Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৪০

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪০

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪০
আশিকা আক্তার সোহাগী

“নিজেকে হারিয়ে যে তোমাকে পেলো
সে জানে হারানোর কি সুখ।
সুখেরও যে বড় অসুখ,
তারে দিলে তত বড় ওষুধ।
আজ থেকে লিখিত সে ওষুধ ,
তবে বারবার হোক সে অসুখ”
জিয়ানা সেন্স ফিরে দেখে বেডে শুয়ে আছে।গায়ে কাথা মুড়ানোত ফলে ঘেমে একাকার।পাশ ফিরেই হাতে বাজে একটা চিরকুট। তাতে লেখা একটা ছোট্ট কবিতা।আর পেছনেও লেখা আছে কিছু,

“ভালোবাসা যে চেয়েছো? একটা ফ্রেন্স কিসই তো নিতে পারলে না।তবে ৭৫কেজি সুখের ৭৫টনের ভালোবাসা কিভাবে নেবে মেয়ে?
রান্নাঘরে তোমার চাহিদা মতো খাবার রাখা আছে।সব খেয়ে শরীর নিজের মনোভাবের মতো শক্ত করো।অন্যথা হলে খবর আছে তোমার! আজ রাতে ফিরতে পারবো না।ক্লাবের কাজে ব্যাস্ত থাকবো। টেইক কেয়ার।
-সুখনীল নিবিড়”
জিয়ানা উঠে দাঁড়ালো ফটাফট। ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে নিলো কিছুক্ষণ।কয়টা বাজে আন্দাজ করতে পারলো না। একটা বেহেড মেয়েকে এভাবে একা একটা ফ্ল্যাটে ফেলে রেখে ভন্ডলোক গেছে রাজ্য উদ্ধার করতে।আবার ভালোবাসা? ছ্যাহ তোর ভালোবাসা দিয়ে তুই নিজের তলার ছিদ্র কচি দে। এমন কচিমারা ভালোবাসা জিয়ানা পুছে না।যত্তসব ফাউল আদমি কোথাকার।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

পরক্ষণেই হাত গেলো ঠোঁটে।মেরুদণ্ডে কেমন জানি করলো।জিয়ানা পেটে বাবলের মতো ভুডু ভুডু করে উঠলো যেনো।কানে ঠং ঠং ঘন্টাও বাজলো মনে হলো।মাথা ঝাকিয়ে ড্রয়িংয়ে যায়।তারপর তখনকার অবস্থানের কথা মনে পড়লো আবার।আবার ঠোঁটে অটোমেটিক হাত চলে গেলো।দাঁড়িয়ে পা দিয়ে খচাখচি শুরু করলো। ভালো লাগে না তার। এমন লাগছে কেন? দপদপ করে পা ফেলে সেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ থ হয়ে দেখে।তারপর পা দিয়ে দরজায় লাত্থি শুরু করলো। হাত পা ইচ্ছা মতো ছুড়াছুড়ি করে আবার পা মেলে ফ্লোরে বসে পড়ে।
কি অদ্ভুত অনুভূতি। সারা শরীর প্রতি মুহূর্তেই বিদ্যুতের মতো চিলিক ঝিলিক মেরে মেরে যাচ্ছে। আবার বাল্ব ফিউজের মতো নিভেও যাচ্ছে।নিবিড়ের একেবারে কাছে আসায় নিজস্ব পুরুষালী গন্ধ যেনো সারাঘরে পাচ্ছে জিয়ানা।দুই হাত দিয়ে নিজের চুল খামচে কতক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলো।
পরক্ষণেই কিছু মনে পড়েছে ভেবে দ্রুত উঠে পড়ে।ফ্রিজ খুলে বের করে আনে দুইটা ময়দা দিয়ে বানানো থামি।যেটাতে নরম থাকা অবস্থায় চাবির ছাপ নেয়া হয়েছে।

