Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ২৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৩

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৩
আশিকা আক্তার সোহাগী

সেপ্টেম্বরের এই সময়টাতে গরমের তেজ কমে আসে। হুটহাট বৃষ্টি নামে। আবার চায়নিজ একটা গরম পড়ে।আকাশের অবস্থা দেখে মন হয় শীতল মেঘে কত নিরীহ আবহাওয়া। আহা।আসলে সেটা চাইনিজ প্রোডাক্টের মতো।স্থায়িত্ব কাল স্বল্প।মুহূর্তেই ঘর্মকর গরমে প্রাণীকুলকে অতিষ্ঠ করে দেয়।
সেই গরমে অল্প ঘেমে জিয়ানা বসার রুমে এসে দেখলো এক মনমুগ্ধকর দৃশ্য।জেনি মক্কুর কাধে মাথা রেখে বসে আছে।আর মক্কু একহাত সামনের টেবিলের উপর পানিতে চুবানো। অপর হাতে জেনিকে আকড়ে ধরে আছে।
জেনি খুবই মিষ্টি একটা মেয়ে।এককথায় লক্ষ্মীমন্ত যাকে বলে।মা মা ভাব আছে সেন্ট পার্সেন্ট। একটা দূর্ঘটনায় জীবনের রং রুপ হারাতে বসেছিলো। আবার সেই রং হয়ে ফিরে এলো মুসাদ্দিক। আজ আর মক্কু বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না জিয়ানার। বরং বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করতে ইচ্ছা হচ্ছে।

প্রথম দিকের বেয়াদবির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিবে ভাবলো।মক্কুদের তার পছন্দ না হলেও জিয়ানাকে কখনো তারা বিরক্ত করেনি।বরং সাহায্য করেছে অনেক। নিবিড়ের দুইটা চ্যালাকে ইভটিজিং এর জন্য পি*টিয়ে থানায় দিয়ে এসেছিলো যেবার ,তখন নিবিড় বার কয়েক তেড়ে গিয়েছিলো জিয়ানাকে ধরতে।সজীব আর মক্কুই তাকে শেল্টার দিয়েছিলো।
তারপর আরেকদিন ক্লাস বাদ দিয়ে স্টুডেন্টদের সমাবেশে ডেকে নিয়ে যাওয়াই সবার সামনে ইচ্ছামতো ঝেড়েছিলো নিবিড়কে। সেদিনও সমাবেশ শেষে নিবিড় তেড়ে যায় জিয়ানার দিকে।মক্কুর দুইহাত দিয়ে সামনে বাউন্ডারি দিয়ে বাঁচিয়েছিলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

যতই দাবাংগিরী দেখাক। নিবিড়ের চোয়াল শক্ত করে তাকানোতে সবারই কম বেশি ভেতরে ভয় ধরে। তারপর এমন শক্তপোক্ত লোকের মা*র নিশ্চয় আরামদায়ক হবে না।আজ সত্যি জিয়ানা মুসাদ্দিকের উপর কৃতজ্ঞ হলো।
মনে মনে দোয়া করলো ,
-একে অপরের জন্য পদ্মপুকুরর হও। একজন হও পদ্ম আর একজন হও সমগ্র পুকুর। যেনো একসময় পদ্ম না থাকলে পুকুরটা পদ্মপুকুর নামেই পরিচিতি পায়।

নিশব্দে চলে আসে আবার নিবিড়ের রুমে। নিবিড়ের কপালে ছোয়ে দেখে জ্বর কমেছে বেশ।তারপর সেখান থেকে বারান্দায় আসে। এবং এই বারান্দাটাই এই ফ্ল্যাটের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা বলে মনে হলো জিয়ানার।সাইডে একটা তোতা পাখির খাচা। রাত গভীর হওয়াই পাখিটা ঘুমে। তিনতলার ফ্ল্যাটের এই বারান্দাটা কিছুটা স্পেশাল হইতো অন্যগুলোর চেয়ে।আকারেও বড়। রাউন্ড শেপের গ্রিলের ফাঁকে ফাঁকে অনেক গুলো মানিপ্ল্যান্ট গাছ ঝুলছে। মানিপ্ল্যান্ট ছাড়া দ্বিতীয় কোন গাছ বোধহয় নেই।অল্প আলোয় সব পর্যবেক্ষণ করে জিয়ানা আকাশের দিকে মুখ করে তাকালো।

