নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২
রূপন্তী সরকার
রিদ এসে ঋষভ কে সাইডে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো
“হাতের অবস্থা কি করেছো সেদিকে খেয়াল আছে? মাম্মা কে কাঁদাতে এতো ভালো লাগে?”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো
“মাম্মা কাঁদে না”
রিদ মুখ কালো করে নিলো। ঋশ সত্যিই বলেছে ওদের জন্মের পর থেকে কখনোই মিহি কে কেউ কাঁদতে দেখে নি।কান্না করলেও শুধু রিদের সামনেই কাদতো। মিহির প্রথম বাবু মারা যাওয়ার পর একদমি চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো। কখনো প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে কথা বলতো না, রিদ ছাড়া। রিদ মিহি কে কাছে পেলেই এমন এমন কথা বলতো মিহি অটোমেটিক হেসে দিতো। ঋশ ও হয়েছে একদম চুপচাপ গম্ভীর। প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে কথা বলে না। আবার বেশি কথা বলাও পছন্দ করে না। ওর সামনে কেউ বেশি বকবক করলেও রেগে যায়। এইদিকে রুহি হয়েছে একদম উল্টো। মেয়েটা কথা বলতে খুব ভালোবাসে। তবে ওর সাথে কথা বলার মতো তেমন কেউ নেই ও সুযোগ পেলে ওর মামনি অর্থাৎ তিথি এবং রিদের সাথেই কথা বলে।
রিদ ঋষভ কে বললো
“সামনে একটা হসপিটাল রয়েছে চলো”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো
“প্রয়োজন নেই তুৃমি যাও”
রিদ রেগে বললো
“ঋশ সব সময় ত্যাড়ামি করবে না বলে দিচ্ছি। বেশিক্ষণ এমন করে থাকলে হাতে ইনফেকশন হয়ে যাবে চুপচাপ আমার সাথে চলো”
ঋষভ কিছু বলার আগেই শুভ্র আর অদ্রিত এসে হাজির। অদ্রিত রিদের উদ্দেশ্য বললো
“আঙ্কেল তুমি যাও আমরা দেখছি”
শুভ্র দাঁত কেলিয়ে বললো
“হেহে কাকাই তুৃমি এতো চিন্তা করো কেনো? মে হু না?”
রিদ শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
“হ্যাঁ সেটাই তো আরো চিন্তার”
শুভ্র চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।
শুভ্র আর অদ্রিতের উপর রিদের ভরসা আছে। রিদ যাওয়ার আগে বললো
“আজকে সন্ধ্যার দিকে অফিসে যাবে তুমি। নতুন ক্লাইটের সাথে ডিল ফাইনাল করতে হবে”
ঋষভ কোনো কথা বললো না। কথাটা বলে রিদ চলে গেলো।
ঋষভ ভার্সিটি থেকে বের হয়ে ওদের ক্লাবে গেলো। ক্লাব ঘর টা হলো ওদের আড্ডা দেওয়ার জন্য। যদিও ঋশ সব সময় যায় না। মাঝে মাঝে ভার্সিটি তে আসলে তখন যায়। ঋষভ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। এরপর ফোন বের করে স্ক্রল করতে লাগলো। শুভ্র একটা আলমারির উপর থেকে ফার্স্ট এইড বক্স নামিয়ে ঋষভের কাছে আসে। এরপর আলতো ভাবে ঋষভের হাত ওর কোলের উপর রাখে। ঋষভ শুভ্রর দিকে রেগে তাকাতেই শুভ্র বলে
“এ্যাই এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। তাছাড়া এভাবে তাকালে আমার শরম লাগে বুঝিস না ক্যান?”