ছাদ থেকে এসেই যখন নিবিড় শাওয়ারে ঢুকে জিয়ানা দেখে আজ নিবিড় চাবি কাবার্ডে রাখেনি। বেডেই ছিলো।লক রুমের দুইটার চাবির নরম ময়দার থামিতে ছাপ নিয়ে একটা কন্টেইনারে ভরে ফ্রিজে রেখেছিলো।যেনো শক্ত হয়ে ছাপটা বসে যায়।এবং কাজ হয়েছে।থামিটা একেবারেই শক্ত হয়ে গেছে।
যেটা নিয়ে বারান্দায় যায় জিয়ানা।স্যাসির কিছু ক্যাক ফুডের দানা হাতে নিয়ে ছুড়ে মারে মিরালদের বারান্দা বরাবর। বার কয়েকবার মারার পর দুইটা মাত্র লাগে মিরালের জানালার গ্লাসে।এর কিছুক্ষণ পরেই মিরাল এসে দাঁড়ায় বারান্দায়।জিয়ানা মিরালকে দেখেই সরাসরি জিজ্ঞেস করে ,

-কয়টা বাজে?
-সাড়ে নয়টা আপু।
-একটা উপকার করবে প্লিজ? করতেই হবে জীবন মরণ প্রশ্ন সুখের।
-এইভাবে বলছো কেনো আপু? বলো কি করতে হবে?
-সামনের গলিতে যে পান সিগারেটের দোকান আছে না টং টাইপের? যেটার পাশে একটা চাবি বানানোর কাকা বসেন রাত দশটা পর্যন্ত থাকেন উনি।এই দুইটা ছাপ নিয়ে যাও প্লিজ।উনাকে দিয়ে বানিয়ে আনবে।
-কিসের চাবি আপু? আর আম্মু আমাকে একা যেতে দিবে নাতো।
-আন্টিকে নিয়েই যাও প্লিজ।সুখের একটা মারাত্মক অসুখ আছে মিরাল।সেসব ডিটেইলস বলতে গেলে চাবি ওয়ালা চলে যাবে।প্রমিস করছি কাল সব বলবো তোমাকে। একটা দড়ি ফেলো আমি এই ব্যাগটা বেঁধে দেই।তুমি টেনে উঠাও।

-আচ্ছা দিচ্ছি।
বলে মিরাল ঘর থেকে একটা দড়ি এনে একপাশ নিজের কাছে ধরে ছুড়ে দেয় জিয়ানার দিকে।কয়েকবার মিস হলেও ফাইনালি ধরতে পারে। মিরাল প্যাকেটটা নিয়েই ছুটে ভেতরে।
জিয়ানা এই সুযোগে রান্নাঘরে যায়।এবং দেখে সব বাঙ্গালী খাবার।আলু ভাজি ,পাতলা ডাল ,রুই মাছের আলু বেগুনের ঝোল ,মুরগীর কারি,সাদা ঝরঝরে ভাত।কালক্ষেপণ না করে জিয়ানা প্লেটে ভাত নিয়ে টপাটপ খেয়ে ফেলে।তারপর আবার দৌঁড় লাগায় বারান্দায়।

নিবিড় মক্কুকে নির্দেশ দিচ্ছে আগামী কালের জন্য কি কি করতে হবে।কাল নিবিড়দের জন্য অগ্নি পরিক্ষা।একসাথে দুইজনকে এক্সপোজ করবে। এই জন্য দেশের টপ লেবেলের পাঁচটা নিউজ চ্যানেলের সাথে কন্ট্রাক্ট করেছে।তারা যদি বেইমানী করে তবেও সমস্যা নেই।কারণ নিবিড়ের আন্ডারে কাজ করা তিনজন ফ্রিল্যান্সার ভালো হ্যাকিং পারে।তারা বেশি ভিউ পাওয়া পেইজ গুলোকে টার্গেট হিসেবে রেখেছে বিকল্প রাস্তা ধরে ।রাত বারোটাই অনলাইনে যদি নিউজ চ্যানেল গুলা প্রকাশ না করে তবে হ্যাকার রা কাজে নেমে পড়বে।
নিবিড় আর একটা কাজে এগিয়ে আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে কিছুক্ষণ আগে নিজের অবস্থান ক্লিয়ার করে রেখেছে।বলেছে তার পিতার সাথে দ্বন্দের জের ধরে পার্টির কিছু ছেলে দ্বারা হামলা করা হয়।এগুলো বিরোধীদলীয় কাজ না।সদলেরই নোংরা রাজনীতি। এমনকি বড় আকুল হয়ে রিকুয়েষ্ট করেছে যেনো তার পিতার নমিনেশনে কোন সমস্যা না হয়।

এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়েছে।এক নিবিড় উনার কাছে স্বচ্ছ থাকলো। দুই নিজের পিতার প্রতি তার টান প্রকাশ করে গোপনে বুঝালো মামুন ইসলাম সৎ লোক না।
সকল প্ল্যান কমপ্লিট করে ফোন চেইক করতে হাতে নেয়।রাত দশটা বাজতে চললো। ঘর ফাঁকা দেখায় কিছুক্ষণ আগের সময় টেনে দেখে।জিয়ানার লাফালাফি দেখে হোঁ হোঁ করে হেঁসে দেয়।আবার নিজেকে সংবরণ করে জুম ইন করে কাছে নিয়ে দেখে ঠোঁটে হাত দিয়ে ব্লাশ করছে জিয়ানা।এবার নিবিড় নিজেও চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে স্মৃতির রোমন্থন করে।

নিবিড়ের কি হয়েছে তখন নিজেও বুঝেনি।নিজের উনত্রিশ বছরের বয়সে এতটা উদগ্রীব আর কন্ট্রোলেস কখনোই লাগেনি।শরীরের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাথে মস্তিষ্ক আর হৃদয়ও একজোট হয়ে তার পুরুষস্বত্বা কেপে উঠেছিলো।নড়ে গেছে সকল সংকল্প।তাই তো বারবার না চাইতেও জিয়ানার কাছে চলে যায়।পরবর্তীতে মনে হয় এই মেয়ের মাঝে চুম্বকীয় শক্তি আছে।কিভাবে যেনো নিজের দিকে বারবার নিবিড়কে টানে।এই যে সিসিটিভির ফুটেজে দেখে এখন মন চাচ্ছে সব ফেলেফুলে ছুটে চলে যেতে এই চুম্বকীয় নারীর পানে।তার ঠোঁটের ভাজে আবার হারাতে।যেখানে নিবিড় একদন্ডের জন্য ভুলে গিয়েছিলো নিজের কালো অতীত ,কলুষিত বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। অশান্তির জীবনে একছটা সুখ পেয়ে নিবিড়ের যে এখন লোভী হতে ইচ্ছা হচ্ছে।

“না না ” বলে মাথা ঝাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো নিবিড়। দুইহাত দুইপাশে চেপেচেপে মাইন্ড ডাইভার্ট করার চেষ্টা করলো অন্যদিকে।
দূর থেকে মক্কু নিবিড়ের এই উচাটন তখন থেকে লক্ষ্য করছিলো।এই মিটিমিটি হাঁসা। আবার ঠোঁট কামড়ে অপলক টিনের চালের ঢেউ গোনা।এখন আবার হাত চেপে চেপে মুখ কঠিন করে ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করছে।মক্কু কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-ভাই বাসার জন্য মন টানছে?
অন্যমনস্ক নিবিড় উত্তর দিলো ,
-টানলেই কি এখন যাওয়া অসম্ভব।
বলেই ফট করে মক্কুর দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় আবার বলে,
-নিতম্বে একটা কিক করবো যেয়ে পড়বি পায়খানায়।ফাইল সব রেডি কর যাহ!
মক্কু নিবিড়ের দিকে ঘুরে নিতম্ব বাঁকিয়ে বলে,

-ভাই মারেন কিন্তু পায়খানায় না ,যেতে চাই বাসায়।নতুন বিয়ে করা বউ রেখে কাম কাজে মন টিকে না।আপনার মনটাও যে আগডুম বাগডুম কর‍তাছে সেটা যে কেউ দেখেই বুঝবে।
নিবিড় তেড়ে যায় মক্কুর দিকে পথে চলে আসে আকাশ।এবং সে তার হাতে একটা কার্ড দেখিয়ে বলে উঠে,
-ভাই একটা প্রশ্ন?
-কোন প্রশ্ন নাই।কাজ কত দূর?
-ভাই প্লিজ?ভাবি কি তার সাইকেলেটারে আপনার চেয়ে বেশি ভালোবাসে? না মানে সাইকেলটারে কি আপনি সতিন ভাবেন? এই নিয়ে দুইবার ভাঙ্গলেন।
-পেনড্রাইভ টা দে।আর নিজের কাজ কর। অহেতুক প্যাচেল পাড়লে এক একটাকে ফ্লোরে ফেলে কেলাবো।
বলে হাতের পেনড্রাইভ নিয়ে ভেতরের রুমে চলে যায় নিবিড়।আকাশ মক্কুর কানে কানে বলে,
-ভাবি মনে হয় ভাইরে ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না।ভাই খালি সারাদিন খ্যাচখ্যাচ করে খিস্তি করতেই থাকে। তাই না মক্কু ভাই?
-যাবি তুই?
-দূর ভালোর ভাত নাই পেন্দের ওষুধ নাই।
বলে আকাশ ক্লাবের এক সাইডে বসা কয়েকজনের দিকে যায়।

