Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫
ইনান হাওলাদার

সন্তানদের কিছু কিছু শারীরিক গঠন যেমন অনেকটাই পিতা – মাতা থেকে আসে।তেমনি মা বাবার অনেক গুণাগুণ তারা পায়। এইযে আহি এত কথা বলে সেটা ওর মায়ের থেকে পাওয়া।তবে মারুফা বেগম ওর মতো অকেজো কথা বলেন না।এমনি কথা বলতে ভালোবাসেন ,একজন আলাপী মানুষ এবং খুবই আন্তরিক।
প্রতিদিনের মতো তিন জা’য়ে মিলে আজও সংসারের কাজ কর্ম করছেন।কাজকর্ম বলতে রান্না আর খাওয়া ছাড়া তেমন কোনো কাজই তো তাদের নেই।
প্রতি বেলা রান্নার সময় তিন জনে মিলে নানান খুচরো আলাপ করেন।এই যেমন সাংসারিক কথা,তার পাশাপাশি আরো নানান কথা।

নিজেদের স্বামিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে হাসাহাসি করতেও ভুলেন না।
তবে আজ মারুফা বেগম পুরোপুরি চুপ করে আছেন।গোমড়া মুখে সকল কাজ করে যাচ্ছেন।বিষয়টা লতা বেগম এবং পারভিন বেগমও খেয়াল করেছেন।কিন্তু কারণ সম্পর্কে তারা অবগত নন।আসলাম চৌধুরী আর মারুফা বেগমের দাম্পত্য জীবন অনেক ভালো।কখনো ঝ’গড়া হয় না বললেই চলে। শুধু তাদের নয় , বাড়ির অন্য দুই জোড়া দম্পতিদের মধ্যেও এসব বিষয়- আশয় নেই।
মানুষ তো আর ফেরেশতা নয়।
একজায়গায় থাকতে গেলে,সংসার করতে গেলে সকলেরই একটু মতের অমিল,কথা কা’টাকাটি হয়ে থাকে। তাদেরও হয় ।তবে খুব একটা নয়।আর হলেও কখনো মা’রাত্মক লেভেলে যায়নি।
মারুফা বেগমের এমন ব্যবহার দেখে বাকি দুই জা নিজেদের মধ্যে ইশারায় কিছু বললেন।তারপর পারভিন বেগম বললেন,

” কী হয়েছে মেজো ? তোর মন খারাপ কেন ? ”
” কিছু হয়নি বু…” বুবু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন তিনি। পারভিন বেগম বুঝতে পারলেন হয়তো তার উপরেই অ’ভিমান হয়েছে । কিন্তু কারণ সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
” কিছু হয়নি তাহলে কোনো কথা বলছিস না কেন? ”
” তোমরা তো বলছো।বলো ,আমি কে যে আমাকে কথা বলতেই হবে?”
পারভিন বেগম বোঝানোর কায়দায় বললেন,
” মনে কর, তুই কারো উপরে কোনো বিষয় নিয়ে রে’গে বা অভিমান করে আছিস। এখন যদি সেই ব্যক্তিরটাকে কিছু না বলে,না কয়ে সবটা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখিস তাহলে সে কিভাবে বুঝবে তুই রে’গে আছিস ? কী হয়েছে খোলোসা করে বল ”

” কিছু হয়নি বুবু ”
” তুই বলবি আর আমি মেনে নিবো ? ”
” না,তুমি মানবে না,কিন্তু তুমি বললেই আমি মেনে নেই।সত্যি – মিথ্যে যাচাই বাছাই করতে যাই না। ”
” হেঁয়ালি করিস না মেজো।কি হয়েছে বল ” একেবারে কাটকাট গলায় বললেন পারভীন বেগম।
” একটা সত্যি কথা বলবে ? সবসময় যে বলো আমাকে আর লতাকে তুমি ছোট বোনের মতো দেখো ,সেটা কি আদেও সত্যি? আমাকে সত্যিই তুমি নিজের বোনের মতো দেখো ? ”
” মেজো ….!” আর্তনাদ করে উঠলেন পারভিন বেগম।
” কষ্ট পেয় না বুবু ! কাল যদি লতা আর তোমার কথাবার্তা আমি শুনতে না পেতাম ,তাহলে তো আসল সত্যিটা আজও জানতে পারতাম না ”

