পৌষপার্বণ পর্ব ২৭
Irfa Mahnaj
মানুষের জীবন খড়স্রোতা নদীর ন্যায়। এই ভালো তো এই খারাপ। এতো কিছুর মাঝেও বারোমাসি নীড়ে কখনো দুঃখ কি জিনিস তা দেখা যায়নি।
শুনতে হাস্যকর লাগলেও এ বাড়িটি সবসময় হাসি ঠাট্টা আর মজায় মাতোয়ারা হয়ে থাকে। এই পরিবারের সবার মজার আর হাস্যরসাতকে মুখরিত থাকে বাড়ির প্রতিটি দেওয়াল আনাচ কানাচ।
সবসময় হাসি মজায় সুখে থাকে বলেই যে দুঃখ এদের ছুঁতে পারবে না এমন তো কোনো কথা নেই। জীবনে দুঃখ থাকবেই। সুখ থাকলে দুঃখ থাকবে আবার দুঃখ থাকলে সুখ!
চেঁচামেচির আওয়াজ শুনে উপরের তলা দিয়ে আসতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায় পৌষ। একটু দ্রুতই সে আসতে চেয়েছিলো ফলাফল পায়ের সাথে পা বেজে সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়।
পৌষের আর্তনাদ করে করা একেকটা চিৎকার পার্বণের বুকে তীরের মতো বিধছে। ছেলেটা স্থির হয়ে দাড়িয়ে আছে।
ওর পা বোধহয় আটকে গেছে। মস্তিস্ক কাজ করছে না। এতক্ষণ মায়ের হাতে এতো গুলো মার খেয়েও দাঁত কেলিয়েছে যেই ছেলেটা সেই ছেলেটাই এখন পাথর হয়ে গেছে!
বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য স্থির। মাত্রই তাদের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বুঝতে তাদের সময় লাগছে।
ফাল্গুনের হাত থেকে খুন্তি পড়ে গিয়ে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠলো। এতেই সবাই যেনো তাদের ভ্রম থেকে বেরিয়ে আসে।
পার্বণের মাথায় শুধু একটা কথাই বাজছে পৌষের চিৎকার করে বলা ‘ওমাগোওওও”! তার মন ও মস্তিস্ক তাকে বারংবার সিগন্যাল দিচ্ছে পৌষ পড়ে গেছে, তার পৌষ এই অবস্থায় পড়ে গেছে! তার পৌষ ব্যথা পেয়েছে
ব্যাস এটুকুই যথেষ্ট ছিলো ছেলেটাকে উন্মাদ করে দিতে। ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে পৌষের কাছে চলে গেলো।
কিভাবে যে পার্বণ পৌষের কাছে তা সে নিজেও জানে না। ছেলেটার পুরো শরীর কাঁপছে। হাতটা এতো অসম্ভব পরিমানে কাঁপছে ও ঠিক করে ধরতেও পারছে না।
তড়িঘড়ি করে পৌষকে নিজের বক্ষে নেয়। পৌষ জ্ঞান হারিয়েছে। ওর মুখটা দুই হাতে ধরে ওকে জাগানোর চেষ্টা করছে পার্বণ।
আর ওর পরিবার তারা তো পার্বণের প্রথম চিৎকারেই এসে পৌষের কাছে দাড়িয়েছে। তবে ছেলেটা কাউকে ধরতেই দিচ্ছে না।
পার্বণ নিজেও বাচ্চা ছেলেই। ১৭ বছরের ছেলেটা আহামরি বড় নয় যে এতো বেশি স্টেবেল হবে। ফাল্গুন ছেলের নিকট এগিয়ে গেলো।
পৌষকে ডাকতে ডাকতেই মায়ের পানে তাকায় পার্বণ। ছেলের লাল টকটকে চোখের দিকে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠে ফাল্গুনের।
একটু আগেও মার খেয়ে ও যার চোখে জলের রেশ মাত্র দেখা গেলো না সেই ছেলেই এখন কান্না করছে।
— ম… মা প… পৌষ চোখ খুলছে না কেনো।
ভাদ্র বোনের এই অবস্থা দেখে কি করবে দিশা পাচ্ছে না। পৌষের হাতধরে দাড়িয়ে বসে আছে।
বর্ষা আর জ্যৈষ্ঠ বাসায় নেই। বর্ষার বান্ধবী অসুস্থ ওখানেই আছে। বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় আর বাসায় আসেনি। আর জ্যৈষ্ঠ বউকে একলা ছাড়বে না তাই সেও হসপিটালেই থেকে যায়।
এরকম একটা সিচুয়েশনে সবাই ভেঙ্গে পড়লে কাজ হবে না। তাই চৈত্র বুদ্ধি খাটিয়ে প্রথমে নিজের স্বামীর কাছে যায়। বলে,
— ভাদ্র উঠ এভাবে বসে থেকে কোনো কাজ হবে না। পৌষ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নয় ওকে আমাদের হসপিটালে নিতে হবে।
চোখের পানি মুছে বউয়ের দিকে তাকায় ভাদ্র। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
— চৈত্র আমার বোন…!