প্রনয়ণের নিদর্শন অনেক সময় অনেক ভারি পড়ে।অনেক সময় নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মানুষ ভালোবাসার মানুষের জন্য অসামাজিক অনাচার করে ফেলে।উচিত অনুচিত ,ঠিক ভুল ,ক্ষতি উপকার ,ধর্ম অধর্ম সব গুলিয়ে ফেলে উক্ত অন্ধভালোবাসায় আক্রান্ত ব্যাক্তিটি। আইনের মানদন্ডে কোনভাবেই তাকে বিচার করা সম্ভব হয় না।অন্তত বিবেকের কাছে তো একেবারেই না।
আজ এত এত বছর পর অসংখ্য অনাচার আর নিষ্পাপের বলির মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের অল্প জয় হয়েছে।শয়তানের পূজারীরা বারবার বিশ্রী উলুধ্বনি দিচ্ছে হেল স্যাটানের মূর্তির সামনে।উক্ত রমনীটির আঙুলের কম্পনে তাদের এই বিজয় উল্লাস।

খবর পেয়ে ছুটে আসে সেই ষাটোর্ধ পুরুষ। যার কঠিন সাধনার নারী আজ সাড়া দিয়েছে। আজ অপবিত্র হয়ে না স্বাভাবিক ভাবেই গেলো সেই সুসজ্জিত কামরায়।আজ কামরায় নেই কোন বাড়তি সাজসজ্জা। না কোন অশুভ ধোঁয়ার কুন্ডলী। স্বাভাবিক ভাবেই ভেতর থেকে উঠে এলো সেই কফিন আর তার ভেতরে রাজকীয় সেই রমনী। বন্ধ চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।হাতের তর্জনী আঙুল কেপে কেপে উঠছে।
আকুল হয়ে বেশ অনেকক্ষণ কাঁদলেন সেই শয়তানের পূজারী।এই কক্ষে থেইষ্টিক স্যাটানিজমদের (আস্তিক শয়তানবাদ) প্রবেশ নিষিদ্ধ। এখানে শুধু অবজেক্ট আর সাবজেক্ট প্রবেশ করতে পারবে।অন্য কেউ প্রবেশ করলে কালু জাদু বিকৃত হয়ে তাদের সকল সাধনা নষ্ট হয়ে যাবে।তাই তো এত গোপনীয়তা। এত আড়াল ,এত মুখোশ ,এত অভিনয়। না হলে সে এই দুনিয়ার ধার ধারে না।এখনো শ্বাস নিচ্ছে শুরু মাত্র এই রমনীটির জন্য।
কান্নারত অবস্থায় রমনীর হাতে চুমু খেলেন লোকটি। তারপর বের হয়ে এলেন সেই পেন্টাগন আর বেদির কক্ষে। যেখানে শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছে।যেই রুমে পালন করা হয় অ্যানব্যাপ্টিসম অর্থাৎ জন্মগত ধর্মের রীতির উল্টা রীতি প্রক্রিয়া।

শয়তানের যে তাগূত সে এগিয়ে এসে সম্মোধন করলো লোকটিকে। কাটকাট ইংরেজিতে বলল,
-ইউর ওয়েট ইজ অলমোস্ট ওভার ,সান।দ্যা ডেভিল হেজ হার্ড ইউর ওয়ার্ড।জাষ্ট টু মোর লাইভস নিড টু বি স্যাক্রিফাইস এন্ড দ্যা প্রিন্সেস উইল আওয়েকেন।
-রিয়েলি তাগূত? উইল আই এগেইন ফাইন্ড হার ইন দিস লাইফ?
-ইয়েস ইউ জাষ্ট নিড টু মোর ইনোসেন্ট।
-আই উইল ডেফিনিটলি গেট দোজ।

