Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৭০

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭০

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭০
আশিকা আক্তার সোহাগী

“ধুলো ছিলো চেহারায় আর আমি সারাক্ষণ আয়না মুছে গেলাম -মির্জা গালিব।”
ধরফর করে উঠে বসে মাইমুনা।তার চিন্তা ধারায় ভুল ছিলো।ছোটবেলার ঘটা ঘটনার কিছুই মনে নেই তার।বাবা মার স্মৃতি আবছা আবছা ছন্নছাড়া মেঘের মতো কিছুটা আছে আবার সব হাওয়া।তার নানা বাড়ির লোকজন সারাজীবন উস্কে এসেছে।নূর ম্যানসনের সবাই তো ঠিকঠাক ,দিব্বি বেঁচে আছে তবে মাজাহারের পরিবারের কেউ নেই কেনো?তবে কি পরিকল্পিত সব?শতকোটি টাকার সম্পত্তির ভাগ কমাতে এইসব পরিকল্পনা?নানা জটিল চিন্তা তারা ঠুসে ঠুসে মাইমুনার মগজে ঢুকিয়েছে।বছরখানেক থেকে তো আরও কঠিন পরিকল্পনা করে আসছিলো তার দুই মামা মিলে।

মাইমুনা তাকিতুকি করে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির দিকে তাকাতেই শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠে।তড়িঘড়ি করে নেমে দিকবিদিক ভুলে দৌঁড় শুরু করে বাসার দিকে।
রিসিপশনে লতা আর রেবেকা বসে ছিলো।লতার কোলে তাহানী জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। তাহাকে শিশুবিভাগে কয়েকঘন্টার জন্য অবজারভে রেখেছে।শরীরে অক্সিজেন সাপ্লাই কমে আসায় নার্ভ উইক হয়ে গেছে। মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে আসার আগেই রেসকিউ করায় বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

দ্বিপ্রহর শুরুর বেশ কিছুক্ষণ পাড় হয়ে গেছে। আষাড়ের শেষ শ্রাবণের শুরু হয়েছে।শ্রাবণা নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের নাম এসেছে।নক্ষত্রের মতো ঝলমলে দুপুর চিড়ে সাঁইসাঁই করে ছুঁটে চলেছে মাইমুনার ব্যবহৃত ব্যাক্তিগত গাড়িটি।আপাতত তার মাথা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।এতকাল জেনে এসেছে এরা কেউ তার পরিবার না,সবাই শত্রু।আজ সকালের নিবিড়ের ব্যবহারের পর সেই বোধ আরও বেশি মাথায় চেপে বসেছিলো।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যেনো নিজে আঙুল দিয়ে দেখালেন,এরাই তোর আপনজন।এরাই কাতর হয় তোর বিপদের সময়।
শুক্রবার লান্সের খাবারের নূর ম্যানসনের সবাই উপস্থিত থাকে ডাইনিংয়ে। শুধুমাত্র উম্মে কুলসুম আর রেবেকা ছাড়া।মাইমুনা আর রাহাকে এডমিট করে সবাই লান্স করতে এসেছে বাসায়।রেবেকা আর লতা আছে সেখানে।
সবাই বসে অ্যাপিটাইজার দিয়ে শুরু করেছে।জিয়ানার নজর রুপক মন্ডলের দিকে।লোকটার চেহারা আজ কেমন মলিন মলিন ভাব।আজ আর গান্ডেপিন্ডে বিফ খাচ্ছে না।একটা অনথন নিয়ে অল্প টুকরো মুখে দিয়ে ধ্যান ধরে বসে আছে মাথা নিচু করে।

