কাছে চলে যায়। মেঘ ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে নিচে নামে এরপর বাড়ির বাহিরে রাখা গাড়িতে উঠে বসে। তারা একসাথে কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্য রওনা হয়।
কলেজের ডান্স প্র্যাকটিস রুমে ডান্স অনুশীলন করছে ছাএ ছাএীরা। আদ্রিয়ান কাল সকলের সাথে অনুষ্ঠানের আয়োজন ‚ প্রোগাম নিয়ে আলোচনা করেছে। নবীন বরণ অনুষ্ঠানে সকলে নাচ ‚গান ‚ কবিতা ‚ অভিনয় সহ অন্য বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণ করবে। সময় খুব কম তাই দ্রুত অনুশীলন করতে হবে। দূরে থাকা এক টেবিলে নূহা বসে আছে ছাএ ছাএীর ডান্স দেখছে তার হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহিত করছে।
কলেজে প্রবেশ করে মেঘ প্রথমে ডান্স রুমে আসে ডান্স রুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। টেবিলের উপর বসে থাকা নূহা মেঘকে দেখে হাত দিয়ে ইশারা করে। মেঘ নূহার ইশারা খেয়াল করে নূহার কাছে এগিয়ে আসে। নূহা মেঘকে তার পাশে বসায় এরপর মেঘের দিকে ঘুরে তাকিয়ে হাসি খুশি মেজাজে প্রশ্ন করে
“মেঘ তুমি আজ কলেজে এসেছ কেনো? বড়দিন উপলক্ষে আজ কলেজ ছুটি দিয়েছে! তুমি কি জানো না?
“হুম‚জানি। কিন্তু বাসায় একা থাকতো বোরিং লাগছিল তাই কলেজে এসেছি।”
“মেঘ ‚ তুমি কাল নবীন বরণ অনুষ্ঠানে কি করবে? গান না নাচ?”
“আমি নাচ করতে পারি না ‚তবে গান গাইতে পারি।”
“তবে তুমি নবীন বরণ অনুষ্ঠানে গান গাইবে।”
“নূহা‚আমি বাংলা গান করি। আমেরিকার মানুষ কি বাংলা গান শুনবে!
“আরে মেঘ তুমি কি জানো না। নবীন বরণ অনুষ্ঠানের যিনি প্রধান অতিথি ওনি বাংলাদেশের। তাই তুমি প্রধান অতিথিকে ইমপ্রেস করার জন্য বাংলা গান গাইতে পার।”
প্রধান অতিথি বাংলাদেশের শুনে মেঘ অবাক হয়ে বলে
“প্রধান অতিথি সত্যি বাংলাদেশের? তার মানে ওনি বাঙালি?”
“হুম ওনি বাঙালি। তাছাড়া আমেরিকার একজন বিখ্যাত গায়ক ও হলেন ওনি। তাই তুমি যদি বাংলা গান কর তবে প্রধান অতিথি ইমপ্রেস হয়ে যাবে।”
“ওকে তাহলে কাল নবীন বরণ অনুষ্ঠানে গান করায় যায়।”
মেঘ গানের প্রতিযোগীতায় নাম দেয়। কিন্তু নূহা ডান্স করবে বলে ঠিক করে । তাই সে রুমে উপস্থিত সিনিয়রদের কাছে যায় আর ডান্সে নাম দেয়। ছোটবেলা থেকো তিহান নাচ খুব ভালো করে তাই সে নাচে নাম দেয়। কিন্তু অনুষ্ঠানের জন্য একজোড়া কাপল ডান্স পার্টনার খুব জরুরি ছিল৷ তাই সিনিয়রা নূহা আর তিহানের নাম কাপল ডান্সে রাখে।
ডান্স গাউনে পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান করছে নূহা আর তিহান। চারপাশে গানের টিউন বাজছে সাথে সকলে তাদের উৎসাহিত করছে হাততালি দিচ্ছে। কিন্তু নূহা আর তিহান উভয়ই মধ্যে আনন্দ নয় বরং ভয় আর জড়তা কাছ করছে। একে অপরকে কাছে যেতে তার হয়ত দ্বিধা বোধ করছে! নূহা পিটপিট করে তাকায় তার থেকে সামান্য দূরে অবস্থান করা তিহানের দিকে। তিহান ও তাকায় নূহার দিকে। দুইজনের চোখ মিলিত হয়।
বেশ দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ার পর নূহা আর তিহান ডান্স করা শুরু করছে না দেখে। দূরে থাকা সিনিয়রা বিরক্ত হয়ে বলে
“নূহা‚তিহান তোমরা ডান্স শুরু করছ না কেন? মিউজিক বাজছে।”
