পৌষপার্বণ পর্ব ৩০
Irfa Mahnaj
কাজিন বিয়ে করলে অনেকগুলো সুবিধা থাকে। তার মধ্যে একটা এই যে বউকে যেহেতু তুমি ছোট থেকেই দেখে আসছো তাই বউয়ের রগে রগে তোমার চেনা। বধূ যে তাহার হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করেই তাহার নিজস্ব মেয়েলি অলংকারটি বস্রে স্থাপন করিয়াছে এটুকু বুঝবার মতো জ্ঞান পার্বণ নামক কিশোরের আছে।
পৌষ শুধু নিজের ক্লো-ক্লিপ পার্বণের শার্ট এ আটকেই ক্ষান্ত হয়নি। বারবার সাবধান ও করে দিয়েছে যাই হোক এই ক্লিপ জানি না খোলা হয়।
পার্বণের একমাত্র আদরের বউটা কিছু বলেছে আর পার্বণ তা মানবে না এও আবার হয় নাকি? উঁহু একদমই না। এই যে পুরো কলেজ এদিক সেদিক ঘুরে কাজ করছে একবারের জন্য ও পৌষের ক্লিপ শার্ট থেকে খুলেনি।
কেউ কেউ মিটিমিটি হেসেছে তো কেউ টিপ্পনী কেটেছে। পার্বণের অবশ্য এসব গায়েই লাগেনি। সে দিব্যি কলেজ ঘুরেছে সে অবস্থাতেই।
এখন এই এতক্ষন পর ফ্রি হয়ে বসেছে। একটা গাছের ছায়ায় বসে আছে সে আর পৌষ। পৌষের কোলের উপর সিঙ্গারার পলিথিন।
একটা নিজে খাচ্ছে আরেকটা পার্বণকে খাইয়ে দিচ্ছে। পার্বণ ও লক্ষী ছেলের মতো বউয়ের হাতে খাচ্ছে। আর ফোন টিপছে।
পার্বণের বড় চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। শার্ট ঘামে শরীরের সাথে গায়ের সাথে সেটে আছে। পৌষ ও ঘেমে গেছে। ঘামের বিন্দু বিন্দু কণা আবার নাকের ডগায় চিকচিক করছে।
সিঙ্গারা খাওয়া শেষ তবুও বসে আছে। চোখ বুজে দুই হাত পিছনে ঠেলে বসে আছে পৌষ।তখনই শুনতে পেলো পার্বণের ফিচেল স্বরের বাণী,
— মেয়েদের নাক ঘামালে নাকি তাদের স্বামী তাদের বেশি আদর করে।
ফট করে চোখ খুলে পাশে ফিরতেই দেখলো পার্বণ ফোন পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে কথাটা বলছে। চোখে তার খেলা করছে দুস্টুমি।
ভ্রু কুঁচকে গেলো পৌষের। ও শুধালো,
— তোকে এসব আজগুবি কথাবার্তা কে বলেছে?
— মুরব্বিরা বলেছে। তাছাড়া কথা কিন্তু ঠিক তুই কি বলিস?
কুঁচকানো ভ্রু আরো একটু কুঁচকে গেলো। প্রশ্ন করলো পৌষ।
— কিভাবে ঠিক?
— নিজের দিকে তাকা। ভালোবাসার ঠেলায় বাপ হয়ে গেছি! তাহলে বোঝ কি পরিমান ভালোটাই না তোকে বেসেছি।
পৌষের কুঁচকানো ভ্রু শিথিল হলো। কপোলদয় লালিমায় ছেয়ে গেলো। লজ্জা মাখা কণ্ঠে বলল,
— অসভ্য একটা।
গা দুলিয়ে হেসে উঠলো পার্বণ। তারপর হাসতে হাসতেই নিম্নওষ্ঠ কামড়ে ধরলো সে।পৌষের দিকে তাকিয়েই একটা চোখ মারে। আরেকটু এগিয়ে পৌষের গায়ের সাথে গা বাজিয়ে বসে। পৌষের কানের কাছে মুখ নিয়ে খালি গলায় গেয়ে ওঠে গানের কয়েকটা লাইন,
“অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে, তাই
কাছে আসো না আরো কাছে আসো না
শসসহঃ..কথা বলো না, কোন কথা বলো না,
অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে, তাই
কাছে আসো না, আরো কাছে আসো না
পাশে বসো না, কোন কথা বলো না
অভদ্র হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে, তাই”
— উফ তুই গেলে যা না রে আমাকে কেনো টানছিস?