পেছনের হাত খোপা করা চুলের কিছু বেবি হেয়ার বের হয়ে আছে।মৃদু বাতাসে সেটা মুখে আছড়ে পড়ছে। অলসতায় কিংবা আকাশ দেখার ব্যস্ততায় সেই চুল সরালো না জিয়ানা। লম্বা একহারা দেহে ঢিলা পায়জামা সাথে লং কুর্তি আর গলায় সিল্কের ওড়না পেছানো যুবতী চেয়ে রইলো অপলক উর্ধ্ব গগনে।জীবনের হিসেব জিয়ানা কখনোই করে না। না অতীতে আর না বর্তমানে। কাল যা হবে সেটাকে হাঁসি মুখে ফেস করাই তার কর্ম।তবুও বিয়ে নামের পবিত্র বন্ধনে কে চাই এমন ঝড়ের বেগে জড়াতে? প্রতিটা মেয়ের বিয়ে,সংসার ,স্বামী নিয়ে একটা স্বপ্ন কিংবা জল্পনা কল্পনা কাজ করে।দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো জিয়ানা।
পরিস্কার আকাশ।মিটিমিটি তারা জ্বলছে।মানব জীবন ছাড়া আর একটা জীবন জিয়ানার ছোটবেলায় চাইতো। তারা হতে।যাকে ধরা যাবে না ,ছোয়া যাবে না।শুধু তার ক্ষুধ জ্যোতি লক্ষকোটি কিলো দূর থেকে অনুভব করা যাবে।জিয়ানার ভাবনার ব্যাঘাত ঘটলো খুবই মিহি পক্ষিকন্ঠের ডাকে,

-চাঁদ। চাঁদ। চাঁদ
তিনবার বলে ডানা ঝাপটালো তোতাপাখিটা।জিয়ানা বিস্মিত হয়ে পাখিটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-কি তোতা মিয়া? চাঁদ কে?
-চাঁদ। সুখু। সুখ।
আবার আওড়ালো তোতাটা।
-এগুলা তোর চোদ্দগুষ্টির নাম নাকি বে?
-বে বে বে।
জিয়ানা কুটোকুটি করে হেঁসে দিলো। তারপর বলল,
-ভন্ড নেতা। ভন্ড নেতা। ভন্ড নেতা।
তোতা আওড়ালো
-ভন্দ নোতা
জিয়ানা এইবার খিলখিল করে হেঁসে দিলো।
আড়াআড়ি ঠিক উপরের বারান্দা থেকে একটা মুখ উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,

-কে? ওইটা কে?
জিয়ানাও উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো। একটা পনের ষোল বছরের মেয়ে সেই বারান্দার দোলনায় বই নিয়ে বসে জিয়ানার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
-হাই। আমি জিয়ানা হক। তুমি কে?
মেয়েটা কোন ইন্ট্রডিউসে গেলো না সরাসরি রাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-নিবিড় ভাইয়ের ফ্ল্যাটে মেয়ে মানুষ হয়ে এত রাতে কি করছো?
-তোমার নিবিড় ভাইয়ের বউ হই তাই এত রাতে তার ফ্ল্যাটে বসে মশা মারছি।তা ননদিনী তোমাদের ফ্ল্যাটে মশা নাই?
মেয়েটা উত্তর দিলো না।একপ্রকার ধুমধাম করে বারান্দা থেকে প্রস্থান করলো।
জিয়ানা মুচকি হেঁসে আবার তোতার দিকে নজর দিয়ে বলে,
-আহারে ৪৭০ভোল্টের ছ্যাকা খেলো বাচ্চাটা। সারারাত ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে বুক বাসাবে।

শেহনাজ স্বপ্না স্তব্ধ হয়ে বসে আছে নিজ কক্ষে। সামনে মামুন ইসলামও একই ভাবে বসা।স্বপ্নার চোখে শ্রাবণধারা। একটা সময় পর তো বুঝতে পেরেছিলো ছেলেটার কোন দোষ নেই। কারো জন্মে তো নিজের হাত থাকে না। একদম অল্প বয়সে নিজের ভালোবাসার মানুষ, পরিবার হারিয়ে সতিনের ঘরে উঠেছিলো।দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতন আর ধর্ষ*ণের শিকার হয়ে তার মানষিক অবস্থা ছিলো বিধ্বস্ত। কেউ একটু মাথায় হাত রাখলেও তার প্রতি মন দূর্বল হয়ে যেতো।তাছাড়া নিবিড় পেটে আসার পর থেকে মামুন ইসলাম তাকে বউয়ের মর্যাদা দিলেও আর একটিবারের জন্যও ছোয়ে দেখেনি।

