Home পদ্মপ্রিয়া পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৯

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৯

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৯
ঈশিতা রহমান সানজিদা

সময় ভোর চারটা ছুঁই ছুঁই। নূরের রুমে এখনও বাতি জ্বলছে। তাহাজ্জুদ শেষ করে বেশ কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করেছে নূর। তারপর ফজরের নামাজ পড়ে আবারো কোরআন তেলাওয়াত করেছে। শুনতে শুনতে আজমাঈন জায়নামাজের উপর ঘুমিয়ে পড়েছে। নূর কুশনটা ওর মাথার নিচে দিয়ে নিজেও জায়নামাজের উপর শরীর এলিয়ে দিলো। মনে হলো ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে গেল। রাতটা কে ভীষণ আদুরে মনে হলো। পাশ ফিরে আজমাঈনের দিকে তাকালো। মনে প্রশ্ন জাগলো, ছেলেটা আজকের মোনাজাতে কি চাইলো? পরক্ষনেই মনে পড়লো সেই প্রার্থনার কথা। নূর আচমকাই সাহসী কাজ করলো। মাথায় দুপ্যাচ দেওয়া ওড়না খুলতে লাগলো। চুলের খোঁপা খুলে দিতেই ছড়িয়ে পড়লো মেঝেতে। এখন অবধি ওর চুলের দর্শন কারো মেলেনি। তবে এই ঘন চুলের জন্য কম সাধনা করেনি নূর। অর্গানিক তেল, শ্যাম্পু সবই দিয়েছে সে। এর বাইরে সুগন্ধি তেল ব্যবহার করে তবে খুব কম। নূরের ভাবনার ছেদ ঘটলো আজমাঈনের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে। বার কয়েক চোখের পলক ফেলে কুশনে মাথা রাখলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আর চোখ মেলে রাতে পারলো না। কেননা রাতে দু’জনেই জেগে ছিল। আজমাঈন সেই চাহনি, আকুতি উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিলো নূরের পক্ষে।

হাত ছাড়িয়ে নেওয়া মানে আজমাঈনকে ছেঁড়ে দেওয়া। ভাবনাটা মাথায় আসতেই কেমন যেন আঁতকে উঠে নূর। নির্নিমেষ তাকিয়ে রয় আজমাঈনের দিকে। আজমাঈন কিছু সময় পর উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে নূরের হাত ধরে বলে,’আজ রাতটা যদি আমাকে সময় দাও, খুব সমস্যা হবে তোমার?’
নূর মাথা নেড়ে না বোঝায়। আজমাঈন তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে,’চলো ছাদে যাই!’
নির্দ্বিধায় উঠে দাঁড়ায় নূর। আজমাঈনের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দরজার কাছে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়ায় আজমাঈন। নূরের দিকে তাকিয়ে সেই দিনটার কথা মনে পড়ে। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো নন মাহরাম আজমাঈন, আর নূর ডান পাশে। সেদিন ওর চাহনিতে প্রচন্ড ভয় ছিলো তবে আজ ততই শান্ত এবং বিশ্বাসি দৃষ্টি। ছাদে পা রাখতেই নূরের বাগান স্পষ্ট হলো। দরজার সামনের লাইট জ্বালানো তবে বাগানের অধিকাংশ জায়গায় আবছায়া অন্ধকার। এই অন্ধকারেও আজমাঈনের হাত ধরে সামনে আগাচ্ছে নূর। চৌবাচ্চার কাছে আসতেই পদ্মফুল গুলো দেখা গেল। তবে সন্ধ্যার পর ফুলের পাপড়ি গুলো বন্ধ হয়ে যায়। আজমাঈন ফুলের দিকে তাকিয়ে বলে,’সব গাছগুলো কি তোমার লাগানো?’