সিনিয়রের ধমক শুনে নূহা ভয়ার্ত চাহনি নিয়ে এক পা এগিয়ে যায় তিহানের কাছে। কিন্তু পরক্ষণে থমকে যায়! ‚না তিহানের সাথে একসাথে ডান্স করা তার দ্বারা সম্ভব নয়। নূহা আবার পিছিয়ে যায় ডান্স গাউন থেকে চলে যাওয়া উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। হঠাৎ তড়িৎ বেগে তিহান ছুটে আমে নূহার কাছে পিছন থেকে ওর হাত শক্ত ধরে টান দিয়ে ঘুরায় এরপর দুইজনের মধ্যে দুরত্ব কমাতে পুনরায় নূহার হাত ধরে টান দেয়। নূহাকে এক ধাক্কায় তিহান তার কাছে নিয়ে আসে। হঠাৎ আকস্মিক টানে নূহা টাল সামলাতে না পেরে তিহানের বুকের উপর ধপ পড়ে যায়।
___ চারপাশে মিউজিক আর সকলের হাততালিতে পরিবেশটা বেশ মুখরিত হয়ে উঠেছে। নূহার কপাল যখন শার্টের উপর তিহানের বুক স্পর্শ করে হঠাৎ করে তিহান শরীর কেঁপে উঠে। তার সমস্ত শরীর মন জুড়ে অজানা শীতল আবহাওয়া বয়ে যায়। তিহান শান্ত হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে তার হার্টবিট বেড়ে দিগুণ হয়ে যায়। নূহা তিহানের বুকের কাঁপন শুনতে পায় তার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়।
কপাল উঁচু করে নূহা বুক থেকে মাথা তুলে তাকায় পিটপিট করে তাকায় তিহানের দিকে। তিহান তার মাথা নিচুঁ করে আড়চোখে তাকায় নূহার মুখের আদলে। উভয়ের চোখ মিলিত হয়‚তাদের মধ্যে থাকা জড়তা আর ভয় দূর হয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায় দুইজন। দূরে থাকা সিনিয়রা পুনরায় তাদের তাড়া দিয়ে বলে
“তোমরা দুইজন কি করছ?রোমান্টিক ডান্স করতে হবে তোমাদের! তিহান তুমি নূহার কোমড়ে হাত দাও। দ্রুত ডান্স শুরু কর।”
কোমড়ে হাত দেওয়ার কথা শুনে নূহা বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায় চোখ দিয়ে ইশারা দিয়ে “না” করল তিহানকে। কিন্তু তিহান শুনল না সে এখন ঘোরের মধ্যে চলে গেছে! তিহান তার হাত ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায় নূহার কোমড়ে এরপর জামার উপর দিয়ে সেখানে স্পর্শ করল। এরপর কোমড়ে চাপ করার সাথে সাথে নূহার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল! তিহানের নেশাক্ত চোখ তার মায়াময় চাহনি নূহার অদ্ভুত লাগল! পৃর্বের ন্যায় এই তিহানের চোখে সে ঘৃণা ‚ রাগ ‚ ঝগড়া দেখতে পারল না বরং এক অদৃশ্য মায়াজাল দেখল। যে চোখের মোহে নূহা হারিয়ে গেল তার চিরশত্রুর নিকটে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেল তার মনে।
নূহার কোমড়ে থাকা হাত ধীরে ধীরে উপরে উঠাল তিহান। এরপর নূহার বাহুদ্বয় স্পর্শ করে তার মুষ্ঠিবদ্ব হাত তার আঙুলের ভাঁজে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে। এরপর উঁচু করে দুইজনের হাত উপরে তুলে তিহান ‚ নূহার লজ্জায় রাঙা রক্তিম মুখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে
“চলুন নাচ শুরু করি।”
শান্ত গলায় বলা তিহানের কথা নূহা শুনল কি না তা বুঝা গেল না! শুধু মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক সম্মতি দেয় সে। নূহার অনুমতি পেয়ে তিহান মৃদু হাসল এরপর সে মুষ্ঠিবদ্ব করা তাদের হাতে ঘুরিয়ে নূহাকে তার আর একটু কাছে নিয়ে আসে। দুইজনের ঠোঁট ছুঁয়ে যাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা ছিল তাদের মধ্যে ‚ নূহার কম্পিত ঠোঁট জুড়া নজরে পড়ল তিহানের। তার শরীর বেয়ে উষ্ণ ঘাম গড়িয়ে পড়ল ‚ এই তীব্র শীতে তার গরম করছে! এরপর তিহান আর নূহা দুই বিপরীত পাশে পা বাড়িয়ে একে অপরের সাথে তাল মিলাল।
