প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৩ (২)
আরাফাত আদনান সামি
সময়টা ছিল খুব অল্প, কিন্তু স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মতো এক গভীর মুহূর্ত ছিল সেটি।মেলায় কৌশিকের সাথে কাটানো সেই সন্ধ্যাটা যেন মায়ার জীবনের এক অনির্বচনীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। আলো-ঝলমলে মেলার ভিড়ের ভেতরেও মায়ার চোখে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা, এক অনির্দিষ্ট হারিয়ে যাওয়া ভাব।
কৌশিক মায়ার সেই স্থির চাহনির অর্থ বুঝে উঠতে পারছিল না। হঠাৎ সে মৃদু হাসল, তারপর হঠাৎ করেই মায়াকে নিজের দিকে টেনে নিল এক আকস্মিক টানে। মৃদু বাতাসে মায়ার চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল তার গলা, গাল আর ঠোঁটের কোণে। কৌশিকের আঙুলের ডগা ছুঁয়ে ছুঁয়ে সরিয়ে দিচ্ছিল সেই চুলের গোছাগুলো তারপর চোখে চোখ রেখে নিচু, শান্ত স্বরে বলল,
“ওহে, আমার মায়াবতী! এইভাবে কী দেখছিস শুনি?”
কৌশিক ভেবেছিল, হয়তো মায়া লজ্জায় মুখ নামিয়ে ফেলবে, কিন্তু না। বরং সে দৃঢ়ভাবে কৌশিকের গলা জড়িয়ে ধরল, যেন সময়ের স্রোত থেমে গেল সেই স্পর্শে।কৌশিকের ঠোঁটের কোণে এক প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল। সে মায়ার কানে কানে বলল,
“ভালোবাসি তোমায় মায়াবতী, খুব ভীষণ ভালোবাসি।”
মায়া কৌশিকের বুকের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে লাজুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“তা কতটুকু ভালোবাসেন আপনি আপনার মায়াবতীকে?”
কৌশিক মায়ার মুখ দু’হাতের মুঠোয় তুলে তার কপালে এক দীর্ঘ, কোমল চুম্বন রাখল। চোখ নামিয়ে বলল,
“জানি না কতটা পরিমাপে মাপে বোঝানো যায় ভালোবাসা, তবে এতটুকু জানি,
মা-বাবার চেয়ে একটু কম, কিন্তু নিজের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসি আমি আমার মায়াবতীকে।”
মায়ার মুখ তখন যেন লজ্জার রঙে লালচে পাকা আপেলের মতো। নাকের ডগায় সেই লজ্জার ছোঁয়া এসে কৌশিকের চোখে পড়তেই সে মৃদু হেসে বলল,
“এই, এই, এত লজ্জা পেতে হবে না। রাত অনেক হয়েছে, এবার বাসায় যাবি না?”
‘বাসা’ শব্দটা শুনেই মায়া যেন চমকে উঠল। মুহূর্তেই গলায় আতঙ্কের সুর,
“আরেহ্ হ্যাঁ! তারাতাড়ি আমাকে বাসায় পৌঁছে দিন কৌশিক ভাই, আজ মনে হয় আমার কপালে শনি আছে!”
কৌশিক আর কিছু বলল না, শুধু নরম হেসে বাইকের দিকে এগোল। গ্যারেজ থেকে বাইকটা বের করে মায়াকে উঠতে ইশারা করল। মায়া বাইকের পেছনে বসতেই স্বভাবসিদ্ধ ভয় তাকে ঘিরে ধরল শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কৌশিকের পিঠ। বাতাস কেটে বাইক এগোচ্ছিল অন্ধকারের বুক চিরে। রাস্তা খানাখন্দে ভরা, ফলে বারবার ধাক্কা খেতে হচ্ছিল। মায়া ভয় পেয়ে বলল,
“একটু আস্তে চালান, কৌশিক ভাই! ভয় লাগছে ভীষণ।”
কৌশিক শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
“আস্তেই তো চালাচ্ছি।”
মায়া প্রতিবাদ করে বলল,
“আস্তে চালাচ্ছেন? তাহলে এত ঝাঁকুনি খাচ্ছি কেনো?”
কৌশিকের কৌতুকপূর্ণ জবাবে বলল,
“রাস্তা যে অনেক সুন্দর তাই!”
“রাস্তার দোষ দিচ্ছেন কেনো? চালাতে পারেন না, সেই দায় রাস্তার উপর চাপাচ্ছেন?”
কৌশিক আড়চোখে তাকাল মায়ার দিকে। তার সেই দৃষ্টি দেখে মায়া ভড়কে গিয়ে বলল,
“এই এই, কী করছেন! পরে যাবো তো সামনে তাকান!”
কৌশিক দাঁতে দাঁত পিষে হেসে বলল,
“আমি বাইক চালাতে পারি না, তাই না? খুব কথা বেড়েছে আজ, চুপ না করলে এখানেই নামিয়ে রেখে চলে যাব।”
তারপর আর কেউ কিছু বলল না। নীরবতা নেমে এলো তাদের মাঝখানে। শুধু বাতাসের শব্দ আর রাস্তার গর্জন।একসময়ে মায়া নিস্তব্ধতা ভাঙল নিজের মজার ছলে,
“দেশটাই তো ভাঙাচোরা, আবার সেই দেশের রাস্তা ভালো থাকবে কীভাবে! এই ভাঙ্গাচুরা দেশটারে কোন কটকটি ওয়ালাও কিনবে না! না হলে এতদিনে এই ভাঙ্গাচুরা দেশটারে ভাঙ্গারি দোকানে বিক্রি কইরা কটকটি কিনে খেয়ে হজম করে ফেলতাম।”
কৌশিক হঠাৎ হেসে উঠল জোরে। মায়া বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এই হাসছেন কেনো? ভুল কিছু বললাম?”
“না..!”
শুধু একটুকরো শব্দ ফেলে কৌশিক বাইক চালিয়ে চলল।
মায়া আবার বলল,
“আচ্ছা বলুন তো, আপনি কোন দল সাপোর্ট করেন? আওয়ামী লীগ,বিএনপি, না শিবির?”
কৌশিক বাইক চালাতে চালাতে নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল,
“না আমি আওয়ামী লীগ, না বিএনপি, না শিবির,আমি শুধু আমার বিবির।”
মায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“বিবি হইনি এখনো।”
“এই তো আর হাতে গোনা কয়েকটা মাসের অপেক্ষা।”
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৩
এভাবে হেসে-খেলে, বাক্যালাপে কখন যে বাইক পাটোয়ারী বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, কেউ টের পেল না। রাত তখন অনেক গভীর। মায়া নেমে পড়ল বাইক থেকে, মৃদু হেসে স্বাভাবিক ভাবে কৌশিককে বিদায় জানিয়ে তারাতাড়ি গেইটের ভেতরে ঢুকে গেল।কৌশিক বাইকের উপর বসে রইল কিছুক্ষণ। যতক্ষণ না মায়ার ছায়াটাও অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বাইক স্টার্ট করে সে রওনা হলো নিজের বাড়ির পথে।