নিবিড় জিয়ানার প্লেটে একচামচ কাচা ছোলার সালাদ দিয়ে ইশারা করে খেতে।জিয়ানার নাক ফুলে উঠে।এই অখাদ্য নিবিড় তাকে প্রতিদিন জোর করে খাওয়াই।কাচা ছোলার সাথে মুরগীর বুকের মাংস আর আলো সেদ্ধ দিয়ে কিছু সিজলিং এড করা একটা সালাদ। এরা সবাই দুই চামচ করে খায়।এটার নাম পিক-মি-আপ।ইন্সট্যান্ট এনার্জি নাকি।এদের সাথে থেকে জিয়ানার ধারণা পাল্টে গেছে।এদের লাইফলিড কস্ট অত্যাধিক বেশি কারণ ,বিলাসিতা রন্ধে রন্ধে। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে এত কিছু লাগে না।সারাজীবন এত নকশা করে সেই তো সাড়ে তিনহাত মাটিতেই জায়গা হবে।খাবার আর পোশাকের পেছনে এত ইনভেস্টমেন্ট আসলে যুক্তিহীন লাগে তার কাছে।
জিয়ানা খাচ্ছে না দেখে নিবিড় নিজের স্পোন দিয়ে একচামচ সালাদ উঠায় আর বাহাত দিয়ে জিয়ানার মুখ চেপে হাঁ করিয়ে পুরোটাই ঢুকিয়ে দেয়।

ফিজান কিটকিয়ে হেঁসে উঠে।এতক্ষণ সে কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে ছিলো।সবাইকে বলেছে নিজ অপরাধ।জিয়ানা ফারহানার দিকে তাকালে ফারহানা নজর লুকানোর চেষ্টা করে।বাচ্চাদের সাবকন্সিয়াস মাইন্ড আসলে আশেপাশের পরিবেশ খুব ভালোভাবে অবজারভ করে।আজকে হাতে নাতে প্রমাণ সে পেয়েছে।কতবড় একটা দূর্ঘটনার হাত থেকে আজ রক্ষা পেলো।
অপরদিকে ফিজান জিয়ানার সাথে থেকে থেকে নিবিড়কে দেখে তার কিছুটা ভয় কেটেছে।হাঁসার শব্দে মেহেদী মুখ তুলে বলে,’এসব শিখে রাখ ফিজু।বউকে এভাবে যত্ন করতে হয়। নাহলে এই বংশের পুরুষের আবার বউ ভাগ্য ভালো না।’
ফারহানার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে পিঞ্চ করেই বলে কথাটা।
জিয়ানা খাবার ভরা মুখে বলে,’খাসিলত খারাপ থাকলে বউ ভাগ্য খারাপই হয়।’

‘আগে খাও পরে কথা বলো ক্রিপ।’
মেহেদী কটমট করে বলে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে। জিয়ানা মুখ বাকিয়ে বলে,
‘আমি দুইটাই একসাথে করবো। সমস্যা গরুবেষক? ‘
‘গরুবেষক?হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ইট?ভাশুর হই তোমার।’
‘খাবার মুখে তো তাই ভুল স্পেলিং হয়েছে।গবেষক হবে। ‘
নিবিড় আরেক চামচ মুখে পুড়ে দিয়ে বলে,
‘ঝগড়া না করলে তোমার পেটের ভাত হজম হয় না তাই না?
‘এই না হলে আমার ভাই?এই মেয়ে যে ঝগড়াটে সেটা প্রমাণ হয়ে গেলো?’
‘সব জায়গায় সবসময় সত্যি কথা বলতে হয় না গরুবেষক।’
বলে অট্টহাসি দিয়ে উঠে রাফিন।সাথে সবাই।রুপক মন্ডল অবাক নেত্রে তাকিয়ে আছে।চক্রাকার দুনিয়ার জমিন কি থেমে গেলো নাকি? এই কোন নূর ম্যানসন? এরা সবাই হাসি ঠাট্টা করছে একে অপরের সাথে।অবাক করার বিষয় নিবিড় একগাল বাকিয়ে হেঁসে যাচ্ছে সবার সাথে।জিয়ানা চেয়ার ছেড়ে উঠে ডালের বাটি থেকে বড় করে দুই চামচ ডাল মেহেদীর পাতে দিয়ে বলে,

‘শ্রদ্ধেও ভাশুর। আপনাকে একটু খাতির করে সার্ভ করলাম।দয়া করে কুইক গ্রহন করুন।হাসপাতালে দুইজন অভোক্ত অপেক্ষায়।সেখানে যেতে হবে না?’
মেহেদীর ডাল জিনিসটা একেবারেই অপছন্দ।এটাকে তার রোগীর পথ্য লাগে। থুতনিটা গলায় নামিয়ে ভাবছে এই জিনিস সে কিভাবে খাবে।
তাই নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘দেখ নিবিড় তোর এই বউকে যদি খাঁচায় না ভরে রাখিস তবে খুব শীঘ্রই চিড়িয়াখানা থেকে লোক এসে একে তুলে নিয়ে যাবে।এমন অদ্ভুত প্রাণী তো আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই।’
এরপর রাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,’একে তুই পড়িয়েছিস কিভাবে?এমন বাদর মেয়ে কি পড়াশোনা করতো নাকি অলয়েজ গাছেগাছে ঝুলে থাকতো?’

