নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৩
আশিকা আক্তার সোহাগী
-পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ বলা হয় পাগলদের। কারণ তাদের বোধ কাজ করে না।আর সবচেয়ে দুঃখী বলা হয় তাদের ,যাদের পরিবার নেই।
তবে আমি কি জিয়ানা? সুখী না দুঃখী?
-আপনি দুঃখময় সুখী।
নিবিড় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে জিয়ানাকে বলে,
-আমার কোন বন্ধুবান্ধন নেই। আর পরিবার থেকেও নেই।
-ইউ হ্যাভ মি।
বলে জিয়ানা নিবিড়ের চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।দুই হাতে লম্বা চুলে বেনি করার চেষ্টা করে। হাতের কাজ থামে নিবিড়ের কথায়,
-চলো আমরা একটা ফুটবল টিমের মতো পরিবার বানাই।
-চলুন।
-আম সিরিয়াস।
-আম অলসো।অনেক গুলা বাচ্চার বাবা মা হবো আমরা।
-আমি অরফানেজের কথা বলিনি।তোমার আর আমার দুইজনের অংশের কথা বলেছি।
-আমি আপনাকে বলেছি না এই রোগ শোকের দুনিয়ায় আর বাড়তি মানুষ আনতে চাই না আমি।বরং যারা ইতিমধ্যে এসে গেছে তাদের অল্প কয়েকজনের দায়িত্ব নিতে চাই।
-আমি ক্ষনিক আনন্দ পাওয়ার জন্য তোমার শরীরে আমার বীজ দেইনি জিয়ানা।আমার বীজে তোমার উর্বর মাটিতে একটা চারাগাছকে দেখার প্রবল ইচ্ছা আর আকাঙ্খা থেকেই এই পদক্ষেপ।
জিয়ানার চোয়াল ঝুলে গেলো এমন কথা শুনে।বলে কি এই লোক? এখানেই উপযুক্ত কারন দর্শানো শুরু করেছে।জবানে একেবারে তালা লাগিয়ে দিলো ভন্ড নেতাটা।এতো পাক্কা রাজনীতিবিদ।তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-দেখুন সুখ।নিজ সন্তানের বাবা মা হওয়া বিশেষ কোন আলাদা কৃতিত্ব নেই।ধরুন আপনার মতো একটা ত্যাড়াব্যাড়া ছেলে আমার পেট থেকে হলো তবে কি হবে জানেন?
নিবিড় ভ্রু নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে কি?
-মে*রে তক্তা বানাবো।মা হিসেবে আমি মোটেও ভালো মা হতে পারবো না।তাছাড়া আপনি যা আপনার ছেলে মেয়ে আপনার মতোই হবে।এখন যদি আপনার নিজ সন্তানের অতিরিক্ত চাওয়া থাকে তবে আরও বিয়ে করে শুধু ফুটবল টিম না ,একসাথে ক্রিকেট ,বলিবল টিমও বানান। নো প্রবলেম।
-উল্টাটাও তো হতে পারে। তোমার মতো বানর হলো।
-নো। আমি অতি ভদ্র বাচ্চা ছিলাম।এখন ঘুমাতে দেন।আপনার ফুটবল টিমের বেইল আমার কাছে নাই।যেহেতু দেখে শুনে বিয়ে করননি হুজুগে করেছেন এবার বুঝুন ঠেলা।ঘুমাবো গুড নাইট।আর একবার যদি পিঞ্জুপিঞ্জু করেন তবে আপনার খবর আছে।এমনিতে আমি প্রতিশোধ নিতে ভুলি না।
নিবিড় শক্ত করে জিয়ানার পেটে দুইহাত দিয়ে চেপে ধরে বলে,
-এই পিঞ্জুপিঞ্জু আবার কি?এইসব ভাষা কোথায় পাও?
-এই যে এভাবে ধরে চটকান আমাকে এটাকেই বলে পিঞ্জুপিঞ্জু।
-ধরিই নাতো।হাত উসফিস করে আরও শক্ত করে ধরতে ইচ্ছা হয়।
-উসফিস?
-সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।
বলে একসাথেই দুইজন শব্দ করে ঘর কাপিয়ে হেসে উঠে।
পাশের ঘর থেকে আঞ্জুমান আর জিয়াউলের কাছে সেই হাসি স্বর্গীয় ঠেকে।জিয়াউল বলে,
-ছেলেটা সবার সাথে অদ্ভুত আচরণ করলেও জিয়ুর সাথে স্বাভাবিক। তাই না?
-হ্যাঁ গত পরশু প্রোগ্রামে কি সুন্দর পাশে পাশে ছিলো। জিয়ুকে বসিয়ে ইন্সট্রাকশন দিয়ে খাওয়াচ্ছিলো।ওরা সহজ হলেই হলো।কাঠখোট্টা ছেলেরা আবার হাজবেন্ড ম্যাটারিয়াল হয়।
-বলছো তবে?
অর্ধবয়স্ক দুইজন মানুষও হেসে উঠে। স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসার রাত গুলোতে অন্যরকম একটা সুখ খেলে যায় সংসারের আনাচে-কানাচে।সংসারে সন্তানদের সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে বাবা-মার চমৎকার বন্ডিং।আর বাবা-মা চাওয়া থাকে সন্তানদের সুখ।
এক বছর পর…..