নূর মাথা নেড়ে বলে,’কিছু কিছু গাছ আব্বু লাগিয়েছেন। আমি শুধু ফুলের গাছ লাগিয়েছি।’
আজমাঈন চৌবাচ্চার পানিতে ডান হাত ডোবায়, হিম শীতল পানি। তার অপর হাতটি নূরের হাত ধরে আছে এখনও। হাত নাড়িয়ে পানির ছলাৎ ছলাৎ আওয়াজ তোলে আজমাঈন। বলে,’আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালে তোমার অস্বস্তি হবে?’
নূর তাকায়, গভীর সে দৃষ্টি। মেয়েরা কখনো মুখে সম্মতি দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাদের চোখ সম্মতির চিহ্ন বহন করে। সব পুরুষেরা সে অদৃশ্য সম্মতি বুঝতে পারে না। তবে আজমাঈন চট করেই ধরে ফেললো। নূরকে টেনে এনে সামনে দাঁড় করালো। পেছনে দাঁড়িয়ে চৌবাচ্চার দেয়ালে দুহাত রেখে নূরকে আঁটকে দিলো। ওর পিঠ ঠেকেছে আজমাঈনের বুকে। আজমাঈন ওর ডান হাত আবার পানিতে ডোবায়, তবে এবার সাথে নূরের হাত ছিলো। পানিতে ঢেউ তুলে বলে,’পদ্মফুল তোমার খুব প্রিয় তাই না?’

নূর তখন কোন অজানায় হারিয়ে গেছে। আজমাঈনের গা থেকে মন কাড়া আতরের সুবাস নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। তবে এটা পুরোপুরি আতরের সুবাস নয়। আজমাঈনের গায়ে আতর দেওয়ার পর ওর শরীরের গন্ধ এবং আতরের গন্ধ মিলে এই নতুন সুবাসের সৃষ্টি হয়েছে। মাথা ঘুরে উঠছে নূরের। আজমাঈন ঠান্ডা গলায় বলে,’যে নারীর পদ্মফুল অধিকতর পছন্দের তাকে কি বলে জানো?’
নূরের জবাব আসে না। সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আজমাঈন ফিসফিস করে বলে,’তাকে পদ্মপ্রিয়া বলে। তোমাকে আজ থেকে এই নামে আখ্যায়িত করলাম। তুমি শুধু আমার পদ্মপ্রিয়া।’
নূরের কম্পন টের পেলো আজমাঈন, কেঁপে উঠে ধাক্কা খেলো আজমাঈনের বুকে। আজমাঈন কিছুটা পিছিয়ে আসে। নূর তখনই বলে ওঠে,’সরি সরি, আমি ইচ্ছে করে করিনি।’
আজমাঈন শব্দ করে হাসে। বলে,’এমন ধাক্কা প্রতিদিন একশো বার খেলেও কিছু মনে করব না। মানুষ টা যদি তুমি হও।’

নূর আমতা আমতা করে বলে,’রাত বাড়ছে, এখানে থাকা ঠিক হবে না।’
আজমাঈন ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,’কপাল টাই খারাপ, আজ চাঁদ ওঠেনি। ভাবলাম তোমার সাথে জোৎস্না বিলাস করব তা আর হলো না।’
আফসোসের স্বর শোনা গেলো। অতঃপর নূরের হাত ধরেই ছাদ থেকে নেমে এলো। আজমাঈনের হুটহাট বলা কথাগুলো মাঝে মাঝে বুঝে না নূর। হঠাৎ আফসোস আবার হঠাৎ খুশি। হয়তো ছেলেটার ছোট্ট একটা ইচ্ছে পূর্ণ হলেই দ্বিগুণ খুশি হয়। ওড়নাটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে ফের কুশনে মাথা রাখে। আবেশে চোখ বুজে আসে ওর। কিছু সুখকর স্মৃতিচারণ করতে করতে চোখে ঘুম চলে আসে।
সকাল সকাল কারো ঘুম ভাঙল না। সারারাত জাগার দরুন ঘুম ভাঙতে সময় লাগলো। চোখ মেলে নিজের অবস্থান বুঝে নিলো আজমাঈন। এখনও জায়নামাজের উপর শুয়ে আছে সে। চোখ কচলে উঠে বসলো। নূরের দিকে তাকাতেই চোখজোড়া স্থির হয়ে গেল। ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা গেল, নূরের চুলগুলো ছুঁতে গিয়েও হাত ফিরিয়ে আনলো। এই মেয়েকে ছোঁয়ার অধিকার ওর আছে, স্বয়ংসম্পূর্ণ অধিকার। যাক না আরো কিছু সময়। ফোন হাতে নিয়ে দেখলো সাড়ে দশটা বাজে। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায় আজমাঈন। ওর হোটেলের কাজ শেষ পর্যায়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই রিসেপশনের কাজ শেষ। ওপেনিং খুব দ্রুত হবে। সব ধরনের মার্কেটিং করছে সে, মানসম্মত ব্লগার থেকে টিভি চ্যানেল কোনটাই বাদ রাখেনি। আজ তাকে খুব দ্রুতই যেতে হবে।

