Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ১৬

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৬

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৬
আশিকা আক্তার সোহাগী

মানুষ কত বড়?
-মানুষ ঠিক তার স্বপ্নের মতো বড়।
মানুষের মন কতটা বিশাল?
-এক আসমান সমান।
পৃথিবীতে সবচেয়ে মমতাধর কে?
-মা।

এই স্নিগ্ধ সুন্দর প্রশ্ন গুলোর উত্তর সবার কম বেশি জানা। সময় নির্দেশক যন্ত্রের সবচেয়ে অলস কাটা যখন তিনের ঘরে , জিয়াউলের চোখ লেগে এসেছিলো।ঘুমে ঢুলুনি দিতেই চড়াক করে চোখ মেলে তাকালো। আর দেখতে পেলো আঞ্জুমান বিনাক্লান্তিতে অনবরত শরীর স্পঞ্জ করে চলেছে এখনো।জিয়াউল অপলক ঘুমুঘুমু চোখে চেয়ে দেখে নিজ পত্নীকে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

চল্লিশ পাড় করে ফেলেছে। চোখের পাশে ভাজ পড়েছে একটা। দুই বছর ট্রেনিং শেষে বাড়ি ফেরার পর ,সদ্য কলেজে উঠা যুবতিকে দেখে মন মস্তিস্কের সেই যে আন্দোলন শুরু হলো। তা এখনো চলমান। জিয়াউল মাঝেমাঝে ভাবে সৃষ্টিকর্তা তার উপর কোন একটা কারণে ভিশন সন্তুষ্ট ছিলেন। তাই তো ভাগ্য করে এমন একজন জীবনসঙ্গী পেয়েছে। ত্রিশ বছর সংসার জীবনে বন্ধুর সময় এসেছে অনেক।কিন্তু সবসময় পাশে পেয়েছে এই নারীকে।নীলুফার জের ধরে গ্রামের বাড়িঘর যখন সব জ্বালিয়ে দিলো মামুন ইসলামের লোকজন। সেদিনও একটা শব্দ বা অভিযোগ করেনি আঞ্জুমান।
জিয়াউলের এমন তাকানো দেখে আঞ্জুমান কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করে ,

-কি দেখো এমন করে?
-আমার সন্তানদের মাকে। আমার সেই যুবতি প্রেমিকাকে। যে এখনো সেই সরলতা আর সুন্দরের প্রতীক আমার কাছে।
বলে আঞ্জুমানের গালে আলতু ছুঁয়ে দিলেন জিয়াউর।
-আহা কি হচ্ছে টা কি জিয়া? বুড়ো বয়সে ভিমরতি?
-কিসের বুড়ো? আমি এখনো তাগড়া যুবক। প্রমাণ চাও?
জিয়াউলের কন্ঠে দুষ্টমির ছাপ।
-বদমাশ লোক। ছেলে মেয়ে বিয়ে দিলে দুইদিন পর নাতি-নাতনি পাবে এখনো ফাজলামো করছো?

-আমার তো এখন ইচ্ছা হচ্ছে এমন কিউট কিউট আরও একটা বাচ্চার বাবা হতে। তুমি নাতি-নাতনিতে চলে গেলা কেন?
জিয়ানাকে ইশারা করে দেখিয়ে বলে জিয়া।
আঞ্জুমান চোখ রাঙিয়ে শাসালো কিন্তু মুখে লাজুক হাঁসি।
হঠাৎ জিয়ানা মাথা উঁচু করে বলে উঠলো ,
-আব্বু আম্মু তোমরা আমার সামনে রোমান্স করছো? আমি সিঙ্গেল বলে এতটাও অবুঝ না। কালই আমি শাহাবাগে যাবো আন্দোলন করবো। আর কোন ভাইবোন চাই না। আমার পদ আমি আর কাউকে দিতে পারবো না।সো রোমান্স বন্ধ। আর কোন সম্পত্তির ভাগিদার মানি না মানবো না।
জ্বরে ভাঙ্গা ভাঙ্গা আওয়াজে হাত উঠিয়ে স্লোগান দেয়ার ভঙ্গিতে বলে আবার শোয়ে পড়ে জিয়ানা।
আঞ্জুমান পারে না খাটের নিচে ঢুকে যেতে। এই মেয়ে এত ঠোঁট কাটা হয়েছে।নিজের অস্বস্তি লুকাতে জিয়ানার বাহুতে আলতু চাপড় দিয়ে বলে,