এতক্ষণে ছোট জায়ের অভিমানের কারণ ধরতে পারলেন পারভিন বেগম।
গতকাল রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে সবটা গুছিয়ে নিজেদের শয়ন কক্ষে যাচ্ছিলেন লতা বেগম ।যাওয়ার পথে তার হঠাৎ কর্ণগোচর হয় আহির একটা কথা,
” ভালোবাসি তূর্য ভাই,অনেক ভালোবাসি । আমি জানি আপনিও ভালোবাসেন । তাহলে লুকিয়ে যাচ্ছেন কেন? ”
তিনি আর দেরি করেন না সেখানে। ছেলে – মেয়েদের কথা তিনি মা সমতুল্য চাচি হয়ে আড়ি পেতে শুনতে চান না। তখনই তিনি পারভিন বেগমের কাছে যান এবং সবটা বলেন। পারভিন বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে তূর্যের দিকটাও খুলে বলেন।কবে থেকে এসবের সূচনা।

মারুফা বেগম কোনো কারণে ড্রয়িং রুমে গিয়েছিলেন।সেখান থেকে ফেরার সময় তাদের কথা শুনে ফেলেন। তারপর আর এক মুহুর্ত দেরি না করে তূর্যের রুমের কাছে যান।
তিনি অবশ্য কিছু শুনতে পাননি।সবে মাত্র দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন ঠিক সেই মুহূর্তে তূর্য আহিকে নিয়ে বেরিয়ে আসে।যদিও তিনি আড়ি পাতার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন না।
তারপর তো তূর্যের সহজ সরল স্বীকারোক্তি নিজের কানেই শুনতে পান।কথার খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি।সারারাত জেগে কাটিয়েছেন। বাড়ির কর্তাদের কানে পৌঁছালে বিষয়টা খুব খারাপ হবে সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা,কিছুদিন আগে তিনি আহির হাবভাব লক্ষ্য করে আসলাম চৌধুরীর কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে আহি আর তূর্যের বিয়ে বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিলেন ।তখন তিনি জানতেন না তূর্য আহির জন্য এতটা পাগল,তাকে বিয়ে করতে চায়।তিনি শুধু আহির দিকটাই জানতেন বা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি আসলাম চৌধুরীকে অবশ্য আহির দিকটাও বলেননি। তূর্য – আহির দুই হাত এক করা তার নিজের ইচ্ছা সেটা বলেছেন।তাতেই আসলাম চৌধুরী অনেকটা রে’গে যান।

পারভিন বেগম মারুফা বেগমকে সবটা বুঝিয়ে বলার উদ্দেশ্যে তার হাতে হাত রাখার জন্য এগিয়ে গেলেন।কিন্তু সেই মুহূর্তে লেবু শরবতের গ্লাসটা হাতে নিয়ে মারুফা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।মাঝ সিঁড়িতে তূর্যের সাথে দেখা।অন্যদিন হলে মারুফা বেগম এগিয়ে কথা বলতেন।কফি খাবে কিনা জিজ্ঞেস করতেন।কিন্তু আজ করলেন না।তিনি যে তূর্যের উপর রে’গে আছেন এমনটাও নয়।কিন্তু কথা বলতে দ্বিধা বোধ করছেন। তূর্যকে দেখেও দেখলেন না তিনি।
আজ উল্টো ঘটনা ঘটলো।যে তূর্য প্রয়োজন ছাড়া কথা বলে না সে বলল। মারুফা বেগমের হাতে লেবু শরবত দেখে বলল,