রাফিন হেঁসে বলে,’সেটা খুবই মজার ঘটনা ছিলো।ওরা থাকতো মগবাজার এরিয়ায়। একদিন আমি গিয়েছি মধুবাঘ মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে।খেলারত প্লেয়ারদের মাঝে একজনকে দেখে আমি অবাক।একেবারে আমাদের নীলের মতো একটা ছেলে খুব ভালো খেলছে।আমি সাথে সাথেই নীলকে ফোন দেই।নীল তখন স্কুলে।কৌতুহল বসত আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ,সে ছেলে না মেয়ে।হাটা চলা ,চুলের কাট থেকে শুরু করে একেবারেই ছেলেদের মতো।কাছে যাওয়ার পর স্কিন আর চোখ দেখে বুঝতে পারি মেয়ে।আর পড়তে বসলে টানা আধাঘন্টা পড়তো।বাকি সময় অডিও রেকর্ডের মতো সারাদিনের ঘটা কিচ্ছাকাহিনী বলতো।একবার চিকন বেত দিয়ে পানিশমেন্ট দিয়েছিলাম। এরপরের দিন আমাক জোর করে মিক্সড মার্সাল খেলতে হয়েছে।এক মুভেই আমার পা মচকে দিয়েছিলো।’
বলেই রাফিন প্রাণখোলে হাঁসি দিয়ে উঠে। অপরদিকে নিবিড় জিয়ানার দিকে আগ্নেয়গিরির লার্ভার মতো টগবগিয়ে তাকিয়ে আছে।জিয়ানা অল্প ঠোঁট পাউট করে চোখ মেরে দেয়।

সেই মুহূর্তে হনহনিয়ে মাইমুনা প্রবেশ করে ভেতরে। মাইমুনাকে এইভাবে এলোমেলো ভাবে আসতে দেখে সবাই বেশ অবাক হয়।জিয়ানা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ,’সব ঠিক আছে আপু?বেবি ঠিক….
শেষ করতে পারে না জিয়ানা।কথা গলাতেই আটকে যায় মাইমুনার কান্ডে।ডাইনিং টেবিল থেকে বিফ মাসালা ডিসটা হাতে নিয়ে ছুড়ে মারে ফ্লোরে।সবাই খাবার রেখে দাঁড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যে। শুধু নিবিড় আপন মনে খেয়ে যাচ্ছে।মেহেদী ধমকে উঠে ,’
কি হচ্ছে কি মুন?’

মাইমুনা এসে রুপক মন্ডলের বুকে আছড়ে পড়ে হাউমাউ করে কান্না করে উঠে।ফারহানা এগিয়ে যায় মাইমুনার দিকে।হট্টগোল শুনে কুলসুম বের হয়ে আসে।রুপক মন্ডলের বুকে পড়ে আহাজারি করায় মাইমুনার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।তবুও অস্পষ্ট যা বুঝা যাচ্ছে সব দোষারোপ আর একগাদা নালিশ মামুন ইসলামের নামে।
কুলসুম এগিয়ে গিয়ে নিজের কাছে এনে মাইমুনার এলোমেলো চুল গুছিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে ,
‘মুন? এমন পাগলামি করছিস কেন?’
মাইমুনা কান্নায় ভেঙে পড়ে ফ্লোরে বসে পড়ে। নিবিড় খেতে খেতে বলে,’বিফকারিতে পয়জন মিশিয়েছে এই অপরাধবোধে কাঁদছে।’

সবাই এবার মাইমুনার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিবিড়ের দিকে তাকায়।মাইমুনা ফ্লোর থেকে উঠে দৌঁড়ে এসে নিবিড়ের বাহুতে কিল ঘুষি দেয়া শুরু করে। আর বলতে থাকে,
‘শ*য়তান। তোর সাথে রাগ করেই দিয়েছি।ছোটবেলায় তুই আমাকে মে*রে ফেলতে চেয়েছিলি মনে নাই?তুই আমাকে সুযোগ পেলেই মা*রতি। তোরা সবাই তো দিব্বি বেঁচে আছিস।আমার তো কেউ নাই।তোরা সবাই মিলে মে*রে ফেলেছিস আমার আব্বু ,আম্মু আর ভাইকে।তোদের কারো তো কিচ্ছু হয়নি।তোরা গুষ্টি সহ সব বেঁচে আছিস কিভাবে?