সে দ্রুতই বের হয়ে গেল, নূর তখনও ঘুমে। ওর যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন আজমাঈন নেই, আশেপাশে খুঁজে দেখলো সে। ফ্রেশ হয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো। রেহানা সোফায় বসে ফোনে কথা বলছে। অনুপমা টেবিল গোছাচ্ছে। নূর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাবি উনি কোথায়?’
অনুপমার বুঝতে একটু সময় লাগলো। বুঝতে পেরে ভ্রু জোড়া উঁচু করে ব্যাঙ্গ করলো কেমন। মুখে বললো,’আজমাঈন? সে তো কখন চলে গেছে, তুমি জানো না?’
নূর চুপ করে গেল, যাওয়ার আগে একবার জানিয়ে গেল না। ভীষণ রাগ হলো নূরের। মুখটা থমথমে হয়ে গেল। অনুপমা নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে বললো, ‘বললাম খেয়ে যেতে তাও গেল না।’
এবার রাগটা আরো বাড়লো নূরের। আজমাঈনের উপর নয়, অনুপমার উপর। শক্ত গলায় বললো,’তুমি তাকে না খেয়ে যেতে দিলে?’

অনুপমা ভড়কে গেল, এমন তেজি কন্ঠস্বর কখনো শোনেনি। নিজের সাথে এতো এতো অন্যায় হলো, এতো অবহেলা পেলো তবুও নিরবে সয়ে গেছে মেয়েটা। মায়ের অকথ্য গালাগাল এমনকি মার গুলো হজম করে নিয়েছে। অথচ আজ সে স্বামীর জন্য গলা তুলেছে। এ থেকে প্রমাণিত যে, মেয়েরা সকল অন্যায়ের কাছে মাথা নত করলেও স্বামীর অপমান নিতে পারে না। অনুপমা গাল হাত দিয়ে বলে উঠলো, ‘আয়হায়, ইয়া আল্লাহ! তুমি আমাকে চোখ রাঙানি দিচ্ছ!’ চোখে মুখে মিথ্যা ভয় ফুটিয়ে বলে। পরক্ষণে হেসে বলে,’আমি তাকে বলেছি খেয়ে যেতে কিন্তু কোন কথাই তো শুনলো না। অতো বড় ছেলের সাথে আমি কি পারি?’
‘তুমি কিভাবে বলেছো তা আমি বুঝে গেছি ভাবি, এমন আচরণ করা উচিত হয়নি তোমার। সে এই বাড়ির অতিথি। প্রতিদিন এসে তোমাদের ঘাড়ের উপর এসে বসে থাকে না যে যাচ্ছেতাই আচরণ করবে।’
অনুপমা যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লো। রাতারাতি মেয়েটার হলো কি, জ্বীনে ধরল? এমন কড়া গলায় তো কখনো কথা বলেনি নূর। অনুপমা নিজের সাফাই গাইলো,’আমি বলেছি তবুও সে শোনেনি, এখন তুমি বিশ্বাস না করলে কি আর করার।’

