প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৪
আরাফাত আদনান সামি
রাত কেটে ভোর হলো। শীতের সকাল,আটটা বেজে ত্রিশ মিনিট। চারদিকে নরম কুয়াশার চাদর বিছানো, যেন কেউ চারিপাশে সিটিয়ে রেখেছে সাদা তুলোয়। ঘাসের মাথায় পানি জমে থাকা স্বচ্ছ বিন্দুগুলো সকালের আলোয় মৃদু ঝিলমিল করে উঠছে। চারিপাশে হালকা ঠান্ডা বাতাসে। গতরাতের মায়ার সাথে দুষ্টু-মিষ্টি খুনশুটি শেষে নিজের রুমে এসে শুয়ে কৌশিক কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, সে নিজেও টের পায়নি। তার সেই ঘুম ভাঙেনি এখনো। ঘরের ভেতরও হালকা আধো অন্ধকার, জানালার ফাঁক গলে ঢুকে আসা আলোটুকু কুয়াশায় নরম হয়ে গেছে।ঠিক তখনি ঘড়ির প্রথম এলার্ম যেন ভোরের নীরবতা চিরে ফেলে। চমকে উঠে কৌশিক সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যায় তার। একটু বিরক্ত ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নেয় সে। স্ক্রিন অন হতেই বড় বড় করে ভেসে ওঠে সময়, 9ঃ05 AM। সময় দেখেই কৌশিকের ভ্রু কুঁচকে ওঠে।
“ওফ! ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে ফেললাম!”
বলে মুহূর্তেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। তার সময় নেই। অফিসে আজ দেরি করা যাবে না। তাই সাইট থেকে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে দ্রুত সাওয়ার নিতে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায় কৌশিক।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
একিকে সেই সকাল সাতটা বাজে মায়া ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে এসেছে রান্নার ঘরে। তার মামিদের সাহায্য করতে। তার পড়নে পাতলা নীল শাড়ি।পেঁয়াজ বাটা শেষ করে সে ঘুরে দাঁড়াল তার বড় মামির দিকে।মায়ার কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞাসু সুরে বলল,
“বড় মামি, আর কিছু বাটা লাগবে?”
সবজি কাটতে কাটতে মাহিমা চৌধুরী মায়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি ছুঁড়ে বললেন,
“না মা, আর লাগবে না। তুমি গিয়ে হাত ধুয়ে এসো।”
মাহিমা চৌধুরীর কথা মতো হাত ধুয়ে এসে সাথে সাথে মায়া দ্রুত বলল,
“বড় মামি, আজ আমি রান্না করি?”
কথাটা শুনে পাশ থেকে সায়েরা চৌধুরী অবাক হয়ে মুখ তুললেন।
“ওমা কেনো? এত কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। অনেক কিছুই করেছ তুমি। আমার মেয়ে হলে এতক্ষণে মুখ পুছে না করে বসে থাকত!”
মায়া মৃদু হাসল।
“ছোট মামি, তিয়াশা এখনো ছোট। আর কয়দিন যাক, সব ঠিকই শিখে যাবে।”
সায়েরা চৌধুরী মুখটা খিচে বললেন,
“ও আবার বুঝবে? যদি এমন কিছু হতো! সব দোষ তোমার ছোট মামার। লায় দিয়ে মাথায় তুলেছে। কিচ্ছুটি বলা যায় না।”
পাশ থেকে মাহিমা চৌধুরী হেসে উঠলেন,
“সায়েরা, ও এখনো বাচ্চা। সময় হলে সব শিখে যাবে। চিন্তা করো না তো।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায়েরা চৌধুরী বললেন,
“হলেই ভালো। সত্যি বলছি আমি এই মেয়েকে নিয়ে আর পারছি না ভাবি।”
তাদের কথার মাঝেই মায়া আবার এগিয়ে এল, স্বরে অনুরোধের স্পষ্টতা,
“বড় মামি, আজকে আমি রান্না করি,প্লিজ!”