নিশুতি রাত। ছয়শো এগারো,ছয়শো বারো ,ছয়শো তেরো…. আট মাসের ভরা পেটে জিয়ানা জেগে জেগে এইভাবেই নিবিড়ের দাড়ি গুনছে। বেচারা নিবিড় প্রেগো বউয়ের অত্যাচার সহ্য করছে ঘুমে ঢুলু ঢুলু হয়ে।সারাদিন হাড়গোড় এক করা পরিশ্রম করে নিজের বিছানায় হাত পা মেলে বিশ্রাম নেয়ার কোন ঝো নেই।দাঁড়ি গুনা শেষে শক্ত করে কামড়ে ধরে নিবিড়ের নাক।নিবিড় কোন রকম নাক ছাড়িয়ে বলে,
-কি হচ্ছে কি চাঁদ?
-আমার এখন আপনার নাকের ক্রেবিংস হচ্ছে। দেন প্লিজ প্লিজ।ওইটা না কামড়ালে আমি ম*রে যাবো।আমি ম*রে গেলে আপনার ক্যাসেটের কি হবে?
বলে নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে ফেলে জিয়ানা।বাধ্য হয়েই নিবিড় নিজের নাক এগিয়ে দেয়।প্রথম প্রেগ্ন্যাসি মানেই একটা মাইলস্টোন।বউয়ের যত পাগলামি তাতে সাধ দিতেই হয়।ডাক্তার কড়া করে বলে দিয়েছে মা হাসিখুশি মানেই বাচ্চা হেলদি। তার মতো যেনো গোমড়া মুখো না হয় তাই দাঁতে দাঁত চেপে পাগলের সকল পাগলামিতে সম্মতি দিতে হচ্ছে।
কাল নিশ্চিত মাস্ক দিয়ে নাক ডেকে বের হতে হবে।মান সম্মান এভাবে যে ধূলিসাৎ হবে সেটা ঘুনাক্ষরেও যদি বুঝতো এত বাচ্চা বাচ্চা করতো না নিবিড়।
সত্যি বলতে অন্যের বেলায় যে পুরুষ রওয়ার করে গর্জে উঠে ,সেই একই পুরুষই আবার নিজের আহ্লাদের নারীর কাছে একেবারেই পান্ডা।
এর কয়েক মাস পর জিয়ানা অকাতরে ঘুমাচ্ছে।প্রেগ্ন্যাসির পর থেকে জিয়ানার ঘুম খুব গাঢ় হয়েছে।নিবিড়ের কোলে তাদের তিন মাসের মেয়ে জিসু ইবনাত নিবিড়।মেয়েটা একেবারেই নিবিড়ের চেহারা পেয়েছে।ডেলিভারির পর জিয়ানা সবার আগে জিজ্ঞেস করেছে “নাক টা কার মতো হয়েছে?ওর পাপার মতো?
” নার্সরা অবাক হলেও নিবিড় হয়নি।কারণ জিয়ানা বারবার নিবিড়কে বলেছে “নাক যদি আমার মতো বুঁচা হয় তবে আপনার খবর আছে সুখ?” নিবিড় অভ্যস্ত এইসব উল্টাপাল্টা কথাতে।পুরো প্রেগ্ন্যাসির সময় নানা উদ্ভট কথা জিয়ানার মুখ থেকে বের হয়েছে।
আজও জিয়ানা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু জিসু কেঁদে অস্থির। তার ক্ষুধা লেগেছে।নিবিড় ইতিউতি করেও কান্না থামাতে পারছে না।বাহির থেকে হেটে এসেছে ,কোন কাজে দেয়নি সেটা।তাই বাধ্য হয়ে জিয়ানাকে আলতো স্পর্শ করে মৃদ্যু স্বরে ডাকে ” জিয়ু সোনা। বেবি ক্রাইয়িং।ওর ক্ষুধা লেগেছে।একটু খাওয়াও।”
জিয়ানা হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে।এবার নিবিড়ের মাথা আওলে যাচ্ছে।জিয়ানা বারবার বলেছে সে মাম্মি টাইপ মেয়ে না।বাচ্চার কিছু করতে পারবে না।নিবিড় তখন বড় মুখ করে বলেছে সে আছে না।এখন বুঝছে কত বড় ভুল ছিলো সে।পরক্ষণেই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে যেনো দুনিয়াতেই জান্নাতের ছুঁয়া পেলো।কোন ভুল হয়নি।
সাহস নিয়ে আবার জিয়ানাকে ডাকে।জিয়ানা তেতে উঠে বলে,
-বাপ মেয়ে মিলে আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমাতে দিবেন তো নাকি?
-ওকে খাইয়ে দিয়ে ঘুমাও।
-আপনি খাওয়ান।আপনার নেই?
-আজব প্রশ্ন আমার থাকবে কেনো? ওর বিএম লাগবে।
-হ্যাঁ ওইটাই তো। আপনার যেটা আছে সেটা তো কোন কাজের না। ওহেতুক জায়গা দখল করে দুইটা ডট রাখার মানে কি?ওগুলো কেটে ফেলে দেন।
নিবিড় বেক্কেল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।জিসুরও কান্না থেমে গেছে।
পাঁচ বছরের জিসু বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচে নিবিড়কে টাটা দিচ্ছে।নিবিড় গাড়ির দরজা খুলার আগে শুনতে পেলো।
-ড্যাড? ক্যান ইউ গিভ মি ওয়ান থিংক্স?
-শিওর। হোয়াট ইউ ওয়ান্ট?
-একটা এমন টেকনোলজি যেটা দিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে পি করলে ওই দূরে গিয়ে পড়বে………..