তিহান নূহার হাত ধরে ঘুরাল নূহা তিহানের চারপাশে ঘুরল। নূহার পরহিত গাউন পাখির ডানার মতো মেলে উঠল। নূহা এইবার তিহানের হাত ছেড়ে দিয়ে তার হাত দিয়ে তিহানের বুক স্পর্শ করল। ধীরে ধীরে তিহানের বুকে হাত দিয়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো প্রসস্ত বুকে হাত ছুয়িঁয়ে দেয়। এরপর তিহানের পিছনে গিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকল। গানের সুমধুর ধ্বনি আর তাদের একে অপরের চোখের রোমান্টিক ডান্স যেনো এই তীব্র শীতের মাঝে আগুন ধরিয়ে দিল। নূহা যখন ঘুরে ঘুরে তিহানের থেকে দূরে যেতে চাই তখন তিহান হাত ধরে নূহাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। পিছন থেকে নূহাকে ধরে তার কাছে নিয়ে আসে পুনরায় তার বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
দূরে টেবিলে পড়ে তিহান আর নূহার নাচ দেখছে মেঘ আর মিটমিট করে হাসছে। এই দুইজন যতই ঝগড়া আর মান _ অভিমান করুক না কেন! তাদের একসাথে কিন্তু বেশ মানায় একদম পারফেক্ট কাপল। আর ভালোবাসার মাঝে যদি ঝগড়া ‚ দুষ্ট মিষ্টি হাসি ঠাট্টা আর খুনসুটি না থাকে তবে সে প্রেম কখন পূর্ণতা। নূহা আর তিহান উভয়ই যদি ঝগড়া করতে করতে ধীরে ধীরে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায় তবে কিন্তু মন্দ হবে না! তাছাড়া তিহান ছেলে হিসাবে যথেষ্ট ভালো ‚ শান্ত শিষ্ট আর ভদ্র নূহা ও তাই সুন্দরী ‚ বুদ্ধিমতি আর খুব মিশুক প্রকৃতির। ভবিষ্যত কি হবে তা না হয় ভাগ্য ঠিক করে দিবে!
প্রায় পাঁচ মিনিট পর নূহা আর তিহানের ডান্স শেষ হয় রোমান্স আর মুগ্ধতায় ভরা কাপল ডান্স করেছে তারা। ডান্স শেষ হবার পর আশেপাশে থাকা সকলে হাততালি দিয়ে উঠে। সিনিয়রা তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ! কিন্তু নূহা আর তিহানের কানে এখন হাততালি বা গান থেমে যাওয়ার বিষয়টা যায়নি! তারা এখন ও একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে আছে। নূহার চোখে সমুদ্রের ন্যায় গভীরতা ‚ যার মাঝে তিহান হারিয়ে গেছে! দুইজনে এখন ও খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। সিনিয়রা সকলে এগিয়ে যায় ডান্স গাউনে এরপর খুশি হয়ে জোরে শব্দ করে বলে উঠে
“নূহা‚ তিহান তোমারা উভয়ে খুব সুন্দর ডান্স করেছ। এককথায় দারুণ হয়েছে। কি রোমান্স! আর কি এক্সপ্রেশন দিলে তোমরা। যাস্ট ওয়াও।”
হঠাৎ সিনিয়রের কণ্ঠ শুনে নূহা আর তিহান দুইজনে চমকে যায়। তারা দ্রুত ঘোর থেকে বের হয়ে আসে এরপর আশেপাশে তাকায়। ডান্স শেষ হয়ে গেছে! এইটা বুঝে তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে আসে। ডান্স করার সময় তারা একে অপরের সাথে যে রোমান্স করেছে এই কথাটা অবিশ্বাস্য লাগছে তাদের কাছে! আর এতোখন কি হয়েছিল তাদের? কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল তারা? সত্যি নূহা তার চিরশত্রু এই মি:সয়তানের সাথে ডান্স করছে? আর তিহান সে কি করে এই মিসেস: ঝগড়ুটের সাথে রোমান্টিক কাপল ডান্স করতে পারে! অসম্ভব‚ তারা দুইজন করবে রোমান্স!