নিবিড় দাঁড়িয়ে ঝটকা দিয়ে মাইমুনার হাত নিজের বাহুতে ছাড়িয়ে দিয়ে গমগমে গলায় বলে,’বিষবৃক্ষের গোড়ায় তিনবেলা নিয়ম করে মধু ঢালা হলেও তার তিক্ততা কমবে না।তোর কেউ নেই সেটা তোকে এই পরিবারের কেউ কখনো বুঝতে দিয়েছে ?তোর গর্বের পিতা নিজ হাতে নিজের জন্মদাতাকে খু*ন করেছে। তোর দিকভ্রষ্টা মা একের অর কালোজাদু করে আমার মা আর ফুপুর জীবন বিষিয়ে দিয়েছে।আমার সাথে কুকুর বিড়ালের মতো ব্যবহার করেছে।যতদিন তোর ভাইরা বেঁচে ছিলো একবেলাও আমি ঠিক করে খেতে পারিনি।আমি খেতে বসলেই আমার প্লেটে থু থু দিতো।আমার গায়ে এখনো তোর মায়ের মারের দাগ স্পষ্ট আছে।আমাকে আর ফু-আম্মুকে কত ভাবে যে হত্যা করার প্ল্যান করেছে সেই হিসেব বাদই দিলাম।মেহেদীকে তোর প্রাণের বাপ মে*রে ফেলতে ধরেছিল।আর তুই আমাদের বলছিস আমরা শত্রু?জাত শত্রু তোরা।

এন্ড লাষ্ট কিছুদিন পর জায়গা সম্পত্তি সব সঠিক ভাবে বন্টন করা হবে।সেসব নিয়ে এই বাড়ির ত্রিসীমানায় আর কখনো আসবি না।নির্বাচনের ঝামেলা শেষ হলে জিয়ানা সবাইকে সঠিক ভাবে ভাগ করে দিবে।’
তারপর জিয়ানার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,’দিবা না?’
জিয়ানা উপর নিচ মাথা নাড়ায় দ্রুত। নিবিড়ের মতো সপ্রতিভ মানুষ জিয়ানা আর দুটো দেখেনি।এইজন্যই প্রথম দিনেই জিয়ানাকে সাবধান করেছিলো। তবে কি সত্যি সাইকোলজি মানুষের মন পড়ার ক্ষমতা ধরে ফেলেছে?নাকি মেডিক্যাল সাইন্সের মতো সব আনুমানিক?

পরিস্থিতি পরিবেশ অনুযায়ী নিবিড়ের কথা বলার ঢং পাল্টে যায়।সাথে গলার টোন।এই লোক যখন কথা বলে তখন গমগম করে চারপাশ।একে মনে হয় আল্লাহ মাইক আর লিডারের মাটি দিয়ে বানিয়েছে।নিজে যখন কিছু বলা শুরু করে কাউকে সুযোগই দেয়না কোন কথা বলার।নিবিড়ের প্রতি সে প্রতি মুহূর্তে ফল করে।এই যে এখন জিয়ানার প্রেমে টালমাটাল অবস্থা। উফ এত্ত কেনো জোস তার জামাইটা।নিবিড় সবার সামনে দিয়ে দোতলায় উঠে গেলো।রুপক মন্ডল একেবারেই নিশ্চুপ।তবে সে জিয়ানার দিকে তাকিয়ে।রাফিন সেটা খেয়াল করে বলে,’বাবা আপনার সাথে আমার কিছু দরকারী কথা আছে।ইটস আর্জেন্ট।’
‘চল উপরে গিয়ে বলি?’