বসন্তের বিরক্ত মাখা গলা শুনেও বিশেষ পাত্তা দিলো না হেমন্ত। উল্টে থ্রেট দিলো,
— তুই আমার সাথে যাবি কিনা বল?
— যাবো না।
— বেশ তবে আমি মাকে বলছি তার ছেলে আকাম কুকাম করে বেড়ায়।
মুল ঘটনা হয়েছে বনচাঁপা তো অসুস্থ এখন ওকে দেখতে হেমন্ত যাবে। তবে হেমন্ত একলা গেলে কেমন দেখায় না? তাই বসন্তকেও সঙ্গে নিয়ে যাবে বলে ঠিক করে।
এদিকে বসন্ত যাবে না জানায়। তার বক্তব্য তুই যাবি যা না। আমাকে মাঝখানে টানছিস কেনো! আশ্চর্য! বার্গারের লেটুস পাতা হওয়ার শখ বা ইচ্ছা কোনোটাই বসন্তের নেই।
হেমন্তের থ্রেট শুনে চোখ ছোট ছোট করে তাকায় বসন্ত। তারপর তাকে শুধরে দিয়ে বলে,
— আকাম কুকাম না ওটাকে রিলেশন বলে।
— বড় ভাইয়ের মুখে মুখে কথা বলিস আবার দিবো কানের নিচে একটা। এক থাপ্পড়ে কোমায় চলে যাবি।
— এটা কে কি তোর ইন্ডিয়ান সিরিয়াল মনে হয়? থাপ্পড় খেয়ে কেউ কোনো দিন কোমায় যায় শুনেছিস?
— কেউ শুনেনি তোকে পাঠিয়ে আমিই সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো। আর বড় ভাইয়ের উপর কথা বলতে নিষেধ করলাম না তোকে?
— এহ! আইছে আমার বড় ভাই। এতো বড় ভাই মারাইস না তো। ভুলে ডাক্তার শা*লায় তোর মাথাটা আগে বের করছে কিন্তু দুইজনের বডি তো একসাথেই বের করছে।
— শোন মাথা বের করুক আর পা*ছা বের করুক করছে তো!
— ওই হা*লা*রপুত রে পাইলে আমি ওর ঝিঙ্গালালা কইরা দিতাম।
অগত্যা হেমন্তের থ্রেট আর মায়ের সেদিনকার টয়লেটের ঝাড়ু দিয়া পিটানের কথা মনে করে শেষ মেশ বসন্ত ভাইয়ের সাথে যাওয়ার জন্য রাজি হয়। কি আর করার বসন্তের কপাল টাই তো ফুটা কপাল!
বসন্তের রাজি হতেই হেমন্ত ওকে বগলদাবা করে রওনা দেয় বনচাঁপাদের বাড়ির দিকে। কতক্ষন হয়েছে সে বনচাঁপাকে দেখেনি। অথচ সকালেও ঘুম থেকে উঠে নিজের বেলকুনি দিয়ে বনচাঁপাকে দেখা হেমন্তের হয়ে গেছে।
তখন পার্বণের গান শুনেই বেচারি পৌষ হাঁসফাঁস করতে করতে উঠে যায়। ও উঠে গেলেই আরেক দফা হাসে পার্বণ।
এখন আপাতত কেউ নেই। তাছাড়া পৌষকে নিয়ে পার্বণ কলেজের শান্ত আর নিরিবিলি পাশেই এসে বসেছিলো। এসবই ভাবছিলো পার্বণ।
ঠিক সেসময় সেখানে এসে উপস্থিত হয় একটা মেয়ে। লাজুক লাজুক চোখে তাকায় পার্বণের দিকে। আবেগী হয়ে মিষ্টি মধুর গলায় যেইনা ভালোবাসার কথাটি বলতে যাবে অমনি পার্বণ কপালে ভাঁজ ফেলে বলে উঠে,
— মিরগির বেড়ামে ধরছে নাকি কিড়মিতে পেটের মধ্যে খোঁচা মারছে? কোনটা?