তাই সব রাগ গিয়ে পড়তো ছোট নিবিড়ের উপর।দিন গেছে ,মাস গেছে সাথে বছরের পর বছর। তবুও স্বপ্না নিজ ছেলেকে কাছে টানেনি। উল্টা তার সতীন আর সৎ পুত্রের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিবিড় যখন জ্ঞান হারাতো একটা বার ফিরেও দেখতো না সে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন ম্যাচিউরিটি এলো ততদিনে নিবিড় বহুদূরে চলে গেছে।হাত বাড়ালেও নাগালে পাওয়া যায় না ঠিক এতটাই দূরে।ততদিনে নিবিড়ের বয়স দশ।অথচ স্বপ্না জানে না তার ছেলের প্রিয় খাবার কি? কিংবা পড়াশোনার কি অবস্থা। সে ছেলে সম্পর্কিত কিচ্ছু জানে না।
অন্যদিকে নীলুফাকে ছেলে চোখে হারায়।ফু-আম্মুর জায়গায় আম্মু আম্মু করে বেশি।সবার খাবারের আগে নিবিড়ের জন্য বেষ্ট জিনিস আগেই বাটিতে সরিয়ে রাখা।নিজের হাত খরচ থেকে নিবিড়ের শখ আহ্লাদ পুরোন করা থেকে শুরু করে স্কুলের প্যারেন্টস মিটিং সব নীলুফা করতো।
এইজন্যই তো বিয়ে করেছে তাকে বলার প্রয়োজন মনে করেনি।নীলুফা থাকলে নিশ্চয় তাকে ছাড়া একপা নড়তো না।

-তুমি কি ভাবছো আমি জানি।
মামুন ইসলাম বলে উঠলো।স্বপ্না মুখ তুলে একবার চেয়ে আবার মাথা নিচু করে ফেলল।
-নীলুর কথা।রাইট?এখন যে কথা বলবো তোমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে।
নিবিড় নিলুফার মেয়েকেই বিয়ে করেছে।
স্বপ্না ফট করে দাঁড়িয়ে গেলো।চোখ বড় বড় করে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মামুন ইসলামের দিকে।তারপর জিজ্ঞেস করে ,
-এটা কিভাবে সম্ভব? নীলুফার মেয়ে কোত্থেকে আসবে? শুধু না একটা ছেলে আছে।সেও মারা গেছে বছর দুয়েক আগে?
-নীলুফাকে আমরা যতটা বোকা ভেবেছিলাম সে ততটাও ছিলো না।
-আপনার চেয়ে তাকে আর কে ভালো চিনবে।আপনার তো খুশী হওয়ার কথা।পাপ মোচনের একটা উপায় পেয়েছেন।
-সাগর হকের রক্ত এখনো এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে আর আমি খুশী হবো? এখনো তাহলে আমাকে চিনলে না?
-আপনাকে দুনিয়ার আর কেউ না চিনলেও আমি আর নিবিড় হাড়ে হাড়ে চিনি।যে লোভে পড়ে দিনের পর দিন পাপ করে চলেছেন না।সেটা ইহ জিন্দেগীতে সম্ভব না।
মামুন ইসলাম হাতে একটা পাতলা কাপড় পেচিয়ে স্বপ্নার টুটি চেপে ধরলেন শক্ত করে।তারপর হিসহিসিয়ে বলে,

-নেহাৎ নারী ছোয়া নিষেধ তানাহলে কবেই তোর মতো নোংরা মহিলাকে কেটে টুকরো টুকরো করে কু*ত্তা দিয়ে খাওয়াতাম।
স্বপ্না চোখের পানি ছেড়ে চাপা গলায় বহু কষ্টে বলে উঠলো ,
-আমি মারা যাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পর আপনার মুখোশ উন্মোচন হবে। আমি মরতেই চাই।মেরে ফেলুন।এই নরকে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।
-আর কিছুদিনের অপেক্ষা তারপর তুই নিজেই নিজেকে দিনে দশবার খুন করবি।