রেহানা ফোন রেখে এগিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন কি হয়েছে। অনুপমা কন্ঠে নমনীয়তা এনে বলে, ‘আপনার জামাই না খেয়ে চলে গেছে, আমি কত করে বললাম খেয়ে যেতে তাও শোনেনি। এজন্য নূর আমাকে কত কথা শোনাচ্ছে।’
রেহানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলেন বেশ রেগে আছে সে। তিনি বললেন,’যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছৈ। এরপর আর ভুল হয়না যেন।’
অতঃপর নূরকে বলেন,’তুমি তার স্ত্রী, কিছু দায়িত্ব তোমার ও আছে।’
এবার নূর বেশ ঝাঁঝালো গলায় বলে,’অবশ্যই আমার দায়িত্ব আছে এবং আমি তা পালন করার চেষ্টা করছি। আপু যদি নাও থাকে তবুও দুলাভাই কে কখনো খালি মুখে এ বাড়ি থেকে যেতে হয়নি। আমি থাকতে তো নয়ই, তোমরাও তার প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। তাহলে আমার সময় ভিন্ন কেন?’
রেহানা অবাক হয়ে নূরকে দেখেন। বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেন,’তুলনা করছো নাকি হিংসা।’

নূর সামান্য হাসলো,’আমি কাউকে দেখে হিংসা করিনা।’ অনুপমার দিকে তাকিয়ে বলে,’অনেকে আমাকে দেখে হিংসা করে।’
শেষ কথাগুলো রেহানা কে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘শ্বাশুড়ি হিসেবে দায়িত্ব তোমার ও আছে আম্মু। আমি আপুকে হিংসা করিনা, শুধু জানতে চাইলাম এই বৈষম্যের কারণ কি? এই বাড়িতে কোন অতিথি এসে যদি এভাবে অপমানিত হয় তাহলে ধরে নিচ্ছি এখানে কোন ভদ্রতা সভ্যতার ছায়া নেই। আছে শুধু লোভ। বিনিময় দ্বারা সম্মান ভালোবাসা দেওয়া হয়।’
অনুপমা কিছুটা থিতিয়ে গেল, কথাগুলো যে তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে তা না বোঝার কোন কারণ নেই। তাই সে কোন কথা বললো না। রেহানারও কথা বলার মুখ রইলো না। নূর ওনাদের সামনে থেকে চলে এলো রুমে।

উদ্ভ্রান্তের মতো ফোনটা খুঁজে বের করলো। আজমাঈনের নাম্বারে ডায়াল করলো। কয়েক সেকেন্ড পর রিসিভ হলো। আজমাঈন কানে ইয়ারপডস গুঁজে দিয়ে বললো, ‘আসসালামুয়ালাইকুম ঘুমকুমারী।’
নূর রুষ্ট চোখে তাকায়। সালামের জবাব দিয়ে বলে, ‘কখন গিয়েছেন?’
স্টেয়ারিং বামে ঘোরাতে ঘোরাতে আজমাঈন বলে ওঠে,’যখন তুমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলে।’ কোন সমস্যা?’
‘অবশ্যই সমস্যা, এভাবে না বলে চলে যাওয়া উচিত হয়নি আপনার।’
আজমাঈন মুচকি হেসে বলে,’আমার আদুরে বউয়ের ঘুমন্ত মুখখানি এতোটা আদুরে লাগছিল যে, ভাবলাম কি দরকার ঘুম ভাঙানোর।’