সকল কাজে নিবিড়ের আজ বড্ড উদাসীনতা। কোনভাবেই কাজে মনোনিবেশ করতে পারছে না।তাই কিছুক্ষণের জন্য ব্রেক নিলো।আর তখনই নজরে আসে টেবিলের উপর রাখা পেনড্রাইভটা।হাতে নিয়ে ডেস্কটপে কানেক্ট করে নিবিড়।
ড্রাইভে অনেক গুলা ফোল্ডার।একটা সুখ নামের। সেটাতে ক্লিক করার সাথে সাথে একটা ছবি চলে এলো।জিয়ানা নিবিড়ের গাল টেনে সেল্ফি তুলেছে।নিবিড় বিছানায় চার হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে বিধ্বস্ত হয়ে। একপাশে স্যাসির লেজ দেখা যাচ্ছে।
নিবিড় মনে করার চেষ্টা করলো এটা কবেরকার। তারপর মনে পড়লো তাদের বিয়ের রাতের ছবি।কেমন পাজি হলে কেউ এই মুহুর্তের ছবি ক্লিক করতে পারে।
পরবর্তী ছবি নিবিড় সমুদ্রকে পিটাচ্ছে ক্যাম্পাসের মাঠে। হালকা ব্লার এসেছে ছবিটা।তবে ফ্রেম চমৎকার। মনে হচ্ছে কোন একশন মুভির পোষ্টার।
নিবিড়ের ভাষনের সময় তুলা ছবি।ক্লাবের সামনে করিম মামার চায়ের দোকানে বসা ,বাইক চালানোর একটা দুর্দান্ত ছবিও আছে।ছবিটা এত বেশি পছন্দ হলো নিবিড়ের সেটা তখনই ইন্সট্রার পিপি সেট করলো।ক্যাপশনে দিলো ,
“সুখের চাঁদ ”
আরেকটা ফোল্ডারের নাম আসুন গান শিখি,
সেখানে ভিডিওতে রাব্বি গান গাইছে,

“আকা বাকা কে কে
আমি না তুমি না
এ্যা এ্যা.. ”
ক্যামেরার পেছন থেকে জিয়ানা জিজ্ঞেস করলো ,
এটা কার গান? চেনা চেনা লাগে। কিন্তু বাপ জীবনে এমন গান শুনি নাই।
-উস্তাদ এইডা তো পাকাচুলী বিদ্যাশি বেডির গান।ফুটবল নিয়ে ছিড়াবিড়া ডেরেস পইড়া নাইচ্চা নাইচ্চা যে গায়। ওইটাই।
জিয়ানা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করে ,
-ওক্কা ওক্কা?
-হ হ ওইডাই।
জিয়ানার খিলখিল হাঁসির শব্দ পাওয়া গেলো কিছুক্ষণ। তারপর বলে ,
-তুই তো আমার চেয়ে এক ডিগ্রী উপরে রাব্বি।আফ্রিকান গানকে বাংলা বানাই দিছিস।

তখনই দরজায় নক হলো।পেনড্রাইভ খুলে ড্রয়ারে রেখে দিলো নিবিড়। মক্কু এসে জিজ্ঞেস করলো ,
-খাবেন না ভাই?
-নাহ।
-অল্প খান। সবাই খাবো।
-খেয়েছি।তোরা খা।
মক্কু বের হয়ে গেলে নিবিড় মনে মনে বলে,
-অন্যকিছু খেয়ে সেই স্বাদ নিচে ফেলতে চাই না।এই অল্প পাওয়া সুখটুকু বড্ড আরাম ঠেকছে শরীরে। এলোমেলো হয়ে গেছে ভেতরের পুরুষ আত্মা।

বেশ অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে থাকার পর মিরাল এলো। জিয়ানার উচাটন বাড়ে।আজকের রাত টাই তার শেষ সুযোগ। কাল তার ৭২ ঘন্টা হয়ে গেলে এজেন্সি থেকে নিশ্চিত হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।সে নিজেও দেখেছে একটা পাগল বেশের লোক বারান্দা বরাবর তাকিয়ে ছিলো আজ।মেন্টালিটি ডিজেবলের দৃষ্টি কখনো স্থির হয় না।কিন্তু এই ব্যাক্তি স্থির তাকিয়ে ছিলো জিয়ানার দিকে।তাই কাল কি হবে সে জানে না। তাই অনিশ্চিত কিছু ঘটার আগে সে নিজের কৌতুহল মিটাবে।দরজা ভেঙে হলেও আজ তার সেই রুম গুলাতে অনুসন্ধান চালাতেই হবে।
-আপু কাজ হয়েছে।আমরা গিয়ে দেখি মামা ব্যাগ পত্র গুছিয়ে উঠে পড়েছে।রিকুয়েষ্ট করে বানাতে দেরি হলো।
বলে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঢিল ছুড়ে জিয়ানার বরাবর।চাবি দুটা হাতে পাওয়ার সাথে সাথে জিয়ানা বলে,
-শুকরিয়া মিরাল।দেখা হবে নতুন দুনিয়ায়।

