Home দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৪৮

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৪৮

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৪৮
আফরোজা আশা

বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে মাইশা। ভয়ে গলা শুকিয়ে এসেছে ওর। সামনে দরজার সাথে হেলান দিয়ে হাত ভাজ করে দাঁড়িয়ে রায়হান। ঠোঁটে ক্রুর হাসি ঝুলছে। মাইশার দৃষ্টি এলোমেলো হলো। সব রাগ গিয়ে পড়ল দিশার উপর। দিশা ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে পালিয়েছে।
হাঁটাহাঁটি, কাজকর্ম করার ফলে শরীর আর সায় দিচ্ছিল না মাইশার। কোমড়ের ব্যাথাটাও পুরোপুরি সারেনি। তাই বেলাকে দিগন্তের ঘরে রেখে সেও নিজের রুমে চলে গিয়েছিল। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। হুট করে ঘুমের মাঝে দিশার ফোন পেয়ে সেভাবেই ছুটে এসেছে ওর রুমে। আর এসেই যেন ফেঁসে গেল।
দিশার রুমে দিশা নেই। রুম ফাঁকা। একটু এদিক সেদিক দেখতেই পেছন থেকে এসে রায়হান দরজা আটকে দিল। এখন মিনিট দশেক ধরে সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। রায়হানের কাজে ভেতরে ভেতরে ভয় পেলেও, বাহিরে বিরক্তির ভঙ্গিমা ধরল মাইশা। শুষ্ক অধরজোড়া ভিজিয়ে বলল,

‘ দরজা ছেড়ে দাঁড়ান। আমি বাইরে যাবো। ’
হেলান দেওয়া শরীর সোজা করলো রায়হান। দুহাত মাথার উপরে তুলে অলস ভঙ্গিতে গা মোচড়ালো। একটা বিরাট হাই তুলে বলল,
‘ দিশা নিজ থেকে আমার রাস্তা ক্লিয়ার করে দিল। ওর কষ্ট আমি বৃথা যেতে দেই কিভাবে! প্রয়োজন পড়লে উপহার হিসেবে ওকে খালা বানিয়ে দেই। কি বলো বউ? ’
রায়হান খাপছাড়া কথায় ক্ষেপলো মাইশা। কথার ইঙ্গিতগুলো সহ্য হলো না ওর। কানে ভাসলো সেদিনের তিক্ত কথাগুলো।শান্তশিষ্ট মেয়েরা সহজে রাগে না। কিন্তু একবার রাগলে তার হুশ থাকে না। ক্ষেপা বাঘ হয় যেন। সে দশা হলো মাইশারও। রায়হানের দিকে জোর পায়ে এগিয়ে গেল। ওর বুকের কাছের শার্ট দুহাতে খামচি দিয়ে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ অসভ্যতামির একটা সীমা থাকা উচিত। আপনি ধারণা আছে আপনি কি বলছেন? কোন অধিকারে বলছেন এসব? লজ্জা করে না আপনার? সেদিন যেমন আপনি বিপদে পড়েছিলেন, আমিও তো বিপদে পড়েছিলাম। আপনাকে কে বলেছিল এসে হিরোগিরি দেখাতে। দয়া দেখিয়ে বাঁচাতে এসে, চরিত্রে দাগ লাগিয়ে দিলেন। ’
বলতে বলতে ঠোঁট ভেঙ্গে এলো মাইশার। চোখ গড়িয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল। কিন্তু চোখেমুখে প্রচন্ড রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃণা। একটু থেমে জোরে জোরে দুটো শ্বাস টেনে আবার বলতে ধরল,
‘ থুথু দিয়েছিলেন আমার উপর। বলেছিলেন, আমার মতো মেয়েকে কেউ কবুল করবে না। আপনি এসে ওই জানো’য়ারদের হাত থেকে বাঁচালেন না? দেখিছেলেন তো স্পষ্ট, ওরা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। অথচ কি সুন্দর বলে দিলেন, ওরা আমাকে ছুঁয়েছে , আমি ওদের-ই যোগ্য। ’