চৈত্রের নিজেরও কষ্ট হচ্ছে তবে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এদের সবার বেহাল দশা দেখে ওর বোঝা হয়ে গেছে যা করার ওকেই করতে হবে।
পৌষের পা ঢলছিলো মাঘ। ওকে উদ্দেশ্য করে চৈত্র বলে,
— ছোট মা প্রয়োজনীয় জিনিস গুছাও।
হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে মাঘ গেলো সব গুছাতে। পৌষ সবার আদরের উপরন্তু সন্তানসম্ভাবা এই অবস্থায় এরকম সবাই স্তব্ধ।
চৈত্র এবার গেলো তার ছোট দুই ভাইয়ের কাছে। ওদের উদ্দেশ্য বলল,
— হেমন্ত বাবাকে গিয়ে বলো তিনি অ্যাম্বুলেন্স কল করতে। তিনি বোধহয় আওয়াজ পাননি। আর বসন্ত গিয়ে পানি নিয়ে এসো।
দুই ভাইই উদভ্রান্তের মতো দৌড়ালো। বসন্ত গিয়ে পানি নিয়ে আসলে তা ছিটিয়ে দিলো পৌষের চোখে মুখে।
তবুও জ্ঞান না ফিরায় সবার কলিজার পানি শুকিয়ে গেলো। পার্বণ পৌষকে ধরে বিলাপ শুরু করে দিলো। বলতে গেলে ছেলেটা পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে।
সবাইকে সামলানো গেলেও পার্বণকে সামলানো যাচ্ছে না। ও পৌষকে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— এই পৌষ জান তুই ঠিক আছিস? কোথাও লাগেনি তো? কিছু তো বল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
বোকা ছেলে যার জ্ঞান নেই সে কি উত্তর দিতে জানে!এতো কিছু ভাবার সময় কই পার্বণের ও তো কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে।
তারপর বৈশাখ আসলে সে নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে সামলায়। পৌষকে হসপিটালে নেওয়া হয়। এমন সিচুয়েশনে সত্যিই বসে থাকা যায় না।
আষাঢ়ও প্রায় দৌড়ে দৌড়ে এসেছে। ভাতিজা ভাতিজির এই অবস্থায় সে নিজেও কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সকালে হাঁটতে বের হয়েছিল সেখান থেকেই এসেছে।
যে যেভাবে ছিলো সেই অবস্থাতেই রওনা দেয় হসপিটালে। তাদের এতো খেয়াল করার সময় কই।
পার্বণ তো জুতা ছাড়া খালি পায়েই পৌষকে কোলে করে অ্যাম্বুলেন্স এ নিয়ে যায়। দুজন ওয়ার্ড বয় এসেছিলো তবে তাদের নিকট পৌষকে দিতে নারাজ পার্বণ।
এই অবস্থায় ও বউয়ের প্রতি পসেসিভনেস এক ফোটাও কমেনি। ওই অবস্থাই খালি পায়ে জুতা ছাড়া পৌষের সাথে চলে যায় পার্বণ।
যেখানে তার পুরো দুনিয়া জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে সেখানে এতো কিছু খেয়াল করার সময় আছে নাকি।
ফাল্গুন এক পলকের জন্যও ছেলের কাছছাড়া হননি। আর পার্বণ সেতো পৌষকে নিজের বুকের মধ্যে রেখেই সারা রাস্তা পারি দিয়েছে।