মাহিমা চৌধুরী এবার একটু থমকে মেয়েটার দিকে তাকালেন।
“এত রান্না তুমি একা কী করে করবে মা?”
মায়া হাসিমুখে বলল,
“আমি পারব বড় মামি। সব সামলে নেব। আপনি আর ছোট মামি রুমে গিয়ে একটু বিশ্রাম করুন।”
মায়ার দু’জন মামি একে অপরের দিকে তাকালেন। তারপর নরম স্বরে মাহিমা বললেন,
“ঠিক আছে। তবে কোন দরকার হলে আমাকে বা তোমার ছোট মামিকে ডাক দিও কেমন।”
মায়ার চোখে ঝলমল করে উঠল খুশির আলো।
“ঠিক আছে বড় মামি।”
মায়ার কথা শেষ হতেই মাহিমা চৌধুরী আর সায়েরা চৌধুরী দু’জনেই নিজেদের রুমের দিকে চলে গেলেন। তারা চলে যেতেই মায়া শাড়ির পাতলা নীল আচলটা কোমরে ভাজ করে গুঁজে নিল। তারপরই দ্রুত হাত চালিয়ে কাজে লেগে গেল। সময় গড়াল। ধীরে ধীরে, ধৈর্য আর যত্ন নিয়ে, মায়া একে একে সব রান্না শেষ করল। এখন শুধু রুটি বানানো বাকি। মায়া হাঁপ ছাড়ল আবার নতুন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল।রুটি বানানোর জন্য আটা খুঁজতে লাগল সে। এত বড় রান্নাঘর কোথায় কী রাখা আছে, বোঝা দায়। হুড়োহুড়ি করে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে করতে অবশেষে আটার কৌটাটা চোখে পড়ল। কিন্তু লাভ নেই সেটা রাখা ছিল সবার উপরের থাকে। মায়া চেষ্টা করল। আবার চেষ্টা করল। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে নিজেকে যতটা পারা যায় উঁচু করল, হাতটা টেনে ধরল ওপরে। আঙুলের ডগা কৌটার গায়ে ঠেকল কিন্তু ধরার মতো ভর পাচ্ছে না। বারবার চেষ্টা করতে করতে তার কপালে হালকা ঘাম চিকচিক করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে, একটি উষ্ণ হাত হঠাৎ এসে থামল তার কোমরে। মায়া মুহূর্তেই শিউরে উঠল। শরীর কেঁপে উঠল হঠাৎ। হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে গলায় উঠে এল। ধীরে, ভয় আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি এক দ্বিধায় পিছনে তাকাল সে। কণ্ঠে কাঁপন তুলে বলল,
“এ… একি… আপনি?”
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি খুব শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ, আমি।”
মায়ার মুখ লাল হয়ে গেল আকস্মিকতায়।
“ক-কী করছেন টা কী? নিচে নামান! কেউ দেখে ফেলবে তো…”
কৌশিক এক মুহূর্তেই মায়ার কোমরটা আরও শক্ত করে ধরে আরও একটু উচুতে উঠিয়ে বলল,
“এত কথা না বলে, কী পারবি পার।”
মায়া আঁতকে উঠে হাত বাড়িয়ে কোটটা ধরে ফেলল।
“এবার নিচে নামান আমায়…”
কৌশিক ধীরে ধীরে তাকে নামিয়ে দিল। ঠিক পায়ের গোড়ালি মেঝেতে ছোঁয়া মাত্রই মায়া চোখ নিচু করে লজ্জায় ফিসফিস করে বলল,
“থ্যাংকস…”
কৌশিক দু’হাত বুকের সামনে গুঁজে, ভ্রু কুঁচকে তাকাল মায়ার দিকে।
“শুধু থ্যাংকস?”