ড্রয়িংরুম সহ পুরো ফ্ল্যাটের লাইট অফ করে দেয় জিয়ানা।তারপর চোখ বন্ধ রাখে অনেকক্ষণ।আস্তেধীরে চোখ খুলে পুরা ফ্ল্যাট স্ক্যান করে নিজের চোখ দিয়ে।নির্দিষ্ট ছোট লাল আলো ছাড়া অন্য আলোর নিশান খোঁজতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।এবং জিয়ানার ধারণায় সঠিক। ড্রয়িংরুমের মাঝামাঝি বেডরুমের দরজা বরাবর লাইটের উপরের টিপটিপ করে একটা সবুজ ছোট আলো জ্বলছে।নিবিড় যে তাকে ফাঁকা ফ্ল্যাটে এমনি এমনি রাখবে না এটা বাচ্চাও বুঝবে।লাইট অন করে কিছুক্ষণ টিভি দেখলো।তারপর বেডরুমে গিয়ে একটা টাওয়াল আনলো।টাওয়াল দলাপাকিয়ে কিছুক্ষণ সেটা দিয়ে ফুটবল খেলে আবার উপর নিচ ছুড়াছুঁড়িও খেললো।একপর্যায়ে টাওয়াল সেই লাইট বারবার ছুড়ে মেরে ফট করে পেছনে চলে যায়।আর হাতে লাল রংয়ের টুথপেষ্ট নিয়ে রেডি হয়।উদ্দেশ্য বেডরুম বরাবর দরজা ধরে উপরে উঠে ক্যামেরার স্কিনে লাল পেষ্ট লাগিয়ে দেয়া।

বার কয়েক ঢিল ছুড়ে খেলার বাহানায় ক্যামেরায় আঘাত করলো টাওয়াল দিয়ে। তারপর ফট করে প্ল্যান অনুযায়ী দরজা দিয়ে উঠে পেষ্টের মোটা প্রলেপ দিয়ে দিলো ক্যামেরায়।নে এবার দেখ কেমন লাগে।
আর সময় ক্ষেপন না করে চাবি নিয়ে ঢুকে যায় না দেখা রুমে।এবং এটা একটা মাস্তানের সরঞ্জামের ঘর মনে হলো জিয়ানার।পাশের ঘরের সাথে এই ঘরের আকাশ পাতাল পার্থক্য। ঘরটা কানায় কানায় পুরনো হকিষ্টিক ,লাঠি, কয়েক রকমের চাপাতি ,লম্বা দা , নানা দেশি অস্ত্র।আবার আরেকপাশে অনেক বোতল। যদিও বেশিরভাগ খালি। ছোট একটা কাঠের টেবিলের উপর অসংখ্য কাগজ পত্র এলোমেলো। এই ঘরে মনে হয় খুব একটা আসে না।ধুলোর স্তুপে পরিনত হয়েছে।জিয়ানা সেই টাওয়ালটা নামে মুখে ধরে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।অনেক গুলা কাটা ছেড়া নকশা। পাশে একটা পেন হোল্ডারে অনেক রকমের কলম। একটা সুন্দর পিতলের কলম দেখে জিয়ানা হাতে নেয়।খুলে কিভাবে দেখার জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রেস করতে থাকে।একসময় হঠাৎ করে কলমের মাথা হতে লম্বা সূচালো একটা চিকন ছুড়ি টাইপ আগা বের হয়।প্রচন্ড ধারালো যেটা।জিয়ানার প্রচুর পছন্দ হলো জিনিসটা। কেউ বুঝবেই না এটা একটা অস্ত্র।তাই নিজের পকেটে রেখে বের হয়ে আসে ঘর থেকে।