বাড়ির সবাই চিন্তিত। ওদের সবার চোখে পানি। বারোমাসি নীড়ে কখনো ঝগড়া হতে দেখা যায়নি। বাড়ির একজনের কিছু হলেই সবাই কেঁদেকুটে ভাষায় অস্থির হয়ে যায়। এই নীড়ের বন্ডিংই এতো স্ট্রং।
পৌষকে জ্যৈষ্ঠর হসপিটালেই আনা হয়েছে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলেন জ্যৈষ্ঠ। এতবছর ডাক্তার জীবনে এই প্রথম বার জ্যৈষ্ঠর হাত কাঁপছে কোনো রুগীর চিকিৎসা করতে।
যতই সে ডাক্তার হোক। যত বড়ই ডাক্তার হোক না কেনো মেয়ের এমন অবস্থা কোনো বাবাই মেনে নিতে পারে না।
জ্যৈষ্ঠর পিতৃহৃদয় কেঁপে উঠে। জ্যৈষ্ঠর অবস্থা যে খুব একটা সুবিধার না তা বুঝতে কারোরই বাকি থাকে না। জ্যৈষ্ঠর সহকর্মী ডাক্তার তাই তাকে পৌষের চিকিৎসার কাজে কোনো ভাবেই ইনভল্ভ করে না।
জ্যৈষ্ঠ নিজেও বোধহয় পারতো না। শত হোক বাবা তো! পৌষের থেকেও ক্রিটিকাল রুগীকে হ্যান্ডেল করতে পেরেছে আর আজ? মনের জোর তো ধূর কোনো সাহসই পাচ্ছে না।
বর্ষা এমনিতেই গত রাত অনেক রাত অবধি জেগে ছিলেন। যেই বাড়ি ফিরতে নিয়েছে তখনই দেখে তার নারী ছেড়া ধন, তার বুকের মানিকের এই অবস্থা!
কোনো মাই সহ্য করতে পারেনা। বর্ষা এর ব্যাতিক্রম হয় কিভাবে?এর মাঝে আবার কাল থেকে তার উপর দিয়ে একটার পর একটা যাচ্ছে। আর আজ এই অবস্থা।
ঠিক আর থাকতে পারেনি। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। মায়ের এই অবস্থা পৌষের অবস্থা সব মিলিয়ে পাগলপ্রায় ভাদ্র।
এসবের মাঝেও চৈত্র সর্বদা সব সময় সামাল দিচ্ছে সব। আষাঢ় নিজের বড় দুই ভাইকে সামলাচ্ছে। মাঘ আর ফাল্গুন বর্ষার কাছে।
বর্ষাকে একটা কেবিনে দেওয়া হয়েছে। সেলাইন চলছে। ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। আপাতত বর্ষার জন্য এটাই ঠিক মনে হয়েছে।
বসন্ত ও হেমন্ত দুই ভাই পার্বণের দুই পাশে বসে আছে। চেষ্টা করছে পার্বণকে সামলাতে। যেই ছেলেটা সবসময় আজব আজব কথা বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখে আজ তার মুখে কোনো বুলি নেই।
চঞ্চল ছেলেটা আজ নির্জীব। মূর্ছা যাওয়া। যার মধ্যে নেই কোনো সজীবতা। অথচ এই পার্বণের ভণ্ডামির রেকর্ডের কোনো শেষ নেই।
আজ সে চুপ। মাথা নিচু করে থুতনিতে দুই হাত ঠেকিয়ে বসে আছে। ওর কিচ্ছু ভালো লাগছে না। ওর পৃথিবীটা সামনের ওটিতে।
পার্বণের এই নিস্তব্ধতা কেউ মেনে নিতে পারছে না। ছেলেটা অস্বাভাবাবিক ভাবে চুপ। এ যে ভালো লক্ষণ নয়। চৈত্র এতক্ষনের কঠিন খোলস ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসে।
ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। এতেও ভাই তার কথা বলছে না। পার্বণকে তো দুস্টুমিতেই মানায় সে শান্ত থাকবে কেনো?