রাগ করার আর জায়গা পেলো না নূর। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো সে। নূরকে চুপ করে থাকতে দেখে আজমাঈন বললো,’দুদিন বাদে তোমাকে একেবারের জন্য আমার কাছে নিয়ে আসছি তার একটা প্রস্তুতি নিতে হবে না? ভাবছি একটা লাল শাড়ি কিনব। ফয়েজের বিয়ের শপিং এ গিয়ে রেশম সুতা লাল শাড়িটা পছন্দ করেছিলে তুমি, ঠিক সেরকমই কিনব।’
না খেয়ে গিয়েছে কেন কথাটা হুট করে তুলতে পারছে না নূর। আজমাঈন যদি কিছু ভাবে? আবার ভাবলো এতে ভাবাভাবির কিছু তো নেই। তবে শেষমেশ কথাটা বলা হয়ে ওঠেনা নূরের। উল্টে রেগে বলে,’আপনার শাড়ি আপনিই পড়ুন।’
আজমাঈন হো হো করে হেসে উঠে,’ধুর মেয়ে, ছেলেদের কে মেয়েদের পোশাক পরতে নেই। এটা হারাম, জানো না?’

‘আপনি মানুষ টা হালাল কিন্তু আপনার কথাবার্তা হারাম।’
আট করে ফোনটা রেখে দিয়েছে নূর। আজমাঈন হাসতে হাসতে ড্রাইভিং এ মন দেয়। মূলত সে দেখতে চেয়েছিল যে নূর কি রিয়্যাক্ট করে এভাবে না বলে চলে আসাতে। অবশ্য আসার সময় রাশেদ সাহেব কে বলে এসেছেন। এভাবে না খেয়ে যাওয়াতে তিনিও রাগ করেছেন কিন্তু আজমাঈনের তাড়া আছে। সে পথে কিছু খেয়ে নিবে বলে বেরিয়ে এসেছে। ওর হাজারটা প্যারা, বিয়ে আর হোটেল নিয়ে ঝামেলায় আছে। তার উপর কালকে আজমল শিকদার কে বিয়ের কথা জানিয়েছে। তিনি প্রথমে হট্টগোল করলেও পরে রাশেদ সাহেবের ব্যাপারটা জানার পর থেমেছেন।

আজমাঈন বাসায় ফিরলো বিকেলে। কিন্তু বাড়িটা বোধহয় আস্ত নেই আর। মামা খালা বাড়ির গুষ্টিরা সব হাজির হয়েছে। বাচ্চা পোলাপাইন পায়ের তলা দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছে। তাদের পেছন পেছন আজমল শিকদার দৌড়াচ্ছে। আজমাঈনের সাথে হুট করেই ধাক্কা খেলেন তিনি। আজমাঈন চট করে বাবাকে ধরে ফেললো। রাগি স্বরে বললো,’ওদের সাথে সাথে তুমিও বাচ্চা হয়ে গেলে নাকি?’
‘এই ছ্যাঁচড়া পোলাপাইন গুলো আমার কতগুলো গাছের ডাল ভেঙ্গেছে দেখে আয়। আমি আশ্চর্য হই, গতকাল রাতে সবাইকে দাওয়াত দিলাম। ফজরের সময় সবাই হাজির। এই পরিবারের সবাই ছ্যাঁচড়া। কতগুলো টাকার বাজার করা লাগলো আজকে।’

দুঃখ ফুটে উঠল মুখে। আজমাঈন বিরক্ত হয়। বলে, ‘এই দুইদিন এমন করবে, তারপর সব চলেই যাবে। এতো দৌড়াদৌড়ি করা ঠিক না। হাঁটুর ব্যথা বাড়লে আমি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারব না।’
‘আমিও নিব না ভাইয়া।’ বলতে বলতে তানাজ এগিয়ে আসে। আজমল শিকদারের মুখটা গোমড়া হয়ে যায়। বড় মেয়েটাকে তিনি এক প্রকার ভয় পান। তানাজ বলে,’সকাল থেকে বাচ্চাগুলো কে তাড়া করেই যাচ্ছে। কত করে বলছি থামছে না। এরপর কিছু হলে ডাক্তারের কাছে তো নিবই না উল্টে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসব।’
ক্লান্তির মাঝেও হেঁসে উঠল আজমাঈন। তাহমিনা এসে বলেন,’আমি বলি কি এখনই রেখে আয়। বিয়ে শেষ হোক তারপর নিয়ে আসিস। নাহলে কার পাতে কি পড়ছে তা গুনতে বসবে।’