নিবিড় হুড়মুড় করে ঘুম থেকে উঠে বসে।আশেপাশে খুঁজে তার মেয়েকে।পরক্ষণেই আবিষ্কার করে সে জিয়ানার খাটে ঘুমাচ্ছে।পাশে জিয়ানা গালের নিচে হাত দিয়ে গভীর ঘুমে। আর এই পুরাটাই স্বপ্ন ছিলো।কি ভয়াবহ স্বপ্ন রে বাবা।আগে স্বপ্ন দেখতো ভয়াবহ অতীত আর এখন অদ্ভুত ভবিষ্যৎ।
নিজের চুল টেনে ধরে মুচকি হাসে । সকাল হয়ে গেছে।একটা স্নিগ্ধ সুন্দর নতুন সকাল। একটা মিষ্টি মধুর যন্ত্রনার স্বপ্ন দেখার জন্য আজ নামাজ পড়বে নিবিড়।জিয়ানার দিকে ঝুকে কপালে চুমু এঁকে নেমে যায় বিছানা থেকে।
ওয়ারেন্ট বাফেট বলেছেন” বেতন একটা মেডিসিন যা আপনাকে আপনার স্বপ্ন ভুলে থাকার জন্য দেয়া হয়”
জিয়ানার ঘুম ভাঙার পরেই এটা মনে হয়েছে।নিবিড়ও তার জন্য মেডিসিন যা তাকে তার লক্ষ্য থেকে দূরে রাখে।এমন কি জিয়ানার এক্টিভিটিও কমিয়ে দিয়েছি ফিফটি পার্সেন্ট।
কিন্তু এবার আর ঝিমিয়ে থাকা চলছে না। তার ইদানীং যে সুখের নেশা ধরেছে সেটাকে এবার পরিপূর্ণ করতেই হবে।নীলয়কে তার বের করতেই হবে।নিবিড়ের উপর আর ভরসা করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা যাচ্ছে না।ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের নিচের সকল নকশা ওয়াশা অফিসে পাওয়া যাবে নিশ্চিত। সেটা কালেক্ট করতে হবে।দরকার হলে অন্য রাস্তা বেছে নিবে।
আরও একটা জিনিস ভেবেছে।একটা নির্দিষ্ট সময় পর মানুষের নিজের ভালো থাকার মেয়াদ শেষ হয় ,তখন সবাইকে ভালো রাখতে হয়।সবাইকে ভালো রাখার মাধ্যমেই নিজের ভালো থাকাটা তখন নির্ভর করে। এই বোধটা সবার মাঝে সক্রিয় হলে পারিবারিক এত কলহ আর সামাজিক অবক্ষয় কখনোই হতো না।
জিয়ানা এতকাল নিজেকে ভালো রেখে এসেছে যেকোন উপায়ে।কিন্তু আজ সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টায় নূর ম্যানসনের সকলকে ভালো রাখবে।তাদেরকে সে আর জাজ করবে না।
এখন আপাতত তার দুইটা লক্ষ্য। এক চেয়ারম্যানের অফিসের নাড়ি নক্ষত্রে ছাপ মারা।দুই নূর ম্যানসনের সকলের সুখের ব্যবস্থা করা।
নিবিড়কে সে আউট অফ সিলেবাস রাখলো।এই লোকের সাথে জিয়ানা পেরে উঠবে না।তবে টাউন হলে বিদেশি কিছু লোকের সাথে নিবিড়ের কিসের গোপন বৈঠক ছিলো সেটা যদি বের করতে পারতো তবে এই লোকটাকে অল্প হলেও নিজের হাতে রাখতে পারতো।পরক্ষণেই নিজের চিন্তা ঝেড়ে ফেলে।নিবিড় রাজনৈতিক মা*র প্যাচ ভালো বুঝে। সে তার স্বার্থের জন্য মোটামুটি সবই করতে পারে।এবং জিয়ানা এটাও বুঝেছে লোকাল একজন নেতা হয়েই না ,সেন্ট্রাল কোন পার্সোনের জোরে চলছে নিবিড়। জিয়ানার সিক্রেট ইনফরমারের কন্ট্রাক্ট টা হাতের তুড়িতেই উড়িয়ে দিয়েছে। সেটা কেবল একজন নেতা হলে সম্ভব হতো না।জিয়ানার যেহেতু ম্যান পাওয়ার বা নূন্যতম পাওয়ার নেই সুতরাং তার নিবিড়ের সাথে লড়াই মানাই না।সে আপাতত তার জীবনের গন্ডগোল সামলাক।
নিবিড় বেশ সকালেই বের হয়ে গেছে। জিয়ানা তখনো ঘুমে ছিলো।জিয়ানার পড়ার টেবিলের খাতায় লিখে রেখে গেছে,
“অপার্থিব মুগদ্ধতায় আমি
চেয়ে চেয়ে কাটাই মায়াবী প্রহর
রতিক্লান্ত ওই প্রেমময় মুখ দেখে।
আহা এ লগনে বেঁচে থেকেও সুখ।
আমি শুধু মুগদ্ধ চোখে চেয়ে
দেখি আমার ঘুমন্ত প্রিয়ার মুখ”
-রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
এই পাজেলের মতো লোকটার সাথে কবিতা জিনিসটা জিয়ানা একেবারেই মিলাতে পারে না।তবুও হুটহাট কিছু পঙ্কতি জিয়ানার খুব ভালো লাগে। হালকা রোমান্টিক একটা ফিল আসে। রাতে লোকটা কি পরিমান বোল্ড হয়ে উঠেছিলো ভাবতেই জিয়ানার গাল লাল হয়ে উঠে।পরক্ষণেই মাথা ঝাকিয়ে নিবিড়ের ভাওতাবাজি সরিয়ে দিয়ে নিজের লক্ষ্যের দিকে ফোকাস করে।
তারপর আজকের সারাদিনের প্ল্যান সাজালো।প্রথমে ভার্সিটি যাবে। তারপর যাবে চেয়ারম্যান পরিষদের অফিসের পিওনের বাসায়।সেখান থেকে ওয়াশা অফিস।তারপর সন্ধ্যায় নূর ম্যানসন। ফোনের কভারের নিচ রাখা নিবিড়ের দেয়া ক্রেডিট কার্ডটা চেক করে।আজ থেকে এটার ব্যবহার শুরু করবে।সব কাজের প্ল্যান শেষে তার দ্বিতীয় স্ট্রেস কমানোর মেডিসিন জেনিকে ফোন দেয়।জেনি হচ্ছে প্রচন্ড ইমোশনাল। আর ইমোনশাল মানুষ গুলার কাছে সবসময় বিজ্ঞান বড় না। এরা তাত্ত্বিক জিনিসটাকে সুন্দর ভাবে ধারণ করে।ফলে নিউরোফিজিওলজিক্যালের নিয়ন্ত্রনে সবকিছু ব্যালেন্স হয় চমৎকার ভাবে।
“কিরে অমাবস্যার চাঁদ? এত সকাল সকাল ফোন?”