সবার অবস্থা খারাপ তবুও তাদের এখন চিন্তা পার্বণকে নিয়ে। ও নিতান্তই বাচ্চা। ওর বুঝই বা কতটুকু। সেই যে ঘরে বসে কেঁদেছে তার পর অ্যাম্বুলেন্সে বসে থেকে এই পর্যন্ত আর একটুও কাঁদেনি।
পাথর হয়ে বসে আছে। ফাল্গুন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে দিলেন। চিন্তায় আছে সকলে এই ছেলে আবার কোনো ট্রমায় না চলে যায়।
— এই আব্বা? তুমি কাঁদছো না কেনো? কিছু বলো মায়ের সাথে কথা বলো।
কিন্তু কিসের কি?পার্বণ সে নির্জীব। সবাই এগিয়ে আসলো। এটা সেটা বলেও একটা বুলি বের করতে পারলো না।
এ বারে জ্যৈষ্ঠ এগিয়ে এলেন। তার নিজের অবস্থা যাই হোক এখন তার সেদিকে দেখলে চলবে?
ওদিকে মেয়ে পড়ে আছে ওটিতে এদিকে ভাতিজা সাথে মেয়ে জামাইয়ের এই অবস্থা। কিছু না হোক চেষ্টা তো করাই যায়। এভাবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকার কোনো মানে নেই।
বৈশাখ যে কিনা সব সময় ছেলেকে খোঁচায় সেও ছেলের এই দশা দেখে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না।
পার্বণ আর বৈশাখ বাপ ছেলের মধ্যে সারাক্ষন ইন্ডিয়া পাকিস্তানের মতো অবস্থা বিরাজ করলেও আজ ছেলের করুন পরিণতি পিতৃমন কাঁপিয়ে তুলেছে।
পার্বণকে বার বার বলার পর ও ওটির সামনে দিয়ে নড়াতে অক্ষম সবাই। ছেলেটা কিছু বলছে না ঠিকই তবে গাঁট হয়ে বসে আছে।
জ্যৈষ্ঠ আস্তে আস্তে পার্বণের পাশ ঘেঁষে বসেন। ওকে জোর করে টেনে নিজের কোলে মাথা দেওয়ায়।
মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে এবার তিনি বলতে আরম্ভ করলেন,
— তুই যখন জন্ম নিয়েছিস তখন স্বাভাবিক ভাবে হোসনি। ভীষণ অসুস্থ ছিলি। তোকে অবজার্ভবিশনে রাখা হতো। ৭ দিন মা ছাড়া ছিলি। তোকে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে রাখা হয়েছে। তুই পুরো ছয় মাস অসুস্থ ছিলি। কেমন নির্জীব থাকতি। আমরা তো সবাই টেনশনেই শেষ।
তোর মেজ মা তখন সবে ৭ মাসের অন্তসত্ত্বা ছিলো। পৌষ তখন তার গর্ভে। পৌষের আসার কথা আরো পড়ে থাকলেও পৌষ আমাদের মাঝে তাড়াতাড়ি চলে আসলো।
হয়তো আল্লাহই চেয়েছেন পৌষ আসুক। কারণ এখানে পার্বণ নামের একটা ছেলে যে তাকে ছাড়া অপূর্ন ছিলো। মিরাকেল বললেও ভুল হবে না।
পৌষের জন্মের সাথে সাথে তুই প্রথম বারের মতো কান্না করা থামিয়েছিস। যেখানে ছোট বাচ্চারা কাঁদার পাশে হাসতো সেখানে তুই শুধু কাঁদতি। হয়তো আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে পৌষকে চাইতি!