মায়া মুচকি হেসে আড়চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে লজ্জা খেলছিল,
“হ্যাঁ, শুধু থ্যাংকস।”
কথাটা বলে সে কৌটোটা জায়গামতো রেখে ঘুরতেই, হঠাৎ কৌশিক বাড়িয়ে দিল হাত। মুহূর্তেই তার আঙুল ছুঁয়ে গেল মায়ার পেট, তারপর কোমর। শক্ত এক টানে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল সে। একচোট হোঁচট খেয়ে মায়া সোজা গিয়ে পড়ল কৌশিকের বুকের ওপর। তার শ্বাস আটকে এল, চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কৌশিকের বুকটা নিঃশ্বাসে হালকা উঠানামা করছে আর সেই শ্বাসের উষ্ণতায় মায়ার গালে জ্বালা ধরাল। কৌশিক আরো শক্ত করে তাকে কাছে টেনে ধরে মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে আনল মায়ার মুখের কাছে।
“থ্যাংকসে হবে না, আমার কিস চাই।”
মায়ার গলা শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধকধক করে উঠল হৃদস্পন্দন। চোখ নামিয়ে নিল সে, কিন্তু কৌশিকের হাতের টান থেকে বেরোনোর শক্তি পেল না। মায়া মুচড়ে উঠল। চোখে সামান্য লজ্জার ছোঁয়া, আর শরীরে কিছুটা অস্থিরতা।
“কী করছেন? ছাড়ুন আমায়,এখনো অনেক কাজ বাকি।”
“ছেড়ে দিব?”
মায়া মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ,ছাড়ুন।”
কৌশিক মায়ার মুখের দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ল। চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে বলল,
“সত্যিই ছুটতে চাস?”
“হ্যাঁ, ছাড়ুন আমায়।”
কৌশিক তার মুখের কাছে আরও এগিয়ে এসে কৌশলময়ভাবে বলল,
“তাহলে আমার এই ঠোঁটে কড়াহ্ করে একটা কিসি খা।”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিল।
“ইশ্…”
“কী হলো দে।”
“পারবো না আমি।”
“তাহলে আমিও তোকে ছাড়তে পারবো না।”
মায়া কপাল কুচকাল, চোখে সামান্য বিরক্তি আর লাজের মিশ্রণ এ বলল,
“কেউ চলে আসবে তো।”
“আসুক।”
“উফ্…!”
“উফ্ টু…!”
“ছাড়েন তো।”
“ছাড়েন তো টু।”
“আজব তো আমার কথা নকল করেন কেনো?”
“আজব তো আমার কথা নকল করেন কেনো টু।”
মায়া কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“অসভ্য।”
কৌশিক হেসে বলল,
“কিসি দে, তাহলে সাথে সাথে ছেড়ে দিব আর কথাও নকলও করবো না।”
“ইশ’শি রেহ্…!”
“কী হলো, দিবি না? না দিলে আমিও ছাড়বো না।”
মায়া ভ্রকুচকে লাজুক স্বরে বলল,
“চোখ বন্ধ করুন।”
“কেনো?”
“করতে বলছি, করেন।”
“ঠিক আছে।”
বলেই কৌশিক চোখ বন্ধ করে দিল। মায়ার ছোট্ট হাসি ফুটল, আর সঙ্গে সঙ্গে সে দু’হাত বাড়িয়ে কৌশিকের গাল আলতো করে ধরল। নিজের দিকে আরেকটু টেনে এনে, মায়া কৌতূহলের ছোঁয়ায় তার দুচোখে দুটো চুমু খেল। চুমুর সাথে সাথেই মায়া কৌমিকের গাল থেকে হাত সরিয়ে লজ্জায় নিজের শাড়ির আচলে মুখ লুকাল। কৌশিক কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল; মায়ার চিকন ঠোঁটের স্পর্শ তার মনে অচেনা উষ্ণতার ঢেউ তৈরি করে দিল।ধীরে ধীরে কৌশিক চোখ মেলে মায়ার দিকে তাকাল, আর দুষ্টু স্বরে বলল,
“ঠোঁটে না দিতে বললাম?”