মাইমুনাকে দেখে ফিজান টেবিলের নিচে ঢুকে ফুপিয়ে কাঁদছে।জিয়ানা সেটা দেখে নিচে ঝুকে যায়।আর আস্তে করে বলে তার রুমে আসতে।আস্তেধীরে সবাই প্রস্থান করে সেখান থেকে। শুধু কুলসুম এসে মাইমুনার কাছে দাঁড়ায়।দুইজন গভর্নেন্স রান্নাঘরে ঘাপটি মেরে বসে।
বসে আছে মাইমুনাও।স্তব্দ নিশ্চুপ হয়ে।তাকে তো এসব কথা কেউ কখনোই বলেনি।কুলসুম আস্তে করে মাইমুনার মাথায় হাত রাখে।মাইমুনা মাথা তুলে ভেজা দৃষ্টিতে তাকায় কুলসুমের দিকে।সে দৃষ্টিতে হাজার খানেক প্রশ্ন।বিশ্বাস অবিশ্বাসের ঝড়।এমন অবস্থায় মাইমুনার বিবেক দ্বিধা আর ভরসার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে।
কুলসুম হইতো বুঝতে পারে।তাই হাত বুলিয়ে বলে ,’আমার রুমে আয়। ‘

ফিজান জিয়ানাদের রুমে গিয়ে দেখে জিয়ানা বিছনায় ব্যাগ ভর্তি চকলেট নিয়ে বসে আছে।নিবিড় হসপিটাল থেকে ফেরার পথে কিনে এনেছে।বাচ্চা দুইটা জন্মের মতো ভয় পেয়েছে।এইসব ট্রমা সহজে কাটতে চায় না।নিবিড় নিজে ভুক্তভোগী হওয়াই বেশ ভালো করেই বুঝে শৈশবটা কতটা প্রিসিয়াস।
ফিজানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিয়ানা জিজ্ঞেস করে ,
‘তুলম্বু দেখেছিস কত গুলা চকলেট? খেতে চাস? ‘
ফিজান উপর নিচ মাথা নাড়ায়।
‘তাহলে একশোবার কান ধরে উঠবোস কর। ‘
‘হোয়াই?’

‘সিআইডি নামের ফালতু খেলার জন্য।ডো ইট ফাষ্ট।তবেই পাবি এটা।’
ফিজান চকলেটের লোভে ত্রিশবার টেনেটুনে দিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে বলল,
‘কাকিয়া। মাফ চাই আর পারবো না।’
জিয়ানা হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বলে নে। আর কখনো এইসব খেলবি না ওকে?
চকলেট নিয়ে পকেটে ভরে এক ছুটে বের হয়ে যায় বাচ্চাটা।সিঁড়ির কাছে গিয়েই নিবিড়ের সাথে ধাক্কা খায়।নিবিড় ধরে আটকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘তোর জন্য চকলেট রেখেছি কাকিয়ার আছে। ‘

ফিজান বেকুপের মতো টুকুটুকু করে তাকিয়ে থাকে।যাহ তার জিনিস তাকেই দিলো কিন্তু শাস্তি দিয়েই।আস্তে করে পকেট থেকে বের করে দেখিয়ে আবার ছুটে যায় নিচের দিকে।
নিবিড় রুমে ঢুকার সাথে সাথেই জিয়ানা নিজের ফোন এগিয়ে দিয়ে বলে,
‘মা কাল বারবার আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছে।একবার কথা বলুন?’
নিবিড় এগিয়ে এসে জিয়ানার কপালে হাত দিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করে,’শরীর কি একটু ভালো লাগছে?’
‘হ্যাঁ গত কয়েকদিনের চেয়ে ফার বেটার। আমি কি বললাম শুনেন নাই?’
‘কিছু সম্পর্ক কখনোই জোড়া লাগে না। সেগুলো বহু আগেই পঁচে গলে নষ্ট হয়ে গেছে।অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে এক যুগেরও আগে।সেগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া না করায় কি ভালো না?’
জিয়ানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ,এক্সএকে বলে লাভ নাই।