কথাটা বলেই শুভ্র লজ্জা পাওয়ার ভান করকো। ঋষভ বিরক্ত নিয়ে ওর দিকে তাকালো। শুভ্রর কোল থেকে হাত টা সরিয়ে নিতে গেলে শুভ্র জোর করে ওর হাত ওয়াস করে ব্যান্ডেজ করে দিলো। অদ্রিত ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো
“ঋশ আজকে এতো ওভার রিয়েক্ট করে একদমই ঠিক করিস নি। তোর উচিৎ ছিলো সন্ধ্যার দিকে ওকে টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে উদুম ক্যালানো তাহলে ওকে মেরে গুম করে দিলেও কেউ টের পেতো না।”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো
“মাম্মা কে নিয়ে কথাটা না বললে ওকে কিছুই বলতাম না এসব ছোট খাটো চিকা মেরে হাত গন্ধ করার কোনো ইচ্ছে ছিলো না।তবে ও হসপিটাল থেকে ফিরুক আবারো এক রাউন্ড খেলবো ওর সাথে।”
শুভ্র হালকা কেশে বললো
“এই ঋশ আর না বেচারা কে আর কিছু বলিস না এমনিতেই বাঁচবে কিনা সন্দেহ।”
ড্রয়িং রুম পুরো শান্ত হয়ে আছে।
মিহি টেবিলে গালের উপর হাত রেখে বসে আছে। পাশেই রুহি আর তিথি দাড়িয়ে আছে। মিহির যে মন মেজাজ খারাপ সেটা বোঝায় যাচ্ছে। রুহির হাত পা কাঁপছে। কিন্তু কিছু বলতে পারছে না। এরমধ্যেই রিদ আসলো। রিদ এসেই মিহির এক পাশে দাড়িয়ে গেলো। খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বউ যে রেগে আছে চুমু চাইলে খবর আছে। এরমধ্যেই ঋষভ ও ভার্সিটি থেকে আসলে । মিহি একবার ঋষভের দিকে তাকালো। ঋষভ মিহির কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর গাল দুহাতে ধরে বললো
“রাগ করে লাভ নেই মাম্মা আমি কোনো ভুল করি নি। আমার যেটা করা উচিৎ সেটাই করেছি”
মিহির চোখ ছলছল করে উঠলো। খুব কষ্টে কান্না টা গিলে নিয়ে কড়া গলায় বললো
“সব মানলাম কিন্তু তুমি রেগে গেলে নিজের ক্ষতি কেনো করো? হাতের কি অবস্থা করেছো?”
ঋষভ সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে বললো
“কিছু হবে না”
মিহি ঋষভের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে। রুহি ভয়ে ভয়ে ড্রয়িং রুম থেকে চলে গেলো। তিথি ও রুহির পিছু পিছু গেলো। ড্রয়িং রুম ফাঁকা হয়ে গেলে রিদ মিহির গা ঘেঁষে দাড়ালো। মিহি রিদের দিকে রাগি চোখে তাকাতেই রিদ টুপটুপ করে দুই তিনটা চুমু একসাথে খেয়ে দৌড় দিলো। এতোক্ষণ ধরে এই সুযোগের অপেক্ষাই ছিলো। মিহি তখনো রিদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইলো। এই লোকের শুধু চুমু খাওয়া। মাঝে মাঝে মনে হয় এই লোকের চুমুর রোগ জন্মের মতো ঘুচিয়ে দিতে।
রাতের বেলা…
খাওয়া দাওয়ার পর্ব অনেক আগেই শেষ মিহি ওর ঘরে বসে চুলে বেনুনি করছে। আজকে হুট করেই ওর মামা মামীর কথা মনে পড়ছে।আচ্ছা ওরা কি বেঁচে আছে? ওদের কি এই ছোট্ট মিহি টা কে মনে আছে? হয়তো নেই। মা কেও খুব মনে পড়ছো। এসব ভেবে মেয়েটার চোখ থেকে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। এমন সময় রিদ আসলো। মিহির চোখে জল থেকে উত্তেজিত হয়ে গেলো
“কি হয়েছে প্রিন্সেস কাঁদছো কেনো?”
মিহি চুপ করে আছে কোনো কথা বলছে না। রিদ ওকে জড়িয়ে ধরে বললো
“বলো না পাখি কি হয়েছে কেনো এমন করে কাঁদছো? আমাকে বলো?”
মিহি মাথা নিচু করে বললো
“আমি একটু আমার মামা মামি কে দেখতে যাবো। তোমার কি গ্রামের কথা মনে আছে? আমার না কিচ্ছু মনে নেই। তবুও খুব যেতে ইচ্ছে করছে”
রিদ মিহি কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো
“এ জন্য কাঁদছো? চাপ নিও না প্রিন্সেস ওইখানে অভ্রর দাদু বাড়ি। ওকে বললেই নিয়ে যাবে। তুমি তখন পিচ্চি ছিলে তাই তোমার মনে নেই বাট আমার সব মনে আছে। আমরা কালকেই যাবো ওকে?”