মায়া ভ্রকুচকে উত্তর দিল,
“একটা চাইছিলেন, দুটো বুঝেন? দু’দুটো দিছি, এবার আমাকে ছাড়ুন।”
“কিন্তু আমি তো আমার ঠোঁ…”
মায়া সঙ্গে সঙ্গে কৌশিকের ঠোঁটে তার আঙুল আলতো করে রেখে বলল,
“প্লিজ কৌশিক ভাই, অনেক হইছে,এবার আমাকে ছাড়ুন, অনেক কাজ বাকি আছে।”
কৌশিক ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে দিল। ঠোঁট থেকে মায়ার আঙুল সরিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, এবারের মতো ছাড়লাম।”
বলেই কৌশিক মায়াকে ছেড়ে দিল। কৌশিকের শক্ত, পোক্ত হাতের বন্ধন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মায়া কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিল। এক ঝলকে সে ঘ্রাণ নিল কৌশিকের উপস্থিতির উষ্ণতা, আর কৌশিক হালকা হাসি মুখে বলল,
“তা তুই এখানে! না মানে, তুই রান্না ঘরে কী করছিস?”
“কেনো, এখানে আসতে পারি না?”
“হ্যাঁ অবশ্যই, আচ্ছা, আম্মু আর কাকি কোথায়?”
মায়া আটার কোটটা খুলে, আটা একটা বাটিতে রাখার কাজ করতে করতে বলল,
“এখানে কেউ নেই।”
“তা তো দেখতেই পাচ্ছি কিন্তু কেনো?”
“কারণ আমি বড় মামি আর ছোট মামিকে রুমে পাঠিয়ে দিয়েছি তাই।”
“কেনো সেটা তো বলবি নাকি?”
মায়া গ্যাসের চুলা থেকে আগে থেকে গরম পানি রাখা পাতিলটা নামিয়ে, সেখান থেকে গরম পানি একটু করে আটাতে ঢেলে বলল,
“দেখতে পাচ্ছেন না কেনো। আজকে আমি রান্না করছি, তাই এখানে কেউ নেই।”
মায়ার কথা শুনে কৌশিক বেশ আবাক হয়ে রইল। চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“কীহ্, তুই রান্না করছিস আজ?”
“হ্যাঁ।”
কৌশিক আবারও অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে বলল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি।”
“তা, কী কী রান্না করলি? শুনি।”
“এখানে যা যা দেখতে পাড়ছেন সব।”
“আম্মু, তারাতাড়ি কিছু খেতে দাও না হলে অফিসে যেতে লেট হয়ে যাবে।”
কধাটা বলে সেই মুহূর্তে, রান্নাঘরের দরজার সামনে হাজির হল রোহিত। সামনে যা দেখল, তা দেখে সে অবাক হয়ে বলল,
“একি তোমরা দুইজন এখানে?”
কৌশিক ভ্রকুচকে তাকিয়ে বলল,
“তো?”
রোহিতকে দেখে মায়া হাসি মুখে বলল,
“ভাইয়া, আপনি টেবিলে গিয়ে বসুন। আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
রোহিত বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি কেনো? আম্মু আর বড়’আম্মু কোথায়?”
মায়া হালকা লাজুক হাসি নিয়ে উত্তর দিল,
“কেউ নেই, আজকে আমি রান্না করছি তাই। আপনি টেবিলে গিয়ে বসুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
কথাটা বলার পর মায়া একটু থেমে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“আপনিও তো একটু পরে অফিসে চলে যাবেন তাই না? রোহিত ভাইয়ের সাথে আপনি গিয়ে বসে পড়ুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৩
পাশ থেকে রোহিত দুষ্টু স্বরে বলল,
“কৌশিক ব্রো, চলে আসো। অনেক দেখে ফেলছ, এত দেখো না, পরে নিজের নজর লেগে যাবে দেখো।”
রোহিতের এমন কথায় মায়া লজ্জা পেয়ে গেল। এদিকে রোহিতের কথা শুনে কৌশিক হালকা রাগভরে তেড়ে গেল,
“তবে রে….”
কৌশিককে তেড়ে আসতে দেখে রোহিত সঙ্গে সঙ্গে উল্টো দিকে ঘুরে দৌড় দিল।