যদি তুমি একঝাঁক জল্পনা কল্পনা করে তোমার ক্রাশকে প্রপোজ করতে গেলে এবং সে তোমাকে যদি মিরগি রোগী বলে তখন কেমন লাগে? মিরগি রোগী ও ঠিক আছে তাই বলে শেষে কিনা কিড়মি! ইয়াক! ছি!
মেয়েটা কাঁদো কাঁদো স্বরে প্রতিবাদ করে উঠলো। জানালো,
— ইয়াক পার্বণ আমি তোমাকে ভালোবাসি এটা বলতে এসেছি আর তুমি? ইয়া আল্লাহ! ছি!
পার্বণের কথা শুনেছে কিনা কে জানে তবে মেয়েটার পার্বণকে ভালোবাসার কথাটা বলতে ঠিকই শুনে ফেলে পৌষ। মেয়েদের কান বলে কথা! নিজের জামাই বা বফকে যদি এসব প্রেম পিরিতের কথা বলে কেউ সেটা ৬০ মাইল দূর থেকেও কান খাড়া করে ঠিক শুনে ফেলবে।
পৌষের রাগে লাল হয়ে যাওয়া চোখ মুখ দেখে হাসি আসলো পার্বণের। পৌষ জেলাস পার্সোন। ওর জেলাসি ব্যাপক। নিজের জিনিসের প্রতি তো তা আরো বেশিই।
এগুলো জানা আছে পার্বণের। ওর নিজের মাথার পিছনে চুলকে সুন্দর ভাবে মেয়েটিকে রিজেক্ট করে দিলো,
— দুঃখিত আপনি ভুল নাম্বার ডায়েল করেছেন। বহু আগে থেকেই এই পার্বণ আরেকজনের নামে বুকড। এই যে আমার শার্ট এ যে ক্লিপ দেখতে পাচ্ছেন সেটা সেই হিংসুটে মেয়েটির যে এখন ঠিক আপনার পিছে দাঁড়িয়েই মুখ ফুলিয়ে আছে আর ফুসছে!
পার্বণের বলা কথাগুলো পৌষের জ্বলে যাওয়া বুকে এক পশলা বর্ষণের কাজ করলো। তবে রাগ পুরোপুরি গেলো না। হিংসুটে মনোভাবটা রয়েই গেলো।
মেয়েটি পার্বণের কথানোযায়ী পিছনে ফিরলো। তাকে পিছে ফিরতে দেখেই ধুপধাপ পা ফেলে পার্বণ আর মেয়েটির সামনে আসে পৌষ।
এখানে কেউ নেই। কলেজের এই পাশটা নীরব। মানুষের আনাগোনা কম থাকে। যা বর্তমানে শূন্যর কোঠায়!পার্বণকে কিছু বলতে না দিয়ে পৌষ হুট করে ওর গালে একটা চুমু এঁকে দিলো। এক চোখ খুলে সামনে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারলো।
অর্থাৎ মেয়েটিকে বুঝালো যে এটার বুকিং অনেক আগেই হয়ে গেছে। তুই দূরে গিয়ে মুড়ি খা! পার্বণকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— দাড়া তোকে সিল মেরে দেই।
এই বলেই আলতো একটা কামড় বসায় পৌষ। পার্বণ বেচারার মুখটা দেখার মতো হয়েছে। ওর চোখের আকৃতি স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হয়ে গেছে। অবাকতার রেশ ওর চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠে।
যে ছেলেটা সবাইকে শকে ফেলে আজ সেই বড় সর একটা শকড পেয়ে বসে আছে। মিনিট খানেকের মতো এভাবেই থম মেরে দাড়িয়ে থেকে অস্ফুটে আওড়ালো,
— এটা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন!
পরপরই পার্বণের ঠোঁটের আগায় দেখা মিললো একটুকরো সন্তুষ্টি মিশ্রিত হাসির।পৌষের কানের নিকট মুখ এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— দ্যাটস লাইক মাই উইমেন। একেবারে জেলাস কিটেন! উপস!সরি, জেলাস বি। পার্বণের জেলাস কুইন বি!