তারপর ঢুকে তখনকার সেই লাইব্রেরিতে। এখন আবার ভালোভাবে ঘুরেফিরে দেখে জীবনানন্দ দাশের সেই চারটা বই নিয়ে বসে ফ্লোরে।
চিকন বইটা সত্যি কবিতার বই। আর পরেরটা হাতে নিয়েই মনে হলো ঢেবে গেছে খানিক।খুলে দেখে একটা অনেক পুরাতন ডায়েরি। কারো ব্যাক্তিগত ডায়েরি বিনা অনুমতিতে খোলা উচিত না।কিন্তু নিবিড়কে জানতে হলে জিয়ানার আর কোন উপায় নেই।তার কাছে আসার জন্য হলেও। কিংবা তার সত্যি অসুখ আছে কিনা জানতে হলে জিয়ানাকে এই অনুচিত কাজটা করতেই হবে।আর সিক্রেট ইনফর্মারদের জন্য এই সব অনুসন্ধানের কাজ জায়েজ।
ডায়েরির পাতা উল্টিয়ে দেখে নূরজাহান খাতুন। দ্যা মালকিন অফ নূর ম্যানসন।মানে এটা নিবিড়ের দাদার মা। এই ডায়েরিতে শুধু পারিবারিক ছবি।জিয়ানা উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে সব সাদাকালো ছবি।

তারপর তৃতীয় বইটা খুলে পায় নীলুফা ইয়াসমিন। এইবার জিয়ানা নড়েচড়ে বসে। ডায়েরি খুলেই পায় একটা হাস্যজ্বল চমৎকার সুশ্রী একজন নারী চেয়ারে বাবু হয়ে বসে খিলখিল করে হাঁসছে।জিয়ানা হাত বুলায় ছবিটার উপর।তাদের বাসাতেও আছে একটা ছবি।ধানক্ষেতের আইলে শাড়ি পড়ে আঞ্জুমানের সাথে দাঁড়ানো।
পরের পাতা উল্টায় জিয়ানা।জীবনানন্দ দাশের একটা কবিতা লেখা গুটাগুটা হাতে।পরবর্তী বেশ কয়েকটা পাতায় কবিতা আর গান লেখা।মাঝখানের কিছু পাতা ছেড়া।আবার খালি পাতা। তারপর শুরু কিছু রচনা টাইপ লেখা।বেশিরভাগ অভিযোগ কাউকে নিয়ে কিন্তু কোন নাম উল্লেখ নেই।তবুও জিয়ানা এ টু জেট পড়লো।অধিকাংশ কিশোরী বয়সের নানা অভিযোগ নিয়ে কাচাহাতের লেখা।
পড়তে পড়তে থামে জিয়ানা একটা হেডলাইন টাইপ লেখায়।

যার জন্মই পাপের মাধ্যমে তার সাথে ভালো কিছু আর কি হবে?
আমি নীলুফা ইয়াসমিন। আমার বয়স তেইশ।আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কলুষিত দিক আজ জানতে পারলাম।দুইভাইয়ের একবোন হওয়াই আমাকে পুরা পরিবার মাথায় করে রাখলেও, আমার দাদি নূরজাহানের চোখের বিষ ছিলাম আমি।এতকাল ভাবতাম মেয়ে দেখে দাদির পছন্দ না।কিন্তু আজ অনুরাধার মায়ের কাছ থেকে সত্যটা শুনে নিজেকে খুবই নোংরা লাগছে।অনেক্ষণ আমার সুখ বাবুকে বুকে জরিয়ে কাদলাম।আমি এই বয়সেও যে কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।আমার বাচ্চাটা কিভাবে এই ছোট্ট বয়সে সেই কষ্ট বয়ে বেড়াতে পারে?

নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৯

কিছু পেইজ আবার ছেড়া।
আবার শুরু ,
কোন গুনি একজন বলেছিলো “যত্নে বানানো এককাপ চায়ে যে পরিমান ভালোবাসা থাকে ,বিশাল এক সমুদ্রে সে পরিমান লবণও থাকে না।”
ঠিক তেমনই আমার আদরে গড়া আমার সুখের ভেতরে যে পরিমাণ মনুষ্যত্ব আর বিবেকবোদ আছে সারা দুনিয়ার মানুষের একসাথে সেটা নেই।আমার সুখ ছোট থেকেই দ্বায়িত্ব বান।পরিবার তার কাছে সবার আগে।সবাই তাকে যতই হেলাফেলা করে সে ততই তাদের মন জয় করে।তাই তো সুখ এখন নূর মেনসনের অন্তপ্রাণ।
অগোছালো আরও অনেক লেখা। জিয়ানা কিছুই বুঝতে পারছে না।তাই পরের সবচেয়ে মোটা ডায়েরিটা খুলে ফেললো।এবং জিয়ানা প্রথম ধাক্কাটা তখনই খেলো।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৪১