Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ২৯

পৌষপার্বণ পর্ব ২৯

পৌষপার্বণ পর্ব ২৯
Irfa Mahnaj

যেই না পার্বণ পৌষের সাথে কিছু করবে এমন টাইমে ঠিক সেই সময়টাতে কেবিনের দরজায় কড়া নাড়ে কেউ একজন।
পৌষ তো হাফ ছেড়ে বাঁচে কিন্তু পার্বণ মোটেও খুশি নয়। সে প্রচন্ড অসন্তুষ্ট। মনে মনে আগমন ঘটা ব্যাক্তিকে একটা গালিও ছুড়ে মারে।
সাথে নিজের ফুটা কপালের দোষ দেয়।
— ওরে বা*ল এখন আবার কে আসলো।
দরজার অপরপ্রান্ত থেকে আবারো নক করার আওয়াজ আসে। সাথে এবারে বসন্তের উচ্চ স্বর ও ভেসে আসে।
— পার্বণ ভাই দরজা খুলো। দরজা কেনো লক করলা।
চিড়বিড়িয়ে উঠলো পার্বণের মেজাজ। বলে উঠলো,

— দরজা লক করে যেই কাজ করতে নিছি ওই কাজ করতে আর দিলি কোথায়?
ফের বসন্ত ডেকে উঠতেই পার্বণ বলে উঠে,
— শা*লার কোনো টাইম সেন্সই নাই। সেই শুরু থেকে ওর আমার রোমান্স এর টাইমে আসা লাগবে!
পার্বণের অবস্থা দেখে পৌষ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। খটখটিয়ে হেসে উঠে। পৌষের হাসি দেখে অসহায় মুখ বানিয়ে পার্বণ বলে,
— হেসে নে হেসে নে যত পারিস হেসে নে।
পৌষ নিজের হাসি থামিয়ে পেটের উপর এক হাত বুলাতে বুলাতে ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
— এতদিন তুই আমাকে জ্বালিয়েছিস এখন আমি তোর মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাবো।
পার্বণ ও নিজের তর্জনী পৌষের পেটের উপর তাক করে বলে,
— এখনই তোর সময়। সমস্যা নেই আমারো দিন আসবে। একবার আমার ছাওপোনাডা পৃথিবীতে আসুক তারপর দেখিস তোরে কি করি!

— যখন আসবে তখন দেখা যাবে। তুই আগে দরজা খোল।
ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও পার্বণকে যেতে হয়। দরজা খুলে দিতেই বসন্তের বত্রিশ পাটির দাঁত সহিত চাঁদ বদনের দর্শন হয়। নিভে যাওয়া রাগটা হুট করেই জ্বলে উঠে।
কোনো কিছু না ভেবেই বসন্তের গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে বসে। মার খেয়ে গালে হাত দিয়ে বোকার মতো দাড়িয়ে আছে বসন্ত। ও তো এটাই বুঝলো না করেছে কি!
বসন্তও এবারে আর সহ্য করতে পারলো না। আজ সেই সকাল থেকে যে যেভাবে পারছে বসন্ত নামের অবলা ছেলেটাকে মেরে যাচ্ছে।
প্রথমে খেলো আম্রপালির হাতের মার। আম্রপালিকে আর বসন্তকে একসাথে দেখে হিমসাগরের হাতে দাবাং মার্কা থাপ্পড় খায়।
থাপ্পড় খেয়ে মাথা পুরো ভন ভন করে ঘুরে উঠে। চারোপাশে তারা দেখে। তাহলে বোঝো কি জোরেই না মেরেছে! সেই রেশ কাটতে না কাটতে মায়ের হাতের গনোধোলাই খেয়েছে।
সারাদিন কোথায় টই টই করেছে সেজন্য। এখন আবার যেই হাসি মুখে বড় ভাইকে ডাকলো এখানেও মার খেলো!
— হ হ মারো সবাই মিলে এই বসন্ত নামের প্রাণীটিকে মেরে মেরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দেও।
— মার খেলে কেউ বিলুপ্ত হয় না।
— তাহলে আর কি? লেটা তো চুকেই গেলো!

পৌষকে সেদিনই রিলিজ করে দেওয়া হয়। তারপর কেটে যায় ৭-৮ দিনের মতো।পৌষ এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। পৌষ রেডি হচ্ছে। আজকে ওরা কলেজে যাবে।
আজ কলেজে অনুষ্ঠান আছে। কিসের অনুষ্ঠান এতো কিছু জানে না। শুধু জানে এতদিন ঘরে বসে বোর ফিল করেছিল তাই আজকে নিজের মাইন্ড ফ্রেশ করতে যাবে।
তাছাড়া পৌষদের কলেজটাই এমন ১২ মাসে ১৩ পার্বণের মতো কিছু না কিছু লেগেই থাকে। সরকারি কলেজ কিনা!
হিজাব নিয়ে বসেছে পৌষ। আজকে হিজাব পড়ে যাবে এছাড়া কোনো উপায় নেই। পার্বণ বেয়াদবটা গলা, কলার বোন কিছু রাখেনি সিল মারতে।

