নূর ই মহব্বত পর্ব ২৩
তাবাসসুম তাজ্বওয়ারী
দুইদিন কেটে গিয়েছে। আহিল কি করেছে নওমি কিছুই জানে না। এর মাঝে দুইবার কল এসেছিল আননোন নম্বর থেকে কিন্তু নওমি রিসিভ করে নি।
আজ দুইদিন পর নওমি তুহিকে ফোন দিল। মেয়েটাকে কল দেওয়ায় হয়নি। জানানো হয় নি যে ও চলে এসেছে আহিলের কাছে। এত টেনশনে মাথাতেই ছিলো না। কল দিয়ে অপেক্ষা করতেই সেকেন্ডের মধ্যে ফোন রিসিভ করলো তুহি। নওমিকে কিছু বলতে যাবে তার আগে ওপাশ থেকে ভেসে আসলো তুহির গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
– কে বলছেন?
– কে বলছেন মানে? তুহি আপু তুমি আমার নম্বর চেনো নি? আমার নম্বর তোমার ফোনে নেই? ডিলিট নাকি?
– কে আপনি?
তুহির এমন কথায় নওমি কিছুই বুঝতে পারলো না। তুহি ওকে চিনতে পারছে না! আর ওর ফোনে তো নম্বর সেভ থাকার কথা। ও একবার নিজের ফোনে নম্বর চেক দিল এটা তো তুহিই!
– আরে আপু আমি নওমি! তুমি চিনতে পারছো না আমায়?
– চেনার কথা ছিলো?
নওমি অবাক কণ্ঠে বললো,
– কিসব বলছো তুমি? পা’গল হয়ে গেলে নাকি?
ওপাশ থেকে তুহির স্বাভাবিক কণ্ঠ ভেসে আসলো। সে তাড়া দিয়ে বললো,
– আপনার কিছু বলার না থাকলে রাখছি? আমি খুব ব্যস্ত। ডিস্টার্ব করবেন না।
নওমি কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে খট করে লাইনটা কেটে গেল। নওমি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো বসে রইল। ওর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তুহি তো এমন মেয়ে নয়! যতই ব্যস্ত থাকুক এমন তো কখনো করে না! নওমি আবার কল দিল। এবারও বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কলটা রিসিভ হলো তবে তুহি এবার কিছু বলল না। ওপাশের ভারী নীরবতা ভেঙে নওমি এবার একটু চড়া গলায় বলল,
– তুহি আপু! এটা কেমন ইয়ার্কি হচ্ছে হ্যাঁ? আমি জানি তুমি আমার ওপর রেগে আছো। কিন্তু এভাবে না চেনার ভান করার কী মানে?
তুহি বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
– ওহ্! এত দিনে মনে পড়ল যে তুহি নামের আপনার একটা বোন আছে? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি বোধহয় আমাদের সবাইকে ভুলেই গিয়েছেন। আপনি তো এখন বড় বড় মানুষের সাথে থাকেন, আমাদের মতো ছোটলোকদের মনে রাখার সময় কোথায়!
তুহির অভিমানী কণ্ঠ শুনে নওমি হেসে ফেলল। বুঝতে পারলো সবটা জেনেই রাগ করেছে। সে হেসেই বললো,
– স্যরি আপু! আমি জানাতে পারিনি তোমাকে। আমি সব বলার জন্যই তো কল দিয়েছি! কিন্তু এভাবে কথা বলো না।
তুহি ঝাঝালো গলায় বললো,
– কিভাবে বলবো হ্যাঁ? আজকে দুটো দিন গেল কোনো কল করলি না! আমি নাহয় হাসপাতালের কাজে ব্যস্ত ছিলাম এটলিস্ট এটা তো জানাতে পারতি!
– আর বোলো না কত যে কাণ্ড করে তারপর এসেছি। আমি নিজেই তো জানতাম না যে আমি আসবো।
– হ্যাঁ হ্যাঁ হয়েছে। আমি তো তোকে বারণ করতাম যেতে তাই না? এটা ভেবেই তো বলিস নি।
– আল্লাহ্ আপু! এসব কি বলছো আমি সত্যি বলছি এরকম কিছু নয়! বিশ্বাস করো।
– যা করলাম। কিন্তু তুই আমাকে পর যে ভাবিস আবার প্রমাণ হলো! কিন্তু আমি খুব খুশি হয়েছি। তুই এবার মন দিয়ে সংসার কর। তোর আর আদনানের জন্য আমার মন থেকে অনেক দোয়া রে! আমি তোদের আমার খুব আপন মনে করি।
নওমি হেসে বললো,
– জানি তো আপু আমি! নাহয় একটা অচেনা মেয়ের জন্য কেউ এতটা করে?