বসন্তের বর্তমানে নিজের ভাইয়ের উপর এতো পরিমান রাগ লাগছে কি যে বলবে। মন চাচ্ছে চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। অবশ্যই হেমন্তের। নিজের চুল টেনে ছিড়লে তার আম্রপালির কি হবে! না বাবা না।
হেমন্ত তো তাকে এক প্রকার জোর খাঁটিয়েই নিয়ে এসেছিলো বনচাঁপাদের বাড়ি। তুই তোর জান, গিলা, কলিজা, ফুসফুসরে দেখতে আসবি বেশ ভালো কথা। তুই কেন আমারে ফাসাবি? কেনো?
দরজা খুলে বকুল যখন জিজ্ঞেস করে তারা এসময় এখানে কি করছে? হুট করেই হেমন্ত উত্তর দেয়,
— আন্টি বসন্ত আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলো তাই আসলাম।
কথাটা বসন্তের মাথায় প্রসেস করতেও ২ মিনিট লাগছে কিন্তু ততক্ষনে দেরি হয়ে গেছে। হেমন্ত ওর পাতিলে থাকা মান ইজ্জত কাছাইয়া মাছাইয়া রোস্ট করে দিছে।
তারপর কি হইলো বনচাঁপার ঘরে এসে ঢুকেই বসন্তের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলে কিনা দরজার সামনে দাড়িয়ে পাহারা দে!আশ্চর্য! বসন্ত কি দারোয়ান নাকি!
আর বান্দা সেই যে ঢুকছে কি যে এমন কথা বলে আল্লাহ মাবুদ জানে! বেরই হয় না। আজ বাড়িতে আন্টি থাকায় রক্ষে। সেও আবার বসন্তরা আসতে বাহিরে গেছে কাজে।
বকুল বেশি একটা চিন্তা করলো না হেমন্তদের নিয়ে। ছোট পোলাপাইন। বনচাঁপার তো ছোট ভাইয়ের মতোই এরা দুটোয় এতো চিন্তা করার আর তাই কিছু নেই। যদি বড় কেউ আসতো কিংবা বনচাঁপার বয়সি তাহলে হয়তো বা বকুল চিন্তা করতো।
থেকে যেতো। সেরকম তো কিছুই না। মানে বকুল হেমন্তদের গোনায়ই ধরেনি। কিন্তু বেচারি তো আর জানে না বাকিদের থেকে এদের কাছেই মেয়ের বিপদ বেশি।
এরা যে ছোট প্যাকেট বড় ধামাকা সেটা তো বুঝেনি। উনি যদি জানতেন সে যাকে বনচাঁপার ছোট ভাই বলে গোনাতেও ধরছে না সেই হেমন্ত তলে তলে উড়োজাহাজ চালাচ্ছে!
তার মেয়ের পিছে চিপকে আছে। প্রেম করতে চাইছে এমনকি বিয়ে পর্যন্তও চলে গেছে!
— রোজার ঈদ গিয়ে কুরবানীর ঈদ চলে এসেছে এবার তো হ্যা বলে দেও। আমার কি এবারেও কাপল ডিপি দেওয়া হবে না?
অসহায় হয়ে বলা হেমন্তের কথা শুনে বনচাঁপা কি রিঅ্যাকশন দিবে সেটাই ভুলে গেছে। বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলো হেমন্ত নামক এই ছেলের দিকে।
মানুষ রোগী দেখতে আসে ফল নিয়ে এটা সেটা নিয়ে। হাল চাল জিজ্ঞেস করে। কিন্তু এ ব্যাটা তো সোজা ঈদ এ কাপল ডিপি দিতে পারবে না সেই কথা নিয়ে চলে এসেছে।
অধিক উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে বনচাঁপা বলে বসেছে আরেক ভুলভাল কথা।
পৌষপার্বণ পর্ব ২৯
— শুধু এই ঈদ কেনো সামনের বারের ঈদেও আমার উত্তর হ্যা থেকে না হবে না। কাপল ডিপি দিতে চাইলে কতো ট্রিক্স আছে সেগুলো এপ্লাই করো।
কথাটা বলেই জিভ কাটলো বনচাঁপা। বুঝতে পারলো কতোবড় বোকামি করেছে। “না” এর জায়গায় “হ্যা” এবং “হ্যা” এর জায়গায় “না” বলে দিয়েছে সে।

পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি প্লিজ 🫶❤️❤️🔥💭💭💭