-জাতে মাতাল তালে হুশ। পাজি মেয়ে তুই না ঘুমে?
-আমার কান কখনো ঘুমায় না আম্মু।এটা তোমার বরের কঠিন ট্রেনিংয়ের ফল।ইন-ফ্যাচুয়েশনের বয়সে প্রতিদিন মাটির পাতিল কিক করে ফুটো করে এসেছি বলে আমার আবার লজ্জাও কাজ করে কম।
শুকনা গলা অহেতুক খাকি দিয়ে জিয়াউল নিজেকে শক্ত ফর্মে নিতে চাইলো যেনো। তারপর জিয়ানার কপালে হাত দিয়ে বলে,

-জ্বর সেরে যাচ্ছে। আঞ্জু তোমার কাল কলেজ আছে যাও একটু ঘুমিয়ে নাও। বাকি সময় আমি আছি এখানে।
আঞ্জুমান হাতের কাপড় আর পানির পাত্র সাইড টেবিলে রেখে জিয়ানার পাশে শোয়ে বলে,
-একটু পর আজানই দিবে।আমি আছি তুমি গিয়ে রেষ্ট নাও।
-তোমরা দুইজনই যাও আমার এখন ভালো লাগছে বেশ।একটু পর উঠে জগিংয়ে বের হবো।
-আজ আর জগিং করতে হবে না।আর পায়ের নখ পুরাটাই উঠে গেছে। কিছুদিন স্যান্ডেল টাইপ জুতা পড়বি।
বলে জিয়াউল রুম থেকে বের হয়ে গেলো।জিয়ানা পাশ ফিরে আঞ্জুমানকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে টেনে নিলো মা মা গন্ধ।

একবার মির্জা গালিব খুবই হতাশা হয়ে একবার বলেছিলেন ,
“দুঃখ গুলো পৃথিবীতে এসে জিজ্ঞেস করে ,মির্জা গালিবের ঘর কোন দিকে? কারণ তারা সবসময় আমার বুক পকেটেই থাকে। ”
ভার্সিটির মাঠে দাঁড়িয়ে নিবিড়ের মনে হলো ,মির্জা গালিব একা নন উনার সাথে জন্মগত হতভাগা সুখনীল নিবিড়ও আছেন।

আত্মীয় স্বজন বলতে এক মামা। আরেক মামা মানে সমুদ্রের পিতা নিবিড়কে একপ্রকার জাত শত্রু মনে করে। আর নিজের পরিবার সবাই থেকেও নেই। নিজে থেকে কোন সম্পর্কে জড়াতে প্রচুর দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে তার মাঝে।বন্ধু বলতে সজীব ,সমুদ্র কাছের। কিন্তু মক্কু আর বদি ডান হাত বাম হাত হলেও নিজের ভাইয়ের চেয়ে কম মনে করে না। সমুদ্রকে প্রথম থেকেই নিবিড় সোজা চোখে দেখেনি। কিন্তু সমুদ্র নিজেই আগ বাড়িয়ে নিবিড়ের সাথে মিশে থাকতো। দীর্ঘকাল একসাথে উঠাবসা করে একসময় সমুদ্র আস্থাভাজন একজন হয়ে উঠেছে।শত্রুর পাতা ফাঁদ অদৃশ্য হলেও প্রতিপক্ষ সতর্ক থাকে। কিন্তু বন্ধুর পাতা ফাঁদ সম্পর্কে কেউ অবগত হয় না। যতক্ষন না বন্ধু শত্রুতে পরিনত হয়। অপরদিকে বদি নিজের বোন বিয়ে দেয়াই বোন জামাইয়ের সাইডেই থাকবে না নিবিড়ের সাইডে ,সে পড়েছে এক মাইনকার চিপায়।তাই দুইজনের মাঝখানেই সে নিষ্পল দাঁড়িয়ে আছে।
মক্কু সহ আরও বেশকিছু পোলাপান নিবিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।নিবিড় কয়েকপা এগিয়ে সমুদ্রের সামনাসামনি হয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