“আচ্ছা”
কথাটা বলার সাথে সাথে রিদ মিহি কে কয়েকটা চুমু খেলো। তারপর অভ্রর সাথে ফোনে কথা বলে নিলো। এরপর মিহি কে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়লো।
পরেরদিন সকালে….
অভ্র তিথি রিদ মিহি এবং তিথির ছেলে মুগ্ধ গ্রামে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। কালকে রাতেই রিদ অভ্র কল দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিলো। তিথি ও অভ্রর দাদু বাড়ি দেখতে চেয়েছিলো। যদিও তারা এখন বেঁচে নেই। বহু বছর গ্রামে যাওয়া হয় নি। এতো বছর পর টুইংকেলর আবদার রাখতেই যেতে হচ্ছে। তিথির দুই ছেলে মুগ্ধ আর শুভ্র। মুগ্ধ শুভ্রর থেকে ৩ বছরের ছোট। শুভ্র ওদের সাথে যাবে না। কারণ ওর কলিজার বেস্ট ফ্রেন্ড যাবে না তাই। ঋষভ যেই কাজে নেই সেই কাজে শুভ্র ও নেই।
মিহি রা গ্রামের উদ্দেশ্য রওনা দিলো। দেখতে দেখতে ওরা গ্রামে পৌঁছে গেলো। গ্রামে ডুকতেই মিহির প্রান টা জুড়িয়ে গেলো। বহু বছর পর আবারো নিজের গ্রামের মাটিতে পা রেখেছে। গ্রাম টা আগের মতো নেই অনেক টা পরিবর্তন হয়েছে। যদিও মিহির ওতো মনে পড়ছে না কারণ খুব ছোট বেলাই গ্রাম থেকে চলে গেছে। অনেক খোঁজাখুজির পর মিহির মামার বাড়ি পেলো। মিহি গিয়ে দরজাই কড়া নাড়তেই লোক এসে দরজা খুলে দিলো। দরজার বাহিরে এতোজন কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে লোক বেশ অবাক হলো। কাউকেই চিনতে পারছে না কারা এরা। মিহি ও চিনতে পারছে না। মিহি বললো
“আমার মামি কই?”
লোকটা বললো
“আপনারা কারা?”
মিহি মৃদুস্বরে বললো
“আমি মিহি”
লোক টা হঠাৎ করেই চমকে উঠলো
“তুই তুই সত্যি মিহি? ”
মিহি ও হেসে বললো
“হ্যাঁ আমি সত্যি মিহি কিন্তু আপনি কে?”
লোকটা বললো
“আমি তোর ভাই রাজ। কতো বড় হয়ে গেছিস মিহি পাখি। তোরা বাহিরে দাড়িয়ে আছিস ক্যান আই আই ভেতরে আই”
সাথে সাথে রাজ মিহিদের আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। এতো বছর পর বোনটা কে দেখছে। মিহির চোখ মুখেও খুশির ঝলক। এতো বছর পর ভাই কে দেখছে। রিদ কেনো জানি মুখ ভার করে আছে। রাজ যতই মিহির ভাই হোক মিহি পাখি বলে সম্মোধন করলো কেনো? ওর বউকে ওই শুধু পাখি বলবে আর কেউ না। রাজ মিহি দের ভেতরে বসতে দিলো। মিহি রাজ কে জিজ্ঞেস করলো
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ১
“মামা মামি কই?”
রাজ মুখ কালো করে বললো
“উনারা মারা গেছে।”
কথাটা শুনেই মিহির মন টা খারাপ হয়ে গেলো। কতো আশা নিয়ে এসেছিলো। ভেবেছিলো এতো বছর পর মামি হয়ত মেনে নিবে। কিন্তু মামি তো বেঁচেই নেই। একটু পর হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে একটা মেয়ে ঘরে আসলো। মেয়েটার গায়ের রং শ্যামলা। কিন্তু চেয়ারা টা খুব মায়াবি। মিহি রাজ কে জিজ্ঞেস করলো মেয়েটা কে রাজ বললো এটা নাকি তার মেয়ে। মেয়েটা কে দেখে মনে হলো বড্ড শান্ত। মেয়েটা খাবারের প্লেট রেখে ওদের কে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। মুগ্ধ ওর দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