“দুইদিন দেখা হয়নি এইজন্য অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেছি?”
“দরকার টা বলেন মহারানী সবজি বসিয়েছি চুলায়। পুড়ে যাবে।আরেকজন না খেয়েই বের হয়ে গেছে।”
“দরকার তেমন কিছু না। মানে… ”
“কিরে জিয়ু? তুই মানে মানে করছিস? তোর শরীর ঠিক আছে? নাকি ড্রিংকস করেছিস?”
“আরেহ দূর।শোনো ,কলম কাটা হয়েছে কুড়ি যেনো না আসে এটার জন্য কি ব্যবস্থা নিতে হয়?”
জেনি পেয়াজ কাটা থামিয়ে ওড়না ভেজা হাত মুছতে মুছতে অবাক কন্ঠে বলে,
“কি কলম কাটা কুড়ি হাবিজাবি বলছিস? তোর কি হয়েছে জিয়ু?”
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে এই হাদাটা জিয়াউলের মেয়ে কেমনে হয়? কিচ্ছুই বুঝে না।কটমট করে বলে,
“আপি তুমি না বিবাহিত মহিলা? কিচ্ছু বুঝো না দেখি? ফ্যামিলি প্ল্যানিং এর ব্যবস্থা বলো কুইক।”
জেনি হো হো করে হেঁসে উঠে।হাঁসি তার থামেই না।ট্রেইনের মতো ঝমঝমিয়ে চলছে তো চলছেই।জিয়ানা বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিলো।সে আগে ভাবতো তার মাঝে লজ্জার ফাংশন নেই।কিন্তু ইদানীং কোত্থেকে সেটা উদয় হচ্ছে কে জানে।সব রাগ গিয়ে পড়লো নিবিড়ের উপর।আদিম একটা জিনিস সেটা নিয়ে এত সংকোচের কি আছে ।তবুও কেনো যে নিজের ব্যাপার বলতে গেলেই জিহ্বায় ভার অনুভূত হয় কে জানে?সব দোষ ভন্ড নেতার। শা*লা বদ লোক তোর মাথায় মস্ত বড় টাক গজাক।
মেজাজ খারাপ নিয়েই প্ল্যান চেঞ্জ করলো জিয়ানা।অনেকদিন পিওনের বউয়ের সাথে দেখা সাক্ষাৎ যেহেতু নেই তাই হুটহাট বাসায় যাওয়া যায় না।তাই তাড়াহুড়ো করে জগিংয়ে বের হলো।দেখা হয়ে গেলে আজ সরাসরি বাসায় ঢুকে যাবে।
জিয়ানার ভাগ্য আজ ভালো না। হাফ এন্ড আওয়ার হেটেও সেই মহিলার দেখা পেলো না।তাই সিদ্ধান্ত নিলো তাদের বাড়ির সামনে ঘুরাফেরা করবে।হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।ক্লাস শুরু হতে আরও দেড় ঘন্টা।রাস্তার পাশের একটা দোকান থেকে পানি কিনে অল্প খেয়ে দুইপাক দিলো সেই বাড়ির আশেপাশে। তিনবারের মাথায় স্বয়ং পিওনকেই পেলো।যেহেতু সকাল আটটা বাজে সেহেতু উনি অফিস যাচ্ছে মনে হয়।
জিয়ানা লম্বা সালাম দিয়ে এগিয়ে যায়।উনিও হাঁসি মুখে এগিয়ে আসে জিয়ানার দিকে।জিয়ানার নতুন পরিচয় উনি জানেন বিধায় আজ বিশেষ আগ্রহ লোকটার।
“তুমি মানে আপনি এখানে?
“আংকেল তুমিই ঠিক আছি। জগিং করতে করতে এদিকে চলে এসেছিলাম।কাল আমাদের বাসায় ছিলাম তো ”
“ও আচ্ছা।বাসায় যাও।আমি তো এখন অফিসে যাচ্ছি।তোমার আন্টি তোমার কথা খুব বলে।তুমি নিজের পরিচয় দাওনি আমরা আসলে খুব লজ্জিত ”
“যাবো অন্য একদিন।কিন্তু আলাদা পরিচয় দেয়ার মতো কিছু নেই আসলে।সেসব থাক।আমার শ্বশুড়ের কি অবস্থা বলুন তো? উনি খুব একটা বাড়ি ফিরছেন না। কি যে এত কাজ আপনাদের?”
“স্যারের যেনো কি হয়েছে।প্রচন্ড ডিস্টার্ব থাকেন ইদানীং। কোন ফাইলই সাইন হচ্ছে না।একাধিক কাজের জ্যাম বেজে গেছে।”
“বলেন কি? শরীর ঠিক আছে তো?