-সমস্যা কি? গ্রুপিং করছিস? পদ চাস? ভালো কথা ,নিবি।কিন্তু আমার ছেলেপেলেদের মকবুলের হাতে মার খাওয়ালি কেন?
-মকবুলের সাথে আমার কোন লেনদেন নাই। ওই হা*লার পু হা*লা আমার নাম ভাঙ্গাইয়া চলে।
সমুদ্রের কন্ঠে অতি কনফিডেন্ট।
-বিশ্বাস করলাম। সেকেন্ড ইয়ারের জার্নালিজমে পড়া মেয়েটাকে কিডন্যাপের কারণ?
-সেটা তোর বাপকে জিগা যাহ।
মক্কু এগিয়ে এসে বলে,
-ভাই এতদিন আপনারে সম্মান করছি খালি ভাইয়ের বন্ধু বইলা। নাহলে যে চোখ তুইলা কেউ ভাইয়ের দিকে তাকায় সেই চোখ আর শরীরে রাখি না।
সমুদ্র মক্কুর শার্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,

-চামচা চামচার মতো থাকবি। বেশি লাফালাফি করবি একেবারে ছেটে ফেলবো।
-নিবিড় গিয়ে সমুদ্রের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। মক্কুর শার্টের কলার ঠিক করে বলে,
-আমার ছোট ভাইয়ের শরীরের হাত দেয়া মানে আমার শরীরে হাত দেয়া। আমাকে ডিঙ্গিয়ে তারপর তাদের দিকে হাত বাড়াতে হবে। আর কি বললি? চেয়্যারম্যান সাহেবের কথায় করেছিস এমন লেইম কাজ?
-চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান করিস কেন? এখনো নিজেকে বেজন্মা ভাবিস? তোর মাকে না বিয়ে করছে?
বলে সমুদ্র অট্টহাসি দিয়ে চুলে হাত দিয়ে ব্যাকব্রাশ করলো।

এদিকে নিবিড়ের ভাবমূর্তি বুঝা গেলো না। কোমড়ের রিভা*বার টা টান দিয়ে বের করে মক্কুর দিকে ছুড়ে মেরে শার্টের হাতা গুটালো। মুহূর্তেই চোখ মুখে এক প্রকার হিংস্রতা ভড় করলো যেনো। চোখের শ্বেতমন্ডল ক্রমশ লালচে আভায় ঢেকে গেলো। হাতের রগ শক্ত মুষ্টির কারণে ফুলেফেঁপে উঠেছে। সেই ইস্পাত-দৃঢ় হাত দিয়েই তীব্র গতিতে ছুটে গেলো সমুদ্রের চোয়াল বরাবর। একেবারে অপ্রস্তুত সমুদ্র প্রকান্ড ঘু*ষিতে ছিটকে পড়লো মাঠের ঘাসের উপর।
আশেপাশের সবাই থেমে একবার দেখে পরক্ষনেই দ্রুত স্থান ত্যাগের পায়তারা শুরু করেছে। কারণ নিবিড়ের রাগ মানে গুলাগুলি আর অনির্দিষ্টকালের জন্য ভার্সিটি বন্ধ।

মাঠে পড়ারত সমুদ্রকে আর সময় দিলো না উঠার সেই অবস্থাতেই গিয়ে পর পর কয়েকটা লাত্থি দিলো শরীরের সর্বশক্তি খরচ করে। নিবিড়ের ঠোঁট মুখ অত্যন্ত স্থীর কিন্তু চোখে যেনো আগুন ঝড়ছে।
আবার প্রহার করতে গেলে এবার সমুদ্র উঠে নিবিড়ের ডান চোয়ালে একটা ঘু*ষি দিলো। মক্কুর পাশের পার্টির ছেলে গুলা এগুলতে চাইলে মক্কু বাঁধা দিলো তাদের। নিবিড় যখন নিজে হাত বাটে এইসবে ,অন্য কেউ আগালে রাগ করে।
জিয়ানা সাইকেল নেয়ার জন্য ভার্সিটিতে এসেছে অসুস্থ শরীরেই। গেইটে ঢুকতেই দেখতে পেলো সবাই হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে যাচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারলো নিবিড়ের সাথে সমুদ্রের ঝামেলার কথা। সে আর একটু বাড়িয়ে বলল যে গুলাগুলি শুরু হয়েছে।একটু পর পুরা ভার্সিটি ধ্বংসযজ্ঞে পরিনত হবে।
জিয়ানা বেশ আগ্রহ জাগলো ছেলেদের এমন মারামারি দেখার। সিনেমায় অনেক দেখেছে এইবার সরাসরি দেখার পালা। এখন যদি নিবিড়দের মারামারি দেখার জন্য টিকিটও লাগতো ,জিয়ানা টাকা দিয়ে টিকিট কেটে হলেও দেখতো।