মিনাল মেহেনূর ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে। বাবা মায়ের ডিভোর্সের পর মায়ের সাথে থাকে নিবিড়ের ফ্ল্যাটের উপরের তলায়।এইবার এসএসসি দিবে। মিনালের মা কর্পোরেট লেডি।মেয়েকে সময় দিতে পারেন না।এইজন্য নিজে নিজে গিল্টি ফিল করেন খুব।তাই মেয়ের সকল বাহ্যিক বায়না বিনা সংকুচে পূর্ণ করেন।বয়স সতেরো হলেও মিনালের শারীরিক গঠনে মনে হবে প্রাপ্ত বয়স্ক একটা মেয়ে।ক্লাস সিক্স থেকে রিলেশন আর ডেটিংয়ে অভস্ত্য সে।তারা নিবিড়দের বিল্ডিং উঠেছে আজ প্রায় দুইবছর।
এই দুই বছর সে নিবিড়কে স্টক করে এসেছে।শক্তপোক্ত আর দীর্ঘদেহী মানুষটার ব্যাক্তিত্বের নিবিড়কে দেখে মিনালের আগের সব রিলেশন হাওয়া হয়ে গেছে ফুস করে।ফ্যান্টাসির বয়সে মিনাল নিজের থেকে এক যুগের বেশি বড় নিবিড়ের জন্য নিজের অনুভূতি সাজিয়ে রাখলেও নিবিড়ের সামনে কখনো বলার সাহস হয়ে উঠেনি।তবে এটা ওটা দেয়ার অজুহাতে অনেকবার নিবিড়ের ফ্ল্যাটে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ,নিবিড় প্রতিবার দরজা থেকে আলবিদা করে দিতো।

পার্সেলে বেনামে বিভিন্ন গিফট পাঠাতো।সেগুলোও নিবিড় কখন রিসিভ করতো না।এসএসসি দিয়ে সরাসরি কনফেশন করবে এমন প্ল্যান ছিলো। কিন্তু আজ যখন নিবিড়ের বারান্দায় অন্য মেয়েকে দেখে আর পরিচয় জেনে তার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়।
বারান্দা থেকে ফিরে মায়ের রুম থেকে মেডিসিনের বক্স নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নিজের ঘরের দরজায় খিল দিয়েছে।মিনালের মা ঘাবড়ে যায় মেয়ের হটকারিতায়। বার কয়েক দরজায় নক করার পর মিনাল চিল্লিয়ে বলে উঠে,
-নিবিড় ভাই বিয়ে করেছে আম্মু। সে কিভাবে এটা আমার সাথে করতে পারলো।আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না।
মিসেস রেশমা এবার বেশি ঘাবড়ে গেলেন।আবেগের বয়সে বাচ্চারা তো কত ভুলই করে ফেলে। তার এই একটা মেয়ে ছাড়া আর কে আছে। উনি আকুতি মিনতি করতে থাকলেন দরজা খুলার।

ক্রোধে লাল হওয়া একজোড়া চোখের সাথে অল্প ভীত আর কৌতূহল মিশ্রীত বাদামী চোখের দৃষ্টি আদান প্রদান হলো কয়েক পল।লাল চোখ ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসে।আর বাদামি চোখ ছোট করে পিটপিট করে চায়।
সেই জঙ্গলে এমন পিটপিট করা নেত্র দেখে নিবিড়ের কাছে খরগোশ ছানার মতো লেগেছিলো আজ লাগছে স্যাসির মতো।
শরীরে নেশার প্রকোপ কমে এলে ,সাথে সাথে গা ঘেমে জ্বরটাও নেমে যায় নিবিড়ের। তখন কানে আসে খিলখিলিয়ে ছন্দময় হাঁসির শব্দের সাথে সুখুর কথোপকথনের। পা টেনে দুইটা মোচড় দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে নজরে পড়ে ,চওড়া পিঠ ,চিকন কোমড় আর মাজারি নিতম্বের মেসি বানের এক নারী।
একপল তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলেও পরক্ষনে স্প্রিংয়ের মত ঘাড় অটো রোটেড হয় সেই নারী দেহের দিকে।ততক্ষণে নারীটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এগিয়ে এসে কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বর এখনও আবার অল্প আছে।কথাবার্তা ছাড়াই ট্রি-শার্টের হাতা ধরে টেনে রুমে আনে।তারপর রুম থেকে বের হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে মিনিট দুইয়েক পরেই।হাতে একটা বাটি আর চামচ।