লালচে লালচে দাগ বসে গেছে। পার্বণের মতোই ওর দুটো খচ্চর মার্কা ভ্যাম্পায়ার টিথ আছে। যেগুলো বসিয়ে একদম ঘাড়ে নকশা বানিয়েছে বেয়াদবটা।
পৌষ জানি কোন দিন ওর এই রাক্ষসের মতো দাঁতগুলো উপরে ফেলে দেয়! একদম জল জল করছে। যখন পৌষের গায়ে ওর এই বিশাল ভ্যাম্পায়ার টিথ বসায় তখন যে কি পরিমাণ জ্বলুনি হয়! তা শুধু পৌষই জানে।
স্টিল জ্বলছে! জায়গাটা ব্যথায় লাল বর্ণ নিয়েছে। ভাবনার মাঝেই নিজের পেটে ও বুকে পুরুষালি হাতের স্পর্শ পায় পৌষ।
কেঁপে উঠে ও। আর পৌষ এটাও জানে ব্যাক্তিটি আর কেউ নয় পার্বণ। খেঁক করে উঠলো পৌষ। নিজের গায়ের উপর থাকা পার্বণের হাতের উপর হাত রেখে আয়না দিয়েই পার্বণের দিকে তাকালো পৌষ।যে কিনা পিছন থেকে পৌষকে জড়িয়ে ধরে আছে।

— ছাড় পার্বণ। এখন একদম নয়।
— উহু। তা বললে তো শুনবো না।
— বেয়াদব দেখ একবার তুই কি করেছিস?
আয়নার মধ্যে দিয়েই নিজের করা চিহ্ন গুলো দেখলো। যা পৌষের শরীরে চিক চিক করছে। পৌষের চোখের দিকে তাকিয়েই বলল,
— বিবাহিত মহিলাদের এরকম একটু আকটু চিহ্ন থাকেই। নাহলে চলে না। স্বামী আছে অথচ শরীরে চিহ্ন থাকবে না তা আবার হয় নাকি!
তারপর পৌষকে ছেড়ে দিয়ে ওকে নিজের দিকে ফিরায়। পৌষের পায়ের কাছে এক হাটু গেড়ে বসে ওর পেটের উপর মাথা দেয় পার্বণ।
চোখ বুজে রেখে শ্বাস নেয়। উপলব্ধি করে কিছু। হয়তো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অনুভূতি বাবা হওয়ার অনুভূতিটার সাথে সুখের সাগরে পাড়ি জমায়। একটু ফুলেছে পৌষের পেট খানা।
পৌষ এমনিতেই চিকন। তার এই অল্প পেট ফুলায় এখনো তেমন কিছুই বুঝায় না। এবারে বেশ সময় নিয়ে পৌষের পেটে চুমু খায় পার্বণ।
তারপর নিজের মতো করেই বলতে লাগে,

— বাবা তোমার আসার প্রহর গুনছে আমার বাচ্চা। তোমার বাবা যতই ভণ্ডামি করুক সে কিন্তু তোমার জন্য বেস্ট বাবা হবে। হ্যা তবে তোমার বাবা কিন্তু বাকি বাবাদের মতো হবে না। তোমার মাকে যেমন জ্বালায় তোমাকেও জ্বালাবে কিন্তু তোমার মায়ের থেকে কম। তোমার মাকেই বেশি জ্বালাতে আমার ভালো লাগে।
পার্বণের চুলের ভাঁজে হাত বুলায় পৌষ। ইদানিং এমন হুট হাট কাজ গুলো করছে পার্বণ। পৌষের খুব ভালো লাগে। মা হওয়ার মধুর এই সাধ ওর কাছে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।
পৌষের মুখে দেখা মিলে তৃপ্তির হাসি। সেই সাথে ওদের দরজার আড়ালে থাকা বাড়ির বাকি সদস্যদের মুখেও সন্তুষ্টমূলক হাসি।
ফাল্গুন প্রথমে এসে পার্বণের এমন নিজের অনাগত সন্তানের সাথে কথা বলার দৃশ্য দেখেই চোখ দুটো জুড়িয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ বাকিদের ডাকলে তারাও এই দৃশ্য দেখার লোভ সামলাতে না পেরে হাজির হয়।

রেগে পুরো বোম হয়ে আছে পৌষ। আর রাগবে না। পার্বণের চারপাশে কতোগুলো পিঁপড়া ঘুরঘুর করছে।
আর এই ছেলেটাকেও আজ এতো সুন্দর করে আসতে হলো!কই পৌষ যখন সাজতে নিলো তখন পার্বণের সাফ সাফ কথা।
— পৌষ ভুলেও সাজবি না। তোর দিকে কারো চোখ জানি না পড়ে।
এসব ঢঙের কথা বলে নিজে ফিটফাট আর পৌষকে সদর ঘাট বানিয়ে নিয়ে এসেছে। এতক্ষন সব মানা গেলেও একটু আগের কাহিনী পৌষ মোটেই মানতে পারলো না।
পৌষ দাড়িয়ে ছিলো পূর্ণা আর বনচাঁপা আসেনি ওরা এখনো সুস্থ হয়নি। তো একটা মেয়ে কোথা থেকে এসে পৌষের হাতে একটা লেটার গুঁজে দিয়ে বলে,
— তুমি তো পার্বণের কাজিন না?
পৌষ মুখ চোখ শক্ত করে জবাব দিলো,