কিন্তু পাঁচ মিনিট সময় আগে তাদের করা ডান্স আর রোমান্টিক মুহূর্তর কথা মনে করে বেশ লজ্জা পাচ্ছে দুইজন। একে অপরের দিকে তাকিয়ে দেখতে অবধি পারছে না। আর সিনিয়রা তাদের লজ্জা দিতে আরো ইচ্ছা করে ক্ষেপিয়ে যাচ্ছে! নূহা আর গাউনে দাঁড়িয়ে থাকতে পাড়ল না সে দৌড়ে ছুটে চলে আসে আগের জায়গায়। যেখানে মেঘ বসেছিল। টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ায় নূহা ‚ মেঘ বসে থাকা থেকে উঠে দাঁড়ায় এরপর নূহার লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া গাল দুইটি টেনে ধরে বলে
“কি হয়েছে তোমার নূহা? হঠাৎ করে এমন লজ্জা পাচ্ছো কেন? ডান্স গাউনে এতোখন তিহানের সাথে খুব রোমান্স করছিলে! এখন এমন লজ্জায় লাল ‚ নীল হয়ে যাওয়ার কারণ কি শুনি?”
নূহা মেঘের দিকে রাগী দৃষ্টিতে চোখ গরম করে তাকায়। কিন্তু মেঘ ভয় পায় না বরং সে শব্দ করে খিলখিল করে হাসতে থাকে। মেঘ বেশ বুঝতে পারল নূহা খুব শীঘ্রই তিহানের প্রেমে পড়বে! অবশ্যই পড়বে।
ডান্স প্র্যাকটিস রুমে সবাই নবীন বরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে নাচ _ গান অনুশীলন করতে থাকে। মেঘ তার গান গেয়ে সবাইকে শুনায়। যদিও তারা বাংলা বুঝতে পারে না তবুও মেঘের গানের কণ্ঠের প্রশংসা করে।
[দুপুর ২: ০০]
নবীন বরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে সারা কলেজ রঙিন লাল মরিচা বাতি দিয়ে সাজানো রয়েছে। কলেজ প্রাঙ্গনে বড় স্টেজ বসান হয়েছে যা হাজার রকমের ফুল আর রঙিন কাপড় দ্বারা সজ্জিত। সময় খুব কম থাকায় আয়োজন খুব সুন্দর হয়নি কিন্তু খারাপ হয়নি৷ সাধারণতের মধ্যে অসাধারণ ছিল আয়োজন। আর আদ্রিয়ানের পছন্দের অবশ্যই প্রশংসা করতে হয় এতো অল্প সময়ের মধ্যে খুব সুন্দর করে সমগ্র সাজিয়ে ফেলেছে।
আজ সারাদিন কলেজে ক্লাস হয়নি যার ফলে ছাএ ছাএীরা সকলে মিলে বেশ আনন্দ আর মজা করেছে। একসাথে আড্ডা দেওয়া ‚ অনুষ্ঠানের জন্য কলেজ সাজান আদ্রিয়ানকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করা তারা। মেঘের আজ সারাদিন খুব ভালো কেটেছে। সিনিয়র সহ অন্য সব ছাএ ছাএীর সাথে পরিচয় হয়েছে তার! কলেজের নিয়মিত ক্লাস আর পড়াশোনায় মাঝে একটু সকলে মিলে আনন্দঘন মুহুর্ত কাটিয়েছে! বাসায় একা থাকলে হয়ত বোরিং ফিল করত তাই কলেজে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিকই করেছে।
দুপুরে ২:০০ বাজে প্রতৈকের বেশ খুদা লাগছে। আজ কেন্টিন বন্ধ থাকবে তাই কলেজ কমিটির পক্ষ থেকে সকলের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্টেজের বাহিরে চেয়ার রাখা সেখানে বসে সবাই খাবার খাচ্ছে। মেঘ তার খাবার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সাদা কাগজে মোড়ান পলিথিন এর ভিতরে হাল্কা নাস্তা। আশেপাশে তাকিয়ে আদ্রিয়ানকে খুঁজছিল সারাদিন ধরে একবার ও আদ্রিয়ানের সাথে কথা হয়নি তার। দূর থেকে একবার দেখছিল কিন্তু কথা হয়নি। তাছাড়া এতো ছাত্র ছাএী ভিড়ে কথা বলা যেত না আর আদ্রিয়ান কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আদ্রিয়ান শুধু ডিম আর পাউরুটি খেয়েছিল। আর সারাদিন কিছু খায়নি! দুপুর হয়ে গেছে এখন ও খাবার খেয়েছে কি না তা মেঘ জানে না! আশেপাশে কোথাও দেখা অবধি যাচ্ছে না! কোথায় ওনি?