হুট করে আবার বললো,
– তুমি কোথা থেকে জেনেছো?
– কোথায় আবার! আপনার গুণধর স্বামী জানিয়েছে আমার। লোকটাকে আগে সহ্য হতো না বুঝলি এখন না চাইতেও সহ্য করতে হবে। হাসি মুখে কথা বলতে হবে!
না চাইতেও হেসে ফেলল নওমি।
– হাসিস না। তোর মাফ নেই। আদনানকে কল দে তো। আজকেই যেতাম আমি কিন্তু এখন তো তোরা এখন আর ওখানে নেই।
– এখানে চলে এসো।
– ওইটা তোর শশুরবাড়ি হয় যখন তখন যাওয়া যাই নাকি?
নওমি মুখ বাকিয়ে বললো,
– কেন আসা যাবে না? এমন ভাব করছো যেন নতুন বিয়ে হয়েছে আমার! চলে এসো কিন্তু কেউ কিছু বলবে না।
– জানি। ডক্টর আযলান নিজেই যেতে বলেছেন। যাইহোক যা করেছিস ভালো করেছিস। একা একা আর কত? আমার না খুব ভালো লাগছে।
নওমি একটু হেসে বলল,
– হ্যাঁ আপু, আমারও এখন মনে হচ্ছে যা হয়েছে ভালোর জন্যই হয়েছে। অন্তত আদনান একটা সুন্দর পরিবেশ পাচ্ছে। আর শশুরবাড়ি বলে অত ঢং করতে হবে না, আম্মু কিন্তু তোমাকে দারুণ পছন্দ করেন, গল্পে গল্পে কত কথা যে শুনেছে তোর। চলে আসিস কোনো একদিন।
তুহি ওপাশ থেকে একটু হেসে বলল,
– আচ্ছা বাবা দেখব। এখন বল, আমার আদনান সোনা কী করছে? ওর আওয়াজ তো পাচ্ছি না?
নওমি ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে আদনানকে বললো,
– দেখো তো বাবা কে কল দিয়েছে।
আদনান বিছানায় খেলছিল। মায়ের ডাকে সে পেছন ফিরে তাকাল। ফোনের ভেতর থেকে তুহির কণ্ঠ শুনে সে হেসে এগিয়ে আসলো। আধো আধো কণ্ঠে বললো,
– টুয়ি!
– হ্যাঁ তুহি। কথা বলবে?
আদনান মাথা নাড়লো।
– হু হু।
ফোনের ওপাশ থেকে তুহি বলে উঠলো,
– এই আদু! তুই আমাকে ভুলে গেছিস? মায়ের সাথে গিয়ে তুহি খালামণিকে ভুলে গেছিস তুই?
আদনান বুঝলো তুহিকে ভুলার কথা বলছে তাই সে মাথা নাড়িয়ে বললো,
– বুলি না
বেশ কিছুক্ষণ কথা চললো ওদের। তুহির সাথে কথা বলে মন ফ্রেশ হয়ে গেল নওমির। বিকেলের পর পর আহিল ফিরে এসেছে। ড্রইং রুমে বসে ছিলো সকলে। আহিল এসে আদনানকে কোলে তুলে নিয়ে বললো,
– কী অবস্থা আমার আব্বাজানের? গাড়ি চালানো হচ্ছে?
আদনান বাবার কোল পেয়েই খিলখিল করে হেসে উঠল। গাড়ি দেখিয়ে বললো,
– নুতুন গালি
আহিল অবাক হওয়ার ভান ধরে বললো,
– বাব্বাহ কত সুন্দর গাড়ি!
আদনানকে কেড়ে নিয়ে নয়না বেগম বললেন,
– এই যা আগে ফ্রেশ হয়ে আয়! হাসপাতাল থেকে এসে বাচ্চাটাকে ধরবি না একদম!
আহিল নয়না বেগমের ধমক শুনে দুই হাত তুলে সারেন্ডার করার মতো ভঙ্গি করল যেন সে নিষ্পাপ এমন করে বলল,
– হয়েছে! মায়ের ধমক খেয়ে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ানো যাবে না। যাচ্ছি আম্মু, এই গেলাম!