জিয়ানা বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করে।
“কাল একটা ফাইল নিয়ে গিয়ে দেখি গোছানো অফিসের কি লন্ডভন্ড হাল। আর দেখেও মনে হলো না সুস্থ আছেন।ইদানীং মনে হয় ড্রিংকসও করেন।যে মানুষ স্মোক পর্যন্ত করতো না ,তার অফিস কক্ষে দুই ঝুড়ি ম*দের বোতল।ভাবতে পারছো?”
বলেই জিয়ানার দিকে ঝুকে বলে,
“উনাকে নিয়ে চিন্তায় থাকি দেখে বললাম তোমাকে।তুমি যেহেতু উনার পরিবারের লোক।আর কাউকে বলো না আমি বলেছি একথা ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে বলবো না কিন্তু উনাকে নিয়ে আমার খুব টেনশন হচ্ছে।জনগনের কাজ করতে গিয়ে শেষে না কঠিন রোগে পড়ে যায়।আমাকে আজ নিয়ে চলুন আপনার সাথে।দেখি বুঝিয়ে শুনিয়ে বাসায় আনতে পারি নাকি?”
“আচ্ছা স্যার অফিসেই থাকে কেনো বেশিরভাগ সময়?”
“ঘরের কথা কি বলবো? আমার শ্বাশুড়ির সাথে উনার মনোমালিন্য চলিছে।তাই হইতো। ”
জিয়ানা দুঃখী ভাব করে বলে।
“আচ্ছা চলো তবে আজই।কিন্তু ভেতরে ঢুকে বলো না যে আমার সাথে এসেছো? ঠিক আছে?
“একশোবার ঠিক আছে।চলুন।”
“জনতা জনার্দন। সেটা কেবল নির্বাচনের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত। এই দেশে জনগনের কল্যাণার্থে কোন রাজনীতি বিদ নিজের জীবন যৌবন ক্ষয় করে না।আমি তো আরো আগে আগে না”
বলে ক্লাবের সামনে আন্দোলনরত মানুষের ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে যায় নিবিড়।মক্কু পেছনে যেতে যেতে বলে,
“ভাই ওরা হঠাৎ ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে দখল নিতে চাচ্ছে কেন?”
“আমাকে মাইনাস করার প্রথম পদক্ষেপ এই ক্যাম্পাস।”
ভেতরের রুমের দরজার লক খুলে উত্তর দেয় নিবিড়।
“আমরা হাত গুটায়ে দেখমু খালি?আকাশ কতটা জনপ্রিয় হয়ে গেছে এই কয়েকদিনে সেটা সবাই জানে।তাহলে এরা কারা যারা এই সক্কাল সক্কাল ক্লাব ঘেরাও করলো?”
“আপাতত ওদের সাধ দেয়া ছাড়া কোন উপায় নাই।আকাশকে তাড়াতাড়ি আসতে বল।পদত্যাগ করতে হবে।কাল শ্যামল হাসান আর রুহানীর সাথে এই চুক্তি করছি।ওরা ভাবছে আমার জোর একমাত্র এই ক্যাম্পস দিয়েই।ভেবেছিলাম ফেয়ারলি ভোটের মাধ্যমে জিতবো। কিন্তু প্ল্যান চেঞ্জ মক্কু।টাকা খসাতে হবে রে। অনেক টাকা।”
বলে রকিং চেয়ারে বসে টেবিলের একেবারের নিচের ড্রয়ারে চাবি ঢুকায়।
“ভাই আপনি এমনিতেই জিতবেন। শ্যামল হাসানের মতো বিলাইকে কে ভোট দেবে?”
“বলদের মতো কথা তোর মুখ দিয়ে বের হচ্ছে কেমনে? এই দেশে ভোটে কখনোই কেউ জিতে না।নাইনটি পার্সেন্ট হয় সওদা।ফেলো কড়ি মখো তেল টাইপ।”
“আমার মাথায় কিছু ঢুকতাছে ভাই?”
“ঢুকা লাগবে না।আপাতত পিসি গুলা সরানোর ব্যবস্থা কর।প্ল্যান বি তে আগাবো।প্রচারণা যা হওয়ার হয়েছে এনাফ।এবার টাকার খেলা শুরু। ভেবেছিলাম নূর জাহানা বেগমের সাহায্য নিবো না কিন্তু এখন নিতেই হচ্ছে।”
বলে রহস্যময় হাঁসে নিবিড়।
পরক্ষণেই ফোনটা বের করে অন করার সাথে সাথেই সেটা হাত থেকে ছিটকে পরে ফ্লোরে।নিবিড় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যায়।অপরদিকে মক্কু হুড়মুড় করে এগিয়ে এসে ফোন ধরবে তখনই নিবিড় গর্জে উঠে “স্টপ দেয়ার মক্কু।ডোন্ট… ডোন্ট টাচ ইট।”
মক্কুর আগেই নিবিড় এসে ছু মেরে ফোন উঠিয়ে সরাসরি পকেটে ভরে ফেলে উল্টা ঘুরে যায়। মক্কু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে “ভাই সব ঠিক আছে? কেউ কি ব্ল্যাকমেইল করে কিছু পাঠিয়েছে? ”
“আমাকে যদি কেউ কিছু করতে পারে তবে সেটা একমাত্র তোর বউয়ের বোন ছাড়া আর কেউ না।বাহিরে গিয়ে অপেক্ষা কর,আমি আসছি ”
