Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৭

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৭
আশিকা আক্তার সোহাগী

“নিজের পিঠ দেখেছো কখনো?কেউ দেখেনি।কিন্তু অর্শির সাহায্য নিলে সেটা দেখা সম্ভব। মানুষ নিজে যখন কিছু করতে পারে না তখন অন্যের সাহায্য নেয়।”
কথাটা বললেন নিবিড়ের ফ্ল্যাট বরাবর পাশের ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে এক বৃদ্ধা।দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে দুইহাত গ্যাপ শুধু।

নিবিড় বের হয়ে গেলে জিয়ানা তালাবদ্ধ রুম দুটার সামনে ঘুরঘুর করে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়।
নিবিড় বের হওয়ার সময়ও জিয়ানা ঘাট হয়ে বসেই ছিলো সোফায়।আড়চোখে চেয়ে দেখে ভন্ড নেতা কাবলিওয়ালা সেজে ,চুলে জেল টেল মেখে ,মাঞ্জা মেরে ,চমৎকার পারফিউম লাগিয়ে বের হচ্ছে। এত সাজগোছ জিয়ানার সহ্য হলো না।ফোনটা চেয়েছিলো জেনির সাথে কথা বলবে, দেয়নি।নিবিড়ের ফোন দিয়েই কথা বলবে বলেছে তবুও দেয়নি।ব্যাস জিয়ানা একদম চুপ হয়ে বসে আছে।অপরদিকে পড়াশোনা চাঙ্গে ,জিয়ানা ভাসে গাঙ্গে।
কিন্তু থেমে যাওয়ার পাত্রী জিয়ানা না।সামনে টিটেবিলের উপর রাখা পানির বোতল হাতে নিয়ে মুখ ভরে পানি নেয়।নিবিড় যেই দরজা খুলে বের হবে জিয়ানা একমুখ পানির পিক নিবিড়ের উপর ফেলে।
নিবিড় হকচকিয়ে গেলেও কোন রিয়েকশান দেয়নি।আলগোছে রুমে এসে অন্য কালার কাবলি পড়ে আসে।আবার জিয়ানা সেইম ভাবে পানি দেয়।অতি আশ্চর্যজনক ভাবে নিবিড় নো রিয়াকশনেই ছিলো।আবার চেইঞ্জ করে একটা সাদা পাঞ্জাবি পড়ে আসে।হাতে একটা শপিং ব্যাগ সহ।জিয়ানার সামনে দাঁড়িয়ে বলে

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-তাড়াতাড়ি পানি দাও ,বের হতে হবে।
পানি মুখে জিয়ানার হেঁচকি উঠে যায়। আর নিবিড় হাঁসতে হাঁসতে বের হয়ে যায়।ব্যাপারটা এমন হলো” কিলার কাউকে খু*ন করার পর মরতে মরতে ভিকটিম ধন্যবাদ দিয়ে জানালো ‘সে অনেকদিন থেকে ম*রে যেতে চাচ্ছে।কিন্তু আত্ম*হত্যা পাপ দেখে ম*রতে পারে নাই।খু*নি তাকে খু*ন করে বড় উপকার করলো”। নিবিড়কে জ্বালানোর জন্য জিয়ানা উত্যক্ত করলো কিন্তু ব্যাপারটা নিবিড় আরও এনজয় করলো মনে হলো।সেই থেকে জিয়ানার মন খারাপ।
স্যাসিকে গোসল করিয়ে খেতে দিলো। সে খেয়েই ঘুম। তোতা মিয়ার ঘ্যানঘ্যান এক চাঁদ! চাঁদ। জিয়ানা তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছে এখন।
ক্ষুধা লাগাই ঘুমও পাচ্ছে না।জিয়ানার হাজারটা খারাপ অভ্যাসের মাঝে না খেয়ে থাকাও একটা বদ অভ্যাস। যখন মনে হবে খাবে না তখন সে খাবেই না।এমন ভাব করবে দুনিয়াতে খাওয়া নামের কিছু নেই।ভেতর ভেতর যতই ক্ষুধা লাগুক একটা দানা পর্যন্ত দাঁতে কাটবে না।পানিও ছুঁবে না।
পাশের বারান্দায় হঠাৎ একটা বাচ্চা জিয়ানাকে ডাক দেয়,