আজ নির্বাচনের প্রচারনার শেষ দিন।নির্বাচনের আগে দুইদিন কোন প্রকার প্রচারণা একেবারে নিষিদ্ধ। তাই আজকে নিবিড়রা গাড়ি বহর নিয়ে সারা সাভার চক্কর কাটবে।জিয়ানা যাবে জেনির কাছে।তাই নিবিড় গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে জিয়ানার জন্য।ঠিক সেই মুহূর্তে জিয়ানা নেমে এলো।
একটা কালো লং কুর্তির সাথে স্কিনি জিন্স আর ফ্ল্যাট ফিতা ফিতা সেন্ডেল ,মাথায় কালো স্কার্ফ দুই প্যাচ দিয়ে একপাশ সামনে আরেকপাশ পেছনে ঝুলছে।চোখে কালো রোদচশমায় গায়ের রং দুধ সাদার মতো ঝলমলে করছে জিয়ানার।নিবিড়ের কাছে লাগে ,প্রথম বর্ষায় সদ্য ফুটা কদম।কিংবা প্রাপ্তির পর কবির মনের সুখে রচিত কবিতায় হচ্ছে জিয়ানা।বাকানো শরীর যখন ছেলেদের মতো হেঁটে আসছিলো তার কাছে লাগে স্নিগ্ধ টলটলে দিঘির জলে শুভ্র হাসের জলকেলি খেলার ছন্দের মতো।জিয়ানার এই অদ্ভুত শোভাবর্ধক মুখখানা দেখলেই নিবিড়ের মনে একপ্রকার গভীর শান্তি মিলে।

জিয়ানা এসেই বলে,’চলুন।’
‘ইদানিং তোমার ড্রেস চেঞ্জ হয়ে গেছে?’
‘এগুলা ফারহানা ভাবি দিয়েছিলো বহু আগে।অযথা পড়ে আছে তাই পড়ে ফেললাম।এবং একটা জিনিস রিয়ালাইজডও করলাম।’
নিবিড় গাড়ির দরজা খুলে দেয় জিয়ানা ঢুকে যায় ভেতরে। নিবিড় ড্রাইভিং সিটে বসে সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বলে,’কি সেটা?’
‘ব্র‍্যান্ড ভ্যালু ব্যাপারটা।কোয়ানটিটির চেয়ে কোয়ালিটি মেইনটেইন করা বেশ কম্ফি।’
‘হুম তাতো অবশ্যই। ‘

‘কিন্তু বাজেটে তিনগুন থাকা লাগবে।কোয়ালিটিফুল জিনিসের দামে কোয়ালিটিলেস জিনিস ট্রাক ভর্তি পাওয়া যাবে।ও হ্যাঁ আমাকে একটু ক্যাম্পাসে নামিয়ে দিবেন।মিমের সাথে দেখা করে আপির কাছে যাবো।’
‘ক্যাম্পাসের অবস্থা অস্থিতিশীল। সেখানে যাওয়া লাগবে না।মিমকে জেনির বাসায় আসতে বলো?’
‘না সে নতুন বউ ক্যাম্পাস থেকে সরাসরি বাসায় ফিরতে হবে।কাল ওর বিয়ে।’
নিবিড়ের হঠাৎ আকাশের কথা মনে হলো।ছেলেটা নির্বাচনের ঝামেলায় এদিকে ভুলে বসে আছে।
ক্যাম্পাসে ঢুকেই জিয়ানার নজর পড়ে গেট বরাবর।

নিবিড়ের বিশাল ছবি দিয়ে ফেস্টুন টানানো ক্যাম্পাসের গেটের উপর।নিবিড়ের গাড়ি গেটে ঢুকার সাথে সাথে চারপাশ দিয়ে ছাত্রজনতা ঘিরে ধরে।আর একটু কাছ এসে দেখার বৃথা চেষ্টা সকলের।নিবিড়ের পাশে জিয়ানার নিজেকে সং ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না। জিয়ানার এইসব লোক দেখানো শোডাউন ভালো লাগে না। নিবিড় গাড়ির ছাদের উপরের পোর্টেবল পার্টটা সরিয়ে দাঁড়িয়ে যায় সেখান দিয়ে।সবাই হ্যান্ডশেক করার জন্য এগিয়ে এলেও নিবিড় হাত উপরে তুলে সালাম দিচ্ছে শুধু। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়ছে।
কেউ কেউ চিল্লিয়ে নিবিড়ের নামে স্লোগান দিচ্ছে।পাশ থেকে বুলডগের মতো এক ঝুলানো কানের লোক এসে নিবিড়কে জানায় ,’ভাই ওইদিকে প্ল্যান নাকি কিছুটা ভয়ংকর। ওরা নাকি র*ক্তের হলি খেলবে? যদিও সমাস্যা নাই ,আমরা আপনার জন্য র*ক্ত দিতে প্রস্তুত। ওরা হলি খেলবো আমরা ওদের র*ক্তে গোসল করমু।’
জিয়ানার মেজাজ তিরতির করে খারাপ হচ্ছে।নিবিড় মাথা অল্প ভেতরে ঢুকিয়ে প্রশ্ন করে ,