আহিলের সেই বোকা বনে যাওয়ার চেহারা দেখে নওমি নিজের ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। আহিল যাওয়ার সময় নওমির দিকে ইশারা করে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। নওমি সেটা বুঝতে পেরে আদনানকে নয়না বেগমের জিম্মায় দিয়ে আহিলের পেছন পেছন রুমে এলো। রুমে এসে দেখলো আহিল শার্ট খুলছে। আহিল ওকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
– সারাদিন কোনো কল বা মেসেজ এসেছিল?
– নাহ।
আহিল মাথা নেড়ে বললো,
– ওনার কি পরিকল্পনা বুঝতে পারছি না। আমি একবার ট্রাই করেছি তারপর থেকে ফোন অফ ইভেন লোকেশন ট্র্যাক করা যাচ্ছে না! আজব না?
– হু।
আহিল ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললো,
– যাক গে সেসব বাদ দাও। এক কাপ কড়া লিকারের চা করে আনো। স্বামী সেবা তো ভুলতে বসেছেন!
বলেই ওয়াশরুমে গিয়ে দুম করে দরজা লাগিয়ে দিল। নওমি কিছু বলার সুযোগই পেল না। মুখ ভেংচি দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল সে।
নওমি রান্নাঘরে এসে চায়ের কেতলিটা চুলোয় চাপাতে চাপাতে মনে মনে বলল, “হুহ্! এলেন বড় ডাক্তার সাহেব, এসেই হুকুম জারি! স্বামী সেবা নাকি ভুলতে বসেছি! তিন বছর খোঁজ নেই, এখন এসেছেন রসিকতা করতে।”
মুখে একটা কৃত্রিম রাগের ভঙ্গি ফুটিয়ে তুললেও নওমির ঠোঁটের কোণে কিন্তু এক চিলতে মিষ্টি হাসি লেপ্টে রইল।
চা বানিয়ে রুমে নিয়ে আসতেই দেখলো আদনানকে নিয়ে এসেছে আহিল। আদনানের সাথে খেলছে আর কথা বলছে।
– অ্যাই বাবা বল! নাহয় আজকে চকলেট দিবো না।
আদনান চকলেটের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো,
– মাআআয় তকলেত
– মা নয়, বাবা বলতে বলেছি!
– এত জোর জুলুম কিসের?
আহিল নওমির গলা শুনে আদনানকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ঘুরে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হওয়ার পর সুতির হালকা ট্রাউজার আর টি-শার্টে ওকে বেশ চনমনে দেখাচ্ছে। সে সোজা হয়ে বসে বলল,
– জুলুম কোথায় দেখলেন ম্যাডাম? এটা তো জাস্ট একটা ট্রেনিং! তাই না আদনান সোনা? বলো বা-বা!
আদনান চকোলেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
– মা.. তক..
আহিল হতাশার শ্বাস ছেড়ে বললো,
– নওমি তুমি আমার ছেলের মুখে বাবা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করছো!!
নওমি অবাক হয়ে বলল,
– আমি কি করলাম?
– সেদিন হাসপাতালে ডাকার পর তুমি ওকে বারণ করেছিলে তাই তো ডাকছে না!
– আরে আমার দোষ কোথায়? ও বাচ্চা ও স্বাভাবিকভাবেই হুট করে ডাকবে না!
– সেদিন তো ডেকেছিল।
– ওই এক বিষয় নিয়ে থাকেন আপনি! আদর দিয়ে বাচ্চার মন জোর করতে হয়, চকলেট দিয়ে ব্ল্যা’কমেল করে নয়!
বলে নওমি চলে এলো। সে তো আদনানকে আড়ালে অনেকবার বলেছে আহিলকে বাবা ডাকতে কেন ডাকে না কে জানে! ও আজও বলেছে আদনানকে যে আহিল ওর বাবা। কিন্তু ছেলেটা চুপ থাকে বললেই!
রাতে খাবার টেবিলে বসে আছে সকলে। আদনান বাবার কোলে বসে বাবার হাতে খাচ্ছে। দিনদিন বাবার ন্যাওটা হয়ে যাচ্ছে। আগে মায়ের হাতে ছাড়া খেতো না আর এখন বাবার হাতেই খাবে! নয়না বেগম বলে উঠলেন,
– শোন আহিল কাল দ্রুত ফেরার চেষ্টা করিস।
– কেন মা? কাল কি?