এ পর্যায়ে এসে দাঁতে দাঁত পিষে ধরল মাইশা। রায়হানের শার্ট টেনে ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল ,
‘ আমি ওদের যোগ্য? ওই ধর্ষকদের যোগ্য আমি? আমার চরিত্র এতো খারাপ? আর ওরা আমাকে ছুঁয়েছে, এটা কেনো বলেছিলেন? আমাকে ছুঁয়েছে মানে? কি ইঙ্গিত ছিল? আমাকে ধ..ধর্ষণ করে..’
আর বলতে পারল না মাইশা। রায়হানের পুরুষালি শক্ত হাত সজোরে চেপে ধরলো ওর মুখ। কথা বের হওয়ার ফুরসত নেই। মাইশা উন্মাদের মতো ছটফট করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য। কথা শেষ হয় নি ওর। রায়হানের শার্ট ছেড়ে ওর হাত খামচে ধরলো।

শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ধরার ফলস্বরূপ মাইশার হাতের নখ বিঁধলো রায়হানের হাতে। হয়তো রক্তও বের হয়েছে। নিরবে সে ব্যাথা সয়ে নিল রায়হান। চোখজোড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওর। চোয়াল শক্ত। মাইশার মুখ নিঃসৃত একেকটা শব্দ তীরের ফলার ন্যায় আঘাত হেনেছে ওর বুকে।
রায়হানের হাতে খামচি দিয়ে কাজ হলো না দেখে, ওর বুকে- শরীরে এলো-পাথারি হাত চালালো। তাতেও বিশেষ সুবিধা হলো না। আরো কিছুক্ষন মোচড়ামোচড়ি করে নিজেকে রায়হানের থেকে মুক্ত করতে না পেরে হাঁপিয়ে উঠল মাইশা। হাল ছেড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রায়হান স্থির চিত্তে ওর দিকে তাকিয়ে। মাইশাকে নরম হতে দেখে ওর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। ছাড়া পেয়েও নড়ল না মাইশা। একদম শান্ত। মুখ থেকে টু শব্দ বের হলো না। চোখের পাতা স্থির। দৃষ্টি একপাক্ষিক ভাবে অনড় রায়হানের দিকে। রায়হানের উত্তর শুনতে চায় ও।

মাইশার দুগাল আলগোছে ধরে ওর কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিল রায়হান। চোখ বুজে নিয়ে অপরাধী গলায় বলল,
‘ সেদিন আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না। চোখের পলকে এতোকিছু ঘটে যাওয়ার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। পরিস্থিতির চাপে বেসামাল ছিলাম আমি। রাগের বশে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। কি বলেছি না বলেছি তা আমার স্মরণে নেই। বিশ্বাস করো, সেদিনের বলা কোনো কথা আমার মনে নেই। শুধু জানি, আমি অপরাধী। তোমার সাথে চরম অন্যায় করেছি। প্রতি মুহূর্ত আমি সেই অপরাধের জন্য নিজেকে দোষীর কাঠগড়ায় রাখি। তোমার সাথে করা অন্যায়ের দায়ে নিজেকে প্রহার করি। দোহাই, পুরনো সেই কথার জেরে আমাদের বর্তমান, ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না। তুমি যা ভেবেছো আমার কথার মানে এতোটা বিকৃত হতে পারে না। ’
একরোখা জবাব এলো মাইশার, ‘ ভালো কিছুও তো বলেননি। ’
কড়া জবাবে অসহায় চোখে মেলে ওর দিকে তাকিয়ে রইল রায়হান।

‘ আবুলের ঘরের আবুল। হাদার বাচ্চা। বলদ ছোকড়া। জাউড়া ব্যাটা ছেলে। এটাই লাস্ট মেসেজ দিলাম। রিপ্লাই না দিলে তুই মরেও শান্তি পাবি না রে। এই সিঙ্গেলের কথা তোর কপালে লাগুক। ফুউউ। ’
কপালে গাঢ় ভাজ ফেলে মেসেজটার দিকে তাকিয়ে আছে ফাহাদ। ঘুমের ওষুধ খেয়ে সারাদিন ঘুমিয়েছে। সদ্য ঘুম ভেঙ্গে ফোন হাতে নিতেই উপরোক্ত মেসেজ দেখে চোয়াল শক্ত করে রেখেছে। মন-মেজাজ বিশেষ ভালো নেই। তার মাঝে এটা দেখে মাথায় আগুন ধরে গেল। কয়েকদিন থেকে ওকে মেসেজ পাঠায়। সীন করার প্রয়োজনবোধ করেনি। সেভাবেই ফেলে রাখত। কিন্তু আজ মেসেজের ভাষা দেখে রেগেছে অনেক। বেড সাইডে হেলান দিয়ে আইডিতে অডিও কল দিল।