-এটা খেয়ে টেবলেট খেয়ে নেন।আমাদের ফিরতে হবে।একদিনে সেবাযত্ন যা করেছি এনাফ।এর বেশি করলে আপনি প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবেন।
একটু থেমে আবার বলে,
-ওহ সরি। আপনি তো ওল্ড স্কুল।প্রেগন্যান্ট মানে ওই টা না। আমরা গ্যাসের সমস্যাকে প্রেগন্যান্ট বলি।নেন হা করুন।
নিবিড় বাটি হাত দিয়ে একপ্রকার ছুড়ে মারে ফ্লোরে।সিরামিকের বাটি পড়ার সাথে সাথেই করুন আতর্নাদ করে চিচিংফাঁক। জিয়ানা সেদিকে না তাকিয়ে নিবিড়ের ব্যাথাযুক্ত হাতে চেপে ধরে বলে,

-একদম তেজ দেখাবেন না।আপনার তেজের ধার জিয়ানা ধারে না।নেহাৎ নারী হৃদয়ের কোমলতা মাঝেমধ্যে ভর করে বিধায় মানবতা দেখাতে আসি। তানাহলে আপনার মতো নীলশেয়াল কে জিয়ানা পুছে না।
-তুমি এখানে এত রাতে কি করছো? সাহসের মাত্রা দেখে অবাক হচ্ছি।আমার রুমে আমার পাশে বসে আমাকে থ্রেট দিচ্ছো।কেটে কুচিকুচি করে ফেললেও একটা পশমের খোঁজ কেউ পাবে না।
হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বিছনায় পা মেলে বসতে বসতে নিবিড় বলে।
জিয়ানা কোন কথা না বলে আবার রুম ত্যাগ করে ঠিক আগের মতোই আবার একটা বাটি নিয়ে কথা বার্তা ছাড়াই নিবিড়ের মুখ চেপে ধরে বাটির তরল জাতীয় খাবার ঢালা শুরু করে। এইবার নিবিড় বিশেষ বাধা দিলো না।তবে মুখও তেমন খুললো না দেখে জিয়ানা বলে উঠলো ,

-মুখের বাউন্ডারি দেখে তো মনে হচ্ছে আমি সহ ঢুকে যাবো ,অথচ হা করছেন এট্টটুকু।হা করুন তানাহলে কি করতে হবে আমি খুব ভালো করেই জানি।
নিবিড় হা করলো। অল্প গিলে হাত দিয়ে জিয়ানার হাত সরিয়ে বলল,
-এমন নাটক কোত্থেকে শিখেছো?
জিয়ানা ব্রু কুচকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো ঘন পলব বেষ্টিত নেত্রের দিকে।নিবিড় নিজে নিজেই বলা শুরু করলো ,
-নিজের পরিচয় অনেক আগে থেকেই জানতা তুমি। তবুও এমন না জানার ভান কেনো?
এইবার জিয়ানার ব্রু সোজা হলো।জিয়াউলের কথাই তাহলে সঠিক। এই লোক প্রচন্ড অবজারভেন্ট।তাই জিয়ানা আর ঘুরপাকে গেলো না।সরাসরি বলল,

-ছোট হলেও বৈষম্য বুঝতে পারতাম।ঈদে জামা কেনার সময় আপি আর ভাইয়ার সময় আম্মু যতটা উৎফুল্ল থাকতো,আমার বেলায় মুখটা ঠিক ততটাই গম্ভীর হয়ে উঠতো।বারবার টাকার ব্যাগ চেইক করতো।ছোট মনে খুব অভিমান জমতো।আমার বেলায় সবসময় টাকা ফুরিয়ে যায় কেনো।পছন্দের ফর্ক কিংবা কোন ফ্লোরাল ড্রেসের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতাম।কিন্তু আম্মুর ব্যাগের অবস্থা দেখে আমি নিজে থেকেই বলতাম কিনবো না।এগুলা আমার পছন্দ না।তাই কখনোই আমার আর মেয়েলি জামা কেনা হতো না।আব্বু আসতো সব অভার সাইজ বয় ড্রেস নিয়ে।বেশিরভাগ ভাইয়া পড়ে ফেলে রাখলে আমি পরে পড়তাম।