-ওই!
জিয়ানা শব্দের উৎস ধরে পাশে ফিরে দেখে একটা পাঁচ ছয় বছরের নাদুসনুদুস ছেলে বাচ্চা গ্রিলের অনেকটা উপরে উঠে ঝুলে আছে। জিয়ানা গ্রিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে,
-এটা কি মাংকি?
বাচ্চাটা মাথা নাড়ে।তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো ,
-তাহলে বানি?
আবার মাথা নেড়ে না করে। জিয়ানা স্যাড ফেস করে জিজ্ঞেস করে ,
-তাহলে স্পাইডারম্যান?
বাচ্চাটা খিলখিল করে হেঁসে বলে,
-স্পাইডারম্যান তালাফী।
-স্পাইডারম্যান ক্যান ইউ রেসকিউ মি ফ্রম হেয়ার?
-নো। তবে দিদুন পারবে ওয়েট আ মিনিট।
বলে ফটাফট গ্রিল থেকে নেমে কয়েকমিনিট পর একজন বৃদ্ধাকে ধরে আনলো।বৃদ্ধা জিয়ানাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ,

-কে তুমি? নিবিড়ের ফ্ল্যাটে কি করছো?
-আসসালামু আলাইকুম। আ..একচ্যুয়েলি আমি উনার স্ত্রী।
বৃদ্ধা আরও বেশি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-নিবিড় বিয়ে করেছে?
জিয়ানা উপর নিচ মাথা নাড়ায়।
-নিবিড় কি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছে?
এবার জিয়ানা অবাক হয়ে তাকায়।জিয়ানার তাকানো দেখে বৃদ্ধা বলেন,
-আমি নিবিড়ের দাদীর আপন ছোট বোন।এই বিল্ডিং আমাদের।ফ্ল্যাটটা নিবিড় আমাদের কাছ থেকে কিনেছে।ওর পরিবার সম্পর্কে ওর সম্পর্কে সব আমরা জানি।

জিয়ানার থুতনি বুকে নেমে এলো।সত্যি বলতে জিয়ানা নিজেই কিছু জনে না।টুকটাক ছাড়া।কখনো আগ্রহ আসেনি তেমন।তবে বিয়ের পর থেকে নিবিড়কে নিয়ে মাথা না ঘামালেও অটো চলে আসতো ভাবনা।কিন্তু একদিন একরাত থেকে নিবিড়ের সাথে জিয়ানা টানা ছিলো। নিবিড়কে একেবারেই সুস্থ স্বাভাবিক লেগেছে।আগের দিন রাতে ওই বন্ধরুম থেকে গোঙানির শব্দ ছাড়া সব নরমাল ছিলো।
জিয়ানাকে চুপ করে থাকতে দেখে বৃদ্ধা বললেন,
-তোমাদের মাঝে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হয়নি তাই না?
জিয়ানার এবার প্রচন্ড বিরক্ত লাগলো। একজন অপরিচিত মানুষ হয়ে এইভাবে কেউ প্রশ্ন করাটা প্রচুর ব্যাডমেনার্স।তাছাড়া নিজেদের ব্যাক্তিগত বিষয়ে যতই পরিচিত কিংবা কাছের মানুষ হোক বলা উচিত না।বৃদ্ধা বুঝলো মনে হয় জিয়ানার বিরক্তের কথা।জিজ্ঞেস করলো,

-বিরক্ত হইয়ো না।তোমার সুবিধার জন্যই জিজ্ঞেস করেছি।
-আসলে আমাদের স্বাভাবিক বিয়ে নাতো। একে অপরকে চিনিও না ঠিক মতো। আর আমি কাল রাতেই এসেছি।
বলে জিয়ানা চলে আসবে বলে ঘুরলে ,বৃদ্ধা পেছন ডেকে বলে,
-শোন মেয়ে কি নাম তোমার?
-জিয়ানা।জিয়ানা হক।
-জিয়ানা শোনো! নিবিড়ের চাইল্ডহুড ট্রমা আছে।ওও প্রায় তিনবছর কোমায় ছিলো। কোমা থেকে ফিরেও অনেক মাস একটা সিঙ্গেল কথাও বলেনি।ওকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়েছে অনেকদিন।কোন মানুষ বিশেষ করে শাড়ি পড়া কোন মেয়ে মানুষকে দেখলে উন্মাদের মতো ব্যবহার করতো।ওদের পুরাতন নূর ম্যানসন আর আমাদের বাড়ি পাশাপাশি ছিলো।
জিয়ানার এবার আগ্রহ হলো।উনি তাহলে নিবিড়ের সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন।তাই জিজ্ঞেস করলো ,