মক্কু বের হলে নিবিড় ফোন বের করে আবার চেক করে। নিজের ফোনের স্কিনে তাকাতেই লজ্জা লাগছে।কি মাটি দিয়ে আল্লাহ এই মেয়েকে বানিয়েছেন নিবিড়ের মাথায় আসে না।
আবার অন করে ফোন। নিবিড়ের ফোনের ওয়ালপেপার দিয়েছে তারই বডির সিক্রেট পার্টের একটা ফটো।ঝটপট সেটা বদলে জিয়ানার সাইক্লিং করার একটা ফটো ওয়ালপেপার সেট করে।দুইচোখের মাঝখানের জায়গার নাক টা চিমটি দিয়ে ধরে নিবিড় ভাবে এমন চিন্তা একমাত্র জিয়ানার ধারায় সম্ভব। নাকানিচুবানি খাওয়াতে এই মেয়ে সেরা।
ছাই উড়াতে উড়াতে আগুনের দেখা পাওয়া যেতেই পারে। এইজন্য স্বাভাবিক একটা রুমেও জিয়ানা ভালো ভাবে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। রুপক মন্ডল অঘোরে ঘুমাচ্ছিলো অফিসের পাশের রুমটাতে।অফিসের কক্ষ আজ বেশ গুছালো।পিওন যখন বললো “নিবিড়ের বউ এসেছে “উনি হুড়মুড় করে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেছে।
প্রকৃতি প্রেমি মনে হয় লোকটা। একপাশের ওয়াল ঘেঁষে নানা রকম বনসাই সাজানো টবে।অপজিটে একটা অলিভ কালারের সিম্পল ডিভান। মাঝামাঝি একটা অফিস টেবিল আর চেয়ার।ডিভানের পাশে বিশাল সরকারি করিডোরের গ্রিলের জানালা।তবে চেয়ারের পেছনে একটা পুরাতন আলমারি তাতে গাদাগাদি ফাইল রাখা।পাশেই একটা হিবিজিবি দাগের পেইন্টিং।একটা বাচ্চার হাতে কলম ছেড়ে দিলে যেমন ইচ্ছা মত দাগাদারি করে ঠিক তেমন। এতে কি আর্ট বা সৌন্দর্য আছে জিয়ানার বোধগম্য হলো না।
সন্দেহ করার মতো কোন কিছু নেই এই রুমে।তবে যেহেতু রুম থেকে বের হোন না তারমানে এই রুম কিংবা পাশের রেস্টরুমেই আছে সিক্রেট পাস।
জিয়ানা দেখতে দেখতে ডুমুর ফলের বনসাই গাছের কাছে যায়।চারটা বড় বড় ডুমুর ধরে পেকে আছে।পাশেই হলুদ লেবুর বনসাই।পিতলের টবে বেশ যত্ন সহকারে লাগানো গাছ গুলা।একটু নিচু হয়ে টবের নিচের প্লেটের খোদাই করা তারিখ দেখতে গিয়ে তার নজরে পড়ে মোজাইকের ফ্লোরে সুক্ষ্ম কিছু স্ক্র্যাচ। তর্জনী আগুল দিয়ে সেই স্ক্র্যাচে ঘষে বুঝতে পারলো ঘর্ষণের ফলে বেশ অমসৃণ এই জায়গাটা।তার মানে নিয়মিত এই টব গুলা সরানোর হয়।ভারি ভারি টব গুলা কি শুধু মাত্র পরিস্কারের জন্যই সরানো হয় নাকি অন্যকিছু? এখানে সাতটা বনসাই গাছ আছে।কিন্তু স্ক্র্যাচ শুধু তিনটা টবের কাছেই আছে।
জিয়ানা সটান দাঁড়িয়ে যায়।রুপকের সাথে দেখা করার আগেই বের হয়ে যায় অফিস থেকে।
উদ্দেশ্যহীন হয়ে কিছুটা হাটার পর জিয়ানার মনে হলো এই মুহূর্তে একজন নামী দামী মামা চাচার খুব দরকার ছিলো।যার রেফারেন্সে সে কোন সরকারি অফিসে গেলেই তারা বিশেষ তদারকি করবে।কাছেকোলে ,স্মৃতির পাতায় কিংবা জানা শোনার মাঝেও কোন ক্ষমতাধর ব্যাক্তির কথা মাথায় এলো না জিয়ানার।
পকেটে ফোন বের করতে গিয়ে হাতে একটা কার্ড বাজে।তৎক্ষনাৎ সেটা বের করে এনে মুখে মুচকি হাঁসি ফুটে উঠে।
উক্ত কার্ডের উল্লেখিত ফোন নাম্বারে কানেক্ট করে কানে ধরে।
চট করেই রিসিভ হয়ে ভেসে উঠে,
“শফিক আহমেদ স্পিকিং ”
“বাট ক্যান আই কল ইউ “বেটার লেট” মিষ্টার?”
“বেটা ইটস ইউ? আম হ্যাভ বিন ওয়েটিং ফর ইউ ফর আ লং টাইম ডিয়ার?”
“ইউ ক্যান কল মি বেটার কুইক।”
বলে হেঁসে উঠে জিয়ানা।সাথে শফিক আহমেদও হো হো করে হেঁসে দেয়।
*আমি চাই আপনি আজই আসুন নূর ম্যানসনে বেটার লেট? সমাস্যা আছে কি এতে?”
“খুবই উপকৃত হবো এতে।আমার আর এক সপ্তাহ পরেই ফ্লাইট। ”
“আচ্ছা এতে আমার উপর দিয়ে টর্নেডো বয়ে যেতে পারে।কিন্তু এতেও আমার আপত্তি নেই।তবে রিস্ক নিতে পারি যদি…”
“যদি?এনি হেল্প?