— হ্যা।
— এই লেটারটা ওকে একটু কষ্ট করে দিয়ে দিও প্লিজ। আসলে ও আমার টেক্সটের কোনো রিপ্লাই দেয় না সিন করে না। তুমিই বলো নাহয় এই যুগের মেয়ে হয়ে আমি কিনা দিবো লেটার!
লেটার দিয়েই পগারপাড় মেয়েটা। এই মেয়েকে ঠিক চিনতে পারছে না পৌষ। হয়তো আর্স কিংবা কমার্স এর কেউ। কিন্তু এই মেয়ে পার্বণের নাম জানলো কেমনে সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
মনে মনে এসব ভেবেই যেই না চিরকুটটা খুললো অমনি পৌষের দুই কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়া আরম্ভ করলো। গেলো গেলো ধৈর্যের শেষ বাঁধটাও ভেঙ্গে গেলো পৌষের।
ও চিৎকার করে ডেকে উঠলো ওর থেকে কিছু দূরে মাঠের মাঝে দাড়ানো পার্বণকে।

— পার্বণণণণ!!
পৌষ এতদিন না আসলেও পার্বণ এসেছিলো কলেজে। আর ছেলে মানুষ তো অল্প তেই সবার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলে। আর পার্বণের কথা নাই বা বলি।
এই ছেলে ভাব জমাতে ওস্তাদ। রাস্তায় যাকেই দেখো সেই কিছুক্ষনের মধ্যেই সে তার জিগরি দোস্ত।
পৌষ যেখানে টিচার দের ভালো মতো চেনেও না সেখানে পার্বণ এদের চিকুঠি গুষ্টি জেনে বসে আছে। আবার পার্বণকে সব টিচার চেনে তাও ভালো ভাবেই।
সুতরাং অনুষ্ঠানের আয়োজনের ভার কিছুটা হলেও পার্বণের কাঁধে এসে পড়ে। ও সেই নিয়েই টিচারের সাথে কথা বলছিলো তখনই পৌষের চিৎকার শুনে ঘাবড়ে যায়।
আগ পিছ না ভেবেই দৌড়ে পৌষের কাছে যায়। এক দৌড়ে আসার কারণে হাপিয়েও যায়। হাঁপাতে হাপাতে উদিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করে,

— কি হয়েছে জান? কোনো অসুবিধা হচ্ছে? কোথায় কষ্ট হচ্ছে। আমাকে বল পাখি।
তারপর পৌষকে টেনে ছায়া জায়গায় দাঁড় করায়। পকেট থেকে রুমাল বের করে ওর মুখের ঘাম মুছিয়ে দেয়।
দ্রুত পানি বের করে বলে,
— একটু পানি খা।
পানির পিপাসা লাগায় পৌষ পানি খেয়ে নেয়। ব্যাগের চেইন খুলে সেখান থেকে একটা খাতা বের করে তারপর সেটা দিয়ে পৌষকে বাতাস করতে করতে শুধায়,
— এখন বল তোর কি সমস্যা হচ্ছে? একদম চুপ থাকবি না পৌষ।
— আরে বাবা আমাকে বলতে তো দে।
— হু বল।

পৌষপার্বণ পর্ব ২৮

হিজাবের তলা থেকে চুল বেঁধে রাখা ক্লো ক্লিপটা একটানে খুলে ফেলে পৌষ। ক্লিপটা মুখ দিয়ে ধরে রেখে তারপর ছেড়ে রাখা চুলগুলো হাত খোপা করে নেয় পৌষ।
মুখ থেকে ক্লো ক্লিপটা নিয়ে সেটা এগিয়ে গিয়ে পার্বণের শার্ট এর সাথে আটকে দেয়। এতক্ষন ধরে পৌষের কাজ দেখছিলো।
যখন দেখলো পৌষের চুলের ক্লিপ ওর শার্ট এ আটকাতে তখন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে। পৌষ আদেশের স্বরে ওকে বলে,
— খবরদার পার্বণ এটা জানি তোর শার্ট থেকে না খুলে।
এতো সময় পর বুঝলো মেডামের আসল কাহিনী। হেসে ফেললো ও। এটা যে পার্বণের প্রাপ্তির হাসি।

পৌষপার্বণ পর্ব ৩০

2 COMMENTS

  1. পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি প্লিজ 🫶🫶🫶💗💗❤️❤️👏👏👌👌

  2. পরের পর্ব কবে দেবেন 🫶🫶🫶❤️❤️❤️

Comments are closed.