আমি প্রচন্ড দূরন্ত ছিলাম। প্রায়শই আম্মুকে রাগিয়ে দিতাম। আর আম্মুর রাগের সময় আমার জন্য করা যাবতীয় কাজের ফর্দ খুলে বসতেন।কি কি করছেন। ঠিক কি কি কষ্ট আর ভোগান্তি উনার আমার জন্য পোহাতে হয় এইসব।কিন্তু ভাইয়া প্রায়ই পাড়ার ছেলেদের সাথে মারামারি ঝগড়া করে ফিরতো। তারবেলায় হিসেব কষা হতা না।
নানা অভিযোগ সব সাইডে পড়ে যেতো তখন ,যখন আম্মু জোরজবরদস্তি করে খাইতে দিতো।মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতো। আমার ছোট্ট মন সব ভুলে নিজের বাবা মা মেনেই দিন পার করতো।
কিন্তু জেনি আপির নানুর কথায় আমি বুঝতাম অনেক কিছুই।ক্লাস সিক্সে থাকতে আমার শরীর খারাপের জন্য টিফিন পিরিয়ডে বাসায় চলে আসি। আর শুনে ফেলি নানু আর আম্মুর সব কথা। বিশ্বাস করুন সেদিন আমি কাঁদিনি। সব কান্না জমিয়ে রেখেছিলাম যেদিন এক্সপোজ হবে সব সেদিনের জন্য।

-তাহলে এতদিন কেনো সব গোপন করে রেখেছো? এটা তো একপ্রকার মিথ্যায়?
-যে মিথ্যা গোপন করলে আমার কিংবা কারো ক্ষতি হয় না। বরং উপকার। সে মিথ্যা গোপন থাকায় কি ভালো না?
নিবিড় শুয়ে পড়লো বিছানায়।তার সারা শরীরে ব্যাথা।জিয়ানা একটা পেইন ক্লিলার এগিয়ে দিলো নিবিড়ের দিকে।নিবিড় সেটা প্রত্যাখ্যান করলো আবারও।
-এইবার কিন্তু মেরে খাওয়াবো কাবলিওয়ালা। আমার তেল মারা পছন্দ না।কুইক খাবেন।
নিবিড় বাঁকা হেঁসে প্রশ্ন করলো ,
-একটু বেশি অধিকার দেখাচ্ছো না? কবুলের এত পাওয়ার?
-আর অধিকার। আমার জীবনের সব স্বপ্ন অধোরাই রয়ে যায়। ভেবেছিলাম লং লেহেঙ্গার সাথে শার্ট পড়ে শ্বাশুরাল গেন্দাফুলের ডান্স করতে করতে বিয়ে করবো।আপনি তো সব আশায় জল ঢেলে দিয়েছেন।
-কত সহজ তোমার চিন্তাধারা। সাথে এত সস্তা মস্তিষ্ক। কিন্তু এখন যে আমার জন্য তোমার জীবনটা জটিল হয়ে উঠবে ।

-ভার্সিটির কোচিং করার সময় এক ভাইয়া প্রায় বলতো ” এডমিশন পেপার ইজি মনে হলে বুঝতে হবে প্রশ্ন তুমি বুঝতে পারোনি।তেমন যার জীবন বাহির থেকে দেখে মনে হবে যখন অনেক সুখী আর সহজ ,তখন আপনাকে বুঝতে হবে আসলেই আপনি তাকেও বুঝেন নাই।
-তাহলে সহজ না জটিল তোমার লাইফ?
-আপনি জানেন আমার আসল মা কোথায় তাই না?
নিবিড় ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখলো হেয়ালির মাঝে চমৎকার কিছু কথা বলা মেয়েটাকে। খুব কাছাকাছি থাকায় বলে উঠলো ,

-প্রভোকিং স্মেল।
-কি বিড়বিড় করেন? সঠিক উত্তর দিতে পারেন না?
-তোমার ভয় লাগছে না আমার সাথে এক একরুমে এত রাতে আছো?আর তোমার তো মনে হয় আমার থেকে বেশি জানার কথা সব।গোয়েন্দা শার্লক হোমস।
-না। আপনাকে আমার কাছে একটা পাজেল লাগে শুধু। তবে আপনাকে ট্রেস করলে পেয়ে যাবো একদিন।তাছাড়া কিছুতেই পেরে উঠি না আপনার সাথে।সবকিছুতেই এগিয়ে থাকেন।