– কাল তোর মেজো চাচী আর চাচা আসবে। নওমি এসেছে আর আমার নাতির কথা শুনে ওরা আসতে চেয়েছে।
আহিল খাওয়ায় মনোনিবেশ করে বললো,
– তুমিও না! ওদের এখনি বলতে হলো? আরো কয়েকদিন যাক, গুছিয়ে নিতাম এখনি মানুষ জড়ো হবে বাড়িতে।
– তো বলবো না? তুই চাপা হতে পারিস আমি নই বুঝেছিস? আমার খুশি আমি সবাইকে জানালাম।
মা ছেলের বাক বিতন্ডা দেখছিল নওমি। মা ছেলে একে অপরের বিপরীত যেন একদম!
– আচ্ছা আচ্ছা চেষ্টা করবো তাড়াতাড়ি আসার।
– হুম।
পরেরদিন বেলা হতেই বাসায় আসলো আহিলের চাচা চাচী। নওমিকে দেখে ওর চাচী খুব খুশি হয়ে বললো,
– নওমি তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে? তোমাকে কত খুঁজেছে আহিল জানো?
নওমি ভেবেছিল সকলে বোধহয় ওকেই ভুল বুঝবে কিন্তু সকলের কথায় তার এই ধারণা ভেঙ্গে গেল! সকলে কত সহজে আপন করে নিলো ওকে। প্রশ্ন পর্যন্ত করলো না।
– আমাকে আপা(নয়না বেগম) সবটা বলেছে। দুইজনেরই এত কষ্ট হয়েছে তোমাদের। এখন আল্লাহ রহমত করেছে তোমার এক হয়েছ আর ভুল বুঝো না কেউ কাউকে।
নওমি দাঁড়িয়ে শুনছে সব কথা। এর মধ্যে নয়না বেগমের আর্তনাদও শুনছে একজন অপরজনকে বুঝাচ্ছে।
– আর বোলো না মেজো। এই ছেলেটার মনের খবর তো আমার কাছে মুখ ফুটে কোনোদিন কিচ্ছু বলেনি। শুধু দিন-রাত পাগলের মতো নিজেকে ব্যস্ত রাখত। কত চেষ্টা করেছি ওকে একটু স্বাভাবিক রাখতে! ওর বাবা মা-রা যাওয়ার পর তো আরও গুটিয়ে নিয়েছিল!
– হ্যাঁ মুখে হয়তো নিজের রাগ ধরে রেখেছিল সবার সামনে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ও যে কতটা ছটফট করেছে তা কেবল আল্লাহ্ জানেন।
নওমির বুকের ভেতর একটা তীব্র অপরাধবোধ আর একই সাথে এক অদ্ভুত অনুশোচনা মোচড় দিয়ে উঠল। আহিল ততক্ষণে ফিরেছে। ড্রইং রুমে চাচার সাথে কথা বলছে। সে আড়চোখে একবার ড্রইং রুমের দিকে তাকালো। ও রান্নাঘরে চলে গেল। চা নাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে তো!
খানিকক্ষণ বাদে ট্রে হাতে সে পর্দার পাশে এসে আহিলকে ইশারা করলো। আহিল আসতেই ওর হাতে ট্রে দিয়ে বললো,
– আদনান কোথায়?
আহিল ট্রে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
– তোমার কাছে নেই?
– না তো! ও তো আপনার কাছে ছিলো!
– নাহ! আমি যখন হাসপাতাল থেকে এসেছি তখন ও এখানে ছিলো কিন্তু ফ্রেশ হয়ে আসার পর আর দেখিনি। হয়তো বাইরে খেলছে।
নওমির বুকের ভেতরটা হুট করে কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল। সে দ্রুত রুমের দিকে যেতে যেতে বললো,
– আমি রুমে দেখে আসছি।
নূর ই মহব্বত পর্ব ২২
আহিল ট্রে টেবিলে রেখে দ্রুত বাইরে গেল দেখতে। বাইরে চারিদিকে কোনো মানুষের দেখা নেই। এবার চিন্তা হলো আহিলের। গেল কোথায় ছেলেটা? সে বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করতে ভাবল, হয়তো ভেতরেই আছে কোথাও খেলছে। কিন্তু তার ভাবনায় পানি ঢেলে বারান্দা থেকে নওমির আতঙ্কিত গলা শোনা গেল,
– আহিল!! আমি আদনানকে কোথাও পাচ্ছি না! কোথাও নেই ও!