এ পর্যায়ে পার্বণকে জ্যৈষ্ঠর দিকে তাকাতে দেখা যায়। তিনি হালকা হেসে আবারো বলতে শুরু করলেন,
— সদ্য জন্মানো পৌষকে ৬ মাস বয়সি পার্বণের পাশে যখন রাখা হলো হুট করেই কান্না করা ছেলেটা হাসতে আরম্ভ করলো। অলৌকিক ভাবে তুই পৌষ আসার পরেই ধীরে ধীরে সুস্থ হতে আরম্ভ করলি।
সবাই তখন কি বলতো জানিস? সবাই বলতো তুই নাকি পৌষের জন্যই ৬ মাস হসপিটালে অপেক্ষা করছিলি। এই আশ্চর্য ঘটনা দেখেই তোদের দাদাসহ আমরা ঠিক করি ভবিষতে তোদের বিয়ে দিবো।
তোদের এক সুতায় বেঁধে দিবো। কারণ আমাদের বোঝা হয়ে গিয়েছিলো পৌষ ছাড়া পার্বণ চলবে না। এখানেই কিন্তু শেষ নয়।
পৌষ যেহেতু সময়ের আগেই জন্ম নেয় তাই ও অপুষ্টিতে ভোগে।ওর শরীর নাজুক। এটা অবশ্য আমার থেকে ভালো তুই জানিস। আমরা সবাই জানি পৌষের বডি খুবই সেনসিটিভ।
আমরা তোদের বিয়ে দিলেও এতো তাড়াতাড়ি তোদের জানাতে চাইনি।তোরা বড় হবি। নিজের পায়ে দাঁড়াবি তারপর না হয় বলতাম।
তবে ভাগ্যে যে অন্য কিছুই লেখা ছিলো। আমি এর গভীরে যাবো না। আমি তোর চাচা হলেও তোর শশুরও হই। মেয়ে আর মেয়ে জামাইয়ের পার্সোনাল বিষয় নিয়ে আমি বলতে চাইনা।
তোরা ছোট তবে এতটাও নয় যে বুঝবি না। তোদের এই কারণেই আমরা এই বিয়ের কথাটা লুকিয়ে গেছি।
এই এতক্ষন পর পার্বণের চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। জ্যৈষ্ঠ বাচ্চাটাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলেন।
আরো কিছু বলবেন তবে তার কথা অসমাপ্তই রয়ে যায়। জ্যৈষ্ঠ পার্বণের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
— আবার সুযোগ হলে আমি আজ যেই কথা গুলো বলতে পারিনি তা বলবো।
ওটির রুমের দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে আসে। সবাই ছুটে গেলেও যেতে পারে না পার্বণ।ও ঠায় বসে রয়। কেউ দেখলে বলবে এই ছেলে এতো পাগলামি করেছে!
পৌষপার্বণ দুজনেই বাচ্চা ছেলে মেয়ে। এই বয়সে এতো বোধ বুদ্ধি থাকলে কাজেই লাগতো। আগের দিনে এতো কম বয়সে বিয়ে অহরহ ছিলো।
যদিও গ্রামে এখনো তার প্রচলন আছে। তবুও শহরে তা অনেক কম। তার থেকেও বড় কথা পৌষ এতো কম বয়সে বাচ্চা ক্যারি করার মতো স্ট্যাবল নয়।
আগে এই বয়সে কিংবা এর থেকেও কম বয়সে মা হলেও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো মা বাচ্চা দুজনকেই।
আর এখন বর্তমানে এটা খুবই কম। একে তো পৌষ ছোট তার উপর আবার নাজুক শরীর মেয়েটার।
বাচ্চা নেওয়ার মতো ধারণক্ষমতা হলেও এটা পৌষের জন্য রিস্কি। যেখানে ২৪, ২৫ বছর বয়সি মেয়েগুলোর অবস্থাই ঝুকিতে থাকে সেখানে পৌষের জন্য এটা হুমকির মতো।