-তোমার প্ল্যান গুলা ফালতু। যে কেউ এগিয়ে থাকবে।চেইনের মাঝে রেকর্ডার।
বলে হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠলো নিবিড়।
জিয়ানা একপলক সেই হাঁসি দেখে মথা নিচু করে ফেললো। যারা কম হাঁসে তাদের হাঁসি সত্যি ভয়ংকর সুন্দর। জিয়ানা মাথা নিচু করেই জিজ্ঞেস করলো ,
-ওইটাও ধরে ফেলেছিলেন তাই না?
-যে মেয়ে সিঙ্গেল একটা প্রসাধনী ব্যবহার করে না। সে ভার্সিটিতে পড়ে যায় এত ভারি আর লম্বা একটা গোল্ড চেইন?
আবার হেঁসে বলে,

-ওইদিনই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম তুমি তোমার আসল পরিচয় জানো। কারণ চেইনটা ফু-আম্মু। শুধু প্রমাণের অপেক্ষায় ছিলাম।
জিয়ানা নজর লুকানোর চেষ্টা করলো।এই লোক ঠিক কতটা ধূত। জিয়ানা আর জিয়াউলের চিন্তার বাহিরে।
-আর আমিও বুঝে ফেলেছিলাম আপনি আমাকে চিনেছেন।তাই আপনার সামনেই চেইনটা দিয়েছিলাম। তানাহলে দোকানে গিয়ে বিক্রি করে টাকা দিতাম।যেহেতু আপনার কাছেই আছে তাহলে সেটা ফেরত দিন।

-আমার জিনিস আমার কাছেই আছে এবং সেটা নিরাপদে।
-আপনার হয় কিভাবে সেটা? আপনি এত জটিল কেনো?
জিয়ানা ফ্লোরে বাবু হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো।
-তুমি এত সহজ কেনো?
-আমি স্বাভাবিক।
-জীবনকে তুমি কিভাবে দেখো?
-কখনো কাউকে ঘৃণা করবেন না , পরিস্থিতি যেমনই হোক হাসতে থাকুন।
-জীবনের সবচেয়ে নোংরা দিক দেখে কেউ বড় হলে ঘৃণার খনি মানব মস্তিষ্কে তৈরি হয়।বাই দ্যা ওয়ে তোমার দুঃসাহস দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম।
জিয়ানা এইবার পুর্নদৃষ্টিতে তাকালো নিবিড়ের দিকে। আঘাত প্রাপ্ত হাত সহ দুইহাত মাথার নিচে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।আর একটা দিক খেয়াল করলো ,

নিবিড় সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। ডানে বামে অন্য কোথাও চোখ সরে না।যার ফলে সহজে এই লোকের সাথে মিথ্যা বলা যায় না।নিবিড় আবার বলে,
-কোর্টে দাঁড়িয়ে এমন অদ্ভুত কথা বলতে কলিজা কাপেনি?
-তা একটু লজ্জা লেগেছে এছাড়া বাকি সব ওকে।তাছাড়া মিথ্যা তো কিছু বলিনি আপনার বুকেও তিল আছে।
ফট করে উঠে বসে ঝুকে গেলো জিয়ানার দিকে।
-বুকেও মানে? ওয়েট ,ওয়েট আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমার আক্কেল দেখে বেক্কেলও লজ্জা পাবে।
বলে জিয়ানার খোপা খামচি দিয়ে ধরে নিবিড় নিজের কাছে নিয়ে
এলো।জিয়ানা খোপা ধরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেলো।নিবিড়ও সেই অবস্থায় দাঁড়ালো।
অপরদিকে জিয়ানা হঠাৎ আক্রমণে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও ডান হাটু উঠিয়ে নিবিড়ের পায়ের ফাঁকে গোপন জায়গায় আঘাত হানার চেষ্টা করলো। কিন্তু নিবিড় আগেই তার অন্যহাত দিয়ে হাটু আটকে ফেলে।এখন জিয়ানার অবস্থা চ্যাং মাছের মতো।আস্তে আস্তে চুলের চাপ বাড়াচ্ছে নিবিড়। জিয়ানা চোখ হালকা খিচে বন্ধ করে আবার ফট করে খুলে ফেললো।