“হ্যাঁ। এই অঞ্চলের ওয়াশাতে জব করে এমন কেউ কি আপনার পরিচিত আছেন? ”
“নাহ এই অঞ্চলের নেই তো”
“ওহ ”
“তবে পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্য পারভেজ ইকবাল বাংলাদেশ বার কাউন্সিলরের প্রধান আমার বোজম ফ্রেন্ড। ”
“গ্রেট। উনি কি একটা সিক্রেট জিনিস ফাঁস করবে যদি আপনি চান?”
“কি টাইপ সিক্রেট আগে যে আমাকে শুনতে হবে?”
“বিশেষ কিছু না।এই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের অফিসটা আসলে ব্রিটিস আমলের বিল্ডিং হওয়াই এটার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অসাধারণ। যেটার ডিজাইন প্রায় শত বছরের আগে করা হয়েছে।আমার ভার্সিটির একটা প্রোজেক্টের জন্য এমন চমৎকার কিছু পাবলিক বিল্ডিংয়ের আদি অন্ত ডিজাইন লাগবে।যেটা দিয়ে আমরা আমাদের ভুলগুলা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি আর শত বছরের পুরাতন আর সাধারণ টেকনোলজি দেখে শিখতেও পারি।সাথে পরবর্তীতে আমরা সেগুলা জনকল্যাণমুখী প্রয়োগও করতে পারি।কিন্তু আমি কোন ভাবেই এদের কনভিন্স করতে পারিনি। তাই এখন মনে হচ্ছে এই প্রজেক্ট থেকে আমার লিভ নিতে হবে।”
“ওহো এটা তো একটু ঝামেলারই তবে।কারণ সিকিউরিটি ইস্যু আছে এখানে।আচ্ছা তবুও আমি আমার বন্ধুর কাছে জেনে নিচ্ছি।যদি পারে তো হলোই না হলে আগাম সরি ইয়াং লেডি!”
“ওহ বেটার লেট ইটস ওকে।তবে দেখা হচ্ছে সন্ধ্যা নূর ম্যানসনে?”
“অফকোর্স বেটার কুইক।”
“কালো জাম আমার পছন্দ ”
“অবশ্যই আনবো ”
আরও কিছুক্ষণ স্বপ্নার পছন্দ অপছন্দের কথা সাথে তাদের অল্প দিনের প্রণয়ের নানা কথা জিয়ানা শুনলো ভদ্রলোকের কাছ থেকে।
ফোন রেখে জিয়ানার কাছে লাগলো,পুরুষের আসলে মনের কখনো বয়স বাড়ে না।এই যে লোকটা পঞ্চাশের ঘর ছাড়িয়েছে।বিপত্নীক হয়ে আবার স্বপ্ন বুনছে নতুন সংসারের।।মেয়েরা হলে কি পারতো? উমহু মেয়েরা একবার যে মায়ায় জড়িয়ে যায় সেটার রেশ সারাজীবনেও কাটে না।যদি সন্তান থাকে তবে তো জান্নাতেও অন্য সঙ্গীর কথাও চিন্তা করতে পারে না।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে জিয়ানা।তাকেও ছেলেদের মতো চিন্তা করতে হবে।নিবিড় যদি কোন দিন তাকে মিডিল ফিঙ্গার দেখায় তবে সে দুই হাতের মিডিল ফিঙ্গার দেখাবে।বায়াসড সে কখনোই সাপোর্ট করেনি করবেও না।কাবি নেহি।
জিয়ানা ক্যাম্পাসে এসেই দেখে কিসের যেনো আন্দোলন হচ্ছে। একটু কান খাড়া করার পর শুনতে পেলো নানা স্লোগান। যেগুলা সব আকাশের বিপক্ষে দেয়া হচ্ছে।
“প্রেসিডেন্টের গালে গালে
জুতা মারো তালে তালে”
“এক দুই তিন চার
আকাশ তুই গদি ছাড়”
পাশে এসে মিম দাঁড়ালে জিয়ানা তার কাছ থেকে জানতে পারে ,আকাশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে এরা এখন তার পদত্যাগ চাচ্ছে।জিয়ানা ভীড় ঠেলে সামনে আগায়।ক্লাবের দরজার সামনে চেয়ার বেঞ্চ দিয়ে আটকিয়ে রেখে এইসব স্লোগান দিচ্ছে।কিন্তু এদের কাউকেই পরিচিত লাগছে না।ছাত্র কম ছাত্রের বাপ বেশি লাগছে।জিয়ানা ক্লাবের সামনে গিয়ে চেয়ার আর বেঞ্চ লাত্থি দিয়ে সরিয়ে বলে,
“কিসের আন্দোলন হচ্ছে এখানে?”
ভীড়ের সামনে একজন খেকিয়ে বলে”ওই এইখানে কি? সাইডে যাও। ”
“আপনাদের কাউকেই তো চিনতে পারছি না। কারা আপনারা? ফেস অফ গ্রুপ কে? ”
“আমরা ছাত্র সবাই।আর সবাই ফেস অফ গ্রুপ।”
“এইভাবে তো এই মেরমেরা আন্দোলনের কোন মোমেন্টাম হবে না।এই ক্লাবের যে প্রধান ফেস সে একটা হুংকার ছাড়লেও তো আপনাদের চান্দির চুল উঠে চান্দে চলে যাবে।অহেতুক ঝামেলা করছেন কেন?”