” এখনো ওঠেনি।ডেকে ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই। ”
বলে দেরি করলো না সে । পূর্বের মতো একই কায়দায় নেমে গিয়ে সোফায় বসলো।মারুফা বেগম কিছুক্ষণ সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকলেন । মনের ভিতরে খুব অস্থিরতা অনুভব হচ্ছে। সে বড় জায়ের সাথে কোনো দিন মনোমালিন্য টুকু হয়নি।তাকেই আজকে কত কিছু বলল।এতে পারভিন বেগম অনেকটা কষ্ট পেয়েছেন ঠিকই? তারও তো খারাপ লাগছে। এসব কথা তো সে বলতে চাইনি,তবুও অভিমান থেকে বলে ফেলেছে। পারভিন বেগম যখন সবটাই জানেন তখন তাকে জানালে কি বড় কোনো সমস্যা হতো? সে কি এই সম্পর্কে বেগড়া দিতো? নাকি দিবে? তূর্যকে যে মেয়ে, স্বামি হিসাবে পাবে সে তো ভাগ্যবতী ! আর সব মায়েরাই চাই তাদের মেয়ে ভাগ্যবতী হোক। তাহলে তিনি কেন চাইবেন না ?
তূর্য ড্রয়িং রুমে আসার কিছুক্ষণ বাদে পারভিন বেগম কফির মগ হাতে আসলেন।তূর্য হাত থেকে খবরের কাগজটা রেখে মগটা নিলো। মায়ের মুখ কালো দেখে বলল,

” কী হয়েছে? ”
” তুই যেটা চেয়েছিলি,বাবা ”
” আজব! আমি কি চেয়েছিলাম? এভাবে কেন কথা বলছো?”
” কেন তুই তো চেয়েছিলি আমাদের সংসারটা ভেঙে যাক।নাহলে নিজের বোনকে কেন …..” এইটুকু বলে থেমে যান পারভিন বেগম। তূর্য নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়।কফির মগটা শব্দ করে টি টেবিলের উপর রাখে। গর্জে উঠে বলে,
” বারবার তোমাদের একই কথা মনে করিয়ে দিতে অসহ্য লাগে ,আম্মু। আর কত বার বললে বুঝবে ও আমার নিজের বোন না , কাজিন বোন। চাচাতো বোন হয় আমার! চাচাতো! ”
” চি’ৎকার করিস না। তোর বাপ ঘুমিয়ে আছে। ”
শান্ত হয় তূর্য। মোটা, গম্ভীর গলায় বলে,
” কি হয়েছে ক্লিয়ারলি বলো ”
” আজ তোর মেজো মা অভিমান করে আছে , কাল তোর মেজো চাচা রা’গ করে থাকবে,পরশু তোর বাপ ,তারপর তোর… ”

” কেন ?ওর বাপ রাগ কেন করবে ? ” সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বললেন আকবর চৌধুরী।তাকে আসতে দেখে পারভিন বেগম আর লতা বেগম থতমত খেয়ে গেলেন ।কি বলবেন ,কি করবেন বুঝতে পারছেন না।তিনি এসে তূর্যের পাশের সিঙ্গেল সোফায় বসলেন।খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে বললেন,
” সকাল সকাল কি হয়েছে তোমাদের ? কি হয়েছেরে তূর্য ? ”
তূর্য একবার মায়ের দিকে তাঁকালো।তারপর বাবার উদ্দেশ্যে বললো,
” আমার আপনাকে কিছু বলার আছে ”
” হ্যাঁ,বলো ”
” আপনাদের মেয়ে, আফহানা চৌধুরী আহিকে আমি …..”

কথা শেষ করতে পারলো না তূর্য। তার আগেই আসলাম চৌধুরীর ফোন বেজে উঠলো। সেটা কানে ধরেই মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে গেল তার।সকালের চা টাও মুখে তুললেন না ।চিন্তিত মস্তিষ্কে বাড়ির মেইন ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।এভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে পারভিন বেগম ,তূর্য পিছু ডেকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন।তিনি শুধু হাতের ইশারায় বোঝালেন ‘ কিছু হয়নি ‘

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৪

তার পরপরই আসলাম চৌধুরী আর আসিফ চৌধুরীও বেরিয়ে গেলেন।তবে তাদের মুখে কোনো টেনশনের রেশ নেই।দুই ভাইয়ে হাসি হাসি মুখ করে কিছু বলতে বলতে যাচ্ছিলেন।তূর্য যেতে গেলে তাকেও যেতে বাঁধা দিলেন ।আর আসিফ চৌধুরী বললেন ,
” টেনশন করো না কেউ । আর তূর্য , আজ তুই একটু সকাল সকাল বাড়ি ফিরিস।বাকিটা কলে বলছি ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫ (২)