রেহানার পাশে শুয়ে ইয়ারফোন কানে গুজে রিলস দেখছে দিশা। মাইশাকে ওর রুমে পাঠিয়ে ও এসেছে মাইশার রুমে। পাশে রেহানা গভীর ঘুমে। রিলসের মাঝে কল আসায় বিরক্ত হলো, কিন্তু পরপরই তা উবে গেল। চোখ বড় বড় স্ক্রি তাকালো দিশা। হাত দিয়ে কোচলে আবার তাকালো। না, ভুল দেখছে না। ফাহাদের আইডি থেকে অডিও কল। লাফিয়ে উঠে বসল ও। ফোন রিসিভ করতে করতে বেলকনির দিকে ছুটল।
‘ থাপ্পড় চিনিস? কার সাথে লাগতে এসেছিস ধারণা আছে? ফেইক আইডি খুলে তামাশা করিস আমার সাথে। ভালোয় ভালোয় নাম বল। ’
ফাহাদের রাগান্বিত স্বরের কথা শুনে ফাঁকা ঢোক গিলল দিশা। রিয়েল আইডি দিয়ে নক দেওয়ার সাহস হয়নি ওর। তাই দ্বিতীয় আরেকটা আইডি খুলে সেটা দিয়ে ফাহাদকে স্টক করে। গলা খাকড়ি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে বলল,

‘ আরে জান। এতো দেরী করলা জান। তোমার গলার আওয়াজে আমার জান মনে হয় গেল জান। এতো সুন্দর কেন! ভেতর ফুটা হয়ে গেছে জান। ’
গলার স্বর শোনা শোনা লাগল ফাহাদের। হিসহিসিয়ে বলল,
‘ কে? ভালো চাইলে ধরা দে। আমি ধরলে কিন্তু গেড়ে দিবো। ’
ফাহাদের রাগ ভালো লাগছে দিশা। হাসি চেপে বলল,
‘ আচ্ছা। ভালোভাবে ধরিও জান। একবারে দশমাস। ’
থতমত খেলো ফাহাদ। কান থেকে ফোন সরিয়ে জোরে দম ছাড়ল। রাগে মাথা দপদপ করে জ্বলছে। পুনরায় ফোন কানে নিয়ে কিছু বলার আগে অপরপাশ থেকে ভেসে এলো,
‘ এতো জোরে শ্বাস নিও না জান। আমি এখনো দূরে। কিছু করিনি। ’
ফাহাদ বাকহারা হলো। চোখ বন্ধ করে ফোন কেটে আছাড় মারল বিছানায়। মেয়ে মানুষের এতো বেহায়াপনা, তাও ওর সাথে। মানতে কষ্ট হলো।

জয়নালের কোলে ঘুমিয়ে আছে প্রত্যাশা। পাশে সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে জুনায়েদ। প্রেশার বেড়েছিল তার। ওষুধ নিয়েছে কিন্তু ঘাড় টানা ছাড়েনি এখনো। কিছুক্ষন আগে শরীর কাঁপছিল। জয়নাল চাবি দিতে এসে দেখে ভাইয়ের শরীর খারাপ। একা ছাড়তে পারে না। রতনের বাপকে ডেকে গাড়ি ড্রাইভ করতে বলে।
জুনায়দকে ডাক্তার দেখিয়ে এখন মনার কাছে যাচ্ছে। প্রত্যাশাকে রেখে আবার তালুকদার বাড়ি ফিরবে তারা।
গাড়ি এসে থামল ডুপ্লেক্স একটা বাড়ির সামনে। জুনায়েদ প্রত্যাশাকে জয়নালের কাছ থেকে নিয়ে নিচে নামল। জয়নালকে বলল ভেতরে যেতে কিন্তু তার ভালো করে জানা জয়নাল ভেতরে যাবে না। তাই একবার বলেই ভেতরে চলে গেল। জুনায়েদ যেতে রতনের বাপ জয়নালের উদ্দেশ্যে বলল,

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৪৭ (২)

‘ ভাইজান, চা খাবেন? রাস্তার ওইপারের চা টা ভালা। ’
জয়নাল একপলক ওপর পাশের টং দোকানটা দেখল। ঘুম লাগছে তার, মাথা ভার ভার হয়েছে। চা খেলে হয়তো ভালো লাগবে। তাই বলল,
‘ যা আন। মাথা ধরছে। খেলে ভালোই। ’

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৪৮ (২)