বেশি দূর যেতে হলো না। পায়ের নখ উঠে যাওয়াই দ্রুত হাটতে কষ্ট হচ্ছে বিদায় একটু খুড়িয়ে খুড়িয়ে আগালো। মাঠের একপাশে ,সেখানে ব্যাডমিন্টনের কোষ্ট সেখানেই দুইজন একে অপরকে প্রহার করছে। কয়েকজন তাদের চারপাশে শক্ত মুখে তীব্র আগ্রহে তাকিয়ে আছে।
জিয়ানা একেবারে কাছে চলে গেলো। এবং গিয়ে দেখলো নিবিড়ের এক নতুন রুপ। এতদিন জেনে এসেছে এই ভন্ড নেতা একজন মিসোজিনি। আজ দেখলো হিংস্র রুপ।
নিবিড়ের দৃষ্টিতে এক শিকারী সত্তার উপস্থিতি টের পেলো জিয়ানা।যা সামনের টার্গেটের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর। পরের কয়েক সেকেন্ড জিয়ানা কিছু বুঝে উঠার আগেই নিবিড়ের তান্ডবে হা হয়ে গেলো সে।
নিবিড় উল্টা ঘুরে সমুদের হাত ধরে নিজের দিকে একবার করে টান দিলো আর প্রতিবার তীব্র গতিতে নাক আর মুখের চারপাশে বরাবর ঘু*ষি মা*রলো।
সমুদ্রের ঠোঁট মুখ ফেটে রক্ত আর লালা ঝড়ছে সমান তালে। কিন্তু তবুও কিছু ফাউল মার দেয়ার চেষ্টা করছে। জিয়নার মনে হলো নাহ ব্যাপারটা জমছে না। এখানে একজন রেফারি দরকার মধ্যস্ততা করার জন্য। সে সমুদ্রকে চিয়ার্স করলো,

-আরেহ আরেহ সমুদ্র ভাই আপনি হেরে যাচ্ছেন তো।শোনোন আপনি ফালতু ফাউল করছেন শুধু। আপনার প্রতিপক্ষ বেশ লড়াকু। তার টেকনিক দেখুন আর সেইভাবেই মুভ করুন।
জিয়ানার চিল্লানিতে নিবিড় থেমে ওর দিকে তাকালো। জিয়ানা সোজা দাঁড়িয়ে গেলো এতে। চোখ দিয়েই খেয়ে ফেলবে এমন ভাব এই লোকের। এই সুযোগে সমুদ্র নিচ থেকে নিবিড়ের চোয়াল বরাবর একটা ঘু*ষি মারলো। নিবিড় কিছুটা পিছিয়ে গেলো এতে।
অপরদিকে জিয়ানা হাত তালি দিয়ে বলে উঠলো ,

-ভালো পেরেছেন কিন্তু এটা যুদ্ধনীতি না। এটা কাপুরুষত্ব। প্রতিপক্ষের দূর্বল সময়ে আঘাত করা উচিত না।অবশ্য আপনার আর কি করার। যাই হোক আমাকে কিডন্যাপ করার জন্য শুকরিয়া। খুব ভালো একটা ট্যুর হয়েছে। কিন্তু আমার ব্যাগ আর মোবাইল কই?
নিবিড়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো এই মেয়ের এমন অহেতুক প্যাচালে। তবুও রাগটা যেনো কোথাও ভাটা পড়লো। এগিয়ে এসে সমুদ্রর সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-কসম সমুদ্র আজ তোর শেষ দিন হতো যদি তোকে অল্প একটু বন্ধু না ভাবতাম। আর কোনদিন আমার নাম মুখে নিলে কিংবা এই ক্যাম্পাসের আশেপাশেও যদি তোকে দেখি একেবারে খু*ন করে ফেলবো।
তারপর জিয়ানার দিকে এগিয়ে এসে তার হুডির মাথা ধরে টানতে টানতে হাটা ধরলো ক্লাবের দিকে।এদিকে জিয়ানা উল্টা হাটা শুরু করলো টান খেয়ে।