এইলোকের সাথে শক্তিতে সে পারবে না।বুদ্ধিতে মাত দিতে হবে।দুইজনের মুখ খুব কাছাকাছি হওয়াই নিবিড় এই প্রথম জিয়ানাকে খুটিয়ে দেখছে।তেলতেলে চেহারার মাঝে কোন চালাকি নেই।এখনাকার মেয়েদের মুখে খসখসে একপ্রকার পাকনামি থাকে। এই মেয়ের চেহারায় আলাদা একটা কোমলতা আছে।
নিবিড়ের ধ্যান কাটলো থু শব্দে।হাত ছেড়ে মুখে হাত দিয়ে দেখে জিয়ানা দূরে দাঁড়িয়ে পেট ধরে হেঁসে যাচ্ছে।নিবিড়ের চোখে মুখে ,থু থু দিয়েছে পাজি মেয়ে।
মুখ মুছে নিবিড়ের চেহারা লাল হয়ে উঠলো।খুড়িয়ে ছুটলো জিয়ানার দিকে। জিয়ানাও ফাঁকা কক্ষে দৌঁড়ানো শুরু করলো। নিবিড় পায়ের ব্যাথা তোয়াক্কা করলো না। পেছন পেছন ছুটছে।জিয়ানা দৌঁড়ের উপরেই বলল,
-আরেহ আমি মিথ্যা কি বলেছি।আমি একটা ফেসবুক কোয়ার্টসে পড়েছিলাম হ্যান্ডসাম ছেলের ওইখানে তিল থাকে। সেই হিসেবে আপনার তো দুইটা থাকার কথা।কোথায় প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ দিবেন তানা। উল্টা তেড়ে আসছে।
নিবিড় গর্জে উঠলো

-জিয়ানা!!
-সত্যি করে বলুন তো আছে না নাই? যদি না থাকতো পুলিশ চেইক করলে দুইজনই কট খেতাম।
-এই তুমি থামবে? আজ তোমাকে যদি খুন না করেছি আমার নাম সুখনীল নিবিড় না।
নিবিড় রাগে কটমট করে বলে উঠলো।
-আপনি সুখনীল না শুধু নীল শিয়াল। সরি খেক শিয়াল।
হাঁসা ,কথা বলা সাথে দৌঁড় একসাথে হওয়াই নিচের দিকে খেয়াল নেই দুইজনরই।স্যাসির ক্যাট ফুডের প্যাকেট একপাশে রাখা ছিলো।সেটা জিয়ানার পায়ে লেগে সারা রুম দানা দানা খাবার ছড়িয়ে গেলো। স্যাসি এদের কান্ডকারখানা দেখে ঘুম বাদ দিয়ে হা করে তাকিয়ে আছে।

দুই রাউন্ড দৌঁড়ানোর পর সেই খাবারে জিয়ানার পা স্লিপ কাটলো। আর তখনই নিবিড় একহাত টেনে ধরায় ধপ করে বিছানায় পড়লো।আগে জিয়ানা তারপর নিবিড়। ক্যাত করে উঠলো স্যাসি সাথে জিয়ানাও। নিবিড়ের মনে হলো কারেন্ট লাগলো। মেরুদন্ডের সাথে মস্তিষ্কের কানেকশন বিচ্ছিন্ন হয়ে ওইভাবেই পড়ে রইলো তুলতুলে শরিরের উপর। আর জিয়ানার কাছে লাগলো কয়েক টনের পাথর চাপা পড়েছে তার উপর। কেউ কোনকিছুই বুঝে উঠার আগে বন্ধ দরজা খুলে গেলো।নিবিড়ের গর্জনে মক্কু আর আকাশ দৌঁড়ে এসে হাজির। কিন্তু সবাই একসাথে আর্তনাদ করে উল্টো ঘুরে গেলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ২২

অপরদিকে জিয়ানা নিবিড়কে ঠেলে যাচ্ছে। কিন্তু নিবিড়ের হেলদোল নেই।সে অনুভূতির জগতে হারিয়ে কাত হয়ে পড়ে চিৎপটাং।
বেচারা নিবিড়। তুমি যতই কাঠখোট্টা হও ,না হয় পাথর দিয়ে তৈরি হও। পুরুষের জীবনে নারীর আগমন পরশ পাথরের মতই।অনুভূতি অস্বীকার করার সুযোগ নাই বাছাধন।

নীতিহীন রাজ পর্ব ২৪