ওর কন্ডিশনের কথা ভেবে ডাক্তার স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে পৌষকে স্পেশাল কেয়ারে রাখতে হবে। যদিও এখনো পৌষের প্রেগন্যান্সির বয়স বেশিদিন হয়নি তাই আজকের সিচুয়েশন কাটিয়ে উঠা গেছে।
পরিবর্তিতে এরকম কিছু হলে সেটা বাচ্চা এবং মা দুইজেনের জন্যই মারাত্মক লেবেলের ক্রিটিকাল সিচুয়েশন ক্রিয়েট করতে পারে।
ডাক্তারের কথা সবাই শুনলো। ডাক্তার যেহেতু জ্যৈষ্ঠর পরিচিত তাই তিনি কোনো একশন নেননি। জ্যৈষ্ঠ এর জন্য ব্যাপারটা চেপে যাওয়া গেছে।
ডাক্তার আশা এককালের বন্ধু জ্যৈষ্ঠর তাই জ্যৈষ্ঠকে আলাদা ডেকে বলেন,
— জ্যৈষ্ঠ তুই নিজেও তো ডাক্তার। তোর তো বোঝা উচিত। তোর মেয়ের বয়স মাত্র ১৭!তুই ভাবতে পারছিস ওর বয়স এখন হেসে খেলে কাটানোর ও এ বয়সে মা হচ্ছে! মা হতে গেলে যে কি কি করা লাগে এতটুকু জ্ঞান হবার ও তো টাইম দিবি? এসব ও বাদ সময়ের সাথে নাহয় শিখে যাবে। কিন্তু তুই নিজেও জানিস মাতৃকালীন সময়টা কতটা সেনসিটিভ!
আশার ঝাড়ি শুনে মুখ চোখ এটুকু করে দাড়িয়ে রয় জ্যৈষ্ঠ। সে কি জানে না এসব? আলবাত জানে। কিন্তু ওর হাতে কিছু আছে নাকি!
আশা এবার জ্যৈষ্ঠর উদ্দেশ্য শুধায়,
— আর তোর জামাইয়ের ও বলি হারি কান্ডজ্ঞান। কোথায় সে তাকে আজ কয়েকটা কথা শুনাই।
একটু দুরেই দেবদাস হয়ে থাকা পার্বণের দিকে তাকিয়ে কাচুমাচু ভঙ্গিতে হাত দিয়ে পার্বণকে দেখিয়ে দিলো জ্যৈষ্ঠ।
আশা ভেবেছিলো পৌষের বড় কারো সাথে বিয়ে হয়েছে। কিন্তু জামাইয়ের জায়গায় বাচ্চা ছেলে দেখে আকাশ থেকে ধপাস করে পড়ে আশা।
অবিশ্বাস্য গলায় বলে উঠে,
— এখন এটা বলিস না এটা তোর মেয়ের জামাই!
জ্যৈষ্ঠর দিকে তাকাতেই ও অসহায় মুখ বানিয়ে মাথা নাড়ায়। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো আশার।
— বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিয়েছিস! তার উপর বাচ্চার পেট থেকে বাচ্চা! তোদের নামে তো বাল্যবিবাহের কেস করা লাগবে।
— ওদের নিজেদের এখন ফিটার খাওয়ার বয়সে বাচ্চা পালবে!হাহ জ্যৈষ্ঠ তোর থেকে আশা করিনি এটা।
জ্যৈষ্ঠর এখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,
পৌষপার্বণ পর্ব ২৬
— ওরে তোরই যদি এই রিঅ্যাকশন হয় তাহলে বোঝ প্রথম শুনে আমাদের কি অবস্থা হয়েছিলো।
তবে আপাতত চেপে গেলো সেসব। আর আশা? তার মাথা ভন ভন করে ঘুরছে। এখন তাই গেছে রেস্ট নিতে। ভেবেছিলো পৌষের হাসব্যান্ডকে তুলোধোনা করবে। বড় হয়ে কিভাবে এমন বেকুবের মতো কাজ করতে পারলো?
কিন্তু নিজেই এখন বেকুব বনে গেছে। এরে এখন কি বলবে নিজেই তো ছোট! বুঝের ব ও তো হয়নি এখনো এই ছেলের মাঝে।