-কাবলিওয়ালা আমার পায়ে ব্যাথা ,ছাড়ুন এইভাবে টানাটানি করবেন না। আরেহ আরেহ আমার হুডি ছিড়ে যাবে তো। ওই বেটা ছাড়।
থমকে গেলো নিবিড়। রাগের পারদ আবার তড়তড় করে বেড়ে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে জিয়ানার দিকে ঘুরে বলে,
-তোমার ভাগ্য ভালো না আমার ভাগ্য খারাপ জানি না। তানাহলে তোমাকে এক সেকেন্ডের বেশি সহ্য করার কথা না আমার। আরেকদদিন যদি তুই তুকারি করেছো সেদিনই হবে তোমার শেষ দিন।

-এ্যাহ আসছে আমার পালুয়ান। ছাড়ুন তো। যত্তসব ভেজাল পাবলিক। আমার মুখ আমি তুই তুমি আপনি যা ইচ্ছা বলবো। আপনার কান আপনি শুনবেন না তাহলেই তো হলো। এখন এটা বলবেন না যে এই এলাকার বাতাস আমার। খবরদার এই বাতাসে কেউ কার্ব-ডাই-অক্সসাইড ছাড়তে পারবে না।
-মুখটা যদি বন্ধ না করেছো এক্ষনি সেলাই করে দিবো। বাচাল মেয়ে কোথাকার।
বলে আবার টেনে হাটা শুরু করলো। অপরদিকে মক্কুরা সে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে নিবিড় আর জিয়ানাকে দেখছে। আকাশ নামের এক ছেলে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো ,
-ভাই আমরাও কি যাবো?
-না না। এখন প্রাইভেট বিষয় চলবে আর আমরা হচ্ছি পাবলিক। প্রাইভেটে ঢুকা যাবে না। এইদিকে সামলায় চল।
ঘুরে দেখে সমুদ্রকে তার চ্যালারা ধরে গেইটের দিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

ক্লাবে এসে নিবিড় একপ্রকার ছুড়েই মারলো জিয়ানাকে। বলবান শক্তি সামর্থ্যবানের সাথে জিয়ানার ওইটুকু শরীর যেনো পালক।পায়ের লাগায় দাঁত কিড়মিড় করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-এই ভন্ড লোক আপনার সমস্যা কি হ্যাঁ। একজনকে কেলিয়েও আশ মিটেনি? যত্তসব পাগল ছাগল সব আমার কপালেই জোটে।
নিবিড় টেবিলের ড্রয়ার থেকে প্যাকিং টেপ বের করে আনলো। জিয়ানা কপাল ভাজ করে দেখে যাচ্ছে তার কাজ কর্ম।হাতে টেপ অল্প ছিড়ে জিয়ানার মুখে লাগিয়ে দিলো। জিয়ানার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। হাত উঠানোর আগেই হাত পিছমোড়া করে সেই টেপ দিয়ে বেঁধে দিলো। নাক দিয়ে জিয়ানার উম উম শব্দ বের হচ্ছে শুধু।
প্লাস্টিকের একটা চেয়ার এনে জোর করে বসিয়ে দিলো জিয়ানাকে। পকেট থেকে ফোন বের করে মক্কুকে আসতে বলল তাড়াতাড়ি।
আরেকটা চেয়ার এনে জিয়ানার মুখোমুখি বসে বলে,

-তোমার আর তোমার বাবার মাথায় কি মগজের জায়গায় গোবর বসানো? একজন ক্ষমতাসীন দলের লোকের বিরুদ্ধে খবর প্রচার করতে বেঁচে নিয়েছো সি গ্রেডের দুইটা অনলাইন নিউজ চ্যানেলকে।একটা তুড়িতেই সেই চ্যানেল সহ ভ্যানিশ হয়ে যাবে তার কোন ধারণা আছে তোমার? এসব করে লাভের লাভ কিচ্ছু হয়নি বরং তাদেরকে সচেতন করে প্লাস আমার কাজে বাগড়া দিয়েছো। এখন মনে হচ্ছে তোমাকে আর তোমার আবুল বাপকে একেবারে খতম করে দেই।
রাগে চোয়াল শক্ত করে বলে উঠলো নিবিড়।
তখনই মক্কু আর সজীব সাথে আকাশ আর কতগুলো ছেলে এলো। নিবিড় ইশারা দিলো বাকিদের বিদায় করতে।
নিবিড় সবাইকে ভেতরের রুমে ঢুকতে বলল।কিন্তু সজীব জিয়ানার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে আছে দেখে ,একটা রামধমক দিয়ে বলে ,