‘বিরক্ত হচ্ছো?’
‘না হওয়ার কারণ নেই।এসব ফালতু ট্রেন্ড কেনো করেন আপনারা?অহেতুক ঝামেলা।’
‘যা এতকাল চলে এসেছে কেউ এসে হুট করেই সেটা পাল্টে দিতে পারবে না।পলিটিক্সে নিজের পজিশন বজায় রাখতে সকল কাজই একসময় জায়েজ হয়ে যায়। এতে কোন শঠতা থাকে না।জয়ের কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রতিটা ন্যায় বা অন্যায় পদক্ষেপকে।’
‘তাই বলে রাজনৈতিক ফাঁক ফোকড় গুলাকে আপনারা বস্তায় বস্তায় অন্যায় দিয়ে ফিলাপ করবেন গুজামিল দিয়ে?আপনাদের এইসব ফালতু ক্লাব গুলো যত নষ্টের গোড়া।’
‘উপমহাদেশের পলিটিক্সের আঁতুড়ঘর হচ্ছে ক্যাম্পাস ক্লাব।’

‘এইজন্যই তো ভ্যাকেন্সি ব্যাপারটা নেই,সবসময় লাইন রেডি থাকে।’
নিবিড় মুচকি হেঁসে সিটে বসে জিয়ানার গলার স্কার্ফ ঠিক করে দিয়ে বলে,’তোমার এই ইরিটেটিং স্পটটাকে আমাকে খুব ডিস্টার্ব করে জিয়ানা।’
জিয়ানা নিবিড়ের বুকে ধাক্কা দিয়ে বলে,’একটা চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে চলন্ত বাসে উঠে যাওয়ার মতো ট্রপিক চেঞ্জের স্বভাব বদলাবেন না।মাঝেমধ্যে মনে হয় আপনার মাঝে মোরালিটির ছিটেফোঁটাও নেই।আর এটা আপনাকে ডিস্টার্ব করে নাকি আপনি এটাকে?ফ্লোরপ্লের সময় আপনার অত্যাচারে সেখানে কি হয় ডো ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া?

‘এদেশে মোরালিটিতে পলিটিক্স চলে না।ইজমা যার‍ যত বেশি সে তত বেশি ক্ষমতাবান।’
‘কিন্তু আমি জানি ইজমের চেয়ে যে মোরালিটি বড়। বড় বড় বিপ্লবীরা যখন রাষ্ট্র নায়ক হয়েছে তারা মোরালিটির দিকে বেশি নজর দিয়েছে।’
‘হ্যাঁ এইজন্য বেশির ভাগ সফল বিপ্লবী ফ্যাসিস্ট তকমাও পেয়েছে।জনসমর্থনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কিসের মোরালিটি? ‘

নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৯

জিয়ানা এই লোকের সাথে অনন্ত পলিটিক্স নিয়ে কথা বলে পেরে উঠবে না।এই লোককে মাঝেমধ্যেই অ্যাসেসমেন্ট করা যায় না।প্রগতিশীল গলাবাজিও করে না নিবিড়। ওর একটা আলাদা প্যাটান আছে যেটা সবাইকে চুম্বকের মতো টানে।দুইমিনিট পরের নিবিড়কে কেউ প্রেডিক্ট করতে পারবে না।এটাই সবার থেকে ওকে আলাদা করে রেখেছে।
‘এই নির্বাচনের প্রচারনা পুরোটাই ভুলগার থিংক্স লাগে আমার কাছে।,
বলে বের হয় গাড়ি থেকে। নিবিড় পেছন পেছন ভিড় ঠেলে জিয়ানাকে কমনরুম পর্যন্ত নিয়ে যায়।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৭১