মেঘ কেবিনের ভিতরে ঢুকল। আদ্রিয়ান এখন ও নিচু হয়ে কাগজ দেখছে একবার ও মেঘের দিকে তাকায় না। মেঘ তার হাতে রাখা কাগজ আদ্রিয়ানের মুখের উপর ধরে বলে
“এই যে সিনিয়র আপু আপনাকে এই লিস্ট দিতে বলছে।”
আদ্রিয়ান শান্ত গলায় বলে
“হুম টেবিলে রাখ।”
মেঘ জানে এখন যদি সে এখান থেকে চলে যায়। তবে আদ্রিয়ান এই খাবার খাবে না। আবার কাজে বিজি হয়ে যাবে! তাই মেঘ বাধ্য হয়ে এগিয়ে যায় আদ্রিয়ানের পাশে বসে। এরপর টেবিলে থাকা বাক্স থেকে খাবার বের করে আদ্রিয়ানের মুখের সামনে ধরে। আদ্রিয়ান এতোখন যা চাইছিল তাই হয়েছে! সে ওপাশ ফিরে মেঘের হাতের খাবার খেয়ে নেয়!
খাওয়া দাওয়া শেষ করে মেঘ রুমাল দিয়ে আদ্রিয়ানের ঠোঁট পরিস্কার করে দেওয়ার উদ্দেশ্য তার কাছে যায়। কিন্তু আদ্রিয়ান নিচুঁ হয়ে কাগজ দেখছিল দেখে ‚ মেঘ বিরক্ত আর রাগ করে। আদ্রিয়ানের শার্টের কর্লার ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে এরপর রুমাল দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দেয়। আদ্রিয়ানের ঠোঁটে লেগে থাকা খাবারের অংশ মেঘ তার আঙুল দিয়ে পরিস্কার করে তখন আদ্রিয়ান তার দিকে তাকায়। একটু মুচকি হাসে মেঘ দ্রুত তার হাত সরিয়ে নেয় এরপর বলে
“আমি আসছি আপনি থাকুন।”
মেঘ কথাটা বলে কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। আদ্রিয়ান মেঘের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসে। এরপর তার ঠোঁটে লেগে থাকা মেঘের হাতের ছোঁয়ার উপর আঙুল রাখে। ঠোঁট কামড়ে ধরে লজ্জা মিশ্রিত হাসি দেয়।
বিকাল প্রায় ৫:০০। মেঘ স্টেজের সামনে রাখা চেয়ারে বসে ছিল৷ সকল ছাএ ছাএী এখন বাহিরে রেকের্ট খেলছে। এই দিক এখন ফাঁকা কেউ নাই। মেঘের এই নীরব আর শান্ত পরিবেশ বেশ ভালো লাগছিল। দূর থেকে মেঘকে একা বসে থাকতে দেখে আদ্রিয়ান এগিয়ে আসে তার কাছে। এরপর মেঘের পাশে বসে তার হাতে থাকা কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলে
“মেঘ কফি খাও।”
আদ্রিয়ানের হাত থেকে মেঘ কফি নেয়। এরপর খেতে থাকে তারা একসাথে অনুষ্ঠানের বিষয়ে কথা বলছিল। হঠাৎ মেঘের ফোনে কল আসে ফোনের স্কিনে জামান সাহেবের নাম্বার দেখে মেঘ বলে
“আদ্রিয়ান স্যার আমার ফোন এসেছে। আমি একটু কথা বলে আসছি।”
“হুম যাও।”
মেঘ দূরে চলে যায় এরপর ফোন রিসিভ করে বলে
“হ্যালো বড় আব্বু? কেমন আছো তুমি?”
“হুম আমি ভালো তুমি কেমন আছো মেঘ?”
“জি ভালো। কিন্তু হঠাৎ তুমি কেন ফোন করলে? ”
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩৭
__ মেঘ তোমার আর আদ্রিয়ানের ডিভোর্স পেপার রেডি হয়ে গেছে। তুমি কি আদ্রিয়ানকে ডিভোর্স দিতে চাও?
জামান সাহেব কথাটা শুনে মেঘ থমকে যায় এরপর একবার দূরে বসে থাকা আদ্রিয়ানের দিকে তাকায়। আদ্রিয়ান হয়ত এখন মেঘের সাথে ভালো ব্যবহার করছে তার যত্ন করছে। কিন্তু গত নয় বছর আগের অতীত মেঘ ভুলে যায়নি। মেঘ শান্ত হয়ে বলে
___ হুম চাই। তুমি ডিভোর্স পেপার রেডি করো।

Part 39 koi.. Den fst