“এই মাইয়া এখানে ঝামেলা কইরো না তো। যাও সরো। এই ক্লাব আমরা বন্ধ করে দিবো।কোন অযোগ্য লোকের আন্ডারে ক্যাম্পাস পলিটিক্স চলবে না।”
বলে।খেকিয়ে উঠে এক গাট্টাগোট্টা এক চাচ্চু টাইপ লোক।ভেতর থেকে এক স্বপ্ল পরিচিত ছেলে জিয়ানাকে ডেকে বলে”ভাবি ভাই আপনাকে ভেতরে ডাকে।”
জিয়ানা তাই আর কথা না বাড়িয়ে চেয়ার টপকে ভেতরে ঢুকে যায়।সাথে মিমও যায়।
ভেতরে ঢুকার সাথে সাথেই আকাশ দাঁত কেলিয়ে সালাম দেয় তারপর জিয়ানার পেছনে মিমকে দেখে বলে” কি বেনিওয়ালি? ভালো?”
মিম ভেবে পায় না এত চিল আর ফুরফুরে মেজাজ মানুষের কেমনে হয়?বাহিরে এর পদত্যাগের জন্য আন্দোলন হচ্ছে আর সে আমাকে ভালো কিনা জিজ্ঞেস করে। মক্কু বের হয়ে আকাশের মাথায় গাট্টা মেরে বলে,
“খাসিলত বদলাবি না?”
“ভাই কয়লা যায় না ধুইলে খাসিলত যায় না মরলে।”
জিয়ানা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
“একে সরিয়ে আপনারা এহসান করছেন মক্কু ভাই।এই টইটই করে ঘুরার পাবলিক।দায়িত্ব এর জন্য গলায় ফাঁস”
“ভাবি ঠিক বলেছেন। দায়িত্ব নিলে শুধু বউয়ের টা আমি নিতে পারি। বাকি সব বেকার লাগে।”
বলে আবার উঁকি মেরে মিমকে দেখে।মিম জিয়ানার দিকে সেটিয়ে যায়।তার আকাশকে দেখলে ভয় লাগে কেমন করে তাকায়।
জিয়ানা আকাশের কথায় কান না দিয়ে মক্কুকে বলে,
“এইসব পেইড আন্দোলনের মানে কি মক্কু ভাই? সুখ কোথায়? আমার একটু দরকার উনাকে।ফোনে পাচ্ছি না।”
“ভেতরে আছে যাও”
জিয়ানা ভেতরে ঢুকে দেখে নিবিড় দুইটা ক্যালেন্ডারের তারিখে মার্ক করছে বেশ মনোযোগ দিয়ে। জিয়ানাকে দেখে সেগুলা সাইটে গুটিয়ে রেখে হাত দিয়ে ইশারা করে কাছে এসে বসার জন্য।জিয়ানা বসতে বসতে বলে,
“ফোন কোথায় আপনার? ”
নিবিড় জিয়ানার হাত খপ করে ধরে বলে,
“ইবলিশ কি তোমার কাছে তালিম নেই ,না তুমি তার কাছে নাও? ”
মাথায় আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে আবার বলে,
“এত দুষ্টু বুদ্ধি এখানে কিভাবে আটে?”
জিয়ানা খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে বলে,
“রাগ হলে আমি প্রতিশোধ নেই।আপনি ওই শাকচুন্নির কাছে গেছেন দেখে আমার প্রচন্ড রাগ হয়েছিলো তাই দয়া করে হালকা শাস্তি দিয়েছি।তবে একটা জিনিস আবিস্কার করেছি।”
“কি”
“আদালতে আমি মিথ্যা বলিনি ”
বলে ঘর কাপিয়ে হেঁসে উঠে।সেই হাঁসির শব্দে সাউন্ডপ্রোফ ঘরের দেয়ালে ঠা ঠা করে আছড়ে পড়ে।নিবিড় মোহাচ্ছন্ন হয়ে সেই হাঁসির দিকে তাকিয়ে জিয়ানাকে নিজের কাছে টেনে নেই।জিয়ানা নিবিড়ের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বলে,
“শুনোন আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। এখন আপনার অনুমতি চাই?”
“গো এহেড ”
“মা মানে স্বপ্না মার এই জীবনটা আমি দেখতে পারছি না।উনি একটা বেটার লাইফ ডিজার্ভ করেন।”
“বসন্ত শেষে গ্রীষ্মের প্রখরতায় সব ফুল ম*রে উষ্কখুষ্ক শীতের কালে এসে ফুল দেখার শখ কি আর থাকে? থাকলেও কি দেখা সম্ভব? ”
“বেটার লেট দেন নেভার।একটা অপশন আছে আমার হাতে।”
বলে শফিক আহমাদের কার্ডটা নিবিড়ের হাতে দিয়ে আদি অন্ত সব খুলে বলে।নিবিড় কার্ডটা দেখে পিসিতে উনার নাম গুগল করে সব ইনফরমেশন বের করে। তারপর জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তারা যদি চায় এখানে আমার কোন আপত্তি নেই।উনাদের সাথে আমার কোন কালেই কানেকশন ছিলো না।তোমার যেটা ভালো মনে হয় করতে পারো।”
নীতিহীন রাজ পর্ব ৬২
“উনি আপনাকে জন্ম দিয়েছে এই জন্য হলেও আপনার কিন্তু রেস্পন্সিবিলিটি আছে সুখ?”
“প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ প্রানীর জন্ম হয়। এতে মহিমান্বিত বোধের কিছু নেই।আমাকে জন্ম দিয়ে উদ্ধার তো কেউ করেনি জিয়ানা?ওই দিকে না যাই। এই ব্যাপারে আমাকেও জড়িয়ো না।তবে উনার একটা গতি হলে আমি মানুষ হিসেবে খুশি হবো।মিথ্যা পরিচয় নিয়ে আর কতকাল বয়ে বেড়াবে।”
“তবে সন্ধ্যায় আপনি থাকবেন? আমি নানুর সাথেও কথা বলেছি।উনারও আপত্তি নেই।”
“আমার ফিরতে দেরি হবে।তবে চেষ্টা করবো।”