কথাটা গাঁয়ে লাগলো আজমল শিকদারের,’কি ভাবো তুমি আমাকে, আমি কিপ্টা? যাও যাও যা খুশি তাই রান্না করো আমি কিছু বলব না। আমার কোনো দাম নেই এই বাড়িতে। এই গেলাম আমি বাড়ি থেকে।’
তিনি হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। তবে তার এই কথার দাম কেউ দিলো না। আজমাঈন সন্ধ্যার পর বাপকে খুঁজতে বের হয়। পাড়ার চায়ের দোকানে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন এখনও। আজমাঈন ভাবে, এই লোকটা নাকি রাগ করে এসেছে। কিছু করার নেই, বাবাকে বুঝিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলো। কিন্তু এসেই ওনার মাথায় আগুন ধরে গেল। বাড়িতে হল্লা পার্টি হচ্ছে, চায়ের সাথে সিঙাড়া, সমুচা, পাকোড়া কত কি। আজমাঈন দেখলো ভাব খারাপ, এই কিপ্টে ব্যাটা কি না বলে ফেলে আবার। তাই জোর করে নিজের ঘরে নিয়ে গেল।

দু’দিন পর, তিন গাড়ি আত্মীয় স্বজন নিয়ে বউ আনার উদ্দেশ্যে বের হয় আজমাঈন। গাড়ি ড্রাইভ করছে সে, পাশেই আজমল শিকদার বসে আছেন। গাড়িতে আইশাসহ বাচ্চারা আছে। হৈচৈ করছে তারা। আজমল শিকদার দিলেন এক ধমক,’এই চুপ! প্যাক প্যাক না করে আল্লাহ আল্লাহ কর।’
একটা বাচ্চা বলে উঠলো,’দাদু দাদু তুমিই আল্লাহ আল্লাহ করো, বাঁচবে আর ক’দিন।’
বিষ্ফোরিত চোখে তাকালেন আজমল শিকদার। আজমাঈন বলে উঠলো,’খামোখা ওদের সাথে কথা বলো কেন? বাচ্চা মানুষ উল্টাপাল্টা কথা বলে ফেলে।’
আজমল শিকদার বিড়বিড় করে বলেন,’শালার বাড়ির গুষ্টির রক্তে সমস্যা।’
আজমাঈন শুনতে পেলো। বললো,’আমি তো ওনাদের জানাতে বারণ করেছিলাম। এখন তোমার বউ যখন জানিয়েছে কি আর করার? একটা কথা শুনে রাখো, আমার বউ নিয়ে টানা হেঁচড়া করলে সব কটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিব।’

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৮

‘নিজেই ভাত পাইনা তুই আবার কথা কস। নিজের টা বুঝে নে।’
‘আমাকে সাপোর্ট দিও শুধু।’ ও জানে বাবা সবসময় ওর পক্ষে। তবুও কথাটা ফের তুললো।
রাশেদ সাহেবের কারণেই আত্মীয় স্বজন সবাইকে নিয়ে এসেছে আজমাঈন। নাহলে সে একাই নূরকে বাসায় নিয়ে যেতো। রেজিস্ট্রি করার পর খুব বেশি সময় নিলো না ওরা। সন্ধ্যা নামার আগেই রওনা দিতে হবে। শাড়ি গহনা সব নিলেও নূরকে তা পরানো হয়নি। আজমাঈনের দেওয়া কালো বোরকা গায়ে জড়িয়েছে সে। তবে নিকাবের আড়ালে থাকা নূরের মনে আজ ভয়াবহ ঝড় উঠেছে। রাশেদ সাহেব যখন নূরের রুমে গেলেন ওকে আনতে তখন ওনার সব শক্তি যেন ক্ষয় হয়ে গেল। দুয়েক মিটার দূরে থাকা মেয়ের কাছে তিনি কিছুতেই পৌঁছাতে পারছেন না। উল্টে নূরই দৌড়ে এলো। দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো রাশেদ সাহেব কে।

পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৩০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here