-এটাকেও নিয়ে যাচ্ছি তুই ভেতরে যা।
ক্লাবের বাহিরের দরজা বন্ধ করে জিয়ানার বাহু ধরে ভেতরে এনে বিছানায় বসালো। জিয়ানা মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই রুমটা দেখছে। বাহির থেকে একদম বুঝা যায় না এখানে একটা রুম আছে। পা দিয়ে ফ্লোরে টেপ টেপ করে দেখলো নিচের অংশ ফাঁকা। তারমানে আরও সিক্রেট রুম আছে।
রুমটা মনে হচ্ছে সাউন্ডপ্রোফ। টিনের ঘর হলেও চারপাশ মোটা ককসিটের মত কিছু একটা দিয়ে ইন্টেরিয়র করা। জিয়ানার তাকিতুকি শেষ হলো নিবিড়ের হাতে কাপড়ের একটা প্যাচানো ব্যানার দেখে।যেটার দুইপাশে কাঠের ফ্রেম দিয়ে বাধা।আগেরকার দিনের রাজা বাদশাদের চিঠি কিংবা ঘোষণা পত্র যেমন ছিলো ঠিক তেমন। তবে এটা খাদি কাপড়ের পুরাতন একটা ভাব আছে।

কাপড়টা মেলে ধরলো সবার সামনে। অফহোয়াইট কালারের একটা খালি কাপড়। নিবিড় সেই কাপড়টা ফ্লোরে বিছিয়ে দিলো। তারপর সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে সব লাইট একে একে বন্ধ করে দিলো।
অন্ধকারে সবার চোখ যখন আস্তে আস্তে সয়ে এলো। তখন সেই খাদি কাপড় থেকে একপ্রকার আলো বের হওয়া শুরু করলো। এবং ইংরেজিতে এলোমেলো কিছু শব্দ লেখা। ঠিক ইংরেজি না তবে abcd সহ অনেক গুলো বর্ণ যুক্ত কিছু লেখা। জিয়ানা সহ সবাই অবাক হয়ে দেখে চলেছে এমন অদ্ভুত জিনিস। যেটা শুধু ফ্যান্টাসি সিরিজ গুলোতে দেখেছে।
সজীব অতি উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

-কিভাবে পেলি? আর মিনিং গুলো বের করতে পেরেছিস?
এই পর্যায়ে নিবিড়কে বেশ হতাশ দেখালো। পরক্ষণেই উৎসাহী হয়ে বলে,
-আকাশের জন্য পসিবল হয়েছে। সে যদি ছয় মাস গে সেজে রবার্টের গার্লফ্রেন্ড না হতো। এটা সম্ভব হতো না।আকাশের মাধ্যমে আমি রবার্টের সাথে কানেক্টেড হতে পারি ইজিলি।কিন্তু ফাইনাল মুভের আগেই সব নষ্ট করে দিয়েছে এই মেয়েটা।
জিয়ানার দিকে ইশারা করে বলল নিবিড়। জিয়ানা এদের কথা বার্তা আকার ইংগিত কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। সাথে নড়াচড়া তো বন্ধই।
নিবিড় জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
-মুখ খুলে দিবো একটা শর্তে কোন প্রশ্ন কিংবা কথা বলতে পারবে না।রাজি?
জিয়ানা মাথা নাড়ালো রাজি সে।নিবিড় ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে হাতের টেপ খুলে দিলো। জিয়ানা নিজেই নিজের মুখের টেপ খুলে ,মুখটা হা করে একটু এক্সারসাইজ করে নিলো।
মক্কু বলে উঠলো ,

