নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪
রূপন্তী সরকার
মুগ্ধ খুশির ঠেলায় আর কিছু বলতে পারলো না। তাড়াতাড়ি করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। মুগ্ধ বের হওয়ার সাথে সাথেই রুহি রুমে আসলো। রাহা কে অন্য মুখে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ওকে আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে বললো
“এতো লজ্জা পাচ্ছো কেনো ভাবি? আমি কিন্তু চুপিচুপি সব শুনেছি”
রাহা ওর দুহাতে মুখ ডেকে বললো
“ইশশ কি যে বলো না। তেমন কিছু না”
রাহা হেসে বললো
“হুম হুম বুঝি বুঝি”
এইদিকে মুগ্ধ হাসি মুখে সোফায় গিয়ে বসলো। মিহি মুগ্ধর দিকে একবার তাকিয়ে রাজ কে উদ্দেশ্য করে বললো
“ভাইয়া বিয়েটা খুব তাড়াতাড়ি দিতে চাইছি।”
অভ্র মিহির দিকে তাকিয়ে বললো
“এতে তাড়াহুড়োর কি আছে টুইংকেল?”
মিহি কিছু বলার আগেই মুগ্ধ বললো
“বাপি আমি তাড়াতাড়িই বিয়ে করতে চাই”
মুগ্ধর কথা শুনে উপস্থিত সবাই লজ্জা পেয়ে গেলো। রিদ জোরেই হেসে দিলো। এরপর ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো
“দেখো ঋশ ছোট ভাইয়ের থেকে কিছু শিখো। ছেলেটা বিয়ে পাগলা আর তুমি কি? বিয়েই করতে চাও না”
ঋশ কোনো উত্তর দিলো না। ওর একদম এইভাবে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কিন্তু মা বলেছে বসে থাকতে তাই বসে আছে। এতো বেশি রাগ লাগছে ওর। এর মধ্যেই ওর ফোনে কল আসলো। ও ফোন রিসিভ করে সিড়ি দিয়ে উঠতে নিলো এমন সময় রাহা আর রুহি সিড়ি দিয়ে নামছে। ঋষভ কে উপরে যেতে দেখে রাহা ঋষভের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলো। ঋষভ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে হনহন করে নিজের রুমে চলে গেলো।
রাহা এসে মিহির পাশে বসলো। মিহি আবারো রাজ কে বললো
“তাহলে বিয়েটা এই সপ্তাহে হোক”
রাজ মুখ কালো করে বললো
“এতো তাড়াতাড়ি? আমাদের একটু সময় দে”
রাজের বউ ওর পায়ে চিমটি কেটে বললো
“না না মিহি আমাদের কোনো সমস্যা নেই এই সপ্তাহেই বিয়ে হবে”
তিথির কেনো জানি শুরু থেকেই রাজের বউ অথাৎ রাহার মা কে পছন্দ হয় নি। মহিলার আব ভাব ভালো ঠেকছে না। তবে কিছু বললো না। ওর অবশ্য রাহা মেয়ে টা কে ভালোই লেগেছে। মিহি সবার উদ্দেশ্য বললো
“বিয়েটা তাড়াহুড়ো করে হচ্ছে তাই বেশি কাউকে বলার প্রয়োজন নেই। ঘরোয়া ভাবেই বিয়ে টা হোক।”
সবাই রাজি হয়ে গেলো। ঠিক করা হলো সামনের সোমবারে বিয়ে।
মিহি রা সবাই মিলে মার্কেটে গেলো কেনা কাটা করার জন্য। হাতে বেশি সময় নেই। হালকা পাতলা কেনাকাটা করতে হবে। তিথি রাহার জন্য একটা সুন্দর মেরুন রঙের শাড়ী পছন্দ করলো। আর হলুদের জন্য একটা লেহেঙ্গা কিনলো। মিহি ও একটা লেহেঙ্গা পছন্দ করলো। রাহা কে ওইটা রিসেপশনের দিনে পড়তে বলবে। রুহি ও বেশ কিছু শাড়ি লেহেঙ্গা কিনলো। আজকে মুগ্ধ আসে নি। অভ্র রিদ তিথি আর মিহি এসেছে। রিদ মিহির জন্য একটা শাড়ি পছন্দ করলো। রিদের পছন্দ করা শাড়িটা মিহির খুব পছন্দ হলো। মিহি হুট করেই একটা বেবি পিঙ্ক কালার লেহেঙ্গা পছন্দ হলো। লেহেঙ্গার নিচের পার্টে গোলাপের প্যাটার্ন জড়ানো এম্ব্রয়ডারি করা। এতো সুন্দর লাগছে। মিহি রিদকে বললো
“এটা কিনে দিবা পঁচালোক?”
রিদ টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো
“তুমি পড়বা? ঠিক আছে তাহলে একটা চুমু দাও কিনে দিবো”
মিহি কটমট করে তাকাতেই রিদ আরেকটা চুমু দিয়ে লেহেঙ্গা টা কিনে দিলো।
পরেরদিন দুপুর বেলা…
মুগ্ধ ঘরে শুয়ে আছে। কেনো জানি ভালো লাগছে না। রাহা কে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে যদিও আর দুদিন পর ই বিয়ে তাও খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। ও দৌড়ে মিহির ঘরে চলে গেলো। মিহি আরামে রিদের বুকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। আজকে রিদ অফিস যায় নি। মুগ্ধ এসে দরজায় নক করলো। রিদ মৃদুস্বরে চেচিয়ে বললো
“কে রে বাল? তোদের জ্বালায় কি বউ নিয়ে একটু ঘুমাতেও পারবো?”
মুগ্ধ মুখ কালো করে বললো
“কাকাই আমি মুগ্ধ। দরজা খুলো”
রিদ দরজা খুলতে খুলতে বললো
“কি চাই?”
মুগ্ধ হেসে বললো
“আমার তো ছোটমা কে চাই”
রিদ কটমট করে তাকিয়ে বললো
“দুনিয়ায় এতো মানুষ থাকতে আমার বউকেই চাওয়া লাগবে তোর? ”
মুগ্ধ রিদ কে সরিয়ে মিহির দিকে যেতে যেতে বললো
“সরো তো আমি আমার ছোটমার কাছে যাবো”
মুগ্ধ মিহির মাথায় হাত রাখতেই মিহি পিটপিট করে চোখ খুললো। রিদ চেচিয়ে বললো
“এই মুগ্ধর বাচ্চা আমার বউকে একদম ছুবি না”
মুগ্ধ হকচকিয়ে উঠলো। রিদের কান্ড দেখে মিহি মিটিমিটি হাসছে। লোকটা একদম পাল্টায় নি।”
মুগ্ধ মিহির শাড়ির আঁচল ধরে বিছানায় বসলো। মিহি মুগ্ধর মুখ দেখে বুঝতে পারলো ও কোনো আবদার করতে এসেছে। কারণ ওর কিছু দরকার পড়লে ছোট থেকেই মিহির আঁচল ধরে আর মিহি বুঝতে পারে ওর কিছু চাই। মিহি মুগ্ধ কে বললো
“কি চাই?”
মুগ্ধ মুখ ছোট করে বললো
“ছোটমা আমার খুব ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে প্লিজ কিছু করো”
মিহি রেগে বললো
“এই পাঠা তোর না দুদিন পর বিয়ে? বিয়ের আগে আবার কিসের দেখা?”
“আমি জানি না প্লিজ তুমি দেখা করার ব্যবস্থা করে দাও”
মিহি কিছুতেই রাজি হলো না। মুগ্ধ মিহির পায়ের কাছে বসে পড়লো এরপর ওর কোলে মাথা দিয়ে আবদার করতে থাকে। রিদ তেড়ে এসে মুগ্ধ কে সরিয়ে দেই
“আমিই আমার বউয়ের কোলে মাথা দেই না আর তুই বাল কোন ক্ষেতের মুলা রে ওর কোলে মাথা দিচ্ছিস? উঠ বলছি”
মুগ্ধ উঠে গিয়ে বললো
“একদম মিথ্যা কথা বলবা না। আমি দেখেছি তুৃমি সেদিম ছোটমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছো”
রিদ রেগে বললো
“আমার বউয়ের কোল আমি মাথা রাখতেই পারি। কিন্তু তুই তো রাখতে পারিস না। কারন এটা আমার বউ। তুই তোর বউয়ের কোলে মাথা রাখ”
কথাটা বলে নিজেই মিহির কোলে গিয়ে মাথা রাখলো। মিহি রিদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মুগ্ধ কে বললো
“আচ্ছা আমি ভাইয়া কে কল করে দিচ্ছি। আর তোর সাথে ঋশ, শুভ্র আর রুহি যাবে”
মুগ্ধ মুখ ছোট করে বললো
“না না ছোটমা প্লিজ ওদের পাঠিয়ো না। আমরা একা দেখা করি। তাছাড়া ওরা তো ব্যস্ত ওদের সময় হবে না”
মিহি কটমট করে তাকিয়ে বললো
“থাপ্পড় খাবি কিন্তু একা একা যেতে দিবো না ওরা তোর সাথে যাবে রাজি থাকলে বল তাহলে ভাইয়া কে কল করো বলবো।”
মুগ্ধ রাজি হয়ে তাছাড়া উপায় নেই। নাই মামার থেকে কানা মামা ভালো।
রেস্টুরেন্টে সবাই বসে আছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। রাহার পাশে রুহি বসেছে। আর সামনের টেবিলে মুগ্ধ ঋষভ আর শুভ্র বসে আছে। ঋষভ মাজখানে আর দুপাশে শুভ্র আর মুগ্ধ। ঋষভ এক মনে ফোন স্কোল করছে। ওর কাছে এই মুহূর্তে ফোন স্কোল করা ছাড়া আর কোনো প্রয়োজনীয় কাজ নেই। মুগ্ধ রাহার দিকে তাকিয়ে আছে হা করে। আর রাহা ঋষভের দিকে তাকিয়ে আছে। বিষয় টা মুগ্ধ খেয়াল করলো। কিন্তু কিছু বললো না। এইদিকে রুহি আর শুভ্র মিলে আরামসে খাচ্ছে। খাবার সামনে রেখে এসব নাটক দেখার সময় নেই। শুভ্র রুহির খাবার থেকে ভাগ বসালে রুহি ধুম করে শুভ্রর পিঠে মেরে দেই। শুভ্র রুহি চুল এলেমেলো করে ঋশ কে বলে
“এই ঋশ দেখ এই পেতনি তোর কলিজার ভাই কে মেরে কি করেছে চল ওকে আমরা যেখান থেকে কুড়িয়ে পেয়েছি সেখানে গিয়ে রেখে আসি”
রুহি চেচিয়ে বললো
“ভাইয়া শুভ্র মগা কে কিছু বলো তুমি। ও কিন্তু বেশি বেশি করছে”
ঋষভ বিরক্ত চোখে শুভ্র আর রুহির দিকে তাকালো। এমনিতেই ওর মন মেজাজ ভালো না। মিহি জোর করে এদের সাথে পাঠিয়েছে তার উপর এদের এমন কামরা কামরি দেখে রাগ উঠলো ওর। দাঁতে দাঁত চেপে শুভ্র কে বললো
“এটা তোদের বাড়ি না।এইখানে কোনো প্রকার সিনক্রিয়েট করলে দুজনের ই গলার রগ টেনে ছিড়ে ফেলবো মাইন্ড ইট”
ঋষভের কথায় শুভ্র আর রুহি চুপ করলো। যদিও শুভ্র সবার বড় তবে রুহির সাথে শুভ্রর সম্পর্ক ইট পাটকেলের মতো। রুহির সাথে সব থেকে বেশি লাগে মুগ্ধ আর শুভ্র। ওরা দুজন সুযোগ পেলেই রুহি কে জ্বালাই। তাই ওদের সাথে রুহি অনেক ফ্রি একদম বন্ধুর মতো। তবে ঋশের সাথে রুহি ওতো ফ্রি না। কারণ ঋশ বেশি কথা পছন্দ করে না। আর বাঁদরামি ও পছন্দ করে না। তাই রুহি আর মুগ্ধ ঋশ কে একটু ভয় পাই। কারণ ঋশ রেগে গেলে কানের নিচে দিবে। আর ঋশ যদি কিছু করে এর বিচার স্বয়ং রিদ-মিহি ও করে না। কারণ ওরা জানেই ঋশ অকারণে রাগে না।
এইদিকে রাহা আবারো ঋষভের কথায় ক্রাস খেলো। মনে মনে ভাবলো ওকে সবাই কতটা ভয় পাই। ইশশ ভাবতেই ভালো লাগছে এই ছেলেটা ওর বর। একবার শুধু বিয়েটা হোক ঋষভ কে পুরো নিজের বশে রাখবে। এইদিকে মুগ্ধ রাহা কে বললো
“কালকে তো গায়ে হলুদ”
রাহা মুগ্ধর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বললো
“হুম”
রাহা মুগ্ধর উপর মনে মনে খুব বিরক্ত। কারণ ছেলেটা সব সময় ওর পিছে ঘুরঘুর করে। অথচ ওর বর তো ঋষভ। রাহা মনে মনে বললো
“ফুপি তো বললো উনার ছেলের নাকি আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে অথচ আসার পর থেকে আমার দিকে একবার তাকালো ও না। উনি কি লজ্জা পাচ্ছে?”
রাহা ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো
“আপনি কথা বলছেন না কেনো?”
ঋষভ কোনো উত্তর দিলো না ও ভাবলো কথাটা হয়তো মুগ্ধ কে বলেছে। মুগ্ধ ও ভাবে রাহা কথাটা ওকে বলেছে। মুগ্ধ হাসি মুখে বললো
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩
“তুমিই তো চুপ করে আছো তাহলে আমি কি বলবো?”
রাহা বিরক্তি নিয়ে মুগ্ধর দিকে তাকালো। কথাটা কি ও মুগ্ধ কে বলেছে? ও তো বলেছে ওর বর মানে ঋষভ কে তাহলে এই ছেলে কেনো উত্তর দিচ্ছে। কিন্তু এখন কিছু বলা যাবে না। কারণ ওর মা বলেছে শশুর বাড়ির সবাই কে হাতে রাখতে হবে”