-কিন্তু এখন ওও একেবারেই সুস্থ। এসব কিছু নেই।
-তোমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি তুমি কিছু জানো না।আর তোমার পোশাক আশাকের জন্য তুমি হইতো নিবিড়ের পার্থক্য ধরতে পারোনি।অবশ্য সেসব অনেক বছর আগের কথা।এতদিনে সুস্থ হলেও হতে পারে।
-কি হয়েছিলো আমি আসলে ডিটেইলস জানি না। টুকটাক জানি।
বৃদ্ধা পাশ থেকে একটা প্লাস্টিকের টোল টেনে এনে বসলেন।উনি গল্প করতে বেশ আগ্রহী দেখেই বুঝা যাচ্ছে।তারপর বলা শুরু করলো ,

-নিবিড়ের গলায় একটা লম্বা কাটা দাগ আছে দেখেছো?
জিয়ানা মাথা নাড়িয়ে বলে ,
-দাঁড়ির জন্য দেখা যায় না।
-কাছাকাছি গেলে দেখা যাবে।ওইটা খর্ব দায়ের দাগ।নিবিড়কে বলি দেয়ার জন্য ধরে নিয়ে গিয়েছিলো ওরই পরিবারের কোন সদস্য। এমনকি বলি প্রায় হয়েও গিয়েছিলো কিন্তু কোনভাবে বেঁচে ফিরে। এসব কথা নূর ম্যানসনের কেউ উচ্চারণ না করলেও আশেপাশের সবাই বলাবলি করে।
জিয়ানার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। বলি? একটা জলজ্যান্ত মানুষকে বলি দিবে তারই আপনজন? নিজের চিত্রের বিচলিত অনুভূতি প্রকাশ না করে প্রশ্ন করলো ,

-তখন উনার বয়স কত ছিলো?
-নয় দশ হবে হইতো।
জিয়ানা গ্রিলে হাত শক্ত করে চেপে ধরে প্রশ্ন করে ,
-সে ঘটনার পর কি উনি অসুস্থ হয়ে পড়ে?
-ভেতরের খবর তো খুটিনাটি জানি না।তবে অসুস্থ হয় পরিবারের অধিকাংশের মৃত্যু দেখে। সাথে নিজের সবচেয়ে কাছের ফুপুকে হারিয়ে।
-আচ্ছা উনার বাবা মা থাকতেও উনি একা থাকেন।আমাকেও কখনো ওইভাবে পরিচয় করিয়ে দেননি।এগুলা নিয়ে আমার একটু সন্দেহ হয়েছিলো।কিন্তু উনার রাগ দেখে আমি প্রশ্ন করতে সাহস পাইনি।
জিয়ানা একটু বেচারা সাজার চেষ্টা করলো। বৃদ্ধা রোবটের মতো আশেপাশে তাকিয়ে আগের চেয়ে গলা নামিয়ে আস্তে করে বলে,

-আসলে লোকমুখে শোনা কথা কি বলি।নিবিড়ের মা স্বপ্নাই নাকি নিবিড়কে বলি দিতে চেয়েছিলো।
জিয়ানার গলা শুকিয়ে গেলো।সাথে মাথায় প্রশ্নরা কিলবিল করে উঠলো।
বৃদ্ধা বলল,
-তুমি আমাদের বাসায় এসো।আলাপ করা যাবে।
-যাবো একদিন।
-নিবিড় আসতে দিবে না আমি জানি।সে নিজেও কখনো আসে না।
বারান্দায় তালাফী নামের বাচ্চাটা আবার এসে বলে,
-ওই জানো? আমার আজ বার্থডে। তুমি এসো হ্যা?
জিয়ানা বৃদ্ধার দিকে তাকালো।বৃদ্ধাও মুচকি হেঁসে বলে ওর ছোট বোনের বার্থডে আজ।এসো তুমি ভালো লাগবে।তাছাড়া নিবিড়ের পরিবারের অনেকেই আসবে প্রোগ্রামে।তুমি এই সুযোগে সবার সাথে আলাপ করতে পারবে।
জিয়ানা মেকি হেঁসে বলে দেখি।তখন বৃদ্ধা টোল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

-কোন সাহায্য লাগলে বলো।আর শুনো মেয়ে বড় হিসেবে একটা কথা বলি,
-নিজের পিঠ দেখেছো কখনো?কেউ দেখেনি।কিন্তু আর্শির সাহায্য নিলে সেটা দেখা সম্ভব। মানুষ নিজে যখন কিছু করতে পারে না তখন অন্যের সাহায্য নেয়।
এসো আজ সন্ধ্যায়। যদি নিবিড়কে বুঝাতো পারো তবে।
বলে বৃদ্ধা চলে গেলো।আর জিয়ানা বসেই থাকলো। নিবিড়ের সম্পর্কে আসলে সে কিচ্ছু জানে না।নিবিড়ের সকল সিক্রেট ওই বদ্ধরুম দুইটাতে পাওয়া যাবে। রুম গুলাতে ঢুকতে হবে এনি হাউ।তারপর উপরে মিরালদের বারান্দায় তাকালো। প্ল্যান কমপ্লিট।

পুরো সাভারের সকল ছাত্রনেতার সাথে নিবিড়ের একটা সেমিনার ছিলো।ব্যাপারটা কিছুটা গোপনীয় ভাবে সামলাতে হয়েছে।নিবিড় এখন স্থানীয় কারো আন্ডারে না ,সে একেবারে কেন্দ্রীয় সরকারের আন্ডারে কাজ করছে।তাই প্ল্যান অনেক বড়। আর অবশ্যই খতরনাক। সবার মনোভাব বুঝার জন্যই আজ সবাইকে ডেকেছে।যারা একতা জানাবে তারা বেঁচে যাবে। আর বাকিরা ফাঁসবে। এটাই একমাত্র নীতি রাজনীতির।
রাজনীতিতে আর একটা খারাপ দিক হলো ” এখানে ব্যাখ্যা করার কোন সিস্টেম নেই।লিডারের মতামতই এক এবং একমাত্র রাস্তা।যেই দ্বিমত জানাবে। ধরা হয় সে ছাটা হয়ে গেছে টিম থেকে।

একটা পার্টির ম্যান পাওয়ার যদি একলাখ হয় ,তবে সেখানে সক্রিয় কর্মী থাকে সর্বোচ্চ দশহাজার।এখন এই দশহাজারের মতামত নিশ্চয় একরকম হবে না।পার্টি যেটা করে ,এই দশহাজারের মাঝে একমতের পাঁচ হাজার নিয়েই আগাবে।বাকি কাজ টাকার। পাঁচ হাজার সকল শুভ অশুভ কাজ কারবার করবে।সাথে অনলাইন যুদ্ধা তো আছে।নিবিড়ের টার্গেট এই পাঁচ হাজার কর্মী।ছোট ছোট গ্রুপ করে সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিবে।প্রচার প্রসার সব একেবারে হবে।টাকা পয়সার ব্যাকাপ রেডি।এখন শুধু ফাইনাল মুভ।
সেমিনার শেষ প্রায় তখন হন্তদন্ত হয়ে মক্কু এলো। আজই প্রথম মক্কুর দেরি হলো। সেটাও এতটা গুরুত্বপূর্ণ একটা সেমিনার। নিবিড় একবার শুধু চেয়ে দেখলো মক্কুকে। তারপর বাকি বক্তব্য শেষ করে সবার সাথে কৌশল বিনিময় করে বিদায় দিলো।সেমিনারটা হয়েছে গাজীপুর শ্রীপুরের গ্রামের একটা বাজারের ভেতর ভাতের হোটেলে।
সবাই বের হয়ে গেলে নিবিড়ের ক্লাবের ছেলেপেলেরা মক্কুকে ঘিরে ধরলো। আকাশ সামনাসামনি গিয়ে কদমবুসি করে বলে,

-ভাই আপনি এখন লেইট লতিফের দলে।মানে আমাদের দলে।ভাই খালি আমাদের আপনাকে দিয়ে উদাহরণ দিতো। সময় জ্ঞান আপনার সেই সেই লেভেলের। কিন্তু এখন আপনি আমাদের দলে চলে এসেছেন।
নিবিড় চেয়েরে বসেই ফোন বের করে বলে ,
-হয়েছে তোদের প্যাচাল এবার সব আস্তেধীরে বের হয়ে যা।
রনি জিজ্ঞেস করে ,
-মক্কু ভাই আজ আপনারে আলাদা লাগতাছে।মনে হইতাছে ফর্সা হয়ে গেছেন?
আকাশ এগিয়ে এসে মক্কুর মুখের একেবারে কাছে চোখ নিয়ে বলে,
-ভাই ভুলে ভাবির ফেয়ার এন্ড লাভলি ক্রিম মাইখা আসেন নাইতো আবার?
মক্কুর ইতস্ততবোধ দেখা নিবিড় কড়া ধমক দিয়ে বলে,

-সবকটাকে কিন্তু চাবকিয়ে পা*ছার ছাল উঠিয়ে ফেলিবো।আকাশ আজকাল তোর মুখ বেশি ছুটে। আগে তোর মুখ সেলাই করবো।
-ভাই দেখেন এইটা মক্কু ভাইয়ের সাথে আমাদের মামলা।আমাদের একবারও খাইয়াইলো না।একটা কড়া ট্রিট কিন্তু আমরা পাওনা।
-চল আজকেই খাওয়াবো। কোথায় খাবি বল?
মক্কু বলে গলার মাফলার ঠিক করে।
নিবিড় পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে এই অক্টোবর মাসেও মক্কু গলায় মাফলার পড়ে এসেছে।নিজের মাঝে চাপা হাঁসি চেপে ফোনে মনোযোগ দিলো।পোলাপান এইটা খেয়াল করলে খবর আছে বলদটার।নিবিড়ের চিন্তা ফলে গেলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে সজল বলে উঠলো ,

-ভাই এই প্যানপ্যানা গরমে আপনে মাফলার পড়ে আসছেন কেন?
-আসলে আমার হঠাৎ ঠান্ডা লেগে গেছে। গলায় ব্যাথা তাই আর কি।
বলে মক্কু কাশার চেষ্টা করলো।আকাশ বলে,
-হ ভাই বিয়ে করলে সবার একটু আকটু ঠান্ডা লাগেই। আর আপনার মাফলার সব ঢাকতে পারে নাই কি কি যেনো উঁকিঝুঁকি দিতাছে।
নিবিড় একটা ধমক দিয়ে সবার মিটি হাঁসি বন্ধ করে।আর আকাশ হাঁসতে হাঁসতে সব পোলাপান দের নিয়ে বের হয়ে যায়।

নিবিড়ও ফোন পকেটে রেখে বের হয়ে এসে বাইকে বসলে ,মক্কু জড়োসড়ো হয়ে এসে পাশে দাঁড়ায়। নিবিড় তার কাচুমাচু আড়চোখে দেখে ইশারা করে পেছনে বসতে।
গাজীপুরের শ্রীপুরের এই রাস্তাটা এতটা মনোমুগ্ধকর না গেলে বুঝা যাবে না।সারি সারি শাল গাছের গন বনের ফাঁকে ফাঁকে অসংখ্য লতানো গাছ।সেই গাছগুলো বড় গাছকে এমন ভাবে প্যাচিয়ে রেখেছে যা আলো চলাচলকে কঠিন করে দিয়েছে।এই বনে প্রায় ২২১ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে।তার মাঝে শাল প্রধান।আর বাকি তৃণ আর লতানো গাছের সংখ্যা বেশি। তারা আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আয়ত্তে নিতে চায় সকল বড় বড় শাল গাছকে।এই চাওয়াটা নিবিড়ের কাছে এক প্রকার জুলুম লাগলো।পেছনে মক্কু নিবিড়ের কাধে আলতো স্পর্শ করে বলে,
-ভাই ইমার্জেন্সি। একটু দাঁড়ান।
নিবিড় বাইক থামালে মক্কু লাফ দিয়ে নেমে রাস্তা থেকে কিছুটা নিচুতে গিয়ে কাজ সারে।আর নিবিড় বাইক রেখে রাস্তার সাইডে দাঁড়ায়।নিরিবিলি প্রকৃতির মাঝে সন্ধ্যা হবে হবে করছে।পাখিদের বাড়ি ফেরার পায়তারা একমনে দেখে চলল নিবিড়।কিছু মনে পড়তেই ফোনের নির্দিষ্ট এপ্যাসে ঢুকে অন করার সাথে সাথে কারেন্ট লাগলো যেনো।
জিয়ানা সাদা গাউনটা পড়ে চুলের খোপা করতে করতে সোফায় গিয়ে বসলো।নিবিড়ের কল্পনার চেয়েও বেশি মহনীয় লাগছে জিয়ানাকে।শুভ্র পরী কিংবা কোন অলীক কন্যার চেয়ে কম লাগছে না।পাখিদের মতো তারও বাড়ি ফেরার জন্য মন তাড়া দিলো। কিন্তু চোখ সরাতে পারলো না ফোন থেকে।
মক্কু সেই কখন এসে পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে দিকে নিবিড়ের খেয়াল নেই।

-ভাই নিজেকে আর কষ্ট দিয়েন না।
মক্কুর কথায় নিবিড় ফোন বন্ধ করে পকেটে ভরে টানটান করে দাঁড়ায়।তারপর গলায় কঠোরতা এনে বলে,
-আজ তুই অনেক বড় অপরাধ করেছিস।কিন্তু প্রথমবার হওয়াই মাফ করলাম।
-ধন্যবাদ ভাই।সত্যি বলতে আজকেই প্রথম আমার ঘর থেকে বের হইতে মন চাই নাই।আমার জীবনের স্বর্গ মনে হয় আমার ঘরটাই ভাই।
নিবিড় চেয়ে দেখে তৃপ্ত পরিতুষ্ট এক পুরুষকে।যার মুখে আজ অন্যরকম আভা।এটাই কি সেই শান্তির আভা? নিবিড়ের হিংসা করা উচিত না?সে কখনো এমন আভায় আভায়িত হতে পারবে না।মক্কু আবার বলে,

-নিজের জড়তা ভেঙে একবার যদি আপনি আগান ভাই এই স্বর্গসুখ আপনারও হবে।
-বেশি কথা বলছিস না?
-বেয়াদবি মাফ করবেন ভাই।একটা কথা না বলে থাকতে পারতাছি না।আপনার কি জিয়ানাকে দেখে ভেতরে কিছু হয় না? আমরা তো বাহির থেকেই বুঝতে পারতাছি আপনার পরিবর্তন। আপনি বুঝতে পারতাছেন না?
-বুঝলেও কি হবে? দুনিয়ার সব মেয়ে একই।এদের পেলে পুষে আদর যত্নে মাথায় তোলার পর বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিবে।
-সবাই এক না ভাই।জিয়ানা তো আরও না।আপনার চেয়ে এইটা আর কে ভালো বুঝে।ভাগ্য যখন সুযোগ দেয় সেটা লুফে নেয়া উচিত। আপনি একবার ডাক্তারের কাছে যান ভাই।কাউন্সলিং করলে আপনার ফোবিয়া কেটে যাবে।আচ্ছা নিজের জন্য না হোক জিয়ানার জন্য হলেও আপনার ভাবা উচিত।সে একটা মেয়ে ওর একটা চাহিদা আছে না?
নিবিড় ঘুরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

-ওর চাহিদা সময় মতো আমি সব মেটাবো।কিন্তু ওও একটা মেয়ে। এটাই ওর বড় অপরাধ।
-ভাই যে আপনি কোন মেয়েকে দুই মিনিট সহ্য করতেন না সেই আপনি কতবার জিয়ানাকে কোলে নিয়েছেন? সব বিপদে আগলিয়ে রেখেছেন? নজরদারিতে রেখেছেন ৭/২8 ঘন্টা।এগুলা শুধু কি নিজের স্বার্থেই?
নিবিড় উত্তর দিলো না। মক্কু জানে উত্তর পাবেও না।যেহেতু চুপ করে আছে তাই আবার বলতে শুরু করলো ,
-সব বাদ দিলাম।আজ আপনি সমস্ত কাজ বাদ দিয়ে তিনঘন্টা ঘুরে ওর জন্য শপিং করেছেন।চেয়ারম্যান স্যার আর হুইপের হাত থেকে বাঁচাতে নিজের ফ্ল্যাটে আটকে রেখেছেন।এগুলা কি এমনি এমনি ভাই? ইগো আর জেদ টা যদি সাইডে রেখে একটু আগানো যায় তবে জীবনের সহজ সুন্দর সুখ গুলা আসার সুযোগ পায়।

-আমি কোন পিছুটানে বাঁধা পড়তে চাই না মক্কু।আমাকে জ্ঞান দিস না।প্রকৃতিটা উপভোগ করতে দে।
-আপনাকে জ্ঞান দেয়ার গাটস আমার নাই ভাই।সেটা আপনার নিজেরই অনেক আছে।কিছু বাস্তব কথাই বললাম। আর পিছুটানের কথা বলেন ,সবারই একটা নির্দিষ্ট গন্ডিতে বাঁধা থাকা ভালো।গরুকে যদি খুটিতে দঁড়ি দিয়ে বাধা না হয় তবে সবার আগে হয় অন্যের ক্ষেতে মুখ দেয় নাহয় সীমানার বাহিরে গিয়ে বিষবৃক্ষে মুখ দেয়।তাছাড়া জিয়ানাকে দেখে যেটা বুঝেছি মেয়েটা একেবারেই অন্যরকম। এমন না সে প্রচুর সুখী।পরিবার ছাড়া একটা মেয়ে এইটুকু বয়সেই জীবনের আসল রং দেখে ফেলেছে।অথচ সবাইকে বুঝাই সে পৃথিবীর সেরা সুখী মানুষ।
-সেরা সুখী মানুষ আর সাদা কাক একই জিনিস।উই ক্যান নট বি সরি ফর দ্যাট হুইচ হ্যাজ নো এক্সিস্টেন্স ইন দ্যা ওয়ার্ড।

-অত কঠিন কথা আমি বুঝি না।শুধু বুঝি যাকে ভালোবাসি তাকে ভালো রাখতে হয়।নিজের জন্য হলেও সেই মানুষটাকে সুখী করতে হয়।মানব ধর্মের অন্যতম দিক এডজাস্ট করা। নিজের অসুবিধা সাইডে রেখে আপন মানুষদের কম্ফি প্লেস নিশ্চিত করা।
নিবিড়ের কলিজায় গিয়ে গেথে যাচ্ছে মক্কুর প্রতিটা কথা।সে জিয়ানাকে ভালো রাখতে পারবে না?নিবিড়ের কালো অতীতের সামনে পড়লে জিয়ানা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাবে মেয়েটার।এত এত সিক্রেট রেখে কোন সম্পর্ক নিশ্চয় আগায় না?দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাইকের কাছে যেতে যেতে বলে,

-তুই একদিনেই এমন জ্ঞানী মানুষদের মতো বিহেভ করছিস কারনটা কি? ঠান্ডা লেগে মগজ খুলে গেলো।
মক্কু নিজের মাথা চুলকে বলে,
-ভাই আপনিও মজা করেন।?
-উঠ।পিছুটানের সুতায় টান লেগেছে বাড়ি ফিরতে হবে।
মক্কু চটপট উঠে বসে মুখে হাঁসি সমেত।যাক মেইল ইগো সাইডে রেখে তবুও এইটুকু স্বীকার তো করলো।যদি কেউ স্বাভাবিক জীবন নিবিড়কে দিতে পারে সেটা একমাত্র জিয়ানাই।এই মেয়ের আলাদা একটা ক্ষমতা আছে যা একমাত্র নিবিড়ের জন্যই উপযুক্ত।

উসকোখুসকো চুলে সারা শরীরে কাদা আর ময়লায় লেপ্টে থাকা উন্মাদের মতো দেখতে একলোক দাঁড়িয়ে আছে নিবিড়ের বিল্ডিংয়ের সামনে। রাস্তা থেকে নিবিড়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ানাকে দেখে মুচকি হাঁসে। তারপর গুনগুন করে গান ধরে,
“পাইয়াছি রে পাইয়াছি
পাখিরে তো পাইয়াছি
ধরবো যখন ভরবো তখন
উড়াল দিতে পারবা না”
দারোয়ান লাঠি নিয়ে এসে তাড়িয়ে দিলো পাগল ভেবে।লোকটাও তেড়ে যায় দারোয়ানের দিকে।অল্পবয়সী দারোয়ান কিছুটা ভয় পায় পাগলকে দেখে।লোকটাও ঘাট হয়ে বসে পড়ে গেটের কাছে ফুটপাতে।ততক্ষণে বারান্দায় খালি।দশমিনিট পর পাশ দিয়ে সাই করে নিবিড় বাইক নিয়ে ঢুকে যায়।পাগলের মতো লোকটা দাঁড়িয়ে সেলুট করে বলে,

-সালামী দে।
দারোয়ান ভারি বিরক্ত হয়ে বলে,
-ওই বেটা যাস নাই এহোনো তুই? চাস টা কি?
-পাখি। পাখি।মহামূল্যবান পাখি।দিবি? হি হি হি
-পাখি তোর ইয়ে ভইরা দিমু পাগলের ঘরে পাগল।
-তোরেই দিমু। তুই পাগল তোর বাপ পাগল তোর…
ভুলে যাওয়ার মতো করে মাথা চুলকিয়ে উঠে সামনে হাটা শুরু করে।
তারপর আবার ঘুরে এসে বলে,
-দুইদিন বাইচ্চা থাকবি আর।ভালোমন্দ খাইস ঠিকমতো আগেই কইলাম।
দারোয়ান লাঠি দিয়ে এইবার কষিয়ে একটা বাড়ি দেয় লোকটার নিতম্বে।
বাড়ি খেয়ে কুটিকুটি করে হেঁসে বলে ,
“উঁচা দাঁতের কালাচান
কোনটা রেখে কোনটা খান”
তারপর দৌঁড় দিয়ে চলে যায় সেখান থেকে।

নিবিড় দরজার লক খুলে ভেতরে ঢুকে। পেছনে ঘুরেই তার অন্তর আত্মা পুলকিত হয়।
চন্দ্রলোক হতে প্রতিফলিত সূর্যের আলো তার সমগ্র ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছে আজ তার আঙিনায়।ঘুমন্ত চন্দ্রকায়া কি জানে তার রুপের আলোয় আজ চাঁদের চুরি করা আলোকে স্নান করে দিয়েছে? এই মনমোহিনী কি জানে কঠিন পাথুরে হৃদয়ের আঁকেবাঁকে এখন কুলকুল করে শীতল ঝর্ণা বয়? এই ঘুমন্ত রাজকন্যা কি জানে তার ঘননেত্র পল্লবের মৃদ্যু কাপনে ইস্পাত পুরুষ মাটিতে মিশে যেতে চায়?
ইলেক্ট্রিক ম্যাগনেটিক বলয়ের টানে নিবিড় স্থুলপায়ে আগায়।সোফায় গালে হাত রেখে ঘুমন্ত জিয়ানার সামনে হাটু মেরে ফ্লোরে বসে পড়ে মুগ্ধতার আবেশে নিমজ্জিত পুরুষটি।গভীর ঘুমের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি ধীর।নিবিড় একেবারে কাছে থাকায় জিয়ানার শ্বাসপ্রশ্বাস আঁছড়ে পড়ছে নিবিড়ের চোখে মুখে।
পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরতে ৩৮৪,৪০০কিলোমিটার।আর নিবিড়ের থেকে তার চাঁদ মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার দূরে।তবুও ছুঁতে পারে না। হাত বাড়িয়ে আবার গুটিয়ে নেয়।আবার বাড়ায় চোখের নেত্রপল্লবে আলতো হাতে ছুঁয়ে দেয়।মুখের উপর পড়ে থাকা কিছু এলোমেলো চুল কানে গুজে দিয়ে আওড়ালো,

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৬

“হে বিলাসী, তব ঐশ্বর্যের ভার
ক্ষুদ্র রুদ্ধদ্বারে শুধু একাকী তোমার।
নাহি পড়ে সূর্যলোক ,নাহি চাহে চাঁদ,
নাহি তাহে নিখিলের নিত্য আশীর্বাদ।
সম্মুখে দাঁড়ালে মৃত্যু মৃত্যুতেই হায়
পাংশুপান্ডু শীর্ণস্নান মিথ্যা হয়ে যায়।
-রবী ঠাকুর”
ঠায় একদৃষ্টিতে নিবিড় কতক্ষন তাকিয়ে ছিলো সেই হিসেব জানা নেই। ফোনের ভাইব্রেশনে উঠে বেডরুমে গেলে,ঘুমন্ত কন্যা মুচকি হেঁসে বলে ,
-চোর কাহিকে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৮