-ভাই আমি কিচ্ছু বুঝতেছি না।রবার্ট কে?আর এগুলাই বা কি?
নিবিড় বলল,
-আমরা একটা ডু অর ডাই অপারেশনে আছি।যদিও এটা একান্ত আমার ব্যাক্তিগত একটা ব্যাপার কিন্তু আমার সাথে তোরাও না চাইতে জড়িয়ে গেছিস।
স্যাটানিক বাইবেল নামের কিছুর নাম শুনেছিস কখনো?
সবাই মাথা দিয়ে না করলেও জিয়ানা হ্যাঁ বুঝালো। নিবিড় আবার বলা শুরু করলো ,
-যেটা শয়তানবাদিরা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ মনে করে। এটা খ্রিষ্টানদের বাইবেল না।শয়তানবাদিরা একপ্রকার জাদুবিদ্যাটাকে নিজেদের ধর্ম বানিয়ে নিয়েছে। এবং এরা মনে করে ঈশ্বর আর শয়তান একস্বত্ত্বা (নাউজুবিল্লাহ ,আল্লাহ মাফ করো )

এমন এক শয়তানবাদ গ্রুপের নাম ছিলো শিকাগো রিপার্স চক্র। এরা ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮২ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত নারী হত্যা আর গুপ্ত শয়তান পূজা করতো।প্রায় ১৮জন নারীকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে। এবং হত্যা করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ভয়ংকর ছিলো।প্রথমে ধর্ষ*ণ করে এবং জীবিত অবস্থায় লেফট বু*বস কেটে নিতো।তারপর ফেলে যেতো নিরিবিলি কোন জায়গায়।রক্তশূণ্য হয়ে মারা যেতো প্রায় সবাই। কিন্তু একজন ভিক্টিম কোনভাবে বেঁচে গেলে তার বর্ণনা অনুযায়ী শিকাগো পুলিশ ক্রিমিনালকে ধরতে সক্ষম হয়। এবং তাদের লিডারের বাড়ির চিলে কোঠায় পাওয়া যায় শয়তানের মুর্তি ,একটা স্যাটানিক বাইবেল। একটা কাঠের বক্স। যেটাতে ভরতি ছিলো ছোট ছোট মাংশের টুকরো। ফরেনসিক রিপোর্টে সেখানে ১৮জন নারীর বুকের মাংস পাওয়া যায়। এটা সম্পুর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের ঘটনা। এবং সেই শিকাগো রিপার্স চক্রের চারজনেরই কঠিন সাজা হয়।মজার ব্যাপার হচ্ছে সেই চক্রের লিডারের বউ বাচ্চা সহ সুন্দর একটা পরিবার ছিলো। তারা কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারেনি।
একটু থেমে নিবিড় আবার বলা শুরু করলো ,

-কিন্তু আমাদের দেশেও একটা নতুন চক্র আছে এবং সেটা আমাদের খুব কাছাকাছি।এবং খুবই ক্ষমতা ধর কেউ এদের পৃষ্ঠপোষকতা করে।
এই লেখাগুলো স্যাটানিক বাইবেলের একটা অংশ যেটা আমি পেয়েছি রবার্টের কাছ থেকে। পেয়েছি ঠিক না একপ্রকার চুরি করেছি।কিন্তু এটার মানে জানা সম্ভব হয়নি এখনো।কিছুদিনের মাঝেই হইতো উদ্ধার করতে পারতাম যদি না চেয়ারম্যান তার ক্যানিবাল বডিগার্ডদের সতর্ক করে দিতো।এই স্টুপিড মেয়ে আর তার বাবা সব ভন্ডুল করে দিয়েছে। তাই এখন একেই আমার টিমে নিয়েছি যেভাবে সে ওই হিরোইনের হত্যার ইনফরমেশন আর ক্যানিবালদের খুজে বের করেছে। ঠিক সেভাবেই আমাকে এদের কাছে থাকা সেই ইংলিশ ভার্সনের স্যাটানিক বাইবেল এনে দিবে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৫

জিয়ানা হা হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে কিংবা চিপায় চাপায় ঘুরে সিক্রেট ইনফরমেশন বের করা আর শয়তানের গুহায় ঢুকা এক জিনিস নাকি? আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলো ,
-কাবলিওয়ালা! এতে আপনার কি লাভ?আর আমাকেই কেনো কুরবানী দিচ্ছেন?
-কারণ তাদের কাছে আমার সবচেয়ে দামী একজন মানুষ জিম্মি।

নীতিহীন রাজ